অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সমাধান - গাছের কথা

WBBSE-র 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের "গাছের কথা" প্রবন্ধটির সম্পূর্ণ সমাধান।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

প্রবন্ধ: গাছের কথা

লেখকের নাম: জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭)


লেখক পরিচিতি

Jagadish Chandra Bose

জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী, যিনি পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা এবং উদ্ভিদবিদ্যায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে গাছেরও প্রাণ আছে এবং তারা বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। তাঁর আবিষ্কৃত ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র গাছের বৃদ্ধি পরিমাপে সক্ষম। বিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি বাংলা সাহিত্যেও অবদান রাখেন। তাঁর বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখাগুলি 'অব্যক্ত' নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।

প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ

'গাছের কথা' প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র বসু অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষায় গাছের জীবনরহস্য তুলে ধরেছেন। লেখক দেখিয়েছেন, মানুষের মতোই গাছেরও একটি জীবন আছে। তারা আহার করে, বেড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যেও অভাব, দুঃখ ও কষ্ট আছে। তিনি গাছের মধ্যে বন্ধুত্ব, একে অপরকে সাহায্য করা এবং এমনকি স্বার্থত্যাগের মতো মানবিক গুণাবলিরও সন্ধান পেয়েছেন। লেখক একটি জীবন্ত গাছ ও একটি মরা ডালের মধ্যে জীবনের লক্ষণ (বৃদ্ধি ও গতি) তুলনা করে প্রাণের ধারণা দিয়েছেন। তিনি বীজকে 'গাছের ডিম' বলেছেন, যার মধ্যে বৃক্ষশিশু ঘুমিয়ে থাকে এবং অনুকূল পরিবেশে (মাটি, উত্তাপ, জল) জেগে ওঠে। পাখিদের মাধ্যমে, বাতাসের মাধ্যমে বা অন্য নানা উপায়ে কীভাবে বীজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রকৃতি কীভাবে মাতৃস্নেহে সেই বীজকে রক্ষা করে, তার এক অপূর্ব চিত্র লেখক অঙ্কন করেছেন। প্রবন্ধটির মাধ্যমে তিনি প্রকৃতি ও প্রাণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলেছেন।


অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর

১. লেখক পরিচিতি

১.১ জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা একটি বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর: জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা একটি বইয়ের নাম হলো 'অব্যক্ত'।

১.২ জগদীশচন্দ্র বসু কী আবিষ্কার করেছিলেন?
উত্তর: জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন যে গাছেরও প্রাণ আছে এবং তিনি ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন যা দিয়ে গাছের বৃদ্ধি পরিমাপ করা যায়।

২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর একটি বাক্যে লেখো:

২.১ লেখক কবে থেকে গাছদের অনেক কথা বুঝতে পারেন?
উত্তর: লেখক যখন থেকে গাছ, পাখি ও কীটপতঙ্গদের ভালোবাসতে শিখেছেন, তখন থেকে তিনি তাদের অনেক কথা বুঝতে পারেন।

২.২ 'ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়।' কী দেখা যায়?
উত্তর: মানুষের মধ্যেকার সদ্‌গুণ, যেমন একে অপরকে সাহায্য করা, বন্ধুত্ব এবং স্বার্থত্যাগ, গাছের মধ্যেও কিছু কিছু দেখা যায়।

২.৩ জীবিতের লক্ষণ কী তা লেখক অনুসরণে উল্লেখ করো।
উত্তর: লেখক অনুসারে জীবিতের লক্ষণ হলো বৃদ্ধি এবং গতি (অর্থাৎ নড়াচড়া করার ক্ষমতা)।

২.৪ 'বৃক্ষ শিশু নিরাপদে নিদ্রা যায়।' বৃক্ষশিশু কোথায় নিদ্রা যায়?
উত্তর: বৃক্ষশিশু বীজের মধ্যেকার কঠিন ঢাকনার আড়ালে নিরাপদে নিদ্রা যায়।

২.৫ অঙ্কুর বের হবার জন্য কী কী প্রয়োজন?
উত্তর: অঙ্কুর বের হবার জন্য উত্তাপ, জল ও মাটি প্রয়োজন।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো:

৩.১ 'আগে এসব কিছুই জানিতাম না।' কোন বিষয়টি লেখকের কাছে অজানা ছিল?
উত্তর: গাছেরা যে কথা না বললেও তাদের একটি জীবন আছে, তারা আমাদের মতো আহার করে, দিন দিন বেড়ে ওঠে—এই সমস্ত বিষয় লেখকের কাছে আগে অজানা ছিল।

৩.২ 'ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়।'- কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের মধ্যে কী লক্ষ করা যায়?
উত্তর: এখানে গাছপালার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে মানুষের মতোই অভাব, দুঃখ-কষ্ট, একে অপরকে সাহায্য করা, বন্ধুত্ব এবং স্বার্থত্যাগের মতো সদ্‌গুণ লক্ষ করা যায়।

৩.৩ 'গাছের জীবন মানুষের ছায়ামাত্র।' লেখকের এমন উক্তি অবতারণার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: লেখক এমন উক্তি করেছেন কারণ তিনি মানুষ ও গাছের জীবনের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পেয়েছেন। মানুষের মতো গাছও জন্মগ্রহণ করে, আহার করে, বেড়ে ওঠে, সংগ্রাম করে এবং বংশবিস্তার করে। মানুষের মতো তাদেরও অনুভূতি, কষ্ট এবং একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ রয়েছে। এই গভীর সাদৃশ্যের কারণেই তিনি গাছের জীবনকে মানুষের জীবনের ছায়া বলেছেন।

৩.৪ জীবনের ধর্ম কীভাবে রচনাংশটিতে আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: রচনাংশটিতে জীবনের প্রধান দুটি ধর্ম—বৃদ্ধি ও গতি—আলোচিত হয়েছে। লেখক একটি জীবন্ত গাছ ও মরা ডালের তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, যা জীবিত তা ক্রমশ বাড়ে এবং তার গতি আছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, বীজ হলো সুপ্ত জীবন, যা অনুকূল পরিবেশে (উত্তাপ, জল, মাটি) অঙ্কুরিত হয়ে জীবনের প্রকাশ ঘটায়। এভাবেই জীবন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হয়।

৩.৫ 'নানা উপায়ে গাছের বীজ ছড়াইয়া যায়।'- উপায়গুলি পাঠ্যাংশ অনুসরণে আলোচনা করো।
উত্তর: পাঠ্যাংশ অনুসারে, নানা উপায়ে গাছের বীজ ছড়িয়ে যায়। যেমন:
ক) পাখিদের মাধ্যমে: পাখিরা ফল খেয়ে তাদের মলের সঙ্গে দূর-দূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দেয়।
খ) বাতাসের মাধ্যমে: শিমুল গাছের বীজের মতো অনেক হালকা বীজ তুলোর সঙ্গে বাতাসে ভেসে বহু দূরে চলে যায়।
গ) জলের মাধ্যমে: যদিও পাঠ্যাংশে উল্লেখ নেই, তবে নদীর স্রোতেও বীজ ভেসে যায়।

৩.৬ লেখক তাঁর ছেলেবেলার কথা পাঠ্যাংশে কীভাবে স্মরণ করেছেন, তা আলোচনা করো।
উত্তর: লেখক পাঠ্যাংশে তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করেছেন শিমুল ফলের বীজ ধরার প্রসঙ্গে। তিনি বলেছেন, ছেলেবেলায় শিমুল ফল ফেটে যখন তুলোর সঙ্গে বীজ উড়ে যেত, তখন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা সেই বীজ ধরার জন্য ছুটোছুটি করতেন। হাত বাড়ালেই বাতাস কীভাবে বীজসুদ্ধ তুলোকে আরও উপরে উড়িয়ে নিয়ে যেত, সেই সুন্দর স্মৃতি তিনি স্মরণ করেছেন।

৩.৭ 'ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বীজ পাকিয়া থাকে।'- উদ্ধৃতিটির সাপেক্ষে নীচের ছকটি পূরণ করো।

বীজ কোন ঋতুতে পাকে
১. আম, লিচু গ্রীষ্ম (বৈশাখ মাস)
২. ধান, যব শরৎ/হেমন্ত (আশ্বিন-কার্তিক মাস)
৩. শিমুল বসন্ত
৪. কাঁঠাল গ্রীষ্ম/বর্ষা
৫. মটরশুঁটি শীত

৩.৮ 'পৃথিবী মাতার ন্যায় তাহাকে কোলে লইলেন।' বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে লেখকের গভীর উপলব্ধি উদ্ধৃতিটিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা আলোচনা করো।
উত্তর: এই উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে লেখক বিশ্বপ্রকৃতিকে এক মমতাময়ী মা হিসেবে দেখেছেন। একটি বীজ যখন ঝড়-বাতাসে পরিশ্রান্ত হয়ে মাটির তলায় আশ্রয় নেয়, তখন পৃথিবী তাকে মায়ের মতোই পরম স্নেহে আগলে রাখে। মাটি, ধুলো দিয়ে তাকে ঢেকে বাইরের শীত ও ঝড় থেকে রক্ষা করে। লেখকের এই গভীর উপলব্ধি প্রমাণ করে যে, তিনি প্রকৃতিকে কেবল জড় পদার্থ হিসেবে দেখেননি, বরং এক জীবন্ত, মাতৃরূপা সত্তা হিসেবে অনুভব করেছেন।

৩.৯ 'প্রত্যেক বীজ হইতে গাছ জন্মে কিনা, কেহ বলিতে পারে না।' বীজ থেকে গাছের জন্মের জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্তগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: বীজ থেকে গাছের জন্মের জন্য কয়েকটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত রয়েছে। প্রথমত, বীজটিকে অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশে পড়তে হবে। যেমন, কঠিন পাথরের উপর পড়লে চলবে না। দ্বিতীয়ত, তিনটি প্রধান উপাদান অপরিহার্য: (ক) মাটি, যা আশ্রয় ও পুষ্টি জোগায়; (খ) জল, যা বীজকে সিক্ত করে অঙ্কুরোদগমে সাহায্য করে; এবং (গ) উত্তাপ, যা বীজের ভেতরের ঘুমন্ত জীবনকে জাগিয়ে তোলে। এই শর্তগুলি পূরণ হলেই একটি বীজ থেকে গাছ জন্মাতে পারে।

৩.১০ 'তখন সব খালি-খালি লাগিত।'- কখনকার অনুভূতির কথা বলা হলো? কেন তখন সব খালি-খালি লাগত? ক্রমশ তা কীভাবে অন্য চেহারা পেল তা পাঠ্যাংশ অনুসরণে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: লেখক যখন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখেননি, সেই সময়কার অনুভূতির কথা বলা হয়েছে।
তখন তাঁর কাছে গাছ, পাখি, কীটপতঙ্গরা ছিল প্রাণহীন, অনুভূতিহীন বস্তু। তাই একা মাঠে বা পাহাড়ে বেড়াতে গেলে তাঁর চারপাশটা অর্থহীন ও ফাঁকা মনে হতো।
ক্রমশ যখন তিনি গাছ, পাখি ও কীটপতঙ্গদের ভালোবাসতে শিখলেন, তখন তিনি তাদের জীবন, তাদের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারলেন। তখন থেকে তাঁর কাছে আর কিছুই খালি মনে হয় না, কারণ তিনি প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে জীবনের স্পন্দন খুঁজে পেয়েছিলেন।

৪. নির্দেশ অনুসারে বাক্য পরিবর্তন করো:

৪.১ আগে যখন একা মাঠে কিংবা পাহাড়ে বেড়াইতে যাইতাম, তখন সব খালি-খালি লাগিত। (সরল বাক্যে)
উত্তর: আগে একা মাঠে বা পাহাড়ে বেড়াতে গেলে সব খালি-খালি লাগত।

৪.২ তাদের অনেক কথা বুঝিতে পারি, আগে যাহা পারিতাম না। (হ্যাঁ-সূচক বাক্যে)
উত্তর: এখন তাদের অনেক কথা বুঝতে পারি যা আগে আমার বোঝার ক্ষমতার বাইরে ছিল।

৪.৩ ইহাদের মধ্যেও আমাদের মতো অভাব, দুঃখ-কষ্ট দেখিতে পাই। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: ইহাদের মধ্যে এমন কিছু দেখতে পাই, যা আমাদের অভাব, দুঃখ-কষ্টের মতো।

৪.৪ তোমরা শুষ্ক গাছের ডাল সকলেই দেখিয়াছ। (না-সূচক বাক্যে)
উত্তর: শুষ্ক গাছের ডাল তোমাদের কারো দেখতে বাকি নেই।

৪.৫ প্রবল বাতাসের বেগে কোথায় উড়িয়া যায়, কে বলিতে পারে? (প্রশ্ন পরিহার করো)
উত্তর: প্রবল বাতাসের বেগে কোথায় উড়ে যায়, তা কেউ বলতে পারে না।

৫. নীচের শব্দগুলির ব্যাসবাক্যসহ সমাসের নাম লেখো:

কীটপতঙ্গ: কীট ও পতঙ্গ (দ্বন্দ্ব সমাস)
স্বার্থত্যাগ: স্বার্থের ত্যাগ (সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস) / স্বার্থকে ত্যাগ (কর্ম তৎপুরুষ সমাস)
বৃক্ষশিশু: বৃক্ষরূপ শিশু (রূপক কর্মধারয় সমাস)
বনজঙ্গল: বন ও জঙ্গল (দ্বন্দ্ব সমাস)
জনমানবশূন্য: জন ও মানবশূন্য (দ্বন্দ্ব সমাস) অথবা জন এবং মানব দ্বারা শূন্য (করণ তৎপুরুষ)
দিনরাত্রি: দিন ও রাত্রি (দ্বন্দ্ব সমাস)
দেশান্তরে: অন্য দেশ (নিত্য সমাস)
নিরাপদ: নেই আপদ যেখানে (নঞ বহুব্রীহি সমাস)

৬. নিম্নরেখাঙ্কিত অংশের কারক-বিভক্তি নির্দেশ করো:

৬.১ ইহাদের মধ্যে একের সহিত অপরের বন্ধুত্ব হয়।
উত্তর: সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি।

৬.২ আর কিছুকাল পরে ইহার চিহ্নও থাকিবে না।
উত্তর: সম্বন্ধ পদে 'র' বিভক্তি।

৬.৩ বীজ দেখিয়া গাছ কত বড়ো হইবে বলা যায় না।
উত্তর: কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

৬.৪ মানুষের সর্বোচ্চ গুণ যে স্বার্থত্যাগ, গাছে তাহাও দেখা যায়।
উত্তর: অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৭. সন্ধিবদ্ধ পদগুলি খুঁজে নিয়ে সন্ধি-বিচ্ছেদ করো:

৭.১ তাহার মধ্যে বৃক্ষশিশু নিরাপদে নিদ্রা যায়।
উত্তর: নিরাপদে = নিঃ + আপদে

৭.২ অতি প্রকাণ্ড বটগাছ, সরিষা অপেক্ষা ছোটো বীজ হইতে জন্মে।
উত্তর: অপেক্ষা = অপ + ঈক্ষা

৭.৩ এই প্রকারে দিনরাত্রি দেশদেশান্তরে বীজ ছড়াইয়া পড়িতেছে।
উত্তর: দেশান্তরে = দেশ + অন্তরে