অধ্যায় ৫: মুঘল সাম্রাজ্য

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে পানিপথের প্রথম যুদ্ধের (১৫২৬ খ্রিঃ) মাধ্যমে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। এই অধ্যায়ে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে এর বিস্তার, শাসনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন শাসকের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

  • প্রতিষ্ঠা ও প্রাথমিক পর্যায়: তৈমুর লঙ ও চেঙ্গিস খানের বংশধর জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল শাসনের সূচনা করেন। খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুত শক্তিকে এবং ঘর্ঘরার যুদ্ধে আফগানদের পরাজিত করে তিনি উত্তর ভারতে নিজের শাসন সুদৃঢ় করেন। তাঁর পুত্র হুমায়ুন শের খানের কাছে পরাজিত হয়ে সাময়িকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন।
  • শের শাহের সংস্কার: এই অন্তর্বর্তীকালে আফগান শাসক শের শাহ (সুরি) এক উন্নত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা ('পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত'), যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি (সড়ক-ই-আজম) এবং সামরিক সংস্কার (দাগ ও হুলিয়া) পরবর্তীকালে আকবর অনুসরণ করেন।
  • আকবরের শাসন (স্বর্ণযুগ): হুমায়ুনের পুত্র আকবরের দীর্ঘ শাসনকালে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিঃ) মুঘল সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ গৌরবে পৌঁছায়। তিনি পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন। যুদ্ধ ও মৈত্রীর মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। তাঁর রাজপুত নীতি, 'সুলহ-ই-কুল' (সকলের প্রতি সহনশীলতা) আদর্শ, 'দীন-ই-ইলাহি' মতাদর্শ, মনসবদারি ব্যবস্থা এবং 'জাবতি' বা 'দহসালা' ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা মুঘল শাসনকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
  • পরবর্তী সম্রাটরা: জাহাঙ্গিরের আমলে 'বারো ভূঁইয়া'-দের দমন করে বাংলায় মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। শাহ জাহানের শাসনকাল স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত হলেও, তাঁর শেষ জীবনে পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে রক্তক্ষয়ী संघर्ष হয়। ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ শাসনকালে সাম্রাজ্যের আয়তন সর্বাধিক হলেও, তাঁর দাক্ষিণাত্য নীতি এবং বিভিন্ন বিদ্রোহ (জাঠ, সৎনামী, শিখ, মারাঠা) সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' নামে পরিচিত।
  • শাসনব্যবস্থা: মুঘলরা নিজেদের 'বাদশাহ' বলত। আকবরের সময় থেকে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সাম্রাজ্যকে 'সুবা' (প্রদেশ), 'সরকার' (জেলা) ও 'পরগনা'-তে ভাগ করা হয়। মনসবদারি ও জায়গিরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সামরিক ও অসামরিক প্রশাসন পরিচালিত হত।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
১৫২৬পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা।
১৫২৭খানুয়ার যুদ্ধ।
১৫২৯ঘর্ঘরার যুদ্ধ।
১৫৩৯চৌসার যুদ্ধ।
১৫৪০কনৌজের (বিলগ্রামের) যুদ্ধ, হুমায়ুনের পরাজয় ও শের শাহের উত্থান।
১৫৫৬পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ, আকবরের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার।
১৫৭৬হলদিঘাটির যুদ্ধ।
১৫৮০আকবরের 'দহসালা' ব্যবস্থা প্রবর্তন।
১৬০৫আকবরের মৃত্যু।
১৬২৭-১৬৫৮শাহ জাহানের শাসনকাল।
১৬৫৮-১৭০৭ঔরঙ্গজেবের শাসনকাল।
১৬৭৯ঔরঙ্গজেবের পুনরায় জিজিয়া কর আরোপ।
১৭০৭ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

মুঘলরা কার বংশধর হিসেবে গর্ববোধ করত?

(ক) চেঙ্গিস খান (খ) তৈমুর লঙ (গ) সুলতান মাহমুদ (ঘ) মহম্মদ ঘুরি
উত্তর: (খ) তৈমুর লঙ

ভারতের প্রথম মুঘল বাদশাহ কে ছিলেন?

(ক) হুমায়ুন (খ) আকবর (গ) বাবর (ঘ) শের শাহ
উত্তর: (গ) বাবর

বাবর কত সালে 'পাদশাহ' উপাধি নেন?

(ক) ১৫০৪ (খ) ১৫০৭ (গ) ১৫২৬ (ঘ) ১৫৩০
উত্তর: (খ) ১৫০৭

খানুয়ার যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়েছিল?

(ক) বাবর ও ইব্রাহিম লোদি (খ) বাবর ও রানা সংগ্রাম সিংহ (গ) বাবর ও নসরৎ শাহ (ঘ) হুমায়ুন ও শের খান
উত্তর: (খ) বাবর ও রানা সংগ্রাম সিংহ

বাবর কোন যুদ্ধে 'গাজি' উপাধি নেন?

(ক) পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (খ) খানুয়ার যুদ্ধ (গ) ঘর্ঘরার যুদ্ধ (ঘ) চৌসার যুদ্ধ
উত্তর: (খ) খানুয়ার যুদ্ধ

চৌসার যুদ্ধ কবে হয়েছিল?

(ক) ১৫২৬ খ্রি: (খ) ১৫২৭ খ্রি: (গ) ১৫৩৯ খ্রি: (ঘ) ১৫৪০ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৫৩৯ খ্রি:

কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন ভারত ছাড়তে বাধ্য হন?

(ক) চৌসার যুদ্ধ (খ) খানুয়ার যুদ্ধ (গ) কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ (ঘ) পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ
উত্তর: (গ) কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ

শের শাহ কৃষককে কী দিতেন?

(ক) জায়গির (খ) কবুলিয়ত (গ) পাট্টা (ঘ) মনসব
উত্তর: (গ) পাট্টা

'সড়ক-ই-আজম' কে নির্মাণ করান?

(ক) বাবর (খ) আকবর (গ) শের শাহ (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (গ) শের শাহ

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ কবে হয়েছিল?

(ক) ১৫২৬ খ্রি: (খ) ১৫৩৯ খ্রি: (গ) ১৫৫৬ খ্রি: (ঘ) ১৫৭৬ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৫৫৬ খ্রি:

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবরের প্রতিপক্ষ কে ছিলেন?

(ক) শের শাহ (খ) রানা প্রতাপ (গ) হিমু (ঘ) ইব্রাহিম লোদি
উত্তর: (গ) হিমু

হলদিঘাটির যুদ্ধ কবে হয়েছিল?

(ক) ১৫৫৬ খ্রি: (খ) ১৫৬৮ খ্রি: (গ) ১৫৭৬ খ্রি: (ঘ) ১৬০৫ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৫৭৬ খ্রি:

হলদিঘাটির যুদ্ধে মুঘলদের প্রধান সেনাপতি কে ছিলেন?

(ক) বৈরাম খান (খ) টোডরমল (গ) বীরবল (ঘ) মান সিংহ
উত্তর: (ঘ) মান সিংহ

আকবরের 'নবরত্ন' সভার একজন সদস্য কে ছিলেন?

(ক) বৈরাম খান (খ) আবুল ফজল (গ) হিমু (ঘ) মালিক অম্বর
উত্তর: (খ) আবুল ফজল

'আকবরনামা' কে রচনা করেন?

(ক) আবুল ফজল (খ) আবদুল কাদির বদাউনি (গ) বীরবল (ঘ) টোডরমল
উত্তর: (ক) আবুল ফজল

'বারো ভূঁইয়া' কাদের বলা হত?

(ক) রাজপুত জমিদারদের (খ) বাংলার জমিদারদের (গ) মারাঠা সর্দারদের (ঘ) আফগান নেতাদের
উত্তর: (খ) বাংলার জমিদারদের

কোন মুঘল সম্রাটের আমলে 'বারো ভূঁইয়া'দের দমন করা হয়?

(ক) আকবর (খ) জাহাঙ্গীর (গ) শাহ জাহান (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (খ) জাহাঙ্গীর

কোন মুঘল সম্রাট কান্দাহারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারান?

(ক) জাহাঙ্গীর (খ) শাহ জাহান (গ) ঔরঙ্গজেব (ঘ) আকবর
উত্তর: (খ) শাহ জাহান

ঔরঙ্গজেবের সময়ে জাঠ কৃষকরা কোথায় বিদ্রোহ করে?

(ক) পাঞ্জাব (খ) হরিয়ানা (গ) মথুরা (ঘ) বাংলা
উত্তর: (গ) মথুরা

আকবর কোন কর তুলে দেন?

(ক) খরাজ (খ) খামস (গ) জাকাত (ঘ) জিজিয়া
উত্তর: (ঘ) জিজিয়া

'ওয়াতন' কথাটির অর্থ কী?

