অধ্যায় ৯: আজকের ভারত: সরকার, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে আধুনিক ভারতের শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি—সংবিধান, সরকার, গণতন্ত্র এবং স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পুরোনো দিনের রাজতন্ত্রের সঙ্গে আজকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরে ভারতের শাসন কাঠামোকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

  • সরকার ও গণতন্ত্র: 'সরকার' শব্দটি ফারসি, যার অর্থ শাসনব্যবস্থা। প্রাচীনকালে রাজারাই শাসন করতেন (রাজতন্ত্র), কিন্তু এখন জনগণ ভোট দিয়ে নিজেদের শাসক বেছে নেয়। এই পদ্ধতিকেই 'গণতন্ত্র' বলা হয়।
  • ভারতের সংবিধান: ভারতের শাসনব্যবস্থা একটি লিখিত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম সংবিধান, যার প্রধান রূপকার ছিলেন ড. বি. আর. আম্বেদকর। ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর এটি গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি কার্যকর হয়। এই দিনটি 'প্রজাতন্ত্র দিবস' হিসেবে পালিত হয়।
  • যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা: ভারতে একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রতিটি রাজ্যের জন্য আলাদা রাজ্য সরকার রয়েছে। এই দ্বি-স্তরীয় শাসনব্যবস্থাকে 'যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা' বলা হয়। সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা আছে।
  • সরকারের তিনটি বিভাগ: সরকারের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনটি বিভাগ রয়েছে: (১) আইন বিভাগ (আইন তৈরি করে), (২) শাসন বিভাগ (আইন অনুযায়ী দেশ চালায়), এবং (৩) বিচার বিভাগ (আইন রক্ষা করে ও বিচার করে)। বিচার বিভাগকে অন্য দুটি বিভাগ থেকে স্বাধীন রাখা হয়েছে।
  • স্বায়ত্তশাসন: জনগণ যখন সরাসরি নিজেদের শাসনকার্যে অংশ নেয়, তাকে 'স্বায়ত্তশাসন' বলে। পশ্চিমবঙ্গে এটি দুই ধরনের: (১) শহরের জন্য পৌরসভা এবং (২) গ্রামের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থা (গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদ)। এই প্রতিষ্ঠানগুলির সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করেন।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
১৯৪৯, ২৬শে নভেম্বরভারতীয় গণপরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়।
১৯৫০, ২৬শে জানুয়ারিভারতের সংবিধান কার্যকর হয় এবং ভারত একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

'সরকার' শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?

(ক) আরবি (খ) তুর্কি (গ) ফারসি (ঘ) সংস্কৃত
উত্তর: (গ) ফারসি

নিজেদের মধ্য থেকে শাসক বেছে নেওয়ার পদ্ধতিকে কী বলে?

(ক) রাজতন্ত্র (খ) গণতন্ত্র (গ) স্বায়ত্তশাসন (ঘ) যুক্তরাষ্ট্র
উত্তর: (খ) গণতন্ত্র

ভারতীয় সংবিধানের প্রধান রূপকার কে ছিলেন?

(ক) জওহরলাল নেহরু (খ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (গ) মহাত্মা গান্ধি (ঘ) ড. বি. আর. আম্বেদকর
উত্তর: (ঘ) ড. বি. আর. আম্বেদকর

ভারতের সংবিধান কবে গৃহীত হয়?

(ক) ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি (খ) ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট (গ) ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর (ঘ) ১৯৫০ সালের ১৫ই আগস্ট
উত্তর: (গ) ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর

ভারতে প্রজাতন্ত্র দিবস কবে পালিত হয়?

(ক) ১৫ই আগস্ট (খ) ২৬শে জানুয়ারি (গ) ২রা অক্টোবর (ঘ) ২৬শে নভেম্বর
উত্তর: (খ) ২৬শে জানুয়ারি

ভারতে কত বছর অন্তর সরকার নির্বাচন হয়?

