অধ্যায় ৫: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সমাজে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—একদিকে ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সহযোগিতা ও সংস্কার আন্দোলন, অন্যদিকে ছিল কৃষক ও উপজাতি সম্প্রদায়ের সশস্ত্র বিদ্রোহ।
- সহযোগিতা ও সংস্কার: রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিওর নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী, জ্যোতিরাও ফুলে, স্যর সৈয়দ আহমদ খানের মতো ব্যক্তিত্বরা ব্রিটিশদের সহযোগিতায় সমাজ সংস্কারে ব্রতী হন। তাঁদের উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা রদ (১৮২৯), বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬) পাসের মতো ঘটনা ঘটে। ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, আলিগড় আন্দোলন ইত্যাদি ಸಂಸ್ಥাগুলি ধর্ম ও শিক্ষা সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বিদ্রোহ: ঔপনিবেশিক ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, শোষণ এবং বহিরাগতদের (দিকু) অত্যাচারে কৃষক ও উপজাতি সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর ফলে সাঁওতাল হুল (১৮৫৫-৫৬), মুন্ডা উলগুলান, ফরাজি ও ওয়াহাবি আন্দোলন (বারাসাত বিদ্রোহ), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) এবং মোপালা বিদ্রোহের মতো একাধিক স্থানীয় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
- ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ: সিপাহিদের মধ্যে জমে থাকা নানা ক্ষোভ, বিশেষত এনফিল্ড রাইফেলের টোটা সংক্রান্ত গুজবকে কেন্দ্র করে ১৮৫৭ সালে যে বিদ্রোহ শুরু হয়, তা দ্রুত উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সিপাহিদের সঙ্গে যোগ দেয় ক্ষমতাচ্যুত রাজা-জমিদার এবং সাধারণ মানুষ। বাহাদুর শাহ জাফর, নানা সাহেব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। যদিও ব্রিটিশরা কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করে, এর ফলেই ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে এবং সরাসরি ব্রিটিশ মহারানির শাসন (১৮৫৮) প্রতিষ্ঠিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| ১৭৮০ | জেমস অগাস্টাস হিকির 'বেঙ্গল গেজেট' প্রকাশ। |
| ১৮১৫ | রামমোহন রায়ের আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা। |
| ১৮১৮ | 'সমাচার দর্পণ' পত্রিকা প্রকাশ। |
| ১৮২৮ | ব্রাহ্ম সমাজ (প্রথমে ব্রাহ্ম সভা) প্রতিষ্ঠা। |
| ১৮২৯ | লর্ড বেন্টিঙ্ক আইন করে সতীদাহ প্রথা রদ করেন। |
| ১৮৩১ | বারাসাত বিদ্রোহ বা নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লার পতন। |
| ১৮৫১ | জ্যোতিরাও ফুলে পুনায় নারী শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। |
| ১৮৫৬ | হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন জারি হয়। |
| ১৮৫৫-৫৬ | সাঁওতাল হুল (বিদ্রোহ) সংঘটিত হয়। |
| ১৮৫৭ | মহাবিদ্রোহের সূচনা। |
| ১৮৫৮ | ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ও ব্রিটিশ মহারানির শাসন শুরু। |
| ১৮৫৯-৬০ | বাংলায় নীল বিদ্রোহ। |
| ১৮۶۳ | কলকাতায় মহামেডান লিটেরারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা। |
| ۱۸۷۵ | স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং স্যর সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা। |
| ১৮۹۳ | স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে যোগদান। |
| ১৮৯۹-۱۹۰۰ | বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা উলগুলান (বিদ্রোহ)। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
ভারতে প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা 'বেঙ্গল গেজেট' কে প্রকাশ করেন?
(ক) মার্শম্যান (খ) জেমস অগাস্টাস হিকি (গ) রামমোহন রায় (ঘ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) জেমস অগাস্টাস হিকি
সতীদাহ প্রথা রদ হয় কবে?
(ক) ১৮০৩ খ্রি: (খ) ১৮২৯ খ্রি: (গ) ১৮৫৬ খ্রি: (ঘ) ১৮৭৫ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৮২৯ খ্রি:
সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন কে জারি করেন?
(ক) লর্ড ওয়েলেসলি (খ) লর্ড ডালহৌসি (গ) লর্ড ক্যানিং (ঘ) লর্ড বেন্টিঙ্ক
উত্তর: (ঘ) লর্ড বেন্টিঙ্ক
হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন কবে জারি হয়?
(ক) ১৮২৯ খ্রি: (খ) ১৮৫০ খ্রি: (গ) ১৮৫৬ খ্রি: (ঘ) ১৮৬৬ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৮৫৬ খ্রি:
বিধবা বিবাহ আন্দোলনের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
(ক) রাজা রামমোহন রায় (খ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (গ) ডিরোজিও (ঘ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (খ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা কে?
(ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (খ) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (গ) কেশবচন্দ্র সেন (ঘ) রাজা রামমোহন রায়
উত্তর: (খ) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও
বোম্বাইয়ে প্রার্থনা সমাজ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন কে?
(ক) জ্যোতিরাও ফুলে (খ) বিষুশাস্ত্রী পন্ডিত (গ) আত্মারাম পান্ডুরং (ঘ) বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু
উত্তর: (গ) আত্মারাম পান্ডুরং
আত্মীয় সভা কে প্রতিষ্ঠা করেন?
(ক) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) কেশবচন্দ্র সেন (গ) রাজা রামমোহন রায় (ঘ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উত্তর: (গ) রাজা রামমোহন রায়
ব্রাহ্ম সমাজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
(ক) ১৮১৫ খ্রি: (খ) ১৮২৮ খ্রি: (গ) ১৮২৯ খ্রি: (ঘ) ১৮৬০ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৮২৮ খ্রি:
আর্য সমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
(ক) স্বামী বিবেকানন্দ (খ) রামকৃষ্ণ পরমহংস (গ) স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (ঘ) রাজনারায়ণ বসু
উত্তর: (গ) স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
হিন্দুমেলা কার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
(ক) রাজনারায়ণ বসু (খ) নবগোপাল মিত্র (গ) স্বামী বিবেকানন্দ (ঘ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (খ) নবগোপাল মিত্র
স্বামী বিবেকানন্দ কবে শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে যোগ দেন?
(ক) ১৮৭৫ খ্রি: (খ) ১৮৯০ খ্রি: (গ) ১৮৯৩ খ্রি: (ঘ) ১৮৯৭ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৮৯৩ খ্রি:
আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
(ক) আব্দুল ওয়াহাব (খ) হাজি শরিয়তউল্লা (গ) স্যর সৈয়দ আহমদ খান (ঘ) তিতুমির
উত্তর: (গ) স্যর সৈয়দ আহমদ খান
সাঁওতালরা বহিরাগত মহাজনদের কী বলত?
(ক) হুল (খ) উলগুলান (গ) দিকু (ঘ) সাহেব
উত্তর: (গ) দিকু
সাঁওতাল বিদ্রোহের একজন নেতার নাম লেখো।
(ক) তিতুমির (খ) বিরসা (গ) সিধু (ঘ) দুদু মিঞা
উত্তর: (গ) সিধু
ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের সূচনা কে করেন?
(ক) আব্দুল ওয়াহাব (খ) তিতুমির (গ) সৈয়দ আহমদ (রায়বেরিলি) (ঘ) হাজি শরিয়তউল্লা
উত্তর: (গ) সৈয়দ আহমদ (রায়বেরিলি)
তিতুমিরের আসল নাম কী?
(ক) মির নিসার আলি (খ) সৈয়দ আহমদ (গ) শরিয়তউল্লা (ঘ) আব্দুল ওয়াহাব
উত্তর: (ক) মির নিসার আলি
বারাসাত বিদ্রোহে তিতুমির কোথায় বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন?
(ক) বারাসাত (খ) বসিরহাট (গ) নারকেলবেড়িয়া (ঘ) ফরিদপুর
উত্তর: (গ) নারকেলবেড়িয়া
'নীলদর্পণ' নাটকটি কে লেখেন?
(ক) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (খ) জেমস লং (গ) শিশির কুমার ঘোষ (ঘ) দীনবন্ধু মিত্র
উত্তর: (ঘ) দীনবন্ধু মিত্র
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কোথায় প্রথম শুরু হয়?
(ক) ব্যারাকপুর (খ) দমদম (গ) মিরাট (ঘ) দিল্লি
উত্তর: (গ) মিরাট
ব্যারাকপুরে প্রথম ব্রিটিশ আধিকারিককে কে গুলি করেন?
(ক) মঙ্গল পাণ্ডে (খ) বাহাদুর শাহ জাফর (গ) নানা সাহেব (ঘ) তিতুমির
উত্তর: (ক) মঙ্গল পাণ্ডে
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা কাকে 'হিন্দুস্থানের সম্রাট' ঘোষণা করে?
(ক) নানা সাহেব (খ) ঝাঁসির রানি (গ) ওয়াজিদ আলি শাহ (ঘ) বাহাদুর শাহ জাফর
উত্তর: (ঘ) বাহাদুর শাহ জাফর
ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান হয় কবে?
(ক) ১৮৫৭ খ্রি: (খ) ১৮৫৮ খ্রি: (গ) ১৮৫৯ খ্রি: (ঘ) ১৮৬৩ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৮৫৮ খ্রি:
ভারতের প্রথম ভাইসরয় কে ছিলেন?
(ক) লর্ড ডালহৌসি (খ) লর্ড বেন্টিঙ্ক (গ) লর্ড ক্যানিং (ঘ) লর্ড রিপন
উত্তর: (গ) লর্ড ক্যানিং
মোপালা বিদ্রোহ কোথায় হয়েছিল?
(ক) বাংলা (খ) দাক্ষিণাত্য (গ) মালাবার (ঘ) छोटाনাগপুর
উত্তর: (গ) মালাবার
'সমাচার দর্পণ' পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?
(ক) জেমস হিকি (খ) মার্শম্যান (গ) রামমোহন রায় (ঘ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) মার্শম্যান
সত্যশোধক সমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
(ক) আত্মারাম পান্ডুরং (খ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডে (গ) জ্যোতিরাও ফুলে (ঘ) বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু
উত্তর: (গ) জ্যোতিরাও ফুলে
ফরাজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
(ক) তিতুমির (খ) দুদু মিঞা (গ) হাজি শরিয়তউল্লা (ঘ) সৈয়দ আহমদ
উত্তর: (গ) হাজি শরিয়তউল্লা
নীল বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম কী?
(ক) সিধু ও কানহু (খ) চাঁদ ও ভৈরব (গ) বিষুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস (ঘ) তিতুমির ও গোলাম মাসুম
উত্তর: (গ) বিষুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস
মুন্ডা উলগুলানের নেতা কে ছিলেন?
(ক) সিধু (খ) কানহু (গ) বিরসা মুন্ডা (ঘ) তিতুমির
উত্তর: (গ) বিরসা মুন্ডা
কলকাতায় আত্মীয় সভা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
(ক) ১৮১৫ খ্রি: (খ) ১৮২৮ খ্রি: (গ) ১৮২৯ খ্রি: (ঘ) ১৮৩০ খ্রি:
উত্তর: (ক) ১৮১৫ খ্রি:
মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে বিধবা বিবাহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কে?
(ক) পণ্ডিতা রমাবাঈ (খ) ভগিনী শুভলক্ষ্মী (গ) বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু (ঘ) জ্যোতিরাও ফুলে
উত্তর: (গ) বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু
লর্ড ওয়েলেসলি সাগরে শিশুকন্যা ভাসিয়ে দেওয়া কবে নিষিদ্ধ করেন?
(ক) ১৮০১ খ্রি: (খ) ১৮০৩ খ্রি: (গ) ১৮২৯ খ্রি: (ঘ) ১৮৫৬ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৮০৩ খ্রি:
কোন গভর্নর জেনারেলের আমলে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাস হয়?
(ক) লর্ড বেন্টিঙ্ক (খ) লর্ড ডালহৌসি (গ) লর্ড ক্যানিং (ঘ) লর্ড হার্ডিঞ্জ
উত্তর: (খ) লর্ড ডালহৌসি
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে 'জাতীয় বিদ্রোহ' বলে কে প্রথম উল্লেখ করেন?
(ক) কার্ল মার্কস (খ) দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (গ) শিবনাথ শাস্ত্রী (ঘ) লর্ড ক্যানিং
উত্তর: (ক) কার্ল মার্কস
১৮৫৭-র বিদ্রোহের পর বাহাদুর শাহ জাফরকে কোথায় নির্বাসন দেওয়া হয়?
(ক) আন্দামান (খ) দিল্লি (গ) রেঙ্গুন (ঘ) লন্ডন
উত্তর: (গ) রেঙ্গুন
মহামেডান লিটেরারি সোসাইটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
(ক) ১৮৬৩ খ্রি: (খ) ১৮৬৪ খ্রি: (গ) ১৮৭৫ খ্রি: (ঘ) ১৮৮৫ খ্রি:
উত্তর: (ক) ১৮৬৩ খ্রি:
রামকৃষ্ণের শিষ্য কে ছিলেন?
(ক) কেশবচন্দ্র সেন (খ) বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী (গ) স্বামী বিবেকানন্দ (ঘ) স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
উত্তর: (গ) স্বামী বিবেকানন্দ
কোন আইনে গভর্নর জেনারেল পদটি তুলে দিয়ে ভাইসরয় পদ তৈরি করা হয়?
(ক) ১৮১৩ সালের সনদ আইন (খ) ১৮৩৩ সালের সনদ আইন (গ) ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন (ঘ) ১৮৬১ সালের আইন
উত্তর: (গ) ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন
'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?
(ক) দীনবন্ধু মিত্র (খ) শিশির কুমার ঘোষ (গ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (ঘ) নবগোপাল মিত্র
উত্তর: (গ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
এনফিল্ড রাইফেলের টোটা নিয়ে গুজব প্রথম কোথায় ছড়ায়?
(ক) ব্যারাকপুর (খ) মিরাট (গ) আম্বালা (ঘ) দমদম
উত্তর: (ঘ) দমদম
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় কানপুরে কে নেতৃত্ব দেন?
(ক) বাহাদুর শাহ জাফর (খ) মঙ্গল পাণ্ডে (গ) নানা সাহেব (ঘ) রানি লক্ষ্মীবাঈ
উত্তর: (গ) নানা সাহেব
কোন ব্রিটিশ আধিকারিক নীল বিদ্রোহের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন?
(ক) লর্ড ক্যানিং (খ) জেমস অগাস্টাস হিকি (গ) রেভারেন্ড জেমস লং (ঘ) লর্ড বেন্টিঙ্ক
উত্তর: (গ) রেভারেন্ড জেমস লং
বিদ্যাসাগর কোন কলেজে পড়ার সময় শিক্ষা সংস্কারে উদ্যোগী হন?
(ক) হিন্দু কলেজ (খ) ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (গ) সংস্কৃত কলেজ (ঘ) প্রেসিডেন্সি কলেজ
উত্তর: (গ) সংস্কৃত কলেজ
'ভদ্রলোক' কাদের বলা হতো?
(ক) কৃষক (খ) জমিদার (গ) হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি (ঘ) ব্রিটিশ কর্মচারী
উত্তর: (গ) হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি
১৮৫৭ সালের ১০ই মে সিপাহিরা কোথায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে?
(ক) ব্যারাকপুর (খ) দিল্লি (গ) লখনউ (ঘ) মিরাট
উত্তর: (ঘ) মিরাট
আলিগড় আন্দোলন কার নেতৃত্বে হয়েছিল?
(ক) হাজি শরিয়তউল্লা (খ) স্যর সৈয়দ আহমদ খান (গ) তিতুমির (ঘ) আব্দুল ওয়াহাব
উত্তর: (খ) স্যর সৈয়দ আহমদ খান
ভারতে ব্রিটিশ মহারানির শাসন কবে থেকে শুরু হয়?
(ক) ১৮৫৭ সালের ১ নভেম্বর (খ) ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর (গ) ১৮৫৯ সালের ১ নভেম্বর (ঘ) ১৮৬০ সালের ১ নভেম্বর
উত্তর: (খ) ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর
সাঁওতাল বিদ্রোহকে কী বলা হত?
(ক) উলগুলান (খ) হুল (গ) বারাসাত বিদ্রোহ (ঘ) ফরাজি
উত্তর: (খ) হুল
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
ঔপনিবেশিক সমাজে 'মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' কাদের বলা হতো?
ঔপনিবেশিক ভারতে, বিশেষত বাংলায়, ব্রিটিশ শাসনের সুযোগ-সুবিধা (যেমন - চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ইংরেজি শিক্ষা) পেয়ে হিন্দু উচ্চবর্ণের যে শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, তাদের 'মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' বলা হতো।
দুটি বাংলা সংবাদপত্রের নাম লেখো।
ঊনবিংশ শতকের দুটি উল্লেখযোগ্য বাংলা সংবাদপত্র হলো 'দিগদর্শন' (মাসিক) এবং 'সমাচার দর্পণ' (সাপ্তাহিক)।
সতীদাহ প্রথা রদে রামমোহনের প্রধান যুক্তি কী ছিল?
রামমোহন রায় শাস্ত্র থেকেই উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা শাস্ত্রসম্মত নয়। তিনি যুক্তি দেন যে, নারীদের বিদ্যাশিক্ষা বা জ্ঞানচর্চার সুযোগ না দিয়ে তাদের 'অল্পবুদ্ধি' বলা অযৌক্তিক এবং শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে পুড়িয়ে মারা ধর্ম ও লোকমত বিরোধী।
নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কোন কোন প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন?
ডিরোজিওর নেতৃত্বে নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং মূর্তিপূজার মতো প্রচলিত হিন্দু সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা ও মতামত প্রকাশ করেছিলেন।
নারীশিক্ষায় বিদ্যাসাগরের দুটি উদ্যোগ উল্লেখ করো।
নারীশিক্ষায় বিদ্যাসাগরের দুটি প্রধান উদ্যোগ হলো: (১) বেথুন স্কুলে মেয়েদের পাঠানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে প্রচার চালানো এবং (২) নিজের খরচে বাংলার বিভিন্ন জেলায় মেয়েদের জন্য একাধিক বিদ্যালয় স্থাপন করা।
পণ্ডিতা রমাবাঈ কে ছিলেন?
পণ্ডিতা রমাবাঈ ছিলেন ঊনবিংশ শতকের পশ্চিম ভারতের একজন অগ্রগণ্য সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। তিনি সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে ডাক্তারি পড়েন এবং বিধবা মহিলাদের শিক্ষার জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্রাহ্ম আন্দোলনের দুজন নেতার নাম লেখো।
রাজা রামমোহন রায়ের পরবর্তীকালে ব্রাহ্ম আন্দোলনের দুজন প্রধান নেতা ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেন।
আর্য সমাজের দুটি সংস্কারমূলক কাজের উল্লেখ করো।
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজের দুটি সংস্কারমূলক কাজ হলো মূর্তিপূজা ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করা এবং বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার পক্ষে প্রচার চালানো।
স্যর সৈয়দ আহমদের সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
স্যর সৈয়দ আহমদের সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সমাজের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিশেষত বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো, যাতে তারা ঔপনিবেশিক প্রশাসনে নিজেদের যোগ্য স্থান করে নিতে পারে।
'দিকু' কাদের বলা হত?
সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে বহিরাগত জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী ও ইজারাদারদের, যারা সাঁওতালদের উপর শোষণ ও অত্যাচার চালাত, তাদের সাঁওতালরা 'দিকু' বলে অভিহিত করত।
সাঁওতাল হুলের চারজন নেতার নাম লেখো।
সাঁওতাল হুল বা বিদ্রোহের চারজন প্রধান নেতা ছিলেন চার ভাই—সিধু, কানহু, চাঁদ ও ভৈরব।
তিতুমির কাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন?
তিতুমির তাঁর বারাসাত বিদ্রোহে স্থানীয় জমিদার, ইংরেজ নীলকর এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন।
ফরাজি আন্দোলন কী?
ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে হাজি শরিয়তউল্লার নেতৃত্বে ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণ এবং স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাই ফরাজি আন্দোলন নামে পরিচিত।
নীল বিদ্রোহে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার ভূমিকা কী ছিল?
'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিকভাবে নীলকরদের অত্যাচার এবং চাষিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে জনমত গঠন করেন, যা নীল বিদ্রোহকে ব্যাপকভাবে সমর্থন জুগিয়েছিল।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল নতুন এনফিল্ড রাইফেলের টোটার প্রবর্তন। সিপাহিদের মধ্যে গুজব রটে যায় যে, এই টোটায় গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে, যা দাঁত দিয়ে কেটে ব্যবহার করলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সিপাহিরই ধর্ম নষ্ট হবে।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী দুজন নেত্রীর নাম লেখো।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী দুজন উল্লেখযোগ্য নেত্রী হলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ এবং অযোধ্যার বেগম হজরত মহল।
১৮৫৮ সালের মহারানির ঘোষণার দুটি বিষয় উল্লেখ করো।
১৮৫৮ সালের মহারানির ঘোষণার দুটি প্রধান বিষয় হলো: (১) ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ মহারানির শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং (২) স্বত্ববিলোপ নীতির মতো রাজ্যগ্রাসী নীতি বাতিল করে দেশীয় রাজাদের অধিকার সুরক্ষিত করার আশ্বাস দেওয়া।
'উলগুলান' কথার অর্থ কী?
'উলগুলান' একটি মুন্ডারি শব্দ, যার অর্থ 'ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা' বা 'প্রবল বিক্ষোভ'। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে পরিচালিত মুন্ডা বিদ্রোহ 'উলগুলান' নামে পরিচিত ছিল।
জ্যোতিরাও ফুলে কেন বিখ্যাত?
জ্যোতিরাও ফুলে মহারাষ্ট্রের একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গীয় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেন এবং স্ত্রী সাবিত্রী বাঈকে নিয়ে নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মোপালা কারা?
দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূলের দরিদ্র মুসলিম কৃষক, কৃষি শ্রমিক, জেলে ও ছোট ব্যবসায়ীদের 'মোপালা' বলা হতো। তারা ঔপনিবেশিক আমলে চড়া রাজস্ব ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিদ্রোহ করেছিল।
ব্রাহ্ম সমাজের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
ব্রাহ্ম সমাজের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল এটি মূলত কলকাতার উচ্চবর্ণের, শিক্ষিত ও ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। সাধারণ জনগণের সঙ্গে এর বিশেষ যোগাযোগ ছিল না এবং জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে এটি ততটা সোচ্চার হয়নি।
ধর্ম সংস্কার আন্দোলনগুলি কেন শাস্ত্র-নির্ভর ছিল?
ঊনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কারকরা রক্ষণশীলদের বিরোধিতা এড়ানোর জন্য এবং নিজেদের বক্তব্যের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ধর্মশাস্ত্রের সাহায্য নিতেন। তাঁরা শাস্ত্র থেকেই উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে, সতীদাহ বা বিধবা বিবাহের মতো বিষয়গুলি শাস্ত্রসম্মত।
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর অবদান কী?
ব্রাহ্ম নেতা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ব্রাহ্ম ভাবধারার সঙ্গে বৈষ্ণব ধর্মের জনপ্রিয় ঐতিহ্যের সংযোগ স্থাপন করে ব্রাহ্ম আন্দোলনকে কলকাতার বাইরে বিভিন্ন জেলায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
'গোরে আয়ে, গোরে আয়ে' কথার অর্থ কী?
এই কথার অর্থ হলো "সাদা চামড়ার লোক (ইংরেজ সৈন্য) এসেছে"। ১৮৫৭ সালে মিরাটে এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েই সিপাহিরা উত্তেজিত হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছিল।
আলিগড় আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতা লেখো।
স্যর সৈয়দ আহমদ খান পরিচালিত আলিগড় আন্দোলনের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল এটি মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। বিশাল সংখ্যক গরিব ও গ্রামীণ মুসলমানদের উপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
শেষ মুঘল সম্রাটের কী পরিণতি হয়েছিল?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ব্রিটিশরা বন্দি করে। বিচারের পর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয়, সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
১৮৫৭-র বিদ্রোহে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ কী ভূমিকা নিয়েছিল?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে বাঙালি শিক্ষিত সমাজের অধিকাংশই বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি। তারা ব্রিটিশ শাসনের সুফল ভোগ করত এবং বিদ্রোহের ফলে অর্জিত স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে বলে মনে করত। তাই তাদের অনেকেই এই বিদ্রোহের নিন্দাও করেছিল।
দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কে ছিলেন?
দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন বাঙালি সরকারি কর্মচারী, যিনি বেরিলিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর 'বিদ্রোহে বাঙ্গালী' গ্রন্থে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
১৮৫৭-র বিদ্রোহে চাপাটি (রুটি) পাঠানোর তাৎপর্য কী ছিল?
১৮৫৭-র বিদ্রোহের সময় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চাপাটি বা রুটি পাঠানোর মাধ্যমে বিদ্রোহের সংকেত, বার্তা ও খবরাখবর আদান-প্রদান করা হতো। এটি ছিল বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা।
কেন ১৮৫৭-র বিদ্রোহ দক্ষিণ ভারতে ছড়ায়নি?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল। দক্ষিণ ভারত এই বিদ্রোহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল কারণ সেখানকার সিপাহিরা (মাদ্রাজ আর্মি) বিদ্রোহে যোগ দেয়নি এবং সেই অঞ্চলের মানুষ ব্রিটিশ শাসনের দ্বারা ততটা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
ঊনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনগুলির চরিত্র ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
ঊনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনগুলির চরিত্র ছিল মূলত উচ্চবর্গীয়, শহরকেন্দ্রিক এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা স্যর সৈয়দ আহমদ খানের মতো সংস্কারকরা ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় আইনি পথে সমাজ সংস্কারের চেষ্টা করেন। তাঁদের উদ্যোগ সতীদাহ রদ বা বিধবা বিবাহের মতো ক্ষেত্রে সফল হলেও এর কিছু সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল।
সীমাবদ্ধতা:
- সামাজিক ভিত্তি: এই আন্দোলনগুলি মূলত কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজের মতো শহরের উচ্চবর্ণের, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত 'ভদ্রলোক' শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ ভারতের বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষ, বিশেষত নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে এর কোনো যোগ ছিল না।
- শাস্ত্রনির্ভরতা: সংস্কারকরা প্রায়শই কুপ্রথাগুলির অমানবিকতার দিকে জোর না দিয়ে, সেগুলি 'শাস্ত্রসম্মত' কি না, সেই তর্কে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এটি সংস্কারের আবেদনকে সীমিত করে দেয়।
- জাতিভেদ বিষয়ে উদাসীনতা: সংস্কারকদের অধিকাংশই উচ্চবর্ণের হওয়ায় তাঁরা জাতিভেদ প্রথার মতো মূল সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে তেমন সোচ্চার হননি।
সাঁওতাল হুল (১৮৫৫-৫৬) এবং নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।
সাঁওতাল হুল এবং নীল বিদ্রোহ উভয়ই ছিল ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া, তবে এদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ছিল।
সাদৃশ্য:
- উভয় বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক শোষণ। সাঁওতালরা জমিদার ও মহাজনদের (দিকু) দ্বারা শোষিত হয়েছিল, আর নীল চাষিরা নীলকর সাহেবদের দ্বারা।
- দুটি বিদ্রোহেই ঔপনিবেশিক প্রশাসন শোষকদের পক্ষ নিয়েছিল এবং কঠোরভাবে বিদ্রোহ দমন করেছিল।
- অংশগ্রহণকারী: সাঁওতাল হুল ছিল মূলত একটি উপজাতি বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল বহিরাগতদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে, নীল বিদ্রোহ ছিল সাধারণ কৃষকদের বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল নীল চাষের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া।
- শিক্ষিত সমাজের ভূমিকা: সাঁওতাল বিদ্রোহ শিক্ষিত বাঙালি সমাজের তেমন সমর্থন পায়নি। কিন্তু নীল বিদ্রোহে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট'-এর হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকের মতো শিক্ষিত শ্রেণির একটি বড় অংশ চাষিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, যা এই বিদ্রোহকে একটি ভিন্ন মাত্রা দেয়।
তুমি কি মনে করো ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে কেবল 'সিপাহি বিদ্রোহ' বলা যুক্তিসঙ্গত? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
না, আমি মনে করি না যে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কেবল 'সিপাহি বিদ্রোহ' বলা যুক্তিসঙ্গত। যদিও এর সূচনা সিপাহিদের হাত ধরে হয়েছিল, তবে এর চরিত্র ছিল আরও ব্যাপক।
যুক্তি:
- গণ-অংশগ্রহণ: মিরাটে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর তা দ্রুত অযোধ্যা, কানপুর, দিল্লি, ঝাঁসির মতো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব জায়গায় বিদ্রোহী সিপাহিদের সঙ্গে যোগ দেয় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, কৃষক, কারিগর এবং ক্ষমতাচ্যুত জমিদার ও সামন্তপ্রভু।
- শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া: সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা কোম্পানির ভূমি-রাজস্ব নীতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মহাজনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। তারা এই বিদ্রোহকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। একারণেই তারা ব্রিটিশদের পাশাপাশি স্থানীয় মহাজনদেরও আক্রমণ করে।
- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: বিদ্রোহীরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিল, যা তাদের মধ্যে একটি সাধারণ ব্রিটিশ-বিরোধী চেতনা প্রমাণ করে।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণগুলি কী ছিল? এই বিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পিছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান ছিল।
কারণ:
- রাজনৈতিক কারণ: লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুরের মতো রাজ্য দখল এবং অপশাসনের অভিযোগে অযোধ্যা দখল, যা রাজন্যবর্গকে ক্ষুব্ধ করে।
- অর্থনৈতিক কারণ: কোম্পানির ভূমি-রাজস্ব নীতির ফলে কৃষক সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। অবশিল্পায়নের ফলে কারিগররা কর্মহীন হয়।
- সামাজিক-ধর্মীয় কারণ: সতীদাহ রদ, বিধবা বিবাহের মতো সংস্কারমূলক আইনকে ভারতীয়রা তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ বলে মনে করে। এছাড়া, এনফিল্ড রাইফেলের চর্বি মাখানো টোটার গুজব সিপাহিদের ধর্মনাশের আশঙ্কা তৈরি করে, যা বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ।
- সর্বভারতীয় রূপের অভাব: বিদ্রোহ মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলা, পাঞ্জাব ও দক্ষিণ ভারত মূলত শান্ত ছিল।
- সুসংগঠিত নেতৃত্বের অভাব: বিদ্রোহীদের মধ্যে নানা সাহেব, লক্ষ্মীবাঈয়ের মতো বীর নেতা থাকলেও তাঁদের মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয় ছিল না।
- অস্ত্রশস্ত্রের অভাব ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব: ব্রিটিশদের মতো উন্নত অস্ত্র ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা বিদ্রোহীদের ছিল না, যা তাদের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করে।
"ঊনবিংশ শতকের ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী: একদিকে সহযোগিতা, অন্যদিকে বিদ্রোহ।" — উদাহরণসহ উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
ঊনবিংশ শতকে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া সত্যিই দ্বিমুখী ছিল।
সহযোগিতার দিক: ভারতীয় সমাজের একটি অংশ, বিশেষত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, নব্য 'ভদ্রলোক' বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের আধুনিকীকরণের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্যর সৈয়দ আহমদ খানের মতো ব্যক্তিত্বরা ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় সতীদাহ রদ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসারের মতো সমাজ সংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁরা মনে করতেন, ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমেই ভারতীয় সমাজের কুসংস্কার দূর করে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ব্রাহ্ম সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, আলিগড় আন্দোলন প্রভৃতি ছিল এই সহযোগিতামূলক প্রতিক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
বিদ্রোহের দিক: অন্যদিকে, ভারতীয় সমাজের বৃহত্তর অংশ, বিশেষত কৃষক ও উপজাতি সম্প্রদায় ঔপনিবেশিক শাসনকে শোষণ ও অত্যাচারের প্রতীক হিসেবে দেখেছিল। কোম্পানির ভূমি-রাজস্ব নীতি, বন আইন এবং বহিরাগত জমিদার-মহাজনদের অত্যাচার তাদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। সাঁওতাল হুল, মুন্ডা বিদ্রোহ, ওয়াহাবি-ফরাজি আন্দোলন এবং নীল বিদ্রোহ ছিল এই বিদ্রোহী প্রতিক্রিয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই সমস্ত বিদ্রোহের চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৯৬)
১। ক-স্তম্ভের সঙ্গে খ-স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| হিন্দু প্যাট্রিয়ট | নীল বিদ্রোহ |
| বাহাদুর শাহ জাফর | শেষ মুঘল সম্রাট |
| রাজা রামমোহন রায় | সতীদাহ-বিরোধী আন্দোলন |
| বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী | ব্রাহ্ম সমাজ |
| সিধু ও কানহু | সাঁওতাল বিদ্রোহ |
২। বেমানান শব্দটি খুঁজে বার করো:
ক) পণ্ডিতা রমাবাঈ, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, ভগিনী শুভলক্ষ্মী, রানি লক্ষ্মীবাঈ।
ব্যাখ্যা: প্রথম তিনজন নারীশিক্ষার প্রসারে ও সমাজ সংস্কারে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু রানি লক্ষ্মীবাঈ ছিলেন ১৮৫৭-র বিদ্রোহের একজন নেত্রী।
খ) আত্মারাম পান্ডুরং, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, জ্যোতিরাও ফুলে, বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু।
ব্যাখ্যা: প্রথম তিনজন মহারাষ্ট্রের সমাজ সংস্কারক ছিলেন, কিন্তু বীরেশলিঙ্গম পাণ্ডুলু ছিলেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির (দক্ষিণ ভারত) সমাজ সংস্কারক।
গ) রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, দয়ানন্দ সরস্বতী।
ব্যাখ্যা: প্রথম তিনজন ব্রাহ্ম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু দয়ানন্দ সরস্বতী ছিলেন আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।
ঘ) বাহাদুর শাহ জাফর, নানা সাহেব, তিতুমির, মঙ্গল পাণ্ডে।
ব্যাখ্যা: বাহাদুর শাহ জাফর, নানা সাহেব ও মঙ্গল পাণ্ডে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তিতুমির ছিলেন তার অনেক আগের বারাসাত বিদ্রোহের নেতা।
৩। অতি সংক্ষেপে উত্তর দাও (৩০-৪০টি শব্দ):
ক) ঔপনিবেশিক সমাজে কাদের 'মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' বলা হতো?
ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ নিয়ে হিন্দু উচ্চবর্ণের যে শিক্ষিত, চাকরিজীবী এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল একটি নতুন শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, তাদেরকেই 'মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' বলা হতো। কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজের মতো শহরকে কেন্দ্র করে এদের উদ্ভব ঘটে।
খ) নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কোন কোন প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন?
হেনরি ডিরোজিওর নেতৃত্বে নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী যুক্তির আলোকে সবকিছু বিচার করত। তারা প্রচলিত হিন্দুধর্মের নানান কুসংস্কার, যেমন - জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, মূর্তিপূজা এবং অন্যান্য সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে তীব্রভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন ও বিরোধিতা করেছিলেন।
গ) স্যর সৈয়দ আহমদের সংস্কারগুলির প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
স্যর সৈয়দ আহমদের সংস্কারগুলির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করা এবং আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিশেষত ইংরেজি ভাষা ও বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানো। তিনি চেয়েছিলেন, এর মাধ্যমে মুসলমানরা ঔপনিবেশিক প্রশাসনে নিজেদের যোগ্য স্থান করে নেবে।
ঘ) তিতুমির কাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন?
তিতুমির তাঁর বারাসাত বিদ্রোহে মূলত তিনটি শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এরা হলো—স্থানীয় হিন্দু জমিদার (যেমন - কৃষ্ণদেব রায়), ব্রিটিশ নীলকর সাহেব এবং সর্বোপরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন। তাঁর আন্দোলন ছিল এই সম্মিলিত শোষণের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ।
৪। নিজের ভাষায় লেখো (১২০-১৬০ টি শব্দ):
ক) সতীদাহ-বিরোধী আন্দোলন ও বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলনের মধ্যে মূল মিলগুলি বিশ্লেষণ করো। বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার জন্য কীভাবে চেষ্টা করেছিলেন?
সতীদাহ-বিরোধী এবং বিধবা বিবাহ—উভয় আন্দোলনের মধ্যেই কয়েকটি মূল মিল ছিল। প্রথমত, দুটি আন্দোলনই ছিল উনিশ শতকের বাংলায় নারীমুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ সমাজ সংস্কার। দ্বিতীয়ত, উভয় ক্ষেত্রেই রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের মতো সংস্কারকরা ব্রিটিশ প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে আইন পাসের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। তৃতীয়ত, দুটি ক্ষেত্রেই সংস্কারকরা রক্ষণশীলদের বিরোধিতা মোকাবিলার জন্য হিন্দু ধর্মশাস্ত্র থেকেই নিজেদের যুক্তির স্বপক্ষে শ্লোক ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলেন।
বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন যে, নারীমুক্তি শিক্ষ ছাড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেন এবং নিজের খরচে ও পরিশ্রমে বাংলার বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
খ) ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল বক্তব্য কী ছিল? ব্রাহ্ম আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাগুলি বিশ্লেষণ করো।
রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল একেশ্বরবাদে বিশ্বাস এবং নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা। এই আন্দোলন মূর্তিপূজা, পুরোহিততন্ত্র, জাতিভেদ প্রথা এবং সতীদাহের মতো সামাজিক কুপ্রথার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। এর মূল ভিত্তি ছিল যুক্তি ও প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রের (বেদ ও উপনিষদ) উদারনৈতিক ব্যাখ্যা।
সীমাবদ্ধতা: ব্রাহ্ম আন্দোলনের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রথমত, এই আন্দোলন মূলত কলকাতা ও অন্যান্য শহরের উচ্চবর্ণের, ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ ভারতের বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর কোনো সংযোগ গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, এর আবেদন ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক, যা সাধারণ মানুষের ভক্তি-নির্ভর ধর্মীয় ভাবাবেগকে আকর্ষণ করতে পারেনি। তৃতীয়ত, জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও এই প্রথা দূর করতে ব্রাহ্ম আন্দোলন তেমন সফল হয়নি।
গ) সাঁওতাল হুল ও নীল বিদ্রোহের একটি তুলনামূলক আলোচনা করো। উভয় বিদ্রোহের ক্ষেত্রেই হিন্দু প্যাট্রিয়টের কী ভূমিকা ছিল?
সাঁওতাল হুল (১৮৫৫-৫৬) ছিল একটি উপজাতি বিদ্রোহ, যার মূল কারণ ছিল বহিরাগত জমিদার, মহাজন (দিকু) এবং ব্রিটিশ কর্মচারীদের শোষণ ও সাঁওতালদের সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ। এর লক্ষ্য ছিল বহিরাগতদের তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে, নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) ছিল বাংলার সাধারণ কৃষকদের একটি সংগঠিত বিদ্রোহ, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও বাধ্যতামূলক নীল চাষ থেকে মুক্তি পাওয়া।
উভয় বিদ্রোহের ক্ষেত্রে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার ভূমিকা ছিল ভিন্ন। সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় যখন বেশিরভাগ শিক্ষিত বাঙালি উদাসীন বা বিরোধী ছিল, তখন সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সাঁওতালদের পক্ষে কলম ধরে তাদের বিদ্রোহের মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক শোষণকে দায়ী করেন। পরবর্তীকালে, নীল বিদ্রোহের সময় তিনি আরও সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং তাঁর পত্রিকাকে নীলচাষিদের মুখপত্রে পরিণত করে দেশব্যাপী জনমত গঠনে সাহায্য করেন।
ঘ) তুমি কী মনে করো ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ কেবল 'সিপাহি বিদ্রোহ' ছিল? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
না, আমি মনে করি না যে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কেবল 'সিপাহি বিদ্রোহ' ছিল। যদিও এর সূচনা সিপাহিদের হাত ধরে হয়েছিল, তবে এর ব্যাপকতা ও চরিত্র ছিল আরও অনেক বিস্তৃত।
যুক্তি:
- গণ-অংশগ্রহণ: বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিপাহিদের সঙ্গে সাধারণ কৃষক, কারিগর এবং সাধারণ মানুষ যোগ দেয়।
- নেতৃত্ব: নানা সাহেব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং-এর মতো ক্ষমতাচ্যুত রাজন্যবর্গ ও জমিদাররা এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন, যা প্রমাণ করে এটি শুধু সিপাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
- সাধারণ শত্রু: বিদ্রোহী সিপাহি, কৃষক, জমিদার—সকলের সাধারণ শত্রু ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। তারা ব্রিটিশদের পাশাপাশি তাদের সহযোগী মহাজন ও জমিদারদেরও আক্রমণ করেছিল।