Advertisement
Advertisement

আকাশে সাতটি তারা: জীবনানন্দ দাশের একটি বিশদ আলোচনা

কবি পরিচিতি: জীবনানন্দ দাশ

জন্ম ও শৈশব: ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের এক বৈদ্য পরিবারে জীবনানন্দের জন্ম হয়। জীবনানন্দের বাবার নাম সত্যানন্দ দাশ এবং মা কুসুমকুমারী দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে জীবনানন্দ ছিলেন সবথেকে বড়ো। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ ছিলেন একজন শিক্ষক, প্রাবন্ধিক এবং ব্রাহ্মবাদী নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক। জীবনানন্দের মা ছিলেন সেই যুগের খ্যাতনামা কবি।

ছাত্রজীবন: জীবনানন্দের প্রাথমিক শিক্ষা হয় তাঁর মায়ের কাছেই। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে, নয় বছর বয়সে জীবনানন্দকে বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলে ফিথ গ্রেডে ভরতি করা হয়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই স্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। বরাবর মেধাবী ছাত্র জীবনানন্দ দাশ ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইনটারমিডিয়েট পাস করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভরতি হন। এই কলেজ থেকেই ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পাস করেন। ১৯২১-এ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইংরেজিতে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবন: ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ কলকাতার সিটি কলেজে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। ১৯২৭-এ তাঁর এই চাকরিটি চলে যায়। এরপর কিছুদিন তিনি বাগের হাট পিসি কলেজে এবং তারপর দিল্লির রামযশ কলেজে পড়ান। আবার তিনি বরিশালে ফিরে যান। ১৯৩০-এ লাবণ্যপ্রভা গুপ্তর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৩৫-এ তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। বছর দশেক পর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৫০-এ খড়গপুর কলেজে পড়াতে শুরু করেন কিন্তু এই চাকরিটিও তাঁকে ছাড়তে হয়। এরপর বেহালার বড়িশা কলেজ এবং সবশেষে হাওড়া গার্লস কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেছেন।

সাহিত্যজীবন: জীবনানন্দ যে বছর বিএ পাস করেন সেই বছর ১৯১৯-এ ব্রাহ্মবাদী পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা 'বর্ষ আবাহন' প্রকাশিত হয়। ১৯২৭-এ প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরাপালক'। এরপর একে-একে প্রকাশিত হয় তাঁর ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)। জীবনানন্দের রূপসী বাংলা এবং বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যগ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। তিনি কয়েকটি উপন্যাসও লিখেছিলেন, যেমন-বাসমতীর উপাখ্যান, জীবনপ্রণালী, কারুবাসনা, ইত্যাদি। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটোগল্পগুলি হল-একঘেয়ে জীবন, বৃত্তের মতো, চাকরি নেই, কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়' ইত্যাদি। তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ, কবিতার আত্মা ও শরীর, ইত্যাদি।

সম্মান ও স্বীকৃতি: তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কারে ভূষিত করেন।

জীবনাবসান: ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ অক্টোবর কবির মৃত্যু হয়।

উৎস

‘আকাশে সাতটি তারা' কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

'আকাশে সাতটি তারা' কবিতাটিতে কবি জীবনানন্দ দাস বাংলার এক শান্ত সন্ধ্যার ছবি এঁকেছেন। সূর্য ডোবার পর আকাশে সাতটি তারার কথা বলা হয় অর্থাৎ সপ্তর্ষিমণ্ডলের কথা বলেছেন। সূর্যাস্তের আভায় পাকা কামরাঙা ফলের মতো লাল টুকটুকে মেঘ যখন দিগন্তরেখায় সাগরজলে ডুবে গেছে মনে হয় তখন ঢেউয়ের রং-ও হয়ে ওঠে লাল। কবির মনে হয় যেন এক মৃত মনিয়া পাখির রক্তে লাল হয়ে উঠেছে জল। কবির মনে হয় এক এলোকেশী মেয়ে দেখা দিয়েছে আকাশে। কবির কল্পনার সেই মেয়েটি আসলে সন্ধ্যাকালীন বাংলার রূপ। মাটির বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা অন্ধকার যেন তার কালো চুলের রাশি। কবির মুগ্ধ চোখের সামনে আঁধার ঘনিয়ে সে তার চুলের স্পর্শ অনুভব করায় কবিকে। কবি যেমন করে ‘বাংলার মুখ' দেখেছেন তেমন করে আর কেউ দেখেনি। সেই এলোকেশীর চুলের স্পর্শে হিজল-কাঁঠাল-জামের পাতা ছুঁয়ে নামে রাত্রি। রূপসি বাংলার সন্ধ্যার যে মধুর গন্ধ তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ধান গাছ, কলমি শাক, হাঁসের ভেজা পালক, শরের মৃদু গন্ধ, পুকুরের সোঁদা গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ, কিশোরী মেয়ের চালধোয়া ভিজে ঠান্ডা হাতের গন্ধ, কিশোরের পায়ে দলা সুগন্ধি মুথাঘাসের গন্ধ আর বট ফলের হালকা গন্ধ মিলেমিশে তৈরি করে বাংলার সন্ধ্যার আমেজ। এই সহজসরল গ্রাম্য প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যেই কবি খুঁজে পান তাঁর রূপসি বাংলাকে।

নামকরণ

কবিতার নামকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কবিতার ক্ষেত্রে সাধারণত বিষয়বস্তু বা ব্যঞ্জনা অনুযায়ী নামকরণ হয়ে থাকে। কবিতার প্রথম পক্তি অনুসারে ‘আকাশে সাতটি তারা' নামটি সংকলকদের দেওয়া।

‘আকাশে সাতটি তারা' কবিতাটিতে কবি দিনের একটি বিশেষ সময় সন্ধ্যাকে বেছে নিয়েছেন। কবির চোখে তাঁর অতি প্রিয় রূপসি বাংলা সন্ধ্যার সময় যে রূপে ধরা দিয়েছে তাকেই তিনি বিভিন্ন সব খেয়ে ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। সবে যখন সূর্য অস্ত গিয়ে আকাশে দেখা দিয়েছে সপ্তর্ষিমণ্ডল তখন সূর্যের শেষ আভায় কামরাঙার মতো লালমেঘ বিলীন হয় পরে সাগরজলে। কবির উপলব্ধি হয় এক এলোকেশী কন্যা যেন দেখা দিয়েছে বাংলার সন্ধ্যা নীলআকাশে। মাটির বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা অন্ধকার যেন সেই মেয়ের ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের রাশি। কবি তাঁর চোখ-মুখ-নাক অর্থাৎ তাঁর প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেন সেই ঘনিয়ে আসা অন্ধকারকে। তাঁর মনে হয় পৃথিবীর কোনো পথ বা অঞ্চলে প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য দেখেনি।

হিজল-কাঁঠাল-জামের পাতা চুঁইয়ে নামা রাত্রি যেন সেই রূপসির চুলের আদরমাখা স্পর্শ। শুধু চোখ বা ত্বক দিয়ে নয় কবি ঘ্রাণেন্দ্রিয় দিয়েও অনুভব করেন সন্ধ্যাকে। পরিবেশের অনেক রকমের গন্ধ মিলেমিশে তৈরি হয় সন্ধ্যার এক বিশেষ গন্ধ। ধান গাছ, কলমি শাক, জলে ভেজা হাঁসের পালক, শর ইত্যাদির মৃদু গন্ধ, পুকুরের সোঁদা গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ, কিশোরী মেয়ের চালধোয়া ভিজে ঠান্ডা হাতের গন্ধ, কিশোরের পায়ে দলা মুথাঘাসের গন্ধ আর বট ফলের হালকা গন্ধ মিশে তৈরি হয় বাংলার একান্ত নিজস্ব সন্ধ্যার মধুর শীতল গন্ধ। এইভাবে কবি বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শ দিয়ে অনুভব করেন বাংলাকে। তাই কবিতাটির নামকরণ সার্থক ও যথার্থ হয়েছে।

আকাশে সাতটি তারা কবিতার ছবি

আকাশে সাতটি তারা: জীবনানন্দ দাশ

১. আকাশে সাতটি তারা (কবিতা) জীবনানন্দ দাশ – নবম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর:

MCQ

  1. ১.১ আকাশে কয়টি তারা উঠেছে?

    উত্তর: সাতটি।

  2. ১.২ জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর –

    উত্তর: চুলের বিন্যাসে।

  3. ১.৩ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় বঙ্গের কিশোর পায়ে দলে যায় –

    উত্তর: মুথা ঘাস।

  4. ১.৪ “কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো ________ ঢেউয়ে ডুবে গেছে” –

    উত্তর: বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে।

  5. ১.৫ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার পঙ্‌ক্তি সংখ্যা –

    উত্তর: ১৪।

  6. ১.৬ তারায় তারায় স্বপ্ন কখন এঁকে রাখে?

    উত্তর: সারাটা রাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে।

  7. ১.৭ “আমি এই ঘাসে বসে থাকি” – কখন?

    উত্তর: যখন আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে “আমি এই ঘাসে বসে থাকি”।

  8. ১.৮ কবি কোথায় বসে আছেন?

    উত্তর: ঘাসে।

  9. ১.৯ গঙ্গা সাগরের ঢেউয়ে কে ডুবে গেছে?

    উত্তর: মেঘ।

  10. ১.১০ সন্ধ্যাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?

    উত্তর: কেশবতী কন্যা।

  11. ১.১১ ‘অজস্র চুলের চুমা’ যেখানে ঝরে পড়েছে –

    উত্তর: হিজলে কাঁঠালে জামে।

  12. ১.১২ ‘কামরাঙা – লাল মেঘ’-কে কবি তুলনা করেছেন-

    উত্তর: মৃত মনিয়ার সাথে।

  13. ১.১৩ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি যে কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত সেটি হল –

    উত্তর: ‘রূপসী বাংলা’।

  14. ১.১৪ ‘আকাশে সাতটি তারা’ – কবিতাটি কার লেখা?

    উত্তর: জীবনানন্দ দাশ।

Advertisement

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ২.১ “বাংলার নীল সন্ধ্যা” – কেমনভাবে আসে কবির কাছে?

    উত্তর: বাংলা নীল সন্ধ্যা কবির কল্পনায় ‘কেশবতী কন্যার’ মত আসে।

  2. ২.২ কবির ‘চোখের’ পরে’, ‘মুখের’ পরে’ কী ভাসে?

    উত্তর: কবির ‘চোখের’ পরে’, ‘মুখের’ পরে’ কেশবতী কন্যার চুল অর্থাৎ বাংলার নীল সন্ধ্যার ছবি ফুটে ওঠে।

  3. ২.৩ কিশোরীর চালধোয়া হাত কেমন ছিল?

    উত্তর: কিশোরীর চালধোয়া হাত ছিল ভিজে এবং শীতল।

  4. ২.৪ কামরাঙা – লাল মেঘ কোথায় ডুবে গেছে?

    উত্তর: কামরাঙা- লাল মেঘ মৃত মনিয়ার মতো গঙ্গা সাগরে ডুবে গেছে।

  5. ২.৫ কবি কী টের পান?

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ টের পান সমাগত সন্ধ্যায় তাঁর পল্লি প্রকৃতিতে লুকিয়ে থাকা বাংলার প্রাণশক্তি।

  6. ২.৬ কলমি কী?

    উত্তর: পুকুরের ধারে বা কোন জলাশয়ের ধারে জন্মায় এমন এক ধরনের শাক যা বাঙালির খাদ্যতালিকায় স্থান পায়।

  7. ২.৭ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি কোন মাছ দুটিৱ উল্লেখ করেছেন?

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিত চাঁদা ও সরপুঁটি এই দুটি মাছের কথা উল্লেখ করেছেন।

  8. ২.৮ সন্ধ্যার সঙ্গে কবি কিসের ঘ্রাণ পান?

    উত্তর: সন্ধ্যার আগমণের সঙ্গে কবি নরম ধান, কলমি, শর, পুকুরের জল, চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের আঁশটে গন্ধ, পায়ে দলিত মুথা ঘাস ইত্যাদির ঘ্রাণ অনুভব করেন।

  9. ২.৯ কিশোরীর হাত ভিজে কেনো?

    উত্তর: কিশোরী সন্ধ্যাবেলায় চাল দিচ্ছিল, তাই তার হাত ভিজে।

  10. ২.১০ কবি কখন বাংলার প্রাণকে খুঁজে পান?

    উত্তর: আকাশে যখন সাতটি তারা ফুটে ওঠে তখন কবি বাংলার প্রাণকে খুঁজে পান।

  11. ২.১১ ‘আকাশে সাতটি তাৱা কবিতায় বটফল ব্যথিত কেন?

    উত্তর: লাল লাল বটফল গাছের তলায় পড়ে থাকে, নিতান্ত অবহেলায়—এই ফল কেউ আদর করে তুলে নেয় না। তাই সে ব্যথিত।

  12. ২.১২ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কাদেৱ মৃদু ঘ্রাণের কথা বলা হয়েছে?

    উত্তর: পুকুরের জল থেকে ভেসে আসছে চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু ঘ্রাণ।

  13. ২.১৩ ‘… মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো/ গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে’ – মেঘের রং কী?

    উত্তর: মেঘের রঙ কামরাঙা ফলের মতো লাল।

  14. ২.১৪ বাংলার সন্ধ্যাকে কবি ‘শান্ত অনুগত’ বলেছেন কেন?

    উত্তর: প্রকৃতির শান্ত – স্নিগ্ধ রূপ বোঝানের জন্য কবি ‘শান্ত অনুগত’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন।

  15. ২.১৫ ‘আকাশে সাতটি তারা’ – কবিতায় কোন্‌ কোন্‌ গাছের কথা উল্লেখ রয়েছে?

    উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় ‘হিজল, কাঁঠাল এবং জাম’ গাছের উল্লেখ আছে।

  16. ২.১৬ কবি ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কিশোরীর কথা কিভাবে উল্লেখ করেছেন?

    উত্তর: কবি কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

  17. ২.১৭ কিশোর পায়ে কি দলছে?

    উত্তর: কিশোর পায়ে মুথাঘাস দলছে।

  18. ২.১৮ কবি সন্ধ্যাকে কি বলেছেন?

    উত্তর: কবি সন্ধ্যাকে শান্ত অনুগত সন্ধ্যা বলে উল্লেখ করেছেন।

  19. ২.১৯ আকাশের সাতটি তারা কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?

    উত্তর: আকাশের সাতটি তারা কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের লেখা রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

  20. ২.২০ বাংলার নীল সন্ধ্যা কেমন ও কবি তাকে কীরূপে কল্পনা করেছেন?

    উত্তর: বাংলার নীল সন্ধ্যা শান্ত অনুগত এবং কবি তাকে কেশবতী কন্যারূপে কল্পনা করেছেন।

  21. ২.২১ কবি ঘাসে বসে থেকে আকাশে কী দেখেন?

    উত্তর: কবি ঘাসে বসে থেকে আসন্ন সন্ধ্যার দৃশ্যপটে আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠতে দেখেন।

  22. ২.২২ আকাশে সাতটি তারা বলতে কোন তারাদের কথা বলা হয়েছে?

    উত্তর: আকাশে সাতটি তারা বলতে আকাশের সপ্তর্ষিমন্ডলের কথা বলা হয়েছে।

  23. ২.২৩ কবি কামরাঙা–লাল মেঘের গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?

    উত্তর: কবি আকাশের লাল মেঘের গঙ্গাসাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে মৃত মনিয়া পাখির সাগরের জলে ডুবে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

  24. ২.২৪ আকাশে সাতটি তারা ওঠার সময় কবি কোথায় বসে?

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ আকাশে সাতটি তারা উঠলে ঘাসের উপর বসে সন্ধ্যার রূপ দেখেন।

  25. ২.২৫ ‘আকাশে সাতটি তারা কবিতায় সন্ধ্যার আকাশে কে এসেছে বলে কবির মনে হয়েছে?

    উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা কবিতায় বাংলার সন্ধ্যার আকাশে এক কেশবতী কন্যা এসেছে বলে কবি জীবনানন্দ দাশের মনে হয়েছে।

  26. ২.২৬ কবির ‘চোখের পরে’, ‘মুখের ‘পরে কী ভাসে?

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশের ‘চোখের পরে’, ‘মুখের পরে’ বাংলার নীল সন্ধ্যার চেহারায় আসা কেশবতী কন্যার চুল ভাসে।

  27. ২.২৭ কেশবতী কন্যার চুলের.চুমা কোথায় ঝরে?

    উত্তর: কেশবতী কন্যার চুলের চুমা হিজলে-কাঠালে-জামে অবিরত ঝরে পড়ে।

  28. ২.২৮ কবি বাংলার সন্ধ্যা সম্পর্কে কী কী বিশেষণ ব্যবহার করেছেন?

    উত্তর: কবি বাংলার সন্ধ্যা সম্পর্কে শান্ত, অনুগত ও নীল এই তিনটি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন।

  29. ২.২৯ পৃথিবীর কোন পথ কাকে দেখেনি বলে কবির মনে হয়?

    উত্তর: পৃথিবীর কোন পথ বাংলার সন্ধ্যারুপী কেশবতী কন্যাকে দেখেনি বলে কবির মনে হয়।

  30. ২.৩০ ‘অজস্র চুলের চুমা’ বলতে কবি কি বুঝিয়েছেন?

    উত্তর: প্রকৃতির বুকে অন্ধকারের নিবিড়তাকে বোঝাতে তিনি ‘অজস্র চুলের চুমা’ কথাটি ব্যবহার করেছেন।

Advertisement

সংক্ষিপ্ত বা ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ৩.১ ‘পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখেনি কো’ কবির বক্তব্য বিশ্লেষণ কর।

    উত্তর: কবি বঙ্গভুমিকে পৃথিবীর সব থেকে রুপসী নারী রূপে গণ্য করেন। রূপসী বাংলার মতো সুর্য পৃথিবী আর কোথাও নেই। তাই সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে সেখানে যে সন্ধ্যা নামে সে যেন কোনো এক কেশবতী কন্যার খোলার চুলের রাশি। তার চুল যেভাবে আকাশে ছড়িয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে তোলে তা আর পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। কবির কল্পনার সেই মানসী আসলে সন্ধ্যাকালীন বাংলার প্রকৃতি।

  2. ৩.২ ‘অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে, জামে ঝরে অবিরত’ – অজস্র চুমা বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: কল্পনাপ্রবণ কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশের সাতটি তারা’ কবিতাটিতে পল্লীবাংলার সন্ধ্যা এক মানসী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। সূর্যাস্তের পর সেই মানসী তার কালো চুল ছড়িয়ে দেয় বাংলার আকাশে। আকাশে ছড়িয়ে পড়া তার কালো চুল ধীরে ধীরে অন্ধকারের স্পর্শ নিয়ে আসে প্রকৃতির বুকে। হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের পাতায় নেমে আসে সেই অন্ধকার যেন সেই রূপসীর চুলের চুম্বন।

  3. ৩.৩ ‘এরই মাঝে বাংলার প্রাণ; —পঙক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।

    উত্তর: উধৃত পঙক্তিটি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জীবনানন্দের কাছে শুধু এক ভূখণ্ড নয়, প্রাণময়ী মূর্তি। শব্দ-গন্ধ- বর্ণ-স্পর্শ দিয়ে কবি তাকে অনুভব করেন। আলোচ্য কবিতাটিতে তিনি বাংলার সন্ধ্যাকালীন প্রকৃতির এক অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। হিজল, কাঠাল, বট প্রভৃতি বৃক্ষ, ধান গাছ, কলমি শাক, মুথা ঘাস, পুকুর, মাছ, কিশোর- কিশোরী অর্থাৎ মানুষ—এই সব নিয়েই বাংলার পরিপূর্ণ প্রকৃতি। এই প্রকৃতির মধ্যেই কবি বাংলার জীবন্ত সত্তাকে উপলব্ধি করেছেন।

  4. ৩.৪ “লাল লাল বর্টের ফলের/ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা”—তাৎপর্য– ব্যাখ্যা কর।

    উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি পল্লিপ্রকৃতির মধ্যে বাংলার প্রাণ’-কে খুঁজে পেয়েছিলেন। গাছ থেকে খসে পড়া বট ফলের মধ্যে রয়েছে এক নীরব ক্লান্তি। বাংলার শান্ত নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির মধ্যে থাকা বিষাদময়তাকেই যেন কবি এখানে প্রত্যক্ষ করেন। গাছ থেকে খসে পড়া বট ফলের মধ্যে রয়েছে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা।

  5. ৩.৫ ‘আমি এই ঘাসে বসে থাকি’ – কোন্‌ সময়ে কবি ঘাসে বসে থাকেন? তখন প্রকৃতির কেমন রূপ তাঁর চোখে ধরা পড়ে?

    উত্তর: আকাশে যখন সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে ওঠে, তখন কবি ঘাসে বসে থাকেন। তিনি সন্ধ্যা নেমে আসাকে অনুভব করেন। নীল সন্ধ্যার আবেশ তাঁর মনকে স্পর্শ করে। তাঁর মনে হয় কোনো এক কেশবতী কন্যা, কেশরাজি বিস্তার করে পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যার অন্ধকারকে নামিয়ে আনছে। তাঁর সেই চুলের স্পর্শ যেন কবি অনুভব করেন তাঁর চোখে মুখে।

  6. ৩.৬ ‘পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো’ – উদ্ধৃতাংশে কোন্‌ কন্যার কথা বলা হয়েছে? পৃথিবীর কোনো পথ তাকে দেখেনি কেন?

    উত্তর: উদ্ধৃতাংশে ‘কেশবতী কন্যা’র কথা বলা হয়েছে। সন্ধ্যের অন্ধকারকে ধীরে ধীরে গ্রামবাংলার প্রকৃতির বুকে নেমে আসতে দেখছেন কবি। অন্ধকার নেমে আসছে হিজল, কাঁঠাল, জাম গাছের উপরে। কবি কল্পনা করছেন আকাশে আছে এক রূপসী কেশবতী কন্যা, সেই রমণীর আলুলায়িত কেশ যেন স্পর্শ করছে এই গাছের মাথাকে। কবি তাঁর মাথার উপরে এই রূপসী কন্যার চুলের স্পর্শ অনুভব করেছেন। এই কন্যা কবির কল্পনা। তাই বাস্তব পৃথিবীর পথে এই কন্যাকে কোনো দিন দেখতে পাওয়া যায় না। সে শুধুমাত্র কবির কল্পনাতে মূর্ত হয়ে আছে।

  7. ৩.৭ “আসিয়াছে শান্ত অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা” – সন্ধ্যাকে নীল বলার যুক্তি কোথায়?

    উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি বলেছেন- রক্তিম সূর্য অস্ত গেছে। আকাশের রক্তাভ আভা মিলিয়ে গিয়ে আকাশ এখন নীল। এখন দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ। সূর্যের রক্তিম ছটাও যেমন নেই, তেমনি রাত্রির গাঢ় অন্ধকারও এখনো নেমে আসেনি, আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল এখন জ্বলজ্বল করেছে। আকাশ এখন মেঘমুক্ত ঝকঝকে নীল, তাই কবি সন্ধ্যাকে নীল বলেছেন।

  8. ৩.৮ “আমি এই ঘাসে বসে থাকি” – আমি কে? তিনি এই ঘাসে বসে থাকেন কেন?

    উত্তর: আমি বলতে এখানে কবি জীবনানন্দ দাশকে বোঝানো হয়েছে। কবি প্রকৃতি প্রেমী। গ্রাম বাংলার রূপের সঙ্গে তাঁর মনের নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। গ্রামবাংলা যেন তারই সত্ত্বার আরেক রূপ। সূর্যে অস্ত গেছে ‘নীল সন্ধ্যা’ নেমে আসছে, আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে উঠেছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে, তিনি ঘাসের উপর বসে পৃথিবীর বুকে এই সন্ধ্যে নেমে আসার ক্ষণটাকে অনুভব করছেন।

  9. ৩.৯ ‘কামরাঙা লাল মেঘ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

    উত্তর: কামরাঙা আমাদের বাংলার একটা ফল। কাঁচা অবস্থায় এই ফলটির রং সবুজ হলেও পরিপক্ক অবস্থায় এটি সিঁদুরে লাল রঙে পরিণত হয়। সূর্য যখন অস্তমিত হতে চলেছে, তখন সূর্যের লাল রঙের আভায় আকাশের মেঘও রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। যা কবিকে লাল কামরাঙার লাল রঙের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তাই কবি বলেছেন- ‘কামরাঙা লাল মেঘ’।

  10. ৩.১০ ‘কামরাঙ্গা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে’- পঙক্তিটির মধ্যে দিয়ে কবি কি বোঝাতে চেয়েছেন?

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় সন্ধ্যার আগমনের আগে বাংলার আকাশে সূর্যাস্তের আলোয় রাঙা মেঘের ছবি এঁকেছো। সূর্যের লাল আভায় মেঘগুলি যেন পাকা কামরাঙার মতো লাল হয়ে উঠেছে। মেঘের এই লাল রং খুবই ক্ষণস্থায়ী। লাল রং মুছে গেলে মেঘকে মনে হয় মৃত মুনিয়ার মতো ম্লান, বিবর্ণ। গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে তা অবলুপ্ত হয়। কামরাঙার রঙের সঙ্গে, মৃত মুনিয়ার সঙ্গে মেঘের তুলনা করা হয়েছে।

  11. ৩.১১ ‘আসিয়াছে শান্ত অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা——বাংলাৱ সন্ধ্যাকে শান্ত, অনুগত ও নীল বিশেষণে ভূষিত কৱাৱ কারণ কী?

    উত্তর: আলোচ্য উদ্ধৃতিটি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা থেকে গৃহীত। বাংলার গ্রামে শহরের মতো কোলাহল নেই, দিনশেষে সেখানে সমস্ত কাজের বিশ্রাম ঘটে। তাই সন্ধ্যা শান্তভাবে দিনের বিরতির ঘোষনা নিয়ে আসে। পল্লী বাংলার সন্ধ্যায় সারি সারি গ্যাস লাইট জ্বলে ওঠে না, তাই এক চাকচিক্যহীন সন্ধ্যা প্রতিদিন নিয়ম করে নেমে আসে। তাই সন্ধ্যা অনুগত। সন্ধ্যার অন্ধকার ও দিনের আলো মিশে যে আবছায়া তৈরী করে তার সঙ্গে গাছপালার সবুজ আভা মিশে সন্ধ্যাকে নীল করে।

  12. ৩.১২ “কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে;”—পঙক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

    উত্তর: উধৃত পঙক্তিটি কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় জীবনানন্দ তার একান্ত নিজস্ব ভঙিতে পল্লিবাংলার সন্ধ্যাকে বর্ণনা করেছেন। গ্রাম বাংলার সন্ধ্যাকে তিনি এক মানবী রূপে কল্পনা করেছেন। সূর্য ডুবে গেলে যখন দিনের আলো ফিকে হয়ে আসে, কবির মনে হয় যেন এক কেশবতী কন্যা এসেছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলে ঘনিয়ে আসে রাতের অন্ধকার। কবির চোখে এভাবেই কাব্যিকরূপে ধরা দেয় পল্লিবাংলার সন্ধ্যা।

  13. ৩.১৩ ‘আমার চোখের পরে, আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে’ – বক্তব্যটি ব্যাখ্যা কর।

    উত্তর: সবে যখন সুর্য অস্ত গেছে, আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠেছে সেই সময় কবি ঘাসের উপর বসে স্পর্শ, গন্ধ ও বর্ণ দিয়ে পল্লীবাংলার সন্ধ্যাকে অনুভব করে। তার মনে হয় যেন এক এলোকেশী মেয়ে দেখা দিয়েছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পরা কালো চুলের মতো ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। কবি তার চোখে মুখে সেই অন্ধকারের স্পর্শ অনুভব করেন।

বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

  1. ৪.১ ‘আমি পাই টেৱ’–‘আমি’ কে? বক্তার অনুভবটি বিশ্লেষণ কর।

    উত্তর: ‘আমি’ হলেন ‘রূপসী বাংলা’-র স্রষ্টা ও বাংলার প্রকৃতিপ্রেমিক কবি জীবনানন্দ দাশ। কবি জীবনানন্দ গ্রামবাংলার প্রকৃতি জগতে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার অপরূপ দৃশ্য দেখে মোহিত। সন্ধ্যা আসছে শান্ত অনুগত কেশবতী কন্যার মতো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকার কেশবতী কন্যার এলো চুলের মতো দৃশ্যমান সবকিছু ঢেকে ফেলছে। তার চুলের স্পর্শ চুমার মত অবিরত ঝরছে গাছ-গাছালির ওপর। তার চুলের বিন্যাস থেকে স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে পড়ছে। সে গন্ধ নরম ধানে ও কলমি লতার ঘ্রাণে। হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল আর চাঁদা-সরপুঁটির মৃদু গন্ধে। সে ঘ্রাণ কিশোরীর চালধোয়া ভিজে হাতে ও কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাসে, বটের লাল লাল ফলের ব্যথিত গন্ধে। সান্ধ্য শোভার দৃশ্যে, ঘনায়মান অন্ধকারের স্পর্শ ও গন্ধের মাঝে নিহিত বাংলার সজীব প্রাণের অস্তিত্ব কবি অনুভব করেছেন। তিনি টের পেয়েছেন বাংলার প্রকৃতি জগতের রূপ, রস ও গন্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা বাংলার মানুষের সজীবতা। এটাই বাঙালি প্রাণের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য।

  2. ৪.২ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় প্রকাশিত কবি জীবনানন্দের বঙ্গপ্রকৃতি–প্রীতির পরিচয় দাও।

    উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশের বঙ্গপ্রকৃতি-প্রীতির শ্রেষ্ঠ পরিচয় হল রূপময়ী বাংলার প্রকৃতি জগতের অপার সৌন্দর্য নিয়ে লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’। এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার মধ্যে বঙ্গপ্রকৃতির নানা শোভা, নানা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য যেন হাজার ছবি হয়ে ফুটে আছে। আকাশে সাতটি তারা কবিতা সেগুলির মধ্যে একটি। বাংলার বুকে নেমে আসা সন্ধ্যার দৃশ্য কবি কেবল দু-চোখ ভরে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে ঘনায়মান সন্ধ্যা যেন কেশবতী কন্যা। সে রূপসীর এলো চুল কেবল কবির চোখ ও মুখের ওপর ভাসমান নয়, তার চুলের চুমা অবিরত ঝরে হিজলে, কাঁঠালে, জামে। সন্ধ্যার এই দৃশ্য বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না বলে কবি মনে করেন। পৃথিবীর কোন পথ এ কন্যারে দেখে নি কো—’। হিজল কাঁঠাল জাম নিয়ে বাংলা প্রকৃতির যে গাছ-গাছালি তা বাংলার নিজস্ব প্রকৃতি জগৎ। ওই বঙ্গপ্রকৃতির আরও নিজস্ব অনুষঙ্গ হল নরম ধান, কলমি লতা, হাঁস, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটি, বটের লাল লাল ফল। ওইসব অনুষঙ্গের নিজস্ব ঘ্রাণ যেন রূপসী বঙ্গসন্ধ্যা কেশবতী কন্যার চুলের বিন্যাস থেকে ঝরে পড়া স্নিগ্ধ গন্ধ। কবি জীবনানন্দ তাঁর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ব দিয়ে বাংলার সমাগত সন্ধ্যার সৌন্দর্য বর্ণনার অবকাশে তাঁর বঙ্গপ্রকৃতির পরিচয়কে সার্থক করে রেখেছেন।

  3. ৪.৩ ‘… আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের।’ – আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে কবি কী টের পান?

    উত্তর: কবি প্রকৃতিপ্রেমী, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর মনের নিবিড় যোগ আছে। সূর্য অস্ত যাবার পরে যখন গ্রামবাংলার বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে, আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তা কবির মনকে ছুঁয়ে যায়। প্রকৃতির সেই রূপ, প্রকৃতির সেই গন্ধ কবির খুবই পরিচিত। কবি যদি দূরেও থাকেন তবুও তিনি মানসচক্ষে সেই রূপকে পরিলক্ষিত করতে পারেন। গ্রাম বাংলার বুকে সন্ধ্যে ধীরে ধীরে নেমে আসার চিত্র কবি বহুবার দেখেছেন। তাঁর মনের গভীরে, তাঁর অনুভূতির সঙ্গে, গ্রামবাংলা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলার ধানের গন্ধ, কলমি শাকের গন্ধ, পুকুরের জলের গন্ধ, হাঁসের পালকের গন্ধ, চাঁদা- সরপুঁটি মাছের বিশেষ ধরনের গন্ধ, কিশোরীর চাল ধোয়ার হাতের গন্ধ, মুথাঘাস পায়ের চাপে দলিত হওয়ার যে গন্ধ, সেইসব গন্ধের মধ্যেই মিশে আছে গ্রাম বাংলা। এই সব কিছুই বাংলার রূপ। এইসব কিছুর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জুড়ে আছে গ্রাম বাংলা। কবি যেখানেই থাকুন না কেন আকাশে সাতটি তারা উঠলে কবি গ্রাম বাংলা এই রুপ অনুভব করেন বা ‘টের’ পান।

  4. ৪.৪ “আমি এই ঘাসে বসে থাকি” – কে, কখন ঘাসে বসে থাকেন? ‘এই ঘাস’ বলতে তাঁর কোন্‌ বিশেষ অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে?

    উত্তর: ‘আমি’ বলতে কবি জীবনানন্দ দাশের কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর বুকে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে তখন কবি ঘাসের উপর বসে থাকেন। ঘাস মাটির বুকে জন্ম নেয়, মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর। ঘাসের উপরে বসে থাকার অর্থ পৃথিবীর সঙ্গে নৈকট্য স্থাপন। ঘাসের উপরে বসে থাকার অর্থ পৃথিবীকে ছুঁয়ে থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে যাওয়া। কবি গ্রাম বাংলাকে ভালোবাসেন। গ্রাম বাংলার একটা অঙ্গ হল এই সবুজ ঘাস। এই ঘাসের মধ্যে বসেই কবি প্রকৃতির সান্ধ্য-রূপে অবগাহন করেন। এখানে বসেই তিনি অনুভব করেন কেশবতী কন্যার রূপে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রকৃতি বাংলার বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন ঘ্রাণ কবির মনকে ছুঁয়ে যায়।

  5. ৪.৫ “যেন মৃত মনিয়ার মতো” – কার সঙ্গে মৃত মনিয়ার তুলনা করা হয়েছে? তুলনাটির যথার্থতা বিচার করো।

    উত্তর: সন্ধ্যা নেমে আসছে পশ্চিম দিগন্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সূর্যের লাল আভা আকাশকে রক্তাভ করে তুলেছে। এই রক্তরাঙা আকাশকে কবি মৃত মুনিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবিতায় মুনিয়ার অর্থ আমাদের কাছে মনিয়া বা মুনিয়া পাখি মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে কবি সেই অর্থে মুনিয়া শব্দটি ব্যবহার করে নি। আসলে ‘মনিয়া’র উৎস একটি গ্রিক-ল্যাটিন শব্দ। গ্রিক menos শব্দের অর্থ নিঃসঙ্গ বালক, ল্যাটিন monica-র অর্থ শিশুকন্যা। এমনকি পর্তুগিজ ভাষায় এই menos / monica পরিবর্তিত হয়ে menina-তে পরিণত হয়েছে। অনুমান করা যায় আরবি ভাষায় এই menina থেকেই মুনিয়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে এবং আরবি ভাষার প্রভাবে বরিশাল, চট্টগ্রামের বাংলা ভাষায় এই শব্দটিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই মনিয়া-র অর্থ পাখি নয়, কন্যাসন্তান। জীবনানন্দের দিনলিপি থেকে জানা যায় মনিয়া আসলে সৈদপুরের এক পাদ্রী এবং এক হিন্দু রমণীর কন্যা। কবির স্মৃতিতে ছিল বাংলার প্রাচীন গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জনের প্রথার কথা। এই কন্যাসন্তান মনিয়াও যেন গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে। আর লাল রঙ যেন সেই কন্যার মৃত্যুকে ইঙ্গিত করেছে। মনিয়ার মতো কন্যারা যেভাবে গঙ্গাসাগরের অতলে ডুবে যায় নিঃশব্দে, তেমনই আকাশের হলুদাভ লাল মেঘ দিগন্তের ওপারে ঢেউয়ের গভীরে যেন ডুবে গেছে।

  6. ৪.৬ “এরই মাঝে বাংলার প্রাণ” – বাংলার প্রাণস্পন্দন কবি কিভাবে উপলব্ধি করেছেন?

    উত্তর: ‘প্রকৃতি প্রেমিক’ কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার মাধ্যমে গ্রাম বাংলার সান্ধ্যকালীন রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। সবুজ ঘাসে বসে তিনি সন্ধ্যার এক অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করেন। সন্ধ্যার আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে। সূর্যের অস্ত যাওয়ার পরবর্তী সময়ের লাল বর্ণের আকাশের রং তাঁকে গঙ্গা সাগরের জলের অতলে ডুবে যাওয়া বিসর্জিত কন্যাকে মনে করায় (যাকে কবি মৃত মনিয়া বলেছেন)। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা সম্পূর্ণ ভাবে নেমে আসে, কোনরূপ চঞ্চলতাহীন সন্ধ্যা যেন প্রকৃতির শান্ত – অনুগত। সন্ধ্যার রং-কে কবির নীল বলে মনে নয়, কবি কল্পনা করেন এ যেন এক ‘কেশবতী কন্যা’। এই কল্পিত কন্যার চুলে স্পর্শ করে কবির চোখ – মুখ। বাংলার পরিচিত গাছ – হিজল, কাঁঠাল, জাম গাছেরাও এই কন্যার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয় না। সন্ধ্যাকালীন অপরূপ মায়াময় স্নিগ্ধ গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। নরম ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রান, হাসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা – শরপুটিদের মৃদু ঘ্রান, কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত, কিশোরের পায়ে দলা মুথাঘাস, লাল বট ফলের ব্যথিত নীরবতা – পল্লীগ্রামের পরিচিত সব বিশেষ মুহূর্ত – গন্ধ – ঘটনা কবির প্রাণকে ছুঁয়ে যায়। তাঁর মনের গভীরে, তাঁর অনুভূতির সঙ্গে, গ্রামবাংলা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এর মাঝেই কবি খুঁজে পান বাংলার প্রাণ।

  7. ৪.৭ আকাশে সাতটি তারা কবিতাটি নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

    উত্তর: বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী বিখ্যাত কবি হলেন জীবনানন্দ দাশ। সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যে নামকরণ বিষয় কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। আলোচ্য কবিতায় আকাশে সাতটি তারা কবির চোখে ধরা পড়েছে। কবি সেই দৃশ্য দেখার জন্য মাটিতে ঘাসের উপর বসে পড়েছেন। রাঙা মেঘকে কবি মৃত মুনিয়ার মতো দেখেছেন। যা গঙ্গা সাগরে ডুবে গেছে, কেশবতী কন্যার ছায়া কবি সন্ধ্যার আকাশে লক্ষ করেছেন। তার নরম হাতের স্পর্শ কবি দেখেছেন চাল ধোয়া জল এর ঠান্ডাময় অবস্থার মধ্যে। বাংলার সন্ধ্যা প্রকৃতির মাঝে ও সন্ধ্যার আকাশের সাতটি তারার মাঝে কবি প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন। আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠেছে। পাঠকের মনের পর্দাতেও যেন সাতটি তারার ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই নাম করন টি যথার্থ এবং সার্থক হয়েছে।

সমস্ত সমাধান আমাদের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা WBBSE নির্দেশিকা অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছে। সমাধানগুলিতে পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নের উত্তর, ব্যাকরণ অনুশীলন এবং লেখার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
Advertisement

Complete Bengali Solutions কিনুন

অফলাইন অধ্যয়নের জন্য সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তর PDF ফরম্যাটে পান

Advertisement