বায়ুদূষণ
"বায়ুদূষণ" অধ্যায়ে বায়ুমণ্ডলের দূষণের কারণ, ফলাফল এবং নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস, ধূলিকণা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে মিশে বায়ুকে দূষিত করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই অধ্যায়ে বায়ুদূষণের ভয়াবহ परिणाम যেমন—অ্যাসিড বৃষ্টি, ওজোন স্তরের ক্ষয় এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন (গ্রিনহাউস এফেক্ট) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সবশেষে, গণপরিবহণের ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ এবং অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কীভাবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দ পরিচিতি
বায়ুদূষণ (Air Pollution)
বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাস, ধূলিকণা, ধোঁয়া বা রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে মিশে যখন বাতাস জীবজগতের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তখন তাকে বায়ুদূষণ বলে।
বায়ুদূষক (Air Pollutant)
যে সমস্ত জৈব ও অজৈব পদার্থ বাতাসকে দূষিত করে, তাদের বায়ুদূষক বলে। যেমন - কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, CFC, সিসা ইত্যাদি।
অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain)
কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ায় থাকা সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে পৃথিবীতে ঝরে পড়লে, তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
ওজোন স্তরের ক্ষয় (Ozone Layer Depletion)
ফ্রিজ, এসি থেকে নির্গত ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (CFC) গ্যাসের প্রভাবে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, যা ওজোন স্তরের ক্ষয় নামে পরিচিত।
গ্রিনহাউস গ্যাস (Greenhouse Gas)
বাতাসে থাকা যে গ্যাসগুলি (যেমন - কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, জলীয় বাষ্প) পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়ায়, তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস বলে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming)
গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
ধোঁয়াশা (Smog)
শীতকালে শহরের বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার সঙ্গে ধোঁয়া ও কুয়াশা মিশে যে বিষাক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, তাকে ধোঁয়াশা (Smoke + Fog = Smog) বলে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
১. কোনটি বায়ুদূষক পদার্থ?
সঠিক উত্তর: C. কার্বন মনোক্সাইড
বিশ্লেষণ: কার্বন মনোক্সাইড একটি বিষাক্ত গ্যাস যা জীবাশ্ম জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহনের ফলে তৈরি হয় এবং বাতাসকে দূষিত করে।
২. যানবাহনের ধোঁয়া থেকে কোন বিষাক্ত ধাতুটি বাতাসে মেশে?
সঠিক উত্তর: C. সিসা
বিশ্লেষণ: পেট্রোল, ডিজেলের মতো জ্বালানি দহনের ফলে প্রচুর পরিমাণে সিসা বাতাসে মেশে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
৩. কোন রোগের সঙ্গে বায়ুদূষণের مباشر সম্পর্ক আছে?
সঠিক উত্তর: C. হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট
বিশ্লেষণ: দূষিত বাতাস সরাসরি আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসজনিত রোগের সৃষ্টি করে।
৪. অ্যাসিড বৃষ্টির জন্য কোন গ্যাসগুলি প্রধানত দায়ী?
সঠিক উত্তর: C. সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড
বিশ্লেষণ: এই গ্যাসগুলি বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে যথাক্রমে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটায়।
৫. কোন ঐতিহাসিক সৌধটি অ্যাসিড বৃষ্টির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
সঠিক উত্তর: A. তাজমহল
বিশ্লেষণ: অ্যাসিড বৃষ্টি তাজমহলের সাদা মার্বেল পাথরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তাকে হলদে করে দিচ্ছে এবং ক্ষয় করছে।
৬. ওজোন স্তরের ক্ষয়ের জন্য দায়ী প্রধান গ্যাস কোনটি?
সঠিক উত্তর: C. ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (CFC)
বিশ্লেষণ: ফ্রিজ, এসি, স্প্রে ইত্যাদি থেকে নির্গত CFC গ্যাস ওজোন অণুকে ভেঙে দিয়ে ওজোন স্তরের ক্ষয় ঘটায়।
৭. ওজোন স্তর আমাদের কী থেকে রক্ষা করে?
সঠিক উত্তর: B. অতিবেগুনি রশ্মি
বিশ্লেষণ: ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি (UV) রশ্মিকে শোষণ করে জীবজগতকে রক্ষা করে।
৮. কোনটি গ্রিনহাউস গ্যাস?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, জলীয় বাষ্প, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাসগুলি গ্রিনহাউস গ্যাস নামে পরিচিত।
৯. 'বিশ্ব উষ্ণায়ন' বলতে কী বোঝায়?
সঠিক উত্তর: B. পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
বিশ্লেষণ: গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির প্রভাবে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
১০. বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে কী হতে পারে?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: বিশ্ব উষ্ণায়ন জলবায়ুর চরম পরিবর্তন ঘটায়, যার ফলে এই সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা যায়।
১১. কোনটি দূষণহীন যানবাহন?
সঠিক উত্তর: C. সাইকেল
বিশ্লেষণ: সাইকেল চালাতে কোনো জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন হয় না, তাই এটি একটি সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত যানবাহন।
১২. বায়ুদূষণ কমাতে কী করা উচিত?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: বৃক্ষরোপণ, গণপরিবহণের ব্যবহার এবং সৌরশক্তি, বায়ুশক্তির মতো অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার—এই সবই বায়ুদূষণ কমাতে সাহায্য করে।
১৩. 'গণপরিবহণ' ব্যবহারের সুবিধা কী?
সঠিক উত্তর: B. একসঙ্গে অনেক লোক যাতায়াত করে
বিশ্লেষণ: একসঙ্গে অনেক লোক যাতায়াত করায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে এবং দূষণও কম হয়।
১৪. কোনটি অপ্রচলিত শক্তি?
সঠিক উত্তর: C. সৌরশক্তি
বিশ্লেষণ: সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটা শক্তি ইত্যাদি হলো অপ্রচলিত বা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, যা পরিবেশ দূষণ ঘটায় না।
১৫. ২০১১ সালে জাপানের কোন পারমাণবিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটেছিল?
সঠিক উত্তর: C. ফুকুশিমা
বিশ্লেষণ: ফুকুশিমা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসে মিশেছিল।
১৬. ঘরের মধ্যে বায়ুদূষণের উৎস কোনটি?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: কাঠ, কয়লা বা গ্যাসের ধোঁয়া, মশা তাড়ানোর ধূপ, সিগারেটের ধোঁয়া ইত্যাদি ঘরের ভিতরের বাতাসকেও দূষিত করে।
১৭. ধূমপানের ফলে কোন রোগের ঝুঁকি বাড়ে?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: সিগারেটের ধোঁয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং এটি ক্যানসার, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে।
১৮. Earth Hour কী?
সঠিক উত্তর: B. বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ
বিশ্লেষণ: এই কর্মসূচিতে বছরে একদিন এক ঘণ্টার জন্য অপ্রয়োজনীয় আলো নিভিয়ে রেখে শক্তি সঞ্চয় ও বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।
১৯. গাছপালা কেটে ফেলার ফলে বাতাসে কোন গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে?
সঠিক উত্তর: C. কার্বন ডাইঅক্সাইড
বিশ্লেষণ: গাছপালা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। গাছ কেটে ফেলায় এই শোষণ কমে যায় এবং বাতাসে এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
২০. কোন প্রাকৃতিক ঘটনা থেকে বায়ুদূষণ হতে পারে?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: অগ্ন্যুৎপাতের ছাই ও গ্যাস, দাবানলের ধোঁয়া এবং ধূলিঝড়ের ধূলিকণা প্রাকৃতিকভাবে বাতাসকে দূষিত করে।
২১. 'গ্রিন হাউস' কী?
সঠিক উত্তর: B. কাচের তৈরি ঘর
বিশ্লেষণ: শীতপ্রধান দেশে শাকসবজি চাষের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ কাচের ঘরকে গ্রিন হাউস বলে, যা ভিতরের তাপকে বাইরে যেতে দেয় না।
২২. বায়ুদূষণের ফলে শিশুদের বেশি ক্ষতি হয় কেন?
সঠিক উত্তর: B. তাদের উচ্চতা কম
বিশ্লেষণ: মাটির কাছাকাছি বাতাসে দূষণের পরিমাণ বেশি থাকে এবং শিশুরা উচ্চতায় কম হওয়ায় সেই দূষিত বাতাস তাদের শরীরে বেশি পরিমাণে প্রবেশ করে।
২৩. ওজোন স্তরের ক্ষয় কোথায় সবচেয়ে বেশি?
সঠিক উত্তর: C. মেরু অঞ্চলে
বিশ্লেষণ: বিশেষত আন্টার্কটিকার উপরে ওজোন স্তরের ক্ষয় বা 'ওজোন গহ্বর' সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
২৪. অ্যাসিড বৃষ্টির ফলে কী হয়?
সঠিক উত্তর: D. সবকটি
বিশ্লেষণ: অ্যাসিড বৃষ্টি মাটি, জল এবং স্থাপত্য—পরিবেশের সবকিছুরই মারাত্মক ক্ষতি করে।
২৫. ধোঁয়াশা শব্দটি কীভাবে তৈরি হয়েছে?
সঠিক উত্তর: A. ধোঁয়া + কুয়াশা
বিশ্লেষণ: ইংরেজি Smog শব্দটি Smoke (ধোঁয়া) এবং Fog (কুয়াশা) শব্দদুটি মিলে তৈরি হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
প্রশ্ন ১: বায়ুদূষণ কাকে বলে?
উত্তর: বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাস, ধূলিকণা, ধোঁয়া বা অন্যান্য পদার্থ বাতাসে মিশে যখন বাতাস জীবজগতের পক্ষে অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে, তখন তাকে বায়ুদূষণ বলে।
প্রশ্ন ২: দুটি প্রধান বায়ুদূষক গ্যাসের নাম লেখো।
উত্তর: দুটি প্রধান বায়ুদূষক গ্যাস হলো কার্বন মনোক্সাইড (CO) এবং সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂)।
প্রশ্ন ৩: বায়ুদূষণের দুটি মনুষ্যসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর: বায়ুদূষণের দুটি মনুষ্যসৃষ্ট কারণ হলো— (১) যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া এবং (২) নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন।
প্রশ্ন ৪: বায়ুদূষণের দুটি প্রাকৃতিক কারণ লেখো।
উত্তর: বায়ুদূষণের দুটি প্রাকৃতিক কারণ হলো— (১) অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত ছাই ও গ্যাস এবং (২) দাবানলের ধোঁয়া।
প্রশ্ন ৫: অ্যাসিড বৃষ্টি কী?
উত্তর: কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ায় থাকা সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে পৃথিবীতে ঝরে পড়লে, তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
প্রশ্ন ৬: গ্রিনহাউস গ্যাস কাকে বলে?
উত্তর: বাতাসে থাকা যে গ্যাসগুলি (যেমন - কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন) পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়াতে সাহায্য করে, তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস বলে।
প্রশ্ন ৭: বিশ্ব উষ্ণায়ন বলতে কী বোঝো?
উত্তর: গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে।
প্রশ্ন ৮: ওজোন স্তরের ক্ষয় কী?
উত্তর: ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (CFC) গ্যাসের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, যা ওজোন স্তরের ক্ষয় নামে পরিচিত।
প্রশ্ন ৯: CFC গ্যাসের পুরো নাম কী? এর উৎস কী?
উত্তর: CFC গ্যাসের পুরো নাম হলো ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন। এর প্রধান উৎস হলো রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ), এয়ার কন্ডিশনার (এসি), সুগন্ধী স্প্রে ইত্যাদি।
প্রশ্ন ১০: বায়ুদূষণের ফলে মানবদেহে সৃষ্ট দুটি রোগের নাম লেখো।
উত্তর: বায়ুদূষণের ফলে মানবদেহে সৃষ্ট দুটি রোগ হলো হাঁপানি (Asthma) এবং ফুসফুসের ক্যানসার।
প্রশ্ন ১১: ধোঁয়াশা কী?
উত্তর: শীতকালে শহরের বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার সঙ্গে গাড়ির ধোঁয়া ও কুয়াশা মিশে যে বিষাক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, তাকে ধোঁয়াশা (Smoke + Fog = Smog) বলে।
প্রশ্ন ১২: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের দুটি উপায় লেখো।
উত্তর: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের দুটি উপায় হলো— (১) প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো এবং (২) জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তির মতো অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
প্রশ্ন ১৩: গণপরিবহণ ব্যবহারে বায়ুদূষণ কমে কেন?
উত্তর: বাস, ট্রেনের মতো গণপরিবহণে একসঙ্গে অনেক মানুষ যাতায়াত করতে পারে, ফলে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমে যায় এবং কম জ্বালানি পোড়ায় দূষণও কমে।
প্রশ্ন ১৪: দুটি দূষণহীন যানবাহনের নাম লেখো।
উত্তর: দুটি দূষণহীন যানবাহন হলো সাইকেল এবং ইলেকট্রিক গাড়ি বা ট্রেন।
প্রশ্ন ১৫: ওজোন স্তরের গুরুত্ব কী?
উত্তর: ওজোন স্তর সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মিকে শোষণ করে জীবজগতকে ত্বকের ক্যানসার ও অন্যান্য রোগের হাত থেকে রক্ষা করে।
প্রশ্ন ১৬: অ্যাসিড বৃষ্টির দুটি ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখ করো।
উত্তর: অ্যাসিড বৃষ্টির দুটি ক্ষতিকর প্রভাব হলো— (১) এটি মার্বেল পাথরের সৌধ (যেমন তাজমহল) ক্ষয় করে এবং (২) পুকুর ও নদীর জলকে আম্লিক করে জলজ প্রাণীদের মৃত্যু ঘটায়।
প্রশ্ন ১৭: ঘরের ভিতরের বাতাস কীভাবে দূষিত হয়?
উত্তর: রান্নার জন্য ব্যবহৃত জ্বালানির ধোঁয়া, সিগারেটের ধোঁয়া, মশা তাড়ানোর ধূপ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক স্প্রে থেকে ঘরের ভিতরের বাতাস দূষিত হয়।
প্রশ্ন ১৮: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তরের কী পরিবর্তন হচ্ছে?
উত্তর: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, যার ফলে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে গিয়ে উপকূলবর্তী নিচু এলাকাগুলি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
প্রশ্ন ১৯: গাছপালা কীভাবে বায়ুদূষণ কমায়?
উত্তর: গাছপালা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শোষণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে, ফলে বাতাসে গ্যাসের ভারসাম্য বজায় থাকে ও দূষণ কমে।
প্রশ্ন ২০: দুটি অপ্রচলিত শক্তির উৎসের নাম লেখো।
উত্তর: দুটি অপ্রচলিত শক্তির উৎস হলো সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি।
প্রশ্ন ২১: 'Earth Hour' কীসের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ?
উত্তর: 'Earth Hour' হলো বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী একটি প্রতীকী সচেতনতামূলক পদক্ষেপ।
প্রশ্ন ২২: কলকারখানা থেকে নির্গত দুটি দূষক পদার্থের নাম লেখো।
উত্তর: কলকারখানা থেকে নির্গত দুটি দূষক পদার্থ হলো কার্বনের গুঁড়ো (Soot) এবং সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂)।
প্রশ্ন ২৩: তেজস্ক্রিয় দূষণ কীভাবে বায়ুতে ছড়ায়?
উত্তর: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটলে বা পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসে মিশে বায়ুদূষণ ঘটায়।
প্রশ্ন ২৪: কৃষিকাজ থেকে কীভাবে বায়ুদূষণ হতে পারে?
উত্তর: চাষের জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের গুঁড়ো বাতাসে মিশে বায়ুকে দূষিত করতে পারে।
প্রশ্ন ২৫: বায়ুদূষণের ফলে গাছের কী ক্ষতি হয়?
উত্তর: বায়ুদূষণ ও অ্যাসিড বৃষ্টির ফলে গাছের পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে যায়, ফলে গাছের খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং গাছ মারাও যেতে পারে।
বড় প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: বায়ুদূষণের কারণগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট।
মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:
- শিল্প ও কলকারখানা: শিল্পকেন্দ্র ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া, ছাই এবং বিষাক্ত গ্যাস (যেমন SO₂, NOx, CO) বাতাসকে দূষিত করে।
- যানবাহন: গাড়ি, বাস, লরি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় থাকা কার্বন মনোক্সাইড, সিসা ইত্যাদি বায়ুদূষণের একটি প্রধান কারণ।
- বৃক্ষচ্ছেদন: গাছপালা কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। নির্বিচারে বনজঙ্গল ধ্বংস করার ফলে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে।
- গৃহস্থালির দূষণ: রান্নার জন্য কাঠ, কয়লা পোড়ানো, সিগারেটের ধোঁয়া, মশা তাড়ানোর ধূপ ইত্যাদি থেকেও ঘরের এবং পারিপার্শ্বিক বাতাস দূষিত হয়।
- অগ্ন্যুৎপাত: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত বিপুল পরিমাণ ছাই, ধূলিকণা ও গ্যাস বায়ুতে মেশে।
- দাবানল: বনাঞ্চলে আগুন লাগলে বা দাবানলের ফলে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া ও কার্বন কণা বাতাসে ছড়ায়।
প্রশ্ন ২: অ্যাসিড বৃষ্টি কী? এর ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তর: অ্যাসিড বৃষ্টি: কলকারখানা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂) এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) গ্যাসগুলি বাতাসে জলীয় বাষ্পের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে যথাক্রমে সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄) এবং নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO₃) তৈরি করে। এই অ্যাসিডগুলি বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে পৃথিবীতে ঝরে পড়লে, তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
ফলাফল:
- সৌধের ক্ষতি: অ্যাসিড বৃষ্টি মার্বেল পাথরের তৈরি ঐতিহাসিক সৌধ (যেমন তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল) ও মূর্তির ক্ষয় করে।
- উদ্ভিদজগতের ক্ষতি: এটি গাছের পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট করে দেয়, ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বনভূমি ধ্বংস হয়ে যায়।
- মাটির দূষণ: অ্যাসিড বৃষ্টি মাটির অম্লত্ব বাড়িয়ে দিয়ে মাটিকে অনুর্বর করে তোলে।
- জলজ প্রাণের ক্ষতি: পুকুর, হ্রদ ও নদীর জল আম্লিক হয়ে পড়ায় মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যু হয়।
প্রশ্ন ৩: বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলতে কী বোঝো? এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি লেখো।
উত্তর: বিশ্ব উষ্ণায়ন: বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কিছু গ্যাস, যেমন - কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (CFC), জলীয় বাষ্প ইত্যাদি কাচের ঘরের মতো একটি আস্তরণ তৈরি করে। এই গ্যাসগুলি সূর্য থেকে আসা তাপকে পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দেয়, কিন্তু পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপকে পুরোপুরি মহাশূন্যে ফিরে যেতে বাধা দেয়। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঘটনাকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে।
ক্ষতিকর প্রভাব:
- বরফ গলন ও জলস্তর বৃদ্ধি: পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার ফলে দুই মেরু অঞ্চলের এবং হিমালয়ের মতো উঁচু পর্বতের বরফ গলে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে গিয়ে উপকূলবর্তী নিচু এলাকা ও দ্বীপগুলি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
- জলবায়ুর পরিবর্তন: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে কোথাও প্রবল বন্যা, আবার কোথাও তীব্র খরা দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতাও বাড়ছে।
- জীববৈচিত্র্যের হ্রাস: জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন ৪: বায়ুদূষণ কীভাবে ওজোন স্তরের ক্ষতি করছে? এর ফলাফল কী?
উত্তর: ওজোন স্তরের ক্ষতি: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে জীবজগতকে রক্ষা করে। কিন্তু মানুষের তৈরি কিছু দূষক পদার্থ এই স্তরকে ধ্বংস করছে।
বিশেষত, রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ), এয়ার কন্ডিশনার (এসি), সুগন্ধী স্প্রে ইত্যাদি থেকে নির্গত ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (CFC) গ্যাসটি ওজোন স্তরের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এই গ্যাস স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভেঙে গিয়ে ক্লোরিন পরমাণু তৈরি করে, যা লক্ষ লক্ষ ওজোন (O₃) অণুকে ভেঙে অক্সিজেনে (O₂) পরিণত করে। এর ফলে ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, যাকে 'ওজোন গহ্বর' বলা হয়।
ফলাফল:
- ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে।
- এর প্রভাবে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখে ছানি পড়ার মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
- উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, ফলে শস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
প্রশ্ন ৫: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি আলোচনা করো।
উত্তর: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা প্রয়োজন:
- বৃক্ষরোপণ: দূষণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে নেয়।
- জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস: কয়লা, পেট্রোল, ডিজেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটা শক্তির মতো অপ্রচলিত ও দূষণহীন শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
- গণপরিবহণের ব্যবহার: ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বাস, ট্রেন, মেট্রোর মতো গণপরিবহণ ব্যবহার করলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমবে এবং দূষণও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
- শিল্পক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ: কলকারখানাগুলি লোকালয় থেকে দূরে স্থাপন করা উচিত। কারখানার চিমনি অনেক উঁচু করতে হবে এবং নির্গত ধোঁয়া ও গ্যাসকে পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি স্তরে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
- দূষণহীন যানবাহন: সাইকেল, ব্যাটারিচালিত গাড়ি ইত্যাদি দূষণহীন যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে হবে।