অধ্যায় ৬: সাম্রাজ্য বিস্তার ও শাসন
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাজনপদগুলির মধ্যে মগধের উত্থানের পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে শুরু করে। এই অধ্যায়ে আমরা মৌর্য সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে গুপ্ত যুগ এবং তার পরবর্তী সময়ের প্রধান প্রধান সাম্রাজ্য ও তাদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানব।
- সাম্রাজ্য ও সম্রাট: অনেকগুলো রাজ্য জয় করে যখন একটি বিশাল শাসন এলাকা তৈরি হয়, তখন তাকে সাম্রাজ্য বলে। যিনি এই সাম্রাজ্য শাসন করেন, তিনি হলেন সম্রাট বা রাজাধিরাজ।
- মৌর্য সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রি.পূ. ৩২৪-১৮৭ অব্দ):
- প্রতিষ্ঠা: নন্দ বংশের শেষ রাজাকে পরাজিত করে চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রথম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিক শাসক সেলুকাসকে পরাজিত করে তিনি সাম্রাজ্যের সীমানা আরও বাড়ান।
- অশোক: চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র অশোক ছিলেন এই বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি যুদ্ধনীতি ত্যাগ করেন এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে 'ধম্ম'-এর আদর্শ প্রচার করেন। তাঁর আমলে মৌর্য সাম্রাজ্য উত্তরে আফগানিস্তান থেকে দক্ষিণে কর্ণাটক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
- শাসনব্যবস্থা: মৌর্যদের শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁকে সাহায্য করার জন্য অমাত্য বা মহামাত্ররা ছিলেন। গুপ্তচর ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের খবরাখবর রাখা হত।
- মৌর্য-পরবর্তী যুগ (কুষাণ ও সাতবাহন): মৌর্যদের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম ভারতে মধ্য এশিয়া থেকে আসা কুষাণরা এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। কণিষ্ক ছিলেন কুষাণদের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। একই সময়ে দাক্ষিণাত্যে সাতবাহনরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি ছিলেন এই বংশের উল্লেখযোগ্য শাসক।
- গুপ্ত সাম্রাজ্য (আনুমানিক ৩২০-৫৫০ খ্রিঃ):
- প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার: প্রথম চন্দ্রগুপ্ত গুপ্ত সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বহু রাজ্য জয় করে সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটান। তাঁর কৃতিত্ব এলাহাবাদ प्रशस्तिতে লিপিবদ্ধ আছে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত 'শকারি' উপাধি নিয়েছিলেন এবং তাঁর সময়ে সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি পায়।
- শাসনব্যবস্থা: গুপ্তরাও একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সাম্রাজ্যকে 'ভুক্তি' (প্রদেশ) ও 'বিষয়' (জেলা)-তে ভাগ করা হয়েছিল।
- গুপ্ত-পরবর্তী যুগ (হর্ষবর্ধন): গুপ্তদের পতনের পর উত্তর ভারতে পুষ্যভূতি বংশের হর্ষবর্ধন এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার চেষ্টা করেন। তিনি কনৌজকে রাজধানী করে শাসন চালাতেন। তবে তাঁর সাম্রাজ্য মৌর্য বা গুপ্তদের মতো বিশাল ছিল না।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টপূর্ব/খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| আনু. খ্রি.পূ. ৩২৫-৩২৪ | চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মগধের সিংহাসন লাভ। |
| আনু. খ্রি.পূ. ২৭৩-২৩২ | সম্রাট অশোকের শাসনকাল। |
| খ্রি.পূ. ১৮৭ | শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের পতন। |
| ৭৮ খ্রিঃ | কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সিংহাসনারোহণ এবং শকাব্দ গণনা শুরু। |
| ৩১৯-৩২০ খ্রিঃ | প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনারোহণ এবং গুপ্তাব্দ গণনা শুরু। |
| ৬০৬ খ্রিঃ | হর্ষবর্ধনের সিংহাসনারোহণ এবং হর্ষাব্দ গণনা শুরু। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
সাম্রাজ্যের শাসককে কী বলা হয়?
(ক) রাজা (খ) মহারাজা (গ) সম্রাট (ঘ) নবাব
উত্তর: (গ) সম্রাট
ভারতের প্রথম সাম্রাজ্য কোনটি?
(ক) গুপ্ত সাম্রাজ্য (খ) মৌর্য সাম্রাজ্য (গ) কুষাণ সাম্রাজ্য (ঘ) হর্ষের সাম্রাজ্য
উত্তর: (খ) মৌর্য সাম্রাজ্য
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় মগধের রাজা কারা ছিলেন?
(ক) মৌর্যরা (খ) গুপ্তরা (গ) নন্দ রাজারা (ঘ) কুষাণরা
উত্তর: (গ) নন্দ রাজারা
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?
(ক) অশোক (খ) বিন্দুসার (গ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (ঘ) ধননন্দ
উত্তর: (গ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থটির লেখক কে?
(ক) চাণক্য (খ) কৌটিল্য (গ) মেগাস্থিনিস (ঘ) পাণিনি
উত্তর: (খ) কৌটিল্য
সেলুকাসের দূত হয়ে কে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দরবারে এসেছিলেন?
(ক) হেরোডোটাস (খ) টলেমি (গ) প্লিনি (ঘ) মেগাস্থিনিস
উত্তর: (ঘ) মেগাস্থিনিস
মেগাস্থিনিসের লেখা বইটির নাম কী?
(ক) অর্থশাস্ত্র (খ) ইন্ডিকা (গ) রাজতরঙ্গিনী (ঘ) মুদ্রা-রাক্ষস
উত্তর: (খ) ইন্ডিকা
সম্রাট অশোক কোন যুদ্ধ করার পর আর যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেন?
(ক) তক্ষশিলার যুদ্ধ (খ) কলিঙ্গ যুদ্ধ (গ) পানিপথের যুদ্ধ (ঘ) তরাইনের যুদ্ধ
উত্তর: (খ) কলিঙ্গ যুদ্ধ
অশোক কোন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন?
(ক) মহাকাশ্যপ (খ) উপালি (গ) আনন্দ (ঘ) উপগুপ্ত
উত্তর: (ঘ) উপগুপ্ত
মৌর্য সম্রাটরা কোন উপাধি ব্যবহার করতেন?
(ক) মহারাজাধিরাজ (খ) দেবপুত্র (গ) দেবানংপিয় পিয়দসি (ঘ) বিক্রমাদিত্য
উত্তর: (গ) দেবানংপিয় পিয়দসি
মৌর্য আমলে রাজকর্মচারীদের কী বলা হত?
(ক) মন্ত্রী (খ) অমাত্য (গ) সচিব (ঘ) মহামাত্র
উত্তর: (খ) অমাত্য
শেষ মৌর্য সম্রাট কে ছিলেন?
(ক) অশোক (খ) বিন্দুসার (গ) বৃহদ্রথ (ঘ) পুষ্যমিত্র
উত্তর: (গ) বৃহদ্রথ
কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?
(ক) কুজুল কদফিসেস (খ) বিম কদফিসেস (গ) কণিষ্ক (ঘ) হুবিষ্ক
উত্তর: (গ) কণিষ্ক
শকাব্দ গণনা কে শুরু করেন?
(ক) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ) অশোক (গ) কণিষ্ক (ঘ) সমুদ্রগুপ্ত
উত্তর: (গ) কণিষ্ক
সাতবাহন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?
(ক) সিমুক (খ) প্রথম সাতকর্ণি (গ) গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি (ঘ) যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি
উত্তর: (গ) গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি
গুপ্তাব্দ গণনা কে শুরু করেন?
(ক) শ্রীগুপ্ত (খ) প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (গ) সমুদ্রগুপ্ত (ঘ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
উত্তর: (খ) প্রথম চন্দ্রগুপ্ত
এলাহাবাদ প্রশস্তি কে রচনা করেন?
(ক) কৌটিল্য (খ) বাণভট্ট (গ) রবিকীর্তি (ঘ) হরিষেণ
উত্তর: (ঘ) হরিষেণ
'শকারি' উপাধি কে গ্রহণ করেছিলেন?
(ক) সমুদ্রগুপ্ত (খ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (গ) প্রথম কুমারগুপ্ত (ঘ) স্কন্দগুপ্ত
উত্তর: (খ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
নালন্দা মহাবিহার কার সময়ে স্থাপিত হয়?
(ক) সমুদ্রগুপ্ত (খ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (গ) প্রথম কুমারগুপ্ত (ঘ) হর্ষবর্ধন
উত্তর: (গ) প্রথম কুমারগুপ্ত
আইহোল প্রশস্তি কে রচনা করেন?