(ক) জায়গির (খ) স্বদেশ বা নিজের এলাকা (গ) সাম্রাজ্য (ঘ) দুর্গ
উত্তর: (খ) স্বদেশ বা নিজের এলাকা

রাঠোর যুদ্ধ কার আমলে হয়েছিল?

(ক) আকবর (খ) জাহাঙ্গীর (গ) শাহ জাহান (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (ঘ) ঔরঙ্গজেব

আহমেদনগরের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

(ক) মালিক কাফুর (খ) মালিক অম্বর (গ) হিমু (ঘ) বৈরাম খান
উত্তর: (খ) মালিক অম্বর

কোন মুঘল বাদশাহ 'সুলহ-ই-কুল' নীতি গ্রহণ করেন?

(ক) বাবর (খ) হুমায়ুন (গ) আকবর (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (গ) আকবর

আকবরের প্রবর্তিত ব্যক্তিগত মতাদর্শের নাম কী ছিল?

(ক) তৌহিদ-ই-ইলাহি (খ) সুলহ-ই-কুল (গ) জাবতি (ঘ) মনসবদারি
উত্তর: (ক) তৌহিদ-ই-ইলাহি (দীন-ই-ইলাহি)

মুঘল আমলে প্রদেশগুলিকে কী বলা হত?

(ক) সরকার (খ) পরগনা (গ) ইকতা (ঘ) সুবা
উত্তর: (ঘ) সুবা

মনসবদারি ব্যবস্থা কে প্রবর্তন করেন?

(ক) শের শাহ (খ) আকবর (গ) জাহাঙ্গীর (ঘ) ঔরঙ্গজেব
উত্তর: (খ) আকবর

রাজস্বের বরাতকে মুঘল আমলে কী বলা হত?

(ক) ইকতা (খ) মনসব (গ) জায়গির (ঘ) ওয়াতন
উত্তর: (গ) জায়গির

আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থার নাম কী ছিল?

(ক) ইকতা ব্যবস্থা (খ) জাবতি বা দহসালা ব্যবস্থা (গ) পাট্টা ও কবুলিয়ত (ঘ) জায়গিরদারি ব্যবস্থা
উত্তর: (খ) জাবতি বা দহসালা ব্যবস্থা

আকবরের রাজস্বমন্ত্রী কে ছিলেন?

(ক) বীরবল (খ) আবুল ফজল (গ) বৈরাম খান (ঘ) টোডরমল
উত্তর: (ঘ) টোডরমল

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

মুঘলরা কাদের বংশধর ছিলেন?

মুঘলরা पितृपक्षে তুর্কি নেতা তৈমুর লঙ এবং মাতৃপক্ষে মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তবে তাঁরা নিজেদের তৈমুরের বংশধর হিসেবেই পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন।

মুঘলরা কেন নিজেদের বাদশাহ বলত?

মুঘলরা নিজেদের 'সুলতান'-এর পরিবর্তে 'বাদশাহ' বা 'পাদশাহ' বলত। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইত যে, তাদের শাসন করার ক্ষমতা সার্বভৌম এবং তারা অন্য কোনো শাসকের (যেমন খলিফা) অধীন নয়।

বাবরের ব্যবহৃত 'রুমি' কৌশলটি কী ছিল?

বাবরের ব্যবহৃত 'রুমি' কৌশলটি ছিল একটি উন্নত রণকৌশল। এতে একদিকে কামান ও বন্দুকধারী সৈন্য সামনে থেকে আক্রমণ করত এবং অন্যদিকে দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার তিরন্দাজ বাহিনী শত্রুকে দুই পাশ ও পেছন দিক থেকে ঘিরে ফেলত।

হুমায়ুন আফগানদের কাছে কেন হেরে গিয়েছিলেন?

হুমায়ুন আফগানদের কাছে হেরে গিয়েছিলেন কারণ, তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে সাহায্য করেনি এবং মুঘল অভিজাতদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। অন্যদিকে, শের খানের নেতৃত্বে আফগানরা অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল।

'পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত' কী?

শের শাহের ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায়, রাষ্ট্র কৃষকদের জমির উপর তাদের নাম, অধিকার ও দেয় রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখ করে যে দলিল দিত, তা হলো 'পাট্টা'। এর বিনিময়ে কৃষক রাজস্ব দেওয়ার কথা স্বীকার করে রাষ্ট্রকে যে দলিল দিত, তা হলো 'কবুলিয়ত'

আকবরের অভিভাবক কে ছিলেন?

