অধ্যায় ৭: অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কৃষিকাজ, পশুপালন, কারিগরি শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায়ও নানা পরিবর্তন আসে।

  • মহাজনপদের আমল (খ্রি.পূ. ৬০০-৩২৪ অব্দ):
    • অর্থনীতি: এই সময়ে লোহার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসে। গঙ্গা উপত্যকার উর্বর জমিতে ধান, গম, যব, আখের মতো ফসল প্রচুর পরিমাণে ফলানো হত। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় নগরায়ণ ঘটে। বারাণসী বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। ধাতুর মুদ্রার (কার্ষাপণ) প্রচলন হওয়ায় বাণিজ্য সহজ হয়।
    • সমাজ: সমাজে জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ভেদাভেদ বাড়ে। নারীদের সামাজিক অবস্থান পুরুষের নীচে ছিল।
  • মৌর্য আমল (খ্রি.পূ. ৩২৪-১৮৭ অব্দ):
    • অর্থনীতি: অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। রাষ্ট্র খনি, বনজ সম্পদ এবং লবণ শিল্পের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখত। উন্নত সড়কপথ (যেমন—উত্তরাপথ) এবং মুদ্রা ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছিল।
    • সমাজ: মেগাস্থিনিসের বিবরণ অনুযায়ী, সমাজ বিভিন্ন পেশার ভিত্তিতে সাতটি 'জাতি'-তে বিভক্ত ছিল।
  • মৌর্য-পরবর্তী ও গুপ্ত যুগ (খ্রি.পূ. ২০০ - খ্রি. ৬০০ অব্দ):
    • অর্থনীতি: কুষাণ ও সাতবাহন আমলে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের মশলা ও বস্ত্রের ব্যাপক বাণিজ্য চলত, যার ফলে প্রচুর সোনা-রুপো ভারতে আসত। গুপ্ত আমলে বৈদেশিক বাণিজ্যে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিলেও দেশের ভেতরের বাণিজ্য সচল ছিল।
    • সমাজ: এই সময়ে বর্ণপ্রথা আরও কঠোর হয়। তবে নারীরা 'স্ত্রীধন' হিসেবে নিজস্ব সম্পত্তির অধিকারী হতেন। গুপ্ত আমলে 'অগ্রহার ব্যবস্থা' বা ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমিদান প্রথা চালু হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল

সময়কাল (আনুমানিক)যুগ/ঘটনা
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকগঙ্গা উপত্যকায় দ্বিতীয় নগরায়ণ শুরু।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক - খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকসুদর্শন হ্রদের ব্যবহার।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

মহাজনপদগুলির আমলে প্রধান ফসল কী ছিল?

(ক) যব (খ) গম (গ) ধান (ঘ) ভুট্টা
উত্তর: (গ) ধান

বস্ত্রশিল্পের জন্য কোন নগরটি বিখ্যাত ছিল?

(ক) মগধ (খ) পাটলিপুত্র (গ) উজ্জয়িনী (ঘ) বারাণসী
উত্তর: (ঘ) বারাণসী

দ্বিতীয় নগরায়ণ কোথায় গড়ে উঠেছিল?

(ক) সিন্ধু উপত্যকায় (খ) গঙ্গা উপত্যকায় (গ) নর্মদা উপত্যকায় (ঘ) কাবেরী উপত্যকায়
উত্তর: (খ) গঙ্গা উপত্যকায়

মৌর্য আমলে নুনের উপর কাদের একচেটিয়া অধিকার ছিল?

(ক) বণিকদের (খ) কারিগরদের (গ) রাষ্ট্রের (ঘ) সাধারণ মানুষের
উত্তর: (গ) রাষ্ট্রের

সাতবাহন রাজা হালের সংকলিত গ্রন্থটির নাম কী?

(ক) অর্থশাস্ত্র (খ) ইন্ডিকা (গ) গাথা সপ্তশতী (ঘ) এলাহাবাদ প্রশস্তি
উত্তর: (গ) গাথা সপ্তশতী

গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী আমলে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নিষ্কর জমিদানকে কী বলা হত?

(ক) ব্রহ্মদেয় (খ) দেবদান (গ) অগ্রহার ব্যবস্থা (ঘ) নিষ্কর
উত্তর: (গ) অগ্রহার ব্যবস্থা

গুপ্ত আমলে সোনার মুদ্রাকে কী বলা হত?

(ক) রূপক (খ) কার্ষাপণ (গ) তঙ্কা (ঘ) দীনার
উত্তর: (ঘ) দীনার

সুদর্শন হ্রদ কোন শাসকের আমলে তৈরি হয়েছিল?

(ক) অশোক (খ) কণিষ্ক (গ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (ঘ) সমুদ্রগুপ্ত
উত্তর: (গ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

প্রথম নগরায়ণ ও দ্বিতীয় নগরায়ণের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

প্রথম নগরায়ণ (হরপ্পা সভ্যতা) ছিল তামা-ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা, যা সিন্ধু উপত্যকায় গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, দ্বিতীয় নগরায়ণ ছিল লৌহ যুগের সভ্যতা, যা গঙ্গা উপত্যকায় গড়ে উঠেছিল এবং এর ভিত্তি ছিল লোহার ব্যাপক ব্যবহার ও কৃষির উন্নতি।

মৌর্য আমলে যোগাযোগের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?

মৌর্য আমলে যোগাযোগের জন্য উন্নত সড়কপথ তৈরি করা হয়েছিল এবং সেগুলির দেখভালের জন্য রাজকর্মচারী নিয়োগ করা হত। রাস্তার পাশে আজকের মাইল ফলকের মতো দূরত্ব ও দিকনির্দেশক ফলক লাগানো থাকত।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল কেন?

প্রাচীন ভারতে অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষিকাজের উন্নতির জন্য এবং অনাবৃষ্টির সময়ও যাতে চাষাবাদ করা যায়, তার জন্য জলের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। এই কারণেই নদীর জল খাল কেটে বা জলাশয়ে ধরে রেখে জমিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

স্ত্রীধন কী?

গুপ্ত যুগে মেয়েরা বিয়ের সময় বাবা-মা বা আত্মীয়দের কাছ থেকে যে সম্পদ (মূলত গয়না বা পোশাক) পেত, তার উপর শুধুমাত্র সেই মেয়েরই অধিকার থাকত। এই ব্যক্তিগত সম্পত্তিকেই 'স্ত্রীধন' বলা হত।

অগ্রহার ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো?

গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী আমলে ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধবিহারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে পুণ্য অর্জনের জন্য যে নিষ্কর বা করহীন জমি দান করা হত, সেই ব্যবস্থাকে 'অগ্রহার ব্যবস্থা' বলা হয়। এই জমি থেকে প্রাপ্ত আয় ধর্মীয় কাজেই ব্যয় করা হত।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১০৯)

১। নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে তার নীচের কোন ব্যাখ্যাটি তোমার সবচেয়ে মানানসই বলে মনে হয়?

১.১) বিবৃতি: মৌর্য-পরবর্তী যুগে অনেকগুলি গিল্ড গড়ে উঠেছিল।
ব্যাখ্যা ২: কারিগর ও ব্যবসায়ীরা গিল্ড গড়ে তুলেছিলেন।

১.২) বিবৃতি: দাক্ষিণাত্যে ভালো তুলোর চাষ হতো।
ব্যাখ্যা ১: দাক্ষিণাত্যের কালো মাটি তুলো চাষের পক্ষে ভালো ছিল।

২। সঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো:

২.১) জনপদ হলো কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ এলাকা।

২.২) মৌর্য আমলে অর্থনীতি মূলত কৃষির উপরে নির্ভর করত।

২.৩) গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী আমলে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে জমিদানকে বলা হয় অগ্রহার ব্যবস্থা।

৩। নিজের ভাষায় ভেবে লেখো (তিন/চার লাইন):

৩.১) প্রথম নগরায়ণ (হরপ্পা) এবং দ্বিতীয় নগরায়ণ (মহাজনপদ)- এর মধ্যে কোন ধরনের পার্থক্য তোমার চোখে পড়ে?

প্রথম নগরায়ণ (হরপ্পা) ছিল সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা একটি তামা-ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা, যার নগরগুলি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। অন্যদিকে, দ্বিতীয় নগরায়ণ ছিল লোহার ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে গঙ্গা উপত্যকায় গড়ে ওঠা সভ্যতা। হরপ্পার নগর পরিকল্পনা অনেক বেশি উন্নত ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় নগরায়ণের সময় মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন হয়, যা বাণিজ্যের প্রসারে সাহায্য করেছিল।

৩.২) প্রাচীন ভারতে জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল কেন? সেযুগের জলসেচ ব্যবস্থার সঙ্গে আজকের দিনের জলসেচ ব্যবস্থার কোন পার্থক্য তোমার চোখে পড়ে কি?

প্রাচীন ভারতে কৃষিকাজ ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। অনাবৃষ্টির সমস্যা মোকাবিলা করে সারা বছর চাষাবাদের জন্য জলের জোগান নিশ্চিত করতে জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সেযুগে মূলত খাল, কূপ ও জলাশয়ের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হত। আজকের দিনেও এই পদ্ধতিগুলি ব্যবহৃত হয়, তবে এখন পাম্প, ডিপ টিউবওয়েল এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক বড় এলাকা জুড়ে এবং আরও কার্যকরভাবে জলসেচ করা সম্ভব হয়।

৩.৩) খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে কৃষির পদ্ধতি ও উৎপাদিত ফসলের মধ্যে কী কী তফাৎ দেখা যায়?

এই সময়ে উত্তর ভারতে, বিশেষ করে গঙ্গা উপত্যকায়, লোহার লাঙলের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসে। এখানকার প্রধান ফসল ছিল ধান, গম ও যব। অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতের কালো মাটিতে তুলো এবং কেরালায় গোলমরিচের মতো মশলার চাষ বেশি হত। দক্ষিণ ভারতে কাবেরী নদীর জলকে খাল কেটে সেচ কাজে লাগানোর উন্নত প্রযুক্তি দেখা যায়।