অধ্যায় ২.৩: রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reaction)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব। রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার জন্য কিছু শর্ত বা প্রভাবকের প্রয়োজন হয়, যেমন—তাপ, আলো, চাপ, দ্রাবক, তড়িৎ এবং অনুঘটক। বিক্রিয়াগুলি তাপের পরিবর্তন অনুসারে তাপমোচী বা তাপগ্রাহী হতে পারে। ইলেকট্রন আদান-প্রদানের ভিত্তিতে জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া ঘটে।
- বিক্রিয়ার প্রভাবক: শুধু মেশালেই বিক্রিয়া হয় না; তাপ, আলো (সালোকসংশ্লেষ), চাপ (খেলনা বন্দুকের ক্যাপ), দ্রাবক (জলে খাবার সোডার বিক্রিয়া), তড়িৎ (জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ) ইত্যাদি বিক্রিয়া শুরু করতে বা গতি বাড়াতে সাহায্য করে।
- অনুঘটক (Catalyst): যেসব পদার্থ বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় কিন্তু নিজে অপরিবর্তিত থাকে, তাদের অনুঘটক বলে। যেমন, হাইড্রোজেন পারক্সাইড বিয়োজনে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড (MnO₂)। জীবদেহের অনুঘটককে উৎসেচক বা এনজাইম বলে।
- তাপমোচী ও তাপগ্রাহী বিক্রিয়া: যে বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়, তা তাপমোচী (Exothermic), যেমন—দহন, পোড়াচুনে জল দেওয়া। যে বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয়, তা তাপগ্রাহী (Endothermic), যেমন—চুনাপাথর থেকে পোড়াচুন তৈরি।
- জারণ-বিজারণ (Oxidation-Reduction): কোনো পদার্থে অক্সিজেন যুক্ত হওয়া বা হাইড্রোজেন বেরিয়ে যাওয়াকে জারণ বলে। এর বিপরীত ঘটনাকে বিজারণ বলে। ইলেকট্রনীয় মতবাদ অনুসারে, ইলেকট্রন বর্জনকে জারণ এবং ইলেকট্রন গ্রহণকে বিজারণ বলে। জারণ-বিজারণ সর্বদা একসঙ্গেই ঘটে।
- জারক ও বিজারক: যে পদার্থ অন্যকে জারিত করে নিজে বিজারিত হয়, তাকে জারক বলে। যে পদার্থ অন্যকে বিজারিত করে নিজে জারিত হয়, তাকে বিজারক বলে।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যারা অংশ নেয় তাদের কী বলে?
উত্তর: (গ) বিক্রিয়ক
সালোকসংশ্লেষ বিক্রিয়ায় কোন শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়?
উত্তর: (খ) আলোকশক্তি
জলের তড়িৎ বিশ্লেষণে কোন শক্তি ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: (গ) তড়িৎশক্তি
যেসব পদার্থ রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায়, তাদের বলে -
উত্তর: (গ) অনুঘটক
হাইড্রোজেন পারক্সাইডের বিয়োজনে কোন অনুঘটক ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: (খ) MnO₂
জীবদেহের জৈব অনুঘটককে কী বলে?
উত্তর: (গ) উৎসেচক বা এনজাইম
যে বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়, তাকে বলে -
উত্তর: (খ) তাপমোচী বিক্রিয়া
দহন বা পোড়ানো হল এক ধরনের -
উত্তর: (খ) তাপমোচী বিক্রিয়া
কোনো পদার্থে অক্সিজেন যুক্ত হওয়াকে কী বলে?
উত্তর: (খ) জারণ
ইলেকট্রন বর্জনকে বলে -
উত্তর: (ক) জারণ
ইলেকট্রন গ্রহণকে বলে -
উত্তর: (খ) বিজারণ
জারক দ্রব্য বিক্রিয়ার সময় নিজে কী হয়?
উত্তর: (খ) বিজারিত হয়
বিজারক দ্রব্য বিক্রিয়ার সময় নিজে কী হয়?
উত্তর: (ক) জারিত হয়
লোহায় মরচে পড়া কোন ধরনের বিক্রিয়া?
উত্তর: (খ) জারণ
কাটা আপেলে বাদামি ছোপ ধরার কারণ হল -
উত্তর: (খ) জারণ
CuO + H₂ → Cu + H₂O, এই বিক্রিয়ায় কোনটি জারক?
উত্তর: (ক) CuO
গ্যালভানাইজেশন পদ্ধতিতে লোহার ওপর কিসের প্রলেপ দেওয়া হয়?
