অধ্যায় ৬: নগর, বণিক ও বাণিজ্য
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সময়কালে ভারতে নগর জীবন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এই অধ্যায়ে সুলতানি ও মুঘল আমলের নগরগুলির গঠন, বণিক সম্প্রদায়ের কার্যকলাপ, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি এবং ইউরোপীয় বণিকদের আগমন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
- মধ্যযুগের শহর: এই সময়ে শহরগুলি গড়ে উঠত মূলত প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক বা ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে। দিল্লি ছিল সুলতানি আমলের প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বিভিন্ন সুলতানের আমলে দিল্লিতে একাধিক নতুন শহর (যেমন—সিরি, তুঘলকাবাদ, জাহানপনাহ) গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে, মুঘল সম্রাট শাহ জাহান যমুনার তীরে 'শাহজাহানাবাদ' নামে এক সুবিশাল নতুন রাজধানী শহর তৈরি করেন, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল লালকেল্লা ও জামা মসজিদ।
- বণিক ও বাণিজ্য: সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বেশ উন্নত ছিল। দেশের অভ্যন্তরে গ্রাম থেকে শহরে খাদ্যশস্য এবং এক শহর থেকে অন্য শহরে বিলাসবহুল সামগ্রী রপ্তানি হত। চরকায় সুতো কাটা, কাগজ তৈরি এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পের বিকাশ ঘটে।
- বৈদেশিক বাণিজ্য: জলপথে গুজরাট ও বাংলা থেকে বস্ত্র, চিনি ও মশলা পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি হত। বিনিময়ে আমদানি করা হত উন্নত মানের ঘোড়া, সোনা ও রুপো। স্থলপথে মুলতান ছিল মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
- বাণিজ্যিক ব্যবস্থা: এই সময়ে বাণিজ্যের সুবিধার্থে 'হুন্ডি' (এক ধরনের ব্যাংক ড্রাফট), বিমা ব্যবস্থা এবং মুদ্রা বিনিময়ের জন্য 'সরাফ'-দের আবির্ভাব ঘটে।
- ইউরোপীয় বণিকদের আগমন: পঞ্চদশ শতকের শেষে ভাস্কো দা গামা জলপথে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করলে পোর্তুগিজরা মশলার বাণিজ্যে একাধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে, সপ্তদশ শতকে ইংরেজ, ওলন্দাজ (ডাচ), ফরাসি প্রভৃতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলি ভারতে আসে এবং সুরাট, মসুলিপটনম, হুগলি, চন্দননগর, কলকাতায় তাদের বাণিজ্য 'কুঠি' স্থাপন করে।
গুরুত্বপূর্ণ সাল এবং ঘটনা
| সাল (খ্রিস্টাব্দ) | ঘটনা |
|---|---|
| আনুমানিক ১৩০৩ | আলাউদ্দিন খলজি কর্তৃক সিরি শহর নির্মাণ। |
| আনুমানিক ১৩২১ | গিয়াসউদ্দিন তুঘলক কর্তৃক তুঘলকাবাদ নির্মাণ। |
| ১৩৯৮ | তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণ। |
| ১৪৯৮ | ভাস্কো দা গামার কালিকট বন্দরে আগমন। |
| ১৫০৫ | সুলতান সিকান্দর লোদির আগ্রা শহরের বিকাশ শুরু। |
| ১৬০০ | ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা। |
| ১৬০২ | ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা। |
| ১৬৩৯ | শাহ জাহান কর্তৃক শাহজাহানাবাদ শহরের পত্তন। |
| ১৬৬৪ | ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা। |
অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর
এই বিভাগে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
'শহর' কথাটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?
(ক) সংস্কৃত (খ) আরবি (গ) ফারসি (ঘ) তুর্কি
উত্তর: (গ) ফারসি
মহাভারতে উল্লিখিত দিল্লির আদি নাম কী?
(ক) হস্তিনাপুর (খ) ইন্দ্রপ্রস্থ (গ) পাটলিপুত্র (ঘ) কনৌজ
উত্তর: (খ) ইন্দ্রপ্রস্থ
সুলতানি আমলের প্রথম দিল্লি কোনটি ছিল?
(ক) সিরি (খ) তুঘলকাবাদ (গ) কিলা রাই পিথোরা (ঘ) জাহানপনাহ
উত্তর: (গ) কিলা রাই পিথোরা
সিরি শহরটি কোন সুলতান নির্মাণ করেন?
(ক) ইলতুৎমিস (খ) বলবন (গ) আলাউদ্দিন খলজি (ঘ) মহম্মদ বিন তুঘলক
উত্তর: (গ) আলাউদ্দিন খলজি
তুঘলকাবাদ শহরটি কে নির্মাণ করেন?
(ক) গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (খ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক (ঘ) নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ
উত্তর: (ক) গিয়াসউদ্দিন তুঘলক
'হনুজ দিল্লি দূর অস্ত' – উক্তিটি কার?
(ক) গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (খ) আমির খসরু (গ) নিজামউদ্দিন আউলিয়া (ঘ) ইবন বতুতা
উত্তর: (গ) নিজামউদ্দিন আউলিয়া
ফিরোজ শাহ কোটলা কে নির্মাণ করেন?
(ক) গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (খ) মুহাম্মদ বিন তুঘলক (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক (ঘ) সিকান্দর লোদি
উত্তর: (গ) ফিরোজ শাহ তুঘলক
দিল্লির সুলতানি আমলের ছোটো শহরতলিকে কী বলা হত?
(ক) মহল্লা (খ) পরগনা (গ) কসবা (ঘ) গঞ্জ
উত্তর: (গ) কসবা
'হৌজ-ই-শামসি' কে খনন করান?
(ক) কুতুবউদ্দিন আইবক (খ) ইলতুৎমিস (গ) বলবন (ঘ) আলাউদ্দিন খলজি
উত্তর: (খ) ইলতুৎমিস
কোন সুলতানের সময় আগ্রা রাজধানীর মর্যাদা পায়?
(ক) বহলোল লোদি (খ) সিকান্দর লোদি (গ) ইব্রাহিম লোদি (ঘ) শের শাহ
উত্তর: (খ) সিকান্দর লোদি
আকবরের নতুন রাজধানী ফতেপুর সিকরি কোথায় অবস্থিত ছিল?
(ক) আগ্রার কাছে (খ) দিল্লির কাছে (গ) লাহোরের কাছে (ঘ) এলাহাবাদের কাছে
উত্তর: (ক) আগ্রার কাছে
শাহজাহানাবাদ শহরটি কোন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?
(ক) গঙ্গা (খ) যমুনা (গ) শতদ্রু (ঘ) সিন্ধু
উত্তর: (খ) যমুনা
শাহজাহানাবাদের প্রধান স্থাপত্য কোনটি ছিল?
(ক) জামা মসজিদ (খ) তাজমহল (গ) লালকেল্লা (ঘ) হুমায়ুনের সমাধি
উত্তর: (গ) লালকেল্লা (কিলা মুবারক)
দিল্লির চাঁদনি চক কে তৈরি করিয়েছিলেন?
(ক) শাহ জাহান (খ) নূরজাহান (গ) মমতাজ মহল (ঘ) জাহান আরা
উত্তর: (ঘ) জাহান আরা
সুলতানি আমলে রুপোর মুদ্রাকে কী বলা হত?
(ক) জিতল (খ) মোহর (গ) দাম (ঘ) তঙ্কা
উত্তর: (ঘ) তঙ্কা
মুঘল আমলের প্রধান মুদ্রা কোনটি ছিল?
(ক) রুপায়া (রুপোর মুদ্রা) (খ) মোহর (সোনার মুদ্রা) (গ) দাম (তামার মুদ্রা) (ঘ) হোন (সোনার মুদ্রা)
উত্তর: (ক) রুপায়া (রুপোর মুদ্রা)
সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতে কীসের আমদানি সবচেয়ে বেশি হত?
(ক) বস্ত্র (খ) মশলা (গ) ঘোড়া (ঘ) সোনা
উত্তর: (গ) ঘোড়া
মুঘল আমলে ভারতের প্রধান বন্দর কোনটি ছিল?
(ক) কালিকট (খ) হুগলি (গ) মসুলিপটনম (ঘ) সুরাট
উত্তর: (ঘ) সুরাট
স্থলপথে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র কোনটি ছিল?
(ক) লাহোর (খ) কাবুল (গ) মুলতান (ঘ) পেশোয়ার
উত্তর: (গ) মুলতান
মুদ্রা বিনিময়কারী বণিকদের কী বলা হত?
(ক) দালাল (খ) সরাফ (গ) বনজারা (ঘ) মুলতানি
উত্তর: (খ) সরাফ
ভাস্কো দা গামা কবে কালিকট বন্দরে আসেন?
(ক) ১৪৯২ খ্রি: (খ) ১৪৯৮ খ্রি: (গ) ১৫০০ খ্রি: (ঘ) ১৫০২ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৪৯৮ খ্রি:
ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
(ক) ১৬০০ খ্রি: (খ) ১৬০২ খ্রি: (গ) ১৬৩২ খ্রি: (ঘ) ১৬৬৪ খ্রি:
উত্তর: (খ) ১৬০২ খ্রি:
বাংলায় ফরাসিদের প্রধান বাণিজ্য কুঠি কোথায় ছিল?
(ক) চুঁচুড়া (খ) শ্রীরামপুর (গ) কলকাতা (ঘ) চন্দননগর
উত্তর: (ঘ) চন্দননগর
দিনেমার কাদের বলা হত?
(ক) নেদারল্যান্ডসের অধিবাসীদের (খ) ডেনমার্কের অধিবাসীদের (গ) পর্তুগালের অধিবাসীদের (ঘ) ফ্রান্সের অধিবাসীদের
উত্তর: (খ) ডেনমার্কের অধিবাসীদের
ইউরোপীয় বণিকরা ভারতীয় কারিগরদের যে অগ্রিম অর্থ দিত, তাকে কী বলা হত?
(ক) হুন্ডি (খ) দাদন (গ) কর (ঘ) ভেট
উত্তর: (খ) দাদন
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
কী কী ভাবে মধ্য যুগের ভারতে শহর গড়ে উঠত?
মধ্যযুগে ভারতে শহর গড়ে উঠত মূলত তিনটি কারণে: (১) প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে, (২) ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বা বন্দর হিসেবে, এবং (৩) মন্দির, মসজিদ বা দরগার মতো ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে।
কেন সুলতানদের সময়কার পুরোনো দিল্লির আস্তে আস্তে ক্ষয় হয়েছিল?
সুলতানদের সময়কার পুরোনো দিল্লির (কুতুব দিল্লি) ক্ষয় হয়েছিল মূলত দুটি কারণে: (১) জলের অভাব, কারণ শহরটি যমুনা নদী থেকে দূরে ছিল; এবং (২) ফিরোজ শাহ তুঘলক নদীর তীরে ফিরোজাবাদ নামে নতুন শহর তৈরি করায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সেদিকে সরে যায়।
কেন, কোথায় শাহজাহানাবাদ শহরটি গড়ে উঠেছিল?
মুঘল সম্রাট শাহ জাহান আগ্রার ঘিঞ্জি পরিবেশ ও যমুনার ভাঙনের কারণে একটি নতুন রাজধানী তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই তিনি ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির যমুনা নদীর পশ্চিমে একটি উঁচু জায়গায় 'শাহজাহানাবাদ' নামে এক সুবিশাল ও সুপরিকল্পিত শহর গড়ে তোলেন।
ইউরোপীয় কোম্পানির কুঠিগুলি কেমন ছিল?
ইউরোপীয় কোম্পানির কুঠিগুলি ছিল মূলত সুরক্ষিত বাণিজ্য কেন্দ্র। এগুলির চারপাশে প্রাচীর থাকত এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দুর্গের মতো সুরক্ষিত করা হত। কুঠির ভেতরে বণিকদের বাসস্থান, অফিস এবং পণ্যের গুদাম বা গুদামঘর থাকত।
মুঘল শাসকরা কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন?
মুঘল শাসকরা বণিকদের উপর শুল্ক ছাড় দিয়ে, তাদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দিয়ে এবং রাস্তাঘাট ও সরাইখানা তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন। তাঁরা রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখতেন, যা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য অপরিহার্য ছিল।
'হজরত-ই-দিল্লি' নামের কারণ কী?
ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের ফলে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র বাগদাদ ধ্বংস হয়ে গেলে বহু সুফি সাধক, পণ্ডিত ও শিল্পী দিল্লিতে এসে আশ্রয় নেন। দিল্লি সুফি সাধকদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় এর নাম হয় 'হজরত-ই-দিল্লি' (মহান দিল্লি)।
কসবা কী?
সুলতানি আমলে বড় শহরের আশেপাশে যে ছোটো ছোটো শহরতলি গড়ে উঠত, সেগুলিকে কসবা বলা হত। এগুলি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা থাকত না এবং এখানে মূলত কারিগর ও ছোট ব্যবসায়ীরা বাস করত।
'নেহর-ই-বিহিস্ত' কী?
শাহজাহানাবাদ শহরে জল সরবরাহের জন্য যে নালা বা খাল কাটা হয়েছিল, তাকে 'নেহর-ই-বিহিস্ত' বা 'স্বর্গের খাল' বলা হত। এটি শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত এবং জলকষ্ট দূর করত।
হুন্ডি কী?
হুন্ডি হলো এক ধরনের কাগজ বা দলিল, যা মধ্যযুগে ব্যাঙ্ক ড্রাফটের মতো কাজ করত। বণিকরা এক জায়গায় সরাফকে টাকা জমা দিয়ে একটি হুন্ডি কিনে নিত এবং অন্য শহরে গিয়ে সেই হুন্ডি দেখিয়ে টাকা তুলে নিতে পারত। এর ফলে দূরপাল্লার বাণিজ্যে নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি কমে যায়।
ভাস্কো দা গামা কেন ভারতে এসেছিলেন?
ভাস্কো দা গামার ভারতে আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের সঙ্গে ভারতের মশলা, বিশেষ করে গোলমরিচের সরাসরি বাণিজ্য পথ আবিষ্কার করা। তিনি আরব বণিকদের এড়িয়ে সরাসরি মশলা কিনে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করতে চেয়েছিলেন।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছিল?
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি বিভিন্ন রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছিল।
১. ভৌগোলিক অবস্থান: আরাবল্লি পর্বতমালা ও যমুনা নদীর মাঝে সুরক্ষিত অবস্থান শহরটিকে প্রাকৃতিক নিরাপত্তা দিয়েছিল। যমুনা নদী ছিল জলপথ ও জল সরবরাহের প্রধান উৎস।
২. রাজনৈতিক কেন্দ্র: কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিকে কেন্দ্র করে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর এটি উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৩. সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলরা বাগদাদ ধ্বংস করলে মধ্য এশিয়া থেকে বহু পণ্ডিত, শিল্পী ও সুফি সাধক দিল্লিতে এসে আশ্রয় নেন। এর ফলে দিল্লি ইসলামীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক নতুন পীঠস্থানে পরিণত হয় এবং 'হজরত-ই-দিল্লি' নামে পরিচিতি লাভ করে।
৪. বাণিজ্যিক গুরুত্ব: রাজনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় দিল্লি একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও পরিণত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বণিকরা পণ্য নিয়ে আসত।
শাহজাহানাবাদের নাগরিক চরিত্র কেমন ছিল?
শাহজাহানাবাদ ছিল একটি সুপরিকল্পিত এবং মিশ্র সংস্কৃতির শহর। এর নাগরিক চরিত্র ছিল বৈচিত্র্যময়।
- বসতি: শহরে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতিভিত্তিক এলাকা ছিল না। একই মহল্লায় আমির-ওমরাহদের বিশাল হাভেলির পাশে সাধারণ কারিগর বা সৈনিকদের ছোট ছোট 'কোঠরি' বা কুঁড়েঘর থাকত। ধনী-দরিদ্রের বাসস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, তারা পাশাপাশি বসবাস করত।
- অর্থনৈতিক জীবন: চাঁদনি চকের মতো বিশাল বাজার ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে দেশ-বিদেশের বণিকরা আসত। শহরের অর্থনীতি ছিল মূলত রাজদরবার এবং অভিজাতদের চাহিদার উপর নির্ভরশীল।
- সাংস্কৃতিক জীবন: শাহজাহানাবাদ ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতের কেন্দ্র। এখানে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ বিভিন্ন উৎসবে, যেমন—দেওয়ালি বা মহরমে, একসঙ্গে অংশগ্রহণ করত। সুফি সাধকদের দরগাগুলি ছিল উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনস্থল।
দিল্লির সুলতানদের আমলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার কেন ঘটেছিল?
দিল্লির সুলতানদের আমলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারের পিছনে একাধিক কারণ ছিল।
- শহরের প্রসার: সুলতানরা দিল্লি-সহ अनेक নতুন শহর তৈরি করেন। এই শহরগুলিতে সুলতান, অভিজাত, সৈন্য এবং সাধারণ মানুষের বসবাসের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও বিলাসবহুল সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে, যা বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে।
- নগদ রাজস্ব: আলাউদ্দিন খলজির মতো সুলতানরা কৃষকদের কাছ থেকে নগদে রাজস্ব আদায় করা শুরু করেন। নগদ টাকা জোগাড় করার জন্য কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বণিকদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হত, যা অভ্যন্তরীণ শস্য-বাণিজ্যকে বাড়িয়ে তোলে।
- যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি: সুলতানরা রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার করেন এবং পথিক ও বণিকদের নিরাপত্তার জন্য রাস্তার ধারে সরাইখানা তৈরি করেন। এর ফলে দূরপাল্লার বাণিজ্য সহজ ও নিরাপদ হয়।
- মুদ্রা ব্যবস্থা: ইলতুৎমিসের প্রবর্তিত 'তঙ্কা' ও 'জিতল'-এর মতো উন্নত মানের মুদ্রা বিনিময় প্রথাকে সহজ করে তোলে এবং বাণিজ্যের প্রসারে সাহায্য করে।
মধ্য যুগে ভারতে দেশের ভেতরে বাণিজ্যের ধরনগুলি কেমন ছিল তা লেখো।
মধ্যযুগে ভারতে দেশের ভেতরের বাণিজ্য মূলত দুই ধরনের ছিল:
১. গ্রাম ও শহরের বাণিজ্য: এটি ছিল সবচেয়ে widespread বাণিজ্য। গ্রামগুলি ছিল মূলত উৎপাদন কেন্দ্র এবং শহরগুলি ছিল ভোগ বা ব্যবহারের কেন্দ্র। গ্রাম থেকে প্রচুর পরিমাণে কমদামি কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন—খাদ্যশস্য, তেল, ঘি, আনাজ, ফল, লবণ ইত্যাদি গরুর গাড়িতে বা নৌকায় করে শহরের বাজারে নিয়ে আসা হত।
২. দুটি শহরের মধ্যে বাণিজ্য: এই বাণিজ্যে মূলত বেশি দামি ও শৌখিন জিনিসপত্রের লেনদেন হত। এক শহরের দক্ষ কারিগরদের তৈরি জিনিস অন্য শহরের ধনী অভিজাতদের জন্য পাঠানো হত। যেমন, বাংলা, করমণ্ডল ও গুজরাটের সুতি ও রেশম বস্ত্র, দামি মদ, চামড়া বা ধাতুর তৈরি সামগ্রী, গালিচা ইত্যাদি এক শহর থেকে অন্য শহরে রপ্তানি হত।
এই দুই ধরনের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে হাট, গঞ্জ, মন্ডি গড়ে উঠেছিল এবং করওয়ানি, বনজারার মতো ভ্রাম্যমাণ বণিক গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির আমদানি-রপ্তানির রেখচিত্র দেখে ওই যুগের বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা হয়?
রেখচিত্রটি থেকে ওই যুগের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে কয়েকটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়:
- ত্রিমুখী বাণিজ্য: এটি একটি ত্রিমুখী বাণিজ্যের ছবি তুলে ধরে, যেখানে ইউরোপ, এশিয়া (ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং আমেরিকা যুক্ত ছিল।
- ভারতের রপ্তানি: ভারত থেকে প্রধানত শিল্পজাত পণ্য, যেমন—সুতি ও রেশম বস্ত্র এবং কৃষিজাত পণ্য, যেমন—গোলমরিচ, নীল, সোরা, আফিম ইত্যাদি ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি হত। এর থেকে বোঝা যায়, ভারতের বস্ত্রশিল্প ও কৃষিপণ্যের বিশ্বজোড়া চাহিদা ছিল।
- ভারতের আমদানি: ভারত মূলত মূল্যবান ধাতু, যেমন—সোনা ও রুপো আমদানি করত। আমেরিকা থেকে রুপো ইউরোপ হয়ে ভারতে আসত। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মশলা, টিন, তামা আমদানি করা হত। এটি প্রমাণ করে যে, ভারতের রপ্তানির পরিমাণ আমদানির চেয়ে বেশি ছিল এবং বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে ছিল।
- ইউরোপের ভূমিকা: ইউরোপীয় বণিকরা ছিল এই বাণিজ্যের মধ্যস্থতাকারী। তারা আমেরিকা থেকে রুপো এনে ভারতের জিনিস কিনত এবং সেই জিনিস ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য বাজারে বিক্রি করে লাভ করত।
পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তর (পৃষ্ঠা নং ১১০-১১১)
১। নীচের নামগুলির মধ্যে কোনটি বাকিগুলির সঙ্গে মিলছে না তার তলায় দাগ দাও:
ক) শাহজাহানাবাদ, তুঘলকাবাদ, কিলা রাই পিথোরা, দৌলতাবাদ। (দৌলতাবাদ দাক্ষিণাত্যে, বাকিগুলি দিল্লিতে।)
খ) তঙ্কা, মোহর, হুন্ডি, জিতল। (হুন্ডি একটি কাগজ, বাকিগুলি ধাতব মুদ্রা।)
গ) নীল, গোলমরিচ, সুতি বস্ত্র, রুপো। (রুপো আমদানি করা হত, বাকিগুলি রপ্তানি করা হত।)
ঘ) করওয়ানি, কসবা, বনজারা, মুলতানি। (কসবা একটি স্থান, বাকিগুলি বণিক গোষ্ঠী।)
ঙ) পান্ডুয়া, বুরহানপুর, চট্টগ্রাম, গৌড়। (বুরহানপুর দাক্ষিণাত্যে, বাকিগুলি বাংলায়।)
২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো:
| ক-স্তম্ভ | খ-স্তম্ভ |
|---|---|
| সিরি | আলাউদ্দিন খলজি |
| দিনেমার | ডেনমার্কের অধিবাসী |
| সরাফ | মুদ্রা বিনিময়কারী |
| চিরাগ-ই দিল্লি | শেখ নাসিরউদ্দিন |
| হৌজ | জল সংরক্ষণ |
৩। সংক্ষেপে (৩০-৩৫ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও:
ক) কী কী ভাবে মধ্য যুগের ভারতে শহর গড়ে উঠত?
মধ্যযুগে ভারতে শহর গড়ে উঠত মূলত তিনটি কারণে: (১) প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে, (২) ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বা বন্দর হিসেবে, এবং (৩) মন্দির, মসজিদ বা দরগার মতো ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে।
খ) কেন সুলতানদের সময়কার পুরোনো দিল্লির আস্তে আস্তে ক্ষয় হয়েছিল?
সুলতানদের সময়কার পুরোনো দিল্লির (কুতুব দিল্লি) ক্ষয় হয়েছিল মূলত দুটি কারণে: (১) জলের অভাব, কারণ শহরটি যমুনা নদী থেকে দূরে ছিল; এবং (২) ফিরোজ শাহ তুঘলক নদীর তীরে ফিরোজাবাদ নামে নতুন শহর তৈরি করায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সেদিকে সরে যায়।
গ) কেন, কোথায় শাহজাহানাবাদ শহরটি গড়ে উঠেছিল?
মুঘল সম্রাট শাহ জাহান আগ্রার ঘিঞ্জি পরিবেশ ও যমুনার ভাঙনের কারণে একটি নতুন রাজধানী তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই তিনি ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির যমুনা নদীর পশ্চিমে একটি উঁচু জায়গায় 'শাহজাহানাবাদ' নামে এক সুবিশাল ও সুপরিকল্পিত শহর গড়ে তোলেন।
ঘ) ইউরোপীয় কোম্পানির কুঠিগুলি কেমন ছিল?
ইউরোপীয় কোম্পানির কুঠিগুলি ছিল মূলত সুরক্ষিত বাণিজ্য কেন্দ্র। এগুলির চারপাশে প্রাচীর থাকত এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দুর্গের মতো সুরক্ষিত করা হত। কুঠির ভেতরে বণিকদের বাসস্থান, অফিস এবং পণ্যের গুদাম বা গুদামঘর থাকত।
ঙ) মুঘল শাসকরা কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন?
মুঘল শাসকরা বণিকদের উপর শুল্ক ছাড় দিয়ে, তাদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দিয়ে এবং রাস্তাঘাট ও সরাইখানা তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন। তাঁরা রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখতেন, যা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য অপরিহার্য ছিল।
৪। বিশদে (১০০-১২০ টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো:
(শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভাষায় লেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হল।)
(ক) খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছিল?
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি বিভিন্ন রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছিল।
১. ভৌগোলিক অবস্থান: আরাবল্লি পর্বতমালা ও যমুনা নদীর মাঝে সুরক্ষিত অবস্থান শহরটিকে প্রাকৃতিক নিরাপত্তা দিয়েছিল। যমুনা নদী ছিল জলপথ ও জল সরবরাহের প্রধান উৎস।
২. রাজনৈতিক কেন্দ্র: কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিকে কেন্দ্র করে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর এটি উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৩. সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলরা বাগদাদ ধ্বংস করলে মধ্য এশিয়া থেকে বহু পণ্ডিত, শিল্পী ও সুফি সাধক দিল্লিতে এসে আশ্রয় নেন। এর ফলে দিল্লি ইসলামীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক নতুন পীঠস্থানে পরিণত হয় এবং 'হজরত-ই-দিল্লি' নামে পরিচিতি লাভ করে।
৪. বাণিজ্যিক গুরুত্ব: রাজনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় দিল্লি একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও পরিণত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বণিকরা পণ্য নিয়ে আসত।
(খ) শাহজাহানাবাদের নাগরিক চরিত্র কেমন ছিল?
শাহজাহানাবাদ ছিল একটি সুপরিকল্পিত এবং মিশ্র সংস্কৃতির শহর। এর নাগরিক চরিত্র ছিল বৈচিত্র্যময়।
- বসতি: শহরে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতিভিত্তিক এলাকা ছিল না। একই মহল্লায় আমির-ওমরাহদের বিশাল হাভেলির পাশে সাধারণ কারিগর বা সৈনিকদের ছোট ছোট 'কোঠরি' বা কুঁড়েঘর থাকত। ধনী-দরিদ্রের বাসস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, তারা পাশাপাশি বসবাস করত।
- অর্থনৈতিক জীবন: চাঁদনি চকের মতো বিশাল বাজার ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে দেশ-বিদেশের বণিকরা আসত। শহরের অর্থনীতি ছিল মূলত রাজদরবার এবং অভিজাতদের চাহিদার উপর নির্ভরশীল।
- সাংস্কৃতিক জীবন: শাহজাহানাবাদ ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতের কেন্দ্র। এখানে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ বিভিন্ন উৎসবে, যেমন—দেওয়ালি বা মহরমে, একসঙ্গে অংশগ্রহণ করত। সুফি সাধকদের দরগাগুলি ছিল উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনস্থল।