চন্দ্রনাথ (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)

বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'চন্দ্রনাথ' গল্পের সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 17 October 2025 Last Update: 23 April 2026

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'চন্দ্রনাথ' গল্পের সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

চন্দ্রনাথের দীপ্ত রূপ ও স্মৃতিচারণা: সারকুলার রোডের সমাধিক্ষেত্র থেকে ফিরে কথক নরেশ (নরু) তাঁর সহপাঠী চন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করছিলেন। চন্দ্রনাথকে তিনি আকাশের মধ্যগগনচারী কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে তার নিজস্ব কক্ষে একাকী ও দৃপ্ত ভঙ্গিতে ছুটে চলেছে। ছোটবেলা থেকেই চন্দ্রনাথের চেহারা ছিল অসাধারণ। তার মোটা নাকের ডগা রাগে ফুলে উঠত এবং কপালে শিরার একটা ত্রিশূল-চিহ্ন ফুটে উঠত।

সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান ও আত্মমর্যাদা: স্কুলে পড়ার সময় চন্দ্রনাথ ছিল অসামান্য মেধাবী। কিন্তু একবার প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় সে সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করে। এর কারণ ছিল দুর্নীতি। স্কুলের সেক্রেটারির ভাইপো হীরু মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আগেভাগেই প্রশ্নপত্র জেনে নিয়েছিল এবং পরীক্ষার হলে চন্দ্রনাথের খাতা থেকে তিনটি অঙ্ক টুকে ফার্স্ট হয়েছিল। এই দুর্নীতির প্রতিবাদ করতেই চন্দ্রনাথ তার আত্মসম্মানবোধ বা 'ডিগনিটি' রক্ষার্থে সেকেন্ড প্রাইজ নিতে অস্বীকার করে।

দাদার সঙ্গে সংঘাত ও গৃহত্যাগ: চন্দ্রনাথের শান্ত প্রকৃতির দাদা নিশানাথবাবু এই খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ হন এবং চন্দ্রনাথকে হেডমাস্টারমহাশয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু আপসহীন চন্দ্রনাথ সরাসরি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করে। এতে রেগে গিয়ে দাদা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। চন্দ্রনাথও বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বাড়ি এবং স্কুলের মায়া ত্যাগ করে নিজের পথ বেছে নেয়।

হীরুর প্রীতিভোজন ও চন্দ্রনাথের প্রস্থান: পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলে দেখা যায় চন্দ্রনাথ ভালো ফল করতে পারেনি, আর দুর্নীতিপরায়ণ হীরু স্কলারশিপ পেয়েছে। স্কলারশিপ পেয়ে হীরু এক বিরাট প্রীতিভোজনের আয়োজন করে, যেখানে জেলার সব গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হন। কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চন্দ্রনাথ সেই উৎসবে যোগ দেয় না। সে হীরুকে একটি চিঠি লিখে উৎসবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং সেই রাতেই কাঁধে লাঠির প্রান্তে পোঁটলা বেঁধে একা গ্রাম ছেড়ে চিরকালের জন্য অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
মধ্যগগনচারীমাঝ-আকাশে বিচরণকারীভীমকায়ভয়ংকর বা বিশাল শরীর
কালপুরুষআকাশের একটি নক্ষত্রমণ্ডল (Orion)ডিগনিটিমর্যাদা / আত্মসম্মান (Dignity)
কুক্ষিগতআয়ত্ত বা বশীভূতপ্রদীপ্তঅত্যন্ত উজ্জ্বল / দীপ্তিমান
তমসা-পারাবারঅন্ধকার রূপ সমুদ্রত্রিশূল-চিহ্নত্রিশূলের আকারের শিরা
আত্মসংবরণনিজেকে সংযত করা / রাগ সামলানোগুরুদক্ষিণাগুরুর প্রাপ্য দক্ষিণা বা ফি
প্রীতিভোজনআনন্দ উৎসব উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়াশৌখিনবিলাসী বা সাজগোজ প্রিয়
নির্জনজনশূন্য / যেখানে কেউ নেইআঙ্কিক নিয়মঅঙ্কের বা গণিতের নিয়ম

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'চন্দ্রনাথ' গল্পটির রচয়িতা কে?
(ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (খ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (গ) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (ঘ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
২. কথক নরেশ কোথা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন?
(ক) স্কুল থেকে (খ) মামার বাড়ি থেকে (গ) সারকুলার রোডের সমাধিক্ষেত্র থেকে (ঘ) হীরুর বাড়ি থেকে
উত্তর: (গ) সারকুলার রোডের সমাধিক্ষেত্র থেকে
৩. চন্দ্রনাথকে আকাশের কোন্ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
(ক) সপ্তর্ষিমণ্ডল (খ) কালপুরুষ (গ) ধ্রুবতারা (ঘ) শুকতারা
উত্তর: (খ) কালপুরুষ
৪. চন্দ্রনাথের দাদার নাম কী?
(ক) অমরনাথ (খ) বিশ্বনাথ (গ) সোমনাথ (ঘ) নিশানাথবাবু
উত্তর: (ঘ) নিশানাথবাবু
৫. রেগে গেলে চন্দ্রনাথের কপালে কীসের চিহ্ন ফুটে উঠত?
(ক) ত্রিশূল-চিহ্ন (খ) সাপের চিহ্ন (গ) চাঁদের চিহ্ন (ঘ) খড়্গের চিহ্ন
উত্তর: (ক) ত্রিশূল-চিহ্ন
৬. চন্দ্রনাথ কী প্রত্যাখ্যান করেছিল?
(ক) ফার্স্ট প্রাইজ (খ) সেকেন্ড প্রাইজ (গ) স্কলারশিপ (ঘ) মেডেল
উত্তর: (খ) সেকেন্ড প্রাইজ
৭. চন্দ্রনাথের সেকেন্ড প্রাইজ না নেওয়ার কারণ কী ছিল?
(ক) তার টাকার প্রয়োজন ছিল না (খ) সে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছিল (গ) প্রাইজ নেওয়াটা তার ডিগনিটির পরিপন্থী ছিল (ঘ) সে ফার্স্ট প্রাইজ চেয়েছিল
উত্তর: (গ) প্রাইজ নেওয়াটা তার ডিগনিটির পরিপন্থী ছিল
৮. স্কুলের ফার্স্ট হওয়া ছাত্র হীরুর কাকা কে ছিলেন?
(ক) হেডমাস্টার (খ) দারোগা (গ) স্কুলের সেক্রেটারি (ঘ) সাব-রেজিস্ট্রার
উত্তর: (গ) স্কুলের সেক্রেটারি
৯. হেডমাস্টারমহাশয় নরুকে কার কাছে পাঠিয়েছিলেন?
(ক) চন্দ্রনাথের কাছে (খ) হীরুর কাছে (গ) নিশানাথবাবুর কাছে (ঘ) সেক্রেটারির কাছে
উত্তর: (ক) চন্দ্রনাথের কাছে
১০. নরু চন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে কী প্রশ্ন করেছিল?
(ক) কী খাচ্ছিস? (খ) কী পড়ছিস? (গ) কী লিখছিস? (ঘ) কোথায় যাচ্ছিস?
উত্তর: (গ) কী লিখছিস?
১১. "দিস ইজ ম্যাথম্যাটিক্স।" - কে বলেছিল?
(ক) নরু (খ) হেডমাস্টার (গ) চন্দ্রনাথ (ঘ) নিশানাথবাবু
উত্তর: (গ) চন্দ্রনাথ
১২. চন্দ্রনাথের দাদা তাকে কী করতে বলেছিলেন?
(ক) স্কুল ছাড়তে (খ) ক্ষমা চেয়ে হেডমাস্টারকে পত্র লিখতে (গ) প্রাইজ নিতে (ঘ) বাড়ি ছেড়ে যেতে
উত্তর: (খ) ক্ষমা চেয়ে হেডমাস্টারকে পত্র লিখতে
১৩. চন্দ্রনাথ অঙ্কের পরীক্ষার দিন হীরুকে তার খাতা থেকে কটি অঙ্ক টুকতে দিয়েছিল?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) পাঁচটি
উত্তর: (খ) তিনটি
১৪. দাদা চন্দ্রনাথকে ত্যাগ করার পর সম্পত্তির কী হলো?
(ক) বিক্রি হয়ে গেল (খ) দান করে দেওয়া হলো (গ) ভাগ হয়ে গেল (ঘ) পুরোটাই দাদা পেলেন
উত্তর: (গ) ভাগ হয়ে গেল
১৫. "গুরুদক্ষিণার যুগ আর নেই।" - এ কথা কে বলেছিল?
(ক) হেডমাস্টার (খ) চন্দ্রনাথ (গ) নরু (ঘ) হীরু
উত্তর: (খ) চন্দ্রনাথ
১৬. ইউনিভার্সিটি এগজামিনের পর স্কলারশিপ কে পেয়েছিল?
(ক) চন্দ্রনাথ (খ) নরু (গ) শ্যামা (ঘ) হীরু
উত্তর: (ঘ) হীরু
১৭. স্কলারশিপ পাওয়ার পর হীরু কী আয়োজন করেছিল?
(ক) গানের আসর (খ) প্রীতিভোজন (গ) পুজো (ঘ) যাত্রা
উত্তর: (খ) প্রীতিভোজন
১৮. হীরু ভবিষ্যতে কী হতে চেয়েছিল?
(ক) ডাক্তার (খ) উকিল (গ) আই. সি. এস. (ঘ) শিক্ষক
উত্তর: (গ) আই. সি. এস.
১৯. "Shame in crowd but solitary pride হওয়াই উচিত ও বস্তু।" - কে বলেছিলেন?
(ক) হেডমাস্টারমহাশয় (খ) নিশানাথবাবু (গ) চন্দ্রনাথ (ঘ) নরু
উত্তর: (ক) হেডমাস্টারমহাশয়
২০. চন্দ্রনাথ তার চিঠিতে প্রথমে 'প্রিয়বরেষু' লিখে কেটে দিয়ে কী লিখেছিল?
(ক) বন্ধুবরেষু (খ) প্রীতিভাজনেষু (গ) সুজনেষু (ঘ) মহাশয়
উত্তর: (খ) প্রীতিভাজনেষু

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. কথক কোথা থেকে ফিরে চন্দ্রনাথের কথা ভাবছিলেন?
উত্তর: কথক নরেশ সারকুলার রোডের সমাধিক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে তাঁর পুরোনো সহপাঠী চন্দ্রনাথের কথা ভাবছিলেন।
২. চন্দ্রনাথকে কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কেন?
উত্তর: কালপুরুষ নক্ষত্র যেমন খড়্গ হাতে একাকী, দৃপ্ত ও নির্ভীকভাবে আকাশের বুকে বিচরণ করে, চন্দ্রনাথও তেমনি আপসহীন ও নির্ভীকভাবে একাকী নিজের জীবনের পথে এগিয়ে চলেছিল। তাই এই তুলনা।
৩. কিশোর চন্দ্রনাথের মুখাকৃতির বিশেষত্ব কী ছিল?
উত্তর: কিশোর চন্দ্রনাথের নাক ছিল অদ্ভুত মোটা। সে সামান্য রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলেই তার নাকের ডগা ফুলে উঠত এবং চওড়া কপালে শিরার একটা ত্রিশূল-চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠত।
৪. হেডমাস্টারমহাশয় নরুকে চন্দ্রনাথের কাছে কেন পাঠিয়েছিলেন?
উত্তর: প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় চন্দ্রনাথ সেকেন্ড প্রাইজ নেবে না বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই দুঃসাহসিক কাজের কারণ জানতেই হেডমাস্টারমহাশয় নরুকে চন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
৫. নরু যখন চন্দ্রনাথের কাছে গেল, তখন সে কী করছিল?
উত্তর: নরু যখন চন্দ্রনাথের কাছে গেল, তখন সে তার দারিদ্র্য-জীর্ণ ঘরের মধ্যে বসে আপন মনে ইউনিভার্সিটি এগজামিনের সম্ভাব্য রেজাল্টের হিসাব বা নম্বর তৈরি করছিল।
৬. চন্দ্রনাথ কেন সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল?
উত্তর: স্কুলের ফার্স্ট হওয়া ছাত্র হীরু মাস্টারমশাইয়ের সাহায্যে আগে থেকেই প্রশ্ন জেনে নিয়ে এবং পরীক্ষার হলে চন্দ্রনাথের খাতা থেকে টুকে ফার্স্ট হয়েছিল। এই দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানো নিজের মর্যাদাহানিকর (বিনিথ মাই ডিগনিটি) মনে করেই চন্দ্রনাথ সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল।
৭. নিশানাথবাবু চন্দ্রনাথকে কী করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: চন্দ্রনাথের দাদা নিশানাথবাবু তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সে যেন সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করার ঔদ্ধত্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে হেডমাস্টারমহাশয়কে একটি পত্র লেখে।
৮. দাদার কথার অবাধ্য হওয়ায় চন্দ্রনাথের কী পরিণতি হয়েছিল?
উত্তর: চন্দ্রনাথ দাদার কথা মতো ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করায় তার দাদা নিশানাথবাবু রেগে গিয়ে তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং তাদের সামান্য পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করে তারা পৃথক হয়ে যায়।
৯. 'গুরুদক্ষিণার যুগ আর নেই।' - চন্দ্রনাথ কেন একথা বলেছিল?
উত্তর: হেডমাস্টারমহাশয় যখন চন্দ্রনাথকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তখন সে স্কুল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির প্রতি চরম ক্ষোভ ও বিদ্রুপ প্রকাশ করে জানিয়েছিল যে স্কুলের সঙ্গে তার আর্থিক দেনা-পাওনা মিটে গেছে, তাই শুধু শ্রদ্ধার খাতিরে সে আর স্কুলে যাবে না।
১০. হীরুর চিঠিতে কথক কী খবর পেয়েছিলেন?
উত্তর: হীরুর চিঠিতে কথক খবর পেয়েছিলেন যে, চন্দ্রনাথের হিসাব মতোই তিনি নিজে থার্ড ডিভিশনে পাশ করেছেন, কিন্তু চন্দ্রনাথ আশানুরূপ ফল করতে পারেনি এবং দুর্নীতিপরায়ণ হীরু স্কলারশিপ পেয়েছে।
১১. হীরুর বাড়িতে কিসের সমারোহ ছিল? কারা এসেছিলেন?
উত্তর: স্কলারশিপ পাওয়ার আনন্দে হীরুর বাড়িতে এক বিরাট প্রীতিভোজনের সমারোহ ছিল। সেখানে জেলার ডেপুটি, ডি.এস.পি., দারোগা এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছিলেন।
১২. মাস্টারমহাশয় হীরুর বাড়িতে এসে নরেশকে সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে কী উপদেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: মাস্টারমহাশয় নরেশকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে পড়ার সময় সাহিত্যচর্চা একটু কম করতে, কিন্তু একেবারে না ছাড়তে। তিনি বলেছিলেন সাহিত্য হলো 'Shame in crowd but solitary pride' (ভিড়ের মধ্যে লজ্জা, কিন্তু একাকিত্বের গর্ব)।
১৩. চন্দ্রনাথ হীরুকে লেখা চিঠিতে 'প্রিয়বরেষু' কেটে 'প্রীতিভাজনেষু' লিখেছিল কেন?
উত্তর: চন্দ্রনাথ নীতিগত কারণে হীরুর দুর্নীতির বিরোধী ছিল, তাই হীরুকে সে আর অন্তরঙ্গ বন্ধু (প্রিয়) বলে মেনে নিতে পারছিল না। এই দূরত্বের কারণেই সে সম্বোধন পরিবর্তন করেছিল।
১৪. চন্দ্রনাথ তার চিঠিতে হীরুকে কী বলেছিল?
উত্তর: চন্দ্রনাথ চিঠিতে হীরুর স্কলারশিপের জন্য তাকে অভিনন্দন জানালেও, শেষে খোঁচা দিয়ে লিখেছিল যে স্কলারশিপ এমন কিছু বড়ো ব্যাপার নয় যার জন্য এত ঘটা করে প্রীতিভোজনের উৎসব করতে হবে।
১৫. চন্দ্রনাথ কীভাবে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল?
উত্তর: আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চন্দ্রনাথ এক রাতে কাঁধে লাঠির প্রান্তে একটি ছোট্ট পোঁটলা বেঁধে, কাউকে কিছু না জানিয়ে একা সেই জনহীন পথ দিয়ে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চিরকালের জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'চন্দ্রনাথ' গল্প অবলম্বনে চন্দ্রনাথ চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'চন্দ্রনাথ' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো চন্দ্রনাথ। তার চরিত্রে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ও বলিষ্ঠ দিক ফুটে উঠেছে:

আত্মমর্যাদাবোধ ও আপসহীনতা: চন্দ্রনাথ চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো দিক হলো তার অটল আত্মমর্যাদাবোধ। সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও স্কুলের সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ সে জানত ফার্স্ট হওয়া ছাত্র হীরু মাস্টারমশাইয়ের সহায়তায় দুর্নীতি করে প্রথম হয়েছে। এই দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানোকে সে নিজের 'ডিগনিটি' বা মর্যাদার হানিকর বলে মনে করেছিল।
নির্ভীকতা ও স্পষ্টবাদিতা: চন্দ্রনাথ কাউকে ভয় পেত না। সে হেডমাস্টারমহাশয় এবং নিজের দাদা নিশানাথবাবুর মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। দাদা যখন তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন, তখন সে দাদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও পিছপা হয়নি।
আত্মবিশ্বাস ও একাকিত্ব: চন্দ্রনাথ ছিল প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। সে তার নিজের এবং সহপাঠীদের পরীক্ষার ফলাফল আগেভাগেই নিখুঁতভাবে হিসেব করে রেখেছিল। সব শেষে, হীরুর প্রীতিভোজনে যোগ না দিয়ে সে একাকী লাঠির ডগায় পোঁটলা বেঁধে অজানার উদ্দেশ্যে গ্রাম ছাড়ে। তার এই একাকী ও দৃপ্ত পথচলাই তাকে কালপুরুষ নক্ষত্রের মতো এক অনন্য ও মহৎ চরিত্রে পরিণত করেছে।

২. "কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে চন্দ্রনাথের তুলনা করিয়া আমার আনন্দ হয়।" - কালপুরুষ নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য কী? তার সঙ্গে চন্দ্রনাথের চরিত্রের কী সাদৃশ্য কথক খুঁজে পেয়েছেন?

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'চন্দ্রনাথ' গল্প থেকে গৃহীত।

কালপুরুষের বৈশিষ্ট্য: রাতের আকাশে কালপুরুষ (Orion) নক্ষত্রমণ্ডলকে দেখলে মনে হয় যেন এক ভীমকায় ও খড়্গধারী এক বীর পুরুষ মধ্যগগনে আপন মনে বিচরণ করছে। তার এই দীপ্তিমান, একাকী এবং দৃপ্ত ভঙ্গি আকাশজুড়ে এক রাজকীয় আভা বিস্তার করে।

সাদৃশ্য ও তাৎপর্য: কথক নরেশ তাঁর সহপাঠী চন্দ্রনাথের মধ্যে এই কালপুরুষ নক্ষত্রের ছায়াই দেখতে পেয়েছেন। চন্দ্রনাথের চেহারাও ছিল বেশ সবল ও দৃপ্ত এবং কপালে শিরার ত্রিশূল-চিহ্ন তাকে এক অসামান্য গাম্ভীর্য দান করত। কালপুরুষ যেমন আকাশের নিজস্ব কক্ষপথে একাকী ও নির্ভীকভাবে হেঁটে চলে, চন্দ্রনাথও তেমনি তার জীবনের আদর্শ ও আত্মমর্যাদার পথে একাই হেঁটেছে। দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে সে স্কুল, দাদা এবং সমাজের সমস্ত পিছুটানকে নিমেষে ত্যাগ করেছে। পিছনের দিকে ফিরে তাকানোর বা বিশ্রাম নেওয়ার কোনো দুর্বলতা তার ছিল না। কালপুরুষের এই ভয়ংকর, একাকী ও আপসহীন রূপের সঙ্গে চন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের এই হুবহু মিল দেখেই কথক অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন।

৩. চন্দ্রনাথ কেন সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং এর পরিণতি কী হয়েছিল তা গল্প অবলম্বনে লেখো।

উত্তর: প্রত্যাখ্যানের কারণ: তারাশঙ্করের 'চন্দ্রনাথ' গল্পে চন্দ্রনাথ ছিল অসামান্য মেধাবী ছাত্র এবং সে কখনোই সেকেন্ড হয়নি। কিন্তু একবার প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় সে জানতে পারে যে, স্কুলের সেক্রেটারির ভাইপো হীরু ফার্স্ট হয়েছে। এর পেছনে ছিল চরম দুর্নীতি। একজন প্রাইভেট মাস্টার (যিনি স্কুলের শিক্ষকও ছিলেন) হীরুকে আগে থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দিয়েছিলেন এবং পরীক্ষার হলে চন্দ্রনাথের খাতা থেকেও হীরু তিনটি অঙ্ক টুকেছিল। এই চরম অন্যায় ও দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানো এবং সেকেন্ড প্রাইজ গ্রহণ করাকে চন্দ্রনাথ নিজের 'বিনিথ মাই ডিগনিটি' বা আত্মমর্যাদার পরিপন্থী বলে মনে করেছিল। তাই সে একটি চিঠি দিয়ে প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করে।

পরিণতি: চন্দ্রনাথের এই স্পর্ধাপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রবল ক্ষুব্ধ হয়। তার দাদা নিশানাথবাবু তাকে জোরাজুরি করেন হেডমাস্টারের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি পত্র লিখতে। কিন্তু চন্দ্রনাথ নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং ক্ষমা চাইতে স্পষ্ট অস্বীকার করে। এর ফলে তার দাদা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং চন্দ্রনাথের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তাদের সামান্য পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া হয়। চন্দ্রনাথও বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে স্কুল এবং বাড়ি উভয়ের মায়া ত্যাগ করে নিজের একাকী পথ বেছে নেয়।

৪. "স্কলারশিপটা কী এমন বড়ো জিনিস!" - উক্তিটির বক্তা কে? সে কাকে, কোন্ পরিস্থিতিতে এ কথা লিখেছিল? এর মধ্য দিয়ে বক্তার কোন্ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলো তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের প্রধান চরিত্র চন্দ্রনাথ।

প্রসঙ্গ ও পরিস্থিতি: ইউনিভার্সিটি এগজামিনের পর দেখা যায় যে, চন্দ্রনাথ ভালো ফল করতে পারেনি এবং স্কুলের সেক্রেটারি কাকার প্রভাবে ও মাস্টারমশাইয়ের সহায়তায় দুর্নীতিপরায়ণ হীরু স্কলারশিপ পেয়েছে। এই স্কলারশিপ পাওয়ার আনন্দে হীরু এক বিরাট প্রীতিভোজনের আয়োজন করে, যেখানে চন্দ্রনাথকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চন্দ্রনাথ সেই নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে গ্রাম ছেড়ে চলে যায় এবং যাওয়ার আগে হীরুর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি রেখে যায়। সেই চিঠিতেই সে এই মন্তব্যটি করেছিল।

মনোভাবের প্রকাশ: এই উক্তির মধ্য দিয়ে চন্দ্রনাথের প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, সততা এবং হীরুর দুর্নীতির প্রতি এক প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ প্রকাশ পেয়েছে। চন্দ্রনাথ জানত যে হীরুর এই সাফল্য সততার ফসল নয়, বরং দুর্নীতির দান। তাই দুর্নীতি করে পাওয়া একটি সামান্য স্কলারশিপের জন্য এত বড়ো উৎসব ও জাঁকজমক করাটা চন্দ্রনাথের কাছে অত্যন্ত হাস্যকর ও অর্থহীন মনে হয়েছিল। এর মাধ্যমে সমাজের এই মেকি আড়ম্বর ও দুর্নীতির প্রতি চন্দ্রনাথের তীব্র ঘৃণা মূর্ত হয়ে উঠেছে।

৫. 'চন্দ্রনাথ' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ নামকরণের মধ্য দিয়েই রচনার মূল ভাববস্তু ও কেন্দ্রীয় চরিত্রের স্বরূপ পাঠকের কাছে উন্মোচিত হয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচ্য গল্পটির নাম রাখা হয়েছে 'চন্দ্রনাথ'।

সমগ্র গল্পটি আবর্তিত হয়েছে চন্দ্রনাথ নামক এক কিশোরের আপসহীন, আদর্শবাদী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জীবনকে কেন্দ্র করে। গল্পের শুরুতেই কথক সারকুলার রোডের সমাধিক্ষেত্র থেকে ফিরে চন্দ্রনাথের কথাই ভাবছিলেন। চন্দ্রনাথের শারীরিক গঠন, কপালের ত্রিশূল-চিহ্ন এবং কালপুরুষ নক্ষত্রের মতো একাকী ও দৃপ্ত ভঙ্গি শুরুতেই পাঠককে আকর্ষণ করে।
স্কুলের দুর্নীতির প্রতিবাদে তার সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান, দাদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং সবশেষে হীরুর মেকি উৎসবকে অবজ্ঞা করে একাকী অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া—এই প্রতিটি ঘটনাই চন্দ্রনাথ চরিত্রের বলিষ্ঠতা ও মহত্ত্বকে প্রমাণ করে। গল্পে কথক বা হীরু উপস্থিত থাকলেও তারা কেবলমাত্র চন্দ্রনাথের চরিত্রের মাহাত্ম্যকে তুলে ধরার অনুষঙ্গ মাত্র। যেহেতু গল্পের আদ্যন্ত চন্দ্রনাথের আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের আলোকেই উদ্ভাসিত, তাই বলা যায় 'চন্দ্রনাথ' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও অত্যন্ত যুক্তিসংগত হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • অতীত = অতি + ইত
  • নির্জন = নিঃ + জন
  • আবিষ্কার = আবিঃ + কার
  • ইত্যাদি = ইতি + আদি
  • প্রীতিভোজন = প্রীতি + ভোজন (সমাসবদ্ধ পদরূপেও গণ্য)

সমাস নির্ণয়

  • কালপুরুষ: কাল (ভয়ংকর) যে পুরুষ (কর্মধারয় সমাস)
  • মধ্যগগনচারী: মধ্যগগনে চরে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • গুরুদক্ষিণা: গুরুকে প্রদত্ত দক্ষিণা (নিমিত্ত তৎপুরুষ / মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)
  • আত্মসংবরণ: আত্মকে সংবরণ (দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস)
  • প্রীতিভোজন: প্রীতির নিমিত্ত ভোজন (নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • দীপ্তি ➜ দীপ্ত
  • শরীর ➜ শারীরিক
  • দিন ➜ দৈনিক
  • মুখ ➜ মৌখিক
  • বিস্ময় ➜ বিস্মিত

চন্দ্রনাথ গল্প সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

গল্পটি বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা। গল্পের মূল চরিত্র হলো চন্দ্রনাথ, যে তার অদম্য আত্মমর্যাদাবোধ এবং আপসহীন মানসিকতার জন্য পাঠকের মনে দাগ কেটে যায়।

কথক চন্দ্রনাথকে কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ কালপুরুষ যেমন খড়্গ হাতে আকাশে একাকী ও দৃপ্ত ভঙ্গিতে বিচরণ করে, চন্দ্রনাথও তেমনি নির্ভীকভাবে নিজের আদর্শের পথে একা হেঁটেছিল।

স্কুলের ফার্স্ট হওয়া ছাত্র হীরু মাস্টারমশাইয়ের সহায়তায় প্রশ্ন জেনে এবং চন্দ্রনাথের খাতা টুকে দুর্নীতি করে প্রথম হয়েছিল। এই দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানো নিজের আত্মসম্মানের বিরোধী মনে করেই চন্দ্রনাথ সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল।