অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - চিঠি

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "চিঠি" পাঠ্যাংশের সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
বিজ্ঞাপন

চিঠি

লেখক: মাইকেল মধুসূদন দত্ত


লেখক সম্পর্কে আলোচনা

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩): ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার। যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। বাল্যকালে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং বিলেত যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট (চতুর্দশপদী কবিতা) প্রবর্তন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে 'মেঘনাদবধ কাব্য', 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য', 'শর্মিষ্ঠা', 'পদ্মাবতী' ইত্যাদি।

Michael Madhusudan Dutt

পাঠ্যাংশের সারসংক্ষেপ

এই পাঠ্যাংশে মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা তিনটি চিঠি রয়েছে, যা তিনি তাঁর তিন বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, গৌরদাস বসাক এবং রাজনারায়ণ বসুকে লিখেছিলেন।

প্রথম চিঠি (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে): ফ্রান্সের ভার্সাই থেকে লেখা এই চিঠিতে মধুসূদন তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন এবং বিদ্যাসাগরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। তিনি ইউরোপের তীব্র শীতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কীভাবে নিজে নিজে ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষা শিখছেন, তার উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয় চিঠি (গৌরদাস বসাককে): এই চিঠিটি তিনি ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে 'সীলোন' নামক জাহাজ থেকে লিখেছিলেন। এখানে তিনি জাহাজের জাঁকজমক এবং তাঁর যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়েছেন। বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ে সম্মান অর্জন করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল, সেই কথাও তিনি বন্ধুকে জানিয়েছেন।

তৃতীয় চিঠি (রাজনারায়ণ বসুকে): এই চিঠিতে তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি 'মেঘনাদবধ কাব্য' নিয়ে আলোচনা করেছেন। কাব্যটি লেখার সময় তাঁর মানসিক অবস্থা এবং কাব্যটির জনপ্রিয়তা সম্পর্কে তিনি বন্ধুকে জানিয়েছেন। তিনি বন্ধুর মতামতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, কারণ বন্ধুর মতামতকে তিনি হাজার হাজার মানুষের জয়ধ্বনির চেয়েও বেশি মূল্যবান বলে মনে করেন।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর (হাতে কলমে)

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

১.১ মধুসূদন দত্ত কোন কলেজের ছাত্র ছিলেন?
উত্তর: মধুসূদন দত্ত হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন।

১.২ পদ্মাবতী নাটকে তিনি কোন ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন?
উত্তর: পদ্মাবতী নাটকে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন।

২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো :

২.১ মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর 'প্রিয় ও পুরাতন বন্ধু' গৌরদাস বসাককে কোথা থেকে পাঠ্য চিঠিটি লিখেছিলেন? তাঁর যাত্রাপথের বিবরণ পত্রটিতে কীভাবে ধরা পড়েছে আলোচনা করো।
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর বন্ধু গৌরদাস বসাককে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে 'সীলোন' নামক জাহাজ থেকে চিঠিটি লিখেছিলেন।
যাত্রাপথের বিবরণে তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি ভূমধ্যসাগরের মধ্যে দিয়ে ভেসে চলেছেন এবং উত্তর-আফ্রিকার উপকূল দেখতে পাচ্ছেন। এর আগে তিনি মলটা এবং আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরেও গিয়েছিলেন। মাত্র ২২ দিনে কলকাতা থেকে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ায় তিনি যাত্রার দ্রুতগতি দেখে অবাক হয়েছেন।

২.২ মধুসূদনের জীবনের উচ্চাশার স্বপ্ন কীভাবে পত্রটিতে প্রতিভাসিত হয়ে উঠেছে?
উত্তর: গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠিতে মধুসূদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন যে, ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যারিস্টারি পেশা শিখবেন এবং সম্মান অর্জন করার জন্য দৃঢ়সংকল্প। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি পড়াশোনায় এতটাই মনোনিবেশ করবেন যে বন্ধুদের জন্যও হয়তো বেশি সময় দিতে পারবেন না।

২.৩ বিদেশে পাড়ি জমানোর সময়েও তাঁর নিজের দেশের কথা কীভাবে পত্রলেখকের মনে এসেছে?
উত্তর: বিদেশে যাওয়ার সময় জাহাজে বসেও লেখকের নিজের দেশের কথা মনে পড়েছে। তিনি ভূমধ্যসাগরের শান্ত অবস্থাকে তাঁর দেশের হুগলি নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেখানকার আবহাওয়াকে তিনি বাংলার নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের মতো মনোরম বলেছেন। এছাড়াও, তিনি তাঁর স্বদেশী বন্ধু হরির খোঁজ নিয়েছেন এবং জাহাজে আরও কিছু দেশীয় লোক থাকলে একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন।