(ক) হরিষেণ (খ) বাণভট্ট (গ) রবিকীর্তি (ঘ) সন্ধ্যাকর নন্দী
উত্তর: (গ) রবিকীর্তি
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
সাম্রাজ্য ও সম্রাটের মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকগুলো রাজ্য জয় করে যে বিশাল শাসন এলাকা তৈরি হয়, তাকে সাম্রাজ্য বলে। যিনি এই বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেন, তিনিই হলেন সম্রাট। অর্থাৎ, রাজা রাজ্যের শাসক এবং সম্রাট সাম্রাজ্যের শাসক, যিনি রাজাদেরও রাজা বা রাজাধিরাজ।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মূল বিষয়বস্তু কী?
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মূল বিষয়বস্তু হলো রাষ্ট্রশাসন ও রাজনীতি। এতে একজন রাজার কর্তব্য, শাসনব্যবস্থা পরিচালনা, কর সংগ্রহ, গুপ্তচর নিয়োগ এবং প্রয়োজনে ছল-চাতুরির মাধ্যমে রাজ্য রক্ষা করার মতো বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
অশোকের ধম্ম কী?
অশোকের ধম্ম ছিল কতগুলি নৈতিক ও সামাজিক আচরণের সমষ্টি। এর মূল কথা ছিল হিংসা না করা, প্রাণীহত্যা বন্ধ করা, দয়া, দান, সত্য কথা বলা এবং বাবা-মা ও গুরুজনদের মেনে চলা। এটি বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হলেও কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না, বরং সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য একটি আচরণবিধি ছিল।
মৌর্য সম্রাটরা গুপ্তচর কেন নিয়োগ করতেন?
মৌর্য সম্রাটরা বিশাল সাম্রাজ্যের সব খবরাখবর রাখার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করতেন। গুপ্তচররা বিদেশি, অচেনা লোক, রাজকর্মচারী এমনকি রাজপুত্রদের উপরেও নজর রাখত। এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যের内部 কোনো ষড়যন্ত্র বা বিদ্রোহের সম্ভাবনা আগে থেকেই জানা যেত এবং তা দমন করা সহজ হত।
মৌর্য সম্রাট ও গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে ক্ষমতা ও মর্যাদার তুলনা করো।
মৌর্য ও গুপ্ত উভয় সম্রাটরাই 'মহারাজাধিরাজ', 'দেবানংপ্রিয়' ইত্যাদি বড় বড় উপাধি নিয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রকাশ করতেন। তবে মৌর্য সম্রাটরা, বিশেষ করে অশোক, 'ধম্ম'-এর মাধ্যমে প্রজাদের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতেন। অন্যদিকে, গুপ্ত সম্রাটরা অশ্বমেধ যজ্ঞ করে এবং নিজেদের দেবতার সঙ্গে তুলনা করে ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতেন।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৯৭)
১। নীচের বাক্যগুলির কোনটি ঠিক কোনটি ভুল বেছে নাও:
ক) সেলুকাস ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মধ্যে চিরকাল শত্রুতা ছিল। - ভুল
খ) মৌর্য আমলে মেয়েরাও মহামাত্যের দায়িত্ব পেতেন। - ঠিক
গ) কুষাণরা এদেশেরই মানুষ ছিলেন। - ভুল
ঘ) প্রথম চন্দ্রগুপ্ত গুপ্তাব্দ গোনা চালু করেন। - ঠিক
২। নীচের বিবৃতিগুলির সঙ্গে কোন ব্যাখ্যাটি সবথেকে বেশি মানানসই বেছে বের করো:
২.১) বিবৃতি: অশোক তাঁর সাম্রাজ্যে পশুহত্যা বন্ধ করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: ধম্মের অনুসরণ করার জন্য।
২.২) বিবৃতি: কুষাণ সম্রাটরা নিজেদের মূর্তি দেবকুলে রাখতেন।
ব্যাখ্যা ২: তাঁরা প্রজাদের সামনে নিজেদের দেবতার মতোই সম্মাননীয় বলে হাজির করতেন।
২.৩) বিবৃতি: গুপ্ত সম্রাটরা বড়ো বড়ো উপাধি নিতেন।
ব্যাখ্যা ৩: সম্রাটরা এর মাধ্যমে নিজেদের বিরাট ক্ষমতাকে তুলে ধরতেন।
২.৪) বিবৃতি: সুয়ান জাং চিন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: বৌদ্ধ ধর্ম সর্ম্পকে আরও পড়াশোনা করার জন্য।
৩। নিজের ভাষায় লেখো (১০০-১২০টি শব্দের মধ্যে):
ক) মৌর্য্য শাসন ও গুপ্ত শাসনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো। কোন শাসনব্যবস্থা তোমার বেশি ভালো বলে মনে হয়? যুক্তিসহ লেখো।
মৌর্য শাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। সম্রাটই ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং অমাত্য, মহামাত্র ও গুপ্তচরদের মাধ্যমে তিনি সমগ্র সাম্রাজ্যে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। অন্যদিকে, গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই বিকেন্দ্রীভূত। গুপ্ত সম্রাটরা সামন্ত রাজাদের উপর বেশি নির্ভরশীল ছিলেন এবং প্রদেশ বা 'ভুক্তি'-র শাসকরা অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতেন। আমার মতে, একটি বিশাল সাম্রাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য মৌর্য শাসন ব্যবস্থা বেশি কার্যকর ছিল। কারণ, তাদের কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ও দক্ষ গুপ্তচর ব্যবস্থা সাম্রাজ্যের উপর সম্রাটের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল, যা গুপ্ত যুগে সামন্তদের উত্থানের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
খ) অশোকের ধম্মের সঙ্গে কণিষ্কের বৌদ্ধধর্ম প্রচারের মধ্যে কী কী মিল ও অমিল ছিল?
মিল: অশোক ও কণিষ্ক উভয়েই বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁরা দুজনেই অহিংসা ও নৈতিকতার আদর্শ প্রচারে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজেদের সাম্রাজ্যে এই আদর্শগুলি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
অমিল: প্রধান অমিল হলো, অশোকের 'ধম্ম' কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না, এটি ছিল সকল ধর্মের মানুষের জন্য একটি নৈতিক আচরণবিধি। অন্যদিকে, কণিষ্ক বৌদ্ধধর্মের 'মহাযান' শাখাকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দেন এবং এই ধর্মমতকে মধ্য এশিয়া ও চিনে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন। অশোক যেখানে নৈতিক উপদেশ প্রচার করেছেন, কণিষ্ক সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন এবং চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির আয়োজন করেছিলেন।
গ) কুষাণ ও সাতবাহনদের আমলে উপমহাদেশের অর্থনীতি কেমন ছিল? সেই অর্থনীতিতে রোমানদের কী ভূমিকা ছিল?
কুষাণ ও সাতবাহনদের আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্য, অত্যন্ত উন্নত ছিল। কুষাণরা মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত 'রেশম পথ' (Silk Road) নিয়ন্ত্রণ করত, যা তাদের বিপুল শুল্ক আদায়ের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে, সাতবাহনরা দাক্ষিণাত্যের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করত।
এই অর্থনীতিতে রোমানদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের মশলা, বিশেষ করে গোলমরিচ এবং উন্নত মানের বস্ত্রের ব্যাপক বাণিজ্য চলত। এই বাণিজ্যের বিনিময়ে ভারত রোম থেকে প্রচুর পরিমাণে সোনা ও রুপোর মুদ্রা আমদানি করত, যা ভারতীয় উপমহাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছিল।
ঘ) হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য কি মৌর্য বা গুপ্তদের মতো ছিল? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
না, হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য মৌর্য বা গুপ্তদের মতো বিশাল বা সুসংহত ছিল না।
যুক্তি:
- আয়তন: হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য মূলত উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দাক্ষিণাত্যের চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হন। তুলনায়, মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রায় সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
- নিয়ন্ত্রণ: হর্ষের শাসন ব্যবস্থা অনেকটাই সামন্ত-নির্ভর ছিল। তাঁর অধীনে অনেক ছোট ছোট রাজা নিজেদের অঞ্চলে শাসন চালাতেন। কিন্তু মৌর্যদের শাসন ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ও সরাসরি।
- স্থায়িত্ব: হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পরেই তাঁর সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। কিন্তু মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য বহু বছর ধরে স্থায়ী হয়েছিল।