অধ্যায় ৪: ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ধারা (দ্বিতীয় পর্যায়)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
হরপ্পা সভ্যতার পতনের পর ভারতীয় উপমহাদেশে এক নতুন সভ্যতার বিকাশ ঘটে, যা বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত। এই অধ্যায়ে আমরা ইন্দো-আর্যদের আগমন, বৈদিক সাহিত্য, এবং আদি ও পরবর্তী বৈদিক যুগের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানব।
- ইন্দো-আর্য ও বৈদিক সাহিত্য: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি শাখা, ইন্দো-আর্যরা, সম্ভবত মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায় মূলত বৈদিক সাহিত্য থেকে। 'বেদ' কথার অর্থ জ্ঞান। বৈদিক সাহিত্য চারটি ভাগে বিভক্ত: সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। চারটি সংহিতা হলো—ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব।
- বৈদিক যুগের বিভাজন: বৈদিক যুগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: (১) আদি বৈদিক যুগ (আনুমানিক খ্রি.পূ. ১৫০০-১০০০ অব্দ), যার ইতিহাস জানার একমাত্র উপাদান ঋকবেদ; এবং (২) পরবর্তী বৈদিক যুগ (আনুমানিক খ্রি.পূ. ১০০০-৬০০ অব্দ), যার ইতিহাস অন্যান্য বৈদিক সাহিত্য থেকে জানা যায়।
- আদি বৈদিক যুগ:
- ভূগোল ও রাজনীতি: এই যুগের মানুষ সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (সিন্ধু ও তার উপনদী বিধৌত এলাকা) বাস করত। তাদের সমাজ ছিল মূলত قبيلةভিত্তিক। গোষ্ঠীর প্রধানকে 'রাজা' বলা হত, যার প্রধান কাজ ছিল গোষ্ঠীকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধ পরিচালনা করা। 'সভা' ও 'সমিতি' নামে দুটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল।
- অর্থনীতি ও সমাজ: অর্থনীতি ছিল মূলত পশুপালন-নির্ভর, গবাদি পশুই ছিল প্রধান সম্পদ। কৃষি কাজ ছিল গৌণ। সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক, তবে নারীদের সম্মানজনক স্থান ছিল। বর্ণপ্রথা কঠোর ছিল না।
- পরবর্তী বৈদিক যুগ:
- ভূগোল ও রাজনীতি: আর্য বসতি পূর্ব দিকে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি 'ভূপতি' বা 'মহীপতি' উপাধি নেন। রাজ্য ও শাসনের ধারণা স্পষ্ট হয়। অশ্বমেধ, রাজসূয় প্রভৃতি বড় বড় যজ্ঞের মাধ্যমে রাজা তাঁর ক্ষমতা জাহির করতেন।
- অর্থনীতি ও সমাজ: লোহার ব্যবহারের ফলে কৃষির ব্যাপক উন্নতি হয়। ধান ও গম প্রধান ফসলে পরিণত হয়। সমাজ চারটি বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) ভাগ হয়ে যায় এবং বর্ণপ্রথা কঠোর ও জন্মভিত্তিক হয়ে ওঠে। নারীদের সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পায়। চতুরাশ্রম প্রথাও (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস) চালু হয়।
- অন্যান্য সমাজ: বৈদিক সভ্যতার বাইরেও উপমহাদেশে অন্যান্য সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। দক্ষিণ ভারতে 'মেগালিথ' বা বড় পাথরের সমাধি পাওয়া গেছে, যা লৌহ যুগের গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচয় দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল
| সময়কাল (আনুমানিক) | যুগ/ঘটনা |
|---|---|
| খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ - ১০০০ অব্দ | আদি বৈদিক যুগ। |
| খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ - ৬০০ অব্দ | পরবর্তী বৈদিক যুগ। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
'বিদ' শব্দটির অর্থ কী?
(ক) শক্তি (খ) বিশ্বাস (গ) জ্ঞান (ঘ) নিয়ম
উত্তর: (গ) জ্ঞান
সবচেয়ে পুরোনো বৈদিক সংহিতা কোনটি?
(ক) সামবেদ (খ) যজুর্বেদ (গ) অথর্ববেদ (ঘ) ঋকবেদ
উত্তর: (ঘ) ঋকবেদ
কোন বেদ মূলত সুর করে গাওয়া হত?
(ক) ঋকবেদ (খ) সামবেদ (গ) যজুর্বেদ (ঘ) অথর্ববেদ
উত্তর: (খ) সামবেদ
আদি বৈদিক যুগের ইতিহাস জানার একমাত্র উপাদান কোনটি?
(ক) ঋকবেদ (খ) রামায়ণ (গ) মহাভারত (ঘ) উপনিষদ
উত্তর: (ক) ঋকবেদ
ঋকবেদে কোন নদীর কথা সবচেয়ে বেশিবার বলা হয়েছে?
(ক) গঙ্গা (খ) যমুনা (গ) সরস্বতী (ঘ) সিন্ধু
উত্তর: (ঘ) সিন্ধু
আদি বৈদিক যুগের মানুষের বাসস্থান কোথায় ছিল?
(ক) গঙ্গা উপত্যকা (খ) দাক্ষিণাত্য (গ) সপ্তসিন্ধু অঞ্চল (ঘ) পূর্ব ভারতউত্তর: (গ) সপ্তসিন্ধু অঞ্চল
দশ রাজার যুদ্ধ কোন গোষ্ঠীর রাজার সঙ্গে হয়েছিল?
(ক) কুরু (খ) পাঞ্চাল (গ) ভরত (ঘ) যদু
উত্তর: (গ) ভরত
ঋকবেদে 'রাজা'কে কী বলা হত?
(ক) ভূপতি (খ) নরপতি (গ) বিশপতি (ঘ) সম্রাটউত্তর: (গ) বিশপতি
আদি বৈদিক সমাজের প্রধান সম্পদ কী ছিল?
(ক) জমি (খ) সোনা (গ) গবাদি পশু (ঘ) শস্য
উত্তর: (গ) গবাদি পশু
পরবর্তী বৈদিক যুগে কোন ধাতুর ব্যবহার শুরু হয়?
(ক) তামা (খ) ব্রোঞ্জ (গ) লোহা (ঘ) রুপো
উত্তর: (গ) লোহা
পরবর্তী বৈদিক যুগে তৈরি ধূসর রঙের মাটির পাত্রগুলিকে কী বলা হয়?
(ক) লাল-কালো পাত্র (খ) চিত্রিত ধূসর মাটির পাত্র (গ) মৃৎপাত্র (ঘ) মৃৎভান্ডউত্তর: (খ) চিত্রিত ধূসর মাটির পাত্র
বৈদিক যুগে শিক্ষা দেওয়া হত কীভাবে?
(ক) পুঁথি পড়ে (খ) লিখে লিখে (গ) ছবি এঁকে (ঘ) শুনে শুনে মুখস্থ করেউত্তর: (ঘ) শুনে শুনে মুখস্থ করে
বৈদিক যুগে রাজাকে যে কর দেওয়া হত, তার নাম কী?
(ক) ভাগ (খ) শুল্ক (গ) বলি (ঘ) কর
উত্তর: (গ) বলি
পরবর্তী বৈদিক যুগের একজন বিখ্যাত নারী কে ছিলেন?
(ক) লোপামুদ্রা (খ) অপালা (গ) গার্গী (ঘ) বিশ্ববারা
উত্তর: (গ) গার্গী
'চতুরাশ্রম'-এর প্রথম পর্যায় কোনটি?
(ক) গার্হস্থ্য (খ) ব্রহ্মচর্য (গ) বাণপ্রস্থ (ঘ) সন্ন্যাস
উত্তর: (খ) ব্রহ্মচর্য
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হতো। এর কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
বৈদিক যুগে লেখার কোনো লিপি বা বর্ণমালা ছিল না। তাই জ্ঞান বা মন্ত্রগুলিকে বংশপরম্পরায় টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় ছিল শুনে শুনে মুখস্থ করা। এক প্রজন্ম পরের প্রজন্মকে মুখে মুখে শিখিয়ে দিত। এই কারণেই বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হত এবং এর অপর নাম 'শ্রুতি'
বৈদিক সমাজ চারটি ভাগে কেন ভাগ হয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?
পরবর্তী বৈদিক যুগে কৃষিকাজ ও অন্যান্য পেশার প্রসারের ফলে সমাজে কাজের ভাগাভাগি জটিল হয়ে ওঠে। যাগযজ্ঞের গুরুত্ব বাড়ায় পুরোহিতদের (ব্রাহ্মণ) ক্ষমতা বাড়ে। শাসন ও যুদ্ধের জন্য যোদ্ধাদের (ক্ষত্রিয়) প্রয়োজন হয়। ব্যবসা ও কৃষিকাজের জন্য একদল (বৈশ্য) এবং বাকিদের সেবার জন্য আরেক দল (শূদ্র) তৈরি হয়। এই কাজের বিভাজনই পরে জন্মভিত্তিক ও কঠোর হয়ে বর্ণপ্রথায় পরিণত হয়।
বৈদিক যুগের পড়াশোনায় গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল বলে মনে হয়?
বৈদিক যুগে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও ঘনিষ্ঠ। শিষ্যরা গুরুগৃহে থেকেই পড়াশোনা করত এবং গুরুর সেবা করত। গুরু শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যাই দিতেন না, তিনি শিষ্যদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাও দিতেন। শিষ্যের প্রতি গুরুর দায়িত্ব ছিল পিতার মতো।
আদি বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থার কি কোনো বদল হয়েছিল? বদল হয়ে থাকলে কেন তা হয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?
হ্যাঁ, নারীর অবস্থার অনেক বদল হয়েছিল। আদি বৈদিক যুগে নারীদের সম্মানজনক স্থান ছিল, তাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন এবং সভা-সমিতিতেও যোগ দিতেন। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগে বর্ণপ্রথা কঠোর হওয়ায় এবং যাগযজ্ঞের গুরুত্ব বাড়ায় সমাজে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার কমে আসে এবং বাল্যবিবাহের মতো প্রথা চালু হয়।
মেগালিথ কী?
মেগালিথ হলো বড় পাথরের সমাধি। প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের সমাধিস্থলকে বড় বড় পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখত। এই সমাধিগুলিকেই মেগালিথ বলা হয়। এগুলি থেকে তৎকালীন সমাজ ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৬৩)
১। সঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো:
১.১) আদি বৈদিক যুগের ইতিহাস জানার প্রধান উপাদান- ঋকবেদ।
১.২) মেগালিথ বলা হয়- পাথরের সমাধি কে।
১.৩) ঋকবেদে রাজা ছিলেন- গোষ্ঠীর প্রধান।
১.৪) বৈদিক সমাজে পরিবারের প্রধান ছিলেন বাবা।
২। বেমানান শব্দটি খুঁজে লেখো:
২.১) ঋকবেদ, মহাকাব্য, সামবেদ, অথর্ববেদ (মহাকাব্য পরবর্তী বৈদিক যুগের রচনা।)
২.২) ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শূদ্র, নৃপতি (নৃপতি হলেন রাজা, বাকিরা চতুর্বর্ণের অংশ।)
২.৩) ইনামগাঁও, হস্তিনাপুর, কৌশাম্বী, শ্রাবস্তী (ইনামগাঁও একটি মেগালিথ কেন্দ্র, বাকিগুলি পরবর্তী বৈদিক যুগের প্রত্নক্ষেত্র।)
২.৪) ঊষা, অদিতি, পৃথিবী, দুর্গা (দুর্গার উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যে নেই।)
৩। নিজের ভাষায় ভেবে লেখো (তিন/চার লাইন):
৩.১) বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হতো। এর কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
বৈদিক যুগে লেখার কোনো লিপি বা বর্ণমালা ছিল না। তাই জ্ঞান বা মন্ত্রগুলিকে বংশপরম্পরায় টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় ছিল শুনে শুনে মুখস্থ করা। এক প্রজন্ম পরের প্রজন্মকে মুখে মুখে শিখিয়ে দিত। এই কারণেই বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হত এবং এর অপর নাম 'শ্রুতি'
৩.২) বৈদিক সমাজ চারটি ভাগে কেন ভাগ হয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?
পরবর্তী বৈদিক যুগে কৃষিকাজ ও অন্যান্য পেশার প্রসারের ফলে সমাজে কাজের ভাগাভাগি জটিল হয়ে ওঠে। যাগযজ্ঞের গুরুত্ব বাড়ায় পুরোহিতদের (ব্রাহ্মণ) ক্ষমতা বাড়ে। শাসন ও যুদ্ধের জন্য যোদ্ধাদের (ক্ষত্রিয়) প্রয়োজন হয়। ব্যবসা ও কৃষিকাজের জন্য একদল (বৈশ্য) এবং বাকিদের সেবার জন্য আরেক দল (শূদ্র) তৈরি হয়। এই কাজের বিভাজনই পরে জন্মভিত্তিক ও কঠোর হয়ে বর্ণপ্রথায় পরিণত হয়।
৩.৩) বৈদিক যুগের পড়াশোনায় গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল বলে মনে হয়?
বৈদিক যুগে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও ঘনিষ্ঠ। শিষ্যরা গুরুগৃহে থেকেই পড়াশোনা করত এবং গুরুর সেবা করত। গুরু শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যাই দিতেন না, তিনি শিষ্যদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাও দিতেন। শিষ্যের প্রতি গুরুর দায়িত্ব ছিল পিতার মতো।
৩.৪) আদি বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থার কি কোনো বদল হয়েছিল? বদল হয়ে থাকলে কেন তা হয়েছিল বলে মনে হয়?
হ্যাঁ, নারীর অবস্থার অনেক বদল হয়েছিল। আদি বৈদিক যুগে নারীদের সম্মানজনক স্থান ছিল, তাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন এবং সভা-সমিতিতেও যোগ দিতেন। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগে বর্ণপ্রথা কঠোর হওয়ায় এবং যাগযজ্ঞের গুরুত্ব বাড়ায় সমাজে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার কমে আসে এবং বাল্যবিবাহের মতো প্রথা চালু হয়।