Chapter 7: জলদূষণ
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 27 MCQ | 18 SAQ | 5 Broad Questions
জলদূষণ আর্সেনিক ইউট্রোফিকেশন তাপীয় দূষণ জলবাহিত রোগ জল সংরক্ষণ সোলার ডিসইনফেকশন ব্ল্যাকফুট
💧
জলদূষণ
শিল্প-কৃষি-গৃহস্থালি | মিনামাটা, হলদিয়া
☠️
আর্সেনিক দূষণ
৯ জেলা প.বঙ্গ | ব্ল্যাকফুট রোগ
🦠
জলবাহিত রোগ
ডায়রিয়া, কলেরা | ৩০ লক্ষ শিশু মৃত্যু/বছর
♻️
জল সংরক্ষণ
বৃষ্টির জল সংগ্রহ | ইজরায়েল ৩০% পুনর্ব্যবহার
জলদূষণের কারণ ও রোগ - একনজরে
| দূষণকারী | রোগ/প্রভাব | উদাহরণ |
| পারদ (Hg) | মিনামাটা রোগ, স্নায়ুর ক্ষতি | জাপান, ১৯৭২ |
| ক্যাডমিয়াম (Cd) | ইতাই-ইতাই রোগ, হাড় ভঙ্গুর | জাপান |
| আর্সেনিক (As) | ব্ল্যাকফুট, ক্যানসার | প.বঙ্গের ৯ জেলা |
| ফ্লুরাইড (F) | ফ্লুরোসিস, দাঁত-হাড়ের ক্ষতি | রাজস্থান, গুজরাট |
| ফসফেট/নাইট্রেট | ইউট্রোফিকেশন, মাছের মৃত্যু | পুকুর, জলাশয় |
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (ব্যাখ্যাসহ)
27 টি
1. জলদূষণের প্রধান কারণ কী?
ক) ক) শুধু বৃষ্টিপাত
খ) খ) মানুষের কার্যকলাপ (শিল্প-কৃষি-গৃহস্থালির বর্জ্য)
গ) গ) শুধু নদীর স্রোত
ঘ) ঘ) শুধু মাছ চাষ
ব্যাখ্যা: জলদূষণের প্রধান কারণ মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ — কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, কৃষিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, গৃহস্থালির নোংরা আবর্জনা, শৌচাগারের জল নদী-পুকুরে মেশা, তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল নির্গমন ইত্যাদি। প্রাকৃতিক কারণও কিছু থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ডই জলদূষণের মূল উৎস।
2. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) কী?
ক) ক) জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
খ) খ) ডিটারজেন্টের ফসফেটে শৈবাল-আগাছা বেড়ে অক্সিজেন কমে যাওয়া
গ) গ) পানির বাষ্পীভবন
ঘ) ঘ) মাছের বৃদ্ধি
ব্যাখ্যা: ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication): সাবান, ডিটারজেন্টে থাকা ফসফেট ও নাইট্রেট পুকুর বা জলাশয়ের জলে মিশলে পুষ্টির আধিক্যে শৈবাল, আগাছা, কচুরিপানা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। পরে এসব পচে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং মাছ ও জলজ প্রাণীরা মারা যায়।
3. আর্সেনিক দূষণ কেন হয়?
ক) ক) বৃষ্টিপাত বেশি হলে
খ) খ) মাটির নীচ থেকে অতিরিক্ত জল তুলে নিলে আর্সেনিক বাতাসের সাথে বিক্রিয়া করে
গ) গ) নদীর জল বাড়লে
ঘ) ঘ) সমুদ্রের জোয়ারে
ব্যাখ্যা: মাটির নীচের স্তর থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত জল তুলে নেওয়ার ফলে মাটির নীচে ফাঁকা জায়গায় আর্সেনিক বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত ধাতব যৌগ তৈরি করে। এই যৌগ জলে মিশে নলকূপের মাধ্যমে পানীয় জলে মেশে এবং আর্সেনিক দূষণ ঘটায়।
4. ব্ল্যাকফুট রোগ (Blackfoot Disease) কী?
ক) ক) পায়ে ছত্রাকের সংক্রমণ
খ) খ) আর্সেনিক দূষিত জল পান করার ফলে হাতে-পায়ে কালো ক্ষত
গ) গ) কুষ্ঠ রোগ
ঘ) ঘ) পায়ের আঙুলের ব্যথা
ব্যাখ্যা: ব্ল্যাকফুট রোগ: আর্সেনিক দূষিত জল দীর্ঘদিন পান করার ফলে হাতের চেটো ও পায়ের তলায় কালো কালো ক্ষত সৃষ্টি হয় — একে ব্ল্যাকফুট রোগ বলে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় আর্সেনিক দূষণ ও ব্ল্যাকফুট রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।
5. মিনামাটা রোগ কীসের কারণে হয়?
ক) ক) সিসার দূষণে
খ) খ) পারদ (Mercury) দূষণে
গ) গ) আর্সেনিক দূষণে
ঘ) ঘ) ক্যাডমিয়াম দূষণে
ব্যাখ্যা: মিনামাটা রোগ (Minamata Disease): ১৯৭২ সালে জাপানের মিনামাটা উপসাগরের উপকূলে একটি রাসায়নিক কারখানা থেকে পারদযুক্ত (Mercury) তরল বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা হয়। এই মারাত্মক পারদ দূষণে ৩০ বছর ধরে অসংখ্য মানুষ ও জলজ প্রাণী মারা যায়। এটি পারদ দূষণের ভয়াবহ উদাহরণ।
6. ইতাই-ইতাই রোগ কীসের কারণে হয়?