আকবরের নাবালক অবস্থায় তাঁর অভিভাবক ছিলেন বৈরাম খান। তাঁর সহায়তায় আকবর পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভ করে মুঘল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।

আকবরের 'নবরত্ন' সভার কয়েকজনের নাম লেখো।

আকবরের নবরত্ন সভার কয়েকজন বিখ্যাত সদস্য ছিলেন—রাজা বীরবল, আবুল ফজল, রাজা টোডরমল, তানসেন এবং রাজা মান সিংহ।

ঔরঙ্গজেবের আমলে বিদ্রোহ করেছিল এমন দুটি কৃষক গোষ্ঠীর নাম লেখো।

ঔরঙ্গজেবের আমলে বিদ্রোহ করেছিল এমন দুটি কৃষক গোষ্ঠী হলো—মথুরার জাঠ কৃষক এবং হরিয়ানার সৎনামী কৃষক।

ওয়াতন জায়গির কী ছিল?

মুঘল আমলে রাজপুত মনসবদারদের নিজেদের এলাকা বা জন্মভূমিতে যে জায়গির দেওয়া হত, তাকে 'ওয়াতন জায়গির' বলা হত। এটি বংশানুক্রমিক ছিল, তবে বাদশাহের অনুমোদন সাপেক্ষ।

দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী?

ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ ২৫ বছরের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ (বিশেষ করে মারাঠাদের বিরুদ্ধে) মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থ ও সামরিক শক্তিকে बुरी तरह से नष्ट করে দেয়। এই অপূরণীয় ক্ষতিকেই 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' বলা হয়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ছিল।

সুলহ-ই-কুল কী?

'সুলহ-ই-কুল' কথার অর্থ হলো 'সকলের প্রতি সহনশীলতা' বা 'পরম শান্তি'। এটি ছিল আকবরের প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক আদর্শ, যার মূল কথা হলো, বাদশাহ কোনো বিশেষ ধর্ম বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে সকল প্রজার প্রতি পিতৃসুলভ ভালোবাসা ও সহনশীলতার সঙ্গে শাসন করবেন।

মনসবদারি ব্যবস্থা কী?

মনসবদারি ছিল আকবরের প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। 'মনসব' কথার অর্থ পদমর্যাদা। এই ব্যবস্থায় সামরিক ও অসামরিক কর্মচারীদের পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য ও ঘোড়া রাখতে হত এবং তার বিনিময়ে তারা নগদ বেতন বা জায়গির পেতেন।

জাবতি ব্যবস্থা কী?

আকবরের আমলে জমি জরিপ বা মাপার ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণ করার পদ্ধতিকে 'জাবতি ব্যবস্থা' বলা হত। এই ব্যবস্থায় জমির উর্বরতা এবং গত দশ বছরের গড় উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে রাজস্বের হার নির্ধারণ করা হত।

'দহসালা ব্যবস্থা' কে প্রবর্তন করেন?

মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমলের সহায়তায় ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে 'দহসালা ব্যবস্থা' (দশ বছরের গড় রাজস্ব ব্যবস্থা) প্রবর্তন করেন।

'বারো ভূঁইয়া'দের মধ্যে কয়েকজন নেতার নাম লেখো।

'বারো ভূঁইয়া'দের মধ্যে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন প্রতাপাদিত্য, চাঁদ রায়, কেদার রায় এবং ঈশা খান।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

শেরশাহর শাসন ব্যবস্থায় কী কী মানবিক চিন্তার পরিচয় তুমি পাও তা লেখো।

শের শাহের শাসনব্যবস্থা কেবল কঠোর ছিল না, এতে মানবিকতারও পরিচয় পাওয়া যায়।

  • কৃষকদের স্বার্থরক্ষা: তিনি 'পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত' প্রথার মাধ্যমে কৃষকদের জমির উপর অধিকারকে স্বীকৃতি দেন এবং দেয় রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেন। এর ফলে কৃষকরা রাজস্ব কর্মচারীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়।
  • জনকল্যাণমূলক কাজ: তিনি পথিক ও বণিকদের সুবিধার জন্য প্রতি দুই ক্রোশ অন্তর সরাইখানা নির্মাণ করেন, যেখানে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা ছিল। তিনি রাস্তা নির্মাণ (সড়ক-ই-আজম) এবং ডাক ব্যবস্থার উন্নতি ঘটান, যা সাধারণ মানুষের যোগাযোগকে সহজ করে তোলে।
  • দুর্ভিক্ষে সাহায্য: দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তিনি কৃষকদের ঋণ দিতেন এবং রাজস্ব মকুব করার ব্যবস্থাও রেখেছিলেন।
এই সমস্ত কার্যকলাপ প্রমাণ করে যে, শের শাহ কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, তিনি প্রজার মঙ্গলের কথাও ভাবতেন।

মুঘল শাসকদের রাজপুত নীতিতে কী কী মিল ও অমিল ছিল তা বিশ্লেষণ করো।

আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত মুঘলদের রাজপুত নীতিতে ধারাবাহিকতার পাশাপাশি কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়।
মিল:

  • সব মুঘল শাসকই রাজপুতদের সঙ্গে মিত্রতা বা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
  • আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহ জাহান এবং ঔরঙ্গজেব—সকলেই রাজপুতদের উচ্চ মনসব বা পদ দিয়ে প্রশাসনিক ও সামরিক কাজে নিযুক্ত করেছিলেন।
  • রাজপুতদের তাদের নিজস্ব রাজ্য বা 'ওয়াতন জায়গির'-এর উপর অধিকার বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
অমিল:
  • আকবর রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, জিজিয়া কর বাতিল করার মতো উদার নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
  • জাহাঙ্গীর ও শাহ জাহান মূলত আকবরের নীতিই অনুসরণ করেন।
  • কিন্তু ঔরঙ্গজেবের আমলে মারওয়াড়ের উত্তরাধিকার问题 নিয়ে রাজপুতদের সঙ্গে মুঘলদের সরাসরি संघर्ष ('রাঠোর যুদ্ধ') হয়। এছাড়াও, ঔরঙ্গজেব পুনরায় জিজিয়া কর আরোপ করেন, যা রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তবে, ঔরঙ্গজেবের আমলেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাজপুত মনসবদার ছিলেন।

দাক্ষিণাত্য অভিযানের ক্ষত মুঘল শাসনের উপর কী প্রভাব ফেলেছিল?

দাক্ষিণাত্য অভিযান, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের সময়ে, মুঘল শাসনের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, যা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' নামে পরিচিত।
প্রভাব:

  1. আর্থিক সংকট: দাক্ষিণাত্যে একটানা ২৫ বছরের যুদ্ধে মুঘল রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
  2. সামরিক দুর্বলতা: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বহু সৈন্য ও অভিজ্ঞ সেনাপতি মারা যান, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। ঔরঙ্গজেব নিজে দাক্ষিণাত্যে ব্যস্ত থাকায় উত্তর ভারতে বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।
  3. মনসবদারি সংকট: বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের পর নতুন দক্ষিণী অভিজাতদের মনসব দিতে গিয়ে জায়গিরের অভাব দেখা দেয়, যা অভিজাতদের মধ্যে অসন্তোষ ও সংঘাত বাড়িয়ে তোলে।
  4. মারাঠা শক্তির উত্থান: মুঘলরা মারাঠাদের পুরোপুরি দমন করতে ব্যর্থ হয়। বরং এই দীর্ঘ যুদ্ধ মারাঠাদের আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, যারা পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
এই ক্ষত মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

মুঘল সম্রাটদের কি কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতি ছিল? উত্তরাধিকারের বিষয়টি কেমনভাবে তাঁদের শাসনকে প্রভাবিত করেছিল?

না, মুঘলদের কোনো নির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার নীতি ছিল না, যেমন জ্যেষ্ঠ পুত্রই সিংহাসনে বসবেন। তাঁরা মূলত তৈমুরীয় প্রথা অনুসরণ করতেন, যেখানে সমস্ত পুত্রদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়ার রীতি ছিল। কিন্তু ভারতে তাঁরা এই নীতি পুরোপুরি মানেননি।
প্রভাব:

  1. উত্তরাধিকার যুদ্ধ: কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় প্রত্যেক সম্রাটের মৃত্যুর পর বা এমনকি তাঁর জীবিত অবস্থাতেই পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন দখলের জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হত। যেমন, শাহ জাহানের পুত্রদের মধ্যে দারাশিকোহ, সুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল।
  2. রাজনৈতিক অস্থিরতা: এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের ফলে সাম্রাজ্যে বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হত। অভিজাতরা বিভিন্ন শাহজাদার পক্ষ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতেন, যা প্রশাসনের ঐক্য নষ্ট করত।
  3. অর্থনৈতিক ক্ষতি: উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধে প্রচুর অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় হত, যা সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিত।
যদিও এই ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক ছিল যে, শুধুমাত্র যোগ্যতম ও শক্তিশালী ব্যক্তিই সম্রাট হতে পারতেন। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবই ছিল বেশি, যা সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করত।

