অধ্যায় ৪: দিল্লি সুলতানি: তুর্কো–আফগান শাসন

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ভারতে এক নতুন ধরনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দিল্লি সুলতানি নামে পরিচিত। প্রায় ৩২০ বছর ধরে (১২০৬-১৫২৬ খ্রিঃ) দিল্লিকে কেন্দ্র করে তুর্কি ও আফগান সুলতানরা শাসন করেন। এই অধ্যায়ে সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতন এবং তাঁদের শাসনব্যবস্থার নানা দিক আলোচনা করা হয়েছে।

  • প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন রাজবংশ: ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে সুলতানি শাসনের সূচনা করেন। এরপর একে একে পাঁচটি রাজবংশ দিল্লি শাসন করে: দাস বা মামলুক বংশ, খলজি বংশ, তুঘলক বংশ, সৈয়দ বংশ এবং লোদি বংশ।
  • গুরুত্বপূর্ণ সুলতান ও তাঁদের কার্যকলাপ:
    • ইলতুৎমিস: সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি 'ইকতা' ব্যবস্থা চালু করেন এবং 'টংকা' ও 'জিতল' মুদ্রা প্রবর্তন করেন।
    • রাজিয়া: দিল্লির প্রথম ও একমাত্র নারী সুলতান।
    • গিয়াসউদ্দিন বলবন: সুলতানের ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং 'সিজদা' ও 'পাইবস' প্রথা চালু করেন।
    • আলাউদ্দিন খলজি: বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি এবং 'দাগ' ও 'হুলিয়া' ব্যবস্থার মাধ্যমে সামরিক সংস্কার করেন। তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর দাক্ষিণাত্য জয় করেন।
    • মুহাম্মদ বিন তুঘলক: রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) স্থানান্তর, তামার প্রতীকী মুদ্রা প্রচলন ইত্যাদি বিতর্কিত পরিকল্পনার জন্য তিনি ইতিহাসে পরিচিত।
  • শাসনব্যবস্থা: সুলতানরা নিজেদের 'খলিফার প্রতিনিধি' বললেও বাস্তবে স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বা 'ইকতা'-তে ভাগ করা হত। ইকতার দায়িত্বে থাকা শাসকরা 'মুক্তি' বা 'ওয়ালি' নামে পরিচিত ছিলেন।
  • দক্ষিণ ভারতে বিস্তার ও সংকট: আলাউদ্দিন খলজির সময় থেকে দাক্ষিণাত্যে সুলতানি আধিপত্য বাড়তে থাকে। কিন্তু মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সময় বিজয়নগর ও বাহমনি নামে দুটি নতুন স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটলে দাক্ষিণাত্যে সুলতানির ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • সুলতানির পতন: ফিরোজশাহ তুঘলকের পর থেকে সুলতানি শাসন দুর্বল হতে থাকে। তৈমুর লঙের আক্রমণ এবং লোদি বংশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং দিল্লি সুলতানির অবসান ঘটান।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
১২০৬কুতুবউদ্দিন আইবকের সিংহাসন লাভ ও দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা।
১২১০কুতুবউদ্দিন আইবকের মৃত্যু।
১২১১-১২৩৬সুলতান ইলতুৎমিসের শাসনকাল।
১২৩৬-১২৪০সুলতান রাজিয়ার শাসনকাল।
১২৬৬-১২৮৭সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনকাল।
১২৯০খলজি বংশের প্রতিষ্ঠা।
১২৯৬-১৩১৬সুলতান আলাউদ্দিন খলজির শাসনকাল।
১৩২০তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠা।
১৩২৫-১৩৫১সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকাল।
১৩২৭মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তর।
১৩৯৮তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণ।
১৪৫১লোদি বংশের প্রতিষ্ঠা।
১৫২৬পানিপথের প্রথম যুদ্ধ এবং দিল্লি সুলতানির অবসান।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

(ক) ইলতুৎমিস (খ) মহম্মদ ঘুরি (গ) কুতুবউদ্দিন আইবক (ঘ) গিয়াসউদ্দিন বলবন
উত্তর: (গ) কুতুবউদ্দিন আইবক

'সুলতান' শব্দটি কোন ভাষার?

(ক) ফারসি (খ) তুর্কি (গ) আরবি (ঘ) উর্দু
উত্তর: (গ) আরবি

ইলতুৎমিস কোন খলিফার থেকে অনুমোদন লাভ করেন?

(ক) দামাস্কাসের (খ) কায়রোর (গ) বাগদাদের (ঘ) কনস্টান্টিনোপলের
উত্তর: (গ) বাগদাদের

দিল্লি সুলতানির প্রথম রাজবংশ কোনটি?

(ক) খলজি (খ) তুঘলক (গ) লোদি (ঘ) দাস বা মামলুক
উত্তর: (ঘ) দাস বা মামলুক

দিল্লি সুলতানির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কাকে বলা হয়?

(ক) কুতুবউদ্দিন আইবক (খ) রাজিয়া (গ) ইলতুৎমিস (ঘ) বলবন
উত্তর: (গ) ইলতুৎমিস

ইলতুৎমিসের মুদ্রা ব্যবস্থা কী কী নামে পরিচিত ছিল?

(ক) দিনার ও দিরহাম (খ) টাকা ও রুপি (গ) টংকা ও জিতল (ঘ) মোহর ও দাম
উত্তর: (গ) টংকা ও জিতল

'বন্দিগান-ই-চিহলগানি' বা চল্লিশ চক্র কে চালু করেন?

(ক) কুতুবউদ্দিন আইবক (খ) ইলতুৎমিস (গ) রাজিয়া (ঘ) বলবন
উত্তর: (খ) ইলতুৎমিস

দিল্লির প্রথম ও একমাত্র মহিলা সুলতান কে ছিলেন?

(ক) নূরজাহান (খ) মমতাজ মহল (গ) চাঁদবিবি (ঘ) রাজিয়া
উত্তর: (ঘ) রাজিয়া

রাজিয়ার शासनकाल কতদিন স্থায়ী ছিল?

(ক) প্রায় আড়াই বছর (খ) প্রায় সাড়ে তিন বছর (গ) প্রায় পাঁচ বছর (ঘ) প্রায় দশ বছর
উত্তর: (খ) প্রায় সাড়ে তিন বছর

'সিজদা' ও 'পাইবস' প্রথা কে চালু করেন?

(ক) ইলতুৎমিস (খ) আলাউদ্দিন খলজি (গ) গিয়াসউদ্দিন বলবন (ঘ) ফিরোজ শাহ তুঘলক
উত্তর: (গ) গিয়াসউদ্দিন বলবন

'খলজি বিপ্লব' কবে ঘটেছিল?

(ক) ১২০৬ খ্রি: (খ) ১২৩৬ খ্রি: (গ) ১২৯০ খ্রি: (ঘ) ১২৯৬ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১২৯০ খ্রি:

খলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?

(ক) আলাউদ্দিন খলজি (খ) জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি (গ) মালিক কাফুর (ঘ) কুতুবউদ্দিন মুবারক খলজি
উত্তর: (খ) জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি

আলাউদ্দিন খলজির দক্ষিণ ভারত অভিযানের নেতৃত্ব কে দেন?

(ক) উলুগ খান (খ) জাফর খান (গ) মালিক কাফুর (ঘ) খিজির খান
উত্তর: (গ) মালিক কাফুর

'দাগ' ও 'হুলিয়া' ব্যবস্থা কে প্রবর্তন করেন?

(ক) বলবন (খ) ইলতুৎমিস (গ) আলাউদ্দিন খলজি (ঘ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক
উত্তর: (গ) আলাউদ্দিন খলজি

কোন সুলতান রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তরিত করেন?

(ক) আলাউদ্দিন খলজি (খ) গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (গ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক (ঘ) ফিরোজ শাহ তুঘলক
উত্তর: (গ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক

কোন সুলতান প্রতীকী মুদ্রা বা টোকেন কারেন্সি চালু করেন?

(ক) ইলতুৎমিস (খ) বলবন (গ) আলাউদ্দিন খলজি (ঘ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক
উত্তর: (ঘ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক

ইবন বতুতা কোন দেশ থেকে ভারতে আসেন?

(ক) পারস্য (খ) তুরস্ক (গ) মিশর (ঘ) মরক্কো
উত্তর: (ঘ) মরক্কো

ইবন বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্তের নাম কী?

(ক) কিতাব-অল-হিন্দ (খ) অল-রিহলা (গ) তারিখ-ই-ফিরোজ শাহি (ঘ) শাহনামা
উত্তর: (খ) অল-রিহলা

'তারিখ-ই-ফিরোজ শাহি' গ্রন্থের লেখক কে?

(ক) আমির খসরু (খ) জিয়াউদ্দিন বরনি (গ) মিনহাজ-ই সিরাজ (ঘ) ইবন বতুতা
উত্তর: (খ) জিয়াউদ্দিন বরনি

কোন সুলতান ব্রাহ্মণদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেন?

(ক) আলাউদ্দিন খলজি (খ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক (ঘ) সিকন্দর লোদি
উত্তর: (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক

তৈমুর লঙ কবে ভারত আক্রমণ করেন?

(ক) ১৩২৬ খ্রি: (খ) ১৩৫১ খ্রি: (গ) ১৩৯৮ খ্রি: (ঘ) ১৪১৪ খ্রি:
উত্তর: (গ) ১৩৯৮ খ্রি:

সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?

(ক) मुबारक शाह (খ) खिजिर खान (গ) बहलोल लोदी (ঘ) मुहम्मद शाह
उत्तर: (ख) खिजिर खान

দিল্লি সুলতানির শেষ রাজবংশ কোনটি ছিল?

(ক) তুঘলক (খ) খলজি (গ) সৈয়দ (ঘ) লোদি
উত্তর: (ঘ) লোদি

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কবে হয়েছিল?

(ক) ১৫২৬ খ্রি: (খ) ১৫২৭ খ্রি: (গ) ১২০৬ খ্রি: (ঘ) ১৩৯৮ খ্রি:
উত্তর: (ক) ১৫২৬ খ্রি:

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির প্রতিপক্ষ কে ছিলেন?

(ক) তৈমুর লঙ (খ) বাবর (গ) আকবর (ঘ) শের শাহ
উত্তর: (খ) বাবর

সুলতানি আমলে প্রদেশের শাসনকর্তাকে কী বলা হত?

(ক) উজির (খ) কাজি (গ) মুক্তি বা ওয়ালি (ঘ) আমির
উত্তর: (গ) মুক্তি বা ওয়ালি

বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্য কোন সুলতানের আমলে স্বাধীন হয়?

(ক) আলাউদ্দিন খলজি (খ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক (ঘ) গিয়াসউদ্দিন বলবন
উত্তর: (খ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক

কুতুব মিনারের নির্মাণकार्य কে শুরু করেন?

(ক) ইলতুৎমিস (খ) কুতুবউদ্দিন আইবক (গ) বলবন (ঘ) আলাউদ্দিন খলজি
উত্তর: (খ) কুতুবউদ্দিন আইবক

কুতুব মিনারের নির্মাণकार्य কে শেষ করেন?

(ক) কুতুবউদ্দিন আইবক (খ) রাজিয়া (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক (ঘ) ইলতুৎমিস
উত্তর: (ঘ) ইলতুৎমিস

বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান কে ছিলেন?

(ক) গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (খ) আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (গ) শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ (ঘ) রাজা গণেশ
উত্তর: (গ) শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

দিল্লি সুলতানি শাসন কত বছর স্থায়ী হয়েছিল?

দিল্লি সুলতানি শাসন ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৩২০ বছর স্থায়ী হয়েছিল।

দিল্লি সুলতানির পাঁচটি রাজবংশের নাম লেখো।

দিল্লি সুলতানির পাঁচটি রাজবংশ হলো—দাস বংশ, খলজি বংশ, তুঘলক বংশ, সৈয়দ বংশ এবং লোদি বংশ।

'সুলতান' কথার অর্থ কী?

'সুলতান' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা। দিল্লির শাসকরা নিজেদের সুলতান বলে পরিচয় দিতেন।

ইকতা ব্যবস্থা কী?

ইকতা ব্যবস্থা হলো সুলতান ইলতুৎমিসের প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক ও রাজস্ব ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বা ইকতায় ভাগ করা হত। প্রতিটি ইকতার দায়িত্বে থাকা মুক্তিরা রাজস্ব আদায় করতেন এবং সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের ও সৈন্যবাহিনীর খরচ চালিয়ে বাকিটা সুলতানকে পাঠাতেন।

চল্লিশ চক্র কী?

সুলতান ইলতুৎমিসের চল্লিশজন তুর্কি ক্রীতদাস বা বান্দাকে নিয়ে 'বন্দেগান-ই-চিহলগানি' বা 'চল্লিশ চক্র' গঠিত হয়েছিল। এরা অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিজাত গোষ্ঠী ছিল এবং সুলতানের পরেই এদের ক্ষমতা ছিল।

রাজিয়ার পতনের দুটি কারণ লেখো।

রাজিয়ার পতনের দুটি প্রধান কারণ হলো: (১) তিনি নারী হওয়ায় তুর্কি আমির-ওমরাহরা তাঁর শাসন মেনে নিতে পারেননি; এবং (২) তিনি অ-তুর্কি অভিজাতদের গুরুত্ব দেওয়ায় তুর্কি অভিজাতরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।

আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতির উদ্দেশ্য কী ছিল?

আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল কম খরচে একটি বিশাল সেনাবাহিনী পোষণ করা। তিনি সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেঁধে দেন, যাতে সেনারা তাদের সীমিত বেতনে জীবনধারণ করতে পারে।

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দুটি বিতর্কিত পরিকল্পনার নাম লেখো।

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দুটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হলো: (১) রাজধানী দিল্লি থেকে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) স্থানান্তর; এবং (২) সোনা ও রুপোর মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীকী তামার মুদ্রা প্রচলন।

দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে কী বোঝায়?

মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মতো, সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দাক্ষিণাত্য নীতিও শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের ক্ষতির কারণ হয়েছিল। দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহ দমন এবং শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সুলতানি সাম্রাজ্যের অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষয় হয়, যা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' নামে পরিচিত।

দিল্লি সুলতানির পতনের দুটি কারণ লেখো।

দিল্লি সুলতানির পতনের দুটি প্রধান কারণ হলো: (১) ফিরোজ শাহ তুঘলকের পরবর্তী সুলতানদের দুর্বলতা এবং অযোগ্যতা; এবং (২) ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণ, যা সুলতানির কেন্দ্রীয় শক্তিকে完全に ধ্বংস করে দেয়।

খুতবা পাঠ কী?

খুতবা হলো একটি ভাষণ। প্রতি শুক্রবার জোহরের নামাজের পর মসজিদে ইমাম সমবেত মুসলিমদের উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিতেন, তাতে সমকালীন খলিফা ও সুলতানের নাম উল্লেখ করা হত। এটি ছিল সুলতানের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

জিজিয়া কর কী?

জিজিয়া ছিল সুলতানি আমলে অ-মুসলিম প্রজাদের উপর ধার্য করা একটি নিরাপত্তামূলক কর। এই করের বিনিময়ে অ-মুসলিম প্রজাদের জীবন, সম্পত্তি এবং ধর্ম পালনের অধিকারকে রাষ্ট্র রক্ষা করত।

বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কারা?

পুরাণ অনুযায়ী, সঙ্গম নামের এক ব্যক্তির দুই পুত্র, প্রথম হরিহর ও বুক্ক, ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে বিজয়নগর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

বাহমনি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

আলাউদ্দিন হাসান বাহমন শাহ (হাসান গঙ্গু) ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে বাহমনি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

তালিকোটার যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল?

১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগর সাম্রাজ্য এবং দাক্ষিণাত্যের চারটি সুলতানি রাজ্যের (বিজাপুর, গোলকোন্ডা, আহমেদনগর, বিদর) সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে তালিকোটার যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে বিজয়নগর পরাজিত হয়।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

সুলতান ইলতুৎমিসকে দিল্লি সুলতানির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন?

কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা করলেও, ইলতুৎমিসই এর ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। একারণে তাঁকেই প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।
কারণ:

  1. বিদ্রোহ দমন ও রাজ্য রক্ষা: তিনি সিংহাসনে বসে প্রথমে অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী আমিরদের দমন করেন এবং মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খানের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন।
  2. শাসনব্যবস্থার সংগঠন: তিনি 'ইকতা' ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজস্ব কাঠামোকে একটি নির্দিষ্ট রূপ দেন।
  3. মুদ্রা ব্যবস্থা: তিনি খাঁটি রুপোর 'টংকা' এবং তামার 'জিতল' মুদ্রা চালু করে সুলতানির একটি নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
  4. খলিফার অনুমোদন: তিনি বাগদাদের খলিফার কাছ থেকে 'সুলতান-ই-আজম' উপাধি লাভ করে তাঁর শাসনকে ইসলামীয় বিশ্বে বৈধতা দেন।
এই সমস্ত কাজের মাধ্যমে ইলতুৎমিস একটি অসংগঠিত রাজ্যকে একটি সুসংহত সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।

আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্কারগুলি আলোচনা করো।

সুলতান আলাউদ্দিন খলজি তাঁর সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করার জন্য যুগান্তকারী অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্কার করেছিলেন।
অর্থনৈতিক সংস্কার: এর মূল ছিল তাঁর 'বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি'। মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য একটি বিশাল সেনাবাহিনী পোষণের প্রয়োজন ছিল। সেনাদের কম বেতনে সন্তুষ্ট রাখতে তিনি সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন—খাদ্যশস্য, কাপড়, ঘোড়া, গবাদি পশু ইত্যাদির দাম নির্দিষ্ট করে দেন। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তিনি 'শাহানা-ই-মান্ডি' নামক রাজকর্মচারী নিয়োগ করেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেন।
সামরিক সংস্কার:

  1. স্থায়ী সেনাবাহিনী: তিনি প্রথম একজন সুলতান যিনি একটি বিশাল, স্থায়ী ও নগদ বেতনের সেনাবাহিনী গঠন করেন।
  2. দাগ ও হুলিয়া: সেনাবাহিনীতে দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য তিনি ঘোড়ার গায়ে ছাপ দেওয়ার প্রথা ('দাগ') এবং সৈন্যদের দৈহিক বিবরণের নথি রাখার প্রথা ('হুলিয়া') চালু করেন।
এই সংস্কারগুলির ফলে আলাউদ্দিনের পক্ষে মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সাম্রাজ্য বিস্তার করা সম্ভব হয়েছিল।

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনাগুলি কেন ব্যর্থ হয়েছিল? এর জন্য কি তাঁকে 'পাগলা রাজা' বলা যুক্তিসঙ্গত?

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনাগুলি ছিল যুগোপযোগী কিন্তু সেগুলি বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও সময়ের ভুলের কারণে ব্যর্থ হয়।
ব্যর্থতার কারণ:

  1. রাজধানী স্থানান্তর: দাক্ষিণাত্যে بهتر নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজধানী দৌলতাবাদে স্থানান্তর একটি ভালো পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু দিল্লির সমস্ত অধিবাসীকে জোর করে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা এবং গ্রীষ্মকালে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অবাস্তব ছিল।
  2. প্রতীকী মুদ্রা:ทั่วโลก রুপোর ঘাটতির কারণে প্রতীকী মুদ্রা প্রচলনের ধারণাটি আধুনিক হলেও, মুদ্রা তৈরির উপর রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বহু জাল মুদ্রা তৈরি হয়, যা অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
তাঁকে 'পাগলা রাজা' বলা পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত নয়। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনি তাঁর সমসাময়িক হওয়ায় তাঁর সমালোচনা হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনাগুলির পিছনে সুচিন্তিত কারণ ছিল, কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ধৈর্য্যের অভাব এবং পরিকল্পনা রূপায়ণের ত্রুটির জন্যই সেগুলি ব্যর্থ হয়। তাই তাঁকে 'ভাগ্যহীন আদর্শবাদী' বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের মধ্যে সংঘর্ষের কারণগুলি কী ছিল?

বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের মধ্যে সংঘর্ষের প্রধান কারণগুলি ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়।

  1. রায়চুর দোয়াব দখল: কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর 'রায়চুর দোয়াব' অঞ্চলটি উভয় রাজ্যের কাছেই অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই অঞ্চলটি দখলের জন্য তাদের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ হত।
  2. খনিজ সম্পদের অধিকার: গোলকোন্ডা অঞ্চলের হিরের খনিগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও তাদের সংঘর্ষের অন্যতম কারণ ছিল।
  3. বাণিজ্যিক প্রতিপত্তি: গোয়া, চৌল, ডাবুলের মতো পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলির মাধ্যমে যে বৈদেশিক বাণিজ্য চলত, তার উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করার জন্যও উভয় রাজ্য একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থাকত।
  4. রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: উভয় রাজ্যই দাক্ষিণাত্যে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যা তাদের মধ্যেকার সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি আমলে বাংলার সংস্কৃতির পরিচয় দাও।

ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি আমলে (চতুর্দশ-ষোড়শ শতক) বাংলার সুলতানরা দিল্লির সুলতানি থেকে স্বাধীনভাবে শাসন করতেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সময়কে 'বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি' গড়ে ওঠার যুগ বলা হয়।

  • ভাষা ও সাহিত্য: এই যুগের সুলতানরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের উৎসাহে কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ এবং মালাধর বসু 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কাব্য বাংলায় অনুবাদ করেন। এটি বাংলা সাহিত্যের বিকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
  • ধর্মীয় উদারতা: সুলতানরা, বিশেষ করে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শ্রীচৈতন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং রূপ ও সনাতনের মতো বৈষ্ণবদের উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করেন। এই সময় হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে এক সমন্বয়ের ধারা লক্ষ্য করা যায়।
  • স্থাপত্য: এই সময়ে গৌড়, পান্ডুয়ার মতো রাজধানীতে বেশ কিছু মসজিদ, মিনার ও সমাধিসৌধ নির্মিত হয়, যেগুলির স্থাপত্যরীতিতে স্থানীয় বাঙালি রীতির (যেমন—বাঁকানো কার্নিশ) প্রভাব দেখা যায়। আদিনা মসজিদ, দাখিল দরওয়াজা এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৬৬-৬৭)

১। শূন্যস্থান পূরণ করো:

ক) ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কুতুবউদ্দিন আইবক

খ) সুলতান রাজিয়া ক্ষমতাচ্যুত হন বন্দেগান-ই-চিহলগানির বিরোধিতায়।

গ) বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ছিলেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ

ঘ) বিজয়নগর রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল বিজয়নগর

ঙ) পানিপথের প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে।

২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:

ক-স্তম্ভখ-স্তম্ভ
সুলতান মাহমুদসোমনাথ মন্দির
প্রথম তরাইনের যুদ্ধ১১৯১ খ্রিস্টাব্দ
দিল্লির সুলতানরাজিয়া
খলজি বিপ্লব১২৯০ খ্রিস্টাব্দ
কৃষ্ণদেব রায়বিজয়নগর

৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

ক) দিল্লির সুলতানদের কখন খলিফাদের অনুমোদন দরকার হতো?

সাধারণত, যখন কোনো সুলতানের সিংহাসনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠত বা অভিজাতদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিত, তখন তিনি নিজের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ইসলাম জগতের প্রধান শাসক খলিফার অনুমোদন চাইতেন। খলিফার অনুমোদন পেলে তাঁর শাসন ইসলামীয় আইন অনুসারে বৈধ বলে গণ্য হত।

খ) সুলতান ইলতুৎমিসের সামনে প্রধান তিনটি সমস্যা কী ছিল?

সুলতান ইলতুৎমিসের সামনে প্রধান তিনটি সমস্যা ছিল: (১) নাসিরউদ্দিন কুবাচা ও তাজউদ্দিন ইলদিজের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী তুর্কি আমিরদের দমন করা, (২) মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খানের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করা, এবং (৩) সুলতানির উত্তরাধিকারের প্রশ্নটির সমাধান করে একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করা।

গ) কারা ছিল সুলতান রাজিয়ার সমর্থক? কারা ছিল তাঁর বিরোধী?

সুলতান রাজিয়ার সমর্থক ছিল সেনাবাহিনী, দিল্লির সাধারণ মানুষ এবং অভিজাতদের একটি অংশ। অন্যদিকে, তাঁর প্রধান বিরোধী ছিল 'বন্দেগান-ই-চিহলগানি' বা চল্লিশ চক্রের অন্তর্ভুক্ত প্রাদেশিক তুর্কি অভিজাতরা, যারা একজন নারীর শাসন মেনে নিতে পারেনি।

ঘ) আলাউদ্দিন খলজি কীভাবে মোঙ্গল আক্রমণের মোকাবিলা করেন?

আলাউদ্দিন খলজি একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন, সিরি নামে নতুন দুর্গ-শহর নির্মাণ, পুরোনো দুর্গ মেরামত এবং বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করে কম খরচে সেনাবাহিনীকে রসদ জুগিয়ে সফলভাবে মোঙ্গল আক্রমণের মোকাবিলা করেন।

ঙ) ইলিয়াসশাহি এবং হোসেনশাহি আমলে বাংলার সংস্কৃতির পরিচয় দাও।

ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি আমলে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। এই সময়ে রামায়ণ ও ভাগবতের মতো গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত হয়। সুলতানরা ধর্মীয়ভাবে উদার ছিলেন এবং স্থাপত্যে স্থানীয় রীতির প্রভাব দেখা যায়। এই যুগকে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সময়কাল বলা হয়।

৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)

(ক) ৪.২ মানচিত্র থেকে আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য অভিযানের বিবরণ দাও।

মানচিত্র অনুযায়ী, আলাউদ্দিন খলজি উত্তর ভারত জয়ের পর দাক্ষিণাত্যের দিকে নজর দেন। তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর প্রথমে দেবগিরির যাদব রাজ্য (১২৯৬ ও ১৩০৭ খ্রিঃ) আক্রমণ করেন। এরপর তিনি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ওয়ারাঙ্গলের কাকতীয় রাজ্য (১৩০৩ ও ১৩০৯ খ্রিঃ) জয় করেন। সেখান থেকে আরও দক্ষিণে গিয়ে তিনি দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজ্য (১৩১১ খ্রিঃ) এবং একেবারে শেষে মাদুরাইয়ের পাণ্ড্য রাজ্য (১৩১১ খ্রিঃ) পর্যন্ত অভিযান চালান। আলাউদ্দিন এই রাজ্যগুলি সরাসরি সাম্রাজ্যভুক্ত না করে, তাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে বার্ষিক কর আদায়ের ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই অভিযানগুলি দিল্লি সুলতানিকে বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী করেছিল।

(খ) দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে তাঁদের অভিজাতদের কেমন সম্বন্ধ ছিল তা লেখো।

দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে তাঁদের অভিজাতদের (আমির ও ওমরাহ) সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল এবং পরিবর্তনশীল। সুলতান শক্তিশালী হলে, যেমন—বলবন বা আলাউদ্দিন খলজির সময়, অভিজাতরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতেন। কিন্তু সুলতান দুর্বল হলে অভিজাতরা, বিশেষ করে 'চল্লিশ চক্র', অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতেন এবং সুলতানকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার বা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর ষড়যন্ত্র করতেন। সুলতানরা একদিকে যেমন শাসনকার্যের জন্য অভিজাতদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন, তেমনই অন্যদিকে তাঁদের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য নানা কৌশল নিতেন। এই ক্ষমতা ও আনুগত্যের টানাপোড়েনই ছিল সুলতান-অভিজাত সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

(গ) ইকতা কী? কেন সুলতানরা ইকতা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন?

ইকতা হলো একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ একটি অংশ বা অঞ্চল। দিল্লি সুলতানিতে, ইকতা ছিল একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেখানে সামরিক বা অসামরিক কর্মচারীদের বেতনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হত।
সুলতান ইলতুৎমিস এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন মূলত দুটি কারণে:
১. প্রশাসনিক সুবিধা: বিশাল সাম্রাজ্যকে কয়েকটি ইকতায় ভাগ করে শাসন পরিচালনা করা সহজ ছিল। ইকতাদার বা মুক্তিরা নিজ নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন।
২. অর্থনৈতিক সুবিধা: এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সুলতান নগদ অর্থ ব্যয় না করেই একটি বিশাল সেনাবাহিনী রাখতে পারতেন। ইকতাদাররা তাঁদের এলাকার রাজস্ব থেকে নিজেদের ও সৈন্যদের বেতন দিয়ে বাকি অর্থ (ফওয়াজিল) কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা দিতেন।

(ঘ) আলাউদ্দিন খলজির সময় দিল্লির বাজার দর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তোমার মতামত লেখো।

আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল একটি যুগান্তকারী এবং কঠোর পদক্ষেপ। আমার মতে, এর উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পদ্ধতি ছিল দমনমূলক।
পক্ষে: এই ব্যবস্থার ফলে সুলতান একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী কম খরচে utrzymywać করতে পেরেছিলেন, যা মোঙ্গল আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য অপরিহার্য ছিল। সাধারণ মানুষ ও প্রজারাও নির্দিষ্ট ও কম দামে জিনিসপত্র পাওয়ায় উপকৃত হয়েছিল।
বিপক্ষে: এই ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য ব্যবসায়ীদের উপর চরম অত্যাচার করা হত। ওজনে কম দিলে তাদের শরীর থেকে মাংস কেটে নেওয়ার মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। এটি ছিল এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। তাছাড়া, এই ব্যবস্থা কেবল দিল্লি ও তার আশেপাশের অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল, সমগ্র সাম্রাজ্যে নয়। তাই, এটি সফল হলেও এর প্রয়োগ পদ্ধতি ছিল অমানবিক।

(ঙ) বিজয়নগর ও দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে তুমি কী একটি ধর্মীয় লড়াই বলবে? তোমার যুক্তি দাও।

না, বিজয়নগর ও দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে কেবল একটি ধর্মীয় লড়াই বলা যায় না। এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।
যুক্তি:

  1. অর্থনৈতিক কারণ: তাদের লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র ছিল কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর 'রায়চুর দোয়াব' এবং গোলকোন্ডার হিরের খনি। উভয় পক্ষই এই সম্পদশালী অঞ্চলগুলি দখল করতে চেয়েছিল।
  2. রাজনৈতিক জোট: অনেক সময় বিজয়নগর কোনো একটি মুসলিম সুলতানির সঙ্গে জোট বেঁধে অন্য মুসলিম সুলতানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আবার, সুলতানি রাজ্যগুলিও নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করত। যদি এটি কেবল ধর্মযুদ্ধ হত, তাহলে এমন জোট তৈরি হত না।
  3. সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: বিজয়নগরের শাসকরা নিজেদের 'হিন্দুরায়সুরত্রাণ' (হিন্দু রাজাদের মধ্যে সুলতান) বলতেন এবং তাঁদের সেনাবাহিনীতে তুর্কি মুসলমান তীরন্দাজ নিয়োগ করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রয়োজনই বড় ছিল।
সুতরাং, ধর্ম একটি বিষয় হলেও, সংঘর্ষের মূল কারণ ছিল সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।