অধ্যায় ৫: প্রাকৃতিক ঘটনা ও তার বিশ্লেষণ (Natural Phenomena and Their Analysis)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা—বজ্রপাত এবং মহামারী—নিয়ে আলোচনা করব। বজ্রপাত কেন হয়, এর পেছনের বিজ্ঞানসম্মত কারণ কী, এবং এর থেকে বাঁচার উপায়গুলি কী কী, তা আমরা জানব। পাশাপাশি, মহামারী কীভাবে ছড়ায়, বিভিন্ন ধরনের মহামারীর কারণ এবং সেগুলি প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।
- বজ্রপাত: মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বা জলকণা ও বায়ুকণার ঘর্ষণের ফলে মেঘ আহিত হয়। সাধারণত মেঘের উপরের অংশে ধনাত্মক (+) এবং নীচের অংশে ঋণাত্মক (-) আধান জমা হয়। এই আধানের পরিমাণ अत्यधिक বেড়ে গেলে মেঘ ও ভূমির মধ্যে বা দুটি মেঘের মধ্যে তড়িৎক্ষরণ ঘটে, যা বজ্রপাত নামে পরিচিত।
- তড়িৎ আধান ও বিভব পার্থক্য: পরমাণুতে ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংখ্যা সমান না হলে তা আয়নে পরিণত হয় এবং আধানগ্রস্ত হয়। দুটি বিন্দুর মধ্যে আধানের প্রবাহের জন্য বিভব পার্থক্য থাকা আবশ্যক। বজ্রপাত হল মেঘ ও ভূমির মধ্যে বিশাল বিভব পার্থক্যের ফল।
- বজ্রপাতের সময় সতর্কতা: বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ বা উঁচু গাছের নীচে থাকা নিরাপদ নয়। পাকা বাড়ি বা গাড়ির ভিতর থাকা উচিত। ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে।
- মহামারী: যখন কোনো সংক্রামক রোগ খুব দ্রুত একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে মহামারী বলে। এটি সাধারণ উৎস থেকে (যেমন দূষিত জল) বা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রামিত হতে পারে।
- বিভিন্ন মহামারী: কলেরা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, প্লেগ, স্মল পক্স, এইডস (AIDS) ইত্যাদি বিভিন্ন মহামারীর কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
- অসংক্রামক রোগ: ডায়াবেটিস, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগও বর্তমানে মহামারীর আকার ধারণ করেছে, যার প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
বজ্রপাতের সময় মেঘের নীচের অংশে সাধারণত কোন প্রকার আধান জমা হয়?
উত্তর: (খ) ঋণাত্মক
বজ্র নিরোধক তৈরি করা হয় কী দিয়ে?
উত্তর: (গ) ধাতু (সাধারণত তামা)
ম্যালেরিয়া রোগের বাহক কে?
উত্তর: (খ) স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা
কলেরা রোগের জন্য দায়ী জীবাণুটি কী?
উত্তর: (খ) ব্যাকটেরিয়া (ভিব্রিও কলেরি)
ডেঙ্গি রোগের জীবাণু বহন করে কোন মশা?
উত্তর: (গ) এডিস (এডিস ইজিপ্টি)
AIDS রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসটির নাম কী?
উত্তর: (গ) HIV
শরীরে ওআরএস (ORS) খাওয়ানো হয় কোন রোগে?
উত্তর: (ঘ) ডায়ারিয়া
DOTS চিকিৎসা কোন রোগের ক্ষেত্রে করা হয়?
উত্তর: (খ) যক্ষ্মা (TB)
বজ্রপাতের সময় কোনটি সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়?
উত্তর: (গ) পাকা বাড়ি
কোন রোগটিকে টিকা দ্বারা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে?
উত্তর: (গ) গুটি বসন্ত (Smallpox)
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
বজ্রপাত কাকে বলে?
উত্তর: আহিত মেঘ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে অথবা দুটি আহিত মেঘের মধ্যে বায়ুর মধ্য দিয়ে তড়িৎ আধানের ক্ষরণ বা ডিসচার্জ হওয়ার ঘটনাকে বজ্রপাত বলে। এই সময় আমরা তীব্র আলো ও শব্দ অনুভব করি।
তড়িৎ আবেশ কাকে বলে?
উত্তর: একটি আহিত বস্তুর কাছে একটি অনায়িত বস্তু আনলে, অনায়িত বস্তুটির নিকটবর্তী প্রান্তে বিপরীত আধান এবং দূরবর্তী প্রান্তে সম-আধান আবিষ্ট হয়। এই ঘটনাকে তড়িৎ আবেশ বলে।
* বজ্র নিরোধক কী? এর কাজ কী?
উত্তর: বজ্র নিরোধক হলো একটি ধাতব দণ্ড যা বাড়ির সবচেয়ে উঁচু স্থানে লাগানো থাকে এবং একটি মোটা পরিবাহী তারের মাধ্যমে মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর কাজ হলো বজ্রপাতের সময় উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তড়িৎকে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছে দিয়ে বাড়িকে রক্ষা করা।
মহামারী বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যখন কোনো রোগ, বিশেষত সংক্রামক রোগ, কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বা বিশ্বজুড়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষকে আক্রান্ত করে, তখন তাকে মহামারী বলা হয়।
কলেরা রোগের দুটি প্রধান লক্ষণ লেখো।
উত্তর: (i) চাল ধোয়া জলের মতো পাতলা পায়খানা এবং (ii) প্রচণ্ড বমি, যার ফলে শরীর থেকে দ্রুত জল বেরিয়ে যায় (ডিহাইড্রেশন)।
ম্যালেরিয়া রোগ কীভাবে ছড়ায়?
উত্তর: স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত থেকে রোগের জীবাণু (প্রোটোজোয়া) গ্রহণ করে এবং পরে সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার দেহে ওই জীবাণু সংক্রমণ ঘটায়।
ডেঙ্গি প্রতিরোধে দুটি ব্যবস্থা লেখো।
উত্তর: (i) বাড়ির আশেপাশে জল জমতে না দেওয়া, কারণ জমা জলে এডিস মশা ডিম পাড়ে। (ii) দিনের বেলায় ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা।
AIDS রোগের পুরো নাম কী?
উত্তর: Acquired Immuno Deficiency Syndrome (অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম)।
ওআরএস (ORS) কীভাবে তৈরি করা হয়?
উত্তর: এক লিটার ফোটানো ঠান্ডা জলে এক চামচ চিনি ও এক চিমটে নুন মিশিয়ে ওআরএস তৈরি করা হয়। এটি ডায়ারিয়ার সময় শরীরের জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করে।
যক্ষ্মা রোগের জীবাণুর নাম কী?
উত্তর: মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis)।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
বজ্রপাত হল একটি প্রাকৃতিক তড়িৎক্ষরণের ঘটনা। এর কারণগুলি হল:
১. মেঘের আহিত হওয়া: ঝড়ের সময় মেঘের মধ্যে থাকা জলকণা ও বরফকণাগুলি বায়ুর সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে আহিত বা চার্জযুক্ত হয়। সাধারণত, মেঘের উপরের দিক ধনাত্মক আধানে এবং নীচের দিক ঋণাত্মক আধানে আহিত হয়।
২. তড়িৎ আবেশ: ঋণাত্মক আধানযুক্ত মেঘ যখন ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে যায়, তখন তড়িৎ আবেশের ফলে ভূপৃষ্ঠে ও উঁচু গাছ বা বাড়িতে ধনাত্মক আধান আবিষ্ট হয়।
৩. বিভব পার্থক্য সৃষ্টি: এর ফলে মেঘের নীচের অংশ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে একটি বিশাল বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়।
৪. তড়িৎক্ষরণ: এই বিভব পার্থক্য খুব বেশি হলে বায়ু, যা সাধারণত তড়িতের কুপরিবাহী, তার প্রতিরোধ ভেঙে যায় এবং মেঘের ঋণাত্মক আধান তীব্র গতিতে ভূপৃষ্ঠের দিকে প্রবাহিত হয়। এই বিপুল তড়িৎ প্রবাহই বজ্রপাত হিসেবে দেখা যায়, যা তীব্র আলো ও শব্দ সৃষ্টি করে।বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকার জন্য কী কী করণীয় ও বর্জনীয়, তার একটি তালিকা তৈরি করো।
উত্তর:
করণীয়:
১. বজ্রপাতের পূর্বাভাস পেলে বাড়ির ভিতরে থাকতে হবে।
২. পাকা বাড়ির ভিতরে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ।
৩. যদি বাইরে থাকতেই হয়, তবে নিচু জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হবে।
৪. জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হবে।
৫. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখতে হবে।
বর্জনীয়:
১. খোলা মাঠে বা উঁচু জায়গায় দাঁড়ানো উচিত নয়।
২. উঁচু গাছের নীচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
৩. পুকুর বা জলাশয়ে থাকা বা স্নান করা উচিত নয়।
৪. ধাতব বস্তু, যেমন ছাতা বা বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে থাকতে হবে।
৫. ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করা উচিত নয়।মহামারী প্রতিরোধের সাধারণ উপায়গুলি কী কী? কলেরা এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট কী কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
উত্তর:
মহামারী প্রতিরোধের সাধারণ উপায়:
১. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
২. বিশুদ্ধ পানীয় জল: ফোটানো বা ফিল্টার করা জল পান করা।
৩. টিকাকরণ: সঠিক সময়ে সঠিক রোগের টিকা নেওয়া।
৪. সচেতনতা বৃদ্ধি: রোগ কীভাবে ছড়ায় এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।
৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক বর্জ্য নিষ্কাশন।
কলেরা নিয়ন্ত্রণ:
১. সর্বদা বিশুদ্ধ জল পান করতে হবে।
২. খাবার ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে এবং বাসি খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
৩. শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ:
১. বাড়ির আশেপাশে জল জমতে দেওয়া যাবে না, কারণ জমা জলে মশা ডিম পাড়ে।
২. ঘুমানোর সময় সর্বদা মশারি ব্যবহার করতে হবে।
৩. মশা তাড়ানোর জন্য ধূপ বা স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।