অধ্যায় ৫: মানুষের খাদ্য (Human Food)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা মানুষের খাদ্যের বিভিন্ন উপাদান এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে জানব। খাদ্যের প্রধান উপাদানগুলি হলো শর্করা (কার্বোহাইড্রেট), প্রোটিন, লিপিড (ফ্যাট), ভিটামিন, খনিজ মৌল ও জল। শর্করা ও লিপিড প্রধানত শক্তি সরবরাহ করে, আর প্রোটিন দেহ গঠনে ও ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে। ভিটামিন ও খনিজ মৌল অল্প পরিমাণে লাগলেও রোগ প্রতিরোধ এবং দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। অধ্যায়টিতে বিভিন্ন ভিটামিন (A, D, E, K, B-complex, C) ও খনিজ মৌলের (আয়রন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন) উৎস এবং তাদের অভাবজনিত রোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও, অপুষ্টি (ম্যারাসমাস, কোয়াশিওরকর) ও স্থূলত্ব (Obesity)-এর কারণ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক, প্রক্রিয়াজাত ও সংশ্লেষিত খাদ্যের পার্থক্য এবং তাদের প্রভাবও এখানে আলোচিত।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
কোন খাদ্য উপাদানটি প্রধানত শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: (গ) শর্করা
দেহ গঠনে ও ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে কোন খাদ্য উপাদান?
উত্তর: (গ) প্রোটিন
কোন ভিটামিনের অভাবে রাতকানা রোগ হয়?
উত্তর: (ক) ভিটামিন A
স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে কোন ভিটামিন?
উত্তর: (গ) ভিটামিন C
হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ঠিক রাখতে প্রয়োজন—
উত্তর: (গ) ভিটামিন D
রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া হয় কোন খনিজ মৌলের অভাবে?
উত্তর: (ঘ) আয়রন
গলগণ্ড বা গয়টার রোগ হয় কিসের অভাবে?
উত্তর: (গ) আয়োডিন
প্রোটিন ও শক্তির অভাবে শিশুদের কোন রোগ হয়?
উত্তর: (গ) ম্যারাসমাস
কোনটি তেলে বা ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন?
উত্তর: (গ) ভিটামিন D
কোনটি জলে দ্রবণীয় ভিটামিন?
উত্তর: (খ) ভিটামিন C
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে কোন খাদ্য উপাদান?
উত্তর: (গ) খাদ্যতন্তু
কোনটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস?
উত্তর: (ঘ) সয়াবিন
BMI-এর মান কত হলে স্থূলত্ব (Obesity) বোঝায়?
উত্তর: (ঘ) 30-এর বেশি
ফাইটোকেমিক্যালস বা উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক পাওয়া যায়—
উত্তর: (গ) রঙিন ফল ও সবজিতে
কোন খাদ্যটিকে সুষম খাদ্য বলা হয়?
উত্তর: (গ) দুধ
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
খাদ্য কাকে বলে?
উত্তর: যা গ্রহণ করলে জীবের দেহ গঠন, বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, তাকে খাদ্য বলে।
খাদ্যের প্রধান উপাদানগুলি কী কী?
উত্তর: খাদ্যের প্রধান উপাদানগুলি হলো: (১) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট, (২) প্রোটিন, (৩) লিপিড বা ফ্যাট, (৪) ভিটামিন, (৫) খনিজ মৌল এবং (৬) জল।
শক্তি উৎপাদক খাদ্য কোনগুলি?
উত্তর: শর্করা (কার্বোহাইড্রেট) এবং লিপিড (ফ্যাট) হলো প্রধান শক্তি উৎপাদক খাদ্য।
দেহ সংরক্ষক খাদ্য কোনগুলি?
উত্তর: ভিটামিন এবং খনিজ মৌলকে দেহ সংরক্ষক খাদ্য বলা হয়, কারণ এরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
ভিটামিন A-র দুটি উৎস লেখো।
উত্তর: ভিটামিন A-র দুটি উৎস হলো গাজর এবং পাকা আম।
ভিটামিন C-র দুটি উৎস লেখো।
উত্তর: ভিটামিন C-র দুটি উৎস হলো পাতিলেবু এবং আমলকী।
ভিটামিন D-র উৎস কী?
