অধ্যায় ১: ইতিহাসের ধারণা
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে ইতিহাসের গুরুত্ব, ইতিহাস লেখার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা: বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের হলেও ইতিহাস পড়া জরুরি, কারণ বর্তমানের ভিত্তি অতীতের মধ্যেই নিহিত থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মনীষীরা প্রচলিত ইতিহাস লেখার পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, যে ইতিহাস শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের যুদ্ধ ও বংশপরিচয়ের কাহিনি বলে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা বলে না, তা অসম্পূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির জন্য বাঙালির লেখা ইতিহাসের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের যুগ বিভাজন ও সমস্যা: জেমস মিল তাঁর "History of British India" (১৮১৭) গ্রন্থে ভারতীয় ইতিহাসকে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ ও ব্রিটিশ যুগ—এই তিনটি ভাগে ভাগ করেন। এই বিভাজন সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয় এবং পরবর্তীকালে এটি প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এই বিভাজনটি ত্রুটিপূর্ণ, কারণ যুগের পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না এবং শাসকের ধর্মের ভিত্তিতে ইতিহাসকে ভাগ করা অবৈজ্ঞানিক।
আধুনিক ইতিহাসের উপাদান: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার জন্য বিভিন্ন ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হয়। যেমন:
- সরকারি নথি: ব্রিটিশ প্রশাসনের বিভিন্ন চিঠিপত্র, দলিল, ও রিপোর্ট।
- আত্মজীবনী ও জীবনী: বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা আত্মজীবনী বা তাঁদের নিয়ে লেখা জীবনী।
- সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র: তৎকালীন সময়ের খবরের কাগজ ও পত্রিকা।
- ফটোগ্রাফ ও ছবি: ক্যামেরায় তোলা ছবি বা হাতে আঁকা ছবি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে।
তবে, এই সব উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিককে সতর্ক থাকতে হয়, কারণ প্রতিটি উপাদানের মধ্যেই লেখকের বা নির্মাতার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও জাতীয়তাবাদ: অধ্যায়ে এই তিনটি ধারণার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ হল একটি শক্তিশালী দেশের দুর্বল দেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। উপনিবেশবাদ হল সেই আধিপত্যের অর্থনৈতিক শোষণ। আর এই সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়, যা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| ১৭০৭ | মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু। |
| ১৭৫৭ | পলাশির যুদ্ধ, যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করে। |
| ১৮০৮ | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার 'রাজাবলি' গ্রন্থটি রচনা করেন। |
| ১৮১৭ | জেমস মিল 'History of British India' গ্রন্থটি রচনা করেন। |
| ১৯৩৮ | হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। |
| ১৯৪৭ | ভারতবর্ষের বিভাজন এবং স্বাধীনতা লাভ। |
প্রশ্নোত্তর
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
'History of British India' গ্রন্থটি কে লিখেছেন?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (গ) জেমস মিল (ঘ) উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন
উত্তর: (গ) জেমস মিল
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয় কত খ্রিস্টাব্দে?
(ক) ১৭৫৭ (খ) ১৭০৭ (গ) ১৮১৭ (ঘ) ১৯৪৭
উত্তর: (খ) ১৭০৭
জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে কটি ভাগে ভাগ করেছেন?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) পাঁচটি
উত্তর: (খ) তিনটি
'রাজাবলি' ইতিহাস গ্রন্থটি কার লেখা?
(ক) জেমস মিল (খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
পলাশির যুদ্ধ হয়েছিল কত খ্রিস্টাব্দে?
(ক) ১৭০৭ (খ) ১৯৪৭ (গ) ১৭৫৭ (ঘ) ১৮১৭
উত্তর: (গ) ১৭৫৭
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
ইতিহাস বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল আপত্তি কী ছিল?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল আপত্তি ছিল যে, ভারতে প্রচলিত ইতিহাস শুধুমাত্র বিদেশি শাসকদের (পাঠান, মোগল, ইংরেজ) কাটাকাটি, মারামারি ও সিংহাসন দখলের কাহিনিতে পূর্ণ। এই ইতিহাসে সাধারণ ভারতবাসীর কোনো স্থান ছিল না, যা ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল করে রেখেছে।
জেমস মিল কীভাবে ভারতীয় ইতিহাসের যুগ বিভাজন করেছিলেন?
জেমস মিল ভারতীয় ইতিহাসকে শাসকের ধর্মের ভিত্তিতে তিনটি যুগে ভাগ করেছিলেন— হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ এবং ব্রিটিশ যুগ।
উপনিবেশবাদ বলতে কী বোঝো?
উপনিবেশবাদ হল একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী দেশ অন্য একটি দুর্বল অঞ্চলের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য স্থাপন করে এবং সেই অঞ্চলের সম্পদ নিজের দেশের স্বার্থে ব্যবহার করে। যেমন, ব্রিটিশরা ভারতের সম্পদ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করত।
ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ফটোগ্রাফ ব্যবহারের একটি সমস্যা লেখো।
ফটোগ্রাফ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো এটি নিরপেক্ষ নয়। ছবিটি যিনি তুলছেন, তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্দেশ্য এবং কোন মুহূর্তকে তিনি ক্যামেরাবন্দী করছেন, তার উপর ছবির অর্থ অনেকটাই নির্ভর করে। ফলে ফটোগ্রাফ সবসময় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বা নিরপেক্ষ চিত্র তুলে ধরে না।
সাম্রাজ্যবাদ কী?
সাম্রাজ্যবাদ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি দুর্বল দেশ বা রাষ্ট্রের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করে এবং তার জনগণ ও সম্পদকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা করে।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
ভারতীয় ইতিহাসের যুগ বিভাজনের সমস্যাগুলি আলোচনা করো।
ভারতীয় ইতিহাসকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক—এই তিনটি পর্বে ভাগ করার বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।
প্রথমত, এই বিভাজনটি মূলত ইউরোপীয় ইতিহাসের অনুকরণে তৈরি, যা ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে সব সময় মেলে না।
দ্বিতীয়ত, জেমস মিলের করা হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ—এই যুগ বিভাজনটি অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক এবং সরলীকরণ দোষে দুষ্ট। এটি বোঝায় যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে শুধুমাত্র একটি ধর্মের শাসকরাই প্রভাবশালী ছিলেন, যা ঐতিহাসিক সত্য নয়।
তৃতীয়ত, যুগের পরিবর্তন নির্দিষ্ট তারিখ ধরে হয় না। যেমন, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুকে মধ্যযুগের শেষ এবং পলাশির যুদ্ধকে আধুনিক যুগের শুরু ধরা হলেও, প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে মুঘল প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তাই এই ধরনের বিভাজন ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করে।
আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদানগুলি কী কী? এই উপাদানগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?
আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার জন্য বিভিন্ন ধরনের উপাদান রয়েছে। প্রধান উপাদানগুলি হল:
- সরকারি নথিপত্র: ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক রিপোর্ট, চিঠিপত্র, আইন ইত্যাদি।
- বেসরকারি নথি: ব্যক্তিগত ডায়েরি, চিঠিপত্র, আত্মজীবনী এবং জীবনী।
- সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র: সমসাময়িক ঘটনাবলির তথ্য পাওয়া যায়।
- ফটোগ্রাফ, চিত্রকলা ও মানচিত্র: এগুলি থেকে তৎকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।
- সরকারি নথিগুলি প্রায়শই ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা, যেখানে ভারতীয়দের বিদ্রোহকে 'হাঙ্গামা' বলে দেখানো হয়েছে।
- আত্মজীবনী বা জীবনীতে লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও পক্ষপাতিত্ব থাকার সম্ভাবনা থাকে।
- ফটোগ্রাফও যিনি ছবি তুলছেন তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল এবং সবসময় সম্পূর্ণ সত্যকে তুলে ধরে না।