২.৪ '... একথা যেন আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।' কোন কথা? সে-কথাকে বক্তার অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে কেন?
উত্তর: ইংল্যান্ডের কাছাকাছি প্রতি মুহূর্তে এগিয়ে চলেছেন—এই কথাটিই লেখকের অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে।
কারণ, ইংল্যান্ড যাওয়া এবং সেখানে পড়াশোনা করা ছিল তাঁর শিশুকালের স্বপ্ন। সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যখন সত্যি হতে চলেছে, তখন সেই বাস্তব ঘটনাকে তাঁর কাছে কল্পনার থেকেও বেশি আশ্চর্যজনক বলে মনে হচ্ছে।

২.৫ প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে হৃদ্যতার ছবি পত্রটিতে কীভাবে ফুটে উঠেছে তা প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিসহ আলোচনা করো।
উত্তর: গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠিটির প্রতিটি ছত্রে বন্ধুর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি চিঠি শুরুই করেছেন "হে আমার প্রিয় ও পুরাতন বন্ধু" বলে। যাত্রাপথের বিবরণ দেওয়ার সময় তিনি লিখেছেন, "বুঝলে বৎস!"। আবার, ইংল্যান্ডে পৌঁছে বন্ধুকে প্রাণ খুলে চিঠি লেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, "তখন তুমি তোমার প্রাণ উজাড় করে আমাকে অনবরত পত্রাঘাত করতে পারবে"। এই সমস্ত উক্তি বন্ধুর সঙ্গে তাঁর গভীর ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিচয় দেয়।

২.৬ রাজনারায়ণ বসুকে লেখা পত্রে লেখক তাঁর এই প্রিয় বন্ধুটির কাছে কোন আবেদন জানিয়েছেন?
উত্তর: রাজনারায়ণ বসুকে লেখা পত্রে লেখক তাঁর সদ্যসমাপ্ত কাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য' সম্পর্কে বন্ধুর মতামত বা রায় জানানোর জন্য আবেদন করেছেন। তিনি বন্ধুর মতামতের জন্য অধীর আগ্রহে বা 'রুদ্ধনিশ্বাসে' অপেক্ষা করছেন।

২.৭ 'এই কাব্য অদ্ভুতরকম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।' কোন কাব্যের কথা বলা হয়েছে? সে কাব্যের জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে লেখক কোন কোন প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন?
উত্তর: এখানে 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর কথা বলা হয়েছে।
এই কাব্যের জনপ্রিয়তা বোঝাতে গিয়ে লেখক বলেছেন যে, কেউ কেউ এটিকে ইংরেজি কবি মিলটনের কাব্যের চেয়েও উৎকৃষ্ট বলছেন, যদিও লেখক নিজে তা মানেন না। অনেকে আবার এটিকে কালিদাসের কাব্যের সমতুল্য বলছেন, যা লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, অনেক হিন্দু মহিলা বইটি পড়ছেন এবং এর করুণ কাহিনি পড়ে কাঁদছেন।

২.৮ প্রিয় বন্ধুর প্রতি, সর্বোপরি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের যে পরিচয় রাজনারায়ণ বসুকে লেখা পত্রটিতে পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠিটিতে বন্ধুর প্রতি লেখকের গভীর আস্থা ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, "এ রকম হাজার-হাজার মানুষের জয়ধ্বনির চেয়ে তোমার অভিমত অনেক নির্ভরযোগ্য।" এ থেকে বোঝা যায়, তিনি বন্ধুর সাহিত্যবোধকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন।
অন্যদিকে, নিজের সৃষ্টিকে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের (মিলটন, কালিদাস, ভার্জিল) সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

২.৯ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ৩ নভেম্বর ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে লেখা মধুসূদনের চিঠিটির বিষয়বস্তু সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লেখা চিঠিটির মূল বিষয়বস্তু ছিল কবির আর্থিক সংকট এবং সেই সংকট থেকে মুক্তির জন্য বিদ্যাসাগরের সাহায্য প্রার্থনা। তিনি এর আগে বিদ্যাসাগর কীভাবে তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন, তা স্মরণ করে আবার তাঁর বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়াও, চিঠিতে তিনি ফ্রান্সের তীব্র শীত এবং তাঁর ভাষা শিক্ষার অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেছেন।

২.১০ বিদ্যাসাগরকে লেখা পত্রটিতে মধুসূদনের জীবনে তাঁর ভূমিকার যে আভাস মেলে, তা বিশদভাবে আলোচনা করো।
উত্তর: বিদ্যাসাগরকে লেখা চিঠিতে মধুসূদন তাঁকে "যে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জলরাশি থেকে আপনি আমাদের উদ্ধার করেছেন" বলে উল্লেখ করেছেন। এই উক্তি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এর আগেও বিদ্যাসাগর মধুসূদনকে চরম বিপদ, সম্ভবত আর্থিক সংকট থেকে উদ্ধার করেছিলেন। মধুসূদন তাঁর উপর এতটাই নির্ভরশীল ও আস্থাশীল ছিলেন যে, বিদেশে থাকাকালীন নিজের সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্বও তিনি বিদ্যাসাগরের হাতেই তুলে দিতে চেয়েছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিদ্যাসাগর মধুসূদনের জীবনে কেবল একজন বন্ধু নন, একজন অভিভাবক ও পরম হিতৈষীর ভূমিকা পালন করতেন।

বিজ্ঞাপন