অধ্যায় ১০: পরিবেশের সংকট ও সংরক্ষণ (Environmental Crisis and Conservation)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের বিভিন্ন সংকট এবং সেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করব। বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ইত্যাদি কীভাবে জীবজগতের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে এবং বিপন্ন প্রজাতিদের বাঁচানোর জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, যেমন ইন-সিটু ও এক্স-সিটু সংরক্ষণ, জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে।
- জীববৈচিত্র্য (Biodiversity): কোনো নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রে উপস্থিত সমস্ত ধরনের জীব (উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব), তাদের জিন এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্যকে একত্রে জীববৈচিত্র্য বলে।
- পরিবেশের সংকট: মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে পরিবেশের সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো - বনভূমি ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের হ্রাস।
- বনভূমি ধ্বংস: জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ ইত্যাদির কারণে ব্যাপক হারে বন কেটে ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং বহু প্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস করছে।
- বিপন্ন প্রজাতি (Endangered Species): যে সমস্ত প্রজাতির জীব অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কার সম্মুখীন, তাদের বিপন্ন প্রজাতি বলে। যেমন - রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, একশৃঙ্গ গন্ডার, শকুন।
- Red Data Book: IUCN (International Union for Conservation of Nature) দ্বারা প্রকাশিত একটি পুস্তিকা যেখানে বিপন্ন প্রজাতির তালিকা ও তাদের সম্পর্কিত তথ্য থাকে।
- জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার পদ্ধতিই হলো সংরক্ষণ। এটি প্রধানত দুই প্রকার:
- ইন-সিটু সংরক্ষণ (In-situ Conservation): জীবদের নিজস্ব প্রাকৃতিক বাসস্থানে রেখে সংরক্ষণ করা। যেমন - জাতীয় উদ্যান (National Park), অভয়ারণ্য (Sanctuary), বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ।
- এক্স-সিটু সংরক্ষণ (Ex-situ Conservation): জীবদের তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান থেকে সরিয়ে এনে কৃত্রিম পরিবেশে রেখে সংরক্ষণ করা। যেমন - চিড়িয়াখানা (Zoo), বোটানিক্যাল গার্ডেন।
- পশ্চিমবঙ্গের বনভূমি: উত্তরবঙ্গের বনভূমি এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বনভূমি, যা বর্তমানে মানুষ-হাতি সংঘাত, চোরাশিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকটের সম্মুখীন।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
IUCN-এর পুরো নাম কী?
উত্তর: (খ) International Union for Conservation of Nature
বিপন্ন প্রজাতির তালিকা কোন বইতে প্রকাশ করা হয়?
উত্তর: (গ) Red Data Book
নীচের কোনটি ইন-সিটু সংরক্ষণের উদাহরণ?
উত্তর: (গ) অভয়ারণ্য
নীচের কোনটি এক্স-সিটু সংরক্ষণের উদাহরণ?
উত্তর: (গ) চিড়িয়াখানা
পশ্চিমবঙ্গের একটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের নাম লেখো।
উত্তর: (গ) সুন্দরবন
গবাদি পশুর ব্যথা কমানোর ওষুধ 'ডাইক্লোফেনাক' কোন প্রাণীর বিলুপ্তির কারণ?
উত্তর: (গ) শকুন
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রাণী কোনটি?
উত্তর: (গ) মেছো বিড়াল (বাঘরোল)
ভারতের জাতীয় জলজ প্রাণী কোনটি?
উত্তর: (গ) গঙ্গার শুশুক
ম্যানগ্রোভ অরণ্যের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—
উত্তর: (খ) শ্বাসমূলের উপস্থিতি
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: (গ) কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের বৃদ্ধি
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
জীববৈচিত্র্য কাকে বলে?
উত্তর: কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী সমস্ত প্রকার জীব (উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব) এবং তাদের মধ্যেকার জিনগত ও প্রজাতিগত ভিন্নতাকে একত্রে জীববৈচিত্র্য বলে।
বনভূমি ধ্বংসের দুটি প্রধান কারণ লেখো।
উত্তর: (i) জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে কৃষিজমি, বসতি এবং কলকারখানা নির্মাণের জন্য গাছ কাটা। (ii) রাস্তাঘাট, রেললাইন এবং বাঁধ নির্মাণের মতো উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বনভূমি ধ্বংস করা।
* Red Data Book কী?
উত্তর: IUCN দ্বারা প্রকাশিত একটি বিশেষ পুস্তিকা, যেখানে সারা বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির একটি তথ্যসমৃদ্ধ তালিকা প্রকাশ করা হয়, তাকে Red Data Book বলে।
অভয়ারণ্য (Sanctuary) কাকে বলে?
উত্তর: অভয়ারণ্য হলো এমন একটি নির্দিষ্ট বনাঞ্চল যেখানে বন্যপ্রাণীদের, বিশেষত কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিকে, নির্ভয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং যেখানে শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ।
জাতীয় উদ্যান (National Park) কাকে বলে?
উত্তর: জাতীয় উদ্যান হলো এমন একটি বৃহৎ সংরক্ষিত এলাকা যেখানে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি সেখানকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক স্থানকেও সংরক্ষণ করা হয় এবং যেখানে পর্যটন নিয়ন্ত্রিতভাবে অনুমোদিত।
ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের দুটি অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: (i) শ্বাসকার্য চালানোর জন্য মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসা শ্বাসমূল (Pneumatophore) দেখা যায়। (ii) কর্দমাক্ত মাটিতে গাছকে সোজাভাবে ধরে রাখার জন্য ঠেসমূল (Stilt root) দেখা যায়।
একশৃঙ্গ গন্ডার সংরক্ষণের জন্য পশ্চিমবঙ্গের দুটি জাতীয় উদ্যানের নাম লেখো।
উত্তর: জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এবং গোরুমারা জাতীয় উদ্যান।
সুন্দরবনের দুটি প্রধান সংকট কী কী?
উত্তর: (i) বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়া, যা ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে প্লাবিত করছে। (ii) নদীর জলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া, যা সুন্দরী গাছের মতো মিষ্টি জল পছন্দকারী উদ্ভিদের সংখ্যা কমাচ্ছে।
বায়োলুমিনিসেন্স কী?
উত্তর: কিছু জীবন্ত প্রাণী (যেমন- জোনাকি, কিছু সামুদ্রিক মাছ) দ্বারা তাদের দেহে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো উৎপাদন করার ঘটনাকে বায়োলুমিনিসেন্স বলে।
মরুভূমির উদ্ভিদের একটি অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: বাষ্পমোচন রোধ করার জন্য মরুভূমির উদ্ভিদের পাতা কাঁটায় রূপান্তরিত হয় এবং কাণ্ড রসালো ও সবুজ হয় যা জল সঞ্চয় করে এবং সালোকসংশ্লেষ করে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব কী? ইন-সিটু ও এক্স-সিটু সংরক্ষণের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব:
১. বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা: প্রতিটি জীব বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
২. অর্থনৈতিক গুরুত্ব: আমরা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধপত্র এবং শিল্পের কাঁচামালের জন্য সরাসরি জীববৈচিত্র্যের উপর নির্ভরশীল।
৩. পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ: বনভূমি ও জলাভূমি পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখে।
৪. নৈতিক দায়িত্ব: পৃথিবীর প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ইন-সিটু ও এক্স-সিটু সংরক্ষণের পার্থক্য:বিষয় ইন-সিটু সংরক্ষণ এক্স-সিটু সংরক্ষণ সংজ্ঞা জীবকে তার নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। জীবকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে এনে কৃত্রিম পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। উদাহরণ জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জিন ব্যাংক, বীজ ব্যাংক। সুবিধা জীবেরা স্বাধীন ও স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এটি কম ব্যয়বহুল। অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতিদের বিশেষ যত্ন নেওয়া সম্ভব হয়। বনভূমি ধ্বংসের প্রধান কারণগুলি কী কী? এর ফলে পরিবেশের উপর কী কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে?
উত্তর:
বনভূমি ধ্বংসের কারণ:
১. জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য বসতি, রাস্তাঘাট এবং কৃষিজমির চাহিদা মেটাতে বন কেটে ফেলা হচ্ছে।
২. নগরায়ন ও শিল্পায়ন: নতুন শহর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে।
৩. চাষাবাদ: ঝুম চাষের মতো অবৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতির জন্য বনের গাছপালা পোড়ানো হয়।
৪. দাবানল: প্রাকৃতিক বা মানুষের কারণে সৃষ্ট দাবানলের ফলে বিশাল বনভূমি পুড়ে যায়।
৫. অবৈধ গাছ কাটা: কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের লোভে বেআইনিভাবে গাছ কাটা হয়।
ক্ষতিকর প্রভাব:
১. জলবায়ুর পরিবর্তন: গাছপালা কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে বাতাসে \(CO_2\)-এর পরিমাণ বেড়ে গিয়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে।
২. মাটির ক্ষয়: গাছের মূল মাটিকে ধরে রাখে। গাছ কেটে ফেলার ফলে মাটির উপরের উর্বর স্তর বৃষ্টির জলে ধুয়ে যায়, ফলে ভূমিক্ষয় হয়।
৩. বন্যা ও খরা: বনভূমি বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং বন্যার প্রকোপ কমায়। বন ধ্বংসের ফলে বন্যা ও খরার প্রবণতা বাড়ে।
৪. জীববৈচিত্র্যের হ্রাস: বনভূমি হলো বহু পশুপাখির বাসস্থান। বন ধ্বংসের ফলে তারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।পশ্চিমবঙ্গের বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গৃহীত দুটি পদক্ষেপ আলোচনা করো।
উত্তর:
পশ্চিমবঙ্গের বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গৃহীত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো:
১. একশৃঙ্গ গন্ডার সংরক্ষণ: একসময় চোরাশিকারের ফলে উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া ও গোরুমারা অরণ্যে গন্ডারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই দুটি অঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর ফলে চোরাশিকার বন্ধ হয়েছে এবং গন্ডারের সংখ্যা বর্তমানে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ (সুন্দরবন व्याघ्र প্রকল্প): সুন্দরবন হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান বাসস্থান। এখানে 'প্রজেক্ট টাইগার'-এর অধীনে ব্যাঘ্র প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। চোরাশিকার বন্ধ করা, বাঘের বাসস্থান সুরক্ষিত রাখা এবং স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাঘ সংরক্ষণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা স্থিতিশীল রয়েছে।