ক) ক) পারদ দূষণ
খ) খ) ক্যাডমিয়াম দূষণ
গ) গ) আর্সেনিক দূষণ
ঘ) ঘ) সিসা দূষণ
ব্যাখ্যা: ইতাই-ইতাই রোগ (Itai-Itai Disease) ক্যাডমিয়াম (Cadmium) দূষণের কারণে হয়। জাপানে খনির বর্জ্য থেকে ক্যাডমিয়াম নদীর জলে মিশে এবং সেই জল পানের ফলে মানুষের হাড় ভঙ্গুর হয়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতো — রোগীরা 'ইতাই-ইতাই' (ব্যথা-ব্যথা) বলে কাঁদতেন, তাই এই নাম।
7. ফ্লুরোসিস রোগ কীসের কারণে হয়?
ক) ক) আর্সেনিক দূষণে
খ) খ) ফ্লুরাইড দূষণে
গ) গ) পারদ দূষণে
ঘ) ঘ) ক্যাডমিয়াম দূষণে
ব্যাখ্যা: ফ্লুরোসিস (Fluorosis) রোগ জলে অতিরিক্ত ফ্লুরাইড থাকার কারণে হয়। এর ফলে দাঁতে বাদামি দাগ (ডেন্টাল ফ্লুরোসিস) ও হাড়ের বিকৃতি (স্কেলেটাল ফ্লুরোসিস) হয়। ভারতের রাজস্থান, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানার অনেক জায়গায় ভূগর্ভস্থ জলে ফ্লুরাইডের পরিমাণ বেশি।
8. তাপীয় দূষণ (Thermal Pollution) কী?
ক) ক) জলের তাপমাত্রা বেড়ে অক্সিজেন কমে যাওয়া
খ) খ) ঠান্ডা জলের দূষণ
গ) গ) বৃষ্টির জলের দূষণ
ঘ) ঘ) তুষার গলনের দূষণ
ব্যাখ্যা: তাপীয় দূষণ: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কারখানায় ব্যবহৃত গরম/উষ্ণ বর্জ্য জল সরাসরি নদী বা জলাশয়ে মেশালে জলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এতে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং অনেক জলজ প্রাণী মারা যায়। একে তাপীয় দূষণ বলে।
9. জলবাহিত রোগ কাকে বলে?
ক) ক) বাতাসে ছড়ানো রোগ
খ) খ) দূষিত জলের মাধ্যমে ছড়ানো রোগ
গ) গ) খাবারে ছড়ানো রোগ
ঘ) ঘ) পোকামাকড়ে ছড়ানো রোগ
ব্যাখ্যা: জলবাহিত রোগ (Water-borne Diseases): দূষিত জল পান বা ব্যবহারের মাধ্যমে যে সমস্ত সংক্রামক রোগ ছড়ায়। যেমন — ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, জন্ডিস (হেপাটাইটিস A ও E), পোলিও। WHO-র মতে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লক্ষ শিশু জলবাহিত রোগে মারা যায়।
10. জল পরিশোধনের সহজ প্রাকৃতিক উপায় কী?
ক) ক) ফুটানো ও সূর্যের আলোতে রাখা
খ) খ) শুধু ছেঁকে নেওয়া
গ) গ) ফ্যান দিয়ে হাওয়া করা
ঘ) ঘ) ঠান্ডা করা
ব্যাখ্যা: জল পরিশোধনের সহজ প্রাকৃতিক উপায়: (১) ১০০°C তাপমাত্রায় ১০ মিনিট ফোটালে বেশিরভাগ জীবাণু নষ্ট হয়, (২) পাতলা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ বোতলে জল ভরে ৬-৭ ঘণ্টা সূর্যের আলোতে রাখলে সৌররশ্মির অতিবেগুনি রশ্মি (UV) জীবাণু নষ্ট করে (সোলার ডিসইনফেকশন), (৩) কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে দিলে কাদা-বালি থিতিয়ে পড়ে।
11. আর্সেনিক দূষণ পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলায় বেশি দেখা যায়?
ক) ক) দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি
খ) খ) মালদা, নদিয়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা
গ) গ) পুরুলিয়া, বাঁকুড়া
ঘ) ঘ) কলকাতা, হাওড়া
ব্যাখ্যা: পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি। এই সমস্ত জেলার মানুষ আর্সেনিক দূষণের শিকার — তাদের হাতে-পায়ে ব্ল্যাকফুট রোগ, চর্মরোগ ও ক্যানসার দেখা যায়।
12. বায়ুদূষণের ফলে অ্যাসিড বৃষ্টি কীভাবে জলদূষণ ঘটায়?
ক) ক) সরাসরি নদীতে পড়ে
খ) খ) বায়ুমণ্ডলের দূষিত গ্যাস বৃষ্টির জলে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে জলাশয় দূষিত করে
গ) গ) বাতাসে মেশে
ঘ) ঘ) মাটিতে মেশে
ব্যাখ্যা: কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ার মাধ্যমে বাতাসে সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOₓ), কার্বন মনোক্সাইড (CO) জমা হয়। বৃষ্টির সময় এই গ্যাসগুলো জলের সঙ্গে মিশে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে। অ্যাসিড বৃষ্টি ভূ-পৃষ্ঠের ও ভূগর্ভের জলকে দূষিত করে।
13. ওজোন স্তর কী থেকে রক্ষা করে?
ক) ক) অ্যাসিড বৃষ্টি
খ) খ) অতিবেগুনি রশ্মি
গ) গ) তাপীয় দূষণ
ঘ) ঘ) জলদূষণ
ব্যাখ্যা: ওজোন স্তর (Ozone Layer) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত এবং সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি (UV) রশ্মি থেকে পৃথিবীবাসীকে রক্ষা করে। CFC গ্যাস ওজোন স্তরের ক্ষয় করে। ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ওজোন দিবস।
14. ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কোন রোগ আর্সেনিক দূষণের প্রভাব?
ক) ক) ডেঙ্গু
খ) খ) ব্ল্যাকফুট রোগ
গ) গ) ম্যালেরিয়া
ঘ) ঘ) টাইফয়েড
ব্যাখ্যা: পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় আর্সেনিক দূষণের কারণে 'ব্ল্যাকফুট রোগ' দেখা যায় — হাতে-পায়ে কালো কালো ক্ষত সৃষ্টি হয়। এছাড়া চর্মরোগ, রক্তাল্পতা, যকৃতের সমস্যা ও ক্যানসার হতে পারে।
15. পানীয় জল পরিশোধনে ক্লোরিনের ভূমিকা কী?
ক) ক) জল ঠান্ডা করে
খ) খ) জলের জীবাণু নষ্ট করে
গ) গ) জল গরম করে
ঘ) ঘ) জলে খনিজ মেশায়
ব্যাখ্যা: জলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লোরিন (Chlorine) মেশালে জলের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণু নষ্ট হয় — জল জীবাণুমুক্ত হয়। পৌরসভা ও পুরসভার জল সরবরাহে ক্লোরিনেশন একটি বহুল প্রচলিত ও কম খরচের পদ্ধতি। তবে অতিরিক্ত ক্লোরিন ক্ষতিকর হতে পারে।
16. প্রতি মানুষ প্রতিদিন অন্তত কত লিটার বিশুদ্ধ জল প্রয়োজন?
ক) ক) ৫ লিটার
খ) খ) ১০ লিটার
গ) গ) ২০ লিটার
ঘ) ঘ) ৫০ লিটার
ব্যাখ্যা: রাষ্ট্রসংঘের মতে, প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন অন্তত ২০ লিটার বিশুদ্ধ জল প্রয়োজন (পান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধির জন্য)। কিন্তু আফ্রিকার মাদাগাস্কারের মানুষ প্রতিদিন ৫ লিটার জলও পায় না। অন্যদিকে আমেরিকায় প্রতিদিন গড়ে ৫০ লিটার করে জল ব্যবহার হয়।
17. ইজরায়েলে ব্যবহৃত জলের কত শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত হয়?
ক) ক) ১০%
খ) খ) ২০%
গ) গ) ৩০%
ঘ) ঘ) ৫০%
ব্যাখ্যা: ইজরায়েল (Israel) জল সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। সেখানে ব্যবহৃত জলের প্রায় ৩০% সেচের কাজে পুনর্ব্যবহৃত (Recycled) হয়। ইজরায়েল ড্রিপ ইরিগেশন (বিন্দু-বিন্দু সেচ) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে জলের অপচয় কমিয়েছে।
18. সোলার ডিসইনফেকশন (SODIS) কী?
ক) ক) রাসায়নিক দিয়ে জল শোধন
খ) খ) প্লাস্টিক বোতলে জল ভরে সূর্যের আলোতে রেখে জীবাণুনাশ
গ) গ) জল ফোটানো
ঘ) ঘ) ফিল্টার দিয়ে জল ছাঁকা
ব্যাখ্যা: সোলার ডিসইনফেকশন (Solar Disinfection বা SODIS): পাতলা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ বোতলে জল ভরে ৬-৭ ঘণ্টা সূর্যের আলোতে রাখলে সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি ও তাপ জলের জীবাণু নষ্ট করে। এটি একটি সহজ, সস্তা ও প্রাকৃতিক জল পরিশোধন পদ্ধতি — উন্নয়নশীল দেশে জনপ্রিয়।
19. জলদূষণ রোধে কলকারখানার বর্জ্য জল কী করা উচিত?
ক) ক) সরাসরি নদীতে ফেলা
খ) খ) পরিশোধন করে তবে নদী বা সমুদ্রে ফেলা
গ) গ) জমিতে ফেলা
ঘ) ঘ) বাষ্পীভূত করা
ব্যাখ্যা: কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত বর্জ্য জল সরাসরি নদী বা সমুদ্রে ফেলা উচিত নয়। প্রথমে ETP (Effluent Treatment Plant) বা বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্রে জলকে পরিশোধন করতে হবে — ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ধাতব পদার্থ সরিয়ে তবে নদীতে ফেলা উচিত। আবার ব্যবহার করা জল পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহার করতে হবে।
20. গৃহস্থালির কোন জিনিসগুলো জলদূষণ ঘটায়?
ক) ক) গাছপালা
খ) খ) সাবান, ডিটারজেন্ট, শৌচাগারের বর্জ্য
গ) গ) পাথর
ঘ) ঘ) কাঠ
ব্যাখ্যা: গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট (যাতে ফসফেট থাকে), শৌচাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের নোংরা জল পুকুর-নদীতে মিশলে জল দূষিত হয়। বিশেষ করে ফসফেট ও নাইট্রেট যুক্ত ডিটারজেন্ট ইউট্রোফিকেশন ঘটায় — শৈবাল ও কচুরিপানা বেড়ে গিয়ে জলজ প্রাণী মারা যায়।
21. হলদিয়া নদীর মোহনায় ইলিশ মাছ কমে যাওয়ার কারণ কী?
ক) ক) অতিরিক্ত মাছ ধরা
খ) খ) হলদিয়া পেট্রো-রসায়ন শিল্পের দূষণ
গ) গ) জলের তাপমাত্রা কমে যাওয়া
ঘ) ঘ) বৃষ্টি কম হওয়া
ব্যাখ্যা: হলদিয়ায় পেট্রো-রসায়ন শিল্প গড়ে ওঠার পর থেকে শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্য হলদি নদীর মোহনায় মিশতে থাকে। এই দূষণের ফলে জলের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে এবং ইলিশ মাছের প্রজনন ও বিচরণ ব্যাহত হয়েছে — ফলে ইলিশ মাছের আনাগোনা কমে গেছে।
22. পূর্ব কলকাতার জলাভূমির মাছ কমে যাওয়ার কারণ কী?
ক) ক) কীটনাশকের ব্যবহার
খ) খ) পানি জমে না
গ) গ) অতিরিক্ত সূর্যের আলো
ঘ) ঘ) বাতাস
ব্যাখ্যা: পূর্ব কলকাতার জলাভূমি (East Kolkata Wetlands) মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে বৃষ্টির জলে ধুয়ে এগুলো জলাভূমিতে এসে মেশে। জলে অক্সিজেন কমে যায় ও মাছের ডিম-পোনা ধ্বংস হয় — মাছ চাষ কমে গেছে।
23. জল সংরক্ষণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কী করা উচিত?
ক) ক) জল অপচয় বন্ধ, ব্যবহারিত জল পুনর্ব্যবহার, বৃষ্টির জল সংগ্রহ
খ) খ) শুধু বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা
গ) গ) নদী খনন
ঘ) ঘ) বেশি করে জল তোলা
ব্যাখ্যা: জল সংরক্ষণের ব্যক্তিগত উপায়: (১) প্রয়োজন না থাকলে কল বন্ধ রাখা, (২) কম ক্ষারযুক্ত সাবান-ডিটারজেন্ট ব্যবহার, (৩) ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহার (গাছের গোড়ায় দেওয়া), (৪) বৃষ্টির জল সংগ্রহ (Rainwater Harvesting), (৫) নোংরা আবর্জনা জলাশয়ে না ফেলা।
24. WHO-র মতে প্রতি বছর কত শিশু জলবাহিত রোগে মারা যায়?
ক) ক) প্রায় ১০ হাজার
খ) খ) প্রায় ৩০ লক্ষ
গ) গ) প্রায় ৫০ হাজার
ঘ) ঘ) প্রায় ১ কোটি
ব্যাখ্যা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লক্ষ (৩ মিলিয়ন) শিশু ডায়রিয়া ও অন্যান্য জলবাহিত সংক্রামক রোগে মারা যায়। বিশুদ্ধ পানীয় জল, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও ময়লা সঠিকভাবে ফেলার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই মৃত্যু প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
25. পুকুরের জল পরিশোধনের প্রাকৃতিক উপায় কী?
ক) ক) কড়াইশুটি, অড়হর ডাল গাছ লাগানো
খ) খ) শুধু ক্লোরিন দেওয়া
গ) গ) ফ্রিজে রাখা
ঘ) ঘ) চিনি মেশানো
ব্যাখ্যা: কড়াইশুটি, অড়হর ডাল, মুসুর ডাল — এরকম কিছু গাছ জলের নোংরাগুলোকে পাত্রের তলায় থিতিয়ে পড়তে সাহায্য করে (প্রাকৃতিক ফ্লোকুলেশন)। এছাড়া কাঠকয়লা, সমুদ্র বালি, নুড়ি পাথরের মাধ্যমেও জল পরিশোধন করা যায়। এগুলো সহজলভ্য ও পরিবেশবান্ধব।
26. পারস্য উপসাগরের যুদ্ধের সময় কীভাবে জলদূষণ হয়েছিল?
ক) ক) বৃষ্টিপাতে
খ) খ) কুয়েতের তেলের কূপ জ্বালিয়ে দেওয়ার ফলে সমুদ্রে তেল মেশায়
গ) গ) ভূমিকম্পে
ঘ) ঘ) সুনামিতে
ব্যাখ্যা: উপসাগরীয় যুদ্ধের (Gulf War, 1991) সময় কুয়েতে প্রচুর তেলের কূপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় — এর ফলে প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল পারস্য উপসাগরের জলে মেশে। এই তেল দূষণে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণী ও পাখি মারা যায় এবং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
27. জলদূষণ প্রতিরোধের তিনটি প্রধান উপায় কী?
ক) ক) বিশুদ্ধ পানি পান, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, ময়লা সঠিক জায়গায় ফেলা
খ) খ) জল ফোটানো, লবণ মেশানো, ফ্রিজে রাখা
গ) গ) নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, সেচ
ঘ) ঘ) বৃষ্টি, রোদ, বাতাস
ব্যাখ্যা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুসারে জলবাহিত সংক্রমণ প্রায় আটকানোর জন্য তিনটি জরুরি বিষয়: (১) বিশুদ্ধ পানীয় জল খাওয়া, (২) সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, (৩) শৌচাগার ব্যবহার করা এবং ময়লা আবর্জনা সঠিকভাবে ফেলা।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পূর্ণ উত্তর)
18 টি
1. জলদূষণ কাকে বলে? এর প্রধান উৎসগুলো কী কী?
জলদূষণ (Water Pollution): নদী, পুকুর, হ্রদ, সমুদ্র বা ভূগর্ভস্থ জলে মানুষের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক, জৈব বা ভৌত পদার্থ মিশে জলের প্রাকৃতিক গুণগত মান নষ্ট হলে তাকে জলদূষণ বলে। প্রধান উৎস: (১) গৃহস্থালির নোংরা বর্জ্য ও শৌচাগারের জল, (২) কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, (৩) কৃষিকাজে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, (৪) তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল নির্গমন, (৫) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গরম জল।
2. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) কী? এর ফলাফল কী?
ইউট্রোফিকেশন: সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্টে থাকা ফসফেট (PO₄) ও নাইট্রেট (NO₃) পুকুর বা জলাশয়ের জলে মিশলে পুষ্টির আধিক্যে শৈবাল (Algae), কচুরিপানা, আগাছা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলাফল: (১) এই অতিরিক্ত উদ্ভিদ মরে পচতে শুরু করলে পচন প্রক্রিয়ায় জলের দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) মারাত্মকভাবে কমে যায়, (২) অক্সিজেনের অভাবে মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়, (৩) জলাশয় ক্রমশ মৃত হয়ে ওঠে — একে 'সাংস্কৃতিক ইউট্রোফিকেশন' বলে।
3. আর্সেনিক দূষণ কী? পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব কী?
আর্সেনিক দূষণ: ভূগর্ভস্থ জলের স্তরে প্রাকৃতিক আর্সেনিক ধাতব পদার্থ থাকে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তুলে নিলে আর্সেনিক বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত যৌগে পরিণত হয় এবং পানীয় জলে মেশে। পশ্চিমবঙ্গের প্রভাব: মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় আর্সেনিক দূষণ মারাত্মক — ব্ল্যাকফুট রোগ, চর্মরোগ, লিভার সমস্যা, ক্যানসার দেখা যায়।
4. ব্ল্যাকফুট রোগ (Blackfoot Disease) কী?
ব্ল্যাকফুট রোগ: আর্সেনিক দূষিত জল দীর্ঘদিন ধরে পান করলে হাতের চেটো (তালু) ও পায়ের তলায় কালো কালো ক্ষত (Gangrene) সৃষ্টি হয় — একে ব্ল্যাকফুট রোগ বলে। এটি আর্সেনিকোসিস (Arsenicosis)-এর একটি গুরুতর লক্ষণ। পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি জেলার বহু মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এছাড়াও আর্সেনিক দীর্ঘমেয়াদে ত্বক, ফুসফুস, যকৃতের ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
5. মিনামাটা রোগ ও ইতাই-ইতাই রোগের কারণ ও ফলাফল লেখো।
মিনামাটা রোগ (Minamata Disease): কারণ — জাপানের মিনামাটা উপসাগরে রাসায়নিক কারখানা থেকে পারদ (Mercury) নির্গমন। পারদ দূষিত জল ব্যবহারে ও মাছ খেলে স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি, পক্ষাঘাত ও মৃত্যু হয়। ইতাই-ইতাই রোগ (Itai-Itai Disease): কারণ — জাপানে খনির বর্জ্য থেকে ক্যাডমিয়াম (Cadmium) নদীতে মেশে। এই জল দীর্ঘদিন পানে হাড় ভঙ্গুর ও নরম হয়ে যায় — রোগী তীব্র যন্ত্রণায় 'ইতাই-ইতাই' (ব্যথা-ব্যথা) বলে কাঁদেন।
6. ফ্লুরোসিস (Fluorosis) কী? এর কারণ ও লক্ষণ লেখো।
ফ্লুরোসিস: পানীয় জলে অতিরিক্ত ফ্লুরাইড (Fluoride) থাকার কারণে যে রোগ হয়। কারণ: ভূগর্ভস্থ জলে প্রাকৃতিকভাবে ফ্লুরাইডের মাত্রা বেশি থাকে (বিশেষত গ্রানাইট শিলা অঞ্চলে), শিল্প বর্জ্য থেকেও জলে ফ্লুরাইড মেশে। লক্ষণ: (১) ডেন্টাল ফ্লুরোসিস — দাঁতে বাদামি/হলুদ দাগ, (২) স্কেলেটাল ফ্লুরোসিস — হাড় ও সন্ধির বিকৃতি, শক্ত হয়ে যাওয়া বা বেঁকে যাওয়া। ভারতের রাজস্থান, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশে প্রকোপ বেশি।
7. জলবাহিত রোগ (Water-borne Diseases) কী? উদাহরণ দাও।
জলবাহিত রোগ: দূষিত জল পান বা ব্যবহারের মাধ্যমে যে সমস্ত সংক্রামক রোগ ছড়ায়। সাধারণত রোগজীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া) দূষিত জলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। উদাহরণ: (১) ডায়রিয়া, (২) কলেরা (Vibrio cholerae), (৩) টাইফয়েড, (৪) আমাশয় (Dysentery), (৫) জন্ডিস বা হেপাটাইটিস A ও E, (৬) পোলিও। WHO-র মতে প্রতি বছর ৩০ লক্ষ শিশু জলবাহিত রোগে মারা যায়।
8. তাপীয় দূষণ (Thermal Pollution) কী? এর প্রভাব কী?
তাপীয় দূষণ: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্প কারখানায় শীতলীকরণ কাজে ব্যবহৃত গরম জল সরাসরি নদী বা সমুদ্রে ফেলা হলে জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫°-১০°C পর্যন্ত বেড়ে যায়। প্রভাব: (১) জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কমে যায় → মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু, (২) মাছের প্রজননচক্র ব্যাহত, (৩) তাপমাত্রার পরিবর্তনে অনেক প্রাণী ঐ জল ছেড়ে চলে যায় → বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট। প্রতিকার: বর্জ্য জল প্রথমে ঠান্ডা করে (Cooling Tower) তবে নদীতে ফেলা উচিত।
9. জল পরিশোধনের তিনটি সহজ উপায় লেখো।
জল পরিশোধনের সহজ উপায়: (১) ফোটানো (Boiling): ১০০°C তাপমাত্রায় ১০ মিনিট ফোটালে জলের বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রোটোজোয়া নষ্ট হয় — এটি সবচেয়ে পুরনো ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। (২) সৌর পরিশোধন (SODIS): পাতলা স্বচ্ছ প্লাস্টিক বোতলে জল ভরে ৬-৭ ঘণ্টা সূর্যের আলোতে রাখলে UV রশ্মি জীবাণু নষ্ট করে। (৩) ক্লোরিনেশন: জলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লোরিন মেশালে জীবাণু নষ্ট হয় ও দীর্ঘদিন জল জীবাণুমুক্ত থাকে — পুরসভার জল সরবরাহে ব্যবহৃত।
10. জল দূষণ রোধে কৃষিক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?
