আবহমান (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

প্রখ্যাত আধুনিক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'আবহমান' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 17 October 2025 Last Update: 23 April 2026

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত আধুনিক যুগের বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত 'আবহমান' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

শাশ্বত পল্লিপ্রকৃতি ও মানুষের নাড়ির টান: 'আবহমান' শব্দটির অর্থ হলো যা চিরকাল ধরে একই নিয়মে চলে আসছে বা শাশ্বত। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর 'আবহমান' কবিতায় পল্লিগ্রামের সঙ্গে মানুষের এক চিরন্তন ও নিবিড় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। মানুষ একসময় সভ্যতার আদিপর্বে গ্রামেই নিবিড় অনুরাগে তার প্রথম ঘর বেঁধেছিল। কিন্তু আজ মানুষ জীবিকার তাগিদে বা নাগরিক সভ্যতার আকর্ষণে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়। তবুও তার ফেলে আসা জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা কখনোই শেষ হয় না। গ্রামের সেই উঠান, লাউমাচা, সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ছোট্ট একটি ফুল তাকে বারবার নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনে।

প্রকৃতি ও স্মৃতির অবিনশ্বরতা: বাংলার লোককথায় আমরা শুনেছি 'আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুড়লো' অর্থাৎ গল্পের সমাপ্তি। কিন্তু কবির মতে মানুষের জীবনের গল্প আর তার শেকড়ের টান কখনও ফুরোয় না। তাই গ্রামের সেই চেনা 'নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না'—অর্থাৎ গ্রামীণ স্মৃতি ও ঐশ্বর্য প্রাচীন হলেও তা কখনোই শেষ বা নিঃশেষ হয়ে যায় না। মাতৃভূমির প্রতি মানুষের এই 'দুরন্ত পিপাসা' বা অদম্য টান চিরকালের।

প্রকৃতির চিরন্তন চক্র: মানুষের আশা-যাওয়া, শহরের বুকে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা এবং গ্রামের মাটির প্রতি তার একগুঁয়ে ভালোবাসা—সবকিছুই চিরকাল ধরে একই রকম রয়েছে। প্রকৃতির নিয়মও আবহমান। আজও প্রতিদিন একইভাবে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় ছায়া নামলে সান্ধ্য নদীর হাওয়া ছুটে আসে, আর গ্রামের বাগানে তেমনি করেই হাসতে থাকে স্নিগ্ধ কুন্দফুল। যুগ যুগ ধরে মানুষের এই ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা আর বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির এই শাশ্বত রূপই কবিতায় অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
আবহমানচির প্রচলিত / যা অতীত থেকে চিরকাল ধরে চলছেদুরন্ত পিপাসাতীব্র আকাঙ্ক্ষা / অদম্য ইচ্ছা
অনুরাগগভীর প্রেম বা ভালোবাসাএকগুঁয়েজেদি / নাছোড়বান্দা
নিবিড়গভীর / ঘনবাসিপুরোনো বা ম্লান হওয়া
মুড়য় নাশেষ হয় না / নিঃশেষ হয় নাকুন্দফুলএকপ্রকার সাদা সুগন্ধি ফুল
নটেগাছএকপ্রকার শাক বা লতাপাতা (লোককথার প্রতীক)সান্ধ্যসন্ধ্যাবেলা সম্বন্ধীয় বা সন্ধ্যার

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'আবহমান' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) জীবনানন্দ দাশ (খ) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (গ) সুভাষ মুখোপাধ্যায় (ঘ) শঙ্খ ঘোষ
উত্তর: (খ) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২. 'আবহমান' শব্দটির অর্থ কী?
(ক) যা চিরকাল ধরে চলছে (খ) আবহাওয়ার খবর (গ) যা শেষ হয়ে গেছে (ঘ) আকাশ
উত্তর: (ক) যা চিরকাল ধরে চলছে
৩. কবি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন?
(ক) নদীর ধারে (খ) শহরের রাস্তায় (গ) ওই উঠানে (ঘ) বাগানে
উত্তর: (গ) ওই উঠানে
৪. উঠানে কিসের পাশে দাঁড়াতে বলা হয়েছে?
(ক) তুলসীমঞ্চের (খ) কুয়োর (গ) লাউমাচাটার (ঘ) আমগাছের
উত্তর: (গ) লাউমাচাটার
৫. লাউমাচাটার পাশে কী দুলছে?
(ক) লাউ (খ) পাতা (গ) ছোট্ট একটা ফুল (ঘ) একটি পাখি
উত্তর: (গ) ছোট্ট একটা ফুল
৬. ছোট্ট ফুলটি কখন দুলছে?
(ক) সকালের বাতাসে (খ) দুপুরের রোদে (গ) সন্ধ্যার বাতাসে (ঘ) রাতের ঝড়ে
উত্তর: (গ) সন্ধ্যার বাতাসে
৭. মানুষ অনেক বছর আগে কোথায় ঘর বেঁধেছিল?
(ক) শহরে (খ) এইখানে বা জন্মভূমিতে (গ) প্রবাসে (ঘ) পাহাড়ে
উত্তর: (খ) এইখানে বা জন্মভূমিতে
৮. মানুষ কীভাবে ঘর বেঁধেছিল?
(ক) অনেক কষ্টে (খ) নিবিড় অনুরাগে (গ) অনিচ্ছায় (ঘ) দ্রুতবেগে
উত্তর: (খ) নিবিড় অনুরাগে
৯. কে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে?
(ক) পাখি (খ) নদী (গ) মানুষ (ঘ) ফুল
উত্তর: (গ) মানুষ
১০. ফিরে এসে মানুষ আবার কী ভালোবাসে?
(ক) শহরের জীবন (খ) এই মাটিকে ও এই হাওয়াকে (গ) অর্থ ও যশ (ঘ) শুধু ফুলকে
উত্তর: (খ) এই মাটিকে ও এই হাওয়াকে
১১. কোন্ গাছটি বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না?
(ক) বটগাছ (খ) লাউগাছ (গ) নটেগাছ (ঘ) শিমুল গাছ
উত্তর: (গ) নটেগাছ
১২. 'নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না' - এটি কীসের প্রতীক?
(ক) অবিনশ্বর গ্রাম্য স্মৃতির (খ) কৃষিকাজের (গ) রূপকথার (ঘ) দীর্ঘায়ু লাভের
উত্তর: (ক) অবিনশ্বর গ্রাম্য স্মৃতির
১৩. একগুঁয়েটার কী ফুরয় না?
(ক) কথা (খ) দুরন্ত পিপাসা (গ) যাওয়া-আসা (ঘ) খ ও গ উভয়ই
উত্তর: (ঘ) খ ও গ উভয়ই
১৪. সে সারাটা দিন আপন মনে কী মাখে?
(ক) ঘাসের গন্ধ (খ) কাদা (গ) সুগন্ধি (ঘ) ফুলের রেণু
উত্তর: (ক) ঘাসের গন্ধ
১৫. সে সারাটা রাত কোথায় স্বপ্ন এঁকে রাখে?
(ক) মেঘে (খ) তারায়-তারায় (গ) খাতায় (ঘ) চোখে
উত্তর: (খ) তারায়-তারায়
১৬. কী নেভে না?
(ক) আলো (খ) আগুন (গ) তার যন্ত্রণা (ঘ) তারা
উত্তর: (গ) তার যন্ত্রণা
১৭. কী বাসি হয় না?
(ক) ফুল (খ) দুঃখ (গ) খাবার (ঘ) আনন্দ
উত্তর: (খ) দুঃখ
১৮. বাগান থেকে কার হাসি হারায় না?
(ক) গোলাপের (খ) কুন্দফুলের (গ) বেলিফুলের (ঘ) শিশুর
উত্তর: (খ) কুন্দফুলের
১৯. তেমনি করেই কী ওঠে?
(ক) সূর্য (খ) চাঁদ (গ) হাওয়া (ঘ) মেঘ
উত্তর: (ক) সূর্য
২০. ছায়া নামলে কী ছুটে আসে?
(ক) অন্ধকার (খ) জোনাকি (গ) সান্ধ্য নদীর হাওয়া (ঘ) শেয়াল
উত্তর: (গ) সান্ধ্য নদীর হাওয়া

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'আবহমান' শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর: 'আবহমান' শব্দটির অর্থ হলো যা প্রাচীনকাল থেকে চিরকাল ধরে বা নিরবচ্ছিন্নভাবে একই নিয়মে চলে আসছে।
২. কবি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন?
উত্তর: কবি আধুনিক শহরের যান্ত্রিক জীবনে ক্লান্ত মানুষকে তার ফেলে আসা জন্মভূমির গ্রামীণ উঠোনে লাউমাচাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন।
৩. লাউমাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে কী দেখা যাবে?
উত্তর: গ্রামের উঠোনে লাউমাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে যে, সেখানে একটি ছোট্ট ফুল সন্ধ্যার শান্ত বাতাসে আপন মনে দুলছে।
৪. 'কে এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: আদিকালে মানুষ যখন প্রকৃতিকে ভালোবেসে তার কোলে প্রথম বসতি বা ঘর নির্মাণ করেছিল, মাতৃভূমির প্রতি সেই গভীর ভালোবাসাকেই 'নিবিড় অনুরাগ' বলা হয়েছে।
৫. 'হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে' - কে ফিরে আসে এবং কেন?
উত্তর: জীবিকা বা নাগরিক সভ্যতার আকর্ষণে যে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে হারিয়ে যায়, নাড়ির টানে বা শেকড়ের প্রতি ভালোবাসায় সেই মানুষই আবার তার জন্মভূমিতে ফিরে আসে।
৬. 'এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে' - বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: এর অর্থ হলো, শহুরে জীবনের কৃত্রিমতা মানুষকে তৃপ্তি দিতে পারে না, তাই সে তার ফেলে আসা গ্রামের সহজ-সরল মাটি ও প্রাকৃতিক হাওয়াকেই শেষ পর্যন্ত ভালোবাসে বা আপন করে নেয়।
৭. 'নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না!' - এই উক্তির তাৎপর্য কী?
উত্তর: বাংলার লোককথায় গল্প ফুরোলে নটেগাছ মুড়োয় (শেষ হয়)। কিন্তু কবির মতে, গ্রামের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতিরূপী নটেগাছ পুরোনো বা প্রাচীন হলেও তা কখনোই মানুষের মন থেকে ফুরিয়ে বা নিঃশেষ হয়ে যায় না।
৮. 'ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা' - কার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: যে মানুষ জন্মভূমি ছেড়ে শহরে চলে যায় এবং শহরের ক্লান্তি মেটাতে বারবার আবার মাতৃভূমির কোলে ফিরে আসে, সেই একগুঁয়ে মানুষের ঘরে ফেরার অনন্ত চক্রের কথাই বলা হয়েছে।
৯. 'ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা' - 'দুরন্ত পিপাসা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'দুরন্ত পিপাসা' বলতে জন্মভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শেকড়ের সান্নিধ্য লাভের জন্য মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অদম্য ও তৃপ্তিহীন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে।
১০. সারাটা দিন সে কী মাখে?
উত্তর: সে সারাটা দিন ধরে তার ফেলে আসা পল্লিপ্রকৃতির সতেজ ও স্নিগ্ধ ঘাসের গন্ধ আপন মনে নিজের গায়ে মাখে বা অনুভব করে।
১১. 'সারাটা রাত তারায়-তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে' - এর অর্থ কী?
উত্তর: সারারাত ধরে একাকী মানুষটি রাতের খোলা আকাশের অগণিত তারার দিকে তাকিয়ে তার মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার বা হারানো দিনগুলোর স্বপ্ন বুনতে থাকে।
১২. 'নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি' - কেন এমন বলা হয়েছে?
উত্তর: নিজের জন্মভূমি ছেড়ে প্রবাসে বা শহরে থাকার যে যন্ত্রণা এবং শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে দুঃখ, তা মানুষের মনে চিরকাল তাজা থাকে, কখনোই ম্লান বা বাসি হয় না।
১৩. 'হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি' - এর রূপক অর্থ কী?
উত্তর: কুন্দফুলের স্নিগ্ধ সাদা হাসি হলো গ্রামীণ প্রকৃতির সারল্য ও অকৃত্রিম সৌন্দর্যের প্রতীক। এই সৌন্দর্য যুগ যুগ ধরে একই রকম সতেজ থাকে, তা কখনো হারিয়ে যায় না।
১৪. 'তেমনি করেই সূর্য ওঠে' - কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের জীবনে যতই পরিবর্তন আসুক না কেন, প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয় না। প্রকৃতি আবহমানকাল ধরে একইভাবে সূর্যোদয়ের মাধ্যমে নতুন দিন নিয়ে আসে।
১৫. ছায়া নামলে কী ছুটে আসে?
উত্তর: সন্ধ্যার সময় যখন প্রকৃতিতে শান্ত ছায়া নেমে আসে, তখন তার সাথে সাথেই ছুটে আসে স্নিগ্ধ ও শীতল সান্ধ্য নদীর হাওয়া।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'আবহমান' কবিতায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পল্লিপ্রকৃতির প্রতি মানুষের যে চিরন্তন আকর্ষণের কথা তুলে ধরেছেন, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

উত্তর: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতাটি মাতৃভূমি তথা পল্লিপ্রকৃতির প্রতি মানুষের এক অচ্ছেদ্য ও নাড়ির টানের কবিতা।

প্রাচীনকালে মানুষ তার প্রথম ঘর বেঁধেছিল প্রকৃতির কোলেই। গভীর অনুরাগে সে আপন করেছিল গ্রামের মাটি ও হাওয়াকে। কিন্তু পরবর্তীতে আধুনিক সভ্যতার বিকাশে ও জীবিকার সন্ধানে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়। তবুও তার ফেলে আসা জন্মভূমির স্মৃতি সে কখনোই ভুলতে পারে না। কবি বলেছেন, সেই মানুষগুলো শহুরে জীবনে হারিয়ে গিয়েও আবার শেকড়ের টানে ফিরে আসে তাদের পুরনো উঠোনে, লাউমাচার পাশে, যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে ছোট্ট একটি ফুল দুলতে থাকে।
পল্লিগ্রামের এই শাশ্বত রূপ আর তার সাথে মানুষের আত্মার সম্পর্ক চিরকালের। শহরের ইট-কাঠের যান্ত্রিক জীবনে আবদ্ধ থাকলেও মানুষের মনে পল্লির সেই ঘাসের গন্ধ মাখার ও তারায় তারায় স্বপ্ন আঁকার 'দুরন্ত পিপাসা' বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়। মাতৃভূমি ছেড়ে আসার যন্ত্রণা তাদের মনে কখনও বাসি বা ম্লান হয় না। যুগের পর যুগ ধরে মানুষের এই ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং পল্লিপ্রকৃতির অপরিবর্তনীয় স্নিগ্ধ রূপকে কবি এক শাশ্বত বা আবহমান আকর্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

২. "নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না!" - পঙ্‌ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত 'আবহমান' কবিতা থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: গ্রামবাংলার একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রচলিত লোককথার প্রবাদ হলো— 'আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুড়লো'। সাধারণত রূপকথার গল্প শেষে বোঝানো হয় যে গল্পটি এবার সমাপ্ত হলো এবং নটেগাছটিও তার জীবনকাল শেষ করে শুকিয়ে গেল।
কিন্তু 'আবহমান' কবিতায় কবি এই প্রবাদটির এক বিপরীত এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রূপক ব্যবহার করেছেন। এখানে 'নটেগাছ' হলো মানুষের জন্মভূমির স্মৃতি, শেকড়ের প্রতি টান এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক। মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেলেও তার মনের মধ্যে সযত্নে লালিত জন্মভূমির স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। সময়ের নিয়মে মানুষ বৃদ্ধ হয়, নটেগাছটিরও বয়স বাড়ে বা তা 'বুড়িয়ে ওঠে', কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি সেই ভালোবাসা ও টান কখনোই 'মুড়য়' বা শেষ হয় না। গ্রামের সেই উঠোন, লাউমাচা আর সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের স্মৃতি আবহমানকাল ধরে মানুষের মনে চিরসবুজ হয়েই বিরাজ করে।

৩. "নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি" - এখানে কার যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে? কেন সেই দুঃখ বাসি হয় না?

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত অংশটি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

কার যন্ত্রণা: এখানে সেইসব একগুঁয়ে ও গ্রামপাগল মানুষের যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে, যারা জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম বা জন্মভূমি ছেড়ে শহরে বা প্রবাসে বসবাস করতে বাধ্য হয়।

দুঃখ বাসি না হওয়ার কারণ: মানুষ তার শেকড় বা জন্মভূমিকে গভীর অনুরাগে ভালোবাসে। যখন সে বাধ্য হয়ে সেই স্নিগ্ধ পল্লিপ্রকৃতি, গ্রামের উঠোন, লাউমাচা আর চেনা মাটি-হাওয়া ছেড়ে ইট-কাঠের কংক্রিটের শহরে বন্দি হয়, তখন তার মনের ভেতর এক গভীর একাকিত্ব ও শিকড় ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা কাজ করে। শহুরে জীবনের কোনো প্রাচুর্যই তার মনের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না। দিনের পর দিন পেরোলেও তার অন্তরে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সেই 'দুরন্ত পিপাসা' একই রকম তীব্র থাকে। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই মানসিক কষ্ট সময়ের সাথে সাথে ম্লান বা 'বাসি' হয় না; বরং তা তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে স্মৃতিতে চিরকাল সতেজ ও জীবন্ত হয়ে থাকে।

৪. "ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা" - এই যাওয়া-আসার মধ্যে দিয়ে কবি মানবজীবনের কোন্ সত্যকে তুলে ধরেছেন?

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

অন্তর্নিহিত সত্য: এই যাওয়া-আসার মধ্যে দিয়ে কবি মানবজীবনের শেকড়ের টান এবং বাস্তবতার দ্বন্দের এক শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেছেন। মানুষ একসময় পরম শান্তিতে প্রকৃতির কোলে গ্রামেই তার বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি এবং আধুনিক জীবনের চাহিদায় সে বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে 'যায়'। কিন্তু শহরে গিয়েও সে তার মাটিকে ভুলতে পারে না। গ্রামের সেই লাউমাচা, কুন্দফুলের হাসি আর ঘাসের গন্ধ তাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে।
ফলে শহুরে জীবনের কোলাহলে ক্লান্ত হয়ে শান্তির খোঁজে সে বারবার আবার তার নিজের জন্মভূমিতে ফিরে 'আসে'। জীবিকার জন্য তাকে যেমন শহরে যেতে হয়, ঠিক তেমনি আত্মার টানে তাকে আবার গ্রামে ফিরে আসতে হয়। মানুষের এই ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা ও 'দুরন্ত পিপাসা' কখনোই ফুরোয় না। যুগ যুগ ধরে গ্রাম ও শহরের মাঝে মানুষের এই নিরন্তর যাতায়াতের আবহমান চক্রটিকেই কবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

৫. 'আবহমান' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার মূল সুর ও অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা পরিস্ফুট হয়। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আলোচ্য কবিতাটির নাম 'আবহমান', যার আভিধানিক অর্থ হলো— যা অতীত থেকে চিরকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে একই নিয়মে চলে আসছে বা শাশ্বত।

কবিতাটিতে কবি পল্লিপ্রকৃতির চিরন্তন রূপ এবং তার প্রতি মানুষের শাশ্বত আকর্ষণের কথা বলেছেন। বহু বছর আগে মানুষ গ্রামেই তার ঘর বেঁধেছিল। আজ মানুষ জীবিকার তাগিদে শহরে চলে গেলেও তার সেই জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়নি। যুগ যুগ ধরে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যায়, আবার শেকড়ের টানে গ্রামে ফিরে আসে। তার এই দুরন্ত পিপাসা ও ফিরে আসার চক্র চিরকাল ধরে চলছে। অন্যদিকে প্রকৃতির নিয়মও আবহমান। একইভাবে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, ছায়া নামে, সান্ধ্য নদীর হাওয়া বয়, বাগানে কুন্দফুল ফোটে এবং উঠোনের পাশে ছোট্ট ফুলটি দুলতে থাকে। রূপকথার নটেগাছটি বুড়িয়ে গেলেও তার গল্প কখনোই ফুরোয় না। যেহেতু মানবমনের এই ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং গ্রামীণ প্রকৃতির এই শাশ্বত ও অবিনশ্বর রূপই কবিতার মূল উপজীব্য বিষয়, তাই বলা যায় 'আবহমান' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • সূর্যোদয় = সূর্য + উদয়
  • সন্ধ্যা = সম্ + ধ্যা
  • দুরন্ত = দুর্ + অন্ত
  • যন্ত্রণা = যম + ত্রণা
  • অনুরাগ = অনু + রাগ

সমাস নির্ণয়

  • লাউমাচা: লাউ লতা জড়ানোর মাচা (মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস)
  • নটেগাছ: নটে নামক গাছ (মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস)
  • কুন্দফুল: কুন্দ নামক ফুল (মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস)
  • সান্ধ্যনদী: সন্ধ্যার নদী (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • একগুঁয়ে: একদিকে গোঁ (জেদ) যার (বহুব্রীহি সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • হাওয়া ➜ হাওয়াই
  • যন্ত্রণা ➜ যন্ত্রণাদায়ক
  • ফুল ➜ ফুলেল
  • দিন ➜ দৈনিক
  • সন্ধ্যা ➜ সান্ধ্য

আবহমান কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি প্রখ্যাত আধুনিক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা। 'আবহমান' শব্দটির অর্থ হলো যা অতীত থেকে শুরু হয়ে চিরকাল ধরে বা নিরবচ্ছিন্নভাবে একই নিয়মে চলে আসছে।

এর অর্থ হলো, সময়ের সাথে সাথে মানুষের বয়স বাড়লেও মাতৃভূমি বা জন্মভূমির প্রতি তার মনের টান ও মধুর স্মৃতিগুলো কখনোই নিঃশেষ বা শেষ হয়ে যায় না।

কবি আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষকে তার শেকড়ের টানে জন্মভূমির সেই পুরনো উঠোনে, লাউমাচাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন।