অধ্যায় ৭: জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: সুলতানি ও মুঘল যুগ
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় ভাবনা, শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে নানা পরিবর্তন ও সমন্বয় ঘটেছিল। এই অধ্যায়ে সেই সময়ের সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
- জীবনযাত্রা: দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত এবং কৃষিই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত সরল ও কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে সুলতান, বাদশাহ ও অভিজাতরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।
- ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ: এই সময়ে প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যবাদের আচার-সর্বস্বতার বিরুদ্ধে ভারতে দুটি লোকায়ত ধর্মীয় ধারার জন্ম হয়—ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ। ভক্তিবাদীরা (যেমন—কবীর, নানক, মীরাবাঈ, চৈতন্যদেব) ঈশ্বরের প্রতি純粹 ভক্তি ও ভালোবাসার উপর জোর দেন এবং জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করেন। সুফি সাধকরা (যেমন—মইনুদ্দিন চিশতি, নিজামউদ্দিন আউলিয়া) ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ধ্যানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলেন। এই দুই ধারাই হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধনে সাহায্য করে।
- শ্রীচৈতন্য ও বাংলায় ভক্তিবাদ: ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেব বাংলায় বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনকে এক নতুন রূপ দেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে 'নামসংকীর্তন'-এর মাধ্যমে ভক্তি প্রচার করেন, যা বাংলার সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।
- স্থাপত্য ও শিল্পকলা: সুলতানি আমলে ভারতীয় ও ইসলামীয় রীতির মিশ্রণে 'ইন্দো-ইসলামীয়' স্থাপত্যশৈলীর জন্ম হয়। কুতুব মিনার, আলাই দরওয়াজা এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মুঘল আমলে এই শিল্প আরও উন্নত হয়। হুমায়ুনের সমাধি, ফতেপুর সিকরি, তাজমহল, লালকেল্লা মুঘল স্থাপত্যের অমর কীর্তি। এই সময়ে 'মিনিয়েচার' বা অণুচিত্র এবং প্রতিকৃতি আঁকারও ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
- ভাষা ও সাহিত্য: সুলতানি ও মুঘল যুগে ফারসি ছিল সরকারি ভাষা। আমির খসরুর মতো কবিরা ফারসি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। এই সময়েই রামায়ণ, মহাভারতের মতো সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনূদিত হয়। পাশাপাশি, বাংলা, হিন্দি প্রভৃতি আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্যেরও বিকাশ ঘটে। কৃত্তিবাসের রামায়ণ, মালাধর বসুর 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়', মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: এই যুগে জ্যোতির্বিদ্যা, ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হয়। বারুদ, কামান, বন্দুকের ব্যবহার যুদ্ধের কৌশল বদলে দেয়। কাগজ, চরকা, পারসিক চক্রের মতো প্রযুক্তিগুলিও ভারতে প্রচলিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| খ্রিস্টীয় ৭ম শতক | দক্ষিণ ভারতে অলভার ও নায়নার সাধকদের হাত ধরে ভক্তিবাদের সূচনা। |
| খ্রিস্টীয় ১০ম-১১শ শতক | মধ্য এশিয়ায় সুফিবাদের আবির্ভাব। |
| খ্রিস্টীয় ১৩শ শতক | ভারতে কাগজ তৈরির প্রযুক্তির আগমন। ভারতে চিশতি সুফি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা। |
| খ্রিস্টীয় ১৪শ শতক | ভারতে চরকার ব্যবহার শুরু। |
| ১৪৪০-১৫১৮ | সন্ত কবীরের জীবনকাল। |
| ১৪৬৯-১৫৩৮ | গুরু নানকের জীবনকাল। |
| ১৪৮৫-১৫৩৩ | শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনকাল। |
| ১৫৭০-এর দশক | আকবরের ফতেপুর সিকরিতে 'ইবাদতখানা' প্রতিষ্ঠা এবং 'দীন-ই-ইলাহি'র সূচনা। |
| খ্রিস্টীয় ১৮শ শতক | রাজা সওয়াই জয় সিংহের মানমন্দির নির্মাণ। মণিপুরে রাসলীলার বিকাশ। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
সুলতানি আমলে একটি বহলোলি মুদ্রা দিয়ে কত পরিমাণ খাদ্যশস্য কেনা যেত?
(ক) এক মণ (খ) পাঁচ মণ (গ) দশ মণ (ঘ) কুড়ি মণ
উত্তর: (গ) দশ মণ
মধ্যযুগে দিন-রাতের সময়কে কয়টি 'প্রহর'-এ ভাগ করা হত?
(ক) চারটি (খ) ছয়টি (গ) আটটি (ঘ) দশটি
উত্তর: (গ) আটটি
ভক্তিবাদের মূল কথা কী?
(ক) জ্ঞান ও যোগ (খ) আচার-অনুষ্ঠান (গ) ভগবানের প্রতি ভক্তের ভালোবাসা (ঘ) মূর্তি পূজা
উত্তর: (গ) ভগবানের প্রতি ভক্তের ভালোবাসা
দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছিল কাদের হাত ধরে?
