অধ্যায় ৮: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে কীভাবে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতি তীব্র হয়ে ওঠে এবং তার পরিণতিতে কীভাবে দেশভাগ হয়, তা আলোচনা করা হয়েছে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে যে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য দেখা গিয়েছিল, তা পরবর্তী নব্বই বছরে ধীরে ধীরে ভেঙে যায়।

  • সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ: ব্রিটিশ সরকার তাদের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির অঙ্গ হিসেবে আদমশুমারি (জনগণনা) এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপে হিন্দু ও মুসলমানদের দুটি পৃথক ও প্রতিযোগী সম্প্রদায় হিসেবে তুলে ধরে। শিক্ষা ও চাকরিতে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া এবং হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের বাড়াবাড়ি উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়।
  • আলিগড় আন্দোলন ও মুসলিম লিগ: স্যার সৈয়দ আহমদ খান আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী হন, কিন্তু তিনি মুসলিমদের কংগ্রেস থেকে দূরে থাকতে বলেন। পরবর্তীতে, ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ' গঠিত হয়।
  • দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান প্রস্তাব: ধীরে ধীরে এই ধারণা প্রভাবশালী হয় যে, হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি এবং তাদের স্বার্থ ভিন্ন। ১৯৩০ সালে কবি মহম্মদ ইকবাল প্রথম মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের কথা বলেন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে মহম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্বে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'-এর ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র 'পাকিস্তান' গঠনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
  • দেশভাগের পথে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কংগ্রেস 'অখণ্ড भारत'-এর পক্ষে থাকলেও, মুসলিম লিগ পাকিস্তান দাবিতে অটল থাকে। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর, জিন্নাহ 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম'-এর ডাক দেন, যার পরিণতিতে কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা (The Great Calcutta Killings) শুরু হয় এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
  • স্বাধীনতা ও দেশভাগ: ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা روکতে ব্যর্থ হয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব দেশভাগ মেনে নিতে বাধ্য হন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্ট ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের নেতৃত্বে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়, যা বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে এবং ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ উদ্বাস্তু সমস্যার জন্ম দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
১৮৭২ভারতে প্রথম আদমশুমারি বা জনগণনা শুরু।
১৮৯৮স্যার সৈয়দ আহমদ খানের মৃত্যু।
১৯০৬ঢাকায় 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ' প্রতিষ্ঠা।
১৯২৪তুরস্কে খলিফা পদের অবসান।
১৯৩০মহম্মদ ইকবালের পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রস্তাব।
১৯৩২সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (Communal Award) ঘোষণা।
১৯৩৭প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত।
১৯৪০মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' গৃহীত।
১৯৪২ক্রিপস মিশনের ভারতে আগমন।
১৯৪৬ক্যাবিনেট মিশনের ভারতে আগমন, ১৬ই আগস্ট কলকাতায় 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম' ও দাঙ্গার সূচনা।
১৯৪৭লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত বিভাজনের পরিকল্পনা ঘোষণা। ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা লাভ।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

ঔপনিবেশিক ভারতে প্রথম আদমশুমারি কবে শুরু হয়?

(ক) ১৮৫৭ খ্রি: (খ) ১৮৭০ খ্রি: (গ) ১৮৭২ খ্রি: (ঘ) ১৮৮৫ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৮৭২ খ্রি:

সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি কবে চালু হয়?

(ক) ১৮৩৫ খ্রি: (খ) ১৮৩৭ খ্রি: (গ) ১৮৫৪ খ্রি: (ঘ) ১৮৫৭ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৮৩৭ খ্রি:

আলিগড় অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?

(ক) মহম্মদ আলি জিন্নাহ (খ) স্যার সৈয়দ আহমদ খান (গ) বদরুদ্দিন তৈয়বজি (ঘ) আগা খান
উত্তর: (খ) স্যার সৈয়দ আহমদ খান

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

(ক) আলিগড় (খ) কলকাতা (গ) লাহোর (ঘ) ঢাকা
উত্তর: (ঘ) ঢাকা

মুসলিম লিগ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

(ক) ১৯০৫ খ্রি: (খ) ১৯০৬ খ্রি: (গ) ১৯০৯ খ্রি: (ঘ) ১৯১১ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৯০৬ খ্রি:

মহারাষ্ট্রে গণপতি ও শিবাজি উৎসবের पुनरुत्थान কে করেন?

(ক) অরবিন্দ ঘোষ (খ) বাল গঙ্গাধর তিলক (গ) বিপিনচন্দ্র পাল (ঘ) লালা লাজপত রাই
উত্তর: (খ) বাল গঙ্গাধর তিলক

তুরস্কের সুলতানকে ইসলাম জগতে কী বলা হত?

(ক) বাদশা (খ) শাহানশাহ (গ) খলিফা (ঘ) আমির
উত্তর: (গ) খলিফা

তুরস্কে খলিফা পদের অবসান কবে ঘটে?

(ক) ১৯২০ খ্রি: (খ) ১৯২২ খ্রি: (গ) ১৯২৪ খ্রি: (ঘ) ১৯২৬ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৯২৪ খ্রি:

হিন্দু মহাসভা কোন ধরনের সংগঠন ছিল?

(ক) নরমপন্থী (খ) চরমপন্থী (গ) বিপ্লবী (ঘ) উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী
উত্তর: (ঘ) উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী

১৯৩০ সালে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের ধারণা কে প্রথম দেন?

(ক) মহম্মদ আলি জিন্নাহ (খ) চৌধুরি রহমত আলি (গ) মহম্মদ ইকবাল (ঘ) এ. কে. ফজলুল হক
উত্তর: (গ) মহম্মদ ইকবাল

'পাকিস্তান' নামটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

(ক) মহম্মদ ইকবাল (খ) মহম্মদ আলি জিন্নাহ (গ) চৌধুরি রহমত আলি (ঘ) লিয়াকত আলি খান
উত্তর: (ঘ) চৌধুরি রহমত আলি

সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি কে ঘোষণা করেন?

(ক) লর্ড কার্জন (খ) উইনস্টন চার্চিল (গ) র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড (ঘ) ক্লিমেন্ট অ্যাটলি
উত্তর: (গ) র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড

১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কোন দল সাফল্য লাভ করে?

(ক) মুসলিম লিগ (খ) কংগ্রেস (গ) কৃষক প্রজা পার্টি (ঘ) ইউনিয়নিস্ট পার্টি
উত্তর: (খ) কংগ্রেস

মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন কবে অনুষ্ঠিত হয়?

(ক) ১৯৩০ খ্রি: (খ) ১৯৩৭ খ্রি: (গ) ১৯৪০ খ্রি: (ঘ) ১৯৪৬ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৯৪০ খ্রি:

লাহোর অধিবেশনে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' কে উত্থাপন করেন?

(ক) মহম্মদ আলি জিন্নাহ (খ) সিকান্দার হায়াৎ খান (গ) এ. কে. ফজলুল হক (ঘ) মহম্মদ ইকবাল
উত্তর: (গ) এ. কে. ফজলুল হক

ক্রিপস মিশন কবে ভারতে আসে?

(ক) ১৯৪০ খ্রি: (খ) ১৯৪২ খ্রি: (গ) ১৯৪৫ খ্রি: (ঘ) ১৯৪৬ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৯৪২ খ্রি:

কৃষক প্রজা পার্টির নেতা কে ছিলেন?

(ক) মহম্মদ আলি জিন্নাহ (খ) হোসেনশহিদ সুরাবর্দি (গ) এ. কে. ফজলুল হক (ঘ) স্যার সিকান্দার হায়াৎ খান
উত্তর: (গ) এ. কে. ফজলুল হক

ক্যাবিনেট মিশন কবে ভারতে আসে?

(ক) ১৯৪৫ খ্রি: (খ) ১৯৪৬ খ্রি: (গ) ১৯৪৭ খ্রি: (ঘ) ১৯৪২ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৯৪৬ খ্রি:

মুসলিম লিগ কবে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' পালনের ডাক দেয়?

(ক) ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট (খ) ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট (গ) ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ (ঘ) ১৯৪৫ সালের ২৫শে জুন
উত্তর: (ক) ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

(ক) মহাত্মা গান্ধি (খ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল (গ) জওহরলাল নেহরু (ঘ) ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ
উত্তর: (গ) জওহরলাল নেহরু

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত নির্ধারণ কমিশনের প্রধান কে ছিলেন?

(ক) লর্ড মাউন্টব্যাটেন (খ) স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস (গ) স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ (ঘ) লর্ড ওয়াভেল
উত্তর: (গ) স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ

স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম কবে হয়েছিল?

(ক) ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট (খ) ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট (গ) ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন (ঘ) ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট
উত্তর: (খ) ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং ইসলামীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন করা। স্যার সৈয়দ আহমদ খান এর মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আধুনিক ও স্বনির্ভর করে তুলতে চেয়েছিলেন।

স্বদেশি আন্দোলন বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

স্বদেশি আন্দোলনে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক (যেমন দেশকে মাতৃরূপে বন্দনা) ব্যবহারের ফলে মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে। ব্রিটিশ সরকারের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির ফলে এবং বঙ্গভঙ্গকে মুসলিমদের জন্য সুবিধাজনক হিসেবে প্রচার করায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক তিক্ত হয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন বৃদ্ধি পায়।

ভারতীয় মুসলমানেরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিলেন কেন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সুলতান, যিনি মুসলিম বিশ্বের খলিফা ছিলেন, ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব করা হয়। এর প্রতিবাদে এবং খলিফার সম্মান পুনরুদ্ধারের দাবিতে ভারতীয় মুসলমানেরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কেন?

১৯৩০ সালটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বছরেই মুসলিম লিগের এলাহাবাদ অধিবেশনে কবি মহম্মদ ইকবাল প্রথমবার মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা দেন। এটিই পরবর্তীকালে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' এবং পাকিস্তান দাবির তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে, যা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেয়।

মুসলিম লিগ গঠনের দুটি উদ্দেশ্য লেখো।

মুসলিম লিগ গঠনের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল: (১) ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং সরকারের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করা; এবং (২) ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা।

দ্বিজাতি তত্ত্ব কী?

দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো এমন একটি রাজনৈতিক ধারণা যেখানে বলা হয় যে, ভারতে হিন্দু ও মুসলমানরা केवल দুটি ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়, বরং দুটি পৃথক জাতি। তাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা, তাই তারা একসঙ্গে একটি জাতি হিসেবে বসবাস করতে পারে না। মহম্মদ আলি জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন।

পাকিস্তান প্রস্তাব কী ছিল?

১৯৪০ সালে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে নিয়ে একটি বা একাধিক স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাই 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামে পরিচিত।

ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব কী ছিল?

১৯৪৬ সালে ভারতে আসা ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন ভারতকে অখণ্ড রেখে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে বলা হয়, কেন্দ্র কেবল পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগের দায়িত্বে থাকবে এবং বাকি সমস্ত ক্ষমতা প্রদেশগুলির হাতে থাকবে। প্রদেশগুলিকে হিন্দু-সংখ্যাগুরু, মুসলিম-সংখ্যাগুরু এবং প্রায় সমান—এই তিনটি গ্রুপে ভাগ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' কী?

ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর, পাকিস্তান দাবি আদায়ের জন্য মুসলিম লিগ ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট দেশব্যাপী हड़ताल ও বিক্ষোভের ডাক দেয়। এই দিনটিকে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' বা 'Direct Action Day' বলা হয়। এই দিন কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়।

মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা কী ছিল?

ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ভারত বিভাগের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, তাই 'মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা' নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনায় বলা হয়, ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন তৈরি করা হবে এবং বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশকে ভাগ করা হবে।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

স্যার সৈয়দ আহমদ খান কীভাবে মুসলমান সমাজকে আধুনিকীকরণের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তা বিশ্লেষণ করো।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন উনিশ শতকে ভারতীয় মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণের প্রধান পথিকৃৎ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ছাড়া মুসলিমদের উন্নতি সম্ভব নয়।
তাঁর পদক্ষেপগুলি ছিল:

  1. শিক্ষা বিস্তার: তিনি মুসলিমদের মধ্যে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে জোর দেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭৫ সালে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ (পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইসলামীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো হয়।
  2. সমাজ সংস্কার: তিনি পুরোনো প্রথা, যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস এবং पर्दा প্রথার বিরোধিতা করেন। তিনি পির ও উলেমাদের গোঁড়ামির সমালোচনা করেন।
  3. যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা: তিনি আধুনিক যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কোরানের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, যাতে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইসলামের কোনো সংঘাত না থাকে।
তবে তাঁর কার্যকলাপ মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি মুসলিমদের কংগ্রেস থেকে দূরে থাকতে উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে।

কীভাবে উনিশ শতকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল? সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে ঐসব আন্দোলনগুলির ভূমিকা কী ছিল?

উনিশ শতকে ব্রাহ্ম আন্দোলনের মতো সংস্কারমুখী আন্দোলনগুলির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার তাগিদ থেকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের প্রাচীন গৌরব পুনরুদ্ধার করা এবং হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করা। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজ, স্বামী বিবেকানন্দের নব্য-বেদান্ত এবং চরমপন্থী নেতাদের কার্যকলাপ এর অন্তর্গত।
সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা:

  1. এই আন্দোলনগুলি ভারতকে 'হিন্দু রাষ্ট্র' এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে 'হিন্দু সংস্কৃতি' হিসেবে তুলে ধরে, যা মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন করে।
  2. বলা হয়, মুসলিম শাসনের ফলেই ভারতের প্রাচীন গৌরবময় সভ্যতার পতন ঘটেছে। এই ধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করে।
  3. চরমপন্থী নেতারা যখন তিলকের গণপতি ও শিবাজি উৎসব বা দেশকে মাতৃরূপে বন্দনার মতো হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকগুলিকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন মুসলিমদের একটি বড় অংশ জাতীয় আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।
এইভাবে, এই আন্দোলনগুলি অসচেতনভাবে হলেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বদলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথকেই প্রশস্ত করেছিল।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পরে কীভাবে মুসলমান নেতাদের অনেকের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল?

অসহযোগ আন্দোলনের সময় খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করে গান্ধিজি যে অভূতপূর্ব হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন, তা আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ভেঙে যায়। এর পিছনে একাধিক কারণ ছিল:

  1. আন্দোলন প্রত্যাহার: চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধিজি হঠাৎ করে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে খিলাফৎ নেতারা হতাশ হন। তাঁরা মনে করেন, কংগ্রেস মুসলিমদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়নি।
  2. খিলাফৎ-এর অবসান: ১৯২৪ সালে তুরস্কেই খলিফা পদের অবসান ঘটলে খিলাফৎ আন্দোলনের মূল ভিত্তিই desaparece যায়, ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের तात्कालिक কারণটিও শেষ হয়ে যায়।
  3. হিন্দু মহাসভার উত্থান: এই সময়ে হিন্দু মহাসভার মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং কংগ্রেসের অনেক নেতা, যেমন মদনমোহন মালব্য, এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের কার্যকলাপ কংগ্রেসে হিন্দু প্রভাব বাড়িয়ে তোলে, যা মুসলিম নেতাদের কংগ্রেস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
  4. দাঙ্গা: ১৯২২-২৩ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।
এইসব কারণে মহম্মদ আলির মতো সম্প্রীতিবাদী মুসলিম নেতারাও কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যান এবং মুসলিমদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক পথের সন্ধান শুরু করেন।

১৯৪০-১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কীভাবে ভারত-ভাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল? তোমার কী মনে হয় ভারত বিভাগ সত্যিই অপরিহার্য ছিল?

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে একাধিক ঘটনার মাধ্যমে ভারত-ভাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  1. পাকিস্তান প্রস্তাব (১৯৪০): মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'-এর দাবি উত্থাপিত হয়, যা বিভাজনের দাবিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়।
  2. ক্রিপস মিশন ও কংগ্রেসের ভূমিকা: ক্রিপস মিশনের (১৯৪২) ব্যর্থতা এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কংগ্রেস নেতাদের কারারুদ্ধ থাকা অবস্থায় মুসলিম লিগ তার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর সুযোগ পায়।
  3. ১৯৪৬-এর নির্বাচন ও ক্যাবিনেট মিশন: নির্বাচনে মুসলিম লিগ মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বিপুল সাফল্য পেয়ে প্রমাণ করে যে তারাই মুসলিমদের প্রধান প্রতিনিধি। এরপর ক্যাবিনেট মিশনের অখণ্ড ভারতের প্রস্তাব লিগ ও কংগ্রেস উভয়েই প্রত্যাখ্যান করলে বিভাজন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
  4. প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও দাঙ্গা: ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট লিগের 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম'-এর ডাকের ফলে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়, তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই ব্যাপক हिंसाচার প্রমাণ করে দেয় যে, হিন্দু ও মুসলমানের একসঙ্গে থাকা প্রায় অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে, ভারত বিভাগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। যদিও দেশভাগ একটি ট্র্যাজেডি, কিন্তু তৎকালীন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কংগ্রেস ও লিগের নেতারা দেশভাগকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৪৬)

১। ঠিকশব্দ বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো:

ক) ঔপনিবেশিক ভারতে সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসির বদলে ইংরেজিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, (১৮৪৭/১৮৩৭/১৮৫০) খ্রিস্টাব্দে।

খ) ভারতের মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণের অভিযান প্রথম শুরু করেছিলেন, (মহম্মদ আলি জিন্নাহ/মৌলানা আবুল কালাম আজাদ/স্যার সৈয়দ আহমদ খান)।

গ) কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ছিলেন (এ. কে. ফজলুল হক/মহম্মদ আলি জিন্নাহ/ জওহরলাল নেহরু)।

ঘ) স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল (১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট/১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট/১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি)।

২। নীচের বিবৃতিগুলির কোনটি ঠিক কোনটি ভুল বেছে নাও:

ক) উনিশ শতকে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানেরা শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। - ঠিক

খ) হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছিল। - ঠিক

গ) মহাত্মা গান্ধি খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। - ভুল

ঘ) পাকিস্তান প্রস্তাব তোলা হয়েছিল ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের লাহোর অধিবেশনে। - ঠিক

৩। অতি সংক্ষেপে উত্তর দাও (৩০-৪০টি শব্দ):

ক) আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল?

আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং ইসলামীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন করা। স্যার সৈয়দ আহমদ খান এর মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আধুনিক ও স্বনির্ভর করে তুলতে চেয়েছিলেন।

খ) স্বদেশি আন্দোলন বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

স্বদেশি আন্দোলনে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক (যেমন দেশকে মাতৃরূপে বন্দনা) ব্যবহারের ফলে মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে। ব্রিটিশ সরকারের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির ফলে এবং বঙ্গভঙ্গকে মুসলিমদের জন্য সুবিধাজনক হিসেবে প্রচার করায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক তিক্ত হয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন বৃদ্ধি পায়।

গ) ভারতীয় মুসলমানেরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিলেন কেন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সুলতান, যিনি মুসলিম বিশ্বের খলিফা ছিলেন, ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব করা হয়। এর প্রতিবাদে এবং খলিফার সম্মান পুনরুদ্ধারের দাবিতে ভারতীয় মুসলমানেরা খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

ঘ) ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কেন?

১৯৩০ সালটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বছরেই মুসলিম লিগের এলাহাবাদ অধিবেশনে কবি মহম্মদ ইকবাল প্রথমবার মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা দেন। এটিই পরবর্তীকালে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' এবং পাকিস্তান দাবির তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে, যা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেয়।

৪। নিজের ভাষায় লেখো (১২০-১৬০ টি শব্দ):

ক) স্যার সৈয়দ আহমদ খান কীভাবে মুসলমান সমাজকে আধুনিকীকরণের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তা বিশ্লেষণ করো।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন উনিশ শতকে ভারতীয় মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণের প্রধান পথিকৃৎ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ছাড়া মুসলিমদের উন্নতি সম্ভব নয়।
তাঁর পদক্ষেপগুলি ছিল:

  1. শিক্ষা বিস্তার: তিনি মুসলিমদের মধ্যে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে জোর দেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭ cinquième সালে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ (পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইসলামীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো হয়।
  2. সমাজ সংস্কার: তিনি পুরোনো প্রথা, যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস এবং पर्दा প্রথার বিরোধিতা করেন। তিনি পির ও উলেমাদের গোঁড়ামির সমালোচনা করেন।
  3. যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা: তিনি আধুনিক যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কোরানের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, যাতে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইসলামের কোনো সংঘাত না থাকে।
তবে তাঁর কার্যকলাপ মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি মুসলিমদের কংগ্রেস থেকে দূরে থাকতে উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে।

খ) কীভাবে উনিশ শতকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল? সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে ঐসব আন্দোলনগুলির ভূমিকা কী ছিল?

উনিশ শতকে ব্রাহ্ম আন্দোলনের মতো সংস্কারমুখী আন্দোলনগুলির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার তাগিদ থেকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের প্রাচীন গৌরব পুনরুদ্ধার করা এবং হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করা। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজ, স্বামী বিবেকানন্দের নব্য-বেদান্ত এবং চরমপন্থী নেতাদের কার্যকলাপ এর অন্তর্গত।
সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা:

  1. এই আন্দোলনগুলি ভারতকে 'হিন্দু রাষ্ট্র' এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে 'হিন্দু সংস্কৃতি' হিসেবে তুলে ধরে, যা মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন করে।
  2. বলা হয়, মুসলিম শাসনের ফলেই ভারতের প্রাচীন গৌরবময় সভ্যতার পতন ঘটেছে। এই ধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করে।
  3. চরমপন্থী নেতারা যখন তিলকের গণপতি ও শিবাজি উৎসব বা দেশকে মাতৃরূপে বন্দনার মতো হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকগুলিকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন মুসলিমদের একটি বড় অংশ জাতীয় আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।
এইভাবে, এই আন্দোলনগুলি অসচেতনভাবে হলেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বদলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথকেই প্রশস্ত করেছিল।

গ) অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পরে কীভাবে মুসলমান নেতাদের অনেকের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল?

অসহযোগ আন্দোলনের সময় খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করে গান্ধিজি যে অভূতপূর্ব হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন, তা আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ভেঙে যায়। এর পিছনে একাধিক কারণ ছিল:

  1. আন্দোলন প্রত্যাহার: চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধিজি হঠাৎ করে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে খিলাফৎ নেতারা হতাশ হন। তাঁরা মনে করেন, কংগ্রেস মুসলিমদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়নি।
  2. খিলাফৎ-এর অবসান: ১৯২৪ সালে তুরস্কেই খলিফা পদের অবসান ঘটলে খিলাফৎ আন্দোলনের মূল ভিত্তিই desaparece যায়, ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের तात्कालिक কারণটিও শেষ হয়ে যায়।
  3. হিন্দু মহাসভার উত্থান: এই সময়ে হিন্দু মহাসভার মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং কংগ্রেসের অনেক নেতা, যেমন মদনমোহন মালব্য, এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের কার্যকলাপ কংগ্রেসে হিন্দু প্রভাব বাড়িয়ে তোলে, যা মুসলিম নেতাদের কংগ্রেস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
  4. দাঙ্গা: ১৯২২-২৩ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।
এইসব কারণে মহম্মদ আলির মতো সম্প্রীতিবাদী মুসলিম নেতারাও কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যান এবং মুসলিমদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক পথের সন্ধান শুরু করেন।

ঘ) ১৯৪০-১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কীভাবে ভারত-ভাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল? তোমার কী মনে হয় ভারত বিভাগ সত্যিই অপরিহার্য ছিল? তোমার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাও।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে একাধিক ঘটনার মাধ্যমে ভারত-ভাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  1. পাকিস্তান প্রস্তাব (১৯৪০): মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'-এর দাবি উত্থাপিত হয়, যা বিভাজনের দাবিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়।
  2. ক্রিপস মিশন ও কংগ্রেসের ভূমিকা: ক্রিপস মিশনের (১৯৪২) ব্যর্থতা এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কংগ্রেস নেতাদের কারারুদ্ধ থাকা অবস্থায় মুসলিম লিগ তার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর সুযোগ পায়।
  3. ১৯৪৬-এর নির্বাচন ও ক্যাবিনেট মিশন: নির্বাচনে মুসলিম লিগ মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বিপুল সাফল্য পেয়ে প্রমাণ করে যে তারাই মুসলিমদের প্রধান প্রতিনিধি। এরপর ক্যাবিনেট মিশনের অখণ্ড ভারতের প্রস্তাব লিগ ও কংগ্রেস উভয়েই প্রত্যাখ্যান করলে বিভাজন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
  4. প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও দাঙ্গা: ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট লিগের 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম'-এর ডাকের ফলে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়, তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই ব্যাপক हिंसाচার প্রমাণ করে দেয় যে, হিন্দু ও মুসলমানের একসঙ্গে থাকা প্রায় অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে, ভারত বিভাগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। যদিও দেশভাগ একটি ট্র্যাজেডি, কিন্তু তৎকালীন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কংগ্রেস ও লিগের নেতারা দেশভাগকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।