অধ্যায় ৩: ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সময়কালে ভারতের সমাজ, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে নানা পরিবর্তন ঘটেছিল। এই অধ্যায়ে সেই সময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে সামন্তপ্রথা, দক্ষিণ ভারত ও বাংলার অর্থনৈতিক জীবন এবং সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

  • অর্থনীতি ও সামন্ত ব্যবস্থা: এই সময়ে উত্তর ভারতে বাণিজ্যে কিছুটা মন্দা দেখা দিলেও গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। সমাজে 'সামন্ত ব্যবস্থা' গড়ে ওঠে, যেখানে রাজা, মহাসামন্ত, সামন্ত এবং সাধারণ প্রজা—এইভাবে একটি স্তরবিন্যাস তৈরি হয়েছিল। সামন্তরা রাজার অধীনে থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব ভোগ করত এবং প্রয়োজনে রাজাকে সামরিক সাহায্য দিত।
  • দক্ষিণ ভারতের অর্থনীতি: দক্ষিণ ভারতে চোল রাজাদের আমলে অর্থনীতি ছিল বেশ উন্নত। কাবেরী নদী থেকে খাল কেটে সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। মন্দিরগুলি শুধুমাত্র উপাসনার স্থান ছিল না, এগুলি অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। 'উর', 'নাড়ু' ও 'নগরম'-এর মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক সভাও ছিল।
  • পাল-সেন যুগের বাংলা: পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। ধান ছিল প্রধান ফসল। কার্পাস বস্ত্রশিল্পের খ্যাতি ছিল। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে মন্দা আসায় মুদ্রার ব্যবহার কমে যায় এবং বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে কড়ি।
  • সমাজ ও ধর্ম: পাল যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে এবং সহজযান, বজ্রযানের মতো তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের জন্ম হয়। সেন যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাধান্য বাড়ে এবং বর্ণব্যবস্থা কঠোর হয়।
  • সাহিত্য ও সংস্কৃতি: পাল যুগে আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন 'চর্যাপদ' রচিত হয়। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত' কাব্য এই যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকীর্তি। সেন যুগে জয়দেবের 'গীতগোবিন্দম্' কাব্য উল্লেখযোগ্য।
  • শিল্প و স্থাপত্য: পাল যুগে 'প্রাচ্য শিল্পরীতি'-র বিকাশ ঘটে। পাহাড়পুরের সোমপুরী মহাবিহারের মতো বিশাল স্থাপত্য নির্মিত হয়। নালন্দা, বিক্রমশীলের মতো মহাবিহারগুলি ছিল জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।
  • ভারত ও বহির্বিশ্ব: এই সময়ে ভারতের সঙ্গে আরব, তিব্বত, চিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটে। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে এক মেলবন্ধনের সৃষ্টি করেন।

গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা

সাল (খ্রিস্টাব্দ)ঘটনা
খ্রিস্টীয় ৭ম-১২শ শতকভারতে সামন্ত ব্যবস্থার বিকাশ।
খ্রিস্টীয় ৯ম শতকপশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ।
খ্রিস্টীয় ৯ম-১১শ শতকদক্ষিণ ভারতে চোলদের নেতৃত্বে বাণিজ্যের উন্নতি।
আনুমানিক ৮০০-১১০০ খ্রিঃপ্রাচীন বাংলা ভাষার জন্ম (চর্যাপদের সময়কাল)।
খ্রিস্টীয় ৮ম শতকপাল সম্রাট ধর্মপাল বিক্রমশীল মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন।
আনুমানিক ৯৮০-১০৫৩ খ্রিঃদীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান (অতীশ)-এর জীবনকাল।
১০৪০ খ্রিঃঅতীশ দীপঙ্করের তিব্বت গমন।
১২শ শতককম্বোডিয়ায় আঙ্কোরভাট মন্দির নির্মাণ। জয়দেবের 'গীতগোবিন্দম্' রচনা।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর

এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)

সামন্ত ব্যবস্থার কাঠামো দেখতে কেমন ছিল?

(ক) বৃত্তের মতো (খ) ত্রিভুজের মতো (গ) চতুর্ভুজের মতো (ঘ) সরলরৈখিক
উত্তর: (খ) ত্রিভুজের মতো

ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের সেরা সময় কোনটি ছিল?

(ক) নবম শতক (খ) দশম শতক (গ) একাদশ শতক (ঘ) দ্বাদশ শতক
উত্তর: (ঘ) দ্বাদশ শতক

চোল রাজ্যে কৃষকদের বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রাম-পরিষদকে কী বলা হত?

(ক) নাড়ু (খ) উর (গ) নগরম (ঘ) মণ্ডলম
উত্তর: (খ) উর

চোল রাজ্যে ব্যবসায়ীদের পরিষদকে কী বলা হত?

(ক) উর (খ) সভা (গ) নগরম (ঘ) নাড়ু
উত্তর: (গ) নগরম

ব্রাহ্মণদের করমুক্ত জমি দান করার ব্যবস্থাকে কী বলা হত?

(ক) সামন্ত ব্যবস্থা (খ) ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা (গ) নগরম (ঘ) ইকতা ব্যবস্থা
উত্তর: (খ) ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা

পাল-সেন যুগে জিনিস কেনাবেচার প্রধান মাধ্যম কী ছিল?

(ক) সোনার মুদ্রা (খ) রুপোর মুদ্রা (গ) তামার মুদ্রা (ঘ) কড়ি
উত্তর: (ঘ) কড়ি

পাল-সেন যুগে রাজারা উৎপন্ন ফসলের কত অংশ কর নিতেন?

(ক) ১/৩ অংশ (খ) ১/৪ অংশ (গ) ১/৬ অংশ (ঘ) ১/১০ অংশ
উত্তর: (গ) ১/৬ অংশ

কোন খাদ্যদ্রব্যটি প্রাচীন বাংলার খাদ্যতালিকায় ছিল না?

(ক) মাছ (খ) ভাত (গ) শাকসবজি (ঘ) আলু
উত্তর: (ঘ) আলু

'রামচরিত' কাব্য কে রচনা করেন?

(ক) জয়দেব (খ) সন্ধ্যাকর নন্দী (গ) ধোয়ী (ঘ) বাণভট্ট
উত্তর: (খ) সন্ধ্যাকর নন্দী

'রামচরিত' কাব্যে কোন পাল রাজার কথা বলা হয়েছে?

(ক) গোপাল (খ) ধর্মপাল (গ) দেবপাল (ঘ) রামপাল
উত্তর: (ঘ) রামপাল

তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের নেতাদের কী বলা হত?

(ক) আচার্য (খ) সিদ্ধাচার্য (গ) মহাচার্য (ঘ) ভিক্ষু
উত্তর: (খ) সিদ্ধাচার্য

আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন কোনটি?

(ক) রামচরিত (খ) গীতগোবিন্দম্ (গ) চর্যাপদ (ঘ) পবনদূত
উত্তর: (গ) চর্যাপদ

চর্যাপদের পুঁথি কে উদ্ধার করেন?

(ক) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (গ) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (ঘ) দীনেশচন্দ্র সেন
উত্তর: (খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

নালন্দা মহাবিহার কোন রাজ্যে অবস্থিত?

(ক) পশ্চিমবঙ্গ (খ) বিহার (গ) ওড়িশা (ঘ) উত্তরপ্রদেশ
উত্তর: (খ) বিহার

বিক্রমশীল মহাবিহার কে প্রতিষ্ঠা করেন?

(ক) গোপাল (খ) ধর্মপাল (গ) দেবপাল (ঘ) রামপাল
উত্তর: (খ) ধর্মপাল

পালযুগের শিল্পরীতিকে কী বলা হয়?

(ক) গান্ধার রীতি (খ) মথুরা রীতি (গ) দ্রাবিড় রীতি (ঘ) প্রাচ্য শিল্পরীতি
উত্তর: (ঘ) প্রাচ্য শিল্পরীতি

পালযুগের দুই প্রসিদ্ধ শিল্পী কারা ছিলেন?

(ক) জয়দেব ও ধোয়ী (খ) ধীমান ও বীটপাল (গ) লুইপাদ ও কাহ্নপাদ (ঘ) সন্ধ্যাকর ও চক্রপাণি
উত্তর: (খ) ধীমান ও বীটপাল

'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের রচয়িতা কে?

(ক) ধোয়ী (খ) গোবর্ধন (গ) জয়দেব (ঘ) উমাপতিধর
উত্তর: (গ) জয়দেব

রাজা বল্লালসেনের লেখা দুটি বইয়ের নাম কী?

(ক) রামচরিত ও পবনদূত (খ) দানসাগর ও অদ্ভুতসাগর (গ) চর্যাপদ ও গীতগোবিন্দম্ (ঘ) ব্রাহ্মণসর্বস্ব ও চিকিৎসা-সংগ্রহ
উত্তর: (খ) দানসাগর ও অদ্ভুতসাগর

দীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান (অতীশ) কোথায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন?

(ক) চিন (খ) জাপান (গ) তিব্বত (ঘ) শ্রীলঙ্কা
উত্তর: (গ) তিব্বত

ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রে নাইটদের প্রধান কাজ কী ছিল?

(ক) চাষাবাদ করা (খ) ব্যবসা করা (গ) যুদ্ধ করা (ঘ) ধর্মপ্রচার করা
উত্তর: (গ) যুদ্ধ করা

দক্ষিণ ভারতে বণিকদের কী বলা হত?

(ক) শেঠ (খ) সাহা (গ) চেট্টি (ঘ) উর
উত্তর: (গ) চেট্টি

প্রাচীন বাংলায় কোন শিল্পের খ্যাতি সবচেয়ে বেশি ছিল?

(ক) লৌহশিল্প (খ) কাষ্ঠশিল্প (গ) কার্পাস বস্ত্রশিল্প (ঘ) মৃৎশিল্প
উত্তর: (গ) কার্পাস বস্ত্রশিল্প

'সহজযান' কোন ধর্মের একটি শাখা ছিল?

(ক) জৈনধর্ম (খ) ব্রাহ্মণ্যধর্ম (গ) শৈব ধর্ম (ঘ) বৌদ্ধধর্ম
উত্তর: (ঘ) বৌদ্ধধর্ম

চক্রপাণিদত্ত কোন বিষয়ের পণ্ডিত ছিলেন?

(ক) সাহিত্য (খ) গণিত (গ) জ্যোতির্বিদ্যা (ঘ) চিকিৎসা-বিজ্ঞান
উত্তর: (ঘ) চিকিৎসা-বিজ্ঞান

'পবনদূত' কাব্যের রচয়িতা কে?

(ক) জয়দেব (খ) গোবর্ধন (গ) উমাপতিধর (ঘ) ধোয়ী
উত্তর: (ঘ) ধোয়ী

কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট কোন দেবতার মন্দির?

(ক) শিব (খ) ব্রহ্মা (গ) বিষ্ণু (ঘ) বুদ্ধ
উত্তর: (গ) বিষ্ণু

বোরোবোদুরের বৌদ্ধ মন্দিরটি কোথায় অবস্থিত?

(ক) কম্বোডিয়া (খ) ইন্দোনেশিয়া (গ) তিব্বত (ঘ) চিন
উত্তর: (খ) ইন্দোনেশিয়া

'নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা' কার বাড়িকে বলা হত?

(ক) সন্ধ্যাকর নন্দী (খ) চক্রপাণিদত্ত (গ) অতীশ দীপঙ্কর (ঘ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
উত্তর: (গ) অতীশ দীপঙ্কর

পাল যুগে কোন ভাষার বিকাশ ঘটেছিল?

(ক) সংস্কৃত (খ) পালি (গ) প্রাকৃত (ঘ) আদি বাংলা
উত্তর: (ঘ) আদি বাংলা

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

সামন্ত ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো?

খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে ভারতে রাজা, বিভিন্ন স্তরের শাসক ও সাধারণ প্রজাদের নিয়ে যে স্তরভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তাকে সামন্ত ব্যবস্থা বলে। এই ব্যবস্থায় রাজা বা ঊর্ধ্বতন শাসকের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে সামন্তরা নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব ভোগ করত।

চোল রাজ্যের দুটি স্থানীয় সভার নাম লেখো।

চোল রাজ্যের দুটি স্থানীয় সভা হলো 'উর' (কৃষকদের গ্রাম-পরিষদ) এবং 'নগরম' (ব্যবসায়ীদের পরিষদ)।

পাল-সেন যুগে কর ব্যবস্থা কেমন ছিল?

পাল-সেন যুগে রাজারা কৃষকদের থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর হিসেবে নিতেন। এছাড়াও, বণিকদের বাণিজ্য কর, গ্রামের উপর ধার্য কর এবং হাট ও খেয়াঘাটের উপর কর আদায় করা হত।

চর্যাপদ কী?

চর্যাপদ হলো খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত কবিতা ও গানের সংকলন। এটি আদি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন।

পাল যুগের চারটি বিখ্যাত বৌদ্ধবিহারের নাম লেখো।

পাল যুগের চারটি বিখ্যাত বৌদ্ধবিহার হলো—নালন্দা, বিক্রমশীল, ওদন্তপুরী এবং সোমপুরী (পাহাড়পুর)।

লক্ষ্মণসেনের রাজসভার 'পঞ্চরত্ন' কারা ছিলেন?

রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভার 'পঞ্চরত্ন' ছিলেন—জয়দেব, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতিধর এবং শরণ।

অতীশ দীপঙ্করের আসল নাম কী ছিল?

অতীশ দীপঙ্করের আসল নাম ছিল আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর তাঁর নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।

দুটি বিখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্রের নাম লেখো।

সেন যুগে রচিত দুটি বিখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্র হলো বল্লালসেন রচিত 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' এবং হলায়ুধ রচিত 'ব্রাহ্মণসর্বস্ব'

‘ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা’ কী?

আদি-মধ্যযুগে দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মণদের করমুক্ত বা নিষ্কর জমি দান করার প্রথাকে ‘ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা’ বলা হত। এই ব্যবস্থার ফলে বহু নতুন ব্রাহ্মণ-অধ্যুষিত গ্রামের পত্তন ঘটেছিল।

পাল ও সেন যুগে বাংলার প্রধান ফসল কী ছিল?

পাল ও সেন যুগে বাংলার প্রধান ফসল ছিল ধান। ধান ছাড়াও সর্ষে, বিভিন্ন ফল ও কার্পাস বা তুলার চাষ হত।

সিদ্ধাচার্য কাদের বলা হত?

পাল যুগে মহাযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তা মিলে বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের জন্ম হয়। এই তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের নেতাদের 'সিদ্ধাচার্য' বলা হত। লুইপাদ, কাহ্নপাদ এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

'নির্বাণ' বলতে কী বোঝায়?

বৌদ্ধ ধর্মমতে 'নির্বাণ' বা মুক্তি হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে জীবনের সমস্ত দুঃখ ও ক্লেশের অবসান ঘটে এবং মানুষকে আর বারবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রের মধ্যে আসতে হয় না।

সোমপুরী মহাবিহার কে নির্মাণ করেন?

পাল সম্রাট ধর্মপাল অষ্টম শতকে বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহীর পাহাড়পুরে সুবিশাল সোমপুরী মহাবিহার নির্মাণ করেন।

'প্রাচ্য শিল্পরীতি' কোন যুগে বিকাশ লাভ করে?

'প্রাচ্য শিল্পরীতি' পাল যুগে বিকাশ লাভ করে। এই শিল্পরীতির প্রধান কেন্দ্র ছিল বাংলা ও বিহার। ধীমান ও বীটপাল ছিলেন এই রীতির শ্রেষ্ঠ শিল্পী।

সেন যুগে বর্ণব্যবস্থা কেমন ছিল?

সেন যুগে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাধান্য বাড়ায় বর্ণব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় হয়ে পড়ে। সমাজে ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয় এবং বাকিদের বিভিন্ন উপবিভাগে ভাগ করা হয়।

'সদুক্তিকর্ণামৃত' গ্রন্থটি কে সংকলন করেন?

ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভার অন্যতম কর্মী শ্রীধর দাস 'সদুক্তিকর্ণামৃত' নামক কাব্যসংকলন গ্রন্থটি সংকলন করেন।

ডাক ও খনার বচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ডাক ও খনার বচনগুলি প্রাচীন বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজের প্রতিচ্ছবি। এই বচনগুলির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ মুখে মুখে কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন জ্ঞান, যেমন—কখন কোন ফসল বুনতে হবে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ইত্যাদি মনে রাখত।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতির দুটি নিদর্শনের নাম লেখো।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো: (১) ইন্দোনেশিয়ার বোরোবোদুরের বৌদ্ধ মন্দির এবং (২) কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট বিষ্ণু মন্দির।

চোল রাজ্যের প্রদেশগুলিকে কী বলা হত?

চোল রাজ্যে প্রদেশগুলিকে 'মণ্ডলম' বলা হত।

'চিকিৎসা-সংগ্রহ' কার লেখা?

'চিকিৎসা-সংগ্রহ' গ্রন্থটি পাল যুগের বিখ্যাত চিকিৎসা-বিজ্ঞানী চক্রপাণিদত্তের লেখা।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার ছবি আঁকতে গেলে কেন তা একখানা ত্রিভুজের মতো দেখায়? এই ব্যবস্থায় সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত?

ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার কাঠামোটি একটি ত্রিভুজের মতো ছিল। কারণ, এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে ছিলেন একজন রাজা। তাঁর নীচে ছিলেন অল্প কিছু মহাসামন্ত, তাঁদের নীচে আরও বেশি সংখ্যক সামন্ত এবং সবচেয়ে নীচের স্তরে ছিল বিপুল সংখ্যক সাধারণ প্রজা বা কৃষক। ক্ষমতার অধিকারী মানুষের সংখ্যা যত উপরের দিকে গিয়েছে, তত কমেছে, তাই এর আকৃতি ত্রিভুজের মতো।
এই ব্যবস্থায় সামন্তরা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তারা রাজা বা ঊর্ধ্বতন শাসকের প্রতি আনুগত্য ও প্রয়োজনে সামরিক সাহায্য দানের বিনিময়ে এক বা একাধিক গ্রামের রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেত। সেই আদায় করা রাজস্বের একটি অংশ তারা রাজকোষে জমা দিত এবং বাকি অংশ দিয়ে নিজেদের জীবিকা, সৈন্যবাহিনীর ভরণপোষণ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। অর্থাৎ, অন্যের শ্রমে উৎপাদিত ফসলের উপর নির্ভর করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করত।

পাল ও সেন যুগের বাংলার বাণিজ্য ও কৃষির মধ্যে তুলনা করো।

পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে কৃষি ও বাণিজ্যের গুরুত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
কৃষি: উভয় যুগেই বাংলার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। ধান ছিল প্রধান ফসল। এছাড়াও সর্ষে, আম, কাঁঠাল, কলা, পান, সুপারি, তুলা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হত। রাজারা উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর হিসেবে নিতেন। উভয় আমলেই ভূমিদান প্রথা চালু ছিল।
বাণিজ্য: পাল যুগের প্রথমদিকে বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য সচল থাকলেও, পরবর্তীকালে ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব বণিকদের দাপট বাড়ায় বাংলার বণিকদের গুরুত্ব কমে আসে। ফলে, পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে বাণিজ্যের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পায়। এর ফলে মুদ্রার ব্যবহার কমে যায় এবং বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে কড়ি। দক্ষিণ ভারতের চোলদের মতো বাংলার পাল বা সেন রাজারা বৈদেশিক বাণিজ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেননি।
সুতরাং, উভয় যুগেই কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি হলেও, পাল যুগের তুলনায় সেন যুগে বাণিজ্য আরও বেশি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে কৃষিনির্ভর হয়ে যায়।

পাল আমলের বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যের কী পরিচয় পাওয়া যায় তা লেখো।

পাল আমলে বাংলায় শিল্প ও স্থাপত্যের remarquable উন্নতি ঘটেছিল। এই শিল্পরীতি 'প্রাচ্য শিল্পরীতি' নামে পরিচিত।
স্থাপত্য: পাল স্থাপত্যের সেরা নিদর্শনগুলি হলো স্তূপ, বিহার (বৌদ্ধমঠ) এবং মন্দির। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ছিল বৌদ্ধবিহারগুলি। বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুরী মহাবিহার ছিল পাল আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য। এটি একটি বিশাল চতুষ্কোণ স্থাপত্য যার কেন্দ্রে একটি মন্দির ছিল এবং এটি মূলত পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি হত। নালন্দা, বিক্রমশীলের মতো মহাবিহারগুলিও পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল।
ভাস্কর্য ও চিত্রকলা: পাল আমলের ভাস্কর্য ছিল অত্যন্ত উন্নত। পাহাড়পুরের মন্দিরের গায়ে পাথরের ফলকে নানা দেবদেবীর মূর্তি এবং পোড়ামাটির ফলকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ধীমান ও বীটপাল ছিলেন এই যুগের বিখ্যাত ভাস্কর। এছাড়া, তালপাতার পুঁথিতে আঁকা ছোট ছোট রঙিন ছবি (অণুচিত্র) পাওয়া গেছে, যা পাল যুগের চিত্রকলার उत्कृष्ट নিদর্শন।

পাল ও সেন যুগে সমাজ ও ধর্মের পরিচয় দাও।

পাল যুগ: পাল যুগে বাংলার সমাজে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্থানীয় বিশ্বাস মিশে বজ্রযান ও সহজযানের মতো তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের জন্ম হয়। সমাজে জাতিভেদ প্রথা থাকলেও সেন যুগের মতো কঠোর ছিল না।
সেন যুগ: সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুসারী। ফলে, তাঁদের আমলে সমাজে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর হয়ে ওঠে এবং ব্রাহ্মণরাই সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করত। এই সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার কমে আসে। সমাজে বৈদিক ও পৌরাণিক—উভয় ধরনের দেবদেবীর (যেমন শিব, বিষ্ণু) পূজা প্রচলিত ছিল। সেন আমলে সমাজে রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পায়।

জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে নালন্দা ও বিক্রমশীল মহাবিহারের গুরুত্ব আলোচনা করো।

পাল যুগে নালন্দা ও বিক্রমশীল মহাবিহার ছিল আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
নালন্দা: গুপ্ত যুগে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাল রাজাদের আমলে এর খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। এখানে প্রায় দশ হাজার ছাত্র ও শিক্ষক থাকতেন। চিন, তিব্বত, কোরিয়া থেকেও ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত। এখানে বৌদ্ধশাস্ত্র ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হত। ছাত্রদের থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনা ছিল বিনামূল্যের।
বিক্রমশীল: পাল সম্রাট ধর্মপাল এই মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বজ্রযান বৌদ্ধমত চর্চার একটি বড় কেন্দ্র। এখানেও প্রায় তিন হাজার ছাত্র পড়াশোনা করত এবং প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হতে হত। এখানকার গ্রন্থাগারে বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ছিল। অতীশ দীপঙ্কর এই মহাবিহারের একজন বিখ্যাত আচার্য ছিলেন।
উভয় মহাবিহারই ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি আক্রমণের ফলে ধ্বংস হয়ে যায়।

পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ৪১-৪২)

১। নীচের নামগুলির মধ্যে কোনটি বাকিগুলির সঙ্গে মিলছে না তার তলায় দাগ দাও:

ক) নাড়ু, চোল, উর, নগরম। (চোল একটি রাজবংশ, বাকিগুলি স্থানীয় পরিষদ।)

খ) ওদন্তপুরী, বিক্রমশীল, নালন্দা, জগদ্দল, লখনৌতি। (লখনৌতি একটি শহর, বাকিগুলি বৌদ্ধবিহার।)

গ) জয়দেব, ধীমান, বীটপাল, সন্ধ্যাকর নন্দী, চক্রপাণিদত্ত। (ধীমান ও বীটপাল শিল্পী, বাকিরা সাহিত্যিক/পণ্ডিত।)

ঘ) লুইপাদ, অশ্বঘোষ, সরহপাদ, কাহ্নপাদ। (অশ্বঘোষ কুষাণ যুগের, বাকিরা পাল যুগের সিদ্ধাচার্য।)

২। নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে তার নীচের কোন ব্যাখ্যাটি তোমার সবচেয়ে মানানসই বলে মনে হয়?

(ক) বিবৃতি: বাংলার অর্থনীতি পাল-সেন যুগে কৃষি নির্ভর হয়ে পড়েছিল।
ব্যাখ্যা-২: পাল-সেন যুগে ভারতের পশ্চিম দিকের সাগরে আরব বণিকদের দাপট বেড়ে গিয়েছিল।

(খ) বিবৃতি: দক্ষিণ ভারতে মন্দির ঘিরে লোকালয় ও বসবাস তৈরি হয়েছিল।
ব্যাখ্যা-১: রাজা ও অভিজাতরা মন্দিরকে নিষ্কর জমি দান করতেন।

(গ) বিবৃতি: সেন যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার কমে গিয়েছিল।
ব্যাখ্যা-২: সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেই প্রাধান্য দিতেন।

৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

ক) দক্ষিণ ভারতে খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে বাণিজ্যের উন্নতি কেন ঘটেছিল?

এই সময়ে দক্ষিণ ভারতে চোল রাজাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। এই নৌবাহিনীর সাহায্যে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে আরব বণিকদের পাশাপাশি ভারতীয় বণিকদের, বিশেষ করে চেট্টিদের, প্রভাব বাড়ে এবং বাণিজ্যের উন্নতি ঘটে।

খ) পাল ও সেন যুগে বাংলায় কী কী ফসল উৎপন্ন হতো? সেই ফসলগুলির কোন কোনটি এখনও চাষ করা হয়?

পাল ও সেন যুগে বাংলায় ধান, সর্ষে, কার্পাস (তুলা), পান, সুপারি, এলাচ, আম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ইত্যাদি ফসল উৎপন্ন হত। এই ফসলগুলির প্রায় সবই, যেমন—ধান, সর্ষে, পান, আম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ইত্যাদি এখনও বাংলায় ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।

গ) রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভার সাহিত্যচর্চার পরিচয় দাও।

রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভা সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। তাঁর সভায় পাঁচজন বিখ্যাত কবি ছিলেন, যাঁরা 'পঞ্চরত্ন' নামে পরিচিত—জয়দেব, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতিধর এবং শরণ। এঁদের মধ্যে জয়দেবের লেখা 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যটি সর্বাধিক বিখ্যাত। এছাড়া, লক্ষ্মণসেনের মন্ত্রী হলায়ুধ 'ব্রাহ্মণসর্বস্ব' নামে একটি স্মৃতিশাস্ত্র রচনা করেন।

ঘ) পাল শাসনের তুলনায় সেন শাসন কেন বাংলায় কম দিন স্থায়ী হয়েছিল?

পাল শাসনের তুলনায় সেন শাসন কম দিন স্থায়ী হওয়ার কারণ হলো, পাল রাজারা ছিলেন বাঙালি এবং 'মাৎস্যন্যায়'-এর পর জনগণের সমর্থনেই তাঁরা ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু সেনরা ছিলেন কর্ণাটক থেকে আসা বহিরাগত। ফলে বাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের আত্মিক যোগ কম ছিল। তাই তাঁরা পালদের মতো গভীরভাবে শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:

(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)

(ক) ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার ছবি আঁকতে গেলে কেন তা একখানা ত্রিভুজের মতো দেখায়? এই ব্যবস্থায় সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত?

ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার কাঠামোটি একটি ত্রিভুজের মতো ছিল। কারণ, এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে ছিলেন একজন রাজা। তাঁর নীচে ছিলেন অল্প কিছু মহাসামন্ত, তাঁদের নীচে আরও বেশি সংখ্যক সামন্ত এবং সবচেয়ে নীচের স্তরে ছিল বিপুল সংখ্যক সাধারণ প্রজা বা কৃষক। ক্ষমতার অধিকারী মানুষের সংখ্যা যত উপরের দিকে গিয়েছে, তত কমেছে, তাই এর আকৃতি ত্রিভুজের মতো।
এই ব্যবস্থায় সামন্তরা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তারা রাজা বা ঊর্ধ্বতন শাসকের প্রতি আনুগত্য ও প্রয়োজনে সামরিক সাহায্য দানের বিনিময়ে এক বা একাধিক গ্রামের রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেত। সেই আদায় করা রাজস্বের একটি অংশ তারা রাজকোষে জমা দিত এবং বাকি অংশ দিয়ে নিজেদের জীবিকা, সৈন্যবাহিনীর ভরণপোষণ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। অর্থাৎ, অন্যের শ্রমে উৎপাদিত ফসলের উপর নির্ভর করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করত।

(খ) পাল ও সেন যুগের বাংলার বাণিজ্য ও কৃষির মধ্যে তুলনা করো।

পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে কৃষি ও বাণিজ্যের গুরুত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
কৃষি: উভয় যুগেই বাংলার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। ধান ছিল প্রধান ফসল। এছাড়াও সর্ষে, আম, কাঁঠাল, কলা, পান, সুপারি, তুলা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হত। রাজারা উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর হিসেবে নিতেন। উভয় আমলেই ভূমিদান প্রথা চালু ছিল।
বাণিজ্য: পাল যুগের প্রথমদিকে বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য সচল থাকলেও, পরবর্তীকালে ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব বণিকদের দাপট বাড়ায় বাংলার বণিকদের গুরুত্ব কমে আসে। ফলে, পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে বাণিজ্যের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পায়। এর ফলে মুদ্রার ব্যবহার কমে যায় এবং বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে কড়ি। দক্ষিণ ভারতের চোলদের মতো বাংলার পাল বা সেন রাজারা বৈদেশিক বাণিজ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেননি।
সুতরাং, উভয় যুগেই কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি হলেও, পাল যুগের তুলনায় সেন যুগে বাণিজ্য আরও বেশি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে কৃষিনির্ভর হয়ে যায়।

(গ) পাল আমলের বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যের কী পরিচয় পাওয়া যায় তা লেখো।

পাল আমলে বাংলায় শিল্প ও স্থাপত্যের remarquable উন্নতি ঘটেছিল। এই শিল্পরীতি 'প্রাচ্য শিল্পরীতি' নামে পরিচিত।
স্থাপত্য: পাল স্থাপত্যের সেরা নিদর্শনগুলি হলো স্তূপ, বিহার (বৌদ্ধমঠ) এবং মন্দির। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ছিল বৌদ্ধবিহারগুলি। বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুরী মহাবিহার ছিল পাল আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য। এটি একটি বিশাল চতুষ্কোণ স্থাপত্য যার কেন্দ্রে একটি মন্দির ছিল এবং এটি মূলত পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি হত। নালন্দা, বিক্রমশীলের মতো মহাবিহারগুলিও পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল।
ভাস্কর্য ও চিত্রকলা: পাল আমলের ভাস্কর্য ছিল অত্যন্ত উন্নত। পাহাড়পুরের মন্দিরের গায়ে পাথরের ফলকে নানা দেবদেবীর মূর্তি এবং পোড়ামাটির ফলকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ধীমান ও বীটপাল ছিলেন এই যুগের বিখ্যাত ভাস্কর। এছাড়া, তালপাতার পুঁথিতে আঁকা ছোট ছোট রঙিন ছবি (অণুচিত্র) পাওয়া গেছে, যা পাল যুগের চিত্রকলার उत्कृष्ट নিদর্শন।

(ঘ) পাল ও সেন যুগে সমাজ ও ধর্মের পরিচয় দাও।

পাল যুগ: পাল যুগে বাংলার সমাজে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্থানীয় বিশ্বাস মিশে বজ্রযান ও সহজযানের মতো তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের জন্ম হয়। সমাজে জাতিভেদ প্রথা থাকলেও সেন যুগের মতো কঠোর ছিল না।
সেন যুগ: সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুসারী। ফলে, তাঁদের আমলে সমাজে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর হয়ে ওঠে এবং ব্রাহ্মণরাই সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করত। এই সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার কমে আসে। সমাজে বৈদিক ও পৌরাণিক—উভয় ধরনের দেবদেবীর (যেমন শিব, বিষ্ণু) পূজা প্রচলিত ছিল। সেন আমলে সমাজে রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পায়।