অধ্যায় ২.২: পদার্থের গঠন (Structure of Matter)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা পদার্থের মূল গঠনগত একক—পরমাণু ও অণু—সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণু, যা প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত। পরমাণুগুলি রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে অণু ও যৌগ গঠন করে।
- পরমাণু (Atom): মৌলের ক্ষুদ্রতম কণা যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। এর কেন্দ্রে থাকে ধনাত্মক আধানযুক্ত নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রনের সমষ্টি) এবং তাকে কেন্দ্র করে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন ঘোরে।
- অণু (Molecule): দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে অণু গঠন করে। এটি পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যা স্বাধীনভাবে থাকতে পারে।
- পরমাণু ক্রমাঙ্ক ও ভরসংখ্যা: কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটন সংখ্যাকে পরমাণু ক্রমাঙ্ক (Atomic Number) এবং প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভরসংখ্যা (Mass Number) বলে।
- আইসোটোপ ও আইসোবার: একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে। ভিন্ন মৌলের যেসব পরমাণুর ভরসংখ্যা সমান কিন্তু প্রোটন সংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোবার বলে।
- আয়ন (Ion): কোনো পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ বা বর্জন করলে তড়িৎগ্রস্ত কণায় পরিণত হয়, যাকে আয়ন বলে। ধনাত্মক আয়নকে ক্যাটায়ন এবং ঋণাত্মক আয়নকে অ্যানায়ন বলে।
- আয়নীয় ও সমযোজী যৌগ: ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন দ্বারা গঠিত যৌগকে আয়নীয় যৌগ (যেমন, NaCl) বলে। ইলেকট্রন জোড় সমভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে গঠিত যৌগকে সমযোজী যৌগ (যেমন, H₂O, CH₄) বলে।
- মূলক (Radical): একাধিক পরমাণু জোটবদ্ধ হয়ে যে আয়ন তৈরি করে, তাকে মূলক বলে (যেমন, সালফেট SO₄²⁻, অ্যামোনিয়াম NH₄⁺)।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকে -
উত্তর: (খ) প্রোটন ও নিউট্রন
পরমাণুর নিস্তড়িৎ কণা কোনটি?
উত্তর: (গ) নিউট্রন
ইলেকট্রনের আধানের প্রকৃতি কী?
উত্তর: (খ) ঋণাত্মক
কোনো মৌলের পরমাণু ক্রমাঙ্ক হল তার -
উত্তর: (খ) প্রোটন সংখ্যা
ভরসংখ্যা হল -
উত্তর: (খ) প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যার যোগফল
* আইসোটোপগুলির ক্ষেত্রে কোন সংখ্যাটি সমান থাকে?
উত্তর: (গ) প্রোটন সংখ্যা
হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ডয়টেরিয়ামে নিউট্রন সংখ্যা কত?
উত্তর: (খ) 1
আইসোবারগুলির ক্ষেত্রে কোনটি সমান থাকে?
উত্তর: (ঘ) ভরসংখ্যা
পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে গেলে কী উৎপন্ন হয়?
উত্তর: (খ) ক্যাটায়ন
পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করলে কী উৎপন্ন হয়?
উত্তর: (ক) অ্যানায়ন
সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) কী ধরনের যৌগ?
উত্তর: (খ) আয়নীয়
জল (H₂O) কী ধরনের যৌগ?
উত্তর: (ক) সমযোজী
কোনটি একটি মূলকের উদাহরণ?
উত্তর: (গ) SO₄²⁻ (সালফেট)
অ্যামোনিয়াম মূলকের সংকেত কী?
উত্তর: (গ) NH₄⁺
পদার্থের চতুর্থ অবস্থা কোনটি?
উত্তর: (ঘ) প্লাজমা
সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের উপাদান হল -
উত্তর: (ঘ) প্লাজমা
সমযোজী বন্ধন গঠিত হয় -
উত্তর: (খ) ইলেকট্রন জোড় ব্যবহারের মাধ্যমে
একটি হাইড্রোজেন অণুতে (H₂) কটি সমযোজী বন্ধন থাকে?
উত্তর: (ক) একটি
মিথেন (CH₄) অণুতে কেন্দ্রীয় পরমাণু কোনটি?
উত্তর: (খ) কার্বন
ফেরিক আয়নের (Fe³⁺) যোজ্যতা কত?
উত্তর: (গ) 3
সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে কী থাকে?
উত্তর: (ক) শুধু একটি প্রোটন
পরমাণুবাদের জনক কে?
উত্তর: (গ) জন ডালটন
ইলেকট্রন কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: (গ) জে. জে. থমসন
নিউট্রন কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: (গ) স্যাডউইক
পরমাণুর নিউক্লিয়াস কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: (খ) রাদারফোর্ড
কোন অবস্থায় অণুগুলির গতিশক্তি সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: (গ) গ্যাসীয়
ক্যালসিয়াম ফসফেটের সংকেত কী?
উত্তর: (গ) Ca₃(PO₄)₂
অক্সিজেন পরমাণুর পরমাণু ক্রমাঙ্ক 8, এর ইলেকট্রন সংখ্যা কত?
উত্তর: (খ) 8
কিউপ্রিক অক্সাইডের সংকেত হল -
উত্তর: (খ) CuO
ফসফেট মূলকের (PO₄³⁻) যোজ্যতা কত?
উত্তর: (গ) 3
মৌলের ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য কণা হল পরমাণু—এটি কার মতবাদ?
উত্তর: (গ) ডালটন
প্রোটন ও ইলেকট্রনের ভরের অনুপাত প্রায় -
উত্তর: (গ) 1836:1 (বা প্রায় 2000:1)
পরমাণুর মধ্যেকার বেশিরভাগ স্থানই -
উত্তর: (গ) ফাঁকা
কোন অবস্থায় অণুগুলির মধ্যে আকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: (ক) কঠিন
¹⁴₆C ও ¹⁴₇N হল পরস্পরের -
উত্তর: (খ) আইসোবার
গলিত সোডিয়াম ক্লোরাইড তড়িৎ পরিবহন করে কার মাধ্যমে?
উত্তর: (ঘ) আয়ন
কোন যৌগে সমযোজী বন্ধন বর্তমান?
উত্তর: (গ) CH₄ (মিথেন)
নাইট্রেট মূলকের সংকেত কী?
উত্তর: (খ) NO₃⁻
কঠিন থেকে সরাসরি বাষ্পে পরিণত হওয়াকে কী বলে?
উত্তর: (গ) ঊর্ধ্বপাতন
কার্বন টেট্রাক্লোরাইডের (CCl₄) অণুতে কটি সমযোজী বন্ধন আছে?
উত্তর: (ঘ) 4
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
পরমাণু কাকে বলে?
উত্তর: পরমাণু হল মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে এবং মৌলটির সমস্ত ধর্ম বজায় রাখে।
অণু কাকে বলে?
উত্তর: দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যে ক্ষুদ্রতম কণা গঠন করে, যা স্বাধীনভাবে থাকতে পারে এবং যাতে ওই পদার্থের সমস্ত ধর্ম বর্তমান থাকে, তাকে অণু বলে।
পরমাণু ক্রমাঙ্ক বা পারমাণবিক সংখ্যা কাকে বলে?
উত্তর: কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত মোট প্রোটন সংখ্যাকে ওই মৌলের পরমাণু ক্রমাঙ্ক বা পারমাণবিক সংখ্যা বলে।
ভরসংখ্যা কাকে বলে?
উত্তর: কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যার মোট যোগফলকে ওই পরমাণুর ভরসংখ্যা বলে।
* আইসোটোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর: একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা (পরমাণু ক্রমাঙ্ক) সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় ভরসংখ্যা ভিন্ন হয়, তাদের পরস্পরের আইসোটোপ বা সমস্থানিক বলে। উদাহরণ: হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ হল প্রোটিয়াম (¹H), ডয়টেরিয়াম (²H) এবং ট্রিশিয়াম (³H)।
আইসোবার কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর: ভিন্ন মৌলের যেসব পরমাণুর ভরসংখ্যা সমান কিন্তু প্রোটন সংখ্যা ভিন্ন, তাদের পরস্পরের আইসোবার বা সমভারিক বলে। উদাহরণ: আর্গন (⁴⁰Ar) ও ক্যালসিয়াম (⁴⁰Ca)।
আয়ন কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?
উত্তর: তড়িৎগ্রস্ত পরমাণু বা পরমাণু জোটকে আয়ন বলে। এটি দুই প্রকার— ক্যাটায়ন (ধনাত্মক আয়ন) এবং অ্যানায়ন (ঋণাত্মক আয়ন)।
ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর: কোনো নিস্তড়িৎ পরমাণু এক বা একাধিক ইলেকট্রন বর্জন করলে ক্যাটায়ন গঠিত হয়। কোনো নিস্তড়িৎ পরমাণু এক বা একাধিক ইলেকট্রন গ্রহণ করলে অ্যানায়ন গঠিত হয়।
মূলক বা র্যাডিক্যাল কাকে বলে? একটি ক্যাটায়ন ও একটি অ্যানায়ন মূলকের উদাহরণ দাও।
উত্তর: একাধিক পরমাণু জোটবদ্ধ হয়ে যে আয়ন তৈরি করে, তাকে মূলক বলে। ক্যাটায়ন মূলক: অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺), অ্যানায়ন মূলক: সালফেট (SO₄²⁻)।
আয়নীয় যৌগ ও সমযোজী যৌগের একটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
উত্তর: আয়নীয় যৌগ ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে গঠিত হয় এবং এদের উপাদান কণা হল আয়ন। সমযোজী যৌগ ইলেকট্রন জোড় সমভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে গঠিত হয় এবং এদের উপাদান কণা হল অণু।
রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের দুটি প্রধান সিদ্ধান্ত লেখো।
উত্তর: (i) পরমাণুর বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা। (ii) পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর ও সমস্ত ধনাত্মক আধান তার কেন্দ্রে এক অতি ক্ষুদ্র অংশে কেন্দ্রীভূত থাকে, যার নাম নিউক্লিয়াস।
পদার্থের প্লাজমা অবস্থা কী?
উত্তর: এটি পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। অত্যন্ত উচ্চ উষ্ণতায় গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে আয়নিত অবস্থায় থাকে। এই আয়নিত গ্যাসের অবস্থাকেই প্লাজমা বলে।
ডালটনের পরমাণুবাদের দুটি স্বীকার্য লেখো।
উত্তর: (i) মৌলের ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য কণা হল পরমাণু, যাকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। (ii) একই মৌলের সমস্ত পরমাণুর ভর ও ধর্ম একই রকম হয়।
পরমাণু নিস্তড়িৎ হয় কেন?
উত্তর: পরমাণুতে ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন সংখ্যা এবং ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন সংখ্যা সমান হওয়ায় পরমাণু সামগ্রিকভাবে নিস্তড়িৎ হয়।
হাইড্রোজেন (¹H) পরমাণুতে কটি প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন থাকে?
উত্তর: ১টি প্রোটন, ০টি নিউট্রন এবং ১টি ইলেকট্রন।
সমযোজী বন্ধন কাকে বলে?
উত্তর: দুটি পরমাণু যখন এক বা একাধিক ইলেকট্রন জোড়কে সমভাবে ব্যবহার করে রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়, তখন সৃষ্ট বন্ধনকে সমযোজী বন্ধন বলে।
আয়নীয় বন্ধন কাকে বলে?
উত্তর: ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্যাটায়ন ও অ্যানায়নের মধ্যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের প্রভাবে যে বন্ধন গঠিত হয়, তাকে আয়নীয় বন্ধন বলে।
অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের সংকেত লেখো।
উত্তর: Al₂O₃।
ফেরাস ও ফেরিক আয়নের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ফেরাস আয়নে (Fe²⁺) লোহার যোজ্যতা 2 এবং ফেরিক আয়নে (Fe³⁺) লোহার যোজ্যতা 3।
পরমাণুর তিনটি মূল কণার নাম লেখো।
উত্তর: প্রোটন, নিউট্রন এবং ইলেকট্রন।
পরমাণুর কোন অংশে প্রায় সমস্ত ভর কেন্দ্রীভূত থাকে?
উত্তর: নিউক্লিয়াসে।
যোজ্যতা কাকে বলে?
উত্তর: কোনো মৌলের একটি পরমাণু অন্য মৌলের পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে ওই মৌলের যোজ্যতা বলে।
অ্যামোনিয়া (NH₃) অণুতে নাইট্রোজেনের যোজ্যতা কত?
উত্তর: 3।
পদার্থের কোন অবস্থায় কণাগুলির মধ্যে আন্তরাণবিক দূরত্ব সবচেয়ে কম?
উত্তর: কঠিন অবস্থায়।
কার্বন-14 (¹⁴C) আইসোটোপের একটি ব্যবহার লেখো।
উত্তর: জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণে (কার্বন ডেটিং) ব্যবহৃত হয়।
কেন গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন থাকে না?
উত্তর: কারণ গ্যাসীয় অবস্থায় অণুগুলির মধ্যে আকর্ষণ বল প্রায় নগণ্য এবং তাদের গতিশক্তি খুব বেশি হওয়ায় তারা পাত্রের সমগ্র আয়তন জুড়ে অবাধে চলাচল করে।
মৌলের অণু ও যৌগের অণুর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: একই প্রকারের পরমাণু দিয়ে গঠিত অণুকে মৌলের অণু বলে (যেমন, O₂)। ভিন্ন প্রকারের পরমাণু দিয়ে গঠিত অণুকে যৌগের অণু বলে (যেমন, H₂O)।
সোডিয়াম পরমাণুর (Na) পরমাণু ক্রমাঙ্ক 11, এর ক্যাটায়নে (Na⁺) কটি ইলেকট্রন থাকে?
উত্তর: 10টি ইলেকট্রন থাকে (11 - 1 = 10)।
ক্লোরিন পরমাণুর (Cl) পরমাণু ক্রমাঙ্ক 17, এর অ্যানায়নে (Cl⁻) কটি ইলেকট্রন থাকে?
উত্তর: 18টি ইলেকট্রন থাকে (17 + 1 = 18)।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় পরমাণুর কোন কণাটি অংশ নেয়?
উত্তর: ইলেকট্রন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলটি সংক্ষেপে বর্ণনা করো। এই মডেল অনুসারে পরমাণুর গঠন কীরূপ?
উত্তর:
বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার মাধ্যমে পরমাণুর গঠন সম্পর্কে কয়েকটি সিদ্ধান্তে আসেন, যা 'রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল' নামে পরিচিত।
মডেলের মূল বিষয়:
১. নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব: পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর ও সমগ্র ধনাত্মক আধান এর কেন্দ্রে এক অতি ক্ষুদ্র অংশে কেন্দ্রীভূত থাকে। এই ভারী অংশের নাম নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক।
২. ফাঁকা স্থান: পরমাণুর বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা।
৩. ইলেকট্রনের অবস্থান: ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে, অনেকটা সৌরজগতে সূর্যের চারপাশে গ্রহদের ঘোরার মতো।
৪. নিস্তড়িৎ অবস্থা: পরমাণুতে মোট ধনাত্মক আধানের পরিমাণ মোট ঋণাত্মক আধানের সমান, তাই পরমাণু নিস্তড়িৎ।আয়নীয় ও সমযোজী বন্ধনের মধ্যে পার্থক্য লেখো। সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) এবং জল (H₂O)-এর গঠন উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
পার্থক্য:বিষয় আয়নীয় বন্ধন সমযোজী বন্ধন গঠন ইলেকট্রন সম্পূর্ণভাবে আদান-প্রদানের (বর্জন ও গ্রহণ) মাধ্যমে গঠিত হয়। পরস্পরের মধ্যে এক বা একাধিক ইলেকট্রন জোড় সমভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে গঠিত হয়। অংশগ্রহণকারী সাধারণত একটি ধাতু ও একটি অধাতব পরমাণুর মধ্যে গঠিত হয়। সাধারণত দুটি অধাতব পরমাণুর মধ্যে গঠিত হয়। ফলাফল ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন নামক আয়ন সৃষ্টি হয়। অণু গঠিত হয়, কোনো আয়ন সৃষ্টি হয় না।
NaCl-এর গঠন (আয়নীয়): সোডিয়াম (Na) পরমাণু তার সবচেয়ে বাইরের কক্ষের ১টি ইলেকট্রন বর্জন করে Na⁺ ক্যাটায়নে পরিণত হয়। ক্লোরিন (Cl) পরমাণু ওই ইলেকট্রনটি গ্রহণ করে Cl⁻ অ্যানায়নে পরিণত হয়। এই বিপরীতধর্মী আয়ন দুটি স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের দ্বারা যুক্ত হয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড গঠন করে।
H₂O-এর গঠন (সমযোজী): একটি অক্সিজেন পরমাণু তার বাইরের কক্ষের দুটি ইলেকট্রনকে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণুর প্রত্যেকটির একটি করে ইলেকট্রনের সঙ্গে দুটি পৃথক ইলেকট্রন জোড় গঠন করে। এই ইলেকট্রন জোড়গুলি অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন উভয় পরমাণু সমভাবে ব্যবহার করে, যার ফলে দুটি সমযোজী বন্ধন তৈরি হয় এবং জলের অণু গঠিত হয়।আইসোটোপ ও আইসোবারের সংজ্ঞা দাও। হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপের নাম, সংকেত এবং গঠন বর্ণনা করো।
উত্তর:
আইসোটোপ: একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন (ফলে ভরসংখ্যা ভিন্ন), তাদের পরস্পরের আইসোটোপ বা সমস্থানিক বলে।
আইসোবার: ভিন্ন মৌলের যেসব পরমাণুর ভরসংখ্যা সমান কিন্তু প্রোটন সংখ্যা ভিন্ন, তাদের পরস্পরের আইসোবার বা সমভারিক বলে।
হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ:
১. প্রোটিয়াম (সাধারণ হাইড্রোজেন): সংকেত ¹₁H। এর নিউক্লিয়াসে ১টি প্রোটন থাকে, কোনো নিউট্রন থাকে না। বাইরে ১টি ইলেকট্রন ঘোরে।
২. ডয়টেরিয়াম (ভারী হাইড্রোজেন): সংকেত ²₁H বা D। এর নিউক্লিয়াসে ১টি প্রোটন ও ১টি নিউট্রন থাকে। বাইরে ১টি ইলেকট্রন ঘোরে।
৩. ট্রিশিয়াম (তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন): সংকেত ³₁H বা T। এর নিউক্লিয়াসে ১টি প্রোটন ও ২টি নিউট্রন থাকে। বাইরে ১টি ইলেকট্রন ঘোরে।অণু ও পরমাণুর মধ্যে পার্থক্য লেখো। পদার্থের কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থার কারণ অণু-পরমাণুর সজ্জার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
অণু ও পরমাণুর পার্থক্য:
১. পরমাণু মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। অণু মৌলিক বা যৌগিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা, যা স্বাধীনভাবে থাকতে পারে।
২. পরমাণু স্বাধীনভাবে থাকতে পারে না (নিষ্ক্রিয় গ্যাস ছাড়া)। অণু স্বাধীনভাবে থাকতে পারে।
৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরমাণু ভাঙে না। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অণু ভেঙে পরমাণুতে পরিণত হতে পারে।
পদার্থের তিন অবস্থার কারণ:
কঠিন: কঠিন পদার্থে অণু বা পরমাণুগুলি খুব কাছাকাছি এবং একটি নির্দিষ্ট সজ্জায় সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে। এদের মধ্যে আন্তরাণবিক আকর্ষণ বল খুব বেশি হওয়ায় কণাগুলি কেবল নিজের অবস্থানে থেকে কাঁপতে পারে, স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। তাই কঠিনের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন আছে।
তরল: তরল পদার্থে অণুগুলির মধ্যে দূরত্ব কঠিনের চেয়ে বেশি এবং আকর্ষণ বল কম। তাই অণুগুলি নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ না থেকে পাত্রের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে। একারণে তরলের নির্দিষ্ট আয়তন থাকলেও নির্দিষ্ট আকার থাকে না।
গ্যাসীয়: গ্যাসীয় পদার্থে অণুগুলির মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি এবং আকর্ষণ বল প্রায় নেই বললেই চলে। অণুগুলি খুব দ্রুতগতিতে পাত্রের মধ্যে এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়ায়। তাই গ্যাসের নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন কোনোটিই নেই।ডালটনের পরমাণুবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি লেখো। অ্যাভোগাড্রোর প্রকল্পটি কী ছিল?
উত্তর:
ডালটনের পরমাণুবাদের প্রতিপাদ্য:
১. প্রতিটি মৌল অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র, অবিভাজ্য কণা দ্বারা গঠিত, যাদের পরমাণু বলে।
২. রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরমাণু সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না।
৩. একই মৌলের সমস্ত পরমাণুর ভর ও ধর্ম একই রকম হয়।
৪. ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণুর ভর ও ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হয়।
৫. রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় বিভিন্ন মৌলের পরমাণুরা পূর্ণসংখ্যার সরল অনুপাতে যুক্ত হয়ে যৌগ গঠন করে।
অ্যাভোগাড্রোর প্রকল্প: অ্যাভোগাড্রো কল্পনা করেন যে, মৌলিক পদার্থের পরমাণুগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে অণু গঠন করতে পারে এবং এই অণুরাই পদার্থের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন কণা। এই ধারণা ডালটনের মতবাদের কিছু ত্রুটি সংশোধন করে।