উত্তর: (গ) জিঙ্ক
উৎসেচক সাধারণত কোন জাতীয় পদার্থ?
উত্তর: (গ) প্রোটিন
খাবার সোডা ও টারটারিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় কোন গ্যাস উৎপন্ন হয়?
উত্তর: (গ) CO₂
পোড়াচুনে জল দিলে কোন শক্তি উৎপন্ন হয়?
উত্তর: (খ) তাপ শক্তি
কঠিন অনুঘটকের ক্ষেত্রফল বাড়ালে বিক্রিয়ার হার -
উত্তর: (ক) বাড়ে
আলুতে কোন এনজাইম থাকে যা H₂O₂-কে ভাঙে?
উত্তর: (খ) ক্যাটালেজ
ইউরিয়াকে অ্যামোনিয়াতে পরিণত করে কোন উৎসেচক?
উত্তর: (গ) ইউরিয়েজ
চুনাপাথর থেকে পোড়াচুন তৈরি একটি -
উত্তর: (খ) তাপগ্রাহী বিক্রিয়া
শ্বসন প্রক্রিয়া হল একটি -
উত্তর: (ক) জারণ প্রক্রিয়া
CuO + H₂ → Cu + H₂O, বিক্রিয়াটিতে বিজারক দ্রব্য কোনটি?
উত্তর: (খ) H₂
Fe + CuSO₄ → FeSO₄ + Cu, এটি কী ধরনের বিক্রিয়া?
উত্তর: (গ) প্রতিস্থাপন
মরচে পড়ার জন্য প্রয়োজন -
উত্তর: (গ) জল ও অক্সিজেন উভয়ই
ZnO + C → Zn + CO, বিক্রিয়াটিতে কোনটি জারিত হয়েছে?
উত্তর: (খ) C
কোন বিক্রিয়ায় রঙের পরিবর্তন হয়?
উত্তর: (ক) CuSO₄ দ্রবণে Fe যোগ
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
রাসায়নিক বিক্রিয়া কাকে বলে?
উত্তর: যে প্রক্রিয়ায় এক বা একাধিক পদার্থ পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক বা একাধিক পদার্থে পরিণত হয়, তাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলে।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার দুটি প্রভাবকের নাম লেখো।
উত্তর: তাপ এবং আলো।
অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: যেসব পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগকে বাড়িয়ে দেয় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে ভর ও ধর্মে অপরিবর্তিত থাকে, তাদের অনুঘটক বলে। উদাহরণ: হাইড্রোজেন পারক্সাইডের বিয়োজনে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড (MnO₂)।
উৎসেচক বা এনজাইম কী?
উত্তর: জীবদেহে উৎপন্ন প্রোটিন জাতীয় জৈব অনুঘটককে উৎসেচক বা এনজাইম বলে, যা জীবদেহের বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করে।
তাপমোচী বিক্রিয়া কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন বা নির্গত হয়, তাকে তাপমোচী বিক্রিয়া বলে। উদাহরণ: কয়লার দহন (C + O₂ → CO₂ + তাপ)।
তাপগ্রাহী বিক্রিয়া কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয়, তাকে তাপগ্রাহী বিক্রিয়া বলে। উদাহরণ: চুনাপাথরকে (CaCO₃) উত্তপ্ত করে পোড়াচুন (CaO) তৈরি।
* জারণ কাকে বলে? (অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন অনুসারে)
উত্তর: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো মৌল বা যৌগের সঙ্গে অক্সিজেন বা অন্য কোনো তড়িৎ-ঋণাত্মক মৌল যুক্ত হয়, অথবা কোনো যৌগ থেকে হাইড্রোজেন বা অন্য কোনো তড়িৎ-ধনাত্মক মৌল অপসারিত হয়, তাকে জারণ বলে।
বিজারণ কাকে বলে? (অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন অনুসারে)
উত্তর: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো মৌল বা যৌগ থেকে অক্সিজেন অপসারিত হয়, অথবা কোনো মৌল বা যৌগের সঙ্গে হাইড্রোজেন যুক্ত হয়, তাকে বিজারণ বলে।
ইলেকট্রনীয় মতবাদ অনুসারে জারণ ও বিজারণের সংজ্ঞা দাও।
উত্তর: ইলেকট্রনীয় মতবাদ অনুসারে, কোনো পরমাণু, আয়ন বা মূলক কর্তৃক এক বা একাধিক ইলেকট্রন বর্জন করার ঘটনাকে জারণ এবং ইলেকট্রন গ্রহণ করার ঘটনাকে বিজারণ বলে।
জারক দ্রব্য কাকে বলে?
উত্তর: যে পদার্থ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অন্য পদার্থকে জারিত করে এবং নিজে বিজারিত হয়, তাকে জারক দ্রব্য বলে।
বিজারক দ্রব্য কাকে বলে?
উত্তর: যে পদার্থ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অন্য পদার্থকে বিজারিত করে এবং নিজে জারিত হয়, তাকে বিজারক দ্রব্য বলে।
মরচে কী? এর রাসায়নিক নাম লেখো।
উত্তর: লোহা জল ও বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে যে লালচে-বাদামি আস্তরণ তৈরি করে, তাকে মরচে বলে। এর রাসায়নিক নাম হল সোদক ফেরিক অক্সাইড (Fe₂O₃·nH₂O)।
গ্যালভানাইজেশন কাকে বলে?
উত্তর: মরচের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লোহার ওপর জিঙ্কের প্রলেপ দেওয়ার পদ্ধতিকে গ্যালভানাইজেশন বলে।
একটি জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া লেখো যেখানে জারণ ও বিজারণ একই সাথে ঘটছে।
উত্তর: CuO + H₂ → Cu + H₂O। এখানে CuO বিজারিত হয়ে Cu এবং H₂ জারিত হয়ে H₂O উৎপন্ন করেছে।
সালোকসংশ্লেষ বিক্রিয়াটি তাপগ্রাহী না তাপমোচী? কেন?
উত্তর: সালোকসংশ্লেষ একটি তাপগ্রাহী (আলোকগ্রাহী) বিক্রিয়া, কারণ এই বিক্রিয়াটি সূর্যালোকের শক্তি শোষণ করে সংঘটিত হয়।
বিক্রিয়ক কাকে বলে?
উত্তর: রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে সমস্ত পদার্থ অংশগ্রহণ করে, তাদের বিক্রিয়ক বলে।
দ্রাবকের ভূমিকা কী? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: দ্রাবক বিক্রিয়ক পদার্থগুলিকে দ্রবীভূত করে তাদের অণু বা আয়নগুলিকে পরস্পরের সংস্পর্শে আসতে সাহায্য করে, ফলে বিক্রিয়া ঘটে। উদাহরণ: শুকনো খাবার সোডা ও টারটারিক অ্যাসিডের মধ্যে জল যোগ করলে বিক্রিয়া শুরু হয়।
অনুঘটকের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: (i) অনুঘটক বিক্রিয়া শেষে নিজে অপরিবর্তিত থাকে। (ii) খুব সামান্য পরিমাণ অনুঘটকই বিক্রিয়ার গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
দহন কাকে বলে?
উত্তর: কোনো পদার্থের অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাপ ও আলোকশক্তি উৎপন্ন করার ঘটনাকে দহন বলে। এটি একটি দ্রুত জারণ প্রক্রিয়া।
Fe³⁺ + e⁻ → Fe²⁺ — এটি জারণ না বিজারণ?
উত্তর: এটি বিজারণ, কারণ ফেরিক আয়ন (Fe³⁺) একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে ফেরাস আয়নে (Fe²⁺) পরিণত হয়েছে।
Zn → Zn²⁺ + 2e⁻ — এটি জারণ না বিজারণ?
উত্তর: এটি জারণ, কারণ জিঙ্ক পরমাণু (Zn) দুটি ইলেকট্রন বর্জন করে জিঙ্ক আয়নে (Zn²⁺) পরিণত হয়েছে।
রাসায়নিক পরিবর্তন চেনার একটি উপায় লেখো।
উত্তর: যদি পরিবর্তনে কোনো নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয়, রঙের পরিবর্তন ঘটে, গ্যাস নির্গত হয় বা অধঃক্ষেপ পড়ে, তবে সেটি রাসায়নিক পরিবর্তন।
ধুনোর দহন কোন ধরনের পরিবর্তন?
উত্তর: এটি একটি তাপমোচী রাসায়নিক পরিবর্তন।
H₂S + Cl₂ → 2HCl + S, বিক্রিয়াটিতে কার জারণ ঘটেছে?
উত্তর: H₂S (হাইড্রোজেন সালফাইড)-এর জারণ ঘটেছে, কারণ এটি থেকে হাইড্রোজেন অপসারিত হয়েছে।
একটি জৈব অনুঘটকের (এনজাইম) নাম লেখো।
উত্তর: ক্যাটালেজ বা ইউরিয়েজ।
ওয়েলডিং-এ কোন গ্যাস ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: অ্যাসিটিলিন (C₂H₂) গ্যাসকে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে পুড়িয়ে ওয়েলডিং করা হয়।
খাবার তেল পুরোনো হয়ে গেলে যে গন্ধ বেরোয়, তার কারণ কী?
উত্তর: বাতাসের অক্সিজেনের দ্বারা তেলের জারণ ঘটার ফলে এই গন্ধ হয়।
স্বচ্ছ চুনজলকে ঘোলা করে কোন গ্যাস?
উত্তর: কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂)।
লোহার মরচে ধরা আটকানোর একটি উপায় লেখো।
উত্তর: লোহার ওপর রং, তেল বা আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া।
অনুঘটন বা ক্যাটালিসিস কাকে বলে?
উত্তর: অনুঘটকের উপস্থিতিতে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগের পরিবর্তন ঘটার ঘটনাকে অনুঘটন বা ক্যাটালিসিস বলে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* জারণ ও বিজারণ বিক্রিয়া বলতে কী বোঝো? ইলেকট্রনীয় তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো। একটি উদাহরণ দিয়ে দেখাও যে জারণ-বিজারণ একসঙ্গেই ঘটে।
উত্তর:
জারণ: যে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো পরমাণু, আয়ন বা মূলক এক বা একাধিক ইলেকট্রন বর্জন করে, তাকে জারণ বলে। এর ফলে ধনাত্মক চার্জ বাড়ে বা ঋণাত্মক চার্জ কমে।
বিজারণ: যে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো পরমাণু, আয়ন বা মূলক এক বা একাধিক ইলেকট্রন গ্রহণ করে, তাকে বিজারণ বলে। এর ফলে ধনাত্মক চার্জ কমে বা ঋণাত্মক চার্জ বাড়ে।
উদাহরণ: কপার সালফেট (CuSO₄) দ্রবণে জিঙ্কের (Zn) টুকরো ফেললে যে বিক্রিয়া হয়: Zn + CuSO₄ → ZnSO₄ + Cu
এখানে, Zn পরমাণু দুটি ইলেকট্রন বর্জন করে Zn²⁺ আয়নে পরিণত হয়। এটি জারণ: Zn → Zn²⁺ + 2e⁻
একই সাথে, দ্রবণ থেকে Cu²⁺ আয়ন ওই দুটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে Cu পরমাণুতে পরিণত হয়। এটি বিজারণ: Cu²⁺ + 2e⁻ → Cu
যেহেতু একটি পদার্থ (Zn) ইলেকট্রন বর্জন করছে এবং অপর পদার্থ (Cu²⁺) সেই ইলেকট্রন গ্রহণ করছে, তাই দেখা যাচ্ছে যে জারণ ও বিজারণ বিক্রিয়া একসঙ্গেই ঘটে।অনুঘটক কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। জীবদেহে অনুঘটকের ভূমিকা কী?
উত্তর:
অনুঘটক: যেসব পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় স্বল্প পরিমাণে উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগকে বাড়িয়ে দেয় বা কমিয়ে দেয় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে ভর ও রাসায়নিক ধর্মে অপরিবর্তিত থাকে, তাদের অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট বলে।
বৈশিষ্ট্য:
১. অনুঘটক বিক্রিয়া শুরু করতে পারে না, শুধুমাত্র বিক্রিয়ার গতি বাড়ায় বা কমায়।
২. বিক্রিয়া শেষে অনুঘটক নিজে অপরিবর্তিত থাকে।
৩. খুব সামান্য পরিমাণ অনুঘটকই বিক্রিয়ার গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
৪. নির্দিষ্ট বিক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট অনুঘটক প্রয়োজন।
জীবদেহে ভূমিকা: জীবদেহে অনুঘটকগুলি উৎসেচক বা এনজাইম নামে পরিচিত। এগুলি প্রোটিন দিয়ে তৈরি। খাদ্য পরিপাক, শক্তি উৎপাদন, কোশ বিভাজন ইত্যাদি প্রায় সমস্ত জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়াই উৎসেচকের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। উৎসেচক ছাড়া জীবদেহের ক্রিয়াগুলি এত ধীর গতিতে ঘটত যে জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ত।তাপমোচী ও তাপগ্রাহী বিক্রিয়ার পার্থক্য লেখো। দহন এবং সালোকসংশ্লেষ—কোনটি কী ধরনের বিক্রিয়া এবং কেন?
উত্তর:
বিষয় তাপমোচী বিক্রিয়া তাপগ্রাহী বিক্রিয়া তাপের পরিবর্তন এই বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন বা নির্গত হয়। এই বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয়। পরিবেশের উষ্ণতা বিক্রিয়ার ফলে পরিবেশের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। বিক্রিয়ার ফলে পরিবেশের উষ্ণতা হ্রাস পায়। উদাহরণ কয়লার দহন, পোড়াচুনে জল দেওয়া। চুনাপাথর থেকে পোড়াচুন তৈরি, জলে গ্লুকোজ গোলা।
দহন: দহন একটি তাপমোচী বিক্রিয়া। কারণ, দহনের সময় (যেমন, কাঠ বা গ্যাস পোড়ানো) রাসায়নিক শক্তি তাপ ও আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে পরিবেশে নির্গত হয়, ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
সালোকসংশ্লেষ: সালোকসংশ্লেষ একটি তাপগ্রাহী (আলোকগ্রাহী) বিক্রিয়া। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ সূর্যালোকের শক্তি শোষণ করে সেই শক্তিকে ব্যবহার করে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল থেকে খাদ্য (গ্লুকোজ) তৈরি করে। এখানে শক্তি শোষিত হয় বলেই এটি তাপগ্রাহী।রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিভিন্ন প্রভাবকগুলি উদাহরণসহ আলোচনা করো।
উত্তর:
রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এমন কয়েকটি বিষয় হল:
১. তাপ: অনেক বিক্রিয়া শুরু করতে বা দ্রুত করতে তাপের প্রয়োজন হয়। যেমন, চুনাপাথরকে উত্তপ্ত করলে তা ভেঙে পোড়াচুন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়।
২. আলো: কিছু বিক্রিয়া আলোর উপস্থিতিতে ঘটে। যেমন, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে।
৩. চাপ: চাপ প্রয়োগ করে কিছু বিক্রিয়ার হার বাড়ানো যায়। যেমন, হেবার পদ্ধতিতে উচ্চ চাপে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া তৈরি হয়।
৪. দ্রাবক: অনেক ক্ষেত্রে বিক্রিয়কগুলিকে উপযুক্ত দ্রাবকে দ্রবীভূত করলে তবেই তাদের মধ্যে বিক্রিয়া সম্ভব হয়। যেমন, জলে দ্রবীভূত অবস্থাতেই খাবার সোডা ও টারটারিক অ্যাসিড বিক্রিয়া করে।
৫. তড়িৎ: কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া তড়িৎ শক্তির সাহায্যে ঘটানো হয়। যেমন, জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ করে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস পাওয়া যায়।লোহায় মরচে পড়া একটি তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়া—ব্যাখ্যা করো। মরচে নিবারণের দুটি উপায় লেখো।
উত্তর:
লোহায় মরচে পড়া একটি জারণ-বিজারণ প্রক্রিয়া যা অনেকটা তড়িৎ-কোষের মতো কাজ করে। জল ও বায়ুর উপস্থিতিতে লোহার পৃষ্ঠের কোনো অংশ অ্যানোড (ঋণাত্মক প্রান্ত) এবং অন্য অংশ ক্যাথোড (ধনাত্মক প্রান্ত) হিসেবে আচরণ করে।
অ্যানোড অংশে: লোহার (Fe) জারণ ঘটে, অর্থাৎ Fe পরমাণু ইলেকট্রন বর্জন করে Fe²⁺ আয়নে পরিণত হয়। (Fe → Fe²⁺ + 2e⁻)
ক্যাথোড অংশে: বায়ুর অক্সিজেন ওই ইলেকট্রন গ্রহণ করে এবং জলের H⁺ আয়নের সাহায্যে বিজারিত হয়ে জলে পরিণত হয়।
এই Fe²⁺ আয়ন পরে আরও জারিত হয়ে Fe³⁺ আয়নে পরিণত হয় এবং জলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সোদক ফেরিক অক্সাইড বা মরচে (Fe₂O₃·nH₂O) তৈরি করে। যেহেতু এখানে আয়ন ও ইলেকট্রনের চলাচল ঘটে, তাই এটি একটি তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
মরচে নিবারণের উপায়:
১. রঙ বা তেলের প্রলেপ: লোহার জিনিসের ওপর রঙ, তেল বা আলকাতরার প্রলেপ দিলে তা জল ও বায়ুর সংস্পর্শে আসতে পারে না, ফলে মরচে ধরে না।
২. গ্যালভানাইজেশন: লোহার ওপর তার চেয়ে বেশি সক্রিয় কোনো ধাতুর (যেমন জিঙ্ক) প্রলেপ দেওয়া হয়। এতে লোহা সুরক্ষিত থাকে এবং জিঙ্ক নিজে জারিত হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।