অধ্যায় ৮: মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের शासनकाल থেকেই বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যে ভাঙনের লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করে। এই অধ্যায়ে সেই সংকটের কারণ এবং তার ফলস্বরূপ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির উত্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

  • সংকটের কারণ: মুঘল সাম্রাজ্যের সংকটের মূলে ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা।
    • জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: সাম্রাজ্যের আয়তন বাড়লেও সেই অনুপাতে ভালো জায়গিরের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে, মনসবদারদের মধ্যে ভালো জায়গির পাওয়ার জন্য দলাদলি ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়, যা প্রশাসনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
    • কৃষি সংকট: অভিজাতরা জমি থেকে আয় বাড়ানোর জন্য কৃষকদের উপর চাপ বাড়াতে থাকে। এর ফলে বহু কৃষক জমি ছেড়ে পালিয়ে যায় বা বিদ্রোহ করে (যেমন—জাঠ, সৎনামী বিদ্রোহ)।
    • দাক্ষিণাত্য ক্ষত: ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ ২৫ বছরের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
  • আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি মুঘলদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
    • মারাঠা শক্তি: শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে 'স্বরাজ্য' প্রতিষ্ঠা করে এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাঁর অষ্টপ্রধান পরিষদ এবং বর্গি ও মাবলে সেনাদের নিয়ে গড়া সেনাবাহিনী মুঘলদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
    • শিখ শক্তি: গুরু অর্জুনদেব থেকে শুরু করে গুরু গোবিন্দ সিংহ পর্যন্ত শিখ গুরুরা মুঘলদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সংগঠিত হন। গুরু গোবিন্দ সিংহ 'খালসা' বাহিনী তৈরি করে শিখদের এক যোদ্ধা জাতিতে পরিণত করেন।
    • অন্যান্য বিদ্রোহ: দিল্লি-আগ্রা অঞ্চলের জাঠ কৃষক এবং নারনৌল অঞ্চলের সৎনামীরাও মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
  • ফলাফল: এই সমস্ত বিদ্রোহ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের ফলে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং বাংলা, হায়দরাবাদ, অযোধ্যার মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থান হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
১৬৩০-৮০শিবাজির জীবনকাল।
১৬৬৫শিবাজি ও মুঘল সেনাপতি জয়সিংহের মধ্যে পুরন্ধরের সন্ধি স্বাক্ষর।
১৬৭৪রায়গড় দুর্গে শিবাজির অভিষেক।
১৬৯৯গুরু গোবিন্দ সিংহের 'খালসা' প্রতিষ্ঠা।
১৭০৭ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

শিবাজির বাবার নাম কী ছিল?

(ক) দাদাজি কোন্ডদেব (খ) শাহজি ভোঁসলে (গ) संभाজি (ঘ) শাহু
উত্তর: (খ) শাহজি ভোঁসলে

শিবাজি কোন অস্ত্র দিয়ে আফজল খানকে হত্যা করেন?

(ক) তলোয়ার (খ) ছোরা (গ) বাঘনখ (ঘ) কৃপাণ
উত্তর: (গ) বাঘনখ

পুরন্ধরের সন্ধি কবে স্বাক্ষরিত হয়?

(ক) ১৬৬৫ খ্রি: (খ) ১৬৭৪ খ্রি: (গ) ১৬৮০ খ্রি: (ঘ) ১৬৯৯ খ্রি:
উত্তর: (ক) ১৬৬৫ খ্রি:

শিবাজির অভিষেক কোথায় হয়েছিল?

(ক) পুণে (খ) সাতারা (গ) রায়গড় (ঘ) কোলাপুর
উত্তর: (গ) রায়গড়

শিবাজির আটজন মন্ত্রী কী নামে পরিচিত ছিলেন?

(ক) নবরত্ন (খ) অষ্টদিগগজ (গ) অষ্টপ্রধান (ঘ) মন্ত্রিসভা
উত্তর: (গ) অষ্টপ্রধান

মারাঠা রাজ্যে স্থায়ীভাবে চাকরি করা সৈনিকদের কী বলা হত?

(ক) মাবলে (খ) বর্গি (গ) পাইক (ঘ) শিলাদার
উত্তর: (খ) বর্গি

শিবাজির পদাতিক সেনাদের কী বলা হত?

(ক) বর্গি (খ) শিলাদার (গ) মাবলে বা মাওয়ালি (ঘ) পাইক
উত্তর: (গ) মাবলে বা মাওয়ালি

'হিন্দুপাদপাদশাহি'-র আদর্শ কে প্রচার করেন?

(ক) শিবাজি (খ) संभाজি (গ) প্রথম বাজিরাও (ঘ) শাহু
উত্তর: (গ) প্রথম বাজিরাও

কোন শিখ গুরুর আমলে গুরুপদ বংশানুক্রমিক হয়?

(ক) গুরু নানক (খ) গুরু অর্জুনদেব (গ) গুরু তেগবাহাদুর (ঘ) গুরু গোবিন্দ সিংহ
উত্তর: (খ) গুরু অর্জুনদেব

নবম শিখ গুরু কে ছিলেন?

(ক) গুরু অর্জুনদেব (খ) গুরু হরগোবিন্দ (গ) গুরু তেগবাহাদুর (ঘ) গুরু গোবিন্দ সিংহ
উত্তর: (গ) গুরু তেগবাহাদুর

খালসা কে প্রতিষ্ঠা করেন?

(ক) গুরু নানক (খ) গুরু তেগবাহাদুর (গ) গুরু গোবিন্দ সিংহ (ঘ) বান্দা বাহাদুর
উত্তর: (গ) গুরু গোবিন্দ সিংহ

শিখদের পাঁচটি 'ক' কী কী?

(ক) কেশ, কোর্তা, কৃপাণ, কচ্ছা, কড়া (খ) কেশ, কঙ্ঘা, কৃপাণ, কচ্ছা, কড়া (গ) কেশ, কঙ্ঘা, কোর্তা, কৃপাণ, কড়া (ঘ) কেশ, কড়া, কৃপাণ, কোর্তা, কাঁচুলি
উত্তর: (খ) কেশ, কঙ্ঘা, কৃপাণ, কচ্ছা, কড়া

ঔরঙ্গজেবের আমলে জাঠরা কার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে?

(ক) শিবাজি (খ) গুরু গোবিন্দ সিংহ (গ) স্থানীয় জমিদার (ঘ) বান্দা বাহাদুর
উত্তর: (গ) স্থানীয় জমিদার

সৎনামীরা কোথায় বিদ্রোহ করেছিল?

(ক) দিল্লি-আগ্রা (খ) পাঞ্জাব (গ) মথুরার কাছে নারনৌল (ঘ) দাক্ষিণাত্য
উত্তর: (গ) মথুরার কাছে নারনৌল

মুঘল দরবারে ইরানি গোষ্ঠীর অভিজাতদের কী বলা হত?

(ক) তুরানি (খ) ইরানি (গ) আফগান (ঘ) হিন্দুস্তানি
উত্তর: (খ) ইরানি

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে কী কী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল?

ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে অর্থনৈতিকভাবে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয় এবং কৃষি সংকট তীব্র হয়। রাজনৈতিকভাবে, মারাঠা ও শিখদের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলি মুঘলদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সাম্রাজ্যের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

কবে, কাদের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়েছিল? এই সন্ধির ফল কী হয়েছিল?

১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সেনাপতি মির্জা রাজা জয়সিংহ এবং মারাঠা নেতা শিবাজির মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়েছিল। এই সন্ধির ফলে শিবাজি তাঁর ২৩টি দুর্গ মুঘলদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন, যা তাঁর ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে খর্ব করেছিল।

জাঠদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত কেন বেঁধেছিল?

জাঠরা ছিল মূলত কৃষক সম্প্রদায় এবং রাজস্ব দেওয়া নিয়ে তাদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত বাধত। ঔরঙ্গজেবের সময়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে তারা স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে এবং একটি পৃথক রাজ্য গঠনের চেষ্টা করে, যা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে।

শিবাজির সঙ্গে মুঘলদের দ্বন্দ্বের কারণ কী ছিল?

শিবাজির সঙ্গে মুঘলদের দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক। শিবাজি দাক্ষিণাত্যে একটি স্বাধীন 'স্বরাজ্য' প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা ছিল মুঘলদের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। শিবাজির রাজ্য বিস্তার এবং মুঘল এলাকা (যেমন—সুরাট) আক্রমণ করা এই দ্বন্দ্বকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের ফলে মুঘলদের কী সুবিধা হয়েছিল?

বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন দাক্ষিণাত্যে অনেক বৃদ্ধি পায়। ঔরঙ্গজেব ভেবেছিলেন এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং মারাঠাদের দমন করা সহজ হবে। এছাড়া, বহু দক্ষিণী মুসলিম অভিজাত মুঘল মনসবদারি ব্যবস্থায় যোগ দেয়।

কৃষি সংকট বলতে কী বোঝায়?

মুঘল যুগে অভিজাতদের শোষণ, অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ এবং প্রযুক্তির অনুন্নতির কারণে যখন কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, উৎপাদন কমে যায় এবং তারা জমি ছেড়ে পালাতে বা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়, সেই সামগ্রিক অবস্থাকেই কৃষি সংকট বলা হয়।

খালিসা জমি কী?মুঘল আমলে যে সমস্ত জমির রাজস্ব সরাসরি কেন্দ্রীয় রাজকোষ বা বাদশাহের কোষাগারে জমা হত এবং যা জায়গির হিসেবে বণ্টন করা হত না, সেই জমিকে 'খালিসা' বা 'খাস জমি' বলা হত।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখরা কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করেছিল?

মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখদের প্রতিরোধ প্রথমে ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ নেয়।
সংগঠনের প্রক্রিয়া:

  1. গুরুপদের বংশানুক্রমিকতা: চতুর্থ গুরু রামদাসের সময় থেকে গুরুপদ বংশানুক্রমিক হলে শিখদের একটি নির্দিষ্ট নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
  2. সামরিকীকরণ: ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ দুটি তলোয়ার ধারণ করে শিখদের সামরিক জাতিতে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু করেন।
  3. 'খালসা' গঠন: দশম গুরু গোবিন্দ সিংহ ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে 'খালসা' নামে একটি সামরিক সংগঠন তৈরি করেন। খালসার সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং কেশ, কঙ্ঘা, কচ্ছা, কৃপাণ ও কড়া—এই পাঁচটি 'ক' ধারণ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
  4. রাজনৈতিক লক্ষ্য: গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে শিখরা পাঞ্জাবে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে, যা তাদের মুঘলদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে নিয়ে আসে।
এভাবেই শিখরা একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী যোদ্ধা জাতি হিসেবে সংগঠিত হয়েছিল।

মুঘল যুগের শেষ দিকে কৃষি সংকট কেন বেড়ে গিয়েছিল? এই কৃষি সংকটের ফল কী হয়েছিল?

মুঘল যুগের শেষ দিকে, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের সময়ে, কৃষি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
কারণ:

  1. অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ: মনসবদারি সংকটের কারণে অভিজাতরা তাদের আয় বাড়ানোর জন্য জমিদার ও কৃষকদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে থাকে।
  2. জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ফসলের উৎপাদন বাড়লেও, তার চেয়ে দ্রুত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জমির উপর চাপ বাড়ে।
  3. প্রযুক্তির অভাব: কৃষির উন্নতির জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি, ফলে উৎপাদন একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর বাড়েনি।
ফলাফল: এই কৃষি সংকটের ফল ছিল ভয়াবহ। বহু কৃষক রাজস্ব দিতে না পেরে বা জমিদারের অত্যাচারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়, যার ফলে বহু জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। যারা পালাতে পারেনি, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে। জাঠ ও সৎনামী বিদ্রোহ ছিল মূলত এই কৃষি সংকটেরই ফল। এই বিদ্রোহগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

মুঘল যুগের শেষ দিকে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় কেন সংকট তৈরি হয়েছিল? মুঘল সাম্রাজ্যের উপর এই সংকটের কী প্রভাব পড়েছিল?

মুঘল যুগের শেষ দিকে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় গভীর সংকট দেখা দেয়, যা সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
সংকটের কারণ:

  1. জায়গিরের অভাব: ঔরঙ্গজেবের আমলে দাক্ষিণাত্য জয়ের ফলে বহু নতুন মারাঠা ও দক্ষিণী অভিজাত মনসবদারি ব্যবস্থায় যোগ দেয়। মনসবদারের সংখ্যা enormosly বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় জায়গির বা রাজস্বযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল সীমিত।
  2. কৃষি সংকট: কৃষক বিদ্রোহ এবং রাজস্ব আদায়ে গরমিলের কারণে জায়গির থেকে প্রকৃত আয় (হাসিল) কমে যায়, যা মনসবদারদের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
  3. দলাদলি: ভালো এবং উর্বর জায়গির পাওয়ার জন্য অভিজাতদের মধ্যে ইরানি, তুরানি, হিন্দুস্তানি ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে দলাদলি ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
প্রভাব: এই সংকটের ফলে মনসবদাররা বাদশাহের প্রতি অনুগত থাকার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য রাখতে ব্যর্থ হন, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অভিজাতদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেন্দ্রীয় শাসনকে পঙ্গু করে দেয় এবং সাম্রাজ্যের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের সামগ্রিক অবস্থা বিষয়ে তোমার মতামত কী?

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন সর্বাধিক হলেও, এই সময়েই এর অবক্ষয়ের বীজ রোপিত হয়েছিল। আমার মতে, তাঁর শাসনকাল ছিল বাহ্যিক বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের এক विरोधाभासी চিত্র।
বিস্তার ও শক্তি: ঔরঙ্গজেব বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। তিনি একজন কঠোর শাসক ও দক্ষ সেনাপতি ছিলেন এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
সংকট: কিন্তু তাঁর কিছু নীতি সাম্রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

  • দাক্ষিণাত্য নীতি: তাঁর দীর্ঘ ২৫ বছরের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
  • আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: তিনি মারাঠা, শিখ বা জাঠদের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে দমন করতে ব্যর্থ হন, যা মুঘল কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দেয়।
  • প্রশাসনিক সংকট: তাঁর সময়েই জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা অভিজাতদের মধ্যে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
সুতরাং, ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল সাম্রাজ্য তার আয়তনের শীর্ষে পৌঁছালেও, তাঁর policies এবং সমসাময়িক সংকটগুলিই পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের দ্রুত পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১৬৫)

১। নীচের নামগুলির মধ্যে কোনটি বাকিগুলির সঙ্গে মিলছে না তার তলায় দাগ দাও:

ক) পুণে, কোঙ্কণ, আগ্রা, বিজাপুর। (আগ্রা উত্তর ভারতে, বাকিগুলি দাক্ষিণাত্যে শিবাজির কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত।)

খ) বান্দা বাহাদুর, আফজল খান, শায়েস্তা খান, মুয়াজ্জম। (বান্দা বাহাদুর শিখ, বাকিরা মুঘল বা বিজাপুরের সেনাপতি।)

গ) অষ্ট প্রধান, বর্গি, মাবলে, খালসা। (খালসা শিখদের সংগঠন, বাকিগুলি মারাঠাদের সঙ্গে যুক্ত।)

ঘ) রামদাস, তেগবাহাদুর, জয়সিংহ, হরগোবিন্দ। (জয়সিংহ মুঘল সেনাপতি, বাকিরা ধর্মগুরু।)

ঙ) কেশ, কৃপাণ, কলম, কঙ্ঘা। (কলম শিখদের পাঁচটি 'ক'-এর অংশ নয়।)

২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:

ক-স্তম্ভখ-স্তম্ভ
রায়গড়শিবাজি
হিন্দুপাদপাদশাহিপ্রথম বাজিরাও
নারনৌলসৎনামী
গোলকোন্ডাদাক্ষিণাত্য
পাঠান উপজাতিউত্তর-পশ্চিম সীমান্ত

৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও:

ক) ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে কী কী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল?

ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে অর্থনৈতিকভাবে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয় এবং কৃষি সংকট তীব্র হয়। রাজনৈতিকভাবে, মারাঠা ও শিখদের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলি মুঘলদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সাম্রাজ্যের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

খ) কবে, কাদের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়েছিল? এই সন্ধির ফল কী হয়েছিল?

১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সেনাপতি মির্জা রাজা জয়সিংহ এবং মারাঠা নেতা শিবাজির মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়েছিল। এই সন্ধির ফলে শিবাজি তাঁর ২৩টি দুর্গ মুঘলদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন, যা তাঁর ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে খর্ব করেছিল।

গ) জাঠদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত কেন বেঁধেছিল?

জাঠরা ছিল মূলত কৃষক সম্প্রদায় এবং রাজস্ব দেওয়া নিয়ে তাদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত বাধত। ঔরঙ্গজেবের সময়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে তারা স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে এবং একটি পৃথক রাজ্য গঠনের চেষ্টা করে, যা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে।

ঘ) শিবাজির সঙ্গে মুঘলদের দ্বন্দ্বের কারণ কী ছিল?

শিবাজির সঙ্গে মুঘলদের দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক। শিবাজি দাক্ষিণাত্যে একটি স্বাধীন 'স্বরাজ্য' প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা ছিল মুঘলদের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। শিবাজির রাজ্য বিস্তার এবং মুঘল এলাকা (যেমন—সুরাট) আক্রমণ করা এই দ্বন্দ্বকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

ঙ) বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের ফলে মুঘলদের কী সুবিধা হয়েছিল?

বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন দাক্ষিণাত্যে অনেক বৃদ্ধি পায়। ঔরঙ্গজেব ভেবেছিলেন এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং মারাঠাদের দমন করা সহজ হবে। এছাড়া, বহু দক্ষিণী মুসলিম অভিজাত মুঘল মনসবদারি ব্যবস্থায় যোগ দেয়।

৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)

(ক) মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখরা কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করেছিল?

মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখদের প্রতিরোধ প্রথমে ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ নেয়।
সংগঠনের প্রক্রিয়া:

  1. গুরুপদের বংশানুক্রমিকতা: চতুর্থ গুরু রামদাসের সময় থেকে গুরুপদ বংশানুক্রমিক হলে শিখদের একটি নির্দিষ্ট নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
  2. সামরিকীকরণ: ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ দুটি তলোয়ার ধারণ করে শিখদের সামরিক জাতিতে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু করেন।
  3. 'খালসা' গঠন: দশম গুরু গোবিন্দ সিংহ ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে 'খালসা' নামে একটি সামরিক সংগঠন তৈরি করেন। খালসার সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং কেশ, কঙ্ঘা, কচ্ছা, কৃপাণ ও কড়া—এই পাঁচটি 'ক' ধারণ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
  4. রাজনৈতিক লক্ষ্য: গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে শিখরা পাঞ্জাবে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে, যা তাদের মুঘলদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে নিয়ে আসে।
এভাবেই শিখরা একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী যোদ্ধা জাতি হিসেবে সংগঠিত হয়েছিল।

(খ) মুঘল যুগের শেষ দিকে কৃষি সংকট কেন বেড়ে গিয়েছিল? এই কৃষি সংকটের ফল কী হয়েছিল?

মুঘল যুগের শেষ দিকে, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের সময়ে, কৃষি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
কারণ:

  1. অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ: মনসবদারি সংকটের কারণে অভিজাতরা তাদের আয় বাড়ানোর জন্য জমিদার ও কৃষকদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে থাকে।
  2. জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ফসলের উৎপাদন বাড়লেও, তার চেয়ে দ্রুত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জমির উপর চাপ বাড়ে।
  3. প্রযুক্তির অভাব: কৃষির উন্নতির জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি, ফলে উৎপাদন একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর বাড়েনি।
ফলাফল: এই কৃষি সংকটের ফল ছিল ভয়াবহ। বহু কৃষক রাজস্ব দিতে না পেরে বা জমিদারের অত্যাচারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়, যার ফলে বহু জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। যারা পালাতে পারেনি, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে। জাঠ ও সৎনামী বিদ্রোহ ছিল মূলত এই কৃষি সংকটেরই ফল। এই বিদ্রোহগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

(গ) মুঘল যুগের শেষ দিকে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় কেন সংকট তৈরি হয়েছিল? মুঘল সাম্রাজ্যের উপর এই সংকটের কী প্রভাব পড়েছিল?

মুঘল যুগের শেষ দিকে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থায় গভীর সংকট দেখা দেয়, যা সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
সংকটের কারণ:

  1. জায়গিরের অভাব: ঔরঙ্গজেবের আমলে দাক্ষিণাত্য জয়ের ফলে বহু নতুন মারাঠা ও দক্ষিণী অভিজাত মনসবদারি ব্যবস্থায় যোগ দেয়। মনসবদারের সংখ্যা enormosly বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় জায়গির বা রাজস্বযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল সীমিত।
  2. কৃষি সংকট: কৃষক বিদ্রোহ এবং রাজস্ব আদায়ে গরমিলের কারণে জায়গির থেকে প্রকৃত আয় (হাসিল) কমে যায়, যা মনসবদারদের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
  3. দলাদলি: ভালো এবং উর্বর জায়গির পাওয়ার জন্য অভিজাতদের মধ্যে ইরানি, তুরানি, হিন্দুস্তানি ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে দলাদলি ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
প্রভাব: এই সংকটের ফলে মনসবদাররা বাদশাহের প্রতি অনুগত থাকার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য রাখতে ব্যর্থ হন, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অভিজাতদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেন্দ্রীয় শাসনকে পঙ্গু করে দেয় এবং সাম্রাজ্যের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে।

(ঘ) সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের সামগ্রিক অবস্থা বিষয়ে তোমার মতামত কী?

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন সর্বাধিক হলেও, এই সময়েই এর অবক্ষয়ের বীজ রোপিত হয়েছিল। আমার মতে, তাঁর শাসনকাল ছিল বাহ্যিক বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের এক विरोधाभासी চিত্র।
বিস্তার ও শক্তি: ঔরঙ্গজেব বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। তিনি একজন কঠোর শাসক ও দক্ষ সেনাপতি ছিলেন এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
সংকট: কিন্তু তাঁর কিছু নীতি সাম্রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

  • দাক্ষিণাত্য নীতি: তাঁর দীর্ঘ ২৫ বছরের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
  • আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: তিনি মারাঠা, শিখ বা জাঠদের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে দমন করতে ব্যর্থ হন, যা মুঘল কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দেয়।
  • প্রশাসনিক সংকট: তাঁর সময়েই জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা অভিজাতদের মধ্যে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
সুতরাং, ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল সাম্রাজ্য তার আয়তনের শীর্ষে পৌঁছালেও, তাঁর policies এবং সমসাময়িক সংকটগুলিই পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের দ্রুত পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।