(ক) ৪ বছর (খ) ৫ বছর (গ) ৬ বছর (ঘ) ১০ বছর
উত্তর: (খ) ৫ বছর

যে শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য দু-রকম সরকার থাকে, তাকে কী বলে?

(ক) গণতান্ত্রিক (খ) যুক্তরাষ্ট্রীয় (গ) রাজতান্ত্রিক (ঘ) স্বায়ত্তশাসন
উত্তর: (খ) যুক্তরাষ্ট্রীয়

সরকারের আইন তৈরির বিভাগকে কী বলা হয়?

(ক) শাসন বিভাগ (খ) বিচার বিভাগ (গ) আইন বিভাগ (ঘ) অর্থ বিভাগ
উত্তর: (গ) আইন বিভাগ

শহর বা নগরের স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান কোনটি?

(ক) গ্রাম পঞ্চায়েত (খ) জেলা পরিষদ (গ) পঞ্চায়েত সমিতি (ঘ) পৌরসভা
উত্তর: (ঘ) পৌরসভা

গ্রামের স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান কোনটি?

(ক) পৌরসভা (খ) ব্লক (গ) গ্রাম পঞ্চায়েত (ঘ) আদালত
উত্তর: (গ) গ্রাম পঞ্চায়েত

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

বর্তমান ভারতে শাসন ব্যবস্থার কী কী বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়?

বর্তমান ভারতের শাসন ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। এখানে জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করে এবং কেন্দ্র ও রাজ্য—এই দুই স্তরেই নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সংবিধান কাকে বলে?

যুক্তরাষ্ট্র: যে শাসনব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়, তাকে যুক্তরাষ্ট্র বলে।
সংবিধান: সংবিধান হলো সেইসব লিখিত বা অলিখিত নিয়মকানুনের সমষ্টি, যা একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

সরকারের কাজ কী কী?

সরকারের প্রধান কাজ হলো দেশের শাসন পরিচালনা করা, দেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষা করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কর সংগ্রহের মাধ্যমে জনগণের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক (যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য) উদ্যোগ গ্রহণ করা।

স্বায়ত্তশাসন বলতে তুমি কী বোঝো?

স্বায়ত্তশাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে স্থানীয় জনগণ নিজেরাই ভোট দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সেই প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজেদের অঞ্চলের শাসন ও উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করে। যেমন—গ্রাম পঞ্চায়েত ও পৌরসভা।

নির্বাচনকে সাধারণ ভাবে কী বলে? ভারতে কত বছর অন্তর সরকার নির্বাচন হয়? সরকার নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কী সম্পর্ক?

নির্বাচনকে সাধারণভাবে 'ভোট হওয়া' বলে। ভারতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার নির্বাচন হয়। সরকার নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড়, কারণ গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, যা নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব হয়।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৭১)

১। শূন্যস্থান পূরণ করো:

ক) জাপান-এ এখনও রাজা-রানি আছেন।

খ) নিজেরা নিজেদের মধ্য থেকে শাসক নির্বাচনের পদ্ধতিকে বলে- গণতন্ত্র

গ) ভারতের সংবিধান পৃথিবীর বৃহত্তম সংবিধান।

ঘ) জনগণ যে শাসনব্যবস্থায় নিজেই নিজের অধীন, তাকে বলে স্বায়ত্তশাসন

ঙ) অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে হয় একটা- ব্লক

২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:

ক-স্তম্ভখ-স্তম্ভ
সরকারফারসি
স্বায়ত্তশাসনজেলাপরিষদ
যুক্তরাষ্ট্রভারত
এথেন্সগ্রিস
ভারতীয় সংবিধানড. বি.আর. আম্বেদকর

৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও:

(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)

(ক) ভারতকে কেন গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হয়? দেশ পরিচালনায় সংবিধানের ভূমিকা কী বলে তুমি মনে করো?

ভারতকে গণতান্ত্রিক বলা হয় কারণ, এখানকার জনগণ প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তাদের পছন্দমতো কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে নির্বাচন করে। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হয় কারণ, এখানে একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক রাজ্য সরকারের সহাবস্থান রয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী তাদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা আছে।
দেশ পরিচালনায় সংবিধানের ভূমিকা অপরিসীম। সংবিধানই হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন। এটি সরকারের গঠন, ক্ষমতা ও কাজের সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে এবং সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করে। এককথায়, সংবিধান দেশকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের পথে চালিত করে।

(খ) সরকারের কয়টি ভাগ? ঐ ভাগগুলি কোনটি কী কাজ করে? বিচার বিভাগকে কেন আলাদা করে রাখা হয়?

সরকারের তিনটি ভাগ রয়েছে:
১. আইন বিভাগ: এর প্রধান কাজ হলো দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করা। ভারতের সংসদ এবং রাজ্যগুলির বিধানসভা হলো আইন বিভাগের উদাহরণ।
২. শাসন বিভাগ: এর কাজ হলো আইন বিভাগ দ্বারা তৈরি আইনকে বাস্তবে প্রয়োগ করা এবং সেই অনুযায়ী দেশ শাসন করা। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁদের মন্ত্রিসভা শাসন বিভাগের অংশ।
৩. বিচার বিভাগ: এর কাজ হলো সংবিধান ও আইন রক্ষা করা। কেউ আইন ভাঙলে তার বিচার করা এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত রাখাও বিচার বিভাগের দায়িত্ব।
বিচার বিভাগকে শাসন ও আইন বিভাগ থেকে আলাদা বা স্বাধীন রাখা হয়, যাতে এটি কোনো রকম রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারে এবং সুবিচারের পথ খোলা থাকে। একেই 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' বলে।

(গ) পৌরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি কী কী কাজ করে?

পৌরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েত হলো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রধান কাজগুলি হলো:

  • পরিষেবামূলক কাজ: নিজ নিজ এলাকায় পানীয় জল সরবরাহ, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, আবর্জনা পরিষ্কার করে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং পথ-আলোর ব্যবস্থা করা।
  • উন্নয়নমূলক কাজ: স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রাস্তা, ছোট সেতু, পুকুর খনন ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কাজ করা।
  • জনকল্যাণমূলক কাজ: প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পাঠাগার ইত্যাদি স্থাপন ও পরিচালনা করা এবং বনসৃজনের মতো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করা।
মূলত, স্থানীয় স্তরের সমস্ত উন্নয়ন ও পরিষেবার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলির উপরই ন্যস্ত থাকে।

(ঘ) পশ্চিমবঙ্গে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা বিষয়ে একটি টীকা লেখো।

পশ্চিমবঙ্গে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা দুটি স্তরে বিভক্ত—পৌর বা শহরাঞ্চলের জন্য এবং গ্রামীণ অঞ্চলের জন্য।
পৌর স্বায়ত্তশাসন: ছোট ও বড় শহরগুলিতে পৌরসভা বা পৌরনিগম রয়েছে। শহরের বাসিন্দারা ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধিদের (কাউন্সিলর) নির্বাচন করেন। এই প্রতিনিধিরা পৌরপ্রধান বা মেয়র নির্বাচন করেন। শহরের পানীয় জল, রাস্তাঘাট, জনস্বাস্থ্য, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি পৌরসভার দায়িত্ব।
গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন: গ্রামের স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা 'পঞ্চায়েত' নামে পরিচিত। এটি ত্রি-স্তরীয়:

  • গ্রাম পঞ্চায়েত: সর্বনিম্ন স্তরে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয়।
  • পঞ্চায়েত সমিতি: কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে একটি ব্লক স্তরে গঠিত হয়।
  • জেলা পরিষদ: জেলার সমস্ত পঞ্চায়েত সমিতি নিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে গঠিত হয়।
প্রতিটি স্তরের সদস্যরা গ্রামবাসীদের ভোটে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করেন।