আকবরের মনসবদারি ও জায়গিরদারি ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

আকবরের প্রবর্তিত মনসবদারি ও জায়গিরদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল প্রশাসনের মূল ভিত্তি।
মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:

  1. 'মনসব' শব্দের অর্থ: 'মনসব' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পদমর্যাদা। এটি ছিল একটি প্রশাসনিক পদ।
  2. 'জাত' ও 'সওয়ার': প্রত্যেক মনসবদারের দুটি পদমর্যাদা থাকত—'জাত' (ব্যক্তিগত পদমর্যাদা ও বেতন) এবং 'সওয়ার' (যে পরিমাণ অশ্বারোহী সৈন্য রাখতে হবে)।
  3. নিয়োগ ও পদোন্নতি: মনসবদারদের সরাসরি বাদশাহ নিয়োগ করতেন এবং তাঁদের পদোন্নতিও বাদশাহের ইচ্ছার উপর নির্ভর করত।
জায়গিরদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:
  1. বেতন প্রথা: মনসবদারদের বেতন নগদ অর্থে অথবা রাজস্ব বরাদ্দের মাধ্যমে দেওয়া হত। এই রাজস্ব বরাদ্দকেই 'জায়গির' বলা হত।
  2. জায়গিরদারের দায়িত্ব: জায়গিরদাররা তাঁদের জায়গির থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতেন। সেই অর্থ থেকে তাঁরা নিজেদের ও সৈন্যদের বেতন দিয়ে বাকিটা (ফওয়াজিল) রাজকোষে জমা দিতেন।
  3. অ-বংশানুক্রমিক ও বদলিযোগ্য: জায়গিরদারি ব্যবস্থা বংশানুক্রমিক ছিল না এবং জায়গিরদারদের নিয়মিত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বদলি করা হত, যাতে তাঁরা কোনো অঞ্চলে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারেন।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৮৯-৯০)

১। শূন্যস্থান পূরণ করো:

ক) ঘর্ঘরার যুদ্ধে বাবরের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন- নসরৎ শাহ

খ) বিলগ্রামের যুদ্ধ হয়েছিল ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে।

গ) জাহাঙ্গিরের আমলে শিখ গুরু অর্জুন-কে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়।

ঘ) রাজপুত নেতাদের মধ্যে মুঘল সম্রাটদের সঙ্গে জোট বাঁধেননি রানা- প্রতাপসিংহ

ঙ) আহমেদনগরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মালিক অম্বর

২। নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে তার নীচের কোন ব্যাখ্যাটি তোমার সবচেয়ে মানানসই বলে মনে হয়?

(ক) বিবৃতি: মুঘলরা তৈমুরের বংশধর হিসাবে গর্ব করত।
ব্যাখ্যা-২: তৈমুর এক সময় উত্তর ভারত আক্রমণ করে দিল্লি দখল করেছিলেন।

(খ) বিবৃতি: হুমায়ুনকে এক সময় ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।
ব্যাখ্যা-২: তিনি শের খানের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন।

(গ) বিবৃতি: মহেশ দাসের নাম হয়েছিল বীরবল।
ব্যাখ্যা-২: তিনি খুব বুদ্ধিমান ছিলেন।

(ঘ) বিবৃতি: ঔরঙ্গজেবের আমলে বাংলায় সামুদ্রিক বাণিজ্যের উন্নতি হয়।
ব্যাখ্যা-১: তিনি পোর্তুগিজ জলদস্যুদের হারিয়েছিলেন।

(ঙ) বিবৃতি: আকবরের আমলে জমি জরিপের পদ্ধতিকে বলা হতো জাবতি।
ব্যাখ্যা-৩: জাবত মানে জমির রাজস্ব নির্ধারণ করা।

৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও:

ক) মুঘলরা কেন নিজেদের বাদশাহ বলতো?

মুঘলরা নিজেদের 'সুলতান'-এর পরিবর্তে 'বাদশাহ' বা 'পাদশাহ' বলত। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইত যে, তাদের শাসন করার ক্ষমতা সার্বভৌম এবং তারা অন্য কোনো শাসকের (যেমন খলিফা) অধীন নয়। এই উপাধি তাদের স্বাধীন ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করত।

খ) হুমায়ুন আফগানদের কাছে কেন হেরে গিয়েছিলেন?

হুমায়ুন আফগানদের কাছে হেরে গিয়েছিলেন কারণ, তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে সাহায্য করেনি এবং মুঘল অভিজাতদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। অন্যদিকে, শের খানের নেতৃত্বে আফগানরা অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল এবং শের খান ছিলেন একজন সুযোগ্য সেনাপতি।

গ) ঔরঙ্গজেবের রাজত্বে মুঘল অভিজাতদের মধ্যে রেষারেষি বেড়েছিল কেন?

ঔরঙ্গজেবের রাজত্বে দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের ফলে বহু দক্ষিণী মুসলিম ও মারাঠা অভিজাত মুঘল প্রশাসনে যোগ দেয়। এর ফলে মনসবদারের সংখ্যা enormously বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় জায়গিরের সংখ্যা কম ছিল। ভালো জায়গির পাওয়ার জন্য পুরোনো ও নতুন অভিজাতদের মধ্যে রেষারেষি বাড়ে।

ঘ) সুলহ-ই-কুল কী?

'সুলহ-ই-কুল' কথার অর্থ হলো 'সকলের প্রতি সহনশীলতা' বা 'পরম শান্তি'। এটি ছিল আকবরের প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক আদর্শ, যার মূল কথা হলো, বাদশাহ কোনো বিশেষ ধর্ম বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে সকল প্রজার প্রতি পিতৃসুলভ ভালোবাসা ও সহনশীলতার সঙ্গে শাসন করবেন।

ঙ) মুঘল শাসন ব্যবস্থায় সুবা প্রশাসনের পরিচয় দাও।

আকবর তাঁর সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বা 'সুবায়' ভাগ করেন। প্রতিটি সুবার দায়িত্বে থাকতেন একজন 'সুবাদার'। তাঁকে সাহায্য করার জন্য থাকতেন 'দেওয়ান' (রাজস্ব), 'বক্সি' (সামরিক), 'সদর' (ধর্মীয়) এবং 'কাজি' (বিচার) প্রমুখ কর্মচারীরা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসনকে প্রদেশের উপর কার্যকর করা হত।

৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)

(ক) পানিপতের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ ও ঘর্ঘরার যুদ্ধের মধ্যে তুলনা করো। পানিপতের প্রথম যুদ্ধে যদি মুঘলরা জয়ী না হতো তাহলে উত্তর ভারতে কারা শাসন করতো?

এই তিনটি যুদ্ধই ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। পানিপতের প্রথম যুদ্ধে (১৫২৬) বাবর দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে আফগান শক্তিকে দুর্বল করেন। খানুয়ার যুদ্ধে (১৫২৭) তিনি মেওয়ারের রানা সংগ্রাম সিংহের নেতৃত্বে রাজপুত জোটকে পরাজিত করে উত্তর ভারতে তাঁর ক্ষমতাকে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন করেন। ঘর্ঘরার যুদ্ধে (১৫২৯) তিনি বাংলার শাসক নসরৎ শাহের সহায়তায় সংগঠিত অবশিষ্ট আফগান শক্তিকে পরাজিত করেন।
পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মুঘলরা জয়ী না হলে সম্ভবত লোদি বংশের আফগান শাসনই উত্তর ভারতে চলতে থাকত অথবা আফগানদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রানা সংগ্রাম সিংহের নেতৃত্বে রাজপুতরা দিল্লিতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত।

(খ) শেরশাহর শাসন ব্যবস্থায় কী কী মানবিক চিন্তার পরিচয় তুমি পাও তা লেখো।

শের শাহের শাসনব্যবস্থা কেবল কঠোর ছিল না, এতে মানবিকতারও পরিচয় পাওয়া যায়।

  • কৃষকদের স্বার্থরক্ষা: তিনি 'পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত' প্রথার মাধ্যমে কৃষকদের জমির উপর অধিকারকে স্বীকৃতি দেন এবং দেয় রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেন। এর ফলে কৃষকরা রাজস্ব কর্মচারীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়।
  • জনকল্যাণমূলক কাজ: তিনি পথিক ও বণিকদের সুবিধার জন্য প্রতি দুই ক্রোশ অন্তর সরাইখানা নির্মাণ করেন, যেখানে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা ছিল। তিনি রাস্তা নির্মাণ (সড়ক-ই-আজম) এবং ডাক ব্যবস্থার উন্নতি ঘটান, যা সাধারণ মানুষের যোগাযোগকে সহজ করে তোলে।
  • দুর্ভিক্ষে সাহায্য: দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তিনি কৃষকদের ঋণ দিতেন এবং রাজস্ব মকুব করার ব্যবস্থাও রেখেছিলেন।
এই সমস্ত কার্যকলাপ প্রমাণ করে যে, শের শাহ কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, তিনি প্রজার মঙ্গলের কথাও ভাবতেন।

(গ) মুঘল শাসকদের রাজপুত নীতিতে কী কী মিল ও অমিল ছিল তা বিশ্লেষণ করো।

আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত মুঘলদের রাজপুত নীতিতে ধারাবাহিকতার পাশাপাশি কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়।
মিল:

  • সব মুঘল শাসকই রাজপুতদের সঙ্গে মিত্রতা বা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
  • আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহ জাহান এবং ঔরঙ্গজেব—সকলেই রাজপুতদের উচ্চ মনসব বা পদ দিয়ে প্রশাসনিক ও সামরিক কাজে নিযুক্ত করেছিলেন।
  • রাজপুতদের তাদের নিজস্ব রাজ্য বা 'ওয়াতন জায়গির'-এর উপর অধিকার বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
অমিল:
  • আকবর রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, জিজিয়া কর বাতিল করার মতো উদার নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
  • জাহাঙ্গীর ও শাহ জাহান মূলত আকবরের নীতিই অনুসরণ করেন।
  • কিন্তু ঔরঙ্গজেবের আমলে মারওয়াড়ের উত্তরাধিকার問題 নিয়ে রাজপুতদের সঙ্গে মুঘলদের সরাসরি संघर्ष ('রাঠোর যুদ্ধ') হয়। এছাড়াও, ঔরঙ্গজেব পুনরায় জিজিয়া কর আরোপ করেন, যা রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তবে, ঔরঙ্গজেবের আমলেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাজপুত মনসবদার ছিলেন।

(ঘ) দাক্ষিণাত্য অভিযানের ক্ষত মুঘল শাসনের উপর কী প্রভাব ফেলেছিল?

দাক্ষিণাত্য অভিযান, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের সময়ে, মুঘল শাসনের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, যা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' নামে পরিচিত।
প্রভাব:

  1. আর্থিক সংকট: দাক্ষিণাত্যে একটানা ২৫ বছরের যুদ্ধে মুঘল রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
  2. সামরিক দুর্বলতা: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বহু সৈন্য ও অভিজ্ঞ সেনাপতি মারা যান, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। ঔরঙ্গজেব নিজে দাক্ষিণাত্যে ব্যস্ত থাকায় উত্তর ভারতে বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।
  3. মনসবদারি সংকট: বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের পর নতুন দক্ষিণী অভিজাতদের মনসব দিতে গিয়ে জায়গিরের অভাব দেখা দেয়, যা অভিজাতদের মধ্যে অসন্তোষ ও সংঘাত বাড়িয়ে তোলে।
  4. মারাঠা শক্তির উত্থান: মুঘলরা মারাঠাদের পুরোপুরি দমন করতে ব্যর্থ হয়। বরং এই দীর্ঘ যুদ্ধ মারাঠাদের আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, যারা পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
এই ক্ষত মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

(ঙ) মুঘল সম্রাটদের কি কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতি ছিল? উত্তরাধিকারের বিষয়টি কেমনভাবে তাঁদের শাসনকে প্রভাবিত করেছিল?

না, মুঘলদের কোনো নির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার নীতি ছিল না, যেমন জ্যেষ্ঠ পুত্রই সিংহাসনে বসবেন। তাঁরা মূলত তৈমুরীয় প্রথা অনুসরণ করতেন, যেখানে সমস্ত পুত্রদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়ার রীতি ছিল। কিন্তু ভারতে তাঁরা এই নীতি পুরোপুরি মানেননি।
প্রভাব:

  1. উত্তরাধিকার যুদ্ধ: কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় প্রত্যেক সম্রাটের মৃত্যুর পর বা এমনকি তাঁর জীবিত অবস্থাতেই পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন দখলের জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হত। যেমন, শাহ জাহানের পুত্রদের মধ্যে দারাশিকোহ, সুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল।
  2. রাজনৈতিক অস্থিরতা: এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের ফলে সাম্রাজ্যে বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হত। অভিজাতরা বিভিন্ন শাহজাদার পক্ষ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতেন, যা প্রশাসনের ঐক্য নষ্ট করত।
  3. অর্থনৈতিক ক্ষতি: উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধে প্রচুর অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় হত, যা সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিত।
যদিও এই ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক ছিল যে, শুধুমাত্র যোগ্যতম ও শক্তিশালী ব্যক্তিই সম্রাট হতে পারতেন। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবই ছিল বেশি, যা সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করত।