উত্তর: ভিটামিন D-র প্রধান উৎস হলো সূর্যালোক। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে আমাদের ত্বকে এটি সংশ্লেষিত হয়। এছাড়া মাছের যকৃতের তেল, দুধ, ডিমেও এটি পাওয়া যায়।
রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে কোন ভিটামিন?
উত্তর: ভিটামিন K রক্ত তঞ্চনে বা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
খাদ্যতন্তু বা রাফেজ কী? এর একটি কাজ লেখো।
উত্তর: খাদ্যতন্তু হলো উদ্ভিজ্জ খাদ্যের অপাচ্য অংশ, যা মূলত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এর প্রধান কাজ হলো মল তৈরিতে সাহায্য করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা।
* অপুষ্টি কাকে বলে?
উত্তর: দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক খাদ্য উপাদানের দীর্ঘকালীন অভাব বা আধিক্যের কারণে শরীরে যে অস্বাভাবিক ও রোগগ্রস্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে অপুষ্টি বলে।
ম্যারাসমাস ও কোয়াশিওরকর রোগের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: খাদ্যে প্রোটিন ও শক্তি (ক্যালোরি) উভয়ের চরম অভাবে ম্যারাসমাস রোগ হয়। আর, খাদ্যে শক্তির পরিমাণ ঠিক থাকলেও শুধুমাত্র প্রোটিনের شدید অভাবে কোয়াশিওরকর রোগ হয়।
স্থূলত্ব বা Obesity কাকে বলে?
উত্তর: বয়স ও উচ্চতার তুলনায় দেহের ওজন যখন স্বাভাবিকের থেকে 20% বা তার বেশি হয়ে যায় এবং শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট জমা হয়, সেই অবস্থাকে স্থূলত্ব বা Obesity বলে।
BMI কী?
উত্তর: BMI-এর পুরো নাম Body Mass Index। এটি হলো দেহের ওজন (কিলোগ্রামে) এবং উচ্চতার (মিটারে) বর্গের অনুপাত (\(BMI = \frac{ওজন (kg)}{উচ্চতা (m)^2}\))। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ওজন স্বাভাবিক, কম না বেশি তা নির্ণয় করা হয়।
প্রাকৃতিক, প্রক্রিয়াজাত ও সংশ্লেষিত খাদ্যের একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর: প্রাকৃতিক খাদ্য: একটি পাকা আম। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য: জ্যাম বা জেলি। সংশ্লেষিত খাদ্য: কমলালেবুর গন্ধযুক্ত ঠান্ডা পানীয়।
ফাইটোকেমিক্যালস বা উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক কী?
উত্তর: উদ্ভিজ্জ খাদ্যে (যেমন রঙিন ফল ও শাকসবজি) প্রাপ্ত কিছু রাসায়নিক যৌগ যা আমাদের দেহে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, তাদের ফাইটোকেমিক্যালস বলে। যেমন: ক্যারোটিনয়েডস।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* খাদ্যের প্রধান উপাদানগুলির নাম লেখো এবং মানবদেহে প্রত্যেকটির একটি করে প্রধান কাজ উল্লেখ করো।
উত্তর:
খাদ্যের প্রধান উপাদান এবং তাদের কাজ নিচে দেওয়া হলো:
১. শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট:
কাজ: এটি দেহের শক্তির প্রধান উৎস। দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।
২. প্রোটিন:
কাজ: দেহের বৃদ্ধি, কোষ গঠন এবং ক্ষয়পূরণ করা প্রোটিনের প্রধান কাজ।
৩. লিপিড বা ফ্যাট:
কাজ: এটি শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে এবং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন শোষণে সাহায্য করে।
৪. ভিটামিন:
কাজ: দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৫. খনিজ মৌল:
কাজ: হাড় ও দাঁত গঠন, রক্ত উৎপাদন এবং স্নায়ুতন্ত্রের কাজ নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
৬. জল:
কাজ: জল খাদ্য পরিপাক, শোষণ, পরিবহন এবং দেহ থেকে দূষিত পদার্থ নিষ্কাশনে সাহায্য করে। এটি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।ভিটামিনকে কয় ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী? ভিটামিন A এবং ভিটামিন C-এর উৎস, কাজ ও অভাবজনিত রোগের নাম লেখো।
উত্তর:
দ্রবণীয়তা অনুসারে ভিটামিনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. তেলে বা ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন: ভিটামিন A, D, E, এবং K।
২. জলে দ্রবণীয় ভিটামিন: ভিটামিন B কমপ্লেক্স এবং C।
ভিটামিন A:
উৎস: গাজর, পাকা আম, পাকা পেঁপে, ডিম, দুধ, মাছের যকৃতের তেল ইত্যাদি।
কাজ: স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখা, ত্বক ও হাড়ের গঠন ঠিক রাখা।
অভাবজনিত রোগ: রাতকানা (কম আলোতে দেখতে না পাওয়া) এবং জেরপথ্যালমিয়া (চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়া)।
ভিটামিন C:
উৎস: পাতিলেবু, আমলকী, পেয়ারা, কাঁচালঙ্কা, টমেটো ইত্যাদি টক জাতীয় ফল ও সবজি।
কাজ: দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করা।
অভাবজনিত রোগ: স্কার্ভি (মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্ত পড়া)।* অপুষ্টির কারণ কী? ম্যারাসমাস ও কোয়াশিওরকর রোগের মধ্যে পার্থক্য লেখো। অপুষ্টি প্রতিরোধে কী কী করা উচিত?
