Chapter 1: ইতিহাসের ধারণা (Concept of History)

ইতিহাস কেন পড়ব | ইতিহাসের উপাদান | প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ | ঔপনিবেশিক ইতিহাস | জাতীয়তাবাদী ইতিহাস | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 01 March 2026 Last Update: 31 May 2026
Class 8 History Chapter 1 ইতিহাসের ধারণা

Chapter 1: ইতিহাসের ধারণা (Concept of History)

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 25 MCQ | 18 SAQ | 7 Broad Questions

ইতিহাস কেন জেমস মিল সাম্রাজ্যবাদ জাতীয়তাবাদ
📜

ইতিহাসের ধারণা

কেন পড়ি ইতিহাস | রবীন্দ্রনাথ

📚

জেমস মিল

হিন্দু-মুসলিম-ব্রিটিশ | যুগভাগ

🌍

সাম্রাজ্যবাদ

উপনিবেশবাদ | ইতিহাসের দ্বন্দ্ব

🇮🇳

জাতীয়তাবাদ

দেশীয় ইতিহাস | প্রমাণ ও যুক্তি

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

25 টি
1. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের ইতিহাসকে কী বলে অভিহিত করেছেন?
ক) ক) গৌরবময় ইতিহাস
খ) খ) দুঃস্বপ্নকাহিনী
গ) গ) বীরগাথা
ঘ) ঘ) স্বাধীনতার কাহিনী
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতবর্ষের ইতিহাস' প্রবন্ধে ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে বলেছিলেন— "ভারতবর্ষের যে ইতিহাস আমাদের পুঁথি এবং মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিই, তাহা ভারতবর্ষের নরনারীকাহিনীর একটা দুঃস্বপ্নকাহিনীমাত্র।" তিনি ইতিহাস পড়ার ধরন নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
2. বিজ্ঞানের যুগেও ইতিহাস পড়ার প্রয়োজনীয়তা কী?
ক) ক) শুধু পুরনো দিনের খতিয়ান জানা
খ) খ) বর্তমানকে বোঝা ও ভবিষ্যতের দিশা পাওয়া
গ) গ) গল্পের বই হিসেবে পড়া
ঘ) ঘ) রাজা-বাদশাদের কাহিনী জানা
ব্যাখ্যা: ইতিহাস পড়া কেবল পুরনো দিনের ঘটনা জানা নয়। বর্তমান যা কিছু ঘটছে, তার শিকড় নিহিত আছে অতীতে। বর্তমান কেমন হবে, তা ঠিক হয়ে যায় অতীত থেকেই। একই সাথে ভবিষ্যতের পথ নির্দেশও মেলে ইতিহাস থেকে। ইতিহাস থেকে যুক্তি নেওয়া যায়, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়।
3. জেমস মিল (James Mill) কত সালে 'British History of India' লেখেন?
ক) ক) ১৮০৮
খ) খ) ১৮১৭
গ) গ) ১৮৫৭
ঘ) ঘ) ১৯০৭
ব্যাখ্যা: জেমস মিল ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে 'British History of India' বা 'History of British India' নামে ভারতের ইতিহাস রচনা করেন। তাঁর বইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ প্রশাসকদের ভারতবর্ষ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া।
4. জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে কয়টি যুগে ভাগ করেছিলেন?
ক) ক) দুই
খ) খ) তিন
গ) গ) চার
ঘ) ঘ) পাঁচ
ব্যাখ্যা: জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেছিলেন: (১) হিন্দু যুগ, (২) মুসলিম যুগ, এবং (৩) ব্রিটিশ যুগ। প্রথম দুটি শাসকের ধর্মের নামে, আর শেষটি শাসকের জাতির নামে। পরবর্তীতে এই তিনটি ধাপ নাম বদলে হয়— প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক।
5. জেমস মিলের ইতিহাস ভাগের বড়ো ত্রুটি কী?
ক) ক) সময়কাল ভুল ছিল
খ) খ) শাসকের ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে সব শাসককে একাকার করা
গ) গ) খুব ছোটো ছিল
ঘ) ঘ) ঘটনা কম ছিল
ব্যাখ্যা: জেমস মিল ধরে নিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতের সব শাসকই হিন্দু, ফলে জৈন ধর্মাবলম্বী চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অশোকও হিন্দু যুগে পড়ে গেলেন। একইভাবে মধ্যযুগের সব শাসককে মুসলমান ধর্মের সজ্জায় একাকার করে দেওয়া হয়। এর ফলে আকবরের মতো উদার শাসকও নিছক ধর্মের পরিচয়ে আটকা পড়লেন।
6. কাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'ভারতবর্ষের ইতিহাস আমাদের পুঁথি এবং মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিই'?
ক) ক) রাজা-বাদশাহ-যুদ্ধ-রাজস্বনীতির ইতিহাস
খ) খ) সাধারণ মানুষের ইতিহাস
গ) গ) বিজ্ঞান বিষয়ক ইতিহাস
ঘ) ঘ) কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল রাজা-সম্রাট-যুদ্ধ-রাজস্বনীতির কাহিনি হিসেবে ইতিহাস পড়তে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন প্রকৃত ইতিহাসে সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকা উচিত।
7. 'রাজাবলি' গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) ক) জেমস মিল
খ) খ) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
গ) গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) ঘ) উইলিয়ম ওয়েভারবান
ব্যাখ্যা: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে 'রাজাবলি' নামে একটি ইতিহাস বই লিখেছিলেন। তিনি মহাভারতের রাজা যুধিষ্ঠিরের কাল থেকে সময় গুণতে শুরু করে কলিযুগ পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। বইটিতে রাজাদের কথা বলাই ছিল মূল লক্ষ্য এবং ঘটনার পিছনে নানা অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত যুক্তি ছিল।
8. ভারতীয় শিক্ষিত জনগণ কাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ইতিহাস রচনা শুরু করেন?
ক) ক) মোগলদের বিরুদ্ধে
খ) খ) মারাঠাদের বিরুদ্ধে
গ) গ) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকদের বিরুদ্ধে
ঘ) ঘ) ফরাসিদের বিরুদ্ধে
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারার বিরুদ্ধে ভারতের শিক্ষিত জনগণ ধীরে ধীরে জোট বাঁধলেন। ইংরেজি শিক্ষা ও সরকারি চাকরি পেলেও তাঁরা দেশের ইতিহাস নিজেদের মতো করে লিখতে শুরু করলেন। এভাবেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার সূচনা হয়।
9. 'সাম্রাজ্যবাদ' (Imperialism) বলতে কী বোঝো?
ক) ক) স্বাধীন দেশ গঠন
খ) খ) শক্তিশালী দেশ কর্তৃক দুর্বল দেশের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে নিজের দখলে আনা
গ) গ) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
ঘ) ঘ) বাণিজ্য সম্প্রসারণ
ব্যাখ্যা: সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী দেশ বা রাষ্ট্র তুলনায় দুর্বল দেশ বা রাষ্ট্রের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে তাকে নিজের দখলে আনে। দুর্বল দেশটির জনগণ, সম্পদ— সব কিছুই শক্তিশালী দেশ নিজের প্রয়োজনমতো পরিচালনা করে।
10. উপনিবেশবাদ (Colonialism) বলতে কী বোঝো?
ক) ক) নিজের দেশে শাসন
খ) খ) এক অঞ্চলের জনগণ ও সম্পদকে অন্য অঞ্চলের স্বার্থে ব্যবহার করা
গ) গ) রাজতন্ত্র
ঘ) ঘ) সাম্যবাদ
ব্যাখ্যা: উপনিবেশবাদ (Colonialism): একটি অঞ্চলের জনগণ ও সম্পদকে অন্য একটি অঞ্চলের স্বার্থে ব্যবহার করাই উপনিবেশবাদের মূল কথা। যেমন— ব্রিটেনের উপনিবেশ হিসেবে ভারতের কৃষিজ ফসল ব্রিটেনের স্বার্থে উৎপাদন হতো। বাংলার নীল চাষ হতো ইংল্যান্ডের কাপড় কলে নীলের চাহিদা মাথায় রেখে, যার ফলে বাংলায় অনাহার ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিত।
11. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কী কী ব্যবহার করা যায়?
ক) ক) শুধু বই
খ) খ) কাগজপত্র, বই, ডায়েরি, চিঠি, দলিল, ছবি, মানচিত্র, সংবাদপত্র
গ) গ) শুধু সংবাদপত্র
ঘ) ঘ) শুধু সরকারি নথি
ব্যাখ্যা: ইতিহাসের উপাদান হিসেবে নানা কিছু ব্যবহার করা হয়: প্রশাসনিক কাগজপত্র, বই, ডায়েরি, চিঠি, জমি বিক্রির দলিল, রাজকার বাজারের ফর্দ, ছবি, মানচিত্র, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, সংবাদপত্র ইত্যাদি। তবে বিভিন্ন উপাদানকে যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ করে ব্যবহার করতে হয়।
12. আধুনিক ইতিহাসের উপাদান বেশি পাওয়ার কারণ কী?
ক) ক) বেশি যুদ্ধ হয়েছে
খ) খ) সময়ের দূরত্ব কম বলে কাগজপত্র, বই, ছবি এখনও তেমন নষ্ট হয়নি
গ) গ) বেশি লেখাপড়া হয়েছে
ঘ) ঘ) কম উপাদান হারিয়েছে
ব্যাখ্যা: আধুনিক ইতিহাসের সময়টা বর্তমানের অনেক কাছাকাছি, তাই গত চার-পাঁচশো বছরের কাগজপত্র, বই, আঁকা ছবি এখনও তেমন নষ্ট হয়নি। তাছাড়া নানা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সেসব উপাদানকে রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করা গেছে। সব মিলিয়ে আধুনিক সময়ের ইতিহাস লেখার উপাদানের বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
13. ঔপনিবেশিক ইতিহাস বনাম জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বলতে কী বোঝো?
ক) ক) দুটি ভিন্ন দেশের ইতিহাস
খ) খ) ঔপনিবেশিক শাসকদের লেখা ইতিহাস বনাম দেশীয়দের লেখা ইতিহাস
গ) গ) প্রাচীন বনাম আধুনিক ইতিহাস
ঘ) ঘ) হিন্দু বনাম মুসলিম ইতিহাস
ব্যাখ্যা: ঔপনিবেশিক ইতিহাস: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের সমর্থক ঐতিহাসিকরা ভারতীয়দের 'অসভ্য' ও শাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে যে ইতিহাস লিখেছিলেন। জাতীয়তাবাদী ইতিহাস: এর বিপরীতে দেশীয় শিক্ষিত জনগণ ভারতের প্রাচীন গৌরব, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রমাণ দিয়ে পালটা ইতিহাস রচনা করেন। সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্দোষ প্রমাণ করা তার উদাহরণ।
14. হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের ছবি থেকে কী বোঝা যায় না?
ক) ক) গান্ধী-সুভাষের আলাপ
খ) খ) দুজনের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ
গ) গ) অধিবেশনের স্থান
ঘ) ঘ) উপস্থিত জনতা
ব্যাখ্যা: ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনের একটি ফটোগ্রাফে গান্ধী ও সুভাষচন্দ্র বসুর হাসিমুখে আলাপচারিতার ছবি আছে। অথচ ঐ সময় নানা প্রসঙ্গে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ ছিল এবং পরের বছর সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস-সভাপতির পদ ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু ছবি থেকে সে সময়ের সংঘাত বোঝা যায় না। ফটোগ্রাফের পিছনের ইতিহাস না জানলে, ফটোগ্রাফ নিজে সবসময় সঠিক মনোভাব প্রতিফলিত করে না।
15. প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক— এই যুগভাগের প্রধান সমস্যা কী?
ক) ক) নামগুলি ঠিক নয়
খ) খ) অতি সরলীকরণ এবং সব অঞ্চলে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়
গ) গ) সময় নির্ধারণ ঠিক নয়
ঘ) ঘ) বইয়ে জায়গা বেশি লাগে
ব্যাখ্যা: প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক পদ্ধতিতে যুগ ভাগ করা অনেকটাই অতি সরলীকরণ। 'যুগ' বলতে একটা বড়ো সময়কে বোঝায় এবং প্রতিটি যুগের বৈশিষ্ট্য রাতারাতি পাল্টে যায় না। যেমন— ঔরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে মারা যান (মধ্যযুগ), ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধ (আধুনিক), অথচ বাংলার নবাবি শাসনের আদবকায়দা মোগল শাসন থেকেই নেওয়া ছিল। তাছাড়া সুলতান রাজিয়া নারীশাসক হিসেবে আধুনিক ছিলেন, কিন্তু সময়ের হিসেবে তাঁকে মধ্যযুগে ফেলা হয়।
16. কোন ঘটনা নিয়ে বর্তমানেও ঐতিহাসিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক আছে?
ক) ক) কলিঙ্গ যুদ্ধ
খ) খ) পলাশির যুদ্ধ
গ) গ) ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন
ঘ) ঘ) পাণিপথের প্রথম যুদ্ধ
ব্যাখ্যা: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন (দেশভাগ) নিয়ে আজও ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা বিতর্ক রয়েছে। সাধারণ মানুষেরও নানা মত থাকে। দেশভাগ বিষয়ে ইতিহাস লিখতে গেলে খুব নিরপেক্ষভাবে লেখা কঠিন, কারণ সময়ের দূরত্ব কম বলে ঐতিহাসিকের ব্যক্তিগত মতামত ও ভাবনাচিন্তা বেশি করে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
17. ইতিহাস থেকে সময়ের দূরত্ব যত বাড়ে, কী ঘটে?
ক) ক) বিতর্ক কমে যায়
খ) খ) বিতর্ক আরও বাড়ে
গ) গ) তথ্য হারিয়ে যায়
ঘ) ঘ) মানুষ ভুলে যায়
ব্যাখ্যা: ইতিহাস থেকে বর্তমানের দূরত্ব যত বাড়ে, ইতিহাসের বিষয় নিয়ে বাদ-বিতর্কের চরিত্র তত বদলায় এবং গুরুত্ব কমে যায়। যেমন— সম্রাট অশোকের ভাবনাচিন্তায় কলিঙ্গ যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, তা আজ আর ততটা প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু দেশভাগের মতো ঘটনা এখনও প্রাসঙ্গিক।
18. 'আধুনিক' শব্দটি কোন শব্দ থেকে এসেছে?
ক) ক) আধুনিকতা
খ) খ) অধুনা
গ) গ) আধুনিকীকরণ
ঘ) ঘ) অধিকার
ব্যাখ্যা: 'আধুনিক' শব্দটি এসেছে 'অধুনা' থেকে। এর মানে বর্তমানকাল, সম্প্রতি বা নতুন। আর সম্প্রতি বা বর্তমানে ঘটেছে যে ঘটনা, তাই আধুনিককালের ঘটনা। সময়ের হিসেবে পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) তুলনায় কম অতীত, তাই সেটা কিছুটা 'আধুনিক'।
19. ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পটি দিয়ে ইতিহাসের কোন দিকটি বোঝানো হয়েছে?
ক) ক) ইতিহাস থেকে যুক্তি নেওয়া যায়
খ) খ) ইতিহাস মুখস্থ করতে হয়
গ) গ) ইতিহাসে গল্প থাকে
ঘ) ঘ) পশুদের ইতিহাস হয়
ব্যাখ্যা: ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পে দেখা যায়, নেকড়ে যেমন পূর্বপুরুষের ইতিহাস ঘেঁটে ছাগলছানাকে ধরার যুক্তি দেয়, তেমনি ছাগলছানাও ইতিহাস ঘেঁটে প্রমাণ করতে পারে যে সে নির্দোষ বা ভিন্ন বংশের। অর্থাৎ, ইতিহাস থেকে নিজের পক্ষে যুক্তি সংগ্রহ করা যায়, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়।
20. ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কায়েম করার পক্ষে ব্রিটিশদের যুক্তি কী ছিল?
ক) ক) ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য
খ) খ) ভারতবাসী 'অসভ্য', তাই 'সভ্য' ব্রিটিশদের শাসন করা কর্তব্য
গ) গ) ভারতীয় রাজাদের আমন্ত্রণে
ঘ) ঘ) বাণিজ্যের জন্য
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ শাসকরা ভারতে উপনিবেশ তৈরির পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল যে, ভারতবাসীরা 'অসভ্য', তাদের দেশে শিক্ষা ও বিজ্ঞানের অভাব ইত্যাদি। আর ব্রিটিশরা 'সভ্য'। তাই প্রতিটি 'সভ্য' ব্রিটিশের কর্তব্য 'অসভ্য' ভারতীয়দের 'সভ্য' করা। এই যুক্তির নিরিখেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছিল।
21. ভারতীয়রা কীভাবে ব্রিটিশদের 'অসভ্য' তত্ত্বের পালটা জবাব দিয়েছিল?
ক) ক) যুদ্ধ করে
খ) খ) ইতিহাস ঘেঁটে ভারতের প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় দৃষ্টান্ত তুলে ধরে
গ) গ) বিদেশে পালিয়ে গিয়ে
ঘ) ঘ) আত্মসমর্পণ করে
ব্যাখ্যা: ভারতীয়রা ব্রিটিশদের 'অসভ্য' তত্ত্ব মানেননি। তারা ইতিহাস ঘেঁটে পালটা যুক্তি দিলেন যে, ভারতে কোম্পানি-পূর্বিতেও এক এক সমাট অশোকের কথা, আর্যভট্ট থেকে চৈতন্যদেবের কথা উল্লেখ করে প্রমাণ করলেন ভারতেরও 'সভ্যতা' ছিল, যা ইউরোপীয় সভ্যতার থেকে খাটো নয়। তাই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বজায় রাখার দরকার নেই।
22. সাঁওতাল বিদ্রোহ বা মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের নাম থাকে না কেন?
ক) ক) সবাই মারা গেছে
খ) খ) নাম জানা যায় না, শুধু সংখ্যা হিসেবে লেখা হয় 'হাজার হাজার মানুষ'
গ) গ) তারা যোগ দেয়নি
ঘ) ঘ) ইতিহাসবিদরা ভুলে গেছেন
ব্যাখ্যা: সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫) ইতিহাস থেকে আমরা কেবল সিধু-কানহুর নাম জানি। কিন্তু বিদ্রোহে যোগ দেওয়া হাজার হাজার সাঁওতালের নাম ইতিহাসে নেই— তারা নিছক সংখ্যা। একইভাবে মহাত্মা গান্ধী বা সুভাষচন্দ্র বসুকে কেন্দ্র করেই ইতিহাস জানা হয়, সাধারণ মানুষের নাম জানা যায় না। কারণ, যিনি বা যাঁরা ইতিহাস লিখেছেন, তাঁরা নেতাদের কথাই লিখেছেন।
23. ইতিহাস পড়তে গিয়ে 'টান' বা আকর্ষণ কোথায়?
ক) ক) রাজা-বাদশাহদের নাম মনে রাখায়
খ) খ) একই ঘটনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণে
গ) গ) সাল-তারিখ মনে রাখায়
ঘ) ঘ) পুরনো ছবি দেখায়
ব্যাখ্যা: ইতিহাস পড়াটা মজার, কারণ একই ঘটনা ও তার ফলাফল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলে ঘটনার দেখাও বদলে যায়, ফলে নানা মতামত তৈরি হয়— যেমন একটাই ছবি নানা কোণ থেকে দেখলে নানা রকম দেখায়। এই তর্ক-বিতর্ক ইতিহাসে টান তৈরি করে।
24. বাংলার ইতিহাস কাদের লেখা উচিত বলে বিপিনচন্দ্র পাল মনে করতেন?
ক) ক) ব্রিটিশদের
খ) খ) বাঙালিদেরই
গ) গ) আমেরিকানদের
ঘ) ঘ) ফরাসিদের
ব্যাখ্যা: বিপিনচন্দ্র পাল মনে করতেন, বাংলার ইতিহাস চাই বলেই তিনি প্রথমে থেকেছিলেন যে ব্রিটিশদের লেখা বাঙালির ইতিহাস ভুলে ভরা। তাই বাঙালির ইতিহাস লিখতে হবে বাঙালিকেই। আর সেই বাঙালি কে? বিপিনচন্দ্রের মতে— আমি, তুমি, যে পারে সবাই। অর্থাৎ, নিজেদের ইতিহাস নিজেদেরই লেখা উচিত।
25. লর্ড ওয়াভেল বা মাউন্টব্যাটেন— এরা কোন সময়ের ভারত ইতিহাসের অংশ?
ক) ক) পলাশির যুদ্ধের
খ) খ) ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের
গ) গ) ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের
ঘ) ঘ) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের
ব্যাখ্যা: লর্ড ওয়াভেল ছিলেন ভারতের ভাইসরয় (১৯৪৩-১৯৪৭) এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছিলেন শেষ ভাইসরয়, যার আমলে ভারত বিভাজন ও স্বাধীনতা (১৯৪৭) ঘটে। তাঁরা আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

18 টি
1. ইতিহাস বলতে কী বোঝো? ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?
ইতিহাস (History): অতীতের ঘটনাবলি, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার নথিভুক্ত ও বিশ্লেষিত ধারাবাহিক বিবরণ। ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা: (১) বর্তমানকে বোঝা— বর্তমানের প্রতিটি ঘটনার শিকড় অতীতে প্রোথিত, (২) ঘটনার পিছনের যুক্তি বোঝা— ইতিহাস থেকে যুক্তি নিয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়, (৩) অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, (৪) নিজের পরিচয় ও শিকড়কে জানা, (৫) সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের ধারা বোঝা।
2. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে কী বলেছিলেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতবর্ষের ইতিহাস' প্রবন্ধে ভারতের প্রচলিত ইতিহাস চর্চা নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "ভারতবর্ষের যে ইতিহাস আমাদের পুঁথি এবং মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিই, তাহা ভারতবর্ষের নরনারীকাহিনীর একটা দুঃস্বপ্নকাহিনীমাত্র।" তাঁর মতে, ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহ-যুদ্ধ-রাজস্বনীতির বিবরণ নয়। প্রকৃত ইতিহাসে সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি ও চিন্তার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
3. জেমস মিল কীভাবে ভারতের ইতিহাসকে ভাগ করেছিলেন? এর সমস্যা কী?
জেমস মিল ১৮১৭ সালে 'History of British India' গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেন: (১) হিন্দু যুগ, (২) মুসলিম যুগ, (৩) ব্রিটিশ যুগ। প্রথম দুটি শাসকের ধর্মের নামে, শেষটি জাতির নামে। সমস্যা: (১) সব শাসককে ধর্মের ছাঁচে ফেলা হয়েছে— জৈন চন্দ্রগুপ্ত বা বৌদ্ধ অশোকও 'হিন্দু যুগে' পড়েছেন, মোগল সম্রাট আকবর 'মুসলিম যুগে', (২) সমগ্র ভারতীয় ইতিহাসকে মাত্র তিনটি ধাপে বেঁধে ফেলা অতি সরলীকরণ, (৩) ভারতীয় ইতিহাসের বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিকতা উপেক্ষিত হয়েছে। এই ভাগই পরে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক নাম নেয়।
4. প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগভাগের সীমাবদ্ধতা কী? উদাহরণ দাও।
প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগভাগের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো অতি সরলীকরণ ও যান্ত্রিক প্রয়োগ। 'যুগ' বলতে বৃহৎ সময়কাল বোঝায় এবং যুগের বৈশিষ্ট্য রাতারাতি পাল্টায় না। উদাহরণ: (১) ঔরঙ্গজেব (মৃত্যু ১৭০৭) মধ্যযুগের, অথচ তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৫০ বছর পর পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) আধুনিক যুগের— অথচ বাংলার নবাবি প্রশাসন মোগল শাসনেরই ধারাবাহিকতা ছিল, (২) সুলতান রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০) নারী শাসক হিসেবে অগ্রগামী, কিন্তু সময়ের হিসেবে তিনি মধ্যযুগে পড়েন, অথচ ব্রিটিশ আমলেও নারী গভর্নর-জেনারেল বা প্রশাসক ছিলেন না।
5. সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) কাকে বলে? উপনিবেশবাদের সাথে এর সম্পর্ক কী?
সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism): একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শক্তিশালী দেশ বা রাষ্ট্র তুলনায় দুর্বল দেশ বা রাষ্ট্রের উপর প্রভুত্ব কায়েম করে তাকে নিজের দখলে আনে। দুর্বল দেশের জনগণ, সম্পদ— সবই শক্তিশালী দেশ নিজের প্রয়োজনমতো পরিচালনা করে। উপনিবেশবাদ (Colonialism): সাম্রাজ্যবাদেরই হাতিয়ার। কোনো অঞ্চলের জনগণ ও সম্পদকে সম্পূর্ণরূপে অন্য একটি অঞ্চলের স্বার্থে ব্যবহার করাই উপনিবেশবাদের মূল কথা। উদাহরণ: ভারত ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল— বাংলায় নীল চাষ হতো ইংল্যান্ডের কাপড় শিল্পের জন্য, ফলে বাংলার খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হতো এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দিত।
6. ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব কী?
ঔপনিবেশিক ইতিহাস: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের অনুগত ঐতিহাসিকরা (যেমন জেমস মিল) ভারতীয়দের 'অসভ্য', 'অশিক্ষিত', 'শাসনের অযোগ্য' প্রমাণ করতে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ওপর ব্রিটিশ শাসনের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয়তাবাদী ইতিহাস: ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তাঁরা ইতিহাস ঘেঁটে দেখালেন যে, ভারতে সম্রাট অশোক, আর্যভট্ট, চৈতন্যদেবের মতো মনীষী ছিলেন। ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ইউরোপের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। অতএব, ভারতকে 'সভ্য' করতে ব্রিটিশ শাসনের প্রয়োজন নেই। সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্দোষ প্রমাণ করাও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের অংশ।
7. ইতিহাসের উপাদান বলতে কী বোঝো? আধুনিক ইতিহাস রচনার উপাদানগুলি কী কী?
ইতিহাসের উপাদান: অতীতের ঘটনাপঞ্জি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পুনর্গঠনের জন্য ঐতিহাসিক যে সমস্ত নথি, দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শিল্পকর্ম ইত্যাদির ওপর নির্ভর করেন। আধুনিক ইতিহাসের উপাদান: সময়ের নৈকট্যের কারণে এই যুগের প্রচুর উপাদান পাওয়া যায়। যেমন— (১) প্রশাসনিক কাগজপত্র ও নথি, (২) বই, পুথি, ডায়েরি, চিঠিপত্র, আত্মজীবনী, (৩) জমি বিক্রির দলিল, রাজকার বাজারের ফর্দ, (৪) ছবি (ফটোগ্রাফ, চিত্র), (৫) মানচিত্র, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, (৬) সংবাদপত্র ও সাময়িকী, (৭) সরকারি আইন ও প্রতিবেদন। তবে প্রতিটি উপাদানকে যথাযথ বিচার ও সমালোচনার মাধ্যমে ব্যবহার করা জরুরি।
8. ঐতিহাসিক উপাদানকে বিচার-বিশ্লেষণ করে ব্যবহার করা কেন জরুরি? উদাহরণ দাও।
যেকোনো ঐতিহাসিক উপাদানই সরাসরি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, কারণ প্রতিটি উপাদান কোনো না কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি। উদাহরণ: (১) আত্মজীবনী: লেখক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সব ব্যাখ্যা করেন— ঐতিহাসিক যদি তা বিনা বিচারে মেনে নেন, তবে ইতিহাস একপেশে হয়ে যায়, (২) ফটোগ্রাফ: ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের ছবিতে গান্ধী-সুভাষের হাসিমুখে আলাপ দেখা যায়, কিন্তু ঐ সময় তাঁদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ছিল— পরের বছরই সুভাষচন্দ্র সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। ছবির পিছনের ইতিহাস না জানলে, ছবিটি প্রকৃত মনোভাব প্রতিফলিত করে না। তাই সব উপাদান ক্রস-চেক করা ও প্রসঙ্গ বুঝে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
9. সাধারণ মানুষের ইতিহাস না থাকার কারণ কী? সাঁওতাল বিদ্রোহের উদাহরণ দাও।
সাধারণ মানুষের ইতিহাস না থাকার কারণ: ইতিহাস ঘেঁটে যে মানুষটির নাম জানা যায়, তিনি সাধারণত কোনো নেতা, রাজা, সংগঠক বা বিশিষ্ট ব্যক্তি। যিনি বা যাঁরা ইতিহাস লিখেছেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতৃকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষ যাঁরা গণআন্দোলন বা বিদ্রোহে হাতিয়ার ধরেছিলেন, তাঁরা ইতিহাসে 'হাজার হাজার মানুষ' হিসেবে গণিত— নামহীন সংখ্যা মাত্র। উদাহরণ: ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাস থেকে আমরা সিধু ও কানহুর নাম জানি। কিন্তু বিদ্রোহে যোগ দেওয়া হাজার হাজার সাঁওতালের নাম আমরা জানি না— তাঁরা শুধু 'হাজার হাজার সাঁওতাল' হিসেবে পরিচিত।
10. রাজাবলি গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য কী? আধুনিক ইতিহাসের সাথে এর তফাৎ কোথায়?
রাজাবলি গ্রন্থ: ১৮০৮ সালে সংস্কৃত পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত ভারতের ইতিহাসের একটি প্রাচীন গ্রন্থ। বৈশিষ্ট্য: (১) সময় গণনা শুরু হয়েছিল মহাভারতের রাজা যুধিষ্ঠিরের কাল থেকে, (২) শেষ হয়েছে কলিযুগের সময়ে এসে, (৩) রাজাদের কথা বলাই ছিল মূল লক্ষ্য, (৪) ঘটনার পিছনে নানা অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃত যুক্তি রাখা হয়েছিল, যেমন— রাজারা যেন অদৃশ্য শক্তির দ্বারা চালিত। আধুনিক ইতিহাসের সাথে তফাৎ: আজকের ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক নানা যুক্তি হাজির করা হয় এবং অতিপ্রাকৃত কারণকে বর্জন করা হয়।
11. ভারতের ইতিহাসে 'আধুনিক' শব্দটি কেন সমস্যাসঙ্কুল?
ভারতীয় প্রেক্ষাপটে 'আধুনিক' শব্দটি সমস্যার কারণ: (১) শব্দটির অর্থ 'অধুনা' বা বর্তমান কাল থেকে উৎপন্ন। কিন্তু সময়ের হিসেবে কালিকট যুদ্ধ (২০১৪) বা পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) বর্তমান থেকে অনেক আগে ঘটেছে, তবুও একে আধুনিক বলা হয়, (২) ইউরোপে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য যেমন— নবজাগরণ, শিল্পবিপ্লব, গণতন্ত্র ইত্যাদি ভারতের ইতিহাসে একই সাথে ঘটেনি, (৩) শুধু ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকেই আধুনিকতার মাপকাঠি ধরা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী, (৪) সুলতান রাজিয়ার সময়ে নারীশাসন (আধুনিক ধারণা) থাকলেও তাঁকে মধ্যযুগেই ফেলা হয়।
12. আত্মজীবনী বা ফটোগ্রাফকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সময় কী সতর্কতা প্রয়োজন?
আত্মজীবনী: লেখক তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারধারা থেকেই ঘটনা ব্যাখ্যা করেন। ঐতিহাসিক যদি সেই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে মেনে নেন, তবে ইতিহাস একপেশে হয়ে যায় বা ভুল সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায়। যেমন— উইলিয়ম ওয়েভারবানের লেখায় সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট বর্ণনা থাকতে পারে। ফটোগ্রাফ: ছবি কখনো কখনো সঠিক মনোভাব প্রকাশ নাও করতে পারে। যেমন— গান্ধী-সুভাষের হরিপুরা কংগ্রেসের (১৯৩৮) হাসিমুখের ছবি দেখে বোঝা যায় না যে সেই সময় তাঁদের মধ্যে তীব্র আদর্শগত বিরোধ চলছিল। ফটোগ্রাফের পিছনের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস জানা আবশ্যক।
13. ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের যুক্তি ও ভারতীয়দের পালটা যুক্তি কী ছিল?
ব্রিটিশ যুক্তি (ঔপনিবেশিক ইতিহাস): ভারতবাসীরা 'অসভ্য', তাদের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের অভাব। এই অবস্থায় 'সভ্য' ব্রিটিশদের কর্তব্য এই 'অসভ্য' জাতিকে শাসন করে 'সভ্য' করা— এই অজুহাতে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসন কায়েম হয়। ভারতীয়দের পালটা যুক্তি (জাতীয়তাবাদী ইতিহাস): ভারতীয় শিক্ষিত জনগণ ইতিহাস ঘেঁটে ব্রিটিশ যুক্তি খণ্ডন করেন— (১) সম্রাট অশোকের শান্তি ও ধর্মনীতি, (২) আর্যভট্ট, বরাহমিহির, চরক-সুশ্রুতের বিজ্ঞানচর্চা, (৩) চৈতন্যদেব ও কবীরের মানবতাবাদী ভাবনা, (৪) সমৃদ্ধ মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের কথা তুলে ধরে প্রমাণ করেন যে ভারতের নিজস্ব 'সভ্যতা' ব্রিটিশ সভ্যতার থেকে কোনো অংশে কম নয় এবং শাসনের জন্য ব্রিটিশদের প্রয়োজন নেই।
14. ইতিহাসে সময়ের দূরত্ব বিতর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলে?
ইতিহাসের ঘটনার সাথে বর্তমানের সময়ের দূরত্ব যত কম হয়, সেই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক তত তীব্র ও প্রাসঙ্গিক হয়। সময়ের দূরত্ব যত বাড়ে, ইতিহাসের বিষয় নিয়ে বাদ-বিতর্কের গুরুত্ব তত কমতে থাকে। উদাহরণ: (১) সম্রাট অশোকের ভাবনাচিন্তায় কলিঙ্গ যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও, তা আজকের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রাসঙ্গিক নয়। (২) ১৯৪৭ সালের দেশভাগ— এই ঘটনার সময়ের নৈকট্য খুব বেশি, এখনও বহু মানুষ সেই স্মৃতি নিয়ে কষ্ট পান। তাই এই বিষয়ে ইতিহাস পুরোপুরি নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন এবং বিতর্কও তীব্র।
15. 'জাতীয়তাবাদ' (Nationalism) বলতে কী বোঝো? কীভাবে এটি ইতিহাস রচনায় প্রভাব ফেলে?
জাতীয়তাবাদ (Nationalism): নিজের জাতি, দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ, গৌরববোধ এবং স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষার মানসিকতা। ইতিহাস রচনায় প্রভাব: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ নিজেদের দেশের ইতিহাস রচনা শুরু করেন, যা জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নামে পরিচিত। এঁরা— (১) ভারতের প্রাচীন গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার কথা তুলে ধরেন, (২) ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের অপপ্রচার ও পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা খণ্ডন করেন (যেমন— সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্দোষ প্রমাণ), (৩) ভারতীয়দের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাধীনতার বাসনা জাগিয়ে তোলেন।
16. ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেন ইতিহাসে এত বিতর্কিত একটি অধ্যায়?
১৯৪৭ সালের দেশভাগ (Partition of India) ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত, কারণ: (১) সময়ের নৈকট্য— আজও বহু মানুষ প্রত্যক্ষ বা পারিবারিক সূত্রে দেশভাগের ভয়াবহতা ও কষ্টের স্মৃতি বহন করেন, (২) বিপুল মানবিক বিপর্যয়— লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, (৩) দায়িত্ব নির্ধারণের বিতর্ক— কংগ্রেস নেতৃত্ব, জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব, ব্রিটিশদের বিভাজননীতি— কে কতটা দায়ী তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আজও শেষ হয়নি, (৪) নিরপেক্ষতা কঠিন— সময়ের দূরত্ব কম বলে ঐতিহাসিকের ব্যক্তিগত মতামত ও ভাবনা অজান্তেই ইতিহাসে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
17. ইতিহাস পড়াটা 'মজার' কেন? উদাহরণ দিয়ে বোঝাও।
ইতিহাস পড়াটা 'মজার' কারণ এখানে একই ঘটনা ও তার ফলাফল নিয়ে অবিরাম তর্ক-বিতর্ক ও টানাটানি চলে। ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানা থাকলেও— কেন এমন ঘটল, কীভাবে ঘটল, এর ফলাফল কী— এসব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মতামত থাকে। যেমন একটি ছবিকে নানা কোণ থেকে নানা রকম দেখায়— তেমনি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলে ঐতিহাসিক ঘটনার 'দেখা' ও ব্যাখ্যা বদলে যায়। এই তর্ক-বিতর্ক ও টানাটানি না থাকলে ইতিহাস শুধুমাত্র কতগুলো ঘটনা ও ফলাফলের শুকনো খতিয়ান হয়ে থাকত, যা পড়তে কারো ভালো লাগত না।
18. ইতিহাসের যুগবিভাগ কেন প্রয়োজন? এর অসুবিধাগুলিই বা কী?
প্রয়োজনীয়তা: সুবিশাল সময়কালকে বোঝার সুবিধার্থে ইতিহাসকে বিভিন্ন যুগে ভাগ করা হয়। এর ফলে— (১) অধ্যয়ন সহজ হয়, (২) একটি যুগের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করা যায়, (৩) সময়রেখার ধারণা স্পষ্ট হয়। অসুবিধা: (১) যুগের বৈশিষ্ট্য হঠাৎ করে বদলায় না— একটি যুগ থেকে আরেক যুগে উত্তরণ ধীর প্রক্রিয়া, তাই নির্দিষ্ট একটি বছরকে ভিত্তি করে যুগবিভাজন যান্ত্রিক, (২) যুগবিভাগ প্রায়শই অতি সরলীকরণ করে— যেমন 'হিন্দু যুগ'-এ বৌদ্ধ-জৈন যুগ গুলিয়ে যায়, (৩) সব অঞ্চলে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়— ভারতের প্রাচীন যুগ শেষ হলে ইউরোপের প্রাচীন যুগ শেষ হয়নি।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর

7 টি
1. ইতিহাস কী? ইতিহাস কেন পড়া প্রয়োজন— তা তোমার নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করো। ইতিহাস পড়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্পটি বিবৃত করো।

ইতিহাস (History)

ইতিহাস হলো অতীতের মানবসমাজের কর্মকাণ্ড, চিন্তাভাবনা, অর্জন ও ব্যর্থতার ধারাবাহিক, সুসংহত ও বিশ্লেষণধর্মী বিবরণ। এটি শুধু রাজা-বাদশাহ-যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষের জীবন ও চিন্তার দর্পণ।

ইতিহাস পড়ার প্রয়োজনীয়তা:

  1. বর্তমানকে বোঝা: আজ যা কিছু ঘটছে, তার বীজ অতীতেই নিহিত ছিল। বর্তমানের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি বুঝতে ইতিহাস জানা জরুরি।
  2. যুক্তি সংগ্রহ: ইতিহাস থেকে যুক্তি নিয়ে নিজের অবস্থান ও অধিকার প্রমাণ করা যায়।
  3. পরিচয়ের সন্ধান: আমি কে, আমার সমাজ কোথা থেকে এলো— এই আত্মপরিচয় ইতিহাসই দেয়।
  4. ভুল থেকে শিক্ষা: অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে তা এড়ানো যায়।

ছাগলছানা ও নেকড়ের গল্প:

ছাগলছানা জল খেতে গেলে নেকড়ে তাকে ধরে বলে— "তোর পূর্বপুরুষ আমার পূর্বপুরুষকে অসম্মান করেছিল, তাই তোকে শাস্তি দেব।" ছাগলছানা যুক্তি দিয়ে বলে— "আমি তো আলাদা বংশের, কিংবা তোর দোষেই তো সব হয়েছে।" এই গল্পের শিক্ষা: নেকড়ে যেমন ইতিহাস ঘেঁটে অত্যাচারের যুক্তি খুঁজে পায়, তেমনি ছাগলছানাও ইতিহাস ঘেঁটে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারে। ব্রিটিশরা যেমন ভারতীয়দের 'অসভ্য' বলে শাসনের যুক্তি দিয়েছিল, ভারতীয়রাও তেমনি ইতিহাস ঘেঁটে নিজেদের সভ্যতা ও গৌরবের প্রমাণ দিয়ে পালটা জবাব দিয়েছিল।

2. জেমস মিল কে ছিলেন? তিনি কীভাবে ভারতের ইতিহাসকে ভাগ করেছিলেন? এই ভাগের সীমাবদ্ধতাগুলি আলোচনা করো। পরবর্তীতে কীভাবে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগভাগ প্রচলিত হলো?

জেমস মিল (James Mill)

জেমস মিল ছিলেন একজন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও প্রশাসক। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন। ১৮১৭ সালে তিনি 'History of British India' নামক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ প্রশাসকদের ভারত সম্পর্কে একটি সহজবোধ্য ধারণা দেওয়া, যাতে তারা সুশাসন দিতে পারে।

তাঁর ইতিহাস বিভাজন:

মিল ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেন:

  1. হিন্দু যুগ (প্রাচীনকাল থেকে মুসলিম বিজয়ের আগে পর্যন্ত)
  2. মুসলিম যুগ (মুসলিম বিজয় থেকে ব্রিটিশ আগমন)
  3. ব্রিটিশ যুগ (ব্রিটিশ শাসনকাল)

এখানে প্রথম দুটি ভাগ শাসকের ধর্ম এবং শেষ ভাগ শাসকের জাতির নামে। তিনি মুসলিম যুগকে 'অন্ধকারময়' এবং হিন্দু যুগকেও 'অসভ্য' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

সীমাবদ্ধতা:

  • ধর্মের ছাঁচে ফেলে জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসকদের একাকার করা হয়েছে।
  • উদার সম্রাট আকবরও 'মুসলিম যুগে' পড়ে নিছক ধর্মীয় পরিচয়ে আটকে গেছেন।
  • ভারতীয় ইতিহাসের বিপুল বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক ভিন্নতা ও ক্রমবিবর্তনকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
  • ব্রিটিশ শাসনের গৌরব ও প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠাই ছিল অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।

প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিকের সূত্রপাত:

পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইতিহাস রচনার ধাঁচে ভারতের ইতিহাসও তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়— প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক। মিলের 'হিন্দু যুগ' প্রাচীন, 'মুসলিম যুগ' মধ্য এবং 'ব্রিটিশ যুগ' আধুনিক নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এই বিভাগই বহুল প্রচলিত, যদিও এরও সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান।

3. প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগভাগ ধারণাটি কেন সমস্যাসঙ্কুল? উদাহরণ-সহ আলোচনা করো। রাজিয়া সুলতান ও ঔরঙ্গজেব-পরবর্তী বাংলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করো।

যুগভাগের সমস্যা

প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক— এই তিন ভাগে ভারতের ইতিহাসকে সাজানো বেশ কিছু বড়ো সমস্যার জন্ম দেয়। 'যুগ' বলতে একটা বৃহৎ সময়কাল বোঝায় এবং একটি যুগের বৈশিষ্ট্য রাতারাতি সম্পূর্ণ বদলে যায় না। এছাড়া ইউরোপের ইতিহাসের ধাঁচে ভারতের ইতিহাসকে সাজানোও যথাযথ নয়।

১. যুগ পরিবর্তনের অস্পষ্টতা (ঔরঙ্গজেব ও পলাশি প্রসঙ্গ):

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে মারা যান— তাঁকে মধ্যযুগের শেষ পর্বের শাসক ধরা হয়। তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পর ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধ হয়— যা আধুনিক যুগের সূচনা। কিন্তু বাংলার নবাবি প্রশাসনের আদবকায়দাগুলো পুরোপুরি মোগল রীতিনীতিরই ধারাবাহিকতা ছিল। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার শাসনব্যবস্থা 'মধ্যযুগীয়' নয়। অথচ সময়ের হিসেবে একজন 'মধ্যযুগে', অন্যজন 'আধুনিকে' পড়েন।

২. নারী শাসনের প্রসঙ্গ (রাজিয়া সুলতান):

দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর মৃত্যুর পর কন্যা রাজিয়াকে সিংহাসনের জন্য নির্বাচিত করে যান। রাজিয়া ১২৩৬-১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সুলতানা ছিলেন— অর্থাৎ সময়ের হিসেবে তিনি 'মধ্যযুগের' মানুষ। অথচ অষ্টাদশ শতক বা তার পরেও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো নারী গভর্নর-জেনারেল বা উচ্চ প্রশাসনিক পদে ছিলেন না। নারীর শাসনক্ষমতার নিরিখে বিচার করলে, রাজিয়া যে আধুনিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন তা বলাই যায়। কিন্তু যুগভাগের যান্ত্রিকতায় তিনি 'মধ্যযুগে' চিরস্থায়ী হয়ে আছেন।

৩. বৈশিষ্ট্যের ধীর পরিবর্তন:

এক যুগের বৈশিষ্ট্য পরবর্তী যুগে হঠাৎ করে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় না। 'মধ্যযুগীয়' ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা ব্রিটিশ আমলেও কিছুকাল চালু ছিল। তাছাড়া ইউরোপীয় রেনেসাঁস, শিল্পবিপ্লব একই সময়ে ও একই গতিতে ভারতে ঘটেনি। তাই সমগ্র দেশকে একটি নির্দিষ্ট বছরে কেটে 'প্রাচীন', 'মধ্য', 'আধুনিক' ছাঁচে ফেলা অতি সরলীকরণ ও সমস্যাসঙ্কুল।

4. সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বলতে কী বোঝো? ভারতের ইতিহাসে এর প্রভাব কীভাবে পড়েছিল? ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের দ্বন্দ্বটি ব্যাখ্যা করো।

সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism)

একটি শক্তিশালী দেশ বা রাষ্ট্র তুলনায় দুর্বল দেশের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভুত্ব বিস্তার করে নিজের দখলে আনার প্রক্রিয়াকে সাম্রাজ্যবাদ বলে। দুর্বল দেশের জনগণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পূর্ণরূপে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থে ব্যবহৃত হয়।

উপনিবেশবাদ (Colonialism)

উপনিবেশবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ কায়েমের একটি রূপ বা প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো দূরবর্তী অঞ্চলকে (কলোনি) সম্পূর্ণরূপে দখল করে সেখানকার অর্থনীতি, জনসম্পদ, কাঁচামাল ও বাজার সাম্রাজ্যবাদী দেশের স্বার্থে পরিচালিত হয়। ভারত ছিল ব্রিটেনের এমনই একটি উপনিবেশ।

ভারতে প্রভাব:

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এলেও ধীরে ধীরে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। বাংলার নীল চাষ হতো ইংল্যান্ডের টেক্সটাইল শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে। ফলে বাংলার ধান-পাট চাষ ব্যাহত হতো, দেখা দিত মন্বন্তর ও দুর্ভিক্ষ। ভারতীয় কৃষি, শিল্প, রাজস্ব ব্যবস্থা সবই ব্রিটেনের স্বার্থে চালিত হয়েছিল।

ঔপনিবেশিক বনাম জাতীয়তাবাদী ইতিহাস:

ঔপনিবেশিক ইতিহাস: জেমস মিলের মতো ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা ভারতীয়দের 'অসভ্য', 'অন্ধকারযুগে নিমজ্জিত' ও 'স্বশাসনের অযোগ্য' হিসেবে চিত্রিত করে ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক ও যৌক্তিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।

জাতীয়তাবাদী ইতিহাস: এর বিপরীতে রাজা রামমোহন রায়, বিপিনচন্দ্র পাল, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ ভারতীয় ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদরা ইতিহাস ঘেঁটে সম্রাট অশোক, গুপ্তযুগ, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন, আর্যভট্ট-চরকের বৈজ্ঞানিক অবদান তুলে ধরে প্রমাণ করেন ভারতের সমৃদ্ধ সভ্যতা, দর্শন ও গৌরবময় অতীত। তাঁরা দেখিয়ে দেন— 'সভ্য' করার অজুহাতে ব্রিটিশ শাসনের কোনো প্রয়োজন নেই।

5. ইতিহাসের উপাদান কাকে বলে? আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার জন্য কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়? ঐতিহাসিকের দায়িত্ব কীভাবে এসব উপাদান যাচাই করা? উদাহরণ দাও।

ইতিহাসের উপাদান (Sources of History)

অতীতের কোনো ঘটনা, ব্যক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ও তার সঠিক পুনর্গঠন করতে ঐতিহাসিক যে সমস্ত নথি, সাক্ষ্য, প্রত্নবস্তু ও শিল্পকর্মের ওপর নির্ভর করেন, সেগুলোই ইতিহাসের উপাদান।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান:

  • লিখিত উপাদান: সরকারি প্রশাসনিক নথি, আইন ও প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, ডায়েরি, আত্মজীবনী, বই, পুথি, জমি বিক্রির দলিল, রাজকার বাজারের ফর্দ।
  • সংবাদ মাধ্যম: সংবাদপত্র (বেঙ্গল গেজেট, হরিজন, অমৃতবাজার পত্রিকা), সাময়িকী, বিজ্ঞাপন।
  • দৃশ্য উপাদান: ফটোগ্রাফ, আঁকা ছবি, মানচিত্র, পোস্টার, কার্টুন।
  • মৌখিক ইতিহাস: দেশভাগ বা বঙ্গভঙ্গের প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিকথা।

ঐতিহাসিকের দায়িত্ব (উপাদানের যাচাই):

কোনো উপাদানকেই সরাসরি বিনা সমালোচনায় সত্য হিসেবে নেওয়া যায় না। কারণ— প্রতিটি উপাদান কোনো না কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা স্বার্থ থেকে সৃষ্ট। ঐতিহাসিকের কর্তব্য ক্রস-চেকিং (একাধিক সূত্র থেকে যাচাই) ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ।

উদাহরণ ১: সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) নিয়ে ব্রিটিশ লেখক উইলিয়ম ওয়েভারবানের বর্ণনা সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট— ভারতীয়দের 'বর্বর' হিসেবে চিত্রিত। অন্যদিকে দেশীয় উৎস থেকে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

উদাহরণ ২: ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের একটি ফটোগ্রাফে গান্ধী ও সুভাষচন্দ্রের হাসিমুখে কথা বলার দৃশ্য। কিন্তু সেই একই সময়ে দুজনের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ তীব্র ছিল এবং পরের বছরই (১৯৩৯) সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি পদ ছেড়ে দেন। ছবির পিছনের ইতিহাস না জানলে ফটোগ্রাফ থেকে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

6. দৃষ্টিভঙ্গি (Perspective) কীভাবে ইতিহাস লেখাকে প্রভাবিত করে? একটি উদাহরণ হিসেবে ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের দ্বন্দ্ব বর্ণনা করো। আরেকটি উদাহরণ হিসেবে নেকড়ে ও ছাগলছানার গল্পের প্রসঙ্গ আনো।

দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিহাস

ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা 'নির্গুণ' হয়ে উঠতে পারে না। কারণ, যিনি ইতিহাস লিখছেন, তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান, এবং সময়কালের প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়েই ঘটনা দেখেন ও ব্যাখ্যা করেন। একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে।

উদাহরণ ১: ঔপনিবেশিক বনাম জাতীয়তাবাদী ইতিহাস

১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ ও সিরাজ-উদ-দৌলা প্রসঙ্গ:

  • ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি: ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা (যেমন রবার্ট অর্ম) সিরাজ-উদ-দৌলাকে 'অত্যাচারী', 'বিশ্বাসঘাতক', 'কালো নবাব' হিসেবে চিত্রিত করেছেন। মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাকে ন্যায্য বলে দেখানো হয়েছে এবং ব্রিটিশদের আগমনকে অন্ধকারে আলোর আবির্ভাব রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
  • জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: বিপরীতে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করেছেন যে সিরাজ ছিলেন মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষাকারী বীর। তথাকথিত 'অন্ধকূপ হত্যা' মিথ্যা— হলওয়েলের বয়ানে অসঙ্গতি রয়েছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ইংরেজ চক্রান্তের শিকার হন।

দুটি পক্ষ একই ঘটনা দেখছেন, কিন্তু নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছচ্ছেন।

উদাহরণ ২: নেকড়ে ও ছাগলছানার গল্প

নেকড়ে যখন ছাগলছানাকে ধরে, তখন তার যুক্তি— "তোর পূর্বপুরুষ আমার পূর্বপুরুষের ক্ষতি করেছিল।" ছাগলছানা ইতিহাস ঘেঁটে দেখাতে পারে— "সেটা অন্য বংশ বা তোর দোষেই হয়েছিল।" নেকড়ে যেমন পূর্বপুরুষের দোহাই দিয়ে নিজের স্বার্থ (ছাগলছানা খাওয়া) চরিতার্থ করতে চায়, তেমনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ইতিহাসের অপব্যাখ্যা দিয়ে ভারত শাসনের যুক্তি বানিয়েছিল। আবার ছাগলছানার মতো ভারতীয়রাও ইতিহাস ঘেঁটে নিজেদের পক্ষে যুক্তি, অধিকার ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে।

7. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের সময়সীমা ও বিষয়বস্তু কী? এই সময়কালের ইতিহাস রচনার জন্য কী কী উপাদান পাওয়া যায় এবং একটি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো কীভাবে উপাদান সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করা উচিত।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের সময়সীমা

যদিও সুস্পষ্টভাবে একে নির্দিষ্ট বছরে বাঁধা যায় না, তবুও সাধারণভাবে ধরা হয়— আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ (পলাশির যুদ্ধ ১৭৫৭) থেকে ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা (ও দেশভাগ) পর্যন্ত সময়কাল আধুনিক ভারতের ইতিহাসের আওতাভুক্ত। কেউ কেউ ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়াকে এর শেষ সীমা ধরেন।

বিষয়বস্তু:

  • ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন বিস্তার।
  • ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন কৃষক, উপজাতি ও ধর্মীয় বিদ্রোহ (সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ ১৮৫৭)।
  • ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ (কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ১৮৮৫, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ১৯০৫)।
  • গান্ধী যুগ ও অসহযোগ-আইন অমান্য-ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
  • দেশভাগ ও স্বাধীনতা (১৯৪৭)।
  • আধুনিক ভারতীয় সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা (১৯৫০)।

উপাদান:

সময়ের নৈকট্যের জন্য এই যুগের বিপুল ও বিচিত্র উপাদান পাওয়া যায়— প্রশাসনিক নথি, চিঠিপত্র, ডায়েরি, সংবাদপত্র (হরিজন, যুগান্তর), ফটোগ্রাফ, পোস্টার, মানচিত্র, আত্মজীবনী (জওহরলাল নেহরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী)।

সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের উদাহরণ:

১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের ফটোগ্রাফ: ছবিতে গান্ধীজি ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র হাসিমুখে আলাপরত। এই একটি মাত্র ছবি দেখে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ছিল, তাহলে ইতিহাস ভুল হবে। কারণ বাস্তবে—

  • ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশন (১৯৩৯)-এ গান্ধীজি সমর্থিত পট্টভি সীতারামাইয়ার বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র জয়ী হয়ে পুনঃনির্বাচিত হন।
  • কিন্তু গান্ধীজি ও কার্যনির্বাহী সমিতির বিরোধিতার মুখে কয়েকমাস পরেই সুভাষচন্দ্র সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করে 'ফরওয়ার্ড ব্লক' নামে নতুন দল গঠন করেন।
  • একটি ফটোগ্রাফ একটি মুহূর্তের ছবি তোলে— কিন্তু তার পিছনের চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও মতাদর্শগত সংঘাতকে ক্যামেরা ধরতে পারে না।

তাই ঐতিহাসিককে একাধিক সূত্র (সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, ডায়েরি) একত্রিত করে ক্রস-চেকিং করে তবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।

মনে রেখো!

ইতিহাস: অতীতের ঘটনা ও তার ব্যাখ্যা। জেমস মিল (১৮১৭): ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলিম, ব্রিটিশ যুগে ভাগ → পরে প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক। সাম্রাজ্যবাদ: শক্তিশালী দেশের দুর্বল দেশের ওপর প্রভুত্ব। উপনিবেশবাদ: এক অঞ্চলের সম্পদ ও জনগণ অন্য অঞ্চলের স্বার্থে ব্যবহৃত। জাতীয়তাবাদী ইতিহাস: দেশীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাম্রাজ্যবাদের জবাব। দৃষ্টিভঙ্গি: ইতিহাসকে যিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তার ব্যাখ্যা সেভাবেই হয়।

PDF ডাউনলোড

সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।

PDF ডাউনলোড
Sponsored Links

Frequently Asked Questions - ইতিহাসের ধারণা

ইতিহাস (History) হলো অতীতের মানবসমাজের কর্মকাণ্ড, চিন্তাভাবনা, অর্জন ও ব্যর্থতার ধারাবাহিক, সুসংহত ও বিশ্লেষণধর্মী বিবরণ। এটি কেবল রাজা-বাদশাহ-যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষের জীবন ও চিন্তার দর্পণ।

জেমস মিল ১৮১৭ সালে 'History of British India' গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেন: (১) হিন্দু যুগ, (২) মুসলিম যুগ, (৩) ব্রিটিশ যুগ। প্রথম দুটি শাসকের ধর্মের নামে, শেষটি জাতির নামে। এই ভাগের সীমাবদ্ধতা হলো— সব শাসককে ধর্মের ছাঁচে ফেলা, বৈচিত্র্য উপেক্ষা করা এবং ইউরোপীয় ধাঁচে ভারতকে দেখা। পরে এর নাম হয় প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক।

আধুনিক ইতিহাসের উপাদানগুলির মধ্যে আছে: (১) প্রশাসনিক কাগজপত্র ও নথি, (২) বই, ডায়েরি, আত্মজীবনী, চিঠিপত্র, (৩) জমি বিক্রির দলিল, রাজকার বাজারের ফর্দ, (৪) ছবি (ফটোগ্রাফ, চিত্র), (৫) মানচিত্র, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, (৬) সংবাদপত্র ও সাময়িকী। তবে প্রতিটি উপাদান বিচার-বিশ্লেষণ (ক্রস-চেকিং) করে ব্যবহার করা জরুরি।

সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) হলো শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করার নীতি বা প্রক্রিয়া। উপনিবেশবাদ (Colonialism) হলো সাম্রাজ্যবাদ কার্যকর করার একটি রূপ, যেখানে বিজিত অঞ্চলটিকে (উপনিবেশ) সম্পূর্ণ দখলে নিয়ে সেখানকার জনগণ, কাঁচামাল, বাজার সবই সাম্রাজ্যবাদী দেশের স্বার্থে পরিচালিত হয়। ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশ।