অধ্যায় ২: সময় ও গতি (Time and Motion)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা গতি সম্পর্কিত বিভিন্ন মৌলিক ধারণা যেমন—সরণ, দ্রুতি, বেগ এবং ত্বরণ সম্পর্কে আলোচনা করব। কোনো বস্তুর অতিক্রান্ত মোট পথ এবং তার প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থানের মধ্যে সরলরৈখিক দূরত্ব (সরণ) যে ভিন্ন হতে পারে, তা এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একক সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্বকে দ্রুতি এবং একক সময়ে সরণকে বেগ বলা হয়। সময়ের সাথে বেগের পরিবর্তনের হারকে ত্বরণ বলে। এরপর, আমরা বলের ধারণা এবং স্যার আইজ্যাক নিউটনের তিনটি বিখ্যাত গতিসূত্র নিয়ে আলোচনা করব। প্রথম সূত্র থেকে জাড্য ও বলের সংজ্ঞা, দ্বিতীয় সূত্র থেকে বলের পরিমাপ (F=ma) এবং তৃতীয় সূত্র থেকে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার ধারণা পাওয়া যায়। সবশেষে, কার্য ও শক্তির ধারণা এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
কোনো বস্তুর প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থানের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্বকে কী বলে?
উত্তর: (খ) সরণ
দ্রুতি হল একটি—
উত্তর: (ক) স্কেলার রাশি
বেগ হল একটি—
উত্তর: (ঘ) খ ও গ উভয়ই
সময়ের সঙ্গে কোনো বস্তুর বেগের পরিবর্তনের হারকে কী বলে?
উত্তর: (গ) ত্বরণ
ঋণাত্মক ত্বরণকে কী বলা হয়?
উত্তর: (ঘ) মন্দন
SI পদ্ধতিতে বলের একক কী?
উত্তর: (খ) নিউটন
নিউটনের কোন গতিসূত্র থেকে জাড্যের ধারণা পাওয়া যায়?
উত্তর: (ক) প্রথম সূত্র
স্থির বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীরা পিছনের দিকে হেলে পড়ে। এটি কিসের উদাহরণ?
উত্তর: (খ) স্থিতিজাড্য
বলের পরিমাপ করা যায় নিউটনের কোন সূত্র থেকে?
উত্তর: (খ) দ্বিতীয় সূত্র
ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল—
উত্তর: (খ) দুটি ভিন্ন বস্তুর উপর ক্রিয়া করে
कार्य করার সামর্থ্যকে কী বলে?
উত্তর: (গ) শক্তি
SI পদ্ধতিতে কার্যের একক কী?
উত্তর: (ঘ) জুল
ঘড়ির কাঁটার গতি হল—
উত্তর: (খ) বৃত্তীয় গতি
কোনো বস্তুর ভর ও বেগের গুণফলকে কী বলে?
উত্তর: (খ) ভরবেগ
সরণ শূন্য হলে কৃতকার্য কত হবে?
উত্তর: (গ) শূন্য
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
গতি কাকে বলে?
উত্তর: সময়ের পরিবর্তনের সাথে পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তনকে গতি বলে।
সরণ কাকে বলে?
উত্তর: নির্দিষ্ট দিকে কোনো বস্তুর প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থানের মধ্যে ন্যূনতম সরলরৈখিক দূরত্বকে সরণ বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি।
দ্রুতি কাকে বলে? এর একক কী?
উত্তর: কোনো গতিশীল বস্তু একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে দ্রুতি বলে। SI পদ্ধতিতে এর একক মিটার/সেকেন্ড (m/s)।
* বেগ কাকে বলে? এর একক কী?
উত্তর: সময়ের সাপেক্ষে কোনো নির্দিষ্ট দিকে বস্তুর সরণের হারকে বেগ বলে। SI পদ্ধতিতে এর একক মিটার/সেকেন্ড (m/s)।
ত্বরণ কাকে বলে?
উত্তর: সময়ের সাপেক্ষে কোনো বস্তুর বেগ পরিবর্তনের হারকে ত্বরণ বলে।
মন্দন কাকে বলে?
উত্তর: সময়ের সাথে কোনো বস্তুর বেগ হ্রাসের হারকে মন্দন বা ঋণাত্মক ত্বরণ বলে।
বল কাকে বলে?
উত্তর: বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করে কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল করা হয় বা করার চেষ্টা করা হয়, অথবা কোনো গতিশীল বস্তুর গতির অবস্থা পরিবর্তন করা হয় বা করার চেষ্টা করা হয়, তাকে বল বলে।
জাড্য কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?
উত্তর: প্রত্যেক বস্তু তার স্থির বা গতিশীল অবস্থা বজায় রাখার যে ধর্ম বা প্রবণতা দেখায়, তাকে জাড্য বলে। জাড্য দুই প্রকার—স্থিতিজাড্য ও গতিজাড্য।
স্থিতিজাড্য কাকে বলে?
উত্তর: স্থির বস্তুর চিরকাল স্থির থাকার প্রবণতাকে স্থিতিজাড্য বলে।
গতিজাড্য কাকে বলে?
উত্তর: গতিশীল বস্তুর সমবেগে সরলরেখায় চলার প্রবণতাকে গতিজাড্য বলে।
নিউটনের প্রথম গতিসূত্রটি লেখো।
উত্তর: বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকে এবং গতিশীল বস্তু সমবেগে সরলরেখায় চলতে থাকে।
নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র থেকে বলের পরিমাপের সমীকরণটি লেখো।
উত্তর: সমীকরণটি হলো: প্রযুক্ত বল (F) = বস্তুর ভর (m) × বস্তুতে উৎপন্ন ত্বরণ (a), অর্থাৎ F = m × a।
* নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রটি লেখো।
উত্তর: প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
কার্য বা কাজ কাকে বলে?
উত্তর: কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগের ফলে যদি বলের প্রয়োগবিন্দুর সরণ ঘটে, তবে প্রযুক্ত বল কার্য করেছে বলা হয়।
শক্তি কাকে বলে?
উত্তর: কার্য করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে।
দ্রুতি ও বেগের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: দ্রুতি একটি স্কেলার রাশি, এর কেবল মান আছে, দিক নেই। কিন্তু বেগ একটি ভেক্টর রাশি, এর মান ও দিক উভয়ই আছে।
একটি বৃত্তাকার পথে সম্পূর্ণ একবার ঘুরে এলে সরণের মান কত হয়?
উত্তর: শূন্য, কারণ প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থান একই।
রকেট উৎক্ষেপণ নিউটনের কোন গতিসূত্রের উপর ভিত্তি করে হয়?
উত্তর: নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রের উপর।
একটি বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও কখন কার্য শূন্য হয়?
উত্তর: যদি বল প্রয়োগের ফলে বস্তুটির কোনো সরণ না ঘটে, তবে কৃতকার্য শূন্য হয়।
SI পদ্ধতিতে ত্বরণের একক কী?
উত্তর: মিটার/সেকেন্ড² (m/s²)।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* নিউটনের প্রথম গতিসূত্রটি বিবৃত করো। এই সূত্র থেকে কী কী ধারণা পাওয়া যায়? জাড্য ধর্মের দুটি বাস্তব উদাহরণ দাও।
উত্তর:
নিউটনের প্রথম গতিসূত্র: বাইরে থেকে কোনো বল প্রযুক্ত না হলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির অবস্থায় থাকে এবং গতিশীল বস্তু সমবেগে সরলরেখা বরাবর চলতে থাকে।
প্রাপ্ত ধারণা: এই সূত্র থেকে দুটি মৌলিক ধারণা পাওয়া যায়—
১. জাড্য (Inertia): বস্তুর নিজের স্থির বা গতিশীল অবস্থা বজায় রাখার যে প্রবণতা, তাকে জাড্য বলে।
২. বলের সংজ্ঞা (Definition of Force): বল হলো সেই বাহ্যিক কারণ, যা বস্তুর জাড্য ধর্মের পরিবর্তন ঘটায় বা ঘটাতে চেষ্টা করে।
জাড্য ধর্মের উদাহরণ:
১. স্থিতিজাড্য: থেমে থাকা বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীরা পিছনের দিকে হেলে পড়ে। কারণ, বাস চলতে শুরু করলেও যাত্রীদের শরীরের উপরের অংশ স্থিতিজাড্যের জন্য স্থির থাকতে চায়।
২. গতিজাড্য: চলন্ত বাস হঠাৎ ব্রেক কষলে যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণ, বাস থেমে গেলেও যাত্রীদের শরীরের উপরের অংশ গতিজাড্যের জন্য গতিশীল থাকতে চায়।দ্রুতি ও বেগের মধ্যে পার্থক্য লেখো। একটি গাড়ি 5 সেকেন্ডে 50 মিটার দূরত্ব অতিক্রম করলে তার দ্রুতি কত? যদি গাড়িটি সরলপথে একবিন্দু থেকে অন্যবিন্দুতে যায়, তবে তার বেগ কত হবে?
উত্তর:
দ্রুতি ও বেগের পার্থক্য:দ্রুতি (Speed) বেগ (Velocity) ১. এটি একক সময়ে অতিক্রান্ত মোট দূরত্ব। ১. এটি একক সময়ে নির্দিষ্ট দিকে বস্তুর সরণ। ২. এটি একটি স্কেলার রাশি, এর কেবল মান আছে। ২. এটি একটি ভেক্টর রাশি, এর মান ও দিক উভয়ই আছে। ৩. গতিশীল বস্তুর দ্রুতি কখনও শূন্য হতে পারে না। ৩. গতিশীল বস্তুর বেগ শূন্য হতে পারে (যদি সরণ শূন্য হয়)।
গাণিতিক সমস্যা:
এখানে, অতিক্রান্ত দূরত্ব = 50 মিটার, সময় = 5 সেকেন্ড।
আমরা জানি, দ্রুতি = অতিক্রান্ত দূরত্ব / সময়
∴ দ্রুতি = 50 মিটার / 5 সেকেন্ড = 10 মিটার/সেকেন্ড।
যদি গাড়িটি সরলপথে একবিন্দু থেকে অন্যবিন্দুতে যায়, তবে তার অতিক্রান্ত দূরত্ব ও সরণ সমান হবে।
সুতরাং, এক্ষেত্রে সরণ = 50 মিটার।
আমরা জানি, বেগ = সরণ / সময়
∴ বেগ = 50 মিটার / 5 সেকেন্ড = 10 মিটার/সেকেন্ড।* নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রটি বিবৃত করো এবং একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো। নৌকা থেকে লাফ দেওয়ার সময় নৌকাটি পিছনের দিকে সরে যায় কেন?
উত্তর:
নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
ব্যাখ্যা: যখন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করে (ক্রিয়া), তখন দ্বিতীয় বস্তুটিও প্রথম বস্তুটির উপর সমান মানের ও বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া)। ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল দুটি ভিন্ন বস্তুর উপর কাজ করে, তাই তারা একে অপরকে প্রশমিত করতে পারে না।
উদাহরণ: বন্দুক থেকে গুলি ছোড়ার সময়, বারুদের বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট বল গুলিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় (ক্রিয়া)। একই সময়ে, গুলিটিও বন্দুকের উপর সমান ও বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করে, যার ফলে বন্দুকটি পিছনের দিকে ধাক্কা দেয় (প্রতিক্রিয়া)।
নৌকা থেকে লাফ দেওয়ার কারণ:
নৌকা থেকে লাফ দিয়ে তীরে নামার সময়, ব্যক্তিটি তার পা দিয়ে নৌকার উপর পিছনের দিকে একটি বল (ক্রিয়া) প্রয়োগ করে। নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী, নৌকাটিও ওই ব্যক্তির উপর সমান ও বিপরীতমুখী একটি বল (প্রতিক্রিয়া) প্রয়োগ করে। এই প্রতিক্রিয়া বলের প্রভাবেই ব্যক্তিটি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে তীরে পৌঁছাতে পারে। আর ব্যক্তির দেওয়া ক্রিয়া বলের জন্য নৌকাটি পিছনের দিকে সরে যায়।ত্বরণ ও মন্দন বলতে কী বোঝ? একটি বস্তু স্থির অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে 5 সেকেন্ড পর 20 m/s বেগ লাভ করল। বস্তুটির ত্বরণ কত?
উত্তর:
ত্বরণ: সময়ের সাপেক্ষে কোনো গতিশীল বস্তুর বেগ বৃদ্ধির হারকে ত্বরণ বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি এবং এর SI একক মিটার/সেকেন্ড² (m/s²)।
মন্দন: সময়ের সাপেক্ষে কোনো গতিশীল বস্তুর বেগ হ্রাসের হারকে মন্দন বা ঋণাত্মক ত্বরণ বলে। এর SI এককও মিটার/সেকেন্ড² (m/s²)।
গাণিতিক সমস্যা:
এখানে, বস্তুটির প্রাথমিক বেগ (u) = 0 m/s (যেহেতু স্থির অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছে)।
অন্তিম বেগ (v) = 20 m/s।
সময় (t) = 5 সেকেন্ড।
আমরা জানি, ত্বরণ (a) = (অন্তিম বেগ - প্রাথমিক বেগ) / সময়
∴ ত্বরণ (a) = (20 - 0) m/s / 5 s
= 20 / 5 m/s²
= 4 m/s²।
সুতরাং, বস্তুটির ত্বরণ হল 4 m/s²।কার্য কাকে বলে? কখন কৃতকার্য শূন্য হয়? 10 নিউটন বল প্রয়োগ করে একটি বস্তুকে বলের দিকে 5 মিটার সরাতে কত কার্য করতে হবে?
উত্তর:
কার্য: পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগের ফলে যদি বলের প্রয়োগবিন্দুর সরণ ঘটে, তবেই প্রযুক্ত বল কার্য করেছে বলা হয়। কার্যের পরিমাপ হলো প্রযুক্ত বল এবং বলের অভিমুখে সরণের গুণফল।
W = F × d, যেখানে W = কার্য, F = বল, d = সরণ।
কৃতকার্য শূন্য হওয়ার শর্ত:
দুটি ক্ষেত্রে কৃতকার্যের মান শূন্য হয়:
১. যদি বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও বস্তুটির কোনো সরণ না ঘটে (d=0)। যেমন, একটি দেয়ালকে ঠেললে দেয়ালের সরণ না হওয়ায় কৃতকার্য শূন্য হয়।
২. যদি প্রযুক্ত বলের অভিমুখ এবং সরণের অভিমুখ পরস্পর লম্বভাবে থাকে।
গাণিতিক সমস্যা:
এখানে, প্রযুক্ত বল (F) = 10 নিউটন।
সরণ (d) = 5 মিটার।
আমরা জানি, কার্য (W) = বল (F) × সরণ (d)
∴ কার্য (W) = 10 নিউটন × 5 মিটার
= 50 নিউটন-মিটার
= 50 জুল।
সুতরাং, 50 জুল কার্য করতে হবে।