Chapter 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা (Colonial Economy & Poverty)

চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্ত | কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ | নীল বিদ্রোহ | অবশিল্পায়ন | সম্পদের বহির্গমন | দারিদ্র্য | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 01 March 2026 Last Update: 31 May 2026
Class 8 History Chapter 4 ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা

Chapter 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা (Colonial Economy & Poverty)

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 29 MCQ | 20 SAQ | 8 Broad Questions

ভূমি রাজস্ব কৃষি অবশিল্পায়ন সম্পদের বহির্গমন
🏛️

ভূমি রাজস্ব নীতি

চিরস্থায়ী | রায়তওয়ারি | মহলওয়ারি

🌾

বাণিজ্যিকীকরণ

নীল | চা | তুলো | পাট

🏭

অবশিল্পায়ন

হস্তশিল্প ধ্বংস | তাঁতিদের দুর্দশা

💰

ড্রেন অফ ওয়েলথ

ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে পাচার

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

29 টি
1. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) কে এবং কবে চালু করেন?
ক) ক) ওয়ারেন হেস্টিংস, ১৭৭২
খ) খ) লর্ড কর্নওয়ালিস, ১৭৯৩
গ) গ) লর্ড ওয়েলেসলি, ১৭৯৮
ঘ) ঘ) লর্ড ডালহৌসি, ১৮৪৮
ব্যাখ্যা: লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হয় এবং রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
2. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement) কী?
ক) ক) জমিদারদের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত
খ) খ) সরাসরি রায়ত বা কৃষকের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত
গ) গ) গ্রাম সমাজের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত
ঘ) ঘ) মিশনারিদের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত
ব্যাখ্যা: রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে (Ryotwari Settlement) জমিদারদের বদলে সরাসরি রায়ত বা কৃষকের সাথে কোম্পানির রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হয়। কৃষককে জমির মালিক স্বীকার করে নেওয়া হলেও, রাজস্বের হার অত্যন্ত চড়া ছিল (উৎপাদনের ৪৫-৫৫%) এবং সময়মতো রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে জমি থেকে উৎখাত করা হতো।
3. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) কোথায় চালু হয়?
ক) ক) বাংলা
খ) খ) মাদ্রাজ
গ) গ) উত্তর ভারত
ঘ) ঘ) বোম্বাই
ব্যাখ্যা: মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) উত্তর ভারতে চালু হয়। এতে গ্রামের প্রধান বা সমগ্র গ্রাম সমাজের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হতো। এ ব্যবস্থাতেও কৃষক সমাজের বিশেষ সুরাহা হয়নি।
4. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে কৃষকদের অবস্থা কেমন ছিল?
ক) ক) অত্যন্ত উন্নত হয়েছিল
খ) খ) জমি হারিয়ে ভাগচাষী বা বর্গাদারে পরিণত হয়েছিল
গ) গ) জমির মালিক হয়েছিল
ঘ) ঘ) ইউরোপে পাড়ি দিয়েছিল
ব্যাখ্যা: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারদের সম্পত্তি বাড়লেও কৃষকদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। কৃষকরা জমিদারের অনুকম্পার পাত্রে পরিণত হন। উঁচু হারের কর, নানা আবওয়াব বা বেআইনি কর এবং নির্দিষ্ট খাজনা দিতে না পারলে জমি বাজেয়াপ্তের ভয়ে কৃষক চরম দুরবস্থায় পড়ে।
5. 'সূর্যাস্ত আইন' (Sunset Law) কী?
ক) ক) সন্ধ্যার পর কাজ বন্ধের আইন
খ) খ) নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারির নিলাম
গ) গ) কৃষক সুরক্ষা আইন
ঘ) ঘ) বন সংরক্ষণ আইন
ব্যাখ্যা: সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law) ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি কঠোর শর্ত। নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যাস্তের আগে জমিদার যদি সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হতেন, তবে সেই জমিদারি কোম্পানি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দিত। এর ফলে বহু পুরনো জমিদার সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন।
6. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ (Commercialization of Agriculture) বলতে কী বোঝো?
ক) ক) কৃষক নিজের খাবারের জন্য চাষ করত
খ) খ) বাজারে বিক্রি বা রপ্তানির জন্য বাণিজ্যিক ফসল (নীল, চা, পাট, তুলো) চাষ
গ) গ) কৃষি জমি ফেলে রাখা
ঘ) ঘ) জমিতে কলকারখানা স্থাপন
ব্যাখ্যা: উনিশ শতকে ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতীয় কৃষকদের ওপর চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতি বাণিজ্যিক ফসল চাষের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। কৃষকদের নিজের খাদ্যশস্যের বদলে রপ্তানিযোগ্য ফসল ফলাতে বাধ্য করা হতো। একে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ (Commercialization of Agriculture) বলা হয়।
7. নীল বিদ্রোহ (Indigo Revolt) কবে হয়?
ক) ক) ১৭৭০
খ) খ) ১৮৫৭
গ) গ) ১৮৫৯-৬০
ঘ) ঘ) ১৮৭৫
ব্যাখ্যা: বাংলায় নীল বিদ্রোহ (Indigo Revolt) ১৮৫৯-৬০ সালে সংঘটিত হয়। নীলকরদের অত্যাচার, দাদন প্রথার মাধ্যমে জোর করে নীল চাষ করানো এবং চাষিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিবাদে বাংলার কৃষকরা এই বিদ্রোহ করেন।
8. 'দাদন' (Dadan) প্রথা কী?
ক) ক) কৃষিঋণ মকুব
খ) খ) জোর করে অগ্রিম টাকা দিয়ে কৃষককে নীলচাষে বাধ্য করার প্রথা
গ) গ) সরকারি ভর্তুকি
ঘ) ঘ) বিনামূল্যে বীজ বিতরণ
ব্যাখ্যা: 'দাদন' (Dadan) ছিল নীলকরদের এক শোষণমূলক প্রথা। নীলকররা কৃষকদের অগ্রিম টাকা (দাদন) ধরিয়ে দিত। সেই ঋণের দায়ে কৃষক তাদের জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য হতো এবং উৎপাদিত নীল অত্যন্ত কম দামে নীলকরদের দিতে হতো। ঋণ কখনো শোধ করা যেত না।
9. 'অবশিল্পায়ন' (Deindustrialization) বলতে কী বোঝো?
ক) ক) শিল্পের বিকাশ
খ) খ) ভারতীয় দেশীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের ধ্বংস
গ) গ) কলকারখানা বন্ধ
ঘ) ঘ) ইউরোপীয় শিল্প ধ্বংস
ব্যাখ্যা: অবশিল্পায়ন (Deindustrialization) বলতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁত, কুটিরশিল্প প্রভৃতির পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করাকে বোঝায়। ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ভারতীয় শিল্প ধ্বংস হয়।
10. সম্পদের বহির্গমন (Drain of Wealth) তত্ত্বের প্রবক্তা কে?
ক) ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) খ) দাদাভাই নওরোজি
গ) গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
ব্যাখ্যা: সম্পদের বহির্গমন বা 'ড্রেন অফ ওয়েলথ' (Drain of Wealth) তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন দাদাভাই নওরোজি (Dadabhai Naoroji)। তাঁর 'Poverty and Un-British Rule in India' (১৯০১) গ্রন্থে তিনি দেখান কীভাবে ভারতের সম্পদ ক্রমাগত ব্রিটেনে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
11. দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা' (Deccan Riots) কবে হয় এবং কেন?
ক) ক) ১৮৫৭, সিপাহি বিদ্রোহ
খ) খ) ১৮৭৫, তুলোচাষিদের ঋণভার ও সাহুকারদের অত্যাচার
গ) গ) ১৮৫৯, নীল বিদ্রোহ
ঘ) ঘ) ১৯০৫, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন
ব্যাখ্যা: দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (Deccan Riots) ১৮৭৫ সালে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষে তুলোর চাহিদা কমে গেলে দাক্ষিণাত্যের তুলোচাষিদের ওপর আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসে। সাহুকার-মহাজনরা চাষিদের ঋণের বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করলে ক্ষুব্ধ কৃষকরা তাঁদের উপর আক্রমণ চালায় ও দলিলপত্র পুড়িয়ে দেয়।
12. বাংলার তাঁত শিল্প কিভাবে ধ্বংস হয়েছিল?
ক) ক) প্রাকৃতিক দুর্যোগে
খ) খ) ব্রিটিশ নীতি— চড়া দামে কাঁচামাল, সস্তা দামে তৈরি দ্রব্য বিক্রি, শুল্কনীতি
গ) গ) ভারতীয়দের অনীহায়
ঘ) ঘ) মহারাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতায়
ব্যাখ্যা: বাংলার তাঁত শিল্প একাধিক কারণে ধ্বংস হয়েছিল: (১) ব্রিটেনে তৈরি সস্তা কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতা, (২) কোম্পানি কাঁচা সুতার একচেটিয়া ব্যবসা করে চড়া দামে বিক্রি, (৩) দেশীয় তাঁতিদের কম দামে তৈরি দ্রব্য বিক্রি করতে বাধ্য করা, (৪) ভারতীয় দ্রব্যের উপর উচ্চ শুল্ক ও ব্রিটিশ দ্রব্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ।
13. বাংলায় প্রথম পাটের কারখানা কোথায় ও কবে চালু হয়?
ক) ক) কলকাতা, ১৮৫০
খ) খ) হুগলির রিষড়া, ১৮৫৫
গ) গ) বোম্বাই, ১৮৫৩
ঘ) ঘ) মাদ্রাজ, ১৮৬০
ব্যাখ্যা: হুগলি জেলার রিষড়ায় (Rishra) ১৮৫৫ সালে ভারতে তথা বাংলায় প্রথম পাটের কারখানা চালু হয়। পাট ছিল বাংলার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল।
14. বোম্বাইয়ে প্রথম সুতির কাপড়ের কারখানা কবে চালু হয়?
ক) ক) ১৮৫০
খ) খ) ১৮৫৩
গ) গ) ১৮৫৫
ঘ) ঘ) ১৮৭০
ব্যাখ্যা: ১৮৫৩ সালে বোম্বাইতে (বর্তমানে মুম্বাই) প্রথম সুতির কাপড় তৈরির কারখানা চালু হয়। এটি ছিল ভারতের আধুনিক বস্ত্রশিল্পের সূচনা।
15. ভারতে রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
ক) ক) ভারতীয়দের যাতায়াতের সুবিধা
খ) খ) ব্রিটিশ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে দ্রুত যাতায়াত, বাজার দখল ও কাঁচামাল রপ্তানি
গ) গ) দূর্ভিক্ষ রোধ
ঘ) ঘ) কৃষির উন্নয়ন
ব্যাখ্যা: ভারতে রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থসিদ্ধি: (১) সেনাবাহিনীর দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করা, (২) বন্দর, শহর, কাঁচামাল উৎপাদনের জায়গাগুলিকে যুক্ত করে ব্রিটিশ বাণিজ্যের সুবিধা বৃদ্ধি, (৩) ব্রিটিশ পণ্য ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে সহজে পৌঁছে দেওয়া এবং কাঁচামাল রপ্তানি সহজ করা।
16. লর্ড ডালহৌসির আমলে (১৮৫৩) রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়। ডালহৌসির মূল লক্ষ্য কী ছিল?
ক) ক) পর্যটন শিল্পের বিকাশ
খ) খ) এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনাবাহিনী চলাচল নিশ্চিত করা
গ) গ) ভারতীয় কৃষকদের সুবিধা
ঘ) ঘ) তীর্থস্থানগুলির সংযোগ
ব্যাখ্যা: লর্ড ডালহৌসি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু করেছিলেন মূলত সামরিক কারণে— এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সেনাবাহিনী চলাচল নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বন্দর, শহর ও কাঁচামাল উৎপাদনের জায়গাগুলিকে যুক্ত করে বাণিজ্যের সুবিধা করাও তাঁর লক্ষ্য ছিল।
17. টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ভারতে প্রথম কবে চালু হয়?
ক) ক) ১৮৫১
খ) খ) ১৮৫৩
গ) গ) ১৮৫৭
ঘ) ঘ) ১৮৬৫
ব্যাখ্যা: ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রথম ১৮৫১ সালে চালু হয়। মাত্র কয়েক মাইল জুড়ে শুরু হলেও, ১৮৫৬ সালের শেষ দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে ৪৬টি টেলিগ্রাফ কেন্দ্র তৈরি হয়। এটি ঔপনিবেশিক প্রশাসন, বাণিজ্য ও সামরিক যোগাযোগে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
18. বাংলার নীলচাষ কিসের চাহিদা মেটানোর জন্য করা হতো?
ক) ক) ভারতীয় বাজারের চাহিদা
খ) খ) ইংল্যান্ডের কাপড় কলে নীলের চাহিদা
গ) গ) চিনের চাহিদা
ঘ) ঘ) আফ্রিকার চাহিদা
ব্যাখ্যা: বাংলায় নীল চাষ পুড়োটাই করা হতো ইংল্যান্ডের কাপড় কলে নীলের চাহিদা মাথায় রেখে। নীল ছিল রং তৈরির অপরিহার্য উপাদান। তবে পরবর্তীতে যখন কৃত্রিম রাসায়নিক পদ্ধতিতে নীল তৈরি শুরু হয়, তখন প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা কমতে থাকে।
19. 'অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী' কাদের বলা হয়?
ক) ক) ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ
খ) খ) যেসব ভারতীয় দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ঔপনিবেশিক নীতিকে দায়ী করে আন্দোলন করেন
গ) গ) ধনী জমিদার
ঘ) ঘ) ইউরোপীয় বণিক
ব্যাখ্যা: জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গোড়ার দিকে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদীরা (Economic Nationalists)— যেমন দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ— ভারতের দারিদ্র্যের জন্য ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতিকে (সম্পদের বহির্গমন, অবশিল্পায়ন) দায়ী করে সরকারের কড়া সমালোচনা করেন।
20. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে কী বলে অভিহিত করেছেন?
ক) ক) উন্নয়নের সোপান
খ) খ) বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
গ) গ) কৃষকের মুক্তির সনদ
ঘ) ঘ) সোনালি অধ্যায়
ব্যাখ্যা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলেন— "এই 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র— কখনো ফিরিবে না। ইংরেজদিগের এ কলঙ্ক চিরস্থায়ী।"
21. মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে মূলত কোন বন্দোবস্ত চালু হয়?
ক) ক) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
খ) খ) রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত
গ) গ) মহলওয়ারি বন্দোবস্ত
ঘ) ঘ) দশসালা বন্দোবস্ত
ব্যাখ্যা: মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের কিছু অঞ্চলে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement) চালু করা হয়। দক্ষিণ ভারতে বড়োমাপের জমিদার না থাকায় এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে কোম্পানি সরাসরি কৃষকের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত করতে চেয়েছিল।
22. ভারতীয় রেল নেটওয়ার্ক কত সালে প্রায় ৫২,৯০০ মাইল বিস্তৃত হয়েছিল?
ক) ক) ১৮৫৭
খ) খ) ১৮৭০
গ) গ) উনবিংশ শতকের শেষ দিকে
ঘ) ঘ) ১৯০৫
ব্যাখ্যা: উনবিংশ শতকের শেষ দিকে (১৯০০ সালের কাছাকাছি) ভারতীয় রেল নেটওয়ার্ক প্রায় ৫২,৯০০ মাইল (প্রায় ৮৫,০০০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই বিশাল রেল নেটওয়ার্ক ব্রিটিশ বাণিজ্য ও সামরিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
23. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদার যদি সময়মতো রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হতেন, তবে কী হতো?
ক) ক) তাঁকে বন্দি করা হতো
খ) খ) জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করা হতো
গ) গ) কর মকুব করা হতো
ঘ) ঘ) কৃষকদের শাস্তি দেওয়া হতো
ব্যাখ্যা: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কঠোর শর্তানুযায়ী (সূর্যাস্ত আইন) কোনো জমিদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব শোধ করতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি সেই জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে নতুন কারও হাতে তুলে দিত। এর ফলে বহু প্রাচীন জমিদার পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছিল।
24. ব্রিটিশ উপনিবেশিক সরকার কোন্ শিল্প স্থাপনে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ নিয়েছিল?
ক) ক) তাঁত শিল্প
খ) খ) নীল চাষের প্রচার ও অর্থায়ন
গ) গ) কাগজ শিল্প
ঘ) ঘ) চর্ম শিল্প
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ কোম্পানি সরকার নীল চাষের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৭৮৮ সালে কোম্পানি দশজন নীলকরকে চাষের জন্য অগ্রিম টাকা দিয়েছিল। নীলকররা বাংলায় নীলচাষে উদ্যোগী হন।
25. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কৃষকদের অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল?
ক) ক) ধনী কৃষক সম্প্রদায় গড়ে ওঠে
খ) খ) জমি হারিয়ে কৃষি শ্রমিক বা ভাগচাষীতে পরিণত হন
গ) গ) কৃষকরা শহরে পাড়ি দেন
ঘ) ঘ) কৃষকরা কারখানার মালিক হন
ব্যাখ্যা: কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সুফল শুধুমাত্র বড়ো কৃষিজীবী ও বিনিয়োগকারীরা পেয়েছিলেন। অধিকাংশ সাধারণ কৃষক উন্নত বীজ, সার, যন্ত্রপাতির অভাবে, চড়া রাজস্ব ও ঋণের বোঝায় জমি হারিয়ে ক্রমেই কৃষি শ্রমিক বা ভাগচাষীতে পরিণত হয়েছিলেন।
26. আসামের চা-বাগানগুলির শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে 'সঞ্জীবনী' পত্রিকায় কে লিখেছিলেন?
ক) ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) খ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়
গ) গ) রামমোহন রায়
ঘ) ঘ) সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি
ব্যাখ্যা: ব্রাহ্মসমাজের প্রবক্তা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় আসামের চা-বাগানগুলির শ্রমিকদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখে 'সঞ্জীবনী' পত্রিকাতে ইউরোপীয় মালিকদের অত্যাচারের খবর প্রকাশ করেন। তাঁর সঙ্গী রামকুমার বিদ্যারত্নও ধারাবাহিকভাবে 'কুলী-কাহিনী' নিবন্ধ লিখেছিলেন।
27. ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের ফলে কী ঘটে?
ক) ক) কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার শেষ হয়
খ) খ) কোম্পানি বিলুপ্ত হয়
গ) গ) ভারত স্বাধীন হয়
ঘ) ঘ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়
ব্যাখ্যা: ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের (Charter Act) মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় বাজারের একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকারের অবসান ঘটে। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে বিভিন্ন ব্রিটিশ পণ্য ভারতে আমদানি হতে থাকে এবং দেশীয় শিল্পগলি ধ্বংস হতে থাকে।
28. অবশিল্পায়নের ফলে কী ঘটেছিল?
ক) ক) ভারত আরও শিল্পোন্নত হয়েছিল
খ) খ) বিস্তর শিল্পী, কারিগর ও শ্রমিক জীবিকাহীন হয়ে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়েছিলেন
গ) গ) বেকারত্ব কমেছিল
ঘ) ঘ) ইউরোপে শিল্প বিপ্লব থেমে গিয়েছিল
ব্যাখ্যা: অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ধ্বংস হয়। বিপুল সংখ্যক শিল্পী, কারিগর ও শ্রমিক জীবিকা হারিয়ে বাধ্য হয়ে কৃষিকাজে ফিরে যেতে থাকেন। এর ফলে কৃষির ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির সামঞ্জস্য নষ্ট হয়।
29. বিজ্ঞান সাম্রাজ্যের প্রেক্ষিতে ভারতকে কী বলে আখ্যা দেওয়া হতো?
ক) ক) 'রক্ত' (Blood)
খ) খ) 'সোনার পাখি'
গ) গ) 'মস্তিষ্ক'
ঘ) ঘ) 'পেশি'
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারত ক্রমাগত সম্পদ শোষণের শিকার হয়েছিল। ব্রিটিশরা ভারতের বাজার, কাঁচামাল ও সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। এজন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ভারতকে সবচেয়ে দামি 'রক্ত' (Blood) হিসেবে বর্ণনা করা হতো— কারণ ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি সম্পদ শোষিত ও নিষ্কাশিত হতো।

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

20 টি
1. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) কী? এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি কী?
লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এটি ছিল এক স্থায়ী ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। মূল বৈশিষ্ট্য: (১) জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা স্বীকার করে নেওয়া হয়, (২) জমিদার কর্তৃক কোম্পানিকে প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় করে দেওয়া হয়, (৩) জমিদার সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর ও উত্তরাধিকারীকে দিতে পারতেন, (৪) কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ('সূর্যাস্ত আইন' অনুযায়ী) সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হতো, (৫) কৃষকদের স্বত্ব খারিজ করে তাদের নিছক প্রজায় পরিণত করা হয়— ফলত কৃষকেরা জমিদারের সম্পূর্ণ অনুকম্পার পাত্রে পরিণত হন।
2. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল ও কুফল কী ছিল?
সুফল: (১) কোম্পানির রাজস্ব আয় নিশ্চিত ও স্থায়ী হয়েছিল, (২) জমিদার শ্রেণি কোম্পানির একনিষ্ঠ অনুগত ও সমর্থক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়— যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত মজবুত করে, (৩) ধরে নেওয়া হয়েছিল জমিদাররা নিজেদের সম্পত্তি ভেবে কৃষির উন্নতিতে বিনিয়োগ করবেন। কুফল: (১) রাজস্বের হার ছিল অত্যধিক উঁচু, (২) কৃষকদের স্বত্ব খারিজ করে তাদের প্রজায় পরিণত করা হয়— জমিদারের অত্যাচার, বেআইনি কর (আবওয়াব) ও বেদখলের ভয়ে কৃষক জর্জরিত ছিলেন, (৩) 'সূর্যাস্ত আইন'-এর ফলে বহু পুরনো জমিদার সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন এবং নতুন মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণি জমিদারি কিনে নেয়, (৪) কৃষকদের অবস্থা ভাগচাষী বা বর্গাদারে নেমে আসে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একে 'বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বলে অভিহিত করেছিলেন।
3. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement) কী? কোথায় চালু হয়েছিল?
রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির কিছু অঞ্চলে চালু করা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় জমিদার না থাকায় সরাসরি রায়ত বা কৃষকের সাথে বন্দোবস্ত করা হয়। বৈশিষ্ট্য: (১) কৃষক বা রায়তকে জমির মালিক হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়, (২) চিরস্থায়ী করা হয়নি— নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাজস্বের হার সংশোধন করা হতো, (৩) রাজস্বের হার ছিল উঁচু— কোথাও ৪৫-৫৫% পর্যন্ত, (৪) নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে কৃষককে জমি থেকে উৎখাত করে অন্য কৃষককে দেওয়া হতো, (৫) কৃষকের দেওয়া রাজস্বকে 'কর' নয়, 'খাজনা' বলা হতো। বাস্তবে কৃষক ভাড়াটে চাষিতে পরিণত হয়েছিল।
4. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) কী? এর বৈশিষ্ট্য লেখো।
মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) উত্তর ভারতে (পাঞ্জাব, গাঙ্গেয় উপত্যকা, মধ্য ভারত) চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় সমগ্র গ্রাম সমাজ বা গ্রামের প্রধানদের সাথে রাজস্ব আদায়ের চুক্তি করা হতো। বৈশিষ্ট্য: (১) গ্রামের সর্দার বা সমগ্র গ্রাম (মহল) একটি একক হিসেবে রাজস্বের দায়িত্ব নিত, (২) এটি চিরস্থায়ী ছিল না— নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাজস্বের হার পুনর্নির্ধারণ করা হতো, (৩) রাজস্বের হার অত্যন্ত উঁচু ধার্য করা হতো, (৪) অতএব বাড়তি রাজস্বের বোঝা এবং সময়মতো শোধ না করতে পারার জটিলতা কৃষকদের ভোগ করতে হতো, (৫) গোটা গ্রাম সমষ্টিগতভাবে দায়ী থাকায় ব্যক্তিগত কৃষকের সুরাহার ব্যবস্থা ছিল না।
5. তিন ধরনের ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্তের মধ্যে কৃষকদের জন্য কোনটি সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল?
তিনটি বন্দোবস্তই ছিল মূলত কোম্পানির সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে তৈরি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদার-মহাজনের দ্বৈত শোষণ, রায়তওয়ারিতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সরাসরি শোষণ ও উৎখাতের ভয়, এবং মহলওয়ারিতে গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে শোষণ এবং অত্যধিক করের বোঝা চাপানো হয়েছিল। তুলনামূলকভাবে, রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্তের অধীনে অস্থায়ী রাজস্ব সংশোধনের ভয় ও সরাসরি সরকারি শোষণের কারণে কৃষকেরা বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাদের জমিতে কোনো প্রকৃত মালিকানা ছিল না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কৃষক বেআইনিভাবে হলেও জমিদারি অত্যাচারের শিকার ছিলেন। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিজেই ছিল 'অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'।
6. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ (Commercialization of Agriculture) কী এবং এর প্রভাব কী হয়েছিল?
কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ: উনিশ শতকে ভারতীয় কৃষকদের ওপর বাজারে বিক্রি বা ইউরোপে রপ্তানির জন্য খাদ্যশস্যের বদলে চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতি বাণিজ্যিক ফসল চাষের প্রবণতা ও বাধ্যবাধকতাকে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলে। প্রভাব: (১) কৃষক নিজের খাদ্যের জন্য চাষ না করে নগদ ফসলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন → ফসলের বাজার দর পড়ে গেলে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েন, (২) ধনী কৃষক ও বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও সাধারণ কৃষক ক্রমে জমি হারিয়ে কৃষি শ্রমিক বা ভাগচাষীতে পরিণত হন, (৩) কৃষির আধুনিকীকরণে যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ, সারের অভাবে সাধারণ কৃষক অংশ নিতে পারেননি, (৪) এই অসন্তোষ থেকেই নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) ও দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (১৮৭৫)-র মতো কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়।
7. নীল বিদ্রোহ (Indigo Revolt) কেন হয়েছিল? এর ফলাফল কী হয়?
নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০): বাংলার নদীয়া, যশোর, পাবনা প্রভৃতি জেলায় কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচার ও বাধ্যতামূলক নীলচাষের প্রতিবাদে সংঘটিত হয়। কারণ: (১) 'দাদন' প্রথা— জোরপূর্বক অগ্রিম টাকা দিয়ে কৃষককে নীলচাষ করতে বাধ্য করা, (২) নীলকরদের অমানুষিক অত্যাচার— পিটিয়ে, বেঁধে, জমি কেড়ে চাষ করানো, (৩) উৎপাদিত নীলের অত্যল্প মূল্য দেওয়া— ফলে ঋণ কখনো শোধই হতো না, (৪) কৃত্রিম রং বাজারে আসায় নীলের চাহিদা কমায় নীলকরদের অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। ফলাফল: বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করলে সরকার ১৮৬০ সালে একটি কমিশন গঠন করে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকদের ওপর জোর করে নীলচাষ করানো বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাংলার প্রথম সুসংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ।
8. 'দাদন' প্রথা কী? কৃষকদের ওপর এর প্রভাব কী ছিল?
'দাদন' (Dadan): এটি ছিল নীলকর সাহেবদের এক শোষণমূলক অর্থনৈতিক ফাঁদ। নীলকররা কৃষকদের জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে অগ্রিম টাকা (দাদন) ধরিয়ে দিতেন। সেই ঋণের বোঝায় কৃষক নীলচাষ করতে বাধ্য হতো— সম্পূর্ণ ফসল নির্ধারিত অল্প দামে নীলকরকে দিতে হতো। প্রভাব: (১) কৃষক ঋণের দুষ্টচক্রে চিরতরে আবদ্ধ হয়ে পড়তেন, (২) নিজের জমিতে ধান-পাটের মতো খাদ্যশস্য চাষ করতে পারতেন না, ফলে খাদ্যাভাব দেখা দিত, (৩) ঋণ শোধ করতে না পারলে জমি, গবাদি পশু ও সর্বস্ব হারাতে হতো, (৪) দমন-পীড়ন ও অত্যাচার চরমে উঠলে শেষ পর্যন্ত ১৮৫৯-৬০ সালে কৃষক বিদ্রোহ করেছিলেন।
9. দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (Deccan Riots, ১৮৭৫) কী? কেন হয়েছিল?
দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (Deccan Riots): ১৮৭৫ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির আহমদনগর, পুনা প্রভৃতি জেলায় কৃষক ও সাহুকার-মহাজনের মধ্যে দাঙ্গা। কারণ: উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-৬৫) সময় তুলোর চাহিদা বেড়ে গেলে দাক্ষিণাত্যে ব্যাপক তুলো চাষ হয়। গৃহযুদ্ধ শেষ হতেই ১৮৭০-এর দশকে তুলোর দাম একেবারে কমে যায়। উপরন্তু চড়া হারের রাজস্ব ও খরার ফলে কৃষক চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। সাহুকার-মহাজনরা এই সুযোগে ঋণের বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে দলিলপত্রে জমি বন্ধক রাখতে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ কৃষকরা সম্মিলিতভাবে সাহুকারদের আক্রমণ করে, ঋণের দলিলপত্র পুড়িয়ে দেয় ও তাঁদের বর্জন করে। এই বিদ্রোহের পর সরকার দাক্ষিণাত্য কৃষক আইন (Deccan Agriculturists' Relief Act, ১৮৭৯) পাস করতে বাধ্য হয়।
10. অবশিল্পায়ন (Deindustrialization) বলতে কী বোঝো? বাংলার তাঁত শিল্পের ক্ষেত্রে এটি কীভাবে ঘটেছিল?
অবশিল্পায়ন (Deindustrialization): ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতীয় দেশীয় কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প ও কারিগরি ব্যবস্থার পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করাকে বোঝায়। বাংলার তাঁত শিল্প: (১) শিল্প বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডে যন্ত্রে তৈরি সস্তা ও টেকসই কাপড়ের সাথে মুষ্টিমেয় তাঁতিদের তৈরি দ্রব্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি, (২) কোম্পানি কাঁচা সুতার কৃত্রিম একচেটিয়া ব্যবসা গড়ে তুলেছিল— ফলে তাঁতিদের উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনতে হতো, (৩) অথচ উৎপাদিত কাপড় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো, (৪) ব্রিটিশ পণ্যের ওপর শুল্ক প্রায় ছিল না, কিন্তু ভারতীয় দ্রব্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল, (৫) ফলস্বরূপ বাংলার তাঁতিশিল্প (বিশেষ করে ঢাকাই মসলিন) ও অন্যান্য হস্তশিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায় এবং লাখ লাখ তাঁতি ও কারিগর জীবিকাহীন হয়ে পড়েন।
11. সম্পদের বহির্গমন বা ড্রেন অফ ওয়েলথ (Drain of Wealth) বলতে কী বোঝো?
সম্পদের বহির্গমন (Drain of Wealth): দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদীদের মতে, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারতের সম্পদ ক্রমাগত বিভিন্ন আইনি ও অবৈধ উপায়ে ব্রিটেনে পাচার হয়ে যেতে থাকায় ভারত ক্রমাগত দরিদ্রতর হয়েছে। এই সম্পদ হস্তান্তরের পদ্ধতি: (১) কোম্পানির কর্মচারীদের উচ্চ বেতন ও পেনশনের টাকা ভারতীয় রাজস্ব থেকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া, (২) ভারতীয় রাজস্ব দিয়ে ব্রিটেনে তৈরি যুদ্ধ সরঞ্জাম ও রেলের মাল কেনা, (৩) রেলপথে বিনিয়োগকারী ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিকে গ্যারান্টি-সূদ প্রদান, (৪) বাগিচা ও খনিজ শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণরূপে ইংল্যান্ডে পাচার। দাদাভাই নওরোজি উনিশ শতকের শেষের দিকে হিসাব করে দেখান, ভারত থেকে প্রতি বছর গড়ে ২-৩ কোটি স্টার্লিং মূল্যের সম্পদ ব্রিটেনে যাচ্ছে, যার বিনিময়ে ভারত পায় না কিছুই।
12. ঔপনিবেশিক ভারতে রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও ফলাফল কী ছিল?
মূল উদ্দেশ্য: (১) ঔপনিবেশিক সামরিক স্বার্থ— দ্রুত সেনাবাহিনী চলাচল ও বিদ্রোহ দমন সহজ করা, (২) অর্থনৈতিক স্বার্থ— বন্দর ও অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে যুক্ত করে রপ্তানি সহজ করা, (৩) ব্রিটিশ পণ্য দ্রুত ও সুলভে ভারতের প্রত্যন্ত বাজারে পৌঁছে দেওয়া, (৪) দেশীয় বাজারে ব্রিটিশ পণ্যের অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করা। ফলাফল: (১) যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, (২) ব্রিটিশ পণ্য ও কাঁচামাল চলাচল সুগম হলেও ভারতীয় শিল্পের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর— কারণ রেলভাড়ার বৈষম্যমূলক নীতি (বন্দর থেকে অভ্যন্তরে কম ভাড়া, অভ্যন্তর থেকে বন্দরে বেশি ভাড়া) দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে দেয়, (৩) ভারতের বাজারগুলি একজোট হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ পণ্যের একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি হয়, (৪) অরণ্য ও জলনিকাশি ব্যবস্থার ক্ষতি, সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুতির মতো ক্ষতিকর প্রভাবও দেখা দেয়।
13. ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা কেন চালু করা হয়েছিল? এর গুরুত্ব কী ছিল?
ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ও সামরিক প্রয়োজনে। ১৮৫১ সালে প্রথম কয়েক মাইল জুড়ে চালু হয় এবং ১৮৫৬ সালের শেষে ৪৬টি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গুরুত্ব: (১) কলকাতা থেকে আগ্রা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও উটাকামুন্ড পর্যন্ত দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান সম্ভব হয়, (২) রেল স্টেশনগুলির মধ্যে সংবাদ ব্যবস্থা ও সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, (৩) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় বিদ্রোহের খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়ায় কোম্পানি ব্যাপকভাবে সুবিধা পায়— একে 'বিদ্রোহ দমনে টেলিগ্রাফের ভূমিকা' বলা হয়, (৪) বাণিজ্যিক দিক থেকে ইউরোপীয় ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার সংবাদ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। ১৮৭০ সালে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সমুদ্রগর্ভস্থ টেলিগ্রাফ সংযোগ চালু হলে ব্রিটেন ভারতীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করে।
14. 'সূর্যাস্ত আইন' (Sunset Law) কী? কেন এটি সমালোচিত?
'সূর্যাস্ত আইন' (Sunset Law) ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত কঠোর রাজস্ব আদায়-বিধি। নিয়ম: নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যাস্তের আগে জমিদারকে সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে হবে। ব্যর্থ হলে জমিদারি কোম্পানি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করবে। সমালোচনা: (১) এই আইন ছিল সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও হৃদয়হীন— প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, খরা) বা ফসলহানির কোনো কারণকেই গ্রাহ্য করা হতো না, (২) বহু পুরনো ও সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবার এই আইনের ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেন, (৩) নিলামের মাধ্যমে নতুন ধনী ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণি জমিদারি কিনে নেয়, যাদের গ্রামের সাথে কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল না— কৃষকের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়, (৪) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও অক্ষয়কুমার দত্ত সহ বহু ভারতীয় বুদ্ধিজীবী এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
15. ভারতীয় হস্তশিল্প ধ্বংসের পিছনে ব্রিটেনের শুল্কনীতি কী ভূমিকা নিয়েছিল?
ব্রিটেন তার নিজের শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে এবং ভারতকে একটি কাঁচামাল সরবরাহকারী উপনিবেশ ও ব্রিটিশ পণ্যের বাজারে পরিণত করতে এক কৌশলী শুল্কনীতি গ্রহণ করেছিল: (১) ভারতীয় তৈরি দ্রব্য (বিশেষ করে সুতিবস্ত্র) ব্রিটেনে রপ্তানির ওপর অত্যন্ত উচ্চ শুল্ক বসানো হয়েছিল, (২) অন্যদিকে ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্য (বিশেষ করে ল্যাঙ্কাশায়ারের কাপড়) ভারতে আমদানির ওপর নামমাত্র বা কোনো শুল্কই ছিল না, (৩) ফলস্বরূপ ব্রিটিশ পণ্য ভারতীয় বাজারে সস্তা হয়ে যায় এবং ভারতীয় তাঁতিদের তৈরি দ্রব্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধ্বংস হয়ে যায়, (৪) ভারতীয় কাঁচামাল (তুলো, পাট, নীল) রপ্তানির ওপর কোনো বাধা ছিল না— বরং রেলভাড়ায় ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানি উৎসাহিত করা হতো। এই একপেশে শুল্কনীতিই ভারতীয় হস্তশিল্প ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। 'অবশিল্পায়ন' শব্দটি দিয়ে এই প্রক্রিয়াকেই বোঝানো হয়।
16. উনিশ শতকে ভারতে দুর্ভিক্ষের কারণ কী ছিল? কোম্পানি সরকারের ভূমিকা কেমন ছিল?
উনিশ শতকে ভারতে বারবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। কারণ: (১) কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ— কৃষক খাদ্যশস্যের বদলে নীল, তুলো, পাট চাষ করতে বাধ্য হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ক্রমাগত কমছিল, (২) চড়া হারে রাজস্ব আদায়— কৃষকের হাতে সঞ্চয় বলতে কিছুই থাকত না, ফলে সামান্য খরায় বিপর্যয় আসত, (৩) রেলপথের নির্মাণ খাদ্যশস্য পরিবহনের চেয়ে বাণিজ্যিক ফসল রপ্তানির জন্যই বেশি ব্যবহৃত হতো, (৪) গ্রামীণ পুরনো জলাধার ও সেচ ব্যবস্থা ব্রিটিশ আমলে অবহেলিত হয় এবং নতুন করে সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি। সরকারের ভূমিকা: সরকার দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ও নিষ্ঠুর ভূমিকা নেয়। সাহায্যের পরিবর্তে রাজস্ব আদায় জারি রাখা হতো এবং খাদ্যশস্য মজুত করা বা বাজারদর নিয়ন্ত্রণেও কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ১৮৫৪ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিলেন।
17. বিজ্ঞান সাম্রাজ্যের ধারণায় ভারতকে কেন 'রক্ত' (Blood) বলা হতো?
বিজ্ঞান সাম্রাজ্য বলতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সেই পর্বকে বোঝায়, যখন উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ভারতের সম্পদকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্রিটেনের স্বার্থে পরিচালিত করা হতো। ভারতকে 'রক্ত' বলার কারণ: (১) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বা শক্তি ভারত থেকেই আসত, (২) ভারতীয় রাজস্ব, কাঁচামাল ও সম্পদ ক্রমাগত শোষিত হয়ে ব্রিটেনের শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক যন্ত্রকে সচল রাখত, (৩) উদাহরণস্বরূপ— ১৯১৪ সালের মধ্যে ব্রিটেনে ব্যবহৃত ল্যাঙ্কাশায়ার সুতিবস্ত্রের ৮৫% ভারতীয় বাজারে বিক্রি হতো, আর ব্রিটেনের লৌহ-ইস্পাত শিল্পের ১৭% কাঁচামাল আসত ভারত থেকে, (৪) অথচ ভারতীয় জনগণ এই দাতৃত্বের বিনিময়ে কোনো উন্নয়ন পেত না। ভারতকে এক 'নির্মমভাবে শোষিত রক্তদাতা উপনিবেশ' বলে আখ্যা দেওয়া হতো।
18. উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ভারতে যে কয়েকটি আধুনিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল, তাদের বর্ণনা দাও।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে (বিশেষ করে ১৮৫০-এর দশক থেকে) ভারতে ধীরে ধীরে কিছু আধুনিক যন্ত্রচালিত শিল্প গড়ে উঠতে থাকে। প্রধানগুলি: (১) সুতির কাপড়ের কল— ১৮৫৩ সালে বোম্বাইতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়; এটি ভারতীয় উদ্যোগপতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, (২) পাট কল— ১৮৫৫ সালে হুগলির রিষড়ায় প্রথম পাটকল চালু হয়, (৩) কয়লা উত্তোলন— রানীগঞ্জ ও ঝরিয়া অঞ্চলে কয়লা খনি বিকাশ লাভ করে, (৪) চা-বাগিচা— আসাম, বাংলার দার্জিলিং ও হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক চা-বাগান গড়ে ওঠে, (৫) চিনি, চামড়া, লৌহ-ইস্পাত শিল্প— বিংশ শতকের গোড়ার দিকে গড়ে ওঠে। তবে এই শিল্পগুলিতে মূলধন ও মুনাফার সিংহভাগ ছিল ইউরোপীয় (বিশেষত ব্রিটিশ) হাতে। ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র সুতির কাপড়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পেরেছিলেন।
19. ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সামঞ্জস্য নষ্ট হয়েছিল কেন?
ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। কারণ: (১) অবশিল্পায়ন— দেশীয় হস্তশিল্প ধ্বংস হলে বিপুল সংখ্যক শিল্পী ও কারিগর জীবিকা হারিয়ে জোরপূর্বক কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, (২) কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ— খাদ্যশস্যের বদলে বাণিজ্যিক ফসল (নীল, তুলো, পাট, চা) চাষ বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, (৩) জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়েনি, (৪) চড়া রাজস্ব ও ঋণের বোঝায় কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা ছিল না, ফলে গ্রামীণ শিল্প তথা কুটিরশিল্পের চাহিদা কমে যায়, (৫) ব্রিটিশ পণ্যের আগমনে শহর ও গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাজার কাঠামো ভেঙে পড়ে। ফলে কৃষি ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক না হয়ে, কৃষি হয়ে ওঠে কেবল কাঁচামাল উৎপাদক এবং ভারত হয়ে ওঠে তৈরি পণ্যের আমদানিকারক।
20. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রমেশচন্দ্র দত্ত কীভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সমালোচনা করেছিলেন?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: তিনি তাঁর বিখ্যাত 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রবন্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন— কর্নওয়ালিস 'প্রজাদিগের হাত পা বাঁধিয়া জমিদার প্রভুদিগের হস্তে সমর্পণ করিলেন', কিন্তু জমিদারদের অত্যাচার রোধের কোনো ব্যবস্থা করলেন না। বঙ্কিমচন্দ্র এই বন্দোবস্তকে 'বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' ও 'ইংরেজের চিরস্থায়ী কলঙ্ক' বলে অভিহিত করেন। রমেশচন্দ্র দত্ত: ভারতীয় সিভিলিয়ানের প্রথম সফল পরীক্ষার্থী ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর 'The Economic History of India' (ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস) গ্রন্থে প্রমাণ করে দেখান যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ঔপনিবেশিক রাজস্বনীতি ভারতীয় কৃষক সমাজকে কীভাবে ধীরে ধীরে অধঃপাতে দিয়েছে। তিনি রাজস্ব ও দুর্ভিক্ষের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে দেখান কীভাবে অতি কর আদায় কৃষি ও কৃষককে ধ্বংস করে দিয়েছে।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর

8 টি
1. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) কী? এর শর্ত, উদ্দেশ্য ও ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা করো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রমেশচন্দ্র দত্তের সমালোচনার উল্লেখ করো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)

লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন।

শর্তাবলি:

  • জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা প্রদান— সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর ও উত্তরাধিকারীকে দেওয়া যাবে।
  • কোম্পানিকে প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়।
  • 'সূর্যাস্ত আইন' (Sunset Law): নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে সম্পূর্ণ রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি।
  • কৃষকদের জমির ওপর স্বত্ব খারিজ— তারা নিছক প্রজায় পরিণত হন।

উদ্দেশ্য:

কর্নওয়ালিস চেয়েছিলেন জমিদারদের সম্পত্তির অধিকার স্থায়ী ও নিরাপদ করা হলে তাঁরা কৃষির উন্নতিতে বিনিয়োগ করবেন, কম সংখ্যক জমিদারের কাছ থেকে সহজে রাজস্ব আদায় হবে এবং জমিদাররা কোম্পানির অনুগত গোষ্ঠীতে পরিণত হবেন।

ফলাফল ও সমালোচনা:

সুফল: কোম্পানির রাজস্ব আয় নিশ্চিত ও স্থায়ী হয়, জমিদার শ্রেণি ব্রিটিশ শাসনের একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে ওঠে।

কুফল: কৃষকের স্বত্বহানি, জমিদার-মহাজনের দ্বৈত শোষণ, বেআইনি কর (আবওয়াব), উৎখাতের ভয় এবং সূর্যাস্ত আইনে প্রাচীন জমিদার পরিবারগুলির পতন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রবন্ধে লিখেছেন— কর্নওয়ালিস 'প্রজাদিগের হাত পা বাঁধিয়া জমিদার প্রভুদিগের হস্তে সমর্পণ করিলেন' এবং এই বন্দোবস্ত 'বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'। রমেশচন্দ্র দত্ত (The Economic History of India) প্রমাণ করেছিলেন কীভাবে এই ব্যবস্থা কৃষক সমাজকে ধ্বংস করেছে।

2. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত ও মহলওয়ারি বন্দোবস্ত কী? এদের সাথে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের তুলনামূলক আলোচনা করো। তিনটি বন্দোবস্তের মধ্যে কোনটি কৃষকদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল বলে তুমি মনে করো?

তিনটি বন্দোবস্তের তুলনা

বৈশিষ্ট্যচিরস্থায়ী বন্দোবস্তরায়তওয়ারি বন্দোবস্তমহলওয়ারি বন্দোবস্ত
প্রবর্তকলর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৯৩)থমাস মুনরো, রিড (১৮২০-এর দশক)উত্তর ভারতের প্রশাসকবৃন্দ (১৮২০-৩০)
অঞ্চলবাংলা, বিহার, উড়িষ্যামাদ্রাজ, বোম্বাইয়ের কিছু অংশউত্তর ভারত, পাঞ্জাব, গাঙ্গেয় অঞ্চল
বন্দোবস্ত কার সাথে?জমিদারের সাথেসরাসরি রায়ত (কৃষক)-এর সাথেগ্রামের সর্দার বা সমগ্র গ্রাম (মহল)-এর সাথে
রাজস্বের মেয়াদচিরস্থায়ী (অপরিবর্তনীয়)সাময়িক (পর্যায়ক্রমিক সংশোধন)সাময়িক (পর্যায়ক্রমিক সংশোধন)
কৃষকের স্বত্বখারিজ— প্রজানামেমাত্র মালিক (ভাড়াটে চাষি)গ্রাম সমাজের অংশ
রাজস্বের হারউঁচুঅত্যন্ত উঁচু (৪৫-৫৫%)উঁচু
মূল সমস্যাজমিদারি শোষণ ও সূর্যাস্ত আইনসরাসরি রাষ্ট্রীয় শোষণ ও উৎখাতসামষ্টিক দায়, ব্যক্তিগত সুরাহার অভাব

তুলনামূলক মূল্যায়ন

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কৃষক জমিদার ও মহাজনের দ্বৈত শোষণের শিকার হন। রায়তওয়ারিতে জমিদারমুক্ত হলেও রাষ্ট্র সরাসরি উৎপাদনের ৪৫-৫৫% রাজস্ব নিত এবং নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হলে উৎখাত করত। মহলওয়ারিতে গ্রামের অভিজাত শ্রেণি শোষকের ভূমিকা নিত।

উপসংহার: রায়তওয়ারি বন্দোবস্তই ছিল সবচেয়ে ক্ষতিকর— কারণ এতে কৃষক সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের মুখে পড়েন এবং রাজস্ব অস্থায়ী হওয়ায় কোনো নিরাপত্তাবোধ ছিল না।

3. ভারতের কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ কী? এর ফলে কৃষক সমাজে কী কী পরিবর্তন এসেছিল? নীল বিদ্রোহ ও দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করো।

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ

উনিশ শতকে ভারতীয় কৃষকদের খাদ্যশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ফসল (নীল, চা, পাট, তুলো, আফিম) উৎপাদনে বাধ্য করার প্রক্রিয়াকে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ (Commercialization of Agriculture) বলে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শিল্পের জন্য কাঁচামাল নিশ্চিত করা ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি।

কৃষক সমাজে পরিবর্তন:

  • খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা: নিজের খাবারের চাষ কমে যাওয়ায় বাজারনির্ভরতা বাড়ে।
  • মূলধন নির্ভরতা: নগদ ফসলের জন্য ঋণের প্রয়োজন হয়— মহাজনশ্রেণির কাছে জমি বন্ধক পড়তে থাকে।
  • আর্থিক বৈষম্য: ধনী কৃষক ও বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও সাধারণ কৃষক ক্রমে জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিক বা ভাগচাষীতে পরিণত হন।
  • বিদ্রোহ: অত্যধিক শোষণ ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কৃষক সম্মিলিত বিদ্রোহ করেন।

নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০)

নীলকররা জোরপূর্বক 'দাদন' (অগ্রিম টাকা) দিয়ে কৃষককে নীল চাষে বাধ্য করত। অত্যল্প মূল্যে ফসল কিনে নেওয়া, অমানুষিক নির্যাতন ও রাসায়নিক নীলের প্রতিযোগিতায় চাষিরা দিশেহারা হয়ে বিদ্রোহ করেন। দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকে এই বিদ্রোহ চিত্রিত হয়েছে। সরকার বাধ্য হয়ে ১৮৬০ সালে নীল কমিশন বসায়।

দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (১৮৭৫)

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তুলোর উচ্চমূল্যের আশায় কৃষক সাহুকারদের থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যাপক তুলোচাষ করেন। যুদ্ধ শেষে ১৮৭০-এর দশকে তুলোর দাম ধসে গেলে এবং খরায় ফসল নষ্ট হলে ঋণ শোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাহুকাররা জমি বন্ধক ও দলিলের বেড়াজালে কৃষককে জর্জরিত করে। ক্ষুব্ধ কৃষক সম্মিলিতভাবে সাহুকারদের আক্রমণ ও দলিল পুড়িয়ে দেয় (Deccan Riots)।

4. অবশিল্পায়ন (Deindustrialization) কী? ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতি কীভাবে ভারতীয় হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প ধ্বংস করেছিল? বাংলার তাঁত শিল্পের উদাহরণ দাও।

অবশিল্পায়ন (Deindustrialization)

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁত, কুটিরশিল্প ও কারিগরি পেশার পরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত ধ্বংসকে অবশিল্পায়ন বলে। এর পিছনে ছিল ভারতকে ব্রিটেনের তৈরি পণ্যের বাজার এবং কাঁচামালের নির্ভরযোগ্য জোগানদারে পরিণত করার নীতি।

ভারতীয় হস্তশিল্প ধ্বংসের উপায়:

  1. শুল্কনীতি: ভারতীয় দ্রব্যের ওপর উচ্চ শুল্ক (ব্রিটেনে রপ্তানিতে) এবং ব্রিটিশ দ্রব্যের আমদানিতে শুল্কমুক্ত বা নামমাত্র শুল্ক।
  2. কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ: কোম্পানি কাঁচা সুতা, রেশমের একচেটিয়া বাণিজ্য গড়ে তোলে, দেশীয় শিল্পীদের চড়া দামে কিনতে বাধ্য করে।
  3. বলপূর্বক সস্তায় ক্রয়: তাঁতিদের তৈরি পণ্য নির্দিষ্ট অল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো।
  4. অসম প্রতিযোগিতা: যন্ত্রে তৈরি টেকসই সস্তা ব্রিটিশ কাপড়ের সাথে হস্তচালিত তাঁতের প্রতিযোগিতা অসম্ভব ছিল।

বাংলার তাঁত শিল্পের ধ্বংস:

বাংলার মসলিন, জামদানি, শান্তিপুরের তাঁত ছিল বিশ্ববিখ্যাত। ব্রিটিশ নীতি: (১) কাঁচা তুলোর মূল্যবৃদ্ধি, (২) ঢাকা-মুর্শিদাবাদের মতো বয়নকেন্দ্রগুলিতে ইংরেজ বণিকদের আগ্রাসন, (৩) ল্যাঙ্কাশায়ারের সস্তা সুতিবস্ত্রের আগমন। ১৮১৩ সালের পর একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার শেষ হওয়ায় বন্যা হয়ে আসা ব্রিটিশ কাপড়ের বাজারে বাঙালি তাঁতি টিকে থাকতে পারেননি। ফলস্বরূপ তাঁতিরা জীবিকা হারিয়ে কৃষিতে ফিরতে বাধ্য হন— যা কৃষির ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করে। উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন— 'ভারতীয় সমভূমি তাঁতিদের হাড়ে ভর্তি'।

5. সম্পদের বহির্গমন (Drain of Wealth) তত্ত্ব কী? দাদাভাই নওরোজির মতে কী কী উপায়ে ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে পাচার হতো? এর ফলাফল কী ছিল?

ড্রেন অফ ওয়েলথ তত্ত্ব

দাদাভাই নওরোজি তাঁর 'Poverty and Un-British Rule in India' (১৯০১) গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে, ব্রিটেন ভারতের সম্পদ ক্রমাগত শুষে নিচ্ছে এবং বিনিময়ে কিছুই দিচ্ছে না। একে তিনি 'ড্রেন অফ ওয়েলথ' বা সম্পদের বহির্গমন বলেন।

সম্পদ পাচারের উপায়:

  1. প্রশাসনিক ব্যয়: কোম্পানির গভর্নর, ইউরোপীয় আমলা ও সেনাপতিদের উচ্চ বেতন, পেনশন ও ভাতা— সবই ভারতীয় রাজস্ব থেকে নিয়ে ইংল্যান্ডে প্রেরণ করা হতো।
  2. সুদ ও গ্যারান্টি: ভারতে রেলপথ নির্মাণকারী ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিকে নিশ্চিত লভ্যাংশ (গ্যারান্টি) দেওয়া হতো ভারতীয় রাজস্ব থেকে।
  3. যুদ্ধ ব্যয়: ভারতের অভ্যন্তরে ও বাইরে ব্রিটেনের যুদ্ধগুলির (আফগান, বর্মা, উপনিবেশিক সম্প্রসারণ) ব্যয় ভারতের ওপর চাপানো হতো।
  4. বাণিজ্য ঘাটতি: ভারত ক্রমাগত কাঁচামাল রপ্তানি করে ব্রিটিশ তৈরি পণ্য আমদানি করত— ফলে সবসময় বাণিজ্যে ভারত লোকসান দিত।

ফলাফল:

সম্পদের নিরন্তর বহির্গমনের ফলে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে মূলধন সম্পূর্ণরূপে নিষ্কাশিত হয়— শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— সব ক্ষেত্রে ভারত ক্রমাগত দরিদ্রতর ও পিছিয়ে পড়তে থাকে। নওরোজি হিসাব করে দেখান, প্রতি বছর গড়ে ২-৩ কোটি স্টার্লিং মূল্যের সম্পদ ভারত থেকে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছে। উনিশ শতকের শেষদিকে ভারতের জাতীয় আয়ের প্রায় ৬% এবং জাতীয় সঞ্চয়ের এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ এভাবেই বহির্গত হতো। এই তত্ত্বই পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

6. ভারতে রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা কখন ও কেন চালু হয়? এই দুই প্রযুক্তি ঔপনিবেশিক শাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল— যুক্তি দিয়ে আলোচনা করো।

রেলপথ (Railways)

লর্ড ডালহৌসির আমলে ১৮৫৩ সালে বোম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত প্রথম রেলপথ চালু হয়। ১৯০০ সালের মধ্যে ভারতে ৫২,৯০০ মাইল রেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়।

উদ্দেশ্য: (১) সামরিক— দ্রুত সেনা চলাচল, (২) অর্থনৈতিক— বন্দর ও কাঁচামাল অঞ্চলের সাথে সংযোগ স্থাপন, ব্রিটিশ পণ্য দ্রুত অভ্যন্তরীণ বাজারে পৌঁছানো, (৩) শাসনিক— দূরবর্তী প্রদেশগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার।

টেলিগ্রাফ (Telegraph)

১৮৫১ সালে প্রথম চালু হয় এবং ১৮৫৬ সালের শেষে ৪৬টি কেন্দ্র তৈরি হয়। ১৮৭০ সালে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সমুদ্রগর্ভস্থ টেলিগ্রাফ চালু হয়।

উদ্দেশ্য: (১) প্রশাসনিক সংবাদ দ্রুত আদান-প্রদান, (২) সামরিক গতিশীলতা নিশ্চিত করা, (৩) বাজার ও বাণিজ্যিক তথ্য দ্রুত সরবরাহ করা।

হাতিয়ার হয়ে ওঠার যুক্তি:

  • রেলপথের বৈষম্যমূলক ভাড়া: বন্দর থেকে অভ্যন্তরে ব্রিটিশ পণ্য আনার ভাড়া ছিল অত্যন্ত কম। অথচ অভ্যন্তর থেকে বন্দরে কাঁচামাল নেওয়ার ভাড়া ছিল বেশি। এটি দেশীয় বাণিজ্যের পক্ষে প্রতিকূল ছিল।
  • বাজার দখল: রেল প্রান্তিক গ্রাম পর্যন্ত ব্রিটিশ পণ্য পৌঁছে দিয়ে দেশীয় তাঁতি ও কারিগরদের বাজার ধ্বংস করে দিয়েছিল।
  • ১৮৫৭-র বিদ্রোহ: টেলিগ্রাফ বিদ্রোহের খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়ায় ব্রিটিশ সেনা দমন করতে সক্ষম হয়। ডালহৌসি বলেছিলেন— 'টেলিগ্রাফ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেছে'।
  • অরণ্য ও আদিবাসী: রেল নির্মাণের জন্য ব্যাপক অরণ্য ধ্বংস ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের স্থানচ্যুতি ঘটানো হয়েছিল।

সুতরাং, এই দুই প্রযুক্তি ভারতীয় জনগণের কল্যাণে না এসে ঔপনিবেশিক শাসনের নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ যন্ত্রকে আরও মসৃণ ও শক্তিশালী করে তুলেছিল।

7. ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির তিনটি প্রধান অভিযোগ— (ক) সম্পদের বহির্গমন, (খ) অবশিল্পায়ন, ও (গ) দারিদ্র্য— কীভাবে পরস্পর সম্পর্কিত ছিল? ব্যাখ্যা করো।

ঔপনিবেশিক অর্থনীতির ত্রিমুখী সংকট

ভারতীয় অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদীরা (দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে) ঔপনিবেশিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, যা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত—

১. সম্পদের বহির্গমন (Drain of Wealth):

ভারতীয় রাজস্ব থেকে প্রশাসনিক খরচ, সামরিক ব্যয়, রেলের গ্যারান্টি-সূদ এবং বাণিজ্য ঘাটতির মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল সম্পদ ব্রিটেনে পাচার হতো। এর ফলে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে মূলধন নিষ্কাশিত হয়ে যেত, যা দেশীয় পুনর্বিনিয়োগ অসম্ভব করে তোলে।

২. অবশিল্পায়ন (Deindustrialization):

বহির্গত সম্পদের পুনর্বিনিয়োগের অভাবে ভারতীয় হস্তশিল্প আধুনিকীকরণের সুযোগ পায়নি। পাশাপাশি ব্রিটেনের একপেশে শুল্কনীতি, কাঁচামালের দামবৃদ্ধি ও যন্ত্রে তৈরি পণ্যের আগমনে দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়। লাখ লাখ শিল্পী, তাঁতি, কারিগর জীবিকাহীন হয়ে কৃষিতে ফিরতে বাধ্য হন।

৩. দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ (Poverty & Famines):

জীবিকাহীন শিল্পী ও কারিগররা যখন জোরপূর্বক কৃষিতে ফিরলেন, তখন কৃষিজমিতে জনসংখ্যার অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। অন্যদিকে চড়া রাজস্ব, বাণিজ্যিক ফসল চাষের চাপ ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে অনীহা কৃষককে নিঃস্ব করে দেয়। সামান্য খরা বা বাজারের ওঠানামায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ত। ১৮৫৪-১৯০১ সালের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিলেন।

পারস্পরিক সম্পর্ক:

এই তিনটি উপাদান একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছিল: সম্পদের বহির্গমন → মূলধনের অভাব ও বিনিয়োগ শূন্যতা → আধুনিকীকরণ অসম্ভব → দেশীয় শিল্পের ধ্বংস (অবশিল্পায়ন) → বিপুল বেকারত্ব ও কৃষির প্রতি অস্বাভাবিক চাপ → চড়া রাজস্বে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ → খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ → চরম দারিদ্র্য। এই চক্রই ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির মর্মমূলে।

8. নীল বিদ্রোহের পূর্বে, সময়ে ও পরে কৃষক সমাজের অবস্থা কেমন ছিল? নীলচাষের মাধ্যমে কীভাবে ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যিকীকরণের নীতি কাজ করেছিল?

নীলচাষের প্রেক্ষাপট

ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের পর বস্ত্রশিল্পে সাদা কাপড়কে রঙিন করতে নীলের চাহিদা ছিল বিপুল। ভারতের (বিশেষত বাংলা ও বিহার) আবহাওয়া নীলচাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় ব্রিটিশ কোম্পানি সরকার ব্যাপক উৎসাহ ও অর্থ বিনিয়োগ করে। ১৭৮৮ সালে দশজন নীলকরকে অগ্রিম টাকা দিয়ে চাষ শুরুর পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।

কৃষকের অবস্থা (বিদ্রোহের পূর্বে):

  • নীলকর সাহেবরা 'দাদন' নামক অগ্রিম ঋণের ফাঁদে কৃষককে আবদ্ধ করতেন।
  • ঋণ শোধের জন্য জোর করে নির্দিষ্ট জমিতে নীল চাষ করাতে হতো— ধান-পাটের মতো খাদ্যশস্য ফলানোর জমি ছেড়ে দিতে হতো।
  • উৎপাদিত নীলের দাম এতই কম দেওয়া হতো যে ঋণ কখনো শোধ হতো না— বাবা-দাদার আমলের ঋণ নাতি-পর্যন্ত বহন করতে হতো।
  • চাষে রাজি না হলে বা প্রতিবাদ করলে ভীষণ অত্যাচার, লাঠিপেটা, জ্বালিয়ে দেওয়া, গৃহপালিত পশু ধরে নিয়ে যাওয়া হতো।

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের নীতি:

নীলচাষই ছিল কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের জ্বলন্ত উদাহরণ। এতে: (১) কৃষকের নিজের খাদ্যচাহিদা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হতো— সম্পূর্ণ চাষাবাদ হতো বিদেশি বাজারের রং-শিল্পের চাহিদা পূরণের জন্য, (২) ইউরোপীয় নীলকর ও কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য, কৃষকের কল্যাণ নয়, (৩) কৃষক বাজারের অধীনস্থ এক পণ্যে পরিণত হয়েছিলেন— যখনই কৃত্রিম রাসায়নিক পদ্ধতিতে নীল তৈরি শুরু হয়, প্রাকৃতিক নীলের দাম পড়ে যায়, কিন্তু কৃষক ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাননি।

বিদ্রোহ ও পরবর্তী অবস্থা:

১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহে বাংলার লাখ লাখ কৃষক সম্মিলিতভাবে নীলচাষ বর্জন ও নীলকরদের প্রতিহত করেন। দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক এই বিদ্রোহের প্রতি ইউরোপীয় ও ভারতীয় মহলে সহানুভূতি তৈরি করে। সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন বসাতে বাধ্য হয়, যা জোরপূর্বক নীলচাষ বন্ধে সুপারিশ করে। কিন্তু কৃষকের দারিদ্র্য ও ঋণের বোঝা সহজে কাটেনি।

মনে রেখো!

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): কর্নওয়ালিস, জমিদারদের স্থায়ী মালিকানা, সূর্যাস্ত আইন। রায়তওয়ারি: মাদ্রাজ-বোম্বাই, সরাসরি কৃষকের সাথে, ৪৫-৫৫% রাজস্ব। মহলওয়ারি: উত্তর ভারত, গ্রাম সমাজের সাথে। নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০): দাদন প্রথা, নীলদর্পণ। অবশিল্পায়ন: দেশীয় শিল্প ধ্বংস। ড্রেন অফ ওয়েলথ: দাদাভাই নওরোজি। দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা (১৮৭৫): তুলোচাষি বিদ্রোহ।

PDF ডাউনলোড

সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।

PDF ডাউনলোড
Sponsored Links

Frequently Asked Questions - ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও দরিদ্রতা

লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হয় এবং রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। জমিদারেরা কোম্পানির অনুগত গোষ্ঠীতে পরিণত হন, কিন্তু কৃষকদের জমির স্বত্ব খারিজ করে তাঁদের প্রজায় পরিণত করা হয়।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement) মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের কিছু অংশে চালু হয়, যেখানে সরাসরি কৃষক বা রায়তের সাথে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হতো। রাজস্বের হার ছিল ৪৫-৫৫% এবং তা চিরস্থায়ী ছিল না। অন্যদিকে, মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) উত্তর ভারতে চালু হয়, যেখানে সমগ্র গ্রাম (মহল) বা গ্রামপ্রধানের সাথে রাজস্ব চুক্তি করা হতো। উভয় ব্যবস্থাতেই কৃষকের অবস্থা শোচনীয় ছিল।

অবশিল্পায়ন (Deindustrialization) বলতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, তাঁত, কুটিরশিল্প ও কারিগরি পেশার পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করাকে বোঝায়। ব্রিটেনের যন্ত্রে তৈরি সস্তা পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শুল্ক বৈষম্য প্রভৃতি কারণে বাংলার তাঁত, ঢাকাই মসলিন সহ বিস্তর দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়। এর ফলে লাখ লাখ শিল্পী ও কারিগর জীবিকাহীন হয়ে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

সম্পদের বহির্গমন (Drain of Wealth) তত্ত্বের প্রবক্তা দাদাভাই নওরোজি। তিনি প্রমাণ করেন যে, ভারত থেকে প্রতিবছর গড়ে ২-৩ কোটি স্টার্লিং মূল্যের সম্পদ বিভিন্ন উপায়ে (প্রশাসনিক ব্যয়, সুদ, যুদ্ধব্যয়, বাণিজ্য ঘাটতি) ব্রিটেনে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। এই ক্রমাগত সম্পদ হস্তান্তরের ফলে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে মূলধন সম্পূর্ণ নিষ্কাশিত হয়ে যায় এবং ভারত চরম দরিদ্রতার শিকার হয়।