উত্তর:
অপুষ্টির কারণ:
অপুষ্টির প্রধান কারণ হলো খাদ্যের অভাব বা সুষম খাদ্যের অভাব। খাদ্যে এক বা একাধিক অপরিহার্য উপাদানের (বিশেষ করে প্রোটিন, শক্তি, ভিটামিন ও খনিজ মৌল) দীর্ঘকালীন অভাবের ফলে অপুষ্টি দেখা দেয়। এছাড়া, কৃমির সংক্রমণ, ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও অপুষ্টির কারণ হতে পারে।
ম্যারাসমাস ও কোয়াশিওরকর রোগের পার্থক্য:বিষয় ম্যারাসমাস কোয়াশিওরকর কারণ খাদ্যে প্রোটিন ও শক্তি (ক্যালোরি) উভয়ের চরম অভাবে হয়। খাদ্যে শক্তির পরিমাণ ঠিক থাকলেও শুধুমাত্র প্রোটিনের شدید অভাবে হয়। বয়স সাধারণত এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। সাধারণত 1 থেকে 4 বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। লক্ষণ শিশুর ওজন খুব কমে যায়, হাড় ও পেশির চরম ক্ষয় হয়, চামড়া কুঁচকে যায়। শিশুর দেহে জল জমে (ইডিমা), পেট ফুলে যায়, চামড়া গাঢ় বর্ণের হয়ে যায়।
অপুষ্টি প্রতিরোধের উপায়:
১. শিশুদের বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে সুষম খাদ্য (চাল, ডাল, সবজি, ফল, দুধ, ডিম) খাওয়ানো।
২. গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা।
৩. শিশুদের নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো এবং টিকাকরণ সম্পূর্ণ করা।
৪. স্বাস্থ্যকর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবহার করা।স্থূলত্ব বা Obesity কী? এর প্রধান কারণগুলি কী কী? স্থূলত্বের ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
উত্তর:
স্থূলত্ব বা Obesity:
স্থূলত্ব হলো শরীরের এমন একটি অবস্থা যখন অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি জমার ফলে দেহের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় এবং তা স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। সাধারণত, কোনো ব্যক্তির BMI (Body Mass Index) 30 বা তার বেশি হলে তাকে স্থূল বলে গণ্য করা হয়।
প্রধান কারণ:
১. অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ: প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার, বিশেষ করে ফ্যাট ও শর্করা জাতীয় খাবার (ফাস্ট ফুড, ভাজাভুজি, ঠান্ডা পানীয়) বেশি পরিমাণে খাওয়া।
২. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা, বসে বসে দিন কাটানো।
৩. জিনগত কারণ: পারিবারিক বা জিনগত কারণেও স্থূলত্বের প্রবণতা দেখা যায়।
৪. অন্যান্য কারণ: কিছু হরমোনের সমস্যা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও ওজন বাড়তে পারে।
স্থূলত্বের ফলে সৃষ্ট সমস্যা:
১. হৃৎপিণ্ডের রোগ: উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২. ডায়াবেটিস: টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
৩. অস্থিসন্ধির সমস্যা: অতিরিক্ত ওজনের চাপে হাঁটু ও কোমরের গাঁটে ব্যথা এবং আর্থ্রাইটিসের সমস্যা দেখা দেয়।
৪. অন্যান্য সমস্যা: শ্বাসকষ্ট, ঘুমের সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।