অধ্যায় ১.৪: তড়িৎ (Electricity)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা তড়িৎ বা বিদ্যুৎ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করব। টর্চের সেল (নির্জল কোষ) কীভাবে রাসায়নিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে বালব জ্বালায়, তা আমরা জানব। একাধিক সেল মিলে ব্যাটারি গঠিত হয়। তড়িৎ প্রবাহের জন্য একটি সম্পূর্ণ পথের প্রয়োজন, যাকে তড়িৎ বর্তনী বলে। যেসব পদার্থের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ চলাচল করতে পারে, তাদের সুপরিবাহী (যেমন: লোহা, তামা) এবং যাদের মধ্যে দিয়ে পারে না, তাদের কুপরিবাহী বা অন্তরক (যেমন: কাঠ, প্লাস্টিক) বলে। তড়িৎ প্রবাহের বিভিন্ন ফল রয়েছে, যেমন—চৌম্বক ফল (তড়িৎ-চুম্বক তৈরি), তাপীয় ফল (হিটার, ইস্ত্রি) এবং আলোকীয় ফল (LED, বালব)। ফিউজ তার তাপীয় ফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ, যা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিকে সুরক্ষা দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
টর্চের সেলকে বলা হয়—
উত্তর: (খ) নির্জল কোষ
একটি ব্যাটারিতে থাকে—
উত্তর: (খ) একাধিক সেল
নির্জল কোষের ধনাত্মক প্রান্ত কোনটি?
উত্তর: (খ) ধাতব টুপি
নিচের কোনটি তড়িতের সুপরিবাহী?
উত্তর: (ঘ) লোহা
নিচের কোনটি তড়িতের কুপরিবাহী বা অন্তরক?
উত্তর: (ঘ) চিনেমাটি
তড়িৎ প্রবাহ চলার সম্পূর্ণ পথকে বলে—
উত্তর: (খ) বর্তনী
বালবের যে অংশটি জ্বলে ওঠে, তাকে বলে—
উত্তর: (খ) ফিলামেন্ট
তড়িৎ প্রবাহের ফলে চুম্বকের সৃষ্টি হয়, এটি তড়িতের কোন ফল?
উত্তর: (গ) চৌম্বক ফল
ইলেকট্রিক ইস্ত্রিতে কোন তার ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: (গ) নাইক্রোম তার
ফিউজ তারের বৈশিষ্ট্য হলো—
উত্তর: (খ) নিম্ন গলনাঙ্ক ও উচ্চ রোধ
LED-এর পুরো নাম কী?
উত্তর: (ক) Light Emitting Diode
সৌর কোষে কোন শক্তি কোন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়?
উত্তর: (খ) আলোক শক্তি থেকে তড়িৎ শক্তি
তড়িৎ বর্তনীকে ইচ্ছামতো খোলা বা বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়—
উত্তর: (গ) সুইচ
সাধারণ বৈদ্যুতিক বালবের ফিলামেন্ট কোন ধাতু দিয়ে তৈরি?
উত্তর: (ঘ) টাংস্টেন
নিচের কোন প্রাণীটি নিজের দেহে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে?
উত্তর: (খ) ইলেকট্রিক ইল
বর্তনী ছিন্ন হলে তাকে বলে—
উত্তর: (খ) মুক্ত বর্তনী
আমাদের শরীর তড়িতের—
উত্তর: (ক) সুপরিবাহী
বায়ু সাধারণত তড়িতের—
উত্তর: (খ) কুপরিবাহী
নির্জল কোষে কোন শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়?
উত্তর: (ঘ) রাসায়নিক শক্তি
একটি বর্তনী পরীক্ষক বা টেস্টার দিয়ে কী পরীক্ষা করা হয়?
উত্তর: (খ) বস্তুটি পরিবাহী না অন্তরক
তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়—
উত্তর: (গ) উভয়ই
নিচের কোনটিতে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের প্রয়োগ দেখা যায়?
উত্তর: (গ) বৈদ্যুতিক হিটার
LED-তে থাকে না—
উত্তর: (গ) ফিলামেন্ট
বর্তনীতে সেলের প্রতীক আঁকার সময় বড়ো দাগটি কোন প্রান্ত বোঝায়?
উত্তর: (খ) ধনাত্মক প্রান্ত
সোলার ক্যালকুলেটরের শক্তির উৎস হল—
উত্তর: (গ) সৌর কোষ
তড়িৎ প্রবাহের ফলে পরিবাহীতে কী উৎপন্ন হয়?
উত্তর: (গ) তাপ
স্নায়ুকোশের মাধ্যমে তথ্য পরিবাহিত হয় কিসের সাহায্যে?
উত্তর: (গ) তড়িৎ উদ্দীপনা
একটি সেলের কয়টি প্রান্ত থাকে?
উত্তর: (খ) দুটি
তড়িৎ-চুম্বক হল এক প্রকার—
উত্তর: (খ) অস্থায়ী চুম্বক
বর্তনীতে বালব না জ্বলার একটি সম্ভাব্য কারণ হল—
উত্তর: (খ) বর্তনী মুক্ত আছে
ইলেকট্রিক তারের উপর কিসের আস্তরণ থাকে?
উত্তর: (গ) প্লাস্টিকের
গাড়ির ব্যাটারি হল এক ধরনের—
উত্তর: (খ) সেকেন্ডারি সেল
একটি বর্তনীতে সেলের সংখ্যা বাড়ালে বালবের উজ্জ্বলতা—
উত্তর: (ক) বাড়ে
হৃৎস্পন্দন তৈরি হয় কিসের প্রভাবে?
উত্তর: (গ) তড়িৎ উদ্দীপনা
একটি LED-এর ধনাত্মক প্রান্তটি সাধারণত—
উত্তর: (খ) বড়ো হয়
সুইচ অন করলে বর্তনীটি—
উত্তর: (খ) বন্ধ হয়
তড়িৎ শক্তিকে আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত করে—
উত্তর: (গ) বালব
তড়িৎ লেপনে কোন ফল ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: (গ) রাসায়নিক ফল
একটি সেলের প্রতীকে ছোটো দাগটি নির্দেশ করে—
উত্তর: (খ) ঋণাত্মক প্রান্ত
নিচের কোনটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়কারী?
উত্তর: (গ) LED বালব
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
তড়িৎ কোষ বা সেল কাকে বলে?
উত্তর: যে যন্ত্রের সাহায্যে রাসায়নিক শক্তি থেকে সরাসরি তড়িৎ শক্তি পাওয়া যায়, তাকে তড়িৎ কোষ বা সেল বলে।
ব্যাটারি কাকে বলে?
উত্তর: একাধিক তড়িৎ কোষের সমবায়কে ব্যাটারি বলা হয়।
তড়িৎ বর্তনী কাকে বলে?
উত্তর: তড়িৎ উৎস, পরিবাহী তার, সুইচ এবং তড়িৎ যন্ত্র সহযোগে তড়িৎ প্রবাহ চলার সম্পূর্ণ ও অবিচ্ছিন্ন পথকে তড়িৎ বর্তনী বলে।
মুক্ত বর্তনী ও বন্ধ বর্তনী কী?
উত্তর: যখন বর্তনীর কোনো অংশ ছিন্ন থাকে এবং তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চলে না, তাকে মুক্ত বর্তনী বলে। আর যখন বর্তনীটি সম্পূর্ণ ও অবিচ্ছিন্ন থাকে এবং তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চলে, তাকে বন্ধ বর্তনী বলে।
সুইচের কাজ কী?
উত্তর: সুইচের সাহায্যে একটি তড়িৎ বর্তনীকে ইচ্ছামতো সংযুক্ত (বন্ধ বর্তনী) বা বিচ্ছিন্ন (মুক্ত বর্তনী) করে তড়িৎ প্রবাহ চালু বা বন্ধ করা যায়।
* তড়িতের সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী (অন্তরক) পদার্থ কাকে বলে? একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর: যেসব পদার্থের মধ্যে দিয়ে সহজেই তড়িৎ চলাচল করতে পারে, তাদের সুপরিবাহী বলে (উদাহরণ: তামা)। আর যেসব পদার্থের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ চলাচল করতে পারে না, তাদের কুপরিবাহী বা অন্তরক পদার্থ বলে (উদাহরণ: প্লাস্টিক)।
ফিলামেন্ট কী?
উত্তর: বৈদ্যুতিক বালবের ভেতরে থাকা খুব সরু, উচ্চ রোধ ও উচ্চ গলনাঙ্কবিশিষ্ট কুন্ডলীকৃত তারটিকে ফিলামেন্ট বলে, যা তড়িৎ প্রবাহের ফলে উত্তপ্ত হয়ে আলো বিকিরণ করে।
তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল কী?
উত্তর: কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে পরিবাহীটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল বলে।
তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ফল কী?
উত্তর: কোনো পরিবাহী তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে তার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ফল বলে।
তড়িৎ প্রবাহের আলোকীয় ফল কী?
উত্তর: কিছু যন্ত্রের (যেমন: LED, বালব) মধ্যে দিয়ে উপযুক্ত পরিমাণে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে তা থেকে আলোক শক্তি নির্গত হয়। একে তড়িৎ প্রবাহের আলোকীয় ফল বলে।
তড়িৎ-চুম্বক কাকে বলে?
উত্তর: একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরিত তামার তার জড়িয়ে তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে দণ্ডটি একটি অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। এই ব্যবস্থাকে তড়িৎ-চুম্বক বলে।
* ফিউজ তার কী? এটি কেন ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: ফিউজ তার হলো টিন ও সিসার একটি সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি কম গলনাঙ্ক ও বেশি রোধের একটি সরু তার। বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহের ফলে সৃষ্ট তাপ থেকে মূল্যবান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
LED কী?
উত্তর: LED (Light Emitting Diode) হলো একটি অর্ধপরিবাহী ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যার মধ্যে দিয়ে খুব অল্প পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে এটি আলো বিকিরণ করে। এতে কোনো ফিলামেন্ট থাকে না।
সৌর কোষ বা সোলার সেল কী?
উত্তর: সৌর কোষ হলো এমন একটি যন্ত্র যা সৌরশক্তিকে (আলোক শক্তি) সরাসরি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
ইলেকট্রিক মিস্ত্রিরা কাজ করার সময় রাবারের হাতমোজা পরেন কেন?
উত্তর: রাবার তড়িতের কুপরিবাহী। তাই রাবারের হাতমোজা পরলে শরীরের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে না, ফলে বৈদ্যুতিক শক লাগার বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
নির্জল কোষের দুটি প্রান্ত কী কী?
উত্তর: নির্জল কোষের দুটি প্রান্ত হলো ধনাত্মক প্রান্ত (ধাতব টুপি) এবং ঋণাত্মক প্রান্ত (ধাতব চাকতি)।
তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের দুটি প্রয়োগ লেখো।
উত্তর: দুটি প্রয়োগ হলো ইলেকট্রিক ইস্ত্রি এবং বৈদ্যুতিক হিটার।
তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি কী কী উপায়ে বাড়ানো যায়?
উত্তর: (১) কুণ্ডলীর পাকসংখ্যা বাড়িয়ে এবং (২) তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা বাড়িয়ে তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি বাড়ানো যায়।
আমাদের শরীর তড়িৎ পরিবাহী কেন?
উত্তর: আমাদের দেহের তরলে বিভিন্ন তড়িৎযুক্ত কণা বা আয়ন দ্রবীভূত থাকে, যার জন্য আমাদের শরীর তড়িৎ পরিবাহী হয়।
বর্তনীতে ব্যাটারির প্রতীক আঁকো।
উত্তর: দুটি সেলের ব্যাটারির প্রতীক হল: —| |— (যেখানে লম্বা দাগটি ধনাত্মক এবং ছোটো দাগটি ঋণাত্মক প্রান্ত নির্দেশ করে)।
তড়িৎ প্রবাহের দিক কোনটি?
উত্তর: প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের দিক ধনাত্মক প্রান্ত থেকে ঋণাত্মক প্রান্তের দিকে ধরা হয়।
সোলার ক্যালকুলেটরে ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না কেন?
উত্তর: কারণ এতে একটি সৌর কোষ বা সোলার প্যানেল থাকে যা আলোক শক্তি থেকে সরাসরি প্রয়োজনীয় তড়িৎ শক্তি উৎপাদন করে।
বৈদ্যুতিক বালবের ফিলামেন্ট টাংস্টেন ধাতু দিয়ে তৈরি হয় কেন?
উত্তর: কারণ টাংস্টেন ধাতুর গলনাঙ্ক খুব বেশি (প্রায় 3422°C), তাই উচ্চ তাপমাত্রাতেও এটি গলে যায় না এবং আলো বিকিরণ করতে পারে।
একটি বর্তনী পরীক্ষকের মূল উপাদানগুলি কী কী?
উত্তর: একটি বর্তনী পরীক্ষকের মূল উপাদানগুলি হলো একটি তড়িৎ উৎস (সেল), একটি সূচক (বালব বা LED) এবং পরিবাহী তার।
তড়িৎ-চুম্বকের মজ্জা হিসেবে কাঁচা লোহা ব্যবহার করা হয় কেন?
উত্তর: কারণ কাঁচা লোহাকে সহজে চুম্বকে পরিণত করা যায় এবং তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এর চুম্বকত্ব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লোপ পায়, যা তড়িৎ-চুম্বকের জন্য একটি জরুরি ধর্ম।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* একটি সরল তড়িৎ বর্তনীর চিত্র অঙ্কন করে এর বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করো। মুক্ত ও বন্ধ বর্তনী বলতে কী বোঝায়?
উত্তর:
সরল তড়িৎ বর্তনী:
একটি সরল তড়িৎ বর্তনীতে মূলত চারটি অংশ থাকে: ১. তড়িৎ উৎস: যেমন একটি সেল বা ব্যাটারি, যা তড়িৎ শক্তি সরবরাহ করে।
২. পরিবাহী তার: যার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়।
৩. তড়িৎ যন্ত্র বা লোড: যেমন একটি বালব, যা তড়িৎ শক্তিকে অন্য শক্তিতে (এখানে আলোক ও তাপ শক্তি) রূপান্তরিত করে।
৪. সুইচ: যা বর্তনীকে প্রয়োজনমতো সংযুক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে ব্যবহৃত হয়।
উপরের চিত্রে একটি সেল, একটি সুইচ, একটি বালব এবং পরিবাহী তার দিয়ে গঠিত একটি সরল বর্তনী দেখানো হয়েছে।
মুক্ত ও বন্ধ বর্তনী:
মুক্ত বর্তনী (Open Circuit): যখন বর্তনীর কোনো অংশ ছিন্ন থাকে বা সুইচ 'অফ' অবস্থায় থাকে, তখন বর্তনীর মধ্যে দিয়ে কোনো তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে না। এই অবস্থাকে মুক্ত বর্তনী বলে। মুক্ত বর্তনীতে বালব জ্বলে না।
বন্ধ বর্তনী (Closed Circuit): যখন বর্তনীটি সম্পূর্ণ ও অবিচ্ছিন্ন থাকে এবং সুইচ 'অন' অবস্থায় থাকে, তখন বর্তনীর মধ্যে দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে। এই অবস্থাকে বন্ধ বর্তনী বলে। বন্ধ বর্তনীতে বালব জ্বলে ওঠে।তড়িতের সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী বা অন্তরক পদার্থ কাকে বলে? দৈনন্দিন জীবন থেকে প্রত্যেকটির দুটি করে উদাহরণ দাও এবং এদের ব্যবহার উল্লেখ করো।
উত্তর:
তড়িতের সুপরিবাহী:
যেসব পদার্থের মধ্যে দিয়ে খুব সহজেই তড়িৎ চলাচল করতে পারে, তাদের তড়িতের সুপরিবাহী বলে। এদের রোধ খুব কম হয়।
উদাহরণ: তামা, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, রুপা ইত্যাদি ধাতু এবং গ্রাফাইট।
ব্যবহার:
১. তামা: বৈদ্যুতিক তার, মোটরের কয়েল ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় কারণ এর পরিবাহিতা খুব বেশি।
২. অ্যালুমিনিয়াম: উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য ওভারহেড তার তৈরিতে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহৃত হয় কারণ এটি তামার চেয়ে হালকা ও সস্তা।
তড়িতের কুপরিবাহী বা অন্তরক:
যেসব পদার্থের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ চলাচল করতে পারে না, তাদের তড়িতের কুপরিবাহী বা অন্তরক বলে। এদের রোধ খুব বেশি হয়।
উদাহরণ: প্লাস্টিক, কাঠ, রাবার, কাচ, চিনেমাটি, শুকনো বাতাস।
ব্যবহার:
১. প্লাস্টিক/রাবার: বৈদ্যুতিক তারের উপর অন্তরক আবরণ হিসেবে এবং ইলেকট্রিক মিস্ত্রিদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির হাতল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা বৈদ্যুতিক শক থেকে সুরক্ষা দেয়।
২. চিনেমাটি: ইলেকট্রিক পোল বা ফিউজ হোল্ডারে অন্তরক হিসেবে ব্যবহৃত হয় কারণ এটি উচ্চ তাপমাত্রা ও ভোল্টেজ সহ্য করতে পারে।* তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল ও চৌম্বক ফলের একটি করে পরীক্ষা বর্ণনা করো।
উত্তর:
তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের পরীক্ষা:
উপকরণ: একটি ব্যাটারি (বা দুটি সেল), একটি সুইচ, পরিবাহী তার এবং একটি সরু নাইক্রোম তারের টুকরো।
পদ্ধতি: ব্যাটারি, সুইচ ও নাইক্রোম তারটিকে পরিবাহী তারের সাহায্যে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করে একটি বর্তনী তৈরি করা হলো। প্রথমে সুইচ অফ অবস্থায় নাইক্রোম তারটিকে স্পর্শ করে এর উষ্ণতা অনুভব করা হলো। এরপর, সুইচ অন করে বর্তনীতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তড়িৎ প্রবাহ চালানো হলো। এবার সুইচ অফ করে আবার নাইক্রোম তারটিকে সাবধানে স্পর্শ করা হলো।
পর্যবেক্ষণ: দেখা যাবে, তড়িৎ প্রবাহ চলার পর নাইক্রোম তারটি আগের চেয়ে গরম হয়ে গেছে।
সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে তাপ উৎপন্ন হয়।
তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ফলের পরীক্ষা:
উপকরণ: একটি ব্যাটারি, একটি সুইচ, পরিবাহী তার, একটি বড় লোহার পেরেক।
পদ্ধতি: একটি বড় লোহার পেরেকের উপর অন্তরিত তামার তার ঘন করে জড়িয়ে একটি কয়েল তৈরি করা হলো। তারটির দুই প্রান্ত একটি ব্যাটারি ও সুইচের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বর্তনী তৈরি করা হলো। এবার কয়েকটি ছোট আলপিনের কাছে পেরেকের মাথাটি নিয়ে যাওয়া হলো।
পর্যবেক্ষণ: সুইচ অফ অবস্থায় পেরেকটি আলপিনগুলিকে আকর্ষণ করছে না। কিন্তু সুইচ অন করার সাথে সাথে দেখা যাবে, পেরেকটি আলপিনগুলিকে আকর্ষণ করছে, অর্থাৎ একটি চুম্বকে পরিণত হয়েছে। আবার সুইচ অফ করলে পেরেকটি তার চুম্বকত্ব হারায় এবং আলপিনগুলি খসে পড়ে।
সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, তড়িৎ প্রবাহের ফলে চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়।ফিউজ তার কী? এর কার্যনীতি ব্যাখ্যা করো। বাড়িতে ফিউজ তার ব্যবহারের গুরুত্ব কী?
উত্তর:
ফিউজ তার: ফিউজ তার হলো একটি বিশেষ ধরনের তার যা সাধারণত টিন ও সিসার সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রোধাঙ্ক বেশি এবং গলনাঙ্ক খুব কম।
কার্যনীতি: ফিউজ তারকে বর্তনীর সঙ্গে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করা হয়। এটি তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যখন বর্তনীর মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন ফিউজ তারে উৎপন্ন তাপ সহজেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারটি গলে না। কিন্তু কোনো কারণে (যেমন শর্ট সার্কিট বা ওভারলোডিং) যদি বর্তনীতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাত্রায় তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তবে ফিউজ তারে খুব বেশি পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয়। এর গলনাঙ্ক কম হওয়ায়, এই অতিরিক্ত তাপে তারটি সঙ্গে সঙ্গে গলে যায় এবং বর্তনীটি ছিন্ন বা মুক্ত হয়ে যায়। ফলে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
গুরুত্ব:
ফিউজ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। এটি অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহের হাত থেকে টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ফ্যানের মতো মূল্যবান এবং সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিগুলিকে রক্ষা করে। ফিউজ তার না থাকলে, অতিরিক্ত প্রবাহে এই যন্ত্রগুলি উত্তপ্ত হয়ে স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারত, এমনকি আগুন লেগে বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত।জীবদেহে তড়িৎ শক্তির ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর:
জীবদেহে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া সম্পাদনে তড়িৎ শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
১. স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা: আমাদের মস্তিষ্ক এবং সমগ্র স্নায়ুতন্ত্র অসংখ্য স্নায়ুকোশ বা নিউরোন দিয়ে গঠিত। 외부 থেকে আসা অনুভূতি গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন অঙ্গে নির্দেশ পাঠানো—এই সমস্ত কাজই খুব দুর্বল তড়িৎ সংকেত বা 'নার্ভ ইমপালস' (nerve impulse)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। স্নায়ুকোশের কোষপর্দার ভেতরে ও বাইরের আয়নীয় ঘনত্বের পার্থক্যের জন্য এই তড়িৎ বিভব তৈরি হয়।
২. হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন: আমাদের হৃৎপিণ্ডের পেশিতে একটি বিশেষ ধরনের কলা (SA নোড) থাকে যা নিয়মিতভাবে ক্ষুদ্র তড়িৎ সংকেত তৈরি করে। এই তড়িৎ উদ্দীপনা হৃৎপিণ্ডের পেশিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং হৃৎপিণ্ডের ছন্দবদ্ধ সংকোচন-প্রসারণ ঘটায়, যা হৃৎস্পন্দন নামে পরিচিত। ইসিজি (ECG) যন্ত্রের সাহায্যে এই বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করে হৃৎপিণ্ডের অবস্থা জানা যায়।
৩. পেশি সঞ্চালন: মস্তিষ্ক থেকে আসা তড়িৎ সংকেত স্নায়ুর মাধ্যমে পেশিতে পৌঁছালে পেশির সংকোচন ঘটে, যার ফলে আমরা হাঁটাচলা, কথা বলা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করতে পারি।
৪. আত্মরক্ষা: কিছু প্রাণী, যেমন ইলেকট্রিক ইল, ইলেকট্রিক রে ইত্যাদি, তাদের দেহে থাকা বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে শক্তিশালী বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। এই বিদ্যুৎ তারা শিকার ধরা বা শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার করে।