Chapter 2: আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Rise of Regional Powers)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 31 MCQ | 20 SAQ | 8 Broad Questions
নবাব
পলাশি
দেওয়ানি
স্বত্ববিলোপ
🏰
বাংলা
মুর্শিদকুলি | আলিবর্দী | সিরাজ
⚔️
পলাশি ও বক্সার
১৭৫৭ ও ১৭৬৪ | কোম্পানির জয়
📜
দেওয়ানি (১৭৬৫)
রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ
🛡️
সাম্রাজ্যবাদী নীতি
অধীনতামূলক মিত্রতা | স্বত্ববিলোপ
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
31 টি
1. ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে কোন মোগল সম্রাট মারা যান?
ক) ক) শাহজাহান
খ) খ) আকবর
গ) গ) ঔরঙ্গজেব
ঘ) ঘ) বাহাদুর শাহ
ব্যাখ্যা: ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব (Aurangzeb) মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর খুব দ্রুত মোগল সাম্রাজ্যের শক্তি ও প্রভাব ক্ষয় হতে থাকে। ফলে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ধীরে ধীরে স্বাধীনভাবে শাসন চালাতে শুরু করে।
2. বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব কে ছিলেন?
ক) ক) আলিবর্দী খান
খ) খ) মুর্শিদকুলি খান
গ) গ) সিরাজ-উদ-দৌলা
ঘ) ঘ) মির জাফর
ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খান (Murshid Quli Khan) ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। তিনি ১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুখশিয়ারের কাছ থেকে বাংলার নাজিম ও দেওয়ানের দ্বৈত দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর সময় থেকেই বাংলায় কার্যত স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
3. মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলার রাজধানী কোথায় ছিল?
ক) ক) কলকাতা
খ) খ) ঢাকা
গ) গ) মুর্শিদাবাদ
ঘ) ঘ) পাটনা
ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খান তাঁর নামে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) শহরের পত্তন করেন এবং বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসেন। মুর্শিদাবাদ দীর্ঘকাল বাংলার নবাবদের রাজধানী ছিল।
4. হায়দরাবাদ রাজ্য কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) সাদাৎ খান
খ) খ) চিন কুলিচ খান (নিজাম-উল-মুলক)
গ) গ) টিপু সুলতান
ঘ) ঘ) মুর্শিদকুলি খান
ব্যাখ্যা: চিন কুলিচ খান (Chin Qilich Khan), যিনি নিজাম-উল-মুলক (Nizam-ul-Mulk) নামে পরিচিত, ১৭২৪ সালে হায়দরাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট ফারুখশিয়ার তাঁকে নিজাম-উল-মুলক উপাধি দেন। ১৭৪০ সাল থেকে হায়দরাবাদ কার্যত স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
5. অযোধ্যা রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) ক) নিজাম-উল-মুলক
খ) খ) মুর্শিদকুলি খান
গ) গ) সাদাৎ খান
ঘ) ঘ) সুজা-উদ-দৌলা
ব্যাখ্যা: সাদাৎ খান (Saadat Khan) ১৭২২ সালে অযোধ্যা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট মহম্মদ শাহ তাঁকে বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন। অযোধ্যার দেওয়ানের দফতরকে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে এনে তিনি অযোধ্যাকে স্বাধীন শাসনে পরিণত করেন।
6. মারাঠা আক্রমণ থেকে কলকাতা রক্ষার জন্য কী খনন করা হয়েছিল?
ক) ক) গোবিন্দপুর খাল
খ) খ) মারাঠা খাল
গ) গ) সল্ট লেক
ঘ) ঘ) টালির নালা
ব্যাখ্যা: মারাঠা আক্রমণ (বর্গি হামলা) থেকে রক্ষা পেতে কলকাতার ব্রিটিশ বণিকেরা ১৭৪৪ সালে কলকাতার চারপাশে একটি খাল খনন করেন, যা মারাঠা খাল (Maratha Ditch) নামে পরিচিত। এই খাল গোবিন্দপুর থেকে সল্ট লেক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
7. পলাশির যুদ্ধ কত সালে হয়?
ক) ক) ১৭৫৬
খ) খ) ১৭৫৭
গ) গ) ১৭৬৪
ঘ) ঘ) ১৭৬৫
ব্যাখ্যা: ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধ (Battle of Plassey) হয়। এই যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এই যুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখে।
8. মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে পলাশির যুদ্ধে প্রভাব ফেলে?
ক) ক) সিরাজের সেনাবাহিনীকে উসকে দিয়েছিল
খ) খ) যুদ্ধে নিরপেক্ষ থেকে সিরাজের পরাজয় নিশ্চিত করেছিল
গ) গ) ব্রিটিশদের অস্ত্র দিয়েছিল
ঘ) ঘ) দিল্লির সম্রাটকে জানিয়েছিল
ব্যাখ্যা: মির জাফর ছিলেন সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাপতি। ব্রিটিশ কোম্পানি ও জগৎ শেঠের সাথে ষড়যন্ত্র করে তিনি পলাশির যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই নবাবের বিশাল সেনাবাহিনী পরাজিত হয়।
9. 'পলাশির লুণ্ঠন' বলতে কী বোঝায়?
ক) ক) যুদ্ধক্ষেত্র লুট
খ) খ) পলাশির যুদ্ধের পর কোম্পানি ও ক্লাইভ কর্তৃক বাংলার অঢেল সম্পদ আত্মসাৎ
গ) গ) গ্রাম লুণ্ঠন
ঘ) ঘ) নবাবের কোষাগার পোড়ানো
ব্যাখ্যা: পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও রবার্ট ক্লাইভ মির জাফরের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও উপহার হিসেবে অর্থ-সম্পদ সংগ্রহ করে। কলকাতা আক্রমণের অজুহাতে ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য সম্পদ— সব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়। এই বিপুল সম্পদ আত্মসাৎকেই 'পলাশির লুণ্ঠন' বলা হয়।
10. বক্সারের যুদ্ধ কবে হয় এবং তাতে কারা অংশ নেয়?
ক) ক) ১৭৫৭; সিরাজ ও ক্লাইভ
খ) খ) ১৭৬৪; মির কাশিম, সুজা-উদ-দৌলা, দ্বিতীয় শাহ আলম বনাম ব্রিটিশ কোম্পানি
গ) গ) ১৭৬০; মির জাফর ও হেক্টর মুনরো
ঘ) ঘ) ১৭৬৫; টিপু সুলতান ও কর্নওয়ালিস
ব্যাখ্যা: বক্সারের যুদ্ধ (Battle of Buxar) ১৭৬৪ সালের অক্টোবর মাসে হয়। একদিকে ছিল মির কাশিম, অযোধ্যার সুজা-উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনী, অন্যদিকে ব্রিটিশ কোম্পানির বাহিনী (হেক্টর মুনরোর নেতৃত্বে)। কোম্পানি এই যুদ্ধেও জয়ী হয়।
11. ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার কবে পায়?
ক) ক) ১৭৫৭
খ) খ) ১৭৬০
গ) গ) ১৭৬৫
ঘ) ঘ) ১৭৭২
ব্যাখ্যা: বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদের চুক্তি অনুসারে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ব্রিটিশ কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) প্রদান করেন। এর বিনিময়ে কোম্পানি সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা দিতে অঙ্গীকার করে।
12. দেওয়ানি অধিকার বলতে কী বোঝো?
ক) ক) সামরিক অধিকার
খ) খ) রাজস্ব আদায়ের অধিকার
গ) গ) বাণিজ্যিক অধিকার
ঘ) ঘ) ধর্মীয় অধিকার
ব্যাখ্যা: দেওয়ানি (Diwani) বলতে ভূমি রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক অধিকার বোঝায়। ১৭৬৫ সালে সম্রাট শাহ আলমের ফরমান বলে ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। এর ফলে কোম্পানি আইনগতভাবে এই তিনটি প্রদেশের বিপুল রাজস্বের মালিক হয়ে যায়।
13. দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual System) কী?
ক) ক) নবাব ও ব্রিটিশ কোম্পানির যৌথ শাসন
খ) খ) রাজনৈতিক দায়িত্ব নবাবের, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কোম্পানির
গ) গ) দুই নবাবের শাসন
ঘ) ঘ) হিন্দু-মুসলিম শাসন
ব্যাখ্যা: দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual System of Administration) চালু হয়। নবাবের হাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব (রাজনৈতিক ক্ষমতা) থাকে, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ কোম্পানির হাতে থাকে। ফলে নবাব হয় দায়িত্বহীন অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী কোম্পানির মুখাপেক্ষী।
14. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (Great Bengal Famine) কত সালে হয়?
ক) ক) ১৭৭০
খ) খ) ১৭৬৫
গ) গ) ১৭৫৭
ঘ) ঘ) ১৭৮০
ব্যাখ্যা: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (Bengal Famine of 1770) অষ্টাদশ শতকের বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ধারাবাহিক খরা, ফসলহানি এবং কোম্পানির কঠোর রাজস্ব আদায়ের নীতির ফলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়। এই দুর্ভিক্ষ রোধে কোম্পানি কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি।
15. 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি' (Subsidiary Alliance) কে প্রবর্তন করেন?
ক) ক) রবার্ট ক্লাইভ
খ) খ) লর্ড ওয়েলেসলি
গ) গ) লর্ড কর্নওয়ালিস
ঘ) ঘ) লর্ড ডালহৌসি
ব্যাখ্যা: লর্ড ওয়েলেসলি (Lord Wellesley) ১৭৯৮ সালে গভর্নর জেনারেল হয়ে এসে 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি' (Subsidiary Alliance) প্রবর্তন করেন। এই নীতি অনুযায়ী দেশীয় রাজাদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনী রাখতে হতো ও তার ব্যয় বহন করতে হতো, বিনিময়ে রাজারা 'সুরক্ষা' পেতেন।
16. 'স্বত্ববিলোপ নীতি' (Doctrine of Lapse) কার শাসনকালে প্রবর্তিত হয়?
ক) ক) লর্ড ওয়েলেসলি
খ) খ) লর্ড ডালহৌসি
গ) গ) লর্ড কর্নওয়ালিস
ঘ) ঘ) ওয়ারেন হেস্টিংস
ব্যাখ্যা: লর্ড ডালহৌসি (Lord Dalhousie) ১৮৪৮-১৮৫৬ পর্যন্ত গভর্নর জেনারেল ছিলেন। তিনি স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) প্রবর্তন করেন, যার বলে কোনো দেশীয় রাজার ঔরসজাত পুত্র সন্তান না থাকলে সেই রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে। সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর প্রভৃতি এই নীতিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
17. টিপু সুলতান কোন রাজ্যের শাসক ছিলেন?
ক) ক) হায়দরাবাদ
খ) খ) মহীশূর
গ) গ) অযোধ্যা
ঘ) ঘ) বাংলা
ব্যাখ্যা: টিপু সুলতান (Tipu Sultan) ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মহীশূর (Mysore) রাজ্যের শাসক। তিনি হায়দার আলির পুত্র। ব্রিটিশ কোম্পানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে ব্রিটিশদের কড়া চ্যালেঞ্জ জানান। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
18. প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ কত সালে হয়?
ক) ক) ১৮৪৫
খ) খ) ১৭৬৪
গ) গ) ১৭৯৯
ঘ) ঘ) ১৮৫৭
ব্যাখ্যা: প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ (First Anglo-Sikh War) ১৮৪৫ সালে হয়। এই যুদ্ধে শিখ বাহিনী পরাজিত হয়। ১৮৪৬ সালে লাহোরের চুক্তি অনুযায়ী পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ কোম্পানির অধীনে চলে যায় এবং একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়।
19. মুর্শিদকুলি খানের সময় বাংলার বাণিজ্যে কারা প্রভাবশালী ছিলেন?
ক) ক) ফরাসি বণিকরা
খ) খ) হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনীয় বণিকেরা
গ) গ) শুধুমাত্র ব্রিটিশরা
ঘ) ঘ) পর্তুগিজরা
ব্যাখ্যা: মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলায় হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনীয় বণিকেরা বাণিজ্যে বিশেষ প্রভাবশালী ছিলেন। হিন্দু বণিক উমিচাঁদ এবং আর্মেনীয় বণিক খাজা ওয়াজিদ ছিলেন এদের মধ্যে অন্যতম। এই ধনী বণিক ও মহাজনদের হাতে আর্থিক ক্ষমতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতাও ছিল।
20. জগৎ শেঠ কাদের উপাধি?
ক) ক) এক ব্যক্তির নাম
খ) খ) একটি নির্দিষ্ট বণিক পরিবারের বংশানুক্রমিক উপাধি
গ) গ) সামরিক উপাধি
ঘ) ঘ) ধর্মীয় উপাধি
ব্যাখ্যা: জগৎ শেঠ (Jagat Seth) একটি নির্দিষ্ট বণিক পরিবারের বংশানুক্রমিক উপাধি। ফতেহচাঁদ নামক এক ব্যক্তি সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছ থেকে প্রথম 'জগৎ শেঠ' উপাধি পান। তাঁদের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল— বাংলার টাঁকশাল ও রাজস্বের উপর জগৎ শেঠদের নিয়ন্ত্রণ ছিল।
21. রেসিডেন্ট (Resident) বলতে কী বোঝো?
ক) ক) দেশীয় রাজা
খ) খ) ব্রিটিশ কোম্পানির প্রতিনিধি, যিনি দেশীয় রাজদরবারে নিযুক্ত থাকতেন
গ) গ) সেনাপতি
ঘ) ঘ) দেওয়ান
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন দেশীয় রাজদরবারে নিজেদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করত, যাঁদের রেসিডেন্ট (Resident) বলা হতো। এরা রাজদরবারের সমস্ত কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করতেন এবং কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতেন। ধীরে ধীরে রেসিডেন্টরাই দেশীয় রাজ্যের প্রকৃত শাসক হয়ে ওঠেন।
22. সিরাজ-উদ-দৌলা কেন ব্রিটিশ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন?
ক) ক) বাণিজ্য বন্ধ করতে
খ) খ) কোম্পানি দুর্গ নির্মাণ, অবৈধ বাণিজ্য ও নবাবের কর্মচারীদের আশ্রয় দিচ্ছিল বলে
গ) গ) ধর্মীয় কারণে
ঘ) ঘ) ফরাসিদের অনুরোধে
ব্যাখ্যা: সিরাজ-উদ-দৌলা ব্রিটিশ কোম্পানির বিরুদ্ধে তিনটি কারণে ক্ষুব্ধ ছিলেন: (১) কোম্পানি অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ ও পরিখা খনন করছিল, (২) 'দস্তক'-এর অপব্যবহার করে শুল্কহীন বাণিজ্য করছিল, (৩) নবাবের কর্মচারী কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দিয়ে নবাবের বিচারাধীনতা ব্যাহত করছিল।
23. 'দস্তক' (Dastak) কী ছিল?
ক) ক) সামরিক অস্ত্র
খ) খ) শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতিপত্র
গ) গ) রাজস্ব আদায়ের অধিকার
ঘ) ঘ) নবাবের ফরমান
ব্যাখ্যা: 'দস্তক' (Dastak) ছিল মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ারের ১৭১৭ সালের ফরমান দ্বারা প্রদত্ত এক বিশেষ অনুমতিপত্র, যা বলে কোম্পানির জাহাজ নির্দিষ্ট শুল্ক দিয়ে অবাধে বাণিজ্য করতে পারত। কিন্তু কোম্পানি ও তাদের বেসরকারি কর্মচারীরা এর অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ শুল্ক ফাঁকি দিতে শুরু করে, যার ফলে বাংলার রাজস্বের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল।
24. এলাহাবাদের চুক্তি (Treaty of Allahabad) কবে হয়?
ক) ক) ১৭৫৭
খ) খ) ১৭৬৪
গ) গ) ১৭৬৫
ঘ) ঘ) ১৭৭২
ব্যাখ্যা: এলাহাবাদের চুক্তি ১৭৬৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে: (১) সুজা-উদ-দৌলা ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে অযোধ্যা ফিরে পান, (২) সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি প্রদান করেন, (৩) বিনিময়ে কোম্পানি সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা দিতে সম্মত হয়।
25. পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণ কী ছিল?
ক) ক) অস্ত্রের অভাব
খ) খ) মির জাফর ও জগৎ শেঠের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা
গ) গ) প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ঘ) ঘ) সেনাবাহিনীর সংখ্যা কম
ব্যাখ্যা: পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণ মির জাফর, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদের মতো ব্যক্তিদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা। মির জাফর নবাবের প্রধান সেনাপতি হয়েও যুদ্ধে নিরপেক্ষ ছিলেন। তাছাড়া নবাবের সেনাপতি রায়দুর্লভ ও অন্যদের একটি বড়ো অংশ যুদ্ধ না করেই দাঁড়িয়ে ছিল।
26. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম কোন যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে?
ক) ক) বক্সারের যুদ্ধ
খ) খ) পলাশির যুদ্ধ
গ) গ) এলাহাবাদের চুক্তি
ঘ) ঘ) বন্দিবাসের যুদ্ধ
ব্যাখ্যা: পলাশির যুদ্ধে (১৭৫৭) জয়লাভ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তার পছন্দের ব্যক্তি মির জাফরকে নবাব হিসেবে বসায়। এর মাধ্যমে কোম্পানি কার্যত বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং পরোক্ষ শাসনের ভিত স্থাপন করে। বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) এই অবস্থান আরও সুদৃঢ় করে।
27. ওয়ারেন হেস্টিংস কে ছিলেন?
ক) ক) বাংলার শেষ নবাব
খ) খ) বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল
গ) গ) ফরাসি সেনাপতি
ঘ) ঘ) মারাঠা পেশোয়া
ব্যাখ্যা: ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings) ছিলেন বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল (১৭৭৩-১৭৮৫)। তাঁর সময়কালে দেওয়ানি ব্যবস্থার পুনর্গঠন করা হয়, দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটানো হয় এবং কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় (১৭৭৪)।
28. কত সালে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে?
ক) ক) ১৭৬৫
খ) খ) ১৭৭২
গ) গ) ১৭৮৫
ঘ) ঘ) ১৭৯৩
ব্যাখ্যা: ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসনব্যবস্থার (Dual System) অবসান ঘটান। কোম্পানি সরাসরি সমস্ত প্রশাসনিক ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। তখন থেকেই বাংলার নবাব সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাহীন পেনশনভোগীতে পরিণত হন।
29. ১৭১৭ সালের ফারুখশিয়ারের ফরমানের প্রধান গুরুত্ব কী ছিল?
ক) ক) বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনা
খ) খ) ব্রিটিশ কোম্পানির অবাধ বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত
গ) গ) নবাবের পদ সৃষ্টি
ঘ) ঘ) দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু
ব্যাখ্যা: ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটি ফরমান (Farman) প্রদান করেন। এই ফরমান অনুযায়ী নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থের বিনিময়ে কোম্পানি সারা বাংলায় প্রায় শুল্কমুক্তভাবে বাণিজ্য করার অধিকার পায়। এটি কোম্পানির অর্থনৈতিক আধিপত্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
30. মারাঠা শক্তির উত্থান কোথায় হয়েছিল?
ক) ক) বাংলা
খ) খ) দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারত
গ) গ) অযোধ্যা
ঘ) ঘ) পাঞ্জাব
ব্যাখ্যা: মারাঠা শক্তির উত্থান দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারতে হয়েছিল। শিবাজী (১৬২৭-১৬৮০) ছিলেন মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। অষ্টাদশ শতকে মারাঠারা উত্তর ভারত পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তৃত করেছিল এবং বাংলায় বর্গি আক্রমণ চালিয়েছিল।
31. কাকে 'বর্গি' বলা হতো?
ক) ক) ব্রিটিশ সৈন্য
খ) খ) মারাঠা আক্রমণকারীদের
গ) গ) আফগান সৈন্য
ঘ) ঘ) ফরাসি সেনা
ব্যাখ্যা: অষ্টাদশ শতকের বাংলায় মারাঠা আক্রমণকারীদের 'বর্গি' (Bargi) বলা হতো। এঁরা মূলত মারাঠা সর্দারদের নেতৃত্বে বাংলায় লুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ চালাতেন। বাংলার লৌকিক ছড়ায় আছে— 'ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে'।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
20 টি
1. অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি কী কী?
মোগল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণ: (১) ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর উত্তরাধিকারীগণের অযোগ্যতা ও দুর্বলতা, (২) অভিজাতদের মধ্যে দলাদলি ও ষড়যন্ত্র— ভালো জায়গির পাওয়ার লড়াই, (৩) সামরিক সংস্কারে ব্যর্থতা— পারসিক (নাদির শাহ, ১৭৩৮-৩৯) ও আফগান (আহমদ শাহ আবদালি) আক্রমণ রুখতে পারেনি, (৪) জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থার সংকট ও কৃষির উপর বাড়তি চাপ— কৃষক বিদ্রোহ, (৫) সম্রাট ও অভিজাতরা সুস্থ শাসনের বদলে ব্যক্তিগত লাভের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন।
2. বাংলায় মুর্শিদকুলি খানের শাসনব্যবস্থা কেমন ছিল?
মুর্শিদকুলি খান (১৭১৭-১৭২৭) ছিলেন বাংলার প্রথম কার্যত স্বাধীন নবাব। তাঁর শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য: (১) তিনি বাংলার নাজিম ও দেওয়ানের দ্বৈত দায়িত্ব একাই পালন করেন, (২) মুর্শিদাবাদ শহর পত্তন ও রাজধানী স্থানান্তর, (৩) নিয়মিত রাজস্ব সংগ্রেহর জন্য কঠোর ব্যবস্থা— দিল্লির সম্রাটকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠাতেন, (৪) ইউরোপীয় বণিকদের সাথে বাণিজ্যে খুবই উদার— কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সতর্ক ছিলেন, (৫) একদল ক্ষমতাবান জমিদার ও ধনী বণিক গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়, যাদের হাতে অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীভূত হয়।
3. আলিবর্দী খান কে ছিলেন? তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে কী জানো?
আলিবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬) ছিলেন বাংলার নবাব। তিনি মুর্শিদকুলি খানের জামাতা। মুর্শিদকুলির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গোলযোগের সুযোগে জগৎ শেঠ ও ক্ষমতাবান জমিদারদের সহায়তায় সেনাপতি আলিবর্দী খান বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। তাঁর শাসনকাল: (১) মারাঠা আক্রমণ (বর্গি হামলা) রুখতে বার্ষিক চৌথ কর দিতে বাধ্য হন (১৭৫১ সন্ধি), (২) ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিদের রাজনৈতিক ক্ষমতা না বাড়তে দেওয়ার ব্যাপারে কড়া ছিলেন— ১৭৪৪ সালে মারাঠা আক্রমণের সময় ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে ৩০ লক্ষ টাকা দাবি করেন, (৩) ১৭৪৮ সালে আর্মেনীয় বণিকদের জাহাজ আটকে রাখার ঘটনায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন।
4. হায়দরাবাদ রাজ্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চিন কুলিচ খান, যিনি নিজাম-উল-মুলক নামে পরিচিত। তিনি মুঘল দরবারের এক উচ্চপদস্থ অভিজাত ও দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। ১৭২৩ সালে তিনি আসসফ বা মুবারিজ খানকে হারিয়ে দেন এবং পরের বছর নিজেই দাক্ষিণাত্যের সুবাদার হয়ে হায়দরাবাদ অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৪০ সাল থেকে তিনি কার্যত স্বাধীনভাবে শাসন চালাতে থাকেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সার্বভৌমত্ব অস্বীকার না করলেও— নামেমাত্র মুঘল সম্রাটের নামে মুদ্রা চালু ও খুৎবা পড়ানো হলেও— বাস্তবে সমস্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতেন।
5. অযোধ্যা রাজ্য কীভাবে স্বাধীন রূপ পেয়েছিল?
অযোধ্যা (Awadh) রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সাদাৎ খান, যাকে সম্রাট মহম্মদ শাহ বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন। ১৭২২ সালে তিনি অযোধ্যার শাসক নিযুক্ত হন। তিনি অযোধ্যার দেওয়ানের দফতরকে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে এনে অযোধ্যার রাজস্ব বিষয়ক কোনো খবরাখবরই মুঘল কোষাগারে পাঠানো বন্ধ করে দেন। জায়গিরদারি ব্যবস্থায় আঞ্চলিক অভিজাতদের অন্তর্ভুক্ত করায় সাদাৎ খানের সমর্থক একটি নতুন শাসকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। অযোধ্যার বাণিজ্য খুবই উন্নত ছিল। তার জামাই সফদর জং-কে অযোধ্যার প্রশাসক নিযুক্ত করে তিনি উত্তরাধিকারের ভিত শক্ত করেন।
6. ১৭৫৬ সালের কলকাতা অবরোধ ও 'অন্ধকূপ হত্যা' সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে ব্রিটিশ কোম্পানির বিরোধ ক্রমশ তীব্র হলে ১৭৫৬ সালের ২০ জুন নবাব-বাহিনী কলকাতার কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কুঠি আক্রমণ করে কলকাতা দখল করে। সিরাজ কলকাতার নাম বদলে আলিনগর রাখেন। 'অন্ধকূপ হত্যা': কলকাতা দখলের পর ব্রিটিশ কর্মচারী হলওয়েল দাবি করেন যে, সিরাজ নাকি ১৪৬ জন ব্রিটিশ নরনারীকে একটি ছোট ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন, যাতে বেশিরভাগই মারা যান। কিন্তু ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রমাণ করে দেখান যে— (১) ১৮x১৮ ফুটের ঘরে ১৪৬ জন থাকা অসম্ভব, (২) সমসাময়িক কোনো কাগজপত্র বা চিঠিতে 'অন্ধকূপ হত্যা'-র উল্লেখ নেই, (৩) হলওয়েল নিজেই এই ঘটনা অতিরঞ্জিত করেছিলেন।
7. পলাশির যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছিল?
পলাশির যুদ্ধে (২৩ জুন ১৭৫৭) রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ কোম্পানি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। ফলাফল: (১) মির জাফরকে সিংহাসনে বসানো হয়— তিনি ছিলেন ব্রিটিশদের হাতের পুতুল, (২) কোম্পানি বিপুল ক্ষতিপূরণ ও উপহার বাবদ প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদ লুঠন করে, (৩) কলকাতার উপরে নবাবের যাবতীয় অধিকার নষ্ট হয়ে যায় এবং কোম্পানি দুর্গ ও টাঁকশাল তৈরির অনুমতি পায়, (৪) ২৪ পরগনার জমিদারি কোম্পানি পায়, (৫) নবাবের দরবারে একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়। বাস্তবে বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
8. বক্সারের যুদ্ধ কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ: (১) পলাশির যুদ্ধ যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, বক্সারের যুদ্ধ তাকে চূড়ান্ত সাফল্য দেয়— কোম্পানির আধিপত্য বাংলা ছাড়িয়ে উত্তর ভারতেও বিস্তৃত হয়, (২) বাংলার নবাব মির কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনীও কোম্পানিকে হারাতে পারেনি— ফলে প্রতিপক্ষের যৌথ প্রতিরোধের সম্ভাবনা নির্মূল হয়, (৩) এই জয়ের ফলে ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদের চুক্তিতে কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের আইনি অধিকার) লাভ করে, (৪) অযোধ্যার মতো বড়ো রাজ্যও কার্যত কোম্পানির করদ রাজ্যে পরিণত হয়।
9. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০) কী? এর কারণ ও ফলাফল কী?
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (Great Bengal Famine of 1770): ১৭৬৯-৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কারণ: (১) টানা খরা ও ফসলহানি— ধান্য নষ্ট হয়ে যায়, (২) কোম্পানির কঠোর রাজস্ব আদায়— ফসল না হলেও রাজস্ব সংগ্রহে কোনোরূপ শিথিলতা দেখানো হয়নি, (৩) কোম্পানির কর্মচারীদের মজুতদারি ও কালোবাজারি— খাদ্যশস্য মজুত রেখে দাম বাড়ানো, (৪) দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার কোনো সক্রিয় ব্যবস্থা না নেওয়া। ফলাফল: বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৃষক প্রাণ হারায়, কৃষি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তবুও কোম্পানি রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখে। ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় লিখেছেন, দুর্ভিক্ষের গতি রোধ করার কোনো আয়োজন তো দূরের কথা, বরং দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী করাই ছিল লাভ।
10. দ্বৈত শাসনব্যবস্থা (Dual System) বলতে কী বোঝো? এর সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
দ্বৈত শাসনব্যবস্থা: ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় প্রবর্তিত এক নতুন শাসন কাঠামো। এর অধীনে: (১) নবাবের হাতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ফৌজদারি দায়িত্ব (নির্জামত), (২) কোম্পানির হাতে থাকে রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতা (দেওয়ানি)। সীমাবদ্ধতা: নবাব হন সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন— কারণ অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া যে কোনো রাজনৈতিক দায়িত্বই নামমাত্র। কোম্পানি দায়িত্বহীন অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী— রাজস্ব আদায় করে সম্পূর্ণরূপে নিজের স্বার্থে ব্যয় করত, কিন্তু প্রজার কল্যাণ বা আইন-শৃঙ্খলায় কোনো ভূমিকা নিতে বাধ্য ছিল না। ফলে বাংলার প্রশাসন ও কৃষি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এই ব্যর্থ ব্যবস্থার অবসান ঘটান।
11. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) কী? এর শর্ত কী ছিল?
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance): লর্ড ওয়েলেসলি (গভর্নর জেনারেল, ১৭৯৮-১৮০৫) কর্তৃক প্রবর্তিত একটি আগ্রাসী কূটনৈতিক নীতি। শর্ত: (১) দেশীয় রাজ্যকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ নিজের রাজ্যে রাখতে হবে এবং সেই সেনাবাহিনীর সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে হবে, (২) রাজ্য কোনো বিদেশি (বিশেষত ফরাসি) কোম্পানি বা নাগরিককে নিজের চাকরিতে রাখতে পারবে না, (৩) অন্য কোনো দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক স্থাপনের আগে ব্রিটিশ কোম্পানির অনুমতি নিতে হবে, (৪) বিনিময়ে কোম্পানি রাজ্যটির 'বাহ্যিক আক্রমণ' থেকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে। দেশীয় রাজ্যেরা বাস্তবে ব্রিটিশ রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
12. স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) কী? কোন কোন রাজ্য এই নীতিতে ব্রিটিশ দখলে আসে?
স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): লর্ড ডালহৌসি (গভর্নর জেনারেল, ১৮৪৮-১৮৫৬) কর্তৃক প্রচলিত এক সাম্রাজ্যবাদী নীতি। নিয়ম: কোনো দেশীয় রাজার যদি দত্তক পুত্র ছাড়া আপন ঔরসজাত স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে সেই রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে— নিছক দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার মান্য হবে না। এই নীতিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত রাজ্যসমূহ: (১) সাতারা (১৮৪৮), (২) জয়পুর (১৮৪৯), (৩) সম্বলপুর (১৮৫০), (৪) নাগপুর (১৮৫৪), (৫) ঝাঁসি (১৮৫৪)— ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্র দামোদর রাওয়ের উত্তরাধিকার অগ্রাহ্য করা হয়। এই নীতির বিরুদ্ধেই পরে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।
13. টিপু সুলতান সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
টিপু সুলতান (১৭৫০-১৭৯৯) ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক ও হায়দার আলির পুত্র। তিনি 'মহীশূরের বাঘ' নামে পরিচিত। ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্য বিখ্যাত: চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তিনি ব্রিটিশ কোম্পানির কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কোম্পানিকে মোকাবিলায় ফরাসিদের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য ও প্রযুক্তি নেন। স্বত্ববিলোপ নীতির পরিবর্তে তিনি স্বদেশীয় প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি জোরদার করেন। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে শ্রীরঙ্গপত্তনম দুর্গ রক্ষা করতে গিয়ে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারতেও ব্রিটিশ আধিপত্য বাধাহীন হয়।
14. সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের কারণ কী ছিল?
সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের একাধিক কারণ ছিল: (১) দরবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র— তাঁরই আত্মীয় ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, মির জাফর প্রমুখ নবাবের বিরুদ্ধে জোট বাঁধেন, (২) জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের মতো প্রভাবশালী বণিক ও মহাজনেরা ব্রিটিশ পক্ষাবলম্বন করেন, (৩) সেনাপতি মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা— পলাশির যুদ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতি হয়েও নিরপেক্ষ ভূমিকা নেন, (৪) সিরাজের সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ যুদ্ধেই অংশ নেয়নি, (৫) নবাবের তরুণ বয়স ও অভিজ্ঞতার অভাব— মাত্র ২৩ বছর বয়সে নবাব হয়েছিলেন, দরবারের চক্রান্ত বুঝে উঠতে পারেননি, (৬) ব্রিটিশ কোম্পানির সুচতুর কূটনীতি ও ঘুষ।
15. রবার্ট ক্লাইভ ও পলাশির লুণ্ঠন সম্পর্কে কী জানো?
রবার্ট ক্লাইভ (Robert Clive) ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক নেতা ও প্রশাসক। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর তিনি মির জাফরকে বাংলার নবাব হিসেবে বসান। বিনিময়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এবং কোম্পানির পক্ষে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করেন, তাকে 'পলাশির লুণ্ঠন' বলা হয়। কলকাতা আক্রমণের অজুহাতে মির জাফরের কাছ থেকে ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা কোম্পানির পক্ষে নেওয়া হয়। ক্লাইভ ব্যক্তিগতভাবে মির জাফরের কাছ থেকে প্রচুর উপঢৌকন ও সম্পদ আত্মসাৎ করেন। পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন— 'আমি আমার সংযম দেখে নিজেই বিস্মিত'।
16. মির কাশিম কেন ব্রিটিশ কোম্পানির সাথে বিরোধে জড়ান?
মির কাশিম ছিলেন মির জাফরের জামাই, ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ কোম্পানির সহায়তায় নবাব হন। কিন্তু পরে কোম্পানির কাছাকাছি তাঁর বিরোধ বাঁধে— কারণ: (১) নবাবী ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপারে তিনি কোম্পানির রেসিডেন্টের কাছে নালিশ জানাতে থাকলেও প্রতিকার পাননি, (২) ব্রিটিশ বেসরকারি কর্মচারীরা 'দস্তক'-এর অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ শুল্ক ফাঁকি দিতে থাকে— বাংলার রাজস্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, (৩) মির কাশিম এই অন্যায় বন্ধ করতে দেশীয় বণিকদের উপর থেকে সমস্ত শুল্ক তুলে দিয়ে সর্বজনীন সমতাভিত্তিক বাণিজ্য নীতি ঘোষণা করেন— যা কোম্পানির স্বার্থে আঘাত হানে, (৪) ফলস্বরূপ ১৭৬৩ সালে সিরাজের সাথে কোম্পানির সরাসরি যুদ্ধ বাঁধে এবং ধারাবাহিক যুদ্ধে (কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, উদয়নালা ও মুঙ্গের) পরাজিত হয়ে মির কাশিম অযোধ্যায় পালিয়ে যান।
17. লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি ভারতীয়দের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল?
স্বত্ববিলোপ নীতি ভারতীয় দেশীয় রাজন্যবর্গ ও সাধারণ প্রজার মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার করে। কারণ: (১) এটি ভারতীয় প্রথা ও ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল— হিন্দু ও মুসলিম সমাজে দত্তক পুত্রকে বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা হতো, (২) এই নীতির মাধ্যমে একের পর এক প্রাচীন রাজবংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, (৩) রাজ্যগুলোর কর্মচারী, সৈন্য ও আশ্রিত প্রজারা হঠাৎ রাজ্যচ্যুত হয়ে ব্রিটিশের অধীনে চাকরি বা জীবিকা হারান, (৪) বিশেষ করে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্র দামোদর রাওয়ের দাবি নাকচ করায় রানি চরমভাবে ক্ষুব্ধ হন— পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে তিনি নেতৃত্ব দেন। ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, স্বত্ববিলোপ নীতি ছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ।
18. মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ারের ফরমানের গুরুত্ব কী?
মোগল সম্রাট ফারুখশিয়ার ১৭১৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতি যে ফরমান প্রদান করেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শর্ত: (১) বার্ষিক ৩ হাজার টাকা রাজস্ব দেওয়ার বিনিময়ে কোম্পানি বাংলায় অবাধে বাণিজ্য করতে পারবে, (২) কোম্পানি তাদের পণ্যসম্ভার সম্বলিত জাহাজ নির্দিষ্ট শুল্ক ('দস্তক') দিলেই বিনা বাধায় চলাচল করতে পারবে, (৩) মুর্শিদাবাদ টাঁকশাল কোম্পানি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারবে। গুরুত্ব: এই ফরমান ব্রিটিশ কোম্পানির প্রায় অবাধ বাণিজ্যের পথ খুলে দেয় এবং কোম্পানিকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধার অধিকারী করে। পরবর্তীতে নবাবদের সাথে কোম্পানির বিরোধের বীজও ছিল এই ফরমানের অপব্যবহারই।
19. সিরাজ-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ কোম্পানির মধ্যে আলিনগরের সন্ধির শর্ত কী ছিল?
১৭৫৬ সালে সিরাজ কলকাতা দখলের পর দ্রুতই রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে এক ব্রিটিশ বাহিনী ১৭৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা পুনর্দখল করে। ফলে সিরাজ আলিনগরের সন্ধি (Treaty of Alinagar) করতে বাধ্য হন। শর্ত: (১) ব্রিটিশ কোম্পানি তার পূর্বের বাণিজ্যিক অধিকারগুলি ফিরে পায়, (২) নবাব কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হন, (৩) কোম্পানি কলকাতায় নিজের দুর্গ নির্মাণ করতে পারে ও নিজস্ব সিক্কা (মুদ্রা) তৈরির অনুমতি পায়। বাস্তবে এই সন্ধি বাংলার নবাবের পক্ষে অসম্মানজনক ও ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে সুবিধাজনক ছিল। সিরাজের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ মনোভাব চূড়ান্তভাবে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
20. বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্যে কোন কোন কোম্পানি প্রধান ভূমিকা পালন করত?
অষ্টাদশ শতকে বাংলায় প্রধানত তিনটি ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল: (১) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি— সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এবং ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, (২) ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (VOC)— প্রাচীন হলেও ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত ও কোণঠাসা হয়, (৩) ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি— ব্রিটিশ কোম্পানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, চন্দননগর ছিল ফরাসিদের প্রধান ঘাঁটি; ব্রিটিশ-ফরাসি প্রতিযোগিতা বাংলার বাইরেও দাক্ষিণাত্যে (কার্ণাটিক যুদ্ধ) সংঘাত সৃষ্টি করেছিল। নবাবেরা এই তিন কোম্পানির পারস্পরিক বিবাদে কোনো পক্ষ না নিয়ে সতর্ক নজর রাখতেন।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টি
1. অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। কীভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলি উত্থান লাভ করেছিল? বাংলা, হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার উদাহরণ দাও।
মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ
- ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭) ও উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতা: ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী সম্রাটরা (বাহাদুর শাহ, জাহান্দার শাহ, ফারুখশিয়ার) ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল— যোগ্য নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ।
- অভিজাতদের দলাদলি: ভালো জায়গির ও মনসব পাওয়ার জন্য দরবারের অভিজাতরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সম্রাটরাও এক একটি পক্ষকে টেনে এনে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইতেন— শাসন ব্যবস্থা গৌণ হয়ে পড়ে।
- সামরিক দুর্বলতা: অষ্টাদশ শতকে কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সংস্কার করা হয়নি। নাদির শাহের পারসিক আক্রমণ (১৭৩৮-৩৯) ও আহমদ শাহ আবদালির আফগান আক্রমণে (১৭৫৬-৫৭) দিল্লি বিধ্বস্ত হয়।
- জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: ক্রমবর্ধমান অভিজাতদের জায়গির দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জমি ছিল না। কৃষির ওপর করের বোঝা বাড়তে থাকে → কৃষক বিদ্রোহ (শিখ, জাঠ, সৎনামী)।
