অধ্যায় ৮: মানুষের খাদ্য ও খাদ্য উৎপাদন (Human Food and Food Production)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব, যা কৃষিবিজ্ঞানের অন্তর্গত। উদ্ভিদজাত ও প্রাণীজাত উভয় প্রকার খাদ্যের উৎপাদন পদ্ধতি, ফসলের প্রকারভেদ, ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ (মাটি তৈরি, বীজ বপন, সার প্রয়োগ, জলসেচ, আগাছা দমন, ফসল তোলা ও সংরক্ষণ) সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, পশুপালন, মৌমাছি পালন, মাছ চাষ এবং পোলট্রি ফার্মিং-এর মতো বিষয়গুলিও এখানে আলোচিত হয়েছে।
- কৃষিবিজ্ঞান: বিজ্ঞানের যে শাখায় উন্নত পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন এবং পশুপালন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে কৃষিবিজ্ঞান বলে।
- ফসল: অর্থনৈতিক প্রয়োজনে যখন কোনো বড়ো এলাকা জুড়ে একই উদ্ভিদের চাষ করা হয়, তখন তাকে ফসল বলে। ঋতু অনুযায়ী ফসল দুই প্রকার—খারিফ (বর্ষাকালীন) ও রবি (শীতকালীন)।
- ফসল উৎপাদনের ধাপ: ভূমিকর্ষণ, বীজ বপন, সার প্রয়োগ (জৈব ও অজৈব), জলসেচ, আগাছা দমন, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই এবং সংরক্ষণ।
- শস্য আবর্তন: মাটির উর্বরতা বজায় রাখার জন্য একই জমিতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ফসল চাষ করার পদ্ধতিকে শস্য আবর্তন বলে।
- প্রাণীজ খাদ্য: ডিম, মাংস, দুধ ও মাছের মতো প্রাণীজ খাদ্য পাওয়ার জন্য পশুপালন, পোলট্রি ও মাছ চাষ করা হয়।
- মৌমাছি পালন (Apiculture): মধু ও মোম পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মৌমাছি প্রতিপালন করা হয়। মৌমাছিরা সমাজবদ্ধ জীব এবং এদের মধ্যে রানি, পুরুষ ও শ্রমিক—এই তিন ধরনের মৌমাছি দেখা যায়।
- মাছ চাষ (Pisciculture): পুকুর বা ভেড়িতে মাছের চারা ছেড়ে তাদের প্রতিপালন করা হয়। কাতলা, রুই, মৃগেলের মতো বিভিন্ন মাছের মিশ্র চাষ করে উৎপাদন বাড়ানো যায়।
- পোলট্রি: ডিম বা মাংসের জন্য হাঁস, মুরগি ইত্যাদি পাখি পালন করাকে পোলট্রি বলে। লেগহর্ন (ডিমের জন্য) এবং ব্রয়লার (মাংসের জন্য) দুটি উন্নত জাতের মুরগি।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
নীচের কোনটি একটি খারিফ ফসল?
উত্তর: (গ) ধান
নীচের কোনটি একটি রবি ফসল?
উত্তর: (খ) গম
জমিতে লাঙল দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: (গ) মাটি আলগা ও ওপর-নীচ করা
ইউরিয়া কী ধরনের সার?
উত্তর: (খ) নাইট্রোজেনযুক্ত অজৈব সার
2, 4-D কী হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: (গ) আগাছানাশক
শস্য আবর্তন পদ্ধতিতে ডাল বা শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদ চাষ করা হয় কেন?
উত্তর: (খ) মাটির নাইট্রোজেন বৃদ্ধি করার জন্য
মধু তৈরি করে কোন মৌমাছি?
উত্তর: (গ) শ্রমিক মৌমাছি
কাতলা মাছ পুকুরের কোন স্তরের খাবার খায়?
উত্তর: (ক) উপরের স্তর
মাংস উৎপাদনের জন্য কোন জাতের মুরগি পালন করা হয়?
উত্তর: (গ) ব্রয়লার
পিটুইটারি ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়—
উত্তর: (গ) মাছের কৃত্রিম প্রজননে
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
কৃষিবিজ্ঞান কাকে বলে?
উত্তর: বিজ্ঞানের যে শাখায় ফসল উৎপাদন, মাটির ব্যবস্থাপনা, উদ্যানপালন এবং পশুপালন সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করা হয়, তাকে কৃষিবিজ্ঞান বলে।
খারিফ ফসল ও রবি ফসলের একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর: খারিফ ফসল: ধান। রবি ফসল: গম।
জৈব সার ও অজৈব সারের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: জৈব সার প্রাকৃতিক উপাদান (উদ্ভিদ ও প্রাণীর বর্জ্য) থেকে তৈরি হয় এবং মাটির গঠন উন্নত করে। অন্যদিকে, অজৈব সার কারখানায় রাসায়নিকভাবে প্রস্তুত করা হয় এবং এটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।
* শস্য আবর্তন কাকে বলে?
উত্তর: মাটির উর্বরতা শক্তি বজায় রাখার জন্য এবং ফসলের রোগ ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ কমানোর জন্য, একই জমিতে এক ফসলের পর অন্য ফসল পর্যায়ক্রমে চাষ করার পদ্ধতিকে শস্য আবর্তন বলে।
আগাছা কী? দুটি আগাছার নাম লেখো।
উত্তর: চাষের জমিতে মূল ফসলের সাথে জন্মানো অবাঞ্ছিত উদ্ভিদদের আগাছা বলে। এরা মূল ফসলের সাথে জল, পুষ্টি ও আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করে। উদাহরণ: পার্থেনিয়াম, চেনোপোডিয়াম।
মৌমাছি পালনের দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
উত্তর: (i) মধু সংগ্রহ করা, যা একটি পুষ্টিকর খাদ্য। (ii) মোম সংগ্রহ করা, যা মোমবাতি ও বিভিন্ন প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
কার্প কী? দুটি মেজর কার্পের উদাহরণ দাও।
উত্তর: কার্প হলো স্বাদু জলের এক প্রকার অস্থিযুক্ত মাছ যার মাথায় আঁশ থাকে না এবং চোয়ালে দাঁত অনুপস্থিত। দুটি মেজর কার্প হলো রুই ও কাতলা।
মিশ্র মাছ চাষের একটি সুবিধা লেখো।
উত্তর: মিশ্র মাছ চাষে পুকুরের বিভিন্ন স্তরের প্রাকৃতিক খাদ্যের সদ্ব্যবহার হয়, ফলে অল্প জায়গায় মাছের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পায়।
পোলট্রি বলতে কী বোঝো?
উত্তর: অর্থনৈতিক গুরুত্বের জন্য ডিম বা মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত পাখি (যেমন- মুরগি, হাঁস) প্রতিপালন করা হয়, তাদের পোলট্রি বলে।
ব্রয়লার মুরগি কী?
উত্তর: ব্রয়লার হলো একটি সংকর জাতের মুরগি যা শুধুমাত্র মাংস উৎপাদনের জন্য খুব অল্প সময়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* ফসল উৎপাদনের জন্য অনুসৃত প্রধান ধাপগুলি কী কী? সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর:
ফসল উৎপাদনের প্রধান ধাপগুলি হলো:
১. মাটি তৈরি করা: লাঙল দিয়ে মাটি চষে আলগা ও ঝুরঝুরে করা হয়, যাতে উদ্ভিদের মূল সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং বায়ু চলাচল ভালো হয়।
২. বীজ বপন: সুস্থ ও সবল বীজ সঠিক দূরত্বে ও গভীরতায় বপন করা হয়।
৩. সার প্রয়োগ: মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জৈব বা অজৈব সার প্রয়োগ করা হয়।
৪. জলসেচ: ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর জমিতে জল সরবরাহ করা হয়।
৫. আগাছা দমন: নিড়ানি দিয়ে বা আগাছানাশক ব্যবহার করে জমি থেকে অবাঞ্ছিত উদ্ভিদ নির্মূল করা হয়।
৬. কীটপতঙ্গ থেকে সুরক্ষা: কীটনাশক প্রয়োগ করে বা জৈবিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৭. ফসল তোলা ও মাড়াই: ফসল পেকে গেলে তা কেটে সংগ্রহ করা হয় এবং শস্যদানা আলাদা করা হয়।
৮. সংরক্ষণ: সংগৃহীত ফসল ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য আর্দ্রতা ও কীটপতঙ্গ থেকে বাঁচিয়ে গুদামজাত করা হয়।জৈব সার কেন অজৈব সারের চেয়ে ভালো? এর তিনটি কারণ লেখো।
উত্তর:
জৈব সার অজৈব সারের চেয়ে ভালো কারণ:
১. মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: জৈব সার মাটিতে হিউমাস যোগ করে, যা মাটির গঠন উন্নত করে এবং উর্বরতা শক্তি দীর্ঘস্থায়ীভাবে বৃদ্ধি করে। অজৈব সার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট খনিজ যোগ করে, যা মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট করতে পারে।
২. জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি: জৈব সার মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, ফলে কম জলসেচের প্রয়োজন হয়। অজৈব সারের এই ক্ষমতা নেই।
৩. পরিবেশবান্ধব: জৈব সার পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না এবং মাটির উপকারী জীবাণুদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত অজৈব সার জল ও মাটি দূষিত করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে।* মিশ্র মাছ চাষ বা পলিকালচার পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা করো। এই পদ্ধতির সুবিধা কী?
উত্তর:
পদ্ধতি: মিশ্র মাছ চাষ হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একটি নির্দিষ্ট জলাশয়ে (যেমন পুকুর) একাধিক প্রজাতির মাছ একসঙ্গে চাষ করা হয়। এই মাছগুলি এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যাতে তারা জলাশয়ের বিভিন্ন স্তরে (উপরের স্তর, মাঝের স্তর, নীচের স্তর) বাস করে এবং ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক খাবার খায়। যেমন - কাতলা ও সিলভার কার্প উপরের স্তরের প্ল্যাঙ্কটন খায়, রুই মাঝের স্তরের খাবার খায়, এবং মৃগেল ও কমন কার্প নীচের স্তরের পচা জৈব বস্তু খায়।
সুবিধা:
১. সম্পদের সদ্ব্যবহার: এই পদ্ধতিতে পুকুরের সমস্ত স্তরের প্রাকৃতিক খাদ্যের পূর্ণ ব্যবহার হয়, ফলে খাদ্যের অপচয় হয় না।
২. অধিক উৎপাদন: যেহেতু মাছদের মধ্যে খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা থাকে না, তাই প্রতিটি মাছ ভালোভাবে বৃদ্ধি পায় এবং একক আয়তনে মোট মাছের উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়।
৩. পরিবেশগত ভারসাম্য: বিভিন্ন স্তরের খাবার গ্রহণ করার ফলে পুকুরের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।