অধ্যায় ৯: ভারত ও সমকালীন বহির্বিশ্ব
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
প্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিচ্ছিন্ন ছিল না। স্থলপথ ও জলপথের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার সঙ্গে এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এই অধ্যায়ে সেই যোগাযোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
- যোগাযোগের মাধ্যম: উত্তর-পশ্চিমের গিরিপথগুলি (যেমন—খাইবার পাস) ছিল স্থলপথে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে, সমুদ্রপথে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চলত।
- রাজনৈতিক যোগাযোগ:
- পারস্য ও গ্রিস: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারস্যের হখামনীষীয় সম্রাট প্রথম দরায়বৌষ উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ জয় করেন। পরে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার এই অঞ্চলে অভিযান চালান। এই যোগাযোগের ফলে উভয় অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা ও শিল্পকলায় প্রভাব পড়ে।
- মধ্য এশিয়া (শক-কুষাণ): মৌর্যদের পর মধ্য এশিয়া থেকে আসা শক, পহ্লব ও কুষাণরা উত্তর ও পশ্চিম ভারতে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এর ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মধ্য এশীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে।
- দূত বিনিময়: মৌর্য সম্রাটরা গ্রিস, মিশর, সিরিয়ার মতো দেশগুলির সঙ্গে দূত বিনিময় করতেন। চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর মতো অনেকেই ভারতে আসেন।
- অর্থনৈতিক যোগাযোগ (বাণিজ্য):
- রেশম পথ (Silk Road): চিনের রেশম স্থলপথে মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপে যেত। কুষাণরা এই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং এর থেকে প্রচুর শুল্ক আয় করত।
- সমুদ্র বাণিজ্য: মৌসুমি বায়ুর জ্ঞান কাজে লাগিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের মশলা ও বস্ত্রের ব্যাপক বাণিজ্য চলত। বিনিময়ে ভারত প্রচুর সোনা ও রুপো পেত। তাম্রলিপ্ত, ভৃগুকচ্ছ ছিল তৎকালীন বিখ্যাত বন্দর।
- সাংস্কৃতিক যোগাযোগ:
- শিল্প ও লিপি: পারসিক প্রভাবে ভারতে খরোষ্ঠী লিপির উদ্ভব হয় এবং স্তম্ভ নির্মাণের ধারণা আসে। গ্রিক প্রভাবে গান্ধার শিল্পরীতির জন্ম হয়, যেখানে ভারতীয় ভাবনায় গ্রিক-রোমান শৈলীতে বুদ্ধমূর্তি তৈরি হত।
- ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান: ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম চিন, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। কুমারজীবের মতো ভারতীয় পণ্ডিতরা চিনে গিয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সাহায্য করেন। ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে গ্রিক ও রোমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান ঘটে।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টপূর্ব/খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| খ্রি.পূ. ৫২২-৪৮৬ অব্দ | পারসিক সম্রাট প্রথম দরায়বৌষের শাসনকাল। |
| আনু. খ্রি.পূ. ৩২৭-৩২৫ | আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান। |
| আনু. ১৫০ খ্রিঃ | 'যবনজাতক' গ্রন্থটি সংস্কৃতে অনূদিত হয়। |
| ৩৯৯-৪১৪ খ্রিঃ | চিনা পর্যটক ফা-হিয়েনের ভারত ভ্রমণ। |
| ৬৩০-৬৪৩ খ্রিঃ | চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং)-এর ভারত ভ্রমণ। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
হেরোডোটাসের মতে 'ইন্ডিয়া' কোন সাম্রাজ্যের প্রদেশ ছিল?
(ক) রোমান (খ) গ্রিক (গ) মিশরীয় (ঘ) পারসিক
উত্তর: (ঘ) পারসিক
মৌর্য সম্রাট অশোক কোন অঞ্চলে আরামীয় লিপি ব্যবহার করেন?
(ক) পূর্ব ভারতে (খ) দক্ষিণ ভারতে (গ) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে (ঘ) মধ্য ভারতে
উত্তর: (গ) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে
ইন্দো-গ্রিক রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কে ছিলেন?
(ক) সেলুকাস (খ) অ্যান্টিওকাস (গ) মিনান্দার (ঘ) টলেমি
উত্তর: (গ) মিনান্দার
'মিলিন্দপঞহো' গ্রন্থে বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের সঙ্গে কোন রাজার কথোপকথন আছে?
(ক) কণিষ্ক (খ) অশোক (গ) মিনান্দার (ঘ) হর্ষবর্ধন
উত্তর: (গ) মিনান্দার
রেশম পথের প্রধান বাণিজ্যদ্রব্য কী ছিল?
(ক) মশলা (খ) সুতির কাপড় (গ) চিনা রেশম (ঘ) ঘোড়া
উত্তর: (গ) চিনা রেশম
কোন চিনা পর্যটক হর্ষবর্ধনের সময়ে ভারতে আসেন?
(ক) ফা-হিয়েন (খ) ই-ৎসিঙ (গ) সুয়ান জাং (হিউয়েন সাঙ) (ঘ) তাও-নান
উত্তর: (গ) সুয়ান জাং (হিউয়েন সাঙ)
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে কী সুবিধা হয়েছিল?
আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ছোট ছোট রাজনৈতিক শক্তিগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে পরবর্তীকালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পক্ষে ওই অঞ্চলগুলি জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সহজ হয়েছিল।
ইন্দো-গ্রিক শাসক কাদের বলা হয়?
আলেকজান্ডারের পর ব্যাকট্রিয়া (আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব অংশ) অঞ্চলে যে গ্রিক শাসকরা শাসন করতেন, তাঁরা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশেও নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই শাসকদেরকেই ইন্দো-গ্রিক বা ব্যাকট্রীয়-গ্রিক শাসক বলা হয়।
রেশম পথ কী?
প্রাচীনকালে যে স্থলপথ ধরে চিনের রেশম মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যেত, তাকেই 'রেশম পথ' বলা হয়। কুষাণ সম্রাটরা এই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বাণিজ্য শুল্ক থেকে প্রচুর আয় করতেন।
তাম্রলিপ্ত বন্দরটি কেন বিখ্যাত ছিল?
তাম্রলিপ্ত (আজকের তমলুক) ছিল প্রাচীন বাংলার একটি বিখ্যাত বন্দর-নগর। এটি স্থলপথ ও জলপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল। এই বন্দর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ চলত। চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন এই বন্দর দিয়েই জাহাজে করে দেশে ফিরেছিলেন।
গন্ধার শিল্পরীতির দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
গন্ধার শিল্পরীতির দুটি বৈশিষ্ট্য হলো: (১) এই শিল্পের মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্ম এবং বুদ্ধের জীবনকাহিনী, এবং (২) এর নির্মাণশৈলীতে গ্রিক ও রোমান শিল্পের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়, যেমন—মূর্তির পোশাকের ভাঁজ, কোঁকড়ানো চুল ইত্যাদি।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৪৯)
১। বেমানান শব্দটি খুঁজে বের করো:
১.১) ভৃগুকচ্ছ, কল্যাণ, সোপারা, তাম্রলিপ্ত। (তাম্রলিপ্ত পূর্ব উপকূলের বন্দর, বাকিগুলি পশ্চিম উপকূলের।)
১.২) বুদ্ধযশ, কুমারজীব, পরমার্থ, সুয়ান জাং। (সুয়ান জাং চিনা পর্যটক, বাকিরা ভারতীয় পণ্ডিত যারা বিদেশে গিয়েছিলেন।)
১.৩) আলেকজান্ডার, সেলিউকাস, কনিষ্ক, মিনান্দার। (কণিষ্ক কুষাণ শাসক, বাকিরা গ্রিক শাসক।)
২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| নকস-ই রুস্তম | প্রথম দরায়বৌষ |
| ভৃগুকচ্ছ | নর্মদা নদী |
| প্রথম অ্যান্টিওকস | সিরিয়া |
৩। সঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো:
৩.১) হেরোডোটাসের মতে ইন্দুস ছিল পারসিক সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ।
৩.২) ইন্দো-গ্রিক বলা হতো ব্যাকট্রিয়ার অধিবাসীদের।
৩.৩) সেন্ট থমাস খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিলেন গন্ডোফারনেস-এর আমলে।
৪। নিজের ভাষায় ভেবে লেখো (তিন/চার লাইন):
৪.১) আলেকজান্ডারের ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযানের কি মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার উপরে কোনো প্রভাব ছিল?
হ্যাঁ, প্রভাব ছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ছোট ছোট রাজ্য ও গোষ্ঠীগুলির শক্তি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এর ফলে সেই অঞ্চলে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। পরবর্তীকালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খুব সহজেই সেই দুর্বল শক্তিগুলিকে পরাজিত করে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলেন।
৪.২) শক-কুষাণরা আসার আগে ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে কী কী বিষয় খুঁজে পাওয়া যায় না?
শক-কুষাণরা আসার আগে ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েকটি বিষয় প্রচলিত ছিল না। যেমন—জামা, পাজামা, লম্বা জোব্বা, বেল্ট ও জুতো পরার রীতি; ঘোড়ার লাগাম ও জিনের উন্নত ব্যবহার এবং চলন্ত ঘোড়া থেকে তির ছোঁড়ার কৌশল। এছাড়াও, কুষাণদের হাত ধরেই উপমহাদেশে সোনার মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন হয় এবং গান্ধার শিল্পরীতিতে গ্রিক-রোমান প্রভাব আসে।
৪.৩) প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পড়াশোনার কী ভূমিকা ছিল বলে তোমার মনে হয়?
পড়াশোনা বা জ্ঞানচর্চা ছিল প্রাচীনকালে যোগাযোগের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন শেখার জন্য ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর মতো চিনা পর্যটকরা ভারতে এসেছিলেন। আবার, কুমারজীব ও অতীশের মতো ভারতীয় পণ্ডিতরা চিন ও তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছেন এবং ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে উভয় অঞ্চলের মধ্যে এক গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।