কৃষিক্ষেত্রে জলদূষণ রোধে সতর্কতা: (১) পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, যাতে বৃষ্টির জলে ধুয়ে জলের উৎস দূষিত না হয়, (২) জৈব সার (কম্পোস্ট, গোবর সার) ও জৈব কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে, (৩) চাষের জমির পাশে ঘাস বা গাছের বেড়া দিতে হবে যাতে মাটি ও সার ধুয়ে না যায় (Buffer Strip), (৪) কীটনাশকের পাত্র ও উদ্বৃত্ত নদী-পুকুরে না ফেলা, (৫) সমন্বিত কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ (IPM) পদ্ধতি ব্যবহার করা।
11. পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলায় আর্সেনিক দূষণ দেখা গেছে? কী কী রোগ হয়?
পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষণ: প্রধানত মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা — এই ৯টি জেলায় ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিকের মাত্রা WHO-র নির্ধারিত সীমা (১০ μg/L) থেকে অনেক বেশি। রোগসমূহ: (১) ব্ল্যাকফুট রোগ — হাতে-পায়ে কালো ক্ষত, (২) পিগমেন্টেশন (গায়ে কালো-সাদা ছোপ), (৩) কেরাটোসিস (হাত-পায়ের চামড়া শক্ত হওয়া), (৪) স্নায়ুর সমস্যা, (৫) ত্বক, ফুসফুস ও যকৃতের ক্যানসার।
12. সোলার ডিসইনফেকশন (SODIS) পদ্ধতি কী? ব্যাখ্যা করো।
সোলার ডিসইনফেকশন (SODIS): এটি একটি সহজ, সস্তা ও পরিবেশবান্ধব জল পরিশোধন পদ্ধতি। প্রণালী: (১) একটি পাতলা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ বোতলে (PET বোতল) পরিষ্কার বা ফিল্টার করা জল ভরতে হবে, (২) বোতলটি সম্পূর্ণ সূর্যের আলোতে ৬-৭ ঘণ্টা (মেঘলা দিনে ২ দিন) অনুভূমিকভাবে রাখতে হবে, (৩) সূর্যের অতিবেগুনি (UV-A) রশ্মি ও তাপমাত্রা (৪০°-৫০°C) সম্মিলিতভাবে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রোটোজোয়া ধ্বংস করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) উন্নয়নশীল দেশে এই পদ্ধতি অনুমোদন করেছে।
13. জল সংরক্ষণের গুরুত্ব ও উপায় আলোচনা করো।
জল সংরক্ষণের গুরুত্ব: পৃথিবীর মিঠা জলের মাত্র ২.৫% — তার অধিকাংশ হিমবাহ ও ভূগর্ভে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও দূষণের কারণে সারা বিশ্ব জল সংকটের সম্মুখীন। উপায়: (১) প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল ব্যবহার না করা — কল বন্ধ রাখা, (২) বৃষ্টির জল সংগ্রহ (Rainwater Harvesting) — ছাদ থেকে ট্যাঙ্কে, (৩) ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহার — গোসলের জল বাগানে, (৪) ড্রিপ ইরিগেশন — ফোঁটা ফোঁটা করে সেচ, (৫) কম ক্ষারযুক্ত ডিটারজেন্ট ব্যবহার, (৬) জল পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহার (ইজরায়েল — ৩০% পুনর্ব্যবহার)।
14. গৃহস্থালির বর্জ্য কীভাবে জলদূষণ ঘটায় ও তার প্রতিকার কী?
গৃহস্থালির জলদূষণ: (১) রান্নাঘরের তেল-ঝোল মেশানো নোংরা জল, (২) সাবান-শ্যাম্পু-ডিটারজেন্ট মেশানো স্নানের ও কাপড় কাচার জল, (৩) শৌচাগারের অপরিশোধিত বর্জ্য — পুকুর-নদীতে মিশে। এতে জলে ফসফেট ও নাইট্রেট বেড়ে ইউট্রোফিকেশন, অক্সিজেন স্বল্পতা ও কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া দূষণ ঘটে। প্রতিকার: (১) সাবান-ডিটারজেন্ট কম ব্যবহার ও কম ক্ষারযুক্ত/ফসফেট-মুক্ত পণ্য ব্যবহার, (২) বাড়ির নোংরা জল শৌচাগারের পাইপে না ফেলে সোক পিট (Soak Pit) বা বাগানে ফেলা, (৩) শৌচাগার সঠিক সেপ্টিক ট্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করা।
15. জলদূষণের ফলে জলজ প্রাণীর কী ক্ষতি হয়? উদাহরণ দাও।
জলদূষণের ফলে জলজ প্রাণীর ক্ষতি: (১) তাপীয় দূষণ ও জৈব দূষণে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কমে যায় → মাছ ও জলজ প্রাণী দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। (২) কীটনাশক ও রাসায়নিক দূষণে মাছের ডিম ও পোনা ধ্বংস হয় — পূর্ব কলকাতার জলাভূমি, চিলকা হ্রদের উদাহরণ। (৩) তেল দূষণে সামুদ্রিক পাখি ও জলচর প্রাণীর পালক/লোমে তেল লেগে তারা সাঁতার কাটতে বা ওড়তে পারে না — পারস্য উপসাগরের যুদ্ধের সময়। (৪) হলদিয়া নদীর মোহনায় রাসায়নিক দূষণে ইলিশ মাছ কমে গেছে।
16. জাতিসংঘের মতে প্রতিদিন একজন মানুষের কত জল প্রয়োজন?
রাষ্ট্রসংঘের (UN) মতে, প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন অন্তত ২০ লিটার বিশুদ্ধ জল প্রয়োজন — পান করা, রান্না, প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি (হাত ধোয়া, স্নান) ইত্যাদির জন্য। বাস্তবতা: আফ্রিকার মাদাগাস্কারের মানুষ দৈনিক ৫ লিটারও পায় না। অপরদিকে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৫০ লিটার পানি ব্যবহার করে। এই বৈষম্য দূর করে সব মানুষের জন্য 'জলের অধিকার' নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG-6) অংশ।
17. জল পরিশোধনে কড়াইশুটি ও কাঠকয়লার ভূমিকা কী?
প্রাকৃতিক জল পরিশোধন: (১) কড়াইশুটি, অড়হর ডাল, মুসুর ডাল — এরকম কিছু ডালজাতীয় গাছে প্রাকৃতিক ফ্লোকুল্যান্ট (জমাট বাঁধা পদার্থ) থাকে যা জলের ক্ষুদ্র নোংরাগুলোকে জমাট বেঁধে থিতিয়ে পড়তে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে 'মোরিঙ্গা অলিফেরা' (সজনে) গাছের বীজেও একই গুণ আছে। (২) কাঠকয়লা (Activated Charcoal) — জৈব দূষণ, রঙ, গন্ধ শোষণ করে এবং জলকে বিশুদ্ধ করে। (৩) সমুদ্র বালি ও নুড়ি পাথরের মাধ্যমে ফিল্টার করে (Bio-sand Filter) দূষিত জল প্রায় ৯০% বিশুদ্ধ করা যায়।
18. সমুদ্রের তেল দূষণ কেন ভয়াবহ?
সমুদ্রের তেল দূষণ (Marine Oil Pollution) অত্যন্ত ভয়াবহ কারণ: (১) তেল জলের উপর পাতলা আস্তরণ (Oil Slick) তৈরি করে → সূর্যালোক ও অক্সিজেন জলের নিচে যেতে পারে না → ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন মারা যায় → পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বিঘ্নিত হয়। (২) সামুদ্রিক পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর পালক/লোমে তেল লেগে সাঁতার ও ওড়ার ক্ষমতা নষ্ট হয় → মৃত্যু। (৩) ম্যানগ্রোভ বন ও প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়। (৪) তেলের রাসায়নিক উপাদান ক্যানসার সৃষ্টিকারী। উদাহরণ: ২০১০ সালের মেক্সিকো উপসাগরের BP তেল নির্গমন।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (বিস্তারিত আলোচনা)
5 টি
1. জলদূষণ কাকে বলে? জলদূষণের প্রধান কারণ ও উৎসগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। বিভিন্ন ধরনের জলদূষণের উদাহরণ দাও।
জলদূষণ (Water Pollution)
নদী, পুকুর, হ্রদ, সমুদ্র বা ভূগর্ভস্থ জলে মানুষের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক, জৈব বা ভৌত পদার্থ মিশে জলের প্রাকৃতিক গুণগত মান নষ্ট হলে তাকে জলদূষণ বলে।
জলদূষণের প্রধান কারণ ও উৎস:
| উৎস | দূষণকারী পদার্থ | উদাহরণ |
| গৃহস্থালির বর্জ্য | সাবান, ডিটারজেন্ট, ফসফেট, শৌচাগারের বর্জ্য | পুকুরে কাপড় কাচা, নর্দমার জল |
| কলকারখানার বর্জ্য | রাসায়নিক, অ্যাসিড, ভারী ধাতু (পারদ, সিসা) | হলদিয়া পেট্রো-রসায়ন, মিনামাটা |
| কৃষি বর্জ্য | রাসায়নিক সার, কীটনাশক | পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, চিলকা |
| তেল দূষণ | খনিজ তেল | পারস্য উপসাগর যুদ্ধ, মেক্সিকো উপসাগর |
| তাপীয় দূষণ | গরম জল | তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ওয়াটার |
| আর্সেনিক দূষণ | প্রাকৃতিক আর্সেনিক | প.বঙ্গের ৯ জেলা — ব্ল্যাকফুট |
2. ইউট্রোফিকেশন কাকে বলে? এর কারণ, প্রক্রিয়া ও প্রভাব বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো। কীভাবে ইউট্রোফিকেশন প্রতিরোধ করা সম্ভব?
ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication)
জলাশয়ে অতিরিক্ত পুষ্টি (ফসফেট, নাইট্রেট) মিশে শৈবাল ও আগাছার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পরবর্তী পচনের মাধ্যমে জলের অক্সিজেন কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ইউট্রোফিকেশন বলে।
ক্রমান্বয়ে প্রক্রিয়া:
- সাবান, ডিটারজেন্ট, সার থেকে ফসফেট ও নাইট্রেট জলে মেশে → পুষ্টি বৃদ্ধি
- পুষ্টির আধিক্যে শৈবাল, কচুরিপানা, আগাছা দ্রুত বেড়ে যায় (Algal Bloom)
- সূর্যালোক জলের নীচে পৌঁছাতে পারে না → নীচের জলজ উদ্ভিদ মারা যায়
- মরে যাওয়া শৈবাল ও উদ্ভিদ পচতে শুরু করে → পচন প্রক্রিয়ায় জলের অক্সিজেন (DO) মারাত্মকভাবে কমে যায়
- অক্সিজেনের অভাবে মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায় → জলাশয় মৃত হয়ে যায়
প্রতিকার:
- ফসফেট-মুক্ত ডিটারজেন্ট ব্যবহার
- কৃষিতে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ
- জলাশয়ের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা
- বর্জ্য জল পরিশোধন করে তবে ফেলা
3. আর্সেনিক দূষণ কী? পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষণের কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার বিস্তারিত আলোচনা করো। ব্ল্যাকফুট রোগ কী?
আর্সেনিক দূষণ (Arsenic Contamination)
আর্সেনিক একটি ধাতব মৌল (As, পারমাণবিক সংখ্যা 33) যা প্রাকৃতিকভাবে মাটির নীচে পাথরের স্তরে বিদ্যমান।
কারণ:
সবুজ বিপ্লবের পরে কৃষিকাজের জন্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলা হয়। জল তুলে নেওয়ার ফলে মাটির নীচের স্তরে অক্সিজেন প্রবেশ করে এবং আর্সেনিক যৌগ অক্সিডাইজড হয়ে জলে দ্রবণীয় বিষাক্ত আর্সেনাইট/আর্সেনেট যৌগ তৈরি করে। নলকূপের মাধ্যমে এই বিষাক্ত জল পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব:
- জেলাসমূহ: মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা
- ব্ল্যাকফুট রোগ: হাতে-পায়ে কালো কালো ক্ষত, গ্যাংগ্রিন
- অন্যান্য: ত্বকের কেরাটোসিস, পিগমেন্টেশন, ত্বক-ফুসফুস-যকৃতের ক্যানসার
প্রতিকার:
- ভূগর্ভস্থ জলের পরিবর্তে ভূপৃষ্ঠের পরিশোধিত জল (নদী-পুকুর)
- আর্সেনিক ফিল্টার (চারকোল, সক্রিয় অ্যালুমিনা, RO)
- সচেতনতা ও নলকূপের নিয়মিত পরীক্ষা
4. জল সংরক্ষণ বলতে কী বোঝো? জল সংরক্ষণ কেন জরুরি? জল সংরক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতি ও উপায় বিস্তারিত আলোচনা করো।
জল সংরক্ষণ (Water Conservation)
জলের অপচয় রোধ করে, সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য জলের প্রাপ্যতা বজায় রাখার কৌশলগত প্রয়াসকে জল সংরক্ষণ বলে।
কেন জরুরি?
- পৃথিবীর মাত্র ২.৫% মিঠা জল, তার অধিকাংশই হিমবাহ ও গভীর ভূগর্ভে — ব্যবহারযোগ্য মাত্র ১%
- জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলের চাহিদা বাড়ছে
- জলদূষণের ফলে ব্যবহারযোগ্য জলের উৎস সংকুচিত হচ্ছে
- বিশ্বের প্রায় ২২ কোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে ভুগছে
জল সংরক্ষণের পদ্ধতি:
- বৃষ্টির জল সংগ্রহ (Rainwater Harvesting): ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাঙ্ক বা ভূগর্ভে জমা করা
- ড্রিপ ইরিগেশন: ফোঁটা ফোঁটা করে গাছের গোড়ায় জল — স্প্রিংকলার থেকে ৭০% জল সাশ্রয়
- ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহার: গোসল ও রান্নার বর্জ্য জল বাগানে, শৌচাগারে
- জল পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার: ইজরায়েলে ৩০% পুনর্ব্যবহার
- সচেতনতা: কল বন্ধ, কম জল ব্যবহার, দাঁত মাজার সময় কল বন্ধ
5. পরিবেশের অবনমন রোধে ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা কী? একটি বিদ্যালয় স্তরে কীভাবে জলদূষণ প্রতিরোধ ও জল সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব?
পরিবেশ রক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা:
ছাত্র-ছাত্রীরা আগামীর নাগরিক। পরিবেশ সম্পর্কে আজকের সচেতনতাই আগামীর পৃথিবীকে রক্ষা করবে।
বিদ্যালয় স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর উপায়:
- সমীক্ষা পরিচালনা:
- বিদ্যালয় বা পাড়ার কাছে পুকুর/জলাশয়ের জলের গুণগত মান পরীক্ষা
- ভাঙা কল ও জল অপচয়ের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি
- সচেতনতামূলক প্রচার:
- পোস্টার তৈরি — 'জলই জীবন', 'জল বাঁচান, পৃথিবী বাঁচান'
- র্যালি, নাটক, প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো
- হাতেকলমে কাজ:
- পুকুর বা জলাশয়ের পাড়ে গাছ লাগানো
- বিদ্যালয়ে বৃষ্টির জল সংগ্রহের ব্যবস্থা (Rainwater Harvesting)
- ব্যবহৃত জল ফুলের গাছে দেওয়ার ব্যবস্থা
- নিজের দায়িত্ব পালন:
- প্রয়োজন না থাকলে কল বন্ধ রাখা
- পুকুরে গরু-মোষ স্নান করানো বা কাপড় কাচা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ
- বাড়ির নোংরা আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা
- প্রশাসনকে জানানো:
- ভাঙা কল মেরামতির জন্য পুরসভা/পঞ্চায়েতে আবেদন
- কারখানা থেকে দূষিত জল ফেলার ঘটনা প্রশাসনকে জানানো
ছাত্র-ছাত্রীরা আজকের ছোট্ট চেষ্টার মাধ্যমেই আগামী দিনে একটি পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়তে পারে।
মনে রেখো!
জলদূষণের উৎস: গৃহস্থালি, কলকারখানা, কৃষি, তেল, তাপ |
ইউট্রোফিকেশন: ফসফেট → শৈবাল → অক্সিজেন কমে → মাছ মরে |
আর্সেনিক: প.বঙ্গের ৯ জেলা → ব্ল্যাকফুট, ক্যানসার |
জলবাহিত রোগ: ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিস |
প্রতি মানুষে দরকার: ২০ লিটার/দিন |
জল পরিশোধন: ফোটানো, ক্লোরিন, সোলার ডিসইনফেকশন (SODIS)