- কেন্দ্রের দুর্বলতা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন: সম্রাটের শক্তি কমতে থাকলে বিভিন্ন সুবাদার ও প্রদেশিক শাসকেরা কেন্দ্রের প্রতি আনুগত্য শিথিল করে— অনেকে স্বাধীন হয়ে পড়েন।
আঞ্চলিক শক্তির উত্থান
মোগল কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে যায়নি— কিন্তু ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত হয়। তিনটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি:
- বাংলা: মুর্শিদকুলি খান নাজিম ও দেওয়ানের দ্বৈত দায়িত্ব নিয়ে স্বাধীন শাসন শুরু করেন— ১৭১৭ সাল থেকে।
- হায়দরাবাদ: চিন কুলিচ খান (নিজাম-উল-মুলক) ১৭২৪ সালে স্বাধীন শাসনের ভিত স্থাপন করেন— সম্রাটের নামে মুদ্রা চললেও প্রশাসন স্বাধীন।
- অযোধ্যা: সাদাৎ খান ১৭২২ সালে অযোধ্যার দেওয়ানী দফতর দিল্লির নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে স্বাধীন শাসন গড়ে তোলেন।
2. বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধের কারণগুলি কী ছিল? পলাশির যুদ্ধ কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার মূল্যায়ন করো।
সিরাজ-ব্রিটিশ বিরোধের কারণ
- দুর্গ নির্মাণ ও পরিখা খনন: নবাবের অনুমতি ছাড়া ব্রিটিশ কোম্পানি কলকাতায় দুর্গ তৈরি ও পরিখা খনন করে— যা ছিল বাদশাহী আইনের লঙ্ঘন।
- 'দস্তক'-এর অপব্যবহার: ব্রিটিশ কর্মচারীরা (বেসরকারি বাণিজ্যে) দস্তক ব্যবহার করে সম্পূর্ণ শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছিল— নবাবের কোষাগার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল।
- কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয়: নবাবের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত কর্মচারী কৃষ্ণবল্লভকে কোম্পানি কলকাতায় আশ্রয় দেয় ও নবাবের দূতকে ফিরিয়ে দেয়।
- নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মদত: কোম্পানি ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, মির জাফরের সাথে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।
পলাশির যুদ্ধের তাৎপর্য
- রাজনৈতিক: বাংলার একজন ব্রিটিশপন্থী পুতুল নবাব (মির জাফর) সিংহাসনে বসেন— প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়।
- অর্থনৈতিক: 'পলাশির লুণ্ঠন'-এর মাধ্যমে বাংলার বিপুল অর্থসম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হয়— যা ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের পুঁজি জোগায়।
- সাম্রাজ্যবাদী: 'বণিকের মানদণ্ড' ক্রমে 'রাজদণ্ডে' পরিণত হয়— বাণিজ্যিক কোম্পানি সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
- মনস্তাত্ত্বিক: প্রমাণিত হয় যে ভারতীয় রাজন্যবর্গকে ষড়যন্ত্র ও ঘুষ দিয়ে পরাজিত করা যায়।
3. বক্সারের যুদ্ধ ও এলাহাবাদের চুক্তির গুরুত্ব আলোচনা করো। দেওয়ানি লাভ কীভাবে বাংলার তথা ভারতের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল?
বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)
মির কাশিমের সাথে কোম্পানির বিরোধ চরমে পৌঁছালে মির কাশিম অযোধ্যার সুজা-উদ-দৌলা ও দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলেন। এই যৌথবাহিনী ১৭৬৪ সালের অক্টোবরে বক্সারে কোম্পানির সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং পরাজিত হয়।
এলাহাবাদের চুক্তি (১৭৬৫)
- সুজা-উদ-দৌলা ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে অযোধ্যা ফিরে পান— কিন্তু কারা ও এলাহাবাদ দিল্লির সম্রাটের হাতে দেওয়া হয়।
- সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম একটি ফরমান জারি করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের আইনি অধিকার) ব্রিটিশ কোম্পানিকে প্রদান করেন।
- বিনিময়ে কোম্পানি সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
গুরুত্ব ও ইতিহাসের পরিবর্তন
দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি বৈধভাবে একটি বিশাল প্রদেশের রাজস্বের কর্তৃত্ব পেল। এর ফলে:
- দায়িত্বহীন অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দায়িত্বের (দ্বৈত শাসন) সূত্রপাত।
- ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর— কোম্পানি রাজস্ব আদায় বজায় রাখায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়।
- ভারতীয় সম্পদে ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব ত্বরান্বিত হয়।
- বাণিজ্যিক কোম্পানি এখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
4. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ও স্বত্ববিলোপ নীতি কী? এই দুই নীতি কীভাবে ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলির পতন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে সহায়তা করেছিল?
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) — লর্ড ওয়েলেসলি
শর্ত:
- দেশীয় রাজ্যকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার বহন করতে হবে।
- কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশির সাথে সম্পর্ক রাখা যাবে না।
- রাজ্যে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিযুক্ত থাকবেন— বাস্তবে তিনিই হবেন সর্বেসর্বা।
প্রভাব: হায়দরাবাদের নিজাম (১৭৯৮), অযোধ্যা (১৮০১) এই নীতি মেনে নেয়— তাদের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি কোম্পানির হাতে চলে যায়। মহীশূরের টিপু সুলতান এই নীতি প্রত্যাখ্যান করায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ও ১৭৯৯ সালে শহীদ হন।
স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) — লর্ড ডালহৌসি
নিয়ম: স্বাভাবিক ঔরসজাত পুত্র সন্তান না থাকলে দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার অগ্রাহ্য করে রাজ্যটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে।
প্রভাব: সাতারা (১৮৪৮), সম্বলপুর (১৮৫০), নাগপুর (১৮৫৪), ঝাঁসি (১৮৫৪) এই নীতিতে ব্রিটিশ দখলে আসে। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার নাকচ করায় তিনি ১৮৫৭-র বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।
উভয় নীতিই ছিল ভারতীয় দেশীয় স্বাধীনতার শেষকৃত্য। প্রথমটি সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে, দ্বিতীয়টি আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে দেশীয় রাজ্যগুলোকে গ্রাস করে নেয়।
5. মির কাশিম ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের কারণ ও ফলাফল কী ছিল? 'দ্বৈত শাসন' ও 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' সম্পর্কে আলোচনা করো।
মির কাশিম-ব্রিটিশ বিরোধের কারণ
- 'দস্তক'-এর অপব্যবহার: ব্রিটিশ বেসরকারি কর্মচারীরা দস্তকের আড়ালে সম্পূর্ণ শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছিল— বাংলার কোষাগার বিপর্যস্ত।
- সর্বজনীন শুল্ক নীতি: মির কাশিম দেশীয় বণিকদের উপর থেকেও সমস্ত শুল্ক তুলে দিয়ে সর্বজনীন সমতা ঘোষণা করেন— যা কোম্পানির বিশেষ সুবিধা খর্ব করে।
- কোম্পানির অনমনীয়তা: নবাবের বারবার নালিশ সত্ত্বেও কোম্পানি কর্মচারীদের অপব্যবহার বন্ধ করেনি।
ফলাফল
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মির কাশিম অযোধ্যায় পালান। কোম্পানি মির জাফরকে পুনরায় নবাব বসায়। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মির কাশিমের যৌথ বাহিনী চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে।
দ্বৈত শাসন (১৭৬৫-১৭৭২)
নবাবের হাতে রাজনৈতিক দায়িত্ব (নিজামত), কোম্পানির হাতে রাজস্ব আদায়ের অর্থনৈতিক ক্ষমতা (দেওয়ানি)— কোনো দায়িত্ব ছাড়া। ফল: শাসনহীন শোষণ।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)
শুষ্ক আবহাওয়া → ফসলহানি → কোম্পানির কঠোর রাজস্ব আদায় → মজুতদারি ও কালোবাজারি। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৃষক মারা যান। তথাপি কোম্পানি রাজস্ব আদায় বজায় রাখে।
6. রেসিডেন্ট ব্যবস্থা কী? কীভাবে এটি ভারতীয় দেশীয় শক্তিগুলির সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেছিল? মারাঠা, মহীশূর ও অযোধ্যার উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করো।
রেসিডেন্ট (Resident) ব্যবস্থা
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন দেশীয় রাজদরবারে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে 'রেসিডেন্ট' নিযুক্ত করত। প্রাথমিকভাবে এঁরা কোম্পানির স্বার্থ দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এঁদের হাতে রাজ্যের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। দেশীয় রাজারা নামেমাত্র শাসকে পরিণত হন।
উদাহরণ:
- অযোধ্যা: ১৮০১ সালে চুক্তির পর থেকে রেসিডেন্টই অযোধ্যার প্রকৃত শাসক হয়ে ওঠেন। নবাব সম্পূর্ণ করদ রাজায় পরিণত হন। ১৮৫৬ সালে 'কুশাসনের' অভিযোগ এনে কোম্পানি অযোধ্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে।
- মহীশূর: টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর মহীশূরেও রেসিডেন্ট বসানো হয় এবং রাজ্যটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে।
- মারাঠা: পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দরবারে রেসিডেন্ট নিযুক্ত ছিল। পেশোয়ার সাথে দ্বন্দ্ব বাঁধলে ১৮১৮ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে মারাঠা শক্তি চিরতরে ধ্বংস হয়।
ফলে রেসিডেন্ট ব্যবস্থা ছিল বাস্তবে দেশীয় সার্বভৌমত্বের সমাধি এবং ব্রিটিশ পরোক্ষ শাসনের মূল হাতিয়ার।
7. সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি সময়রেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করো। পলাশি ও বক্সার কোন্ অর্থে ভারত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
সময়রেখা: ১৭০৭ - ১৭৬৫
| সাল | ঘটনা |
| ১৭০৭ | সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু → মোগল সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন শুরু |
| ১৭১৭ | ফারুখশিয়ারের ফরমান → ব্রিটিশ কোম্পানি শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার পায় |
| ১৭১৭-২৭ | মুর্শিদকুলি খান বাংলার কার্যত স্বাধীন নবাব |
| ১৭২২ | সাদাৎ খান অযোধ্যায় স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা |
| ১৭২৪ | নিজাম-উল-মুলক হায়দরাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা |
| ১৭৩৮-৩৯ | নাদির শাহের পারসিক আক্রমণ → দিল্লি লুণ্ঠন |
| ১৭৪০ | আলিবর্দী খান বাংলার নবাব হন |
| ১৭৫৬ | সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা দখল → 'অন্ধকূপ হত্যা' বিতর্ক |
| ১৭৫৭ | পলাশির যুদ্ধ → ব্রিটিশ রাজনৈতিক আধিপত্যের সূচনা |
| ১৭৬৪ | বক্সারের যুদ্ধ → উত্তর ভারতেও কোম্পানির প্রভাব বিস্তার |
| ১৭৬৫ | এলাহাবাদের চুক্তি → দেওয়ানি লাভ |
ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন
পলাশি (১৭৫৭) 'বণিকের মানদণ্ড' কে 'রাজদণ্ডে' পরিণত করেছিল। বাংলার সম্পদ লুণ্ঠিত হয়ে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের পুঁজি জোগায়। বক্সার (১৭৬৪) প্রমাণ করে যে ভারতীয় রাজন্যবর্গের সম্মিলিত শক্তিও কোম্পানিকে রুখতে পারেনি। দেওয়ানি (১৭৬৫) কোম্পানিকে আইনি ভূমি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা দেয়— যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ভিত হয়ে দাঁড়ায়। এই তিনটি ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।
8. জগৎ শেঠ কাদের উপাধি? বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে জগৎ শেঠদের ভূমিকা কতটা ছিল? পলাশির যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁদের ভূমিকা পর্যালোচনা করো।
জগৎ শেঠ
জগৎ শেঠ কোনো একজন ব্যক্তির নাম নয়— এটি একটি নির্দিষ্ট বণিক পরিবারের বংশানুক্রমিক উপাধি ছিল। ফতেহচাঁদ নামক এক বণিক সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছ থেকে প্রথম 'জগৎ শেঠ' উপাধি লাভ করেন।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা
- জগৎ শেঠরা ছিলেন বাংলার সর্ববৃহৎ মহাজন ও মূলধন নিয়োগকারী।
- বাংলার নবাবের টাঁকশাল ও কোষাগার কার্যত তাঁদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণেই চলত।
- তাঁদের বিপুল ঋণদানের ক্ষমতার ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, নবাব— সকলেই তাঁদের মুখাপেক্ষী ছিল।
- মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারেও তাঁদের প্রভাব ছিল অপরিসীম।
পলাশির প্রেক্ষাপটে ভূমিকা
জগৎ শেঠের পরিবার সিরাজ-উদ-দৌলার বিরোধী ষড়যন্ত্রে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ কোম্পানিও সিরাজ-বিরোধী উদ্যোগে জগৎ শেঠদের নিজের দলে টানতে সচেষ্ট ছিল। মির জাফর নিঃসন্দেহে জগৎ শেঠদের পছন্দের ব্যক্তি ছিলেন। পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ কোম্পানি জগৎ শেঠদের সম্মতিতেই মির জাফরকে নবাব নির্বাচিত করে।
ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, জগৎ শেঠদের এই বণিক স্বার্থচালিত রাজনীতি বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করতে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিল।
মনে রেখো!
১৭০৭: ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু → আঞ্চলিক শক্তির উত্থান। মুর্শিদকুলি: বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। পলাশি (১৭৫৭): সিরাজের পরাজয়, মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা → পলাশির লুণ্ঠন। বক্সার (১৭৬৪): মির কাশিম+অযোধ্যা+দিল্লির সম্রাটের যৌথ পরাজয়। দেওয়ানি (১৭৬৫): বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার কোম্পানির হাতে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০): কোম্পানির শোষণে এক-তৃতীয়াংশ কৃষক মৃত। অধীনতামূলক মিত্রতা: ওয়েলেসলি | স্বত্ববিলোপ: ডালহৌসি।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড