অধ্যায় ৮: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির নানাদিক
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিক—শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পকলা—নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সময়ে ভারতীয় সংস্কৃতি এক বিরাট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।
- শিক্ষা: বৈদিক যুগের গুরুকুল ব্যবস্থার পাশাপাশি বৌদ্ধবিহারগুলি (যেমন—নালন্দা, তক্ষশিলা) গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকরণ, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা এবং যুদ্ধবিদ্যার মতো বিষয়ও পড়ানো হত।
- সাহিত্য ও ভাষা: বৈদিক সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা পালি ও প্রাকৃতেরও বিকাশ ঘটে। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলি এই ভাষাগুলিতেই লেখা হয়। পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী' সংস্কৃত ভাষাকে একটি নিয়মের বাঁধনে বাঁধে। এই সময়েই রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণগুলির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। গুপ্ত যুগে কালিদাসের মতো কবি ও নাট্যকারেরা সংস্কৃত সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। দক্ষিণ ভারতে তামিল ভাষায় সঙ্গম সাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: এই যুগে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভারতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। আর্যভট্ট শূন্যের ব্যবহার ও পৃথিবীর আবর্তন সম্পর্কে ধারণা দেন। বরাহমিহির ও ব্রহ্মগুপ্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চরক ও সুশ্রুতের লেখা বইগুলি (চরক-সংহিতা, সুশ্রুত-সংহিতা) চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ। দিল্লির কাছে মেহরৌলির মরচেহীন লোহার স্তম্ভটি তৎকালীন ধাতুবিদ্যার উৎকর্ষের প্রমাণ।
- শিল্প ও স্থাপত্য: মৌর্য আমলে পাথরের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। অশোকের স্তম্ভগুলি এবং স্তূপগুলি এই সময়ের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। মৌর্য-পরবর্তী যুগে গান্ধার ও মথুরা শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে, যেখানে মূলত বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করা হত। গুপ্ত যুগে প্রথম ইটের মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। অজন্তা, ইলোরা ও বাঘ গুহার গুহাচিত্রগুলি ভারতীয় চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দক্ষিণ ভারতে পল্লবদের তৈরি মহাবলীপুরমের রথ-মন্দিরগুলি স্থাপত্যের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল
| সময়কাল (আনুমানিক) | ঘটনা/ব্যক্তি |
|---|---|
| খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক | পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী' রচনা। |
| খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতক | চরক ও শুশ্রুতের সংহিতা রচনা। কুষাণ আমলে গান্ধার ও মথুরা শিল্পের বিকাশ। |
| খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতক | গুপ্ত যুগ: কালিদাসের সাহিত্যচর্চা, আর্যভট্টের বিজ্ঞানচর্চা। |
| খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক | নালন্দা মহাবিহারের প্রতিষ্ঠা। |
| খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক | পল্লবদের মহাবলীপুরম রথ-মন্দির নির্মাণ। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
পাণিনি কীসের উপর বই লিখেছিলেন?
(ক) গণিত (খ) ব্যাকরণ (গ) জ্যোতির্বিদ্যা (ঘ) চিকিৎসা
উত্তর: (খ) ব্যাকরণ
মহাভারতের আদিনাম কী ছিল?
(ক) ভারত (খ) জয়কাব্য (গ) পঞ্চমবেদ (ঘ) পুরাণ
উত্তর: (খ) জয়কাব্য
'মৃচ্ছকটিকম' নাটকটির রচয়িতা কে?
(ক) কালিদাস (খ) বিশাখদত্ত (গ) শূদ্রক (ঘ) ভাস
উত্তর: (গ) শূদ্রক
গন্ধার শিল্পরীতিতে কোন বিদেশি শিল্পের প্রভাব দেখা যায়?
(ক) পারসিক (খ) চিনা (গ) গ্রিক ও রোমান (ঘ) মিশরীয়
উত্তর: (গ) গ্রিক ও রোমান
সারনাথের অশোকস্তম্ভ কোন যুগের শিল্পের নিদর্শন?
(ক) গুপ্ত (খ) কুষাণ (গ) মৌর্য (ঘ) সাতবাহন
উত্তর: (গ) মৌর্য
অজন্তা গুহাচিত্র কোন যুগে আঁকা হয়েছিল?
(ক) মৌর্য (খ) কুষাণ (গ) গুপ্ত (ঘ) পাল
উত্তর: (গ) গুপ্ত
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
প্রাচীন ভারতের দুটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্রের নাম লেখো।
প্রাচীন ভারতের দুটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র হলো তক্ষশিলা মহাবিহার (বর্তমান পাকিস্তানে) এবং নালন্দা মহাবিহার (বর্তমান বিহারে)।
পালি ও প্রাকৃত ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
পালি ও প্রাকৃত ছিল প্রাচীন ভারতের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। গৌতম বুদ্ধ এবং বর্ধমান মহাবীর এই ভাষাগুলিতেই তাঁদের ধর্মমত প্রচার করতেন, তাই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলি এই ভাষাগুলিতেই লেখা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় জ্ঞান সহজবোধ্য হয়েছিল।
আর্যভট্টের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার উল্লেখ করো।
আর্যভট্টের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো: (১) গণিতে শূন্যের ব্যবহার এবং দশমিকের ধারণা; এবং (২) এই ধারণা যে পৃথিবী গোলাকার এবং নিজের অক্ষের উপর ঘোরে, যার ফলে দিন-রাত্রি হয়।
স্তূপ ও চৈত্যের মধ্যে পার্থক্য কী?
স্তূপ হলো একটি অর্ধ-গোলাকার স্থাপত্য, যার মধ্যে সাধারণত বৌদ্ধ বা জৈন সাধকদের দেহাবশেষ রাখা হত। অন্যদিকে, চৈত্য হলো একটি প্রার্থনা কক্ষ। অনেক সময় পাহাড় কেটে গুহার আকারে চৈত্য বানানো হত এবং তার শেষ প্রান্তে উপাসনার জন্য একটি ছোট স্তূপ থাকত।
পঞ্চতন্ত্র কেন লেখা হয়েছিল?
পঞ্চতন্ত্র লেখা হয়েছিল রাজপুত্রদের নীতিশিক্ষা দেওয়ার জন্য। পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা পশুপাখির চরিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন গল্পের ছলে রাজপুত্রদের শাসনকার্য ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়ে সঠিক আচরণ ও বুদ্ধিমত্তার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৩১)
১। বেমানান শব্দটি খুঁজে বের করো:
১.১) নালন্দা, তক্ষশিলা, বলভী, পাটলিপুত্র। (পাটলিপুত্র একটি নগর ও রাজধানী, বাকিগুলি মহাবিহার বা শিক্ষাকেন্দ্র।)
১.২) ব্রাহ্মী, সংস্কৃত, খরোষ্ঠি, দেবনাগরী (সংস্কৃত একটি ভাষা, বাকিগুলি লিপি বা হরফ।)
১.৩) রত্নাবলী, মৃচ্ছকটিকম, অর্থশাস্ত্র, অভিজ্ঞান শকুন্তলম। (অর্থশাস্ত্র রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থ, বাকিগুলি নাটক ও কাব্য।)
২। নীচের বাক্যগুলির কোনটি ঠিক কোনটি ভুল লেখো:
২.১) নালন্দা মহাবিহারে কেবল ব্রাহ্মণ ছাত্ররাই পড়তে পারত। - ভুল
২.২) কম্বনের রামায়ণে রামকেই বড়ো করে দেখানো হয়েছে। - ভুল (কম্বনের রামায়ণে রাবণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।)
২.৩) বাগভট ছিলেন একজন চিকিৎসক। - ঠিক
২.৪) কুষাণ আমলে গন্ধার শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। - ঠিক
৩। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| মহাবলীপুরম | রথের মতো মন্দির |
| গন্ধার শিল্পরীতি | কুষাণ যুগ |
| গণিতবিদ | নাগার্জুন |
| মণিমেখলাই | তামিল মহাকাব্য |
| অজন্তা | গুহাচিত্র |