সোনম ওয়াংচুকের পর এবার অনশনের ঘোষণা CJP নেতা অভিজিৎ দীপকের, যন্তরমন্তরে উত্তেজনা
দিল্লির যন্তরমন্তরে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর অনশনের ঘোষণা দিলেন CJP নেতা অভিজিৎ দীপকে। কেন এই সিদ্ধান্ত, কী ঘটেছে এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি জানুন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা ছাত্র ও যুব সমাজের আন্দোলনে এল নতুন এবং নাটকীয় মোড়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে টানা ২০ দিন ধরে অনশনরত প্রখ্যাত পরিবেশ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে (Sonam Wangchuk) শনিবার সকালে জোরপূর্বক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করল দিল্লি পুলিশ। আর এই ঘটনার ঠিক পরপরই পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও মারধরের অভিযোগ তুলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসার ঘোষণা করলেন 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা অভিজিৎ দীপকে (Abhijit Dipak)।
নিট (NEET) দুর্নীতি থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় স্তরে প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তাল রাজধানী। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপ এবং তার পাল্টা অভিজিৎ দীপকের অনশনে বসার সিদ্ধান্ত আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কী ঘটেছিল শনিবার সকালে যন্তর মন্তরে?
শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) সকাল থেকেই দিল্লির যন্তর মন্তরে হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পুলিশের তরফে জানানো হয়, দীর্ঘ ২০ দিন অনশনের ফলে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। তাঁর ওজন প্রায় ৮.৫ কেজি কমে গিয়েছে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক স্তরে নেমেছে। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং দিল্লি হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ পুরো প্রক্রিয়াটি জোরপূর্বক সম্পন্ন করেছে। CJP নেতা অভিজিৎ দীপকের অভিযোগ, তিনি নিজে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে ঢুকতে গেলে দিল্লি পুলিশ তাঁকে শুধু বাধাই দেয়নি, তাঁকে মারধর ও সাময়িকভাবে আটকও করে।
"দিল্লি পুলিশ অগণতান্ত্রিকভাবে সোনম স্যারকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। আমাকে যন্তর মন্তরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছে। আমি এই মুহূর্ত থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করছি।"
স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর কড়া হুঁশিয়ারি
সোনমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো। উল্লেখ্য, এর আগে শুক্রবারই তিনি যন্তর মন্তরে এসে স্বামীর কাছে অনশন তুলে নেওয়ার কাতর আর্জি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে সোনম সেই আর্জি প্রত্যাখ্যান করেন।
শনিবার হাসপাতালে পৌঁছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশকে কড়া ভাষায় গীতাঞ্জলি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর এবং সোনমের নিজস্ব চিকিৎসকদের পূর্বানুমতি ছাড়া যেন কোনও ওষুধ প্রয়োগ বা চিকিৎসা শুরু না করা হয়। তিনি সাফ জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া জোর করে তাঁর স্বামীর অনশন ভাঙানোর কোনও চেষ্টা তিনি মেনে নেবেন না।
কেন এই আন্দোলন? প্রেক্ষাপট কী?
সাম্প্রতিক নিট (NEET UG) এবং ইউজিসি নেট (UGC NET) সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় মারাত্মক স্তরে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর সম্পূর্ণ দায়ভার নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২৮ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-র ডাকে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়।
এই ছাত্র ও যুব আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশনে বসেন লাদাখের পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। উল্লেখ্য, এর আগে ৬ জুলাই একটি সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ দীপক নিজে তরুণ আন্দোলনকারীদের অনশনে বসতে বারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "এই লড়াই দীর্ঘমেয়াদী। সবাইকে সুস্থ থাকতে হবে। সোনম স্যারের অনশনের অভিজ্ঞতা আছে, তাই তিনি করছেন। বাকিরা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না।" কিন্তু শনিবার পুলিশের আগ্রাসী পদক্ষেপের পর তিনিই এবার আন্দোলনের রাশ টানতে নিজে অনশনে বসার এই চরম সিদ্ধান্ত নিলেন।
আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন
যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন ক্রমশ জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। খোদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি সোনম ওয়াংচুককে ফোন করে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং এই আন্দোলনের প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান। অভিজিৎ দীপক সেই সময় একটি পোস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই সংহতি জানানোর জন্য অন্তর থেকে ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি অরুন্ধতী রায়, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ এবং অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও যন্তর মন্তরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন।
আগামী ২০ জুলাই সংসদ অভিযান ঘিরে জল্পনা
দিল্লি পুলিশের এই আকস্মিক পদক্ষেপের পেছনে আগামী ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচির সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। CJP এবং আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের আগামী ২০ জুলাই সংসদ ভবন ঘেরাও বা সংসদ অভিমুখে মহামিছিল করার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ছিল। তার ঠিক দু'দিন আগে যন্তর মন্তর থেকে আন্দোলনের মূল মুখ সোনম ওয়াংচুককে সরিয়ে দেওয়া এবং পুলিশ মোতায়েন করে জমায়েত খালি করার নির্দেশ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমানে যন্তর মন্তরে ব্যাপক পুলিশি পাহারা রয়েছে। অন্যদিকে অভিজিৎ দীপকের অনশন ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্র সমাজ পুনরায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেছে। আগামী দিনে দিল্লির এই ছাত্র ও যুব আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয় এবং ২০ জুলাই তারা সংসদ ভবনের দিকে এগোতে পারে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।
Discussion 0
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
No comments yet. Be the first to share your thoughts!