অধ্যায় ১১: আমাদের চারপাশের পরিবেশ ও উদ্ভিদজগৎ

Sk Rejoyanul Kerim
Sk Rejoyanul Kerim

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

আমাদের চারপাশের উদ্ভিদজগৎ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মানুষের জীবনে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। এই অধ্যায়ে আমরা বাঁশ, কচুরিপানা, শাল, সুন্দরী-র মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ এবং মশলা ও ওষধি গাছের ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে জানব।

  • বাঁশ: এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল, বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি কাগজ তৈরি, ঘরবাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি এবং জায়েন্ট পান্ডার মতো প্রাণীদের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • কচুরিপানা: এটি একটি ভাসমান জলজ উদ্ভিদ যা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এটি জল দূষণকারী ভারী ধাতু শোষণ করতে পারে এবং বায়োগ্যাস ও জৈব সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে এর অতিরিক্ত বৃদ্ধি জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে।
  • শাল: এটি একটি পর্ণমোচী বৃক্ষ, যার কাঠ খুব শক্ত ও টেকসই। রেলের স্লিপার, আসবাবপত্র এবং বাড়ির কাঠামো তৈরিতে এর কাঠ ব্যবহৃত হয়। শালপাতা দিয়ে থালা-বাটি তৈরি হয় এবং এর আঠা থেকে ধুনো পাওয়া যায়।
  • সুন্দরী: এটি সুন্দরবনের একটি লবণাম্বু বা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। এর শ্বাসমূল ও ঠেসমূল দেখা যায়। এর কাঠ নৌকা ও আসবাবপত্র তৈরিতে এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • মশলা ও গাছ: আমরা উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ যেমন - ছাল (দারচিনি), ফল (গোলমরিচ), বীজ (সর্ষে), কন্দ (আদা, হলুদ) ইত্যাদি থেকে মশলা পাই। মশলা খাবারের স্বাদ বাড়ায় এবং সংরক্ষক হিসেবেও কাজ করে।
  • ওষধি গাছ: নিম, বেল, আমলকী, নয়নতারা, পুদিনা, ঘৃতকুমারী ইত্যাদি গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে নানা রোগের ওষুধ তৈরি হয়। যেমন - নিমের জীবাণুনাশক ক্ষমতা আছে, আমলকীতে প্রচুর ভিটামিন C থাকে এবং নয়নতারা থেকে ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)

  1. কোন উদ্ভিদটি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়?

    • (ক) শাল
    • (খ) সুন্দরী
    • (গ) বাঁশ
    • (ঘ) নিম

    উত্তর: (গ) বাঁশ

  2. জায়েন্ট পান্ডার প্রধান খাদ্য কী?

    • (ক) শালপাতা
    • (খ) বাঁশের কান্ড
    • (গ) সুন্দরী ফল
    • (ঘ) কচুরিপানা

    উত্তর: (খ) বাঁশের কান্ড

  3. কোন উদ্ভিদ জল থেকে ভারী ধাতু শোষণ করে জলকে দূষণমুক্ত করতে পারে?

    • (ক) শাল
    • (খ) কচুরিপানা
    • (গ) নিম
    • (ঘ) পুদিনা

    উত্তর: (খ) কচুরিপানা

  4. শ্বাসমূল (Pneumatophore) কোন গাছে দেখা যায়?

    • (ক) শাল
    • (খ) বেল
    • (গ) বাঁশ
    • (ঘ) সুন্দরী

    উত্তর: (ঘ) সুন্দরী

  5. দারচিনি গাছের কোন অংশ থেকে পাওয়া যায়?

    • (ক) ফল
    • (খ) বীজ
    • (গ) ছাল
    • (ঘ) মূল

    উত্তর: (গ) ছাল

  6. হলুদে উপস্থিত কোন যৌগটির জীবাণুনাশক ক্ষমতা আছে?

    • (ক) পিপেরাইন
    • (খ) ইউজিনল
    • (গ) কারকিউমিন
    • (ঘ) অ্যালিসিন

    উত্তর: (গ) কারকিউমিন

  7. ব্লাড ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে কোন উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়?

    • (ক) নিম
    • (খ) আমলকী
    • (গ) নয়নতারা
    • (ঘ) ঘৃতকুমারী

    উত্তর: (গ) নয়নতারা

  8. শাল গাছের শুকনো পাতা কী কাজে লাগে?

    • (ক) ওষুধ তৈরিতে
    • (খ) থালা-বাটি তৈরিতে
    • (গ) কাগজ তৈরিতে
    • (ঘ) সুগন্ধি তৈরিতে

    উত্তর: (খ) থালা-বাটি তৈরিতে

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

  1. দুটি ওষধি গাছের নাম লেখো।

    উত্তর: দুটি ওষধি গাছ হলো নিম এবং আমলকী।

  2. * ঠেসমূল কাকে বলে?

    উত্তর: সুন্দরী গাছের মতো নরম মাটিতে জন্মানো গাছকে যান্ত্রিক অবলম্বন দেওয়ার জন্য কাণ্ডের নীচের দিক থেকে কিছু অস্থানিক মূল বেরিয়ে আসে এবং মাটিতে প্রবেশ করে। এই মূলগুলোকে ঠেসমূল (Stilt Root) বলে।

  3. গোলমরিচের তীক্ষ্ণ স্বাদের জন্য দায়ী যৌগটির নাম কী?

    উত্তর: গোলমরিচের তীক্ষ্ণ স্বাদের জন্য দায়ী যৌগটি হলো পিপেরাইন।

  4. কচুরিপানার দুটি উপকারী ভূমিকা উল্লেখ করো।

    উত্তর: কচুরিপানার দুটি উপকারী ভূমিকা হলো: (১) এটি দূষিত জল থেকে ক্যাডমিয়াম, লেড, মার্কারির মতো ভারী ধাতু শোষণ করে জলকে শোধন করে। (২) এটি বায়োগ্যাস এবং জৈব সার তৈরির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

  5. গরমমশলা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এমন তিনটি মশলার নাম লেখো।

    উত্তর: গরমমশলা তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি মশলা হলো লবঙ্গ, এলাচ এবং দারচিনি।

  6. 'ত্রিফলা'-তে কোন তিনটি ফল থাকে?

    উত্তর: 'ত্রিফলা'-তে সমপরিমাণে আমলকী, হরিতকি এবং বহেড়া থাকে।

  7. নয়নতারা গাছ থেকে প্রাপ্ত কোন দুটি উপক্ষার ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়?

    উত্তর: নয়নতারা থেকে প্রাপ্ত ভিনক্রিস্টিন (Vincristine) এবং ভিনব্লাস্টিন (Vinblastine) নামক দুটি উপক্ষার ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

  8. শাল গাছের কাঠ কী কী কাজে লাগে?

    উত্তর: শাল গাছের কাঠ খুব শক্ত হওয়ায় খুঁটি, আসবাবপত্র, জানালা-দরজার ফ্রেম, নৌকা, সেতু ইত্যাদি তৈরির কাজে লাগে।

রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)

  1. * পরিবেশ ও মানবজীবনে বাঁশ গাছের গুরুত্ব আলোচনা করো।

    উত্তর:
    পরিবেশ ও মানবজীবনে বাঁশ গাছের গুরুত্ব অপরিসীম।
    পরিবেশগত গুরুত্ব:
    ১. বাঁশ একটি দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ হওয়ায় এটি দ্রুত কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন বাতাসে ত্যাগ করে পরিবেশকে শুদ্ধ রাখে।
    ২. চিনের জায়েন্ট পান্ডা, ভারতের রেড পান্ডা এবং আফ্রিকার গরিলার মতো অনেক বিপন্ন প্রাণীর প্রধান খাদ্য হলো বাঁশ।

    মানবজীবনে গুরুত্ব:
    ১. নির্মাণ শিল্পে: ঘরবাড়ি, সাঁকো, এবং আসবাবপত্র তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ হিসেবে বাঁশ ব্যবহৃত হয়।
    ২. খাদ্য হিসেবে: বাঁশের কচি কাণ্ড বা কোঁড়ল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
    ৩. শিল্পে: কাগজ, ঝুড়ি, ছাতার বাট, ফুলদানি, খেলনা ইত্যাদি তৈরিতে বাঁশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
    ৪. ওষুধ হিসেবে: Bambusa arundinacea নামক বাঁশ থেকে 'তবাশির' নামক ওষুধ প্রস্তুত হয় যা হাঁপানি ও সর্দিকাশির চিকিৎসায় লাগে।

  2. মশলা কী? আমাদের জীবনে মশলার চারটি ব্যবহার লেখো।

    উত্তর:
    মশলা হলো উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ (যেমন - ফল, বীজ, ছাল, মূল, কন্দ ইত্যাদি) যা শুকিয়ে বা তাজা অবস্থায় খাবারে বিশেষ স্বাদ, গন্ধ ও রং আনার জন্য ব্যবহার করা হয়।

    আমাদের জীবনে মশলার চারটি ব্যবহার নিচে দেওয়া হলো:
    ১. খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বৃদ্ধি: মশলা (যেমন- এলাচ, দারচিনি, গোলমরিচ) বিভিন্ন রান্নায় সুগন্ধ এবং আকর্ষণীয় স্বাদ আনতে সাহায্য করে।
    ২. খাদ্য সংরক্ষক হিসেবে: লবঙ্গের মতো মশলাতে জীবাণুনাশক ক্ষমতা থাকায় এটি আচার, চাটনি বা মাংস সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়, যা খাবারকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করে।
    ৩. হজমে সাহায্যকারী: আদা, জোয়ান, মৌরি ইত্যাদি মশলা লালারসের ক্ষরণ বাড়িয়ে খাবার হজম করতে সাহায্য করে এবং গ্যাস বা অম্বলের সমস্যা দূর করে।
    ৪. ওষধি গুণ: হলুদ (জীবাণুনাশক), রসুন (হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী), মেথি (ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে) ইত্যাদি মশলার ওষধি গুণ থাকায় এগুলি বিভিন্ন রোগের প্রতিরোধ ও নিরাময়ে সাহায্য করে।

  3. নিম এবং আমলকী গাছের ওষধি গুণ সম্পর্কে আলোচনা করো।

    উত্তর:
    নিম গাছের ওষধি গুণ:
    নিম একটি অত্যন্ত উপকারী ওষধি গাছ, যার প্রতিটি অংশই কাজে লাগে।
    ১. জীবাণুনাশক: নিম পাতা ও মূলের অ্যান্টিবায়োটিক গুণ আছে। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক প্রতিরোধ করে। তাই চর্মরোগ সারাতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
    ২. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে: নিমপাতার রস রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে, তাই বহুমূত্র রোগে এটি উপকারী।
    ৩. দাঁতের যত্নে: দাঁত ও মাড়ির ব্যথায় নিমের তেল ও ডাল খুব কার্যকরী। অনেক টুথপেস্টে নিমের নির্যাস ব্যবহার করা হয়।
    ৪. অন্যান্য ব্যবহার: ম্যালেরিয়ার মতো জ্বর সারাতে, রক্ত পরিষ্কার রাখতে এবং কীটনাশক হিসেবেও নিম ব্যবহৃত হয়।

    আমলকী গাছের ওষধি গুণ:
    ১. ভিটামিন C-এর উৎস: আমলকী ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন C থাকে, যা দাঁতের মাড়ি ফোলা ও স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
    ২. পেটের সমস্যায়: শুকনো আমলকী ফল পেটের গোলমাল, আমাশয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
    ৩. অন্যান্য গুণ: আমলকী হাঁপানি, পিত্তরোগ এবং ফুসফুসের প্রদাহে উপকারী। এটি অ্যানিমিয়া ও বার্ধক্য প্রতিরোধেও কার্যকরী।