(ক) নাথপন্থী ও যোগী (খ) অলভার ও নায়নার (গ) রামানন্দ ও কবীর (ঘ) শঙ্করদেব ও চৈতন্যদেব
উত্তর: (খ) অলভার ও নায়নার
শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম কী?
(ক) গ্রন্থসাহিব (খ) দোহা (গ) ত্রিপিটক (ঘ) বেদ
উত্তর: (ক) গুরু গ্রন্থসাহিব
লঙ্গরখানা কে চালু করেন?
(ক) কবীর (খ) রামানন্দ (গ) গুরু নানক (ঘ) চৈতন্যদেব
উত্তর: (গ) গুরু নানক
মীরাবাঈ কার ভক্ত ছিলেন?
(ক) রাম (খ) শিব (গ) শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারী (ঘ) ব্রহ্মা
উত্তর: (গ) শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারী
কবীর পেশায় কী ছিলেন?
(ক) নাপিত (খ) চামার (গ) কসাই (ঘ) তাঁতি (জোলাহা)
উত্তর: (ঘ) তাঁতি (জোলাহা)
হিন্দি ভাষায় দুই পংক্তির কবিতাকে কী বলে?
(ক) পদ (খ) ভজন (গ) দোহা (ঘ) কীর্তন
উত্তর: (গ) দোহা
'সুফ' কথাটির অর্থ কী?
(ক) জ্ঞান (খ) ভক্তি (গ) পশমের তৈরি কাপড় (ঘ) প্রেম
উত্তর: (গ) পশমের তৈরি কাপড়
ভারতে চিশতি সুফি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে?
(ক) নিজামউদ্দিন আউলিয়া (খ) বখতিয়ার কাকি (গ) শেখ সেলিম চিশতি (ঘ) মইনুদ্দিন চিশতি
উত্তর: (ঘ) মইনুদ্দিন চিশতি
সুফি গুরুকে কী বলা হত?
(ক) মুরিদ (খ) খলিফা (গ) পির (ঘ) উলেমা
উত্তর: (গ) পির
শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র কোথায় ছিল?
(ক) বৃন্দাবন (খ) পুরী (গ) গৌড় (ঘ) নবদ্বীপ
উত্তর: (ঘ) নবদ্বীপ
বাংলা ভাষায় চৈতন্যদেবের প্রথম জীবনীগ্রন্থ কোনটি?
(ক) চৈতন্যচরিতামৃত (খ) চৈতন্য ভাগবত (গ) চৈতন্যমঙ্গল (ঘ) শ্রীকৃষ্ণবিজয়
উত্তর: (খ) চৈতন্য ভাগবত
অসমে 'নাম ধর্ম' কে প্রচার করেন?
(ক) শ্রীচৈতন্য (খ) গুরু নানক (গ) শ্রীমন্ত শঙ্করদেব (ঘ) রামানন্দ
উত্তর: (গ) শ্রীমন্ত শঙ্করদেব
'দীন-ই-ইলাহি' কে প্রবর্তন করেন?
(ক) বাবর (খ) হুমায়ুন (গ) আকবর (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (গ) আকবর
ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যরীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
(ক) চূড়া ও বিমান (খ) খিলান ও গম্বুজ (গ) টেরাকোটার কাজ (ঘ) চালা স্থাপত্য
উত্তর: (খ) খিলান ও গম্বুজ
আলাই দরওয়াজা কে নির্মাণ করেন?
(ক) কুতুবউদ্দিন আইবক (খ) ইলতুৎমিস (গ) বলবন (ঘ) আলাউদ্দিন খলজি
উত্তর: (ঘ) আলাউদ্দিন খলজি
'চাহার বাগ' কোন আমলের স্থাপত্যরীতি?
(ক) সুলতানি (খ) মুঘল (গ) পাল (ঘ) সেন
উত্তর: (খ) মুঘল
'পিয়েত্রা দুরা' কী?
(ক) এক প্রকার গম্বুজ (খ) এক প্রকার খিলান (গ) শ্বেতপাথরে রত্ন বসানোর কারুকার্য (ঘ) এক প্রকার মিনার
উত্তর: (গ) শ্বেতপাথরে রত্ন বসানোর কারুকার্য
ভারতের বৃহত্তম গম্বুজ কোনটি?
(ক) তাজমহল (খ) হুমায়ুনের সমাধি (গ) গোল গুম্বদ (ঘ) জামা মসজিদ
উত্তর: (গ) গোল গুম্বদ
বিষ্ণুপুরের জোড়-বাংলা মন্দির কোন রীতির স্থাপত্য?
(ক) ইন্দো-ইসলামীয় (খ) দ্রাবিড় (গ) नागर (ঘ) চালা স্থাপত্য
উত্তর: (ঘ) চালা স্থাপত্য
আদিনা মসজিদ কে নির্মাণ করেন?
(ক) ইলিয়াস শাহ (খ) সিকান্দর শাহ (গ) আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (ঘ) গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
উত্তর: (খ) সিকান্দর শাহ
মুঘল আমলে ছোট আকারের ছবিগুলিকে কী বলা হত?
(ক) প্রতিকৃতি (খ) পোট্রেট (গ) মিনিয়েচার (ঘ) ফ্রেস্কো
উত্তর: (গ) মিনিয়েচার (অণুচিত্র)
মহাভারতের ফারসি অনুবাদের নাম কী?
(ক) শাহনামা (খ) বাবরনামা (গ) রজমনামা (ঘ) আকবরনামা
উত্তর: (গ) রজমনামা
মুঘল চিত্রশিল্পী মনসুর কী আঁকার জন্য বিখ্যাত ছিলেন?
(ক) প্রতিকৃতি (খ) যুদ্ধের দৃশ্য (গ) গাছপালা ও পশুপাখি (ঘ) স্থাপত্যের ছবি
উত্তর: (গ) গাছপালা ও পশুপাখি
আমির খসরু কোন বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারক বলে মনে করা হয়?
(ক) বীণা (খ) বাঁশি (গ) সেতার ও তবলা (ঘ) সরোদ
উত্তর: (গ) সেতার ও তবলা
বাংলায় রামায়ণের প্রথম অনুবাদক কে?
(ক) কাশীরাম দাস (খ) মালাধর বসু (গ) কৃত্তিবাস ওঝা (ঘ) বড়ু চণ্ডীদাস
উত্তর: (গ) কৃত্তিবাস ওঝা
কাগজ প্রথম কোথায় আবিষ্কৃত হয়?
(ক) ভারতে (খ) আরবে (গ) চিনে (ঘ) ইউরোপে
উত্তর: (গ) চিনে
পারসিক চক্র বা সাকিয়া কী কাজে ব্যবহৃত হত?
(ক) কাপড় বুনতে (খ) জল তুলতে (গ) যুদ্ধ করতে (ঘ) সময় মাপতে
উত্তর: (খ) জল তুলতে
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
মধ্যযুগে সাধারণ মানুষের রোজকার খাবার কী ছিল?
মধ্যযুগে সাধারণ মানুষের রোজকার খাবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও একঘেয়ে। ওলন্দাজ বণিকদের বিবরণ অনুযায়ী, তাদের প্রধান খাবার ছিল খিচুড়ি, যা তারা দিনে একবার মাত্র খেত।
ভক্তিবাদ বলতে কী বোঝো?
ভক্তিবাদ হলো মধ্যযুগের ভারতে গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় আন্দোলন, যার মূল কথা ছিল কোনো রকম আচার-অনুষ্ঠান বা জাতিভেদ ছাড়াই কেবল純粹 ভক্তি বা ভালোবাসার মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করা।
অলভার ও নায়নার কারা ছিলেন?
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে দক্ষিণ ভারতে যে ভক্তিবাদী সাধকদের আবির্ভাব হয়, তাঁদের মধ্যে যারা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন তাঁরা 'অলভার' এবং যারা শিবের উপাসক ছিলেন তাঁরা 'নায়নার' নামে পরিচিত।
কবীর কীভাবে ধর্মীয় সমন্বয়ের কথা বলেছেন?
কবীর তাঁর দোহা ও গানের মাধ্যমে হিন্দু ও ইসলাম উভয় ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে এক ঈশ্বরের কথা বলেছেন। তাঁর কাছে রাম, হরি, আল্লাহ—সবই এক ঈশ্বরের ভিন্ন নাম। তিনি মনে করতেন, ভক্তির মাধ্যমে মানুষ নিজের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে পারে।
সুফিবাদ কী?
সুফিবাদ হলো ইসলামের একটি মরমিয়া বা আধ্যাত্মিক ধারা। সুফিরা ইসলামীয় শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রেম, ধ্যান এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক মিলনের উপর জোর দেন।
সিলসিলা কাকে বলে? চিশতি সুফিদের জীবনযাপন কেমন ছিল?
সুফি সাধকদের পরম্পরা বা গোষ্ঠীগুলিকে 'সিলসিলা' বলা হয়। ভারতে চিশতি সুফিরা অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তাঁরা রাজনীতি ও রাজদরবার থেকে দূরে থাকতেন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে আপন করে নিতেন।
শ্রীচৈতন্য কীভাবে ভক্তি প্রচার করতেন?
শ্রীচৈতন্যদেব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে নিয়ে 'নামসংকীর্তন' ও 'নগরকীর্তন'-এর মাধ্যমে ভক্তি প্রচার করতেন। তিনি প্রেম ও ভক্তিকেই ঈশ্বর লাভের একমাত্র পথ বলে মনে করতেন এবং বাংলার সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষাকেই প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
দীন-ই-ইলাহি কী?
দীন-ই-ইলাহি ছিল সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত একটি ব্যক্তিগত মতাদর্শ। এটি কোনো নতুন ধর্ম ছিল না, বরং বিভিন্ন ধর্ম থেকে কিছু ভালো বিষয় গ্রহণ করে বাদশাহের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরির প্রচেষ্টা ছিল। এর মাধ্যমে আকবর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অভিজাতদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
স্থাপত্য হিসাবে আলাই দরওয়াজার বৈশিষ্ট্য কী?
আলাউদ্দিন খলজি নির্মিত আলাই দরওয়াজা হলো ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যরীতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাল বেলেপাথরের ব্যবহার, সুদৃশ্য খিলান, বিশাল গম্বুজ এবং দেয়ালে জ্যামিতিক ও কোরানের বাণী খোদাই করা কারুকার্য।
ক্যালিগ্রাফি এবং মিনিয়েচার বলতে কী বোঝায়?
ক্যালিগ্রাফি: সুন্দর ও শৈল্পিক হস্তাক্ষর বা হস্তলিপিবিদ্যাকে ক্যালিগ্রাফি বলে। মধ্যযুগে ছাপাখানার অভাবে হাতে লেখা পুঁথিকে সুন্দর করে তোলার জন্য এই শিল্পের খুব কদর ছিল।
মিনিয়েচার: পুঁথির পাতায় বা আলাদা কাগজে আঁকা ছোট আকারের রঙিন ছবিকে মিনিয়েচার বা অণুচিত্র বলা হয়। মুঘল আমলে এই শিল্প চরম উন্নতি লাভ করে।
শিবায়ন কী? এর থেকে বাংলার কৃষকের জীবনের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
মধ্যযুগে বাংলায় শিবের ঘর-সংসার ও চাষবাসের কাহিনি নিয়ে যে মঙ্গলকাব্যগুলি রচিত হয়েছিল, সেগুলি 'শিবায়ন' নামে পরিচিত। এতে পৌরাণিক দেবতা শিবকে একজন গরিব কৃষক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি চাষ করে সংসার চালান। এর থেকে সেযুগের বাংলার গরিব কৃষক পরিবারের অভাব-অনটন ও দৈনন্দিন জীবনের কষ্টের পরিচয় পাওয়া যায়।
কাগজ কোথায় আবিষ্কার হয়েছিল? মধ্য যুগের ভারতে কাগজের ব্যবহার কেমন ছিল তা লেখো।
কাগজ প্রথম চিনে আবিষ্কৃত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলদের মাধ্যমে ভারতে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি আসে। সুলতানি আমলে কাগজের ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এর দামও সস্তা হয়ে যায়। পুঁথি লেখা ছাড়াও মিষ্টির মোড়কের মতো সাধারণ কাজেও কাগজ ব্যবহৃত হত।
আমির খসরুকে কেন 'সবক-ই-হিন্দ'-এর আবিষ্কারক বলা হয়?
আমির খসরু ফারসি সাহিত্যের সঙ্গে ভারতীয় রীতি ও বিষয়বস্তুর মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন ধরনের কাব্যরীতি তৈরি করেন, যা 'সবক-ই-হিন্দ' বা 'ভারতীয় শৈলী' নামে পরিচিত। এই কারণেই তাঁকে এর আবিষ্কারক বলা হয়।
মঙ্গলকাব্য বলতে কী বোঝো?
মধ্যযুগের বাংলায় চণ্ডী, মনসা, ধর্মঠাকুরের মতো স্থানীয় দেবদেবীর মহিমা প্রচারের জন্য যে কাহিনিকাব্যগুলি রচিত ও গাওয়া হত, সেগুলিকে মঙ্গলকাব্য বলে। এই কাব্যগুলির মাধ্যমে দেবদেবীর পূজা প্রচার করা হত এবং এতে সমকালীন সমাজজীবনের ছবিও ফুটে উঠত।
পঞ্চরত্ন মন্দির কাকে বলে?
বাংলার চালা স্থাপত্যরীতির একটি বিশেষ ধরন হলো রত্ন মন্দির। যে মন্দিরের মূল চালার চার কোণে চারটি ছোট চূড়া বা রত্ন এবং কেন্দ্রে একটি বড় চূড়া বা রত্ন থাকে, তাকে পঞ্চরত্ন মন্দির বলা হয়। বিষ্ণুপুরের শ্যামরায় মন্দির এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
মধ্য যুগের ভারতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা লেখো।
সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও সরল। দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত এবং কৃষিই ছিল তাদের মূল জীবিকা।
- খাদ্য: তাদের প্রধান খাবার ছিল একঘেয়ে খিচুড়ি বা মোটা চালের ভাত। আমিষ বা অন্যান্য ভালো খাবার তাদের ভাগ্যে কমই জুটত।
- বস্ত্র ও বাসস্থান: তাদের পরনের পোশাক ছিল সামান্য। থাকার জন্য ছিল মাটি বা খড়ের তৈরি ছোট কুঁড়েঘর, যার আসবাবপত্র বলতে ছিল একটি বা দুটি খাটিয়া এবং রান্নার কিছু বাসনপত্র।
- অর্থনৈতিক অবস্থা: হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও তার একটা বড় অংশ রাজকর হিসেবে দিতে হত। এর পর যা বাকি থাকত, তা দিয়েই তাদের সারা বছর চালাতে হত। ফলে অভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।
- বিনোদন: পালা-পার্বণ, লোকগান, নাচ, কুস্তি ইত্যাদি ছিল তাদের কঠোর জীবনের মধ্যে সামান্য আনন্দের উৎস।
কবীর ও নানকের ভক্তি ভাবনায় কীভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এক হয়ে গিয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?
কবীর ও গুরু নানক—উভয়ের ভক্তি ভাবনার মূল ভিত্তিই ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে এক নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করা।
সমন্বয়ের কারণ:
- একেশ্বরবাদ: তাঁরা উভয়েই হিন্দুধর্মের বহুদেববাদ ও ইসলাম ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে এক ঈশ্বরের কথা বলেছেন। কবীরের কাছে রাম ও রহিম, নানকের কাছে হরি ও আল্লাহ এক ও অভিন্ন ছিলেন।
- জাতিভেদ বিরোধিতা: তাঁরা উভয়েই জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচনা করেছেন। নানকের 'লঙ্গরখানা'য় সকল বর্ণের মানুষ একসঙ্গে বসে আহার করত, যা সামাজিক সাম্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
- সাধারণের ভাষা: তাঁরা সংস্কৃত বা ফারসির মতো কঠিন ভাষার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় (হিন্দি, পাঞ্জাবি) তাঁদের বাণী প্রচার করতেন, যা সহজেই মানুষের হৃদয় স্পর্শ করত।
বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের ফলাফল কী হয়েছিল বিশ্লেষণ করো।
শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে বাংলায় বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
সামাজিক প্রভাব: এই আন্দোলন জাতিভেদ প্রথার কঠোরতার উপর আঘাত হানে। চৈতন্যদেব ব্রাহ্মণ হয়েও তথাকথিত 'নীচু' জাতির মানুষদের আলিঙ্গন করেন। নগরকীর্তনে সকল বর্ণের মানুষ একসঙ্গে অংশ নিত, যা সমাজে এক ধরনের সামাজিক সাম্যের বার্তা দেয়। যদিও এটি জাতিভেদকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি, তবে এর তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক প্রভাব: বৈষ্ণব আন্দোলনের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছিল বাংলার সংস্কৃতিতে।
- সাহিত্য: চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় প্রথম জীবনী সাহিত্য (চৈতন্যচরিত, চৈতন্যমঙ্গল) রচনার ধারা শুরু হয়। এছাড়া, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে এক সুবিশাল পদাবলি সাহিত্য গড়ে ওঠে, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।
- সংগীত: নামকীর্তন ও নগরকীর্তন বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়, যা আজও জনপ্রিয়।
- ভাষা: চৈতন্যদেব ও তাঁর অনুগামীরা সাধারণ মানুষের মুখের বাংলা ভাষায় ধর্ম প্রচার করায় বাংলা ভাষার মর্যাদা ও বিকাশ ঘটে।
বাদশাহ আকবরের দীন-ই-ইলাহি সম্বন্ধে একটি টীকা লেখো।
'দীন-ই-ইলাহি' ছিল মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত একটি নতুন মতাদর্শ। এটিকে অনেকে একটি নতুন ধর্ম বলে মনে করলেও, আধুনিক ঐতিহাসিকরা এটিকে ধর্ম না বলে আকবরের প্রতি অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেন।
পটভূমি: আকবর ফতেপুর সিকরির 'ইবাদতখানা'-য় বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, সব ধর্মের মধ্যেই কিছু সত্য নিহিত আছে। এই উপলব্ধি থেকে তিনি 'সুলহ-ই-কুল' বা সকলের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেন।
উদ্দেশ্য: দীন-ই-ইলাহির মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর (হিন্দু, মুসলিম, পারসি, জৈন) অভিজাতদের নিয়ে বাদশাহের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরি করা।
নীতি: এর সদস্যরা বাদশাহকে গুরু হিসেবে মানতেন এবং তাঁর জন্য নিজেদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্ম উৎসর্গ করার শপথ নিতেন। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে 'আল্লাহু আকবর' বলতেন।
এই মতাদর্শ খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি এবং আকবরের মৃত্যুর সঙ্গেই এর প্রভাব প্রায় শেষ হয়ে যায়।
মধ্য যুগের ভারতে কীভাবে ফারসি ভাষার ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা বেড়েছিল তা বিশ্লেষণ করো।
মধ্যযুগে ভারতে, বিশেষ করে সুলতানি ও মুঘল আমলে, ফারসি ভাষার ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা enormously বৃদ্ধি পায়।
কারণ:
- সরকারি ভাষা: দিল্লি সুলতানি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সরকারি ও প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফারসি। ফলে, সরকারি চাকরি পেতে বা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ফারসি শেখা অপরিহার্য ছিল।
- রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: সুলতান ও বাদশাহরা ছিলেন ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উদার পৃষ্ঠপোষক। আমির খসরুর মতো কবি এবং আবুল ফজলের মতো ঐতিহাসিকরা রাজদরবারে সমাদৃত হতেন, যা অন্যদের এই ভাষা চর্চায় উৎসাহিত করত।
- সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: মধ্য এশিয়া ও ইরান থেকে বহু পণ্ডিত, কবি ও শিল্পী ভারতে আসায় দুই অঞ্চলের মধ্যে এক গভীর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটে, যার প্রধান মাধ্যম ছিল ফারসি।
- অনুবাদ সাহিত্য: আকবরের আমলে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত পুরাণের মতো বহু সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনূদিত হয়, যা ফারসি ভাষার ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৫৬-১৫৮)
১। শূন্যস্থান পূরণ করো:
ক) টালি এবং ইট ব্যবহার করে বাংলায় সুলতানি এবং মুঘল আমলে সাধারণ লোকের বাড়ি বানানো হতো।
খ) কবীরের দুই পংক্তির কবিতাগুলিকে বলা হয়- দোহা।
গ) সুফিরা গুরুকে মনে করত পির।
ঘ) নবদ্বীপ ছিল চৈতন্য-আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।
ঙ) মীরাবাঈ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারীর সাধিকা।
চ) দীন-ই ইলাহি-র বৈশিষ্ট্য ছিল মুঘল সম্রাট এবং তাঁর অভিজাতদের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক।
ছ) শ্বেতপাথরে রত্ন বসিয়ে কারুকার্য করাকে বলে- পিয়েত্রা দুরা।
জ) মহাভারতের ফারসি অনুবাদের নাম- রজমনামা।
ঝ) আবদুস সামাদ- পরিচিত ছিলেন 'শিরিনকলম' নামে।
ঞ) জৌনপুরি রাগ তৈরি করেন হোসেন শাহ শরকি।
ট) শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যের লেখকের নাম মালাধর বসু।
ঠ) 'পারসিক চক্র' কাজে লাগানো হতো জল তোলার জন্য।
২। নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে তার নীচের কোন ব্যাখ্যাটি তোমার সবচেয়ে মানানসই বলে মনে হয়?
(ক) বিবৃতি: নদীর ধারে শিল্পগুলি তৈরি হতো।
ব্যাখ্যা-৩: কাঁচা মাল আমদানি এবং তৈরি মাল রপ্তানির সুবিধা হতো।
(খ) বিবৃতি: চৈতন্য বাংলা ভাষাকেই ভক্তি প্রচারের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।
ব্যাখ্যা-২: সে কালের বাংলার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা।
(গ) বিবৃতি: চিশতি সুফিরা রাজনীতিতে যোগ দিতেন না।
ব্যাখ্যা-১: তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে ঈশ্বর-সাধনা সম্ভব নয়।
(ঘ) বিবৃতি: আকবর দীন-ই ইলাহি প্রবর্তন করেন।
ব্যাখ্যা-২: তিনি অনুগত গোষ্ঠী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
(ঙ) বিবৃতি: মুঘল সম্রাটরা দুর্গ বানাতে আগ্রহী ছিলেন।
ব্যাখ্যা-৩: দুর্গ বানানোয় সাম্রাজ্য সুরক্ষিত হতো।
(চ) বিবৃতি: জাহাঙ্গিরের আমলে ইউরোপীয় ছবির প্রভাব মুঘল চিত্রশিল্পে পড়েছিল।
ব্যাখ্যা-১: এই সময়ে ইউরোপীয় ছবি মুঘল দরবারে আসতে শুরু করেছিল।
(ছ) বিবৃতি: মধ্য যুগের মণিপুরী নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণ ছিলেন প্রধান চরিত্র।
ব্যাখ্যা-২: এই সময় বৈষ্ণব ধর্ম মণিপুরে বিস্তার লাভ করেছিল।
(জ) বিবৃতি: ভারতে প্রাচীন কালে তালপাতার উপরে লেখা হতো।
ব্যাখ্যা-১: সে আমলে কাগজের ব্যবহার জানা ছিল না।
৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:
(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)
(ক) মধ্য যুগের ভারতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা লেখো।
সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও সরল। দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত এবং কৃষিই ছিল তাদের মূল জীবিকা।
- খাদ্য: তাদের প্রধান খাবার ছিল একঘেয়ে খিচুড়ি বা মোটা চালের ভাত। আমিষ বা অন্যান্য ভালো খাবার তাদের ভাগ্যে কমই জুটত।
- বস্ত্র ও বাসস্থান: তাদের পরনের পোশাক ছিল সামান্য। থাকার জন্য ছিল মাটি বা খড়ের তৈরি ছোট কুঁড়েঘর, যার আসবাবপত্র বলতে ছিল একটি বা দুটি খাটিয়া এবং রান্নার কিছু বাসনপত্র।
- অর্থনৈতিক অবস্থা: হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও তার একটা বড় অংশ রাজকর হিসেবে দিতে হত। এর পর যা বাকি থাকত, তা দিয়েই তাদের সারা বছর চালাতে হত। ফলে অভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।
- বিনোদন: পালা-পার্বণ, লোকগান, নাচ, কুস্তি ইত্যাদি ছিল তাদের কঠোর জীবনের মধ্যে সামান্য আনন্দের উৎস।
(খ) কবীরের ভক্তি ভাবনায় কীভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এক হয়ে গিয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?
কবীর ও গুরু নানক—উভয়ের ভক্তি ভাবনার মূল ভিত্তিই ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে এক নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করা।
সমন্বয়ের কারণ:
- একেশ্বরবাদ: তাঁরা উভয়েই হিন্দুধর্মের বহুদেববাদ ও ইসলাম ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে এক ঈশ্বরের কথা বলেছেন। কবীরের কাছে রাম ও রহিম, নানকের কাছে হরি ও আল্লাহ এক ও অভিন্ন ছিলেন।
- জাতিভেদ বিরোধিতা: তাঁরা উভয়েই জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচনা করেছেন। নানকের 'লঙ্গরখানা'য় সকল বর্ণের মানুষ একসঙ্গে বসে আহার করত, যা সামাজিক সাম্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
- সাধারণের ভাষা: তাঁরা সংস্কৃত বা ফারসির মতো কঠিন ভাষার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় (হিন্দি, পাঞ্জাবি) তাঁদের বাণী প্রচার করতেন, যা সহজেই মানুষের হৃদয় স্পর্শ করত।
(গ) বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের ফলাফল কী হয়েছিল বিশ্লেষণ করো।
শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে বাংলায় বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
সামাজিক প্রভাব: এই আন্দোলন জাতিভেদ প্রথার কঠোরতার উপর আঘাত হানে। চৈতন্যদেব ব্রাহ্মণ হয়েও তথাকথিত 'নীচু' জাতির মানুষদের আলিঙ্গন করেন। নগরকীর্তনে সকল বর্ণের মানুষ একসঙ্গে অংশ নিত, যা সমাজে এক ধরনের সামাজিক সাম্যের বার্তা দেয়। যদিও এটি জাতিভেদকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি, তবে এর তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক প্রভাব:
- সাহিত্য: চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় প্রথম জীবনী সাহিত্য (চৈতন্যচরিত, চৈতন্যমঙ্গল) রচনার ধারা শুরু হয়। এছাড়া, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে এক সুবিশাল পদাবলি সাহিত্য গড়ে ওঠে, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।
- সংগীত: নামকীর্তন ও নগরকীর্তন বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়, যা আজও জনপ্রিয়।
- ভাষা: চৈতন্যদেব ও তাঁর অনুগামীরা সাধারণ মানুষের মুখের বাংলা ভাষায় ধর্ম প্রচার করায় বাংলা ভাষার মর্যাদা ও বিকাশ ঘটে।
(ঘ) বাদশাহ আকবরের দীন-ই-ইলাহি সম্বন্ধে একটি টীকা লেখো।
'দীন-ই-ইলাহি' ছিল মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত একটি নতুন মতাদর্শ। এটিকে অনেকে একটি নতুন ধর্ম বলে মনে করলেও, আধুনিক ঐতিহাসিকরা এটিকে ধর্ম না বলে আকবরের প্রতি অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেন।
পটভূমি: আকবর ফতেপুর সিকরির 'ইবাদতখানা'-য় বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, সব ধর্মের মধ্যেই কিছু সত্য নিহিত আছে। এই উপলব্ধি থেকে তিনি 'সুলহ-ই-কুল' বা সকলের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেন।
উদ্দেশ্য: দীন-ই-ইলাহির মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর (হিন্দু, মুসলিম, পারসি, জৈন) অভিজাতদের নিয়ে বাদশাহের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরি করা।
নীতি: এর সদস্যরা বাদশাহকে গুরু হিসেবে মানতেন এবং তাঁর জন্য নিজেদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্ম উৎসর্গ করার শপথ নিতেন। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে 'আল্লাহু আকবর' বলতেন।
এই মতাদর্শ খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি এবং আকবরের মৃত্যুর সঙ্গেই এর প্রভাব প্রায় শেষ হয়ে যায়।
(ঙ) মুঘল সম্রাটদের আমলে বাগান তৈরি এবং দুর্গনির্মাণ সম্বন্ধে আলোচনা করো।
বাগান তৈরি: মুঘল সম্রাটরা, বিশেষ করে বাবর, জাহাঙ্গীর ও শাহ জাহান, বাগান তৈরি করতে খুব ভালোবাসতেন। তাঁরা মধ্য এশিয়া থেকে 'চাহার বাগ' (চারটি ভাগে বিভক্ত বাগান) রীতি ভারতে নিয়ে আসেন। এই বাগানগুলিতে জলের ফোয়ারা, খাল এবং নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ থাকত। লাহোরের শালিমার বাগ, কাশ্মীরের নিশাত বাগ এবং তাজমহল ও হুমায়ুনের সমাধিসৌধের বাগান এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
দুর্গ নির্মাণ: সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা এবং বাদশাহের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য মুঘলরা বিশাল ও সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করত। আকবর আগ্রা, লাহোর, এলাহাবাদ ও আজমিরে লাল বেলেপাথরের বিশাল দুর্গ তৈরি করেন। শাহ জাহানের তৈরি দিল্লির লালকেল্লা মুঘল দুর্গ-স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই দুর্গগুলি কেবল সামরিক ঘাঁটি ছিল না, এগুলির ভিতরে প্রাসাদ, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাসের মতো প্রশাসনিক ভবনও থাকত।
(চ) মধ্য যুগের বাংলার স্থাপত্যরীতির পর্যায়গুলির মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
মধ্যযুগে বাংলায় ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যরীতি গড়ে ওঠে, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ইটের ব্যবহার এবং স্থানীয় লোকশিল্পের প্রভাব।
প্রথম পর্যায় (১২০১-১৩৩৯): এই সময়ের স্থাপত্যের বিশেষ কোনো নিদর্শন প্রায় নেই।
দ্বিতীয় পর্যায় (১৩৩৯-১৪৪২): এই পর্বের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য হলো পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ। এটি বিশাল আকারের এবং এর স্থাপত্যে ইসলামীয় রীতির সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবের মিশ্রণ দেখা যায়।
তৃতীয় পর্যায় (১৪৪২-১৫৩৯): এই সময়ে বাংলা স্থাপত্য তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য লাভ করে। পান্ডুয়ার একলাখি সমাধি, গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা, তাঁতিপাড়া মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ এই পর্বের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এই স্থাপত্যগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পোড়ামাটির বা টেরাকোটার অলংকরণ, বাঁকানো কার্নিশ এবং বাংলার কুঁড়েঘরের চালার অনুকরণে তৈরি 'চালা' রীতির ব্যবহার।
(ছ) মুঘল চিত্রশিল্পের উন্নতিতে মুঘল বাদশাহদের কী ভূমিকা ছিল?
মুঘল চিত্রশিল্পের উন্নতির পিছনে বাদশাহদের ব্যক্তিগত উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
- হুমায়ুন: তিনি পারস্য থেকে মির সঈদ আলি ও আবদুস সামাদের মতো শিল্পীদের ভারতে নিয়ে আসেন এবং মুঘল 'কারখানা' (চিত্রশালা) প্রতিষ্ঠা করেন।
- আকবর: তাঁর আমলে ভারতীয় ও পারসিক রীতির মিশ্রণে এক নতুন মুঘল শৈলীর জন্ম হয়। তিনি 'রজমনামা', 'আকবরনামা'-র মতো পুঁথি অলংকরণের জন্য শতাধিক শিল্পী নিয়োগ করেন।
- জাহাঙ্গীর: তাঁর শাসনকালকে মুঘল চিত্রকলার স্বর্ণযুগ বলা হয়। তিনি প্রকৃতি, পশুপাখি এবং প্রতিকৃতি আঁকায় বিশেষ উৎসাহ দেন। মনসুরের মতো বিখ্যাত শিল্পীরা তাঁর দরবারে ছিলেন।
- শাহ জাহান: তাঁর সময়ে ছবির মধ্যে perspectiva বা গভীরতা দেখানোর কৌশল ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং 'পাদশাহনামা'-র মতো বিখ্যাত গ্রন্থ চিত্রিত হয়।
(জ) মধ্য যুগের ভারতে কীভাবে ফারসি ভাষার ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা বেড়েছিল তা বিশ্লেষণ করো।
মধ্যযুগে ভারতে, বিশেষ করে সুলতানি ও মুঘল আমলে, ফারসি ভাষার ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা enormously বৃদ্ধি পায়।
কারণ:
- সরকারি ভাষা: দিল্লি সুলতানি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সরকারি ও প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফারসি। ফলে, সরকারি চাকরি পেতে বা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ফারসি শেখা অপরিহার্য ছিল।
- রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: সুলতান ও বাদশাহরা ছিলেন ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উদার পৃষ্ঠপোষক। আমির খসরুর মতো কবি এবং আবুল ফজলের মতো ঐতিহাসিকরা রাজদরবারে সমাদৃত হতেন, যা অন্যদের এই ভাষা চর্চায় উৎসাহিত করত।
- সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: মধ্য এশিয়া ও ইরান থেকে বহু পণ্ডিত, কবি ও শিল্পী ভারতে আসায় দুই অঞ্চলের মধ্যে এক গভীর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটে, যার প্রধান মাধ্যম ছিল ফারসি।
- অনুবাদ সাহিত্য: আকবরের আমলে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত পুরাণের মতো বহু সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনূদিত হয়, যা ফারসি ভাষার ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে।
(ঝ) সুলতানি এবং মুঘল আমলে সামরিক এবং কৃষি প্রযুক্তিতে কী কী পরিবর্তন ঘটেছিল বলে তোমার মনে হয়?
সুলতানি ও মুঘল আমলে ভারতে সামরিক ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটেছিল।
সামরিক প্রযুক্তি: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে বারুদ-চালিত অস্ত্রের ব্যবহারে। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতক থেকে ভারতে কামান ও বন্দুকের ব্যবহার শুরু হয় এবং মুঘল আমলে, বিশেষ করে বাবরের সময়, এটি যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এছাড়াও, ঘোড়ার পিঠে ব্যবহারের জন্য লোহার পাদানি বা রেকাবের ব্যবহার তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনীকে দ্রুতগামী ও কার্যকর করে তোলে।
কৃষি প্রযুক্তি: এই সময়ে কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি ছিল 'পারসিক চক্র' বা 'সাকিয়া'-র ব্যবহার। এই যন্ত্রের সাহায্যে পশুর শক্তি ব্যবহার করে কুয়ো বা জলাশয় থেকে জল তুলে সেচের কাজে লাগানো যেত। এছাড়াও, ফিরোজ শাহ তুঘলক ও মুঘল বাদশাহদের দ্বারা নির্মিত খালগুলি সেচব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটায়, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।