অধ্যায় ২: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। এই অধ্যায়ে আমরা প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন ভৌগোলিক বিভাগ, শশাঙ্ক, পাল ও সেন राजवंशের শাসন এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তিগুলির উত্থান ও পতন সম্পর্কে জানব।
- প্রাচীন বাংলা: আজকের বাংলা অঞ্চলটি তখন পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র, বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, সমতট ইত্যাদি বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল। এই জনপদগুলির সীমানা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে।
- শশাঙ্ক: সপ্তম শতকে শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম সার্বভৌম নরপতি। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (আজকের মুর্শিদাবাদ)। তিনি গৌড়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং উত্তর ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলায় এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা 'মাৎস্যন্যায়' নামে পরিচিত।
- পাল বংশ: মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বাংলার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন (আনুমানিক ৭৫০ খ্রিঃ)। এর মাধ্যমে পাল বংশের শাসনের সূচনা হয়। ধর্মপাল, দেবপাল, রামপালের মতো শাসকরা পাল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। পাল রাজারা উত্তর ভারতের 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম'-এ অংশ নিয়েছিলেন।
- সেন বংশ: একাদশ শতকে কর্ণাট থেকে আসা সেনরা বাংলায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন ছিলেন এই বংশের উল্লেখযোগ্য রাজা। তাঁদের আমলে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বখতিয়ার খলজির আক্রমণের ফলে সেন শাসনের অবসান ঘটে।
- অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি: এই সময়ে উত্তর ভারতে গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকূট ও চোলদের মতো শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান হয়। কনৌজ দখলের জন্য পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম' নামে পরিচিত।
- ইসলাম ও ভারত: খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে আরবে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতে ইসলামের প্রথম আগমন ঘটে। পরবর্তীকালে, গজনির সুলতান মাহমুদ এবং মহম্মদ ঘুরির নেতৃত্বে তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করে। ১২০৪-০৫ সাল নাগাদ বখতিয়ার খলজি বাংলায় তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| আনুমানিক ৬০৬-'০৭ | শশাঙ্ক গৌড়ের শাসক হন। |
| ৬২২ | হিজরত (মক্কা থেকে মদিনায় গমন) এবং হিজরি সালের গণনা শুরু। |
| ৬৩২ | হজরত মহম্মদের পরলোকগমন। |
| আনুমানিক ৭৫০ | গোপাল রাজা নির্বাচিত হন এবং পাল বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। |
| অষ্টম শতক | কনৌজকে কেন্দ্র করে ত্রিশক্তি সংগ্রামের সূচনা। |
| আনুমানিক ১০০০-১০২৭ | গজনির সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণ। |
| ১১ শতকের দ্বিতীয় ভাগ | বাংলায় কৈবর্ত বিদ্রোহ। |
| ১১৯২ | দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়। |
| আনুমানিক ১২০৪-'০৫ | বখতিয়ার খলজির বাংলা (নদিয়া) জয়। |
| ১২০৬ | মহম্মদ ঘুরির মৃত্যু এবং কুতুবউদ্দিন আইবকের দিল্লিতে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
'বঙ্গ' নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় কোথায়?
(ক) মহাভারতে (খ) অর্থশাস্ত্রে (গ) ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক-এ (ঘ) আইন-ই আকবরি-তে
উত্তর: (গ) ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক-এ
প্রাচীন বাংলার বৃহত্তম অঞ্চল কোনটি ছিল?
(ক) গৌড় (খ) বঙ্গ (গ) পুণ্ড্রবর্ধন (ঘ) সমতট
উত্তর: (গ) পুণ্ড্রবর্ধন
ভাগীরথী ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল কী নামে পরিচিত ছিল?
(ক) বরেন্দ্র (খ) রাঢ় (গ) বঙ্গাল (ঘ) পুণ্ড্রবর্ধন
উত্তর: (ক) বরেন্দ্র
উত্তর রাঢ় এবং দক্ষিণ রাঢ়ের মাঝের সীমানা কোন নদী ছিল?
(ক) দামোদর (খ) অজয় (গ) ভাগীরথী (ঘ) কাঁসাই
উত্তর: (খ) অজয়
শশাঙ্কের রাজধানী কোথায় ছিল?
(ক) গৌড় (খ) তাম্রলিপ্ত (গ) কর্ণসুবর্ণ (ঘ) পুণ্ড্রবর্ধন
উত্তর: (গ) কর্ণসুবর্ণ
হর্ষবর্ধনের সভাকবি কে ছিলেন?
(ক) কালিদাস (খ) সন্ধ্যাকর নন্দী (গ) বাণভট্ট (ঘ) আবুল ফজল
উত্তর: (গ) বাণভট্ট
'মাৎস্যন্যায়'-এর যুগ বলা হয় কোন সময়কে?
(ক) শশাঙ্কের শাসনকালকে (খ) শশাঙ্কের পরবর্তী সময়কে (গ) পাল যুগকে (ঘ) সেন যুগকে
উত্তর: (খ) শশাঙ্কের পরবর্তী সময়কে
পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
(ক) ধর্মপাল (খ) দেবপাল (গ) গোপাল (ঘ) রামপাল
উত্তর: (গ) গোপাল
কৈবর্ত বিদ্রোহের তিনজন নেতা কে কে ছিলেন?
(ক) গোপাল, ধর্মপাল, দেবপাল (খ) দিব্য, রুদোক, ভীম (গ) রামপাল, মহীপাল, রাজ্যপাল (ঘ) সামন্তসেন, হেমন্তসেন, বিজয়সেন
উত্তর: (খ) দিব্য, রুদোক, ভীম
সেন রাজাদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল?
(ক) বাংলা (খ) কনৌজ (গ) কর্ণাট (ঘ) মগধ
উত্তর: (গ) কর্ণাট
'সকলোত্তরপথনাথ' উপাধি কার ছিল?
(ক) শশাঙ্ক (খ) হর্ষবর্ধন (গ) ধর্মপাল (ঘ) প্রথম রাজেন্দ্র চোল
উত্তর: (খ) হর্ষবর্ধন
'গৌড়বহো' কাব্য কে রচনা করেন?
(ক) বাণভট্ট (খ) সন্ধ্যাকর নন্দী (গ) বাকপতিরাজ (ঘ) কালিদাস
উত্তর: (গ) বাকপতিরাজ
ত্রিশক্তি সংগ্রামে কোন শক্তি জড়িত ছিল না?
(ক) পাল (খ) গুর্জর-প্রতিহার (গ) রাষ্ট্রকূট (ঘ) চোল
উত্তর: (ঘ) চোল
'গঙ্গাইকোণ্ডচোল' উপাধি কে গ্রহণ করেন?
(ক) বিজয়ালয় (খ) প্রথম রাজরাজ (গ) প্রথম রাজেন্দ্র চোল (ঘ) দন্তিদুর্গ
উত্তর: (গ) প্রথম রাজেন্দ্র চোল
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক কে?
(ক) আবু বকর (খ) হজরত মহম্মদ (গ) মহম্মদ বিন কাশেম (ঘ) সুলতান মাহমুদ
উত্তর: (খ) হজরত মহম্মদ
প্রথম খলিফা কে ছিলেন?
(ক) হজরত মহম্মদ (খ) আবু বকর (গ) উম্মাইয়া (ঘ) আব্বাস
উত্তর: (খ) আবু বকর
'কিতাব অল-হিন্দ' কার লেখা?
(ক) ফিরদৌসি (খ) অল বিরুনি (গ) মিনহাজ-ই সিরাজ (ঘ) আবুল ফজল
উত্তর: (খ) অল বিরুনি
দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ কবে হয়েছিল?
(ক) ১১৯১ খ্রি: (খ) ১১৯২ খ্রি: (গ) ১২০৪ খ্রি: (ঘ) ১২০৬ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১১৯২ খ্রি:
বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণ করেন কোন রাজার আমলে?
(ক) বল্লালসেন (খ) বিজয়সেন (গ) লক্ষ্মণসেন (ঘ) সামন্তসেন
উত্তর: (গ) লক্ষ্মণসেন
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
প্রাচীন বাংলার প্রধান অঞ্চলগুলির নাম লেখো।
প্রাচীন বাংলার প্রধান অঞ্চলগুলি ছিল পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র, বঙ্গ, বঙ্গাল, রাঢ়, সুহ্ম, গৌড়, সমতট এবং হরিকেল।
'বেঙ্গালা' নামটি কারা দিয়েছিল?
ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপীয় ভ্রমণকারী ও বণিকরা বাংলা অঞ্চলকে 'বেঙ্গালা' নামে অভিহিত করতেন।
শশাঙ্ক ধর্মীয় বিশ্বাসে কী ছিলেন?
শশাঙ্ক ধর্মীয় বিশ্বাসে শৈব অর্থাৎ শিবের উপাসক ছিলেন।
মাৎস্যন্যায় কী?
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় একশো বছর ধরে যে অরাজক পরিস্থিতি চলেছিল, তাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়। এই সময়ে কোনো কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না এবং পুকুরের বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, তেমনি শক্তিশালী লোক দুর্বলদের উপর অত্যাচার করত।
পাল বংশের প্রতিষ্ঠা কীভাবে হয়েছিল?
মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা দূর করার জন্য বাংলার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপাল নামে একজনকে রাজা হিসেবে নির্বাচন করেন। এভাবেই বাংলায় পাল বংশের প্রতিষ্ঠা হয়।
ত্রিশক্তি সংগ্রাম কাদের মধ্যে হয়েছিল? এই সংগ্রামের মূল কারণ কী ছিল?
ত্রিশক্তি সংগ্রাম হয়েছিল বাংলার পাল, পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে। এই সংগ্রামের মূল কারণ ছিল উত্তর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র কনৌজ দখল করা।
কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা কারা ছিলেন?
কৈবর্ত বিদ্রোহের তিনজন প্রধান নেতা ছিলেন দিব্য (দিব্বোক), রুদোক এবং ভীম।
চোল রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?
৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে মুট্টাবাইয়াকে পরাজিত করে বিজয়ালয় চোল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
হিজরত কী?
৬২২ খ্রিস্টাব্দে হজরত মহম্মদ ও তাঁর অনুগামীদের মক্কা থেকে মদিনা শহরে চলে যাওয়াকে আরবি ভাষায় 'হিজরত' বলা হয়। এই ঘটনা থেকেই ইসলামীয় সাল বা হিজরি গণনা শুরু হয়।
খলিফা কথার অর্থ কী?
খলিফা একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ প্রতিনিধি বা উত্তরাধিকারী। হজরত মহম্মদের পর যাঁরা ইসলাম জগতের নেতা হয়েছিলেন, তাঁদের খলিফা বলা হত।
সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
গজনির সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মন্দিরগুলি থেকে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করা। সেই সম্পদ তিনি মধ্য এশিয়ায় তাঁর সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী ও সুসজ্জিত করার কাজে ব্যয় করতেন।
বখতিয়ার খলজি কে ছিলেন?
ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খলজি ছিলেন একজন তুর্কি সেনাপতি। তিনি আনুমানিক ১২০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নদিয়া জয় করে বাংলায় তুর্কি শাসনের সূচনা করেন।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
প্রাচীন বাংলার রাঢ়-সুহ্ম এবং গৌড় অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিচয় দাও।
রাঢ়-সুহ্ম: প্রাচীন রাঢ় অঞ্চল দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল—উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ়। অজয় নদ এই দুই ভাগের সীমানা নির্ধারণ করত। আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার পশ্চিমাংশ, বীরভূম, এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার উত্তরাংশ নিয়ে ছিল উত্তর রাঢ়। অন্যদিকে, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানের বাকি অংশ এবং অজয় ও দামোদর নদের মধ্যবর্তী অঞ্চল দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্গত ছিল। দক্ষিণ রাঢ়কে সুহ্মভূমিও বলা হত।
গৌড়: গৌড় ছিল প্রাচীন বাংলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের পশ্চিম অংশ নিয়ে গৌড় গঠিত হয়েছিল। রাজা শশাঙ্কের আমলে এর ক্ষমতা ও সীমানা বৃদ্ধি পায়। তখন তাঁর রাজধানী কর্ণসুবর্ণকে কেন্দ্র করে গৌড়ের প্রধান এলাকা ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ জেলা। অষ্টম-নবম শতকে গৌড় বলতে সমগ্র পাল সাম্রাজ্যকেও বোঝানো হত।
শশাঙ্কের সঙ্গে বৌদ্ধদের সম্পর্ক কেমন ছিল, সে বিষয়ে তোমার মতামত দাও।
শশাঙ্কের সঙ্গে বৌদ্ধদের সম্পর্ক বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত পাওয়া যায়। কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ, যেমন 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' এবং চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণে শশাঙ্ককে 'বৌদ্ধবিদ্বেষী' হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ করা হয় যে, তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করেন এবং বৌদ্ধদের পবিত্র স্মারক ধ্বংস করেন। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টও শশাঙ্কের নিন্দা করেছেন।
কিন্তু, অন্যদিকে শশাঙ্কের মৃত্যুর কয়েক বছর পরই হিউয়েন সাঙ কর্ণসুবর্ণের কাছে রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহারের সমৃদ্ধি দেখেছিলেন। পঞ্চাশ বছর পর আরেক চিনা পর্যটক ই-ৎসিঙও বাংলায় বৌদ্ধধর্মের উন্নতির কথা উল্লেখ করেছেন। যদি শশাঙ্ক নির্বিচারে বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার করতেন, তাহলে এত অল্প সময়ে বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন সম্ভব হত না। তাই মনে করা হয়, রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি কিছু বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করেছিলেন, কিন্তু তিনি নির্বিচারে বৌদ্ধধর্মের বিরোধী ছিলেন না। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলির বিবরণ সম্ভবত কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল।
ছক ২.১ ভালো করে দেখো। এর থেকে পাল ও সেন শাসনের সংক্ষিপ্ত তুলনা করো।
পাঠ্যবইয়ের ছক অনুযায়ী পাল ও সেন শাসনের তুলনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
- সময়কাল: পালরা প্রায় ৪০০ বছর (৭৫০-১২০০ খ্রিঃ) ধরে বাংলায় শাসন করেছিল, যা বাংলার ইতিহাসে দীর্ঘতম শাসনকাল। তুলনায়, সেনদের শাসনকাল ছিল অনেক সংক্ষিপ্ত, প্রায় দেড়শো বছরের মতো (১১ শতক থেকে ১২০৪/৫ খ্রিঃ)।
- ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা: পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের আমলে অনেক বৌদ্ধবিহার নির্মিত হয় এবং শিক্ষা-শিল্পের বিকাশ ঘটে। অন্যদিকে, সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুসারী। তাঁরা বাংলায় বর্ণপ্রথাকে আরও কঠোর করেন।
- শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি: পাল শাসন বাংলার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত রাজার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। তাঁদের শাসনকালে কৈবর্ত বিদ্রোহের মতো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ঘটেছিল। সেন রাজারা ছিলেন কর্ণাট থেকে আসা বহিরাগত শাসক এবং তাঁদের শাসন তুর্কি আক্রমণের মাধ্যমে শেষ হয়।
দক্ষিণ ভারতে চোল শক্তির উত্থানের পটভূমি বিশ্লেষণ করো। কোন কোন অঞ্চল চোল রাজ্যের অন্তর্গত ছিল?
খ্রিস্টীয় নবম শতকে দক্ষিণ ভারতে পল্লব ও পাণ্ড্যদের শক্তি যখন কমে আসছিল, তখন সেই সুযোগে চোল শক্তির উত্থান ঘটে। কাবেরী নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলে চোলদের আদি বাসভূমি ছিল। ৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে বিজয়ালয় স্থানীয় শাসক মুট্টাবাইয়াকে পরাজিত করে চোল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং থাঞ্জাভুরকে (তাঞ্জোর) রাজধানী বানান।
পরবর্তীকালে, প্রথম রাজরাজ এবং তাঁর পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে চোল সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।
চোল রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চল:
- মূল ভূখণ্ড: চোল রাজ্যের মূল ভিত্তি ছিল বর্তমান তামিলনাড়ু। এছাড়াও কেরল এবং কর্ণাটকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের অধীনে ছিল।
- অন্যান্য অঞ্চল: প্রথম রাজেন্দ্র চোল কল্যাণীর চালুক্য, বাংলার পাল রাজাদের পরাজিত করেন। তাঁদের শক্তিশালী নৌবাহিনীর সাহায্যে তারা মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (শ্রীবিজয়) বিভিন্ন অঞ্চলের উপর আধিপত্য স্থাপন করেছিল।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ২৩-২৪)
১। শূন্যস্থান পূরণ করো:
ক) বঙ্গ নামের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে।
খ) প্রাচীন বাংলার সীমানা তৈরি হয়েছিল ভাগীরথী, পদ্মা, এবং মেঘনা নদী দিয়ে।
গ) সকলোত্তরপথনাথ উপাধি ছিল হর্ষবর্ধনের।
ঘ) কৈবর্ত বিদ্রোহের একজন নেতা ছিলেন ভীম।
ঙ) সেন রাজা লক্ষ্মণসেনের আমলে বাংলায় তুর্কি আক্রমণ ঘটে।
চ) সুলতানি যুগের একজন ঐতিহাসিক ছিলেন মিনহাজ-ই সিরাজ।
২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| বজ্রভূমি | উত্তর রাঢ় |
| লো-টো-চিহ-মো | বৌদ্ধ বিহার |
| গঙ্গাইকোণ্ডচোল | প্রথম রাজেন্দ্র |
| গৌড়বহো | বাকপতিরাজ |
| হরিকেল | আধুনিক চট্টগ্রাম |
| কিতাব অল-হিন্দ | অল বিরুনি |
৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:
ক) এখনকার পশ্চিমবঙ্গের একটি মানচিত্র দেখো। তাতে আদি-মধ্য যুগের বাংলার কোন কোন নদী দেখতে পাবে?
এখনকার পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে আদি-মধ্য যুগের বাংলার অনেক নদীই দেখা যায়। যেমন—ভাগীরথী (হুগলি), দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, কংসাবতী (কাঁসাই), সুবর্ণরেখা, মহানন্দা, তিস্তা, তোর্সা, পুনর্ভবা এবং আত্রাই। এই নদীগুলি আজও পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খ) শশাঙ্কের আমলে বাংলার আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল তা ভেবে লেখো।
শশাঙ্কের আমলে বাংলার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না। যদিও তাঁর সময়ে সোনার মুদ্রা প্রচলিত ছিল, কিন্তু তার মান কমে গিয়েছিল এবং নকল মুদ্রাও দেখা যেত। রুপোর মুদ্রার প্রচলন ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে নগরের গুরুত্ব কমে যায় এবং অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ও গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল।
গ) মাৎস্যন্যায় কী?
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় একশো বছর ধরে যে অরাজক পরিস্থিতি চলেছিল, তাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়। এই সময়ে কোনো কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না এবং পুকুরের বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, তেমনি শক্তিশালী লোক দুর্বলদের উপর অত্যাচার করত।
ঘ) খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকের আঞ্চলিক রাজ্যগুলি কেমন ভাবে গড়ে উঠেছিল?
খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে আঞ্চলিক রাজ্যগুলি গড়ে উঠেছিল। বড় বড় জমির মালিক বা যোদ্ধৃনেতারা 'সামন্ত' বা 'মহাসামন্ত' উপাধি নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। কখনও রাজার দুর্বলতার সুযোগে তাঁরা স্বাধীনভাবে নিজেদের অঞ্চল শাসন করতে শুরু করতেন। এভাবেই রাষ্ট্রকূটদের মতো অনেক নতুন রাজবংশের উত্থান হয়েছিল।
ঙ) সেন রাজাদের আদি নিবাস কোথায় ছিল? কীভাবে তারা বাংলায় শাসন কায়েম করেছিলেন?
সেন রাজাদের আদি নিবাস ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাট অঞ্চলে। পাল শাসনের শেষের দিকে বাংলায় রাজনৈতিক দুর্বলতা ও কৈবর্ত বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সামন্তসেন রাঢ় অঞ্চলে আসেন। তাঁর পুত্র হেমন্তসেন এবং পৌত্র বিজয়সেন ধীরে ধীরে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং পাল রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র বাংলায় সেন শাসন কায়েম করেন।
চ) সুলতান মাহমুদ ভারত থেকে লুঠ করা ধনসম্পদ কী ভাবে ব্যবহার করেছিলেন?
সুলতান মাহমুদ ভারত থেকে লুঠ করা ধনসম্পদ নিজের রাজ্য গজনীকে সাজিয়ে তুলতে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সেখানে অনেক প্রাসাদ, মসজিদ, গ্রন্থাগার, বাগিচা ও জলাধার নির্মাণ করেন। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য বেতন ও বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল।
৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:
(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)
(ক) প্রাচীন বাংলার রাঢ়-সুহ্ম এবং গৌড় অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিচয় দাও।
রাঢ়-সুহ্ম: প্রাচীন রাঢ় অঞ্চল দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল—উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ়। অজয় নদ এই দুই ভাগের সীমানা নির্ধারণ করত। আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার পশ্চিমাংশ, বীরভূম, এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার উত্তরাংশ নিয়ে ছিল উত্তর রাঢ়। অন্যদিকে, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানের বাকি অংশ এবং অজয় ও দামোদর নদের মধ্যবর্তী অঞ্চল দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্গত ছিল। দক্ষিণ রাঢ়কে সুহ্মভূমিও বলা হত।
গৌড়: গৌড় ছিল প্রাচীন বাংলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের পশ্চিম অংশ নিয়ে গৌড় গঠিত হয়েছিল। রাজা শশাঙ্কের আমলে এর ক্ষমতা ও সীমানা বৃদ্ধি পায়। তখন তাঁর রাজধানী কর্ণসুবর্ণকে কেন্দ্র করে গৌড়ের প্রধান এলাকা ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ জেলা। অষ্টম-নবম শতকে গৌড় বলতে সমগ্র পাল সাম্রাজ্যকেও বোঝানো হত।
(খ) শশাঙ্কের সঙ্গে বৌদ্ধদের সম্পর্ক কেমন ছিল, সে বিষয়ে তোমার মতামত দাও।
শশাঙ্কের সঙ্গে বৌদ্ধদের সম্পর্ক বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত পাওয়া যায়। কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ, যেমন 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' এবং চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণে শশাঙ্ককে 'বৌদ্ধবিদ্বেষী' হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ করা হয় যে, তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করেন এবং বৌদ্ধদের পবিত্র স্মারক ধ্বংস করেন। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টও শশাঙ্কের নিন্দা করেছেন।
কিন্তু, অন্যদিকে শশাঙ্কের মৃত্যুর কয়েক বছর পরই হিউয়েন সাঙ কর্ণসুবর্ণের কাছে রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহারের সমৃদ্ধি দেখেছিলেন। পঞ্চাশ বছর পর আরেক চিনা পর্যটক ই-ৎসিঙও বাংলায় বৌদ্ধধর্মের উন্নতির কথা উল্লেখ করেছেন। যদি শশাঙ্ক নির্বিচারে বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার করতেন, তাহলে এত অল্প সময়ে বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন সম্ভব হত না। তাই মনে করা হয়, রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি কিছু বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করেছিলেন, কিন্তু তিনি নির্বিচারে বৌদ্ধধর্মের বিরোধী ছিলেন না। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলির বিবরণ সম্ভবত কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল।