পথে প্রবাসে (অন্নদাশংকর রায়)

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'পথে প্রবাসে' ভ্রমণকাহিনির সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 17 October 2025 Last Update: 23 April 2026

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় রচিত 'পথে প্রবাসে' ভ্রমণকাহিনির সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. রচনার বিষয়সংক্ষেপ

ভারতবর্ষ ত্যাগ ও সমুদ্রযাত্রা: লেখক অন্নদাশংকর রায় বম্বে বন্দর থেকে জাহাজে করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে তাঁর ভ্রমণ শুরু করেন। জাহাজ ছাড়ার সময় তাঁর মনে হয় যেন মাতৃভূমির সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান ছিন্ন হলো। আরব সাগরে তখন বর্ষাকাল (মনসুন)। সাগরের প্রবল ঢেউয়ে জাহাজটি ফুটন্ত তেলে পাঁপর ভাজার মতো দুলতে থাকে। ফলে অধিকাংশ যাত্রী মারাত্মক 'সমুদ্রপীড়া' বা সি-সিকনেসে (Sea-sickness) ভোগেন। তিন দিন ধরে বমি আর উপবাসে কাতর যাত্রীদের মনে হয় যেন মরণ হলেই বাঁচি।

লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল: আরব সাগর পেরিয়ে লোহিত সাগরে পড়তেই সমুদ্র শান্ত হয়ে যায় এবং যাত্রীদের সমুদ্রপীড়া কমে যায়। জাহাজটিকে তখন একটি ভাসমান পান্থশালার মতো মনে হয়। এরপর আসে বিশ্ববিখ্যাত 'সুয়েজ খাল'—যা আফ্রিকা ও এশিয়াকে আলাদা করলেও ভারত ও ইউরোপের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছে। ফরাসি স্থপতি 'লেসেস্' (Lesseps)-এর এই অসামান্য জ্যামিতিক ও স্থাপত্যকীর্তি দেখে লেখক মুগ্ধ হন। খালের দুধারের পাহাড়গুলিকে তাঁর কিউবিস্টদের (Cubist) শিল্পের মতো মনে হয়।

পোর্ট সৈয়দ ও ভূমধ্যসাগর: সুয়েজ খালের শেষে ভূমধ্যসাগরের মুখে অবস্থিত 'পোর্ট সৈয়দ' শহরে নেমে লেখক ফরাসি সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করেন। ইউরোপের কাছাকাছি থাকায় মিশরের অধিবাসীদের মধ্যে স্বাধীন ও ভয়হীন এক আধুনিক মনোভাব দেখা যায়। এরপর জাহাজ ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে। প্রথমে শান্ত থাকলেও পরে তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। যাত্রাপথে মেসিনা প্রণালী এবং স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরি (যাকে লেখক 'রাবণের চিতা' বলেছেন) দেখা যায়।

মার্সেল্স বন্দর ও গন্তব্য: পরিশেষে জাহাজ ফরাসি বন্দর শহর 'মার্সেল্স'-এ পৌঁছায়। এটি ভূমধ্যসাগরের সেরা বন্দর এবং ফরাসি জাতীয় সংগীত 'La Marseillaise'-এর জন্মস্থান। পাহাড় কেটে তৈরি এই শহরের রাস্তাঘাট এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লেখককে মুগ্ধ করে। সেখান থেকে ট্রেনে প্যারিস, ক্যালে, ডোভার হয়ে অবশেষে লেখক লন্ডনে পৌঁছান।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
কক্ষচ্যুতনিজের পথ বা কক্ষপথ থেকে বিচ্যুতগোষ্পদগোরুর পায়ের খুরের গর্ত / খুব ছোটো ডোবা
প্রভঞ্জনাহুতিপ্রবল ঝড়ে আহুতি বা সমর্পণসমুদ্রপীড়াজাহাজে ভ্রমণের সময় মাথা ঘোরা বা বমি (Sea-sickness)
পান্থশালাপথিকদের থাকার জায়গা / হোটেলযোজকদুটি ভূখণ্ডকে যুক্তকারী সংকীর্ণ অংশ (Isthmus)
স্থপতিযিনি ইমারত বা বড়ো কাঠামো তৈরি করেনকিউবিস্টজ্যামিতিক আকার ব্যবহারকারী এক বিশেষ শ্রেণির চিত্রশিল্পী
মোসাফেরভ্রমণকারী / পথিক / পর্যটকসহজিয়া কবিমধ্যযুগের ফরাসি চারণকবি বা গায়ক (Troubadour)
রসাতলপাতাল / মাটির গভীর তলদেশঅপরিচয়পরিচয় না থাকা / অজানা

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'পথে প্রবাসে' রচনার লেখক কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (গ) অন্নদাশংকর রায় (ঘ) শিবরাম চক্রবর্তী
উত্তর: (গ) অন্নদাশংকর রায়
২. লেখক কোথা থেকে জাহাজে উঠেছিলেন?
(ক) কলকাতা (খ) মাদ্রাজ (গ) বম্বে (ঘ) করাচি
উত্তর: (গ) বম্বে
৩. মানচিত্রে ভারতবর্ষকে গোষ্পদের মতো দেখাত কোথায়?
(ক) আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের মাঝে (খ) ভারতবর্ষ ও আফ্রিকার মাঝখানে (গ) এশিয়া ও ইউরোপের মাঝে (ঘ) মিশর ও আরবের মাঝে
উত্তর: (খ) ভারতবর্ষ ও আফ্রিকার মাঝখানে
৪. লেখকের সমুদ্রযাত্রার সময় কোন্ ঋতু ছিল?
(ক) গ্রীষ্ম (খ) শীত (গ) বর্ষা (ঘ) শরৎ
উত্তর: (গ) বর্ষা
৫. আরব সাগরে জাহাজটি কিসের মতো উল্টে পাল্টে ভাজছিল?
(ক) শুকনো পাতার মতো (খ) ফুটন্ত তেলে পাঁপরের মতো (গ) কাগজের নৌকার মতো (ঘ) খেলনার মতো
উত্তর: (খ) ফুটন্ত তেলে পাঁপরের মতো
৬. সমুদ্রপীড়ায় প্রথম কত দিন আচ্ছন্নের মতো কাটল?
(ক) দুই দিন (খ) তিন দিন (গ) পাঁচ দিন (ঘ) সাত দিন
উত্তর: (খ) তিন দিন
৭. সমুদ্রপীড়ার সময় লেখকের হাতের কাছে কার লেখা 'চয়নিকা' ছিল?
(ক) শরৎচন্দ্রের (খ) নজরুলের (গ) বঙ্কিমচন্দ্রের (ঘ) রবীন্দ্রনাথের
উত্তর: (ঘ) রবীন্দ্রনাথের
৮. লোহিত সাগর কাদের মধ্যবর্তী হ্রদতুল্য সমুদ্র?
(ক) এশিয়া ও ইউরোপের (খ) আফ্রিকা ও আরবের (গ) ভারত ও আরবের (ঘ) ইটালি ও সিসিলির
উত্তর: (খ) আফ্রিকা ও আরবের
৯. সুয়েজ যোজক কাদের মধ্যে সেতু ছিল?
(ক) এশিয়া ও ইউরোপ (খ) আফ্রিকা ও ইউরোপ (গ) এশিয়া ও আফ্রিকা (ঘ) মিশর ও আরব
উত্তর: (গ) এশিয়া ও আফ্রিকা
১০. সুয়েজ খালের স্থপতির নাম কী?
(ক) কলম্বাস (খ) ভাস্কো দা গামা (গ) লেসেস্ (Lesseps) (ঘ) আইফেল
উত্তর: (গ) লেসেস্ (Lesseps)
১১. সুয়েজ খালের ধারের পাহাড়গুলোকে দেখে লেখকের কোন্ শিল্পীদের কথা মনে পড়ে?
(ক) ইমপ্রেশনিস্ট (খ) কিউবিস্ট (গ) সুররিয়ালিস্ট (ঘ) ক্লাসিক্যাল
উত্তর: (খ) কিউবিস্ট
১২. সুয়েজ খাল যেখানে ভূমধ্যসাগরে পড়েছে সেখানকার শহরের নাম কী?
(ক) কায়রো (খ) আলেকজান্দ্রিয়া (গ) পোর্ট সৈয়দ (ঘ) মার্সেল্স
উত্তর: (গ) পোর্ট সৈয়দ
১৩. পোর্ট সৈয়দ বন্দরটি কোন্ দেশের অঙ্গ?
(ক) ফ্রান্স (খ) ইটালি (গ) মিশর (ঘ) গ্রিস
উত্তর: (গ) মিশর
১৪. প্রথম দিন-কতক চতুর ব্যবসাদারের মতো কে 'Honesty is the best policy' করেছিল?
(ক) আরব সাগর (খ) লোহিত সাগর (গ) ভূমধ্যসাগর (ঘ) ভারত মহাসাগর
উত্তর: (গ) ভূমধ্যসাগর
১৫. মেসিনা প্রণালী কোন্ দুটি জায়গার মাঝখানে অবস্থিত?
(ক) ফ্রান্স ও ইটালি (খ) ইটালি ও সিসিলি (গ) মিশর ও সিসিলি (ঘ) আরব ও আফ্রিকা
উত্তর: (খ) ইটালি ও সিসিলি
১৬. স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরিকে লেখক কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
(ক) যমের দুয়ার (খ) রাবণের চিতা (গ) পাতালপুরী (ঘ) অগ্নিকুণ্ড
উত্তর: (খ) রাবণের চিতা
১৭. ভূমধ্যসাগরের সেরা বন্দর এবং ফরাসিদের দ্বিতীয় বড়ো শহর কোনটি?
(ক) প্যারিস (খ) ক্যালে (গ) মার্সেল্স (ঘ) বর্দো
উত্তর: (গ) মার্সেল্স
১৮. ফরাসি জাতীয় সংগীত 'La Marseillaise'-এর জন্ম কোথায়?
(ক) প্যারিসে (খ) মার্সেল্স নগরে (গ) ক্যালে-তে (ঘ) ডোভারে
উত্তর: (খ) মার্সেল্স নগরে
১৯. ফরাসি সহজিয়া কবিদের (troubadour) প্রিয়ভূমির নাম কী?
(ক) Bandol (খ) Provence (গ) Paris (ঘ) Calais
উত্তর: (খ) Provence
২০. মার্সেল্স থেকে প্যারিসে লেখক কীভাবে গিয়েছিলেন?
(ক) জাহাজে (খ) বিমানে (গ) রেলপথে (ঘ) গাড়িতে
উত্তর: (গ) রেলপথে

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. ভারতবর্ষ থেকে পা তুলে নেওয়ার মুহূর্তে লেখকের কী মনে হয়েছিল?
উত্তর: ভারতবর্ষ থেকে শেষবারের মতো পা তুলে নেওয়ার মুহূর্তে লেখকের মনে হয়েছিল যেন সদ্যোজাত শিশুর সঙ্গে মায়ের যে নাড়ির যোগসূত্র থাকে, তা এক মুহূর্তে ছিন্ন হয়ে গেল।
২. "আরব সাগরের পরে যখন লোহিত সাগরে পড়লুম তখন সমুদ্রপীড়া বাসি হয়ে গেছে।" - সমুদ্রপীড়া কী?
উত্তর: জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রার সময় ঢেউয়ের প্রবল দুলুনির কারণে যাত্রীদের যে মাথা ঘোরা, বমি ভাব বা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়, তাকেই সমুদ্রপীড়া বা সি-সিকনেস বলা হয়।
৩. 'উদর তা রক্ষণ করতে অস্বীকার করে' - কী রক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: ক্যাবিন স্টুয়ার্ড যাত্রীদের খাওয়ার জন্য যে খাবার দিয়ে যেত, সমুদ্রপীড়ার কারণে জিহ্বা তা গ্রহণ করতে চাইলেও পাকস্থলী বা উদর তা হজম (রক্ষণ) করতে অস্বীকার করে বমি হয়ে যেত।
৪. লোহিত সাগরে পড়লে যাত্রীদের কেমন অনুভূতি হয়?
উত্তর: আরব সাগরের প্রবল ঢেউ পেরিয়ে লোহিত সাগরে পড়লে সমুদ্র শান্ত হ্রদের মতো হয়ে যায়। তখন সমুদ্রপীড়া কমে যায় এবং যাত্রীদের মনে গতির আনন্দে কেবল ভেসে চলতেই ইচ্ছা করে।
৫. সুয়েজ যোজক কাদের মধ্যে সেতু ছিল?
উত্তর: সুয়েজ যোজক (Isthmus of Suez) ছিল এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধন।
৬. সুয়েজ খাল কীভাবে মিলন ঘটাল?
উত্তর: সুয়েজ খাল মাটি কেটে তৈরি হওয়ায় তা এশিয়া ও আফ্রিকাকে আলাদা করলেও, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে কার্যক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সঙ্গে ইউরোপের মহামিলন ঘটিয়েছে।
৭. সুয়েজ খালের দুধারের দৃশ্য কেমন ছিল?
উত্তর: সুয়েজ খালের একদিকে ছিল যত্ন করে লাগানো ও রক্ষিত গাছের সারি, আর অন্যদিকে ছিল ধু-ধু করা মাঠ ও পাথরের পাহাড়, যেখানে শ্যামলতার কোনো আভাসটুকুও নেই।
৮. কিউবিস্টদের সঙ্গে পাহাড়ের কী সম্পর্ক লেখক খুঁজে পেয়েছেন?
উত্তর: সুয়েজ খালের ধারের পাহাড়গুলোকে দেখে লেখকের মনে হয়েছে যেন কোনো কিউবিস্ট চিত্রশিল্পী আপন খেয়ালে পাথর কুঁদে সেগুলোকে জ্যামিতিক আকার দিয়েছেন।
৯. পোর্ট সৈয়দ শহরে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে কাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়?
উত্তর: পোর্ট সৈয়দ শহরে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর এবং কাফেতে ফুটপাথের ওপর বসে খাওয়ার অভ্যাসে স্পষ্টতই ফরাসি সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়।
১০. মিশরীয়দের সমাজে ও রাষ্ট্রে কাদের স্বাধীন মনোবৃত্তি সঞ্চারিত হয়েছে?
উত্তর: ইউরোপের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় মিশরীয়রা ইউরোপীয়দের সঙ্গে বেশি মিশতে পেরেছে, ফলে ইউরোপের স্বাধীন ও ভয়হীন আধুনিক মনোবৃত্তি তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে সঞ্চারিত হয়েছে।
১১. 'Honesty is the best policy' - ভূমধ্যসাগরকে এমন বলার কারণ কী?
উত্তর: ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের পর প্রথম কয়েকদিন সমুদ্র চতুর ব্যবসাদারের মতো শান্তশিষ্ট আচরণ করেছিল, তাই লেখক মজা করে তার এই ভদ্রতাকে 'Honesty is the best policy' বলেছেন।
১২. স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরিকে লেখক কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং কেন?
উত্তর: স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে অনবরত যে আগুন ও ধোঁয়া বের হয়, সমুদ্রের মাঝখানে পাহাড়ের বুকে জ্বলন্ত সেই আগুনকে লেখক রূপক অর্থে 'রাবণের চিতা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৩. মার্সেল্স শহরের রাস্তাঘাট কেমন?
উত্তর: মার্সেল্স শহরটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। তাই এর রাস্তাগুলি সমতল নয়; কোনো রাস্তায় চলতে চলতে মনে হয় একেবারে রসাতলে নেমে যাচ্ছে, আবার কোনোটি যেন স্বর্গের সিঁড়ির মতো উঁচুতে উঠেছে।
১৪. 'Bandol' নামক গ্রামটির বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: 'Bandol' হলো ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরের কূলে অবস্থিত একটি সুন্দর ছোটো গ্রাম। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আবহাওয়া এতই মনোরম যে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ এখানে গ্রীষ্মযাপন করতে আসে।
১৫. লেখক কীভাবে মার্সেল্স থেকে লন্ডনে পৌঁছেছিলেন?
উত্তর: লেখক মার্সেল্স থেকে প্যারিস হয়ে ক্যালে পর্যন্ত রেলপথে যান। তারপর ক্যালে থেকে ডোভার পর্যন্ত জলপথে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে, ডোভার থেকে পুনরায় রেলপথে লন্ডনে পৌঁছান।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'পথে প্রবাসে' রচনাংশ অবলম্বনে লেখকের সমুদ্রপীড়া ও আরব সাগরের ভয়ংকর রূপের বর্ণনা দাও।

উত্তর: প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় তাঁর 'পথে প্রবাসে' ভ্রমণকাহিনিতে সমুদ্রযাত্রার প্রথম পর্বের এক প্রাণবন্ত ও বাস্তব বর্ণনা দিয়েছেন।

বম্বে বন্দর থেকে লেখকের জাহাজ যখন আরব সাগরে প্রবেশ করে, তখন ছিল বর্ষাকাল। মনসুনের প্রবল বাতাসে সমুদ্র যেন তার শত সহস্র জিভ লক্লক্ করে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল। সমুদ্রের এই ভয়ংকর ঢেউয়ের আঘাতে বিশালাকার জাহাজটি একবার ডানদিকে ও একবার বাঁদিকে এমনভাবে দুলছিল, যেন ফুটন্ত তেলের কড়াইতে পাঁপর ভাজা হচ্ছে।

এই ভয়ানক দুলুনির ফলে জাহাজের অধিকাংশ যাত্রী মারাত্মক 'সমুদ্রপীড়া' বা সি-সিকনেসে আক্রান্ত হন। অসহ্য শারীরিক কষ্টে যাত্রীরা ডেক ছেড়ে নিজেদের ক্যাবিনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। প্রথম তিন দিন লেখক নিজেও আচ্ছন্নের মতো বিছানায় পড়ে ছিলেন। বমি ও উপবাসে দিন-রাত এমন কষ্টে কাটে যে, মনে হয় মরণ হলেই যেন বাঁচি। হাতের কাছে রবীন্দ্রনাথের 'চয়নিকা'র মতো সুন্দর বই থাকলেও মাথার যন্ত্রণায় তা পড়ার ইচ্ছা জাগে না। এই অসহ্য দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে অনেকেই মনে মনে সংকল্প করেন যে, প্রথম সুযোগেই জাহাজ থেকে নেমে স্থলপথে দেশে ফিরে যাবেন। লেখকের এই বর্ণনায় সমুদ্রযাত্রার বাস্তব কষ্ট ও আরব সাগরের ভয়ংকর রূপটি অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে।

২. সুয়েজ খাল সম্পর্কে লেখক অন্নদাশংকর রায় যে বিবরণ দিয়েছেন তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

উত্তর: 'পথে প্রবাসে' রচনায় লেখক অন্নদাশংকর রায় সুয়েজ খাল এবং তার স্থপতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

ভৌগোলিকভাবে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের মাঝখানে যে স্থলভাগ এশিয়া ও আফ্রিকাকে যুক্ত করেছিল, তার নাম সুয়েজ যোজক। ফরাসি স্থপতি লেসেস্ (Lesseps) এই যোজক কেটে সুয়েজ খাল নির্মাণ করেন। লেখক বলেছেন, এই খাল এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটালেও ভারত ও ইউরোপের মধ্যে এক মহামিলন ঘটিয়েছে। এই খালের ফলেই ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগরে আসতে জাহাজকে আর হাজার হাজার মাইল পথ ঘুরে আসতে হয় না।

খালের প্রাকৃতিক বর্ণনায় লেখক বলেছেন যে, এটি আমাদের দেশের ছোটো নদীর মতোই অপ্রশস্ত, যেখানে বড়োজোর দুখানা জাহাজ পাশাপাশি যাতায়াত করতে পারে। খালের একদিকে রয়েছে সযত্নে লাগানো গাছের সারি এবং অন্যদিকে রয়েছে ধু-ধু পাথুরে প্রান্তর ও পাহাড়। এই পাহাড়গুলির আকার এমনই অদ্ভুত জ্যামিতিক যে, লেখকের মনে হয়েছে কোনো কিউবিস্ট চিত্রশিল্পী আপন খেয়ালে পাথর কুঁদে এদের তৈরি করেছেন। এক কথায়, স্থপতি লেসেস্-এর এই অসামান্য সৃষ্টি দূরকে নিকটে এনে পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

৩. "পোর্ট সৈয়দ হলো নানা জাতের নানা দেশের মোসাফেরদের তীর্থস্থল"- পোর্ট সৈয়দ শহর এবং মিশরের অধিবাসীদের সম্পর্কে লেখকের অভিমত বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: সুয়েজ খালের উত্তর প্রান্তে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত বন্দর শহর হলো 'পোর্ট সৈয়দ'। 'পথে প্রবাসে' রচনায় লেখক এই শহর এবং মিশরের অধিবাসীদের জীবনযাত্রার এক চমৎকার ছবি এঁকেছেন।

পোর্ট সৈয়দ শহরে নেমে লেখক প্রথমেই ফরাসি সংস্কৃতির গভীর প্রভাব লক্ষ করেন। এখানকার কাফেগুলোতে ফুটপাথের ওপর বসে খাওয়া এবং রাস্তার ডানদিক ধরে হাঁটার চল রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই বন্দরটি নানা দেশের নানা জাতির পর্যটক বা মোসাফেরদের প্রধান তীর্থস্থল হয়ে উঠেছে। এখানে সুযোগ পেলেই এক দেশের মানুষের টাকা অন্য দেশের মানুষের পকেটে চলে যায়।

মিশরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে লেখকের মত হলো, মিশর প্রায় স্বাধীন একটি দেশ। ইউরোপের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় মিশরীয়রা ইউরোপীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার বেশি সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয়দের প্রতি তাদের মনে কোনো অহেতুক ভয় বা অতিপরিচয়ের কারণে কোনো অবজ্ঞা নেই। বরং ইউরোপীয়দের স্বাধীন ও ভয়হীন আধুনিক মনোবৃত্তি তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গভীরভাবে সঞ্চারিত হয়েছে, যা মিশরকে অন্যান্য প্রাচ্যের দেশগুলির তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল করে তুলেছে।

৪. মার্সেল্স শহরের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তা পাঠ্যাংশ অবলম্বনে নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: অন্নদাশংকর রায় তাঁর 'পথে প্রবাসে' রচনায় ফ্রান্সের বিখ্যাত বন্দর শহর মার্সেল্স (Marseilles)-এর এক মনোরম ও জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন।

মার্সেল্স হলো ভূমধ্যসাগরের সেরা বন্দর এবং ফরাসিদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে এই শহরের গুরুত্ব অপরিসীম। ফরাসি বিপ্লবের বিখ্যাত গান বা ফরাসিদের জাতীয় সংগীত 'La Marseillaise'-এর জন্ম এই শহরেই। এটি ফরাসি সহজিয়া কবিদের (Troubadour) প্রিয়ভূমি প্রভেন্স (Provence) অঞ্চলের অন্তর্গত, যেখানে বসন্তকাল দীর্ঘস্থায়ী এবং জ্যোৎস্না অত্যন্ত স্বচ্ছ হয়।

শহরটির প্রাকৃতিক অবস্থান অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। পাহাড় কেটে এই শহরটি গড়ে উঠেছে। দূর পাহাড়ের ওপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সমুদ্র এই শহরটিকে সাপের মতো সাতপাকে জড়িয়ে ধরে আছে। শহরের রাস্তাগুলি একেবারেই সমতল নয়। কোনো রাস্তায় ট্রামে করে যেতে যেতে বাঁক ঘুরলেই মনে হয় যেন রসাতল বা পাতালে নেমে যাচ্ছে, আবার কোনো রাস্তা স্বর্গের সিঁড়ির মতো সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে। রাস্তার দুধারে সুন্দর গাছের সারি এবং ফুটপাথ শহরটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

৫. 'পথে প্রবাসে' ভ্রমণকাহিনিটিতে লেখকের স্বদেশপ্রীতি ও বিদেশভ্রমণের রোমাঞ্চ কীভাবে মিলেমিশে গেছে তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: অন্নদাশংকর রায়ের 'পথে প্রবাসে' ভ্রমণবৃত্তান্তটি কেবল একটি সাধারণ যাত্রার বিবরণ নয়; এতে লেখকের গভীর স্বদেশপ্রেম এবং বিদেশভ্রমণের রোমাঞ্চকর অনুভূতি একসূত্রে গাঁথা হয়ে আছে।

রচনার শুরুতেই লেখকের তীব্র স্বদেশপ্রীতির প্রকাশ ঘটে। বম্বে বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার মুহূর্তে ভারতবর্ষ থেকে পা তুলে নেওয়ার অনুভূতিকে তিনি সদ্যোজাত শিশুর মায়ের সঙ্গে নাড়ির টান ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আরব সাগরে যখন ভারতবর্ষ মানচিত্রের মতো ছোটো হয়ে যায়, তখন তাঁর মন গভীর বিষাদে ভরে ওঠে। সমুদ্রপীড়ার সময়ও মাতৃভূমির কথা তাঁর বারবার মনে পড়েছে।

অন্যদিকে, লোহিত সাগরে পৌঁছানোর পর তাঁর মন থেকে অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা মুছে যায়। তখন তিনি উপস্থিত মুহূর্তের ও গতির আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করেন। সুয়েজ খাল, পোর্ট সৈয়দ, এবং মার্সেল্স শহরের বর্ণনায় তাঁর বিদেশভ্রমণের রোমাঞ্চ ও কৌতূহল স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেসেস্-এর স্থাপত্যকীর্তি থেকে শুরু করে স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরি বা মার্সেল্সের পাহাড়ি রাস্তার বর্ণনা—সবকিছুতেই তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও পর্যটকের মুগ্ধতা ধরা পড়েছে। এভাবেই ফেলে আসা স্বদেশের প্রতি গভীর টান এবং নতুন অজানা বিদেশের প্রতি প্রবল আকর্ষণ রচনাটিকে এক অনন্য সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ করেছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • সদ্যোজাত = সদ্যঃ + জাত
  • রূপান্তরিত = রূপ + অন্তর + ইত
  • গোষ্পদ = গো + পদ (নিপাতনে সিদ্ধ)
  • নিস্তরঙ্গ = নিঃ + তরঙ্গ
  • আগ্নেয়গিরি = অগ্নি + এয় + গিরি

সমাস নির্ণয়

  • সমুদ্রপীড়া: সমুদ্রের কারণে পীড়া (মধ্যপদলোপী কর্মধারয় / তৎপুরুষ)
  • পান্থশালা: পান্থদের শালা (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • বিশ্বকর্মা: বিশ্বের কর্মা (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • পদ-পরিমাণ: পদের পরিমাণ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • দেশবিদেশ: দেশ ও বিদেশ (দ্বন্দ্ব সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • সমুদ্র ➜ সামুদ্রিক
  • মন ➜ মানসিক
  • শরীর ➜ শারীরিক
  • নগর ➜ নাগরিক
  • কল্পনা ➜ কাল্পনিক

পথে প্রবাসে প্রবন্ধ সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই রচনাটি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়ের লেখা। এটি মূলত একটি ভ্রমণকাহিনি, যেখানে লেখকের ভারত থেকে ইউরোপ (লন্ডন) যাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে।

জাহাজে সমুদ্রযাত্রার সময় ঢেউয়ের প্রবল দুলুনিতে যাত্রীদের যে মাথা ঘোরা বা বমি ভাব হয়, তাকেই সমুদ্রপীড়া বলে। রচনায় যাত্রীরা বর্ষাকালে আরব সাগরের প্রবল ঢেউয়ের কারণে এই পীড়ায় ভুগেছিলেন।

সমুদ্রের মাঝখানে পাহাড়ের বুকে অনবরত জ্বলতে থাকা স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরিকে লেখক রূপক অর্থে 'রাবণের চিতা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন।