অধ্যায় ৭: অনুজীবের জগৎ (The World of Microbes)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা আমাদের চারপাশে থাকা অদৃশ্য জীবজগৎ অর্থাৎ অণুজীবদের সম্পর্কে জানব। অণুজীব কারা, তাদের বৈশিষ্ট্য কী, তারা কত প্রকারের (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, শৈবাল, আদ্যপ্রাণী) এবং তাদের গঠন কেমন, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও, পরিবেশে এবং মানব জীবনে অণুজীবদের উপকারী (যেমন - ওষুধ প্রস্তুতি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কৃষিকাজ) ও অপকারী (বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি) ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে।
- অণুজীব: যেসব জীবদের খালি চোখে দেখা যায় না, দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, তাদের অণুজীব বলে। এরা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র—জল, স্থল, বায়ু, এমনকি জীবদেহের ভিতরেও বাস করে।
- অণুজীবের প্রকারভেদ: প্রধানত পাঁচ প্রকারের অণুজীব হল - ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, শৈবাল এবং আদ্যপ্রাণী।
- ব্যাকটেরিয়া: এরা সরলতম এককোশী জীব, যাদের সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না (প্রোক্যারিওটিক)। এরা দই তৈরি, নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ ইত্যাদি উপকারী কাজ করে, আবার কলেরা, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগ সৃষ্টি করে।
- ভাইরাস: এরা জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু। পোষক কোশের বাইরে এরা জড়ের মতো, কিন্তু পোষক কোশের ভিতরে জীবনের লক্ষণ দেখায়। এরা ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিও, AIDS ইত্যাদি রোগ সৃষ্টি করে।
- ছত্রাক: এরা ক্লোরোফিলবিহীন হওয়ায় সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না এবং পরভোজী। ইস্ট, পেনিসিলিয়াম ইত্যাদি উপকারী ছত্রাক, আবার দাদ, হাজা সৃষ্টিকারী ছত্রাক অপকারী।
- শৈবাল: এরা ক্লোরোফিলযুক্ত হওয়ায় স্বভোজী। এরা জলজ পরিবেশে বাস করে এবং সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন তৈরি করে।
- অণুজীবের ভূমিকা:
- উপকারী ভূমিকা: অ্যান্টিবায়োটিক (পেনিসিলিন) ও ভ্যাকসিন প্রস্তুতি, দই ও পাউরুটি তৈরি, কৃষিক্ষেত্রে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ, পরিবেশ দূষণমুক্ত করা ইত্যাদি।
- অপকারী ভূমিকা: মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে বিভিন্ন রোগ (কলেরা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, AIDS) সৃষ্টি করা এবং খাদ্য পচিয়ে নষ্ট করা।
- খাদ্য সংরক্ষণ: অণুজীবের আক্রমণ থেকে খাদ্যকে রক্ষা করার বিভিন্ন পদ্ধতি হল- রেফ্রিজারেশন, পাস্তুরাইজেশন, নুন বা চিনি মেশানো ইত্যাদি।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
দই তৈরিতে সাহায্য করে কোন অণুজীব?
উত্তর: (খ) ল্যাকটোব্যাসিলাস
প্রথম আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিক কোনটি?
উত্তর: (খ) পেনিসিলিন
কোনটিকে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয়?
উত্তর: (ঘ) ভাইরাস
শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে অর্বুদ সৃষ্টি করে কোন ব্যাকটেরিয়া?
উত্তর: (গ) রাইজোবিয়াম
পাউরুটি তৈরিতে কোন ছত্রাক ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: (গ) ইস্ট
যক্ষ্মা রোগের জন্য দায়ী অণুজীবটি হল—
উত্তর: (খ) ব্যাকটেরিয়া
ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু এক প্রকার—
উত্তর: (গ) আদ্যপ্রাণী (প্লাজমোডিয়াম)
দাদ, হাজা, চুলকানি জাতীয় চর্মরোগের কারণ কী?
উত্তর: (ক) ছত্রাক
ভ্যাকসিন বা টিকা কী দিয়ে তৈরি হয়?
উত্তর: (গ) মৃত বা দুর্বল জীবাণু
পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়—
উত্তর: (খ) খাদ্য সংরক্ষণে
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
অণুজীব কাদের বলে?
উত্তর: যেসব জীবদের খালি চোখে দেখা যায় না এবং যাদের পর্যবেক্ষণের জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, তাদের অণুজীব বা মাইক্রোব বলে। যেমন - ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি।
চার প্রকার প্রধান অণুজীবের নাম লেখো।
উত্তর: চার প্রকার প্রধান অণুজীব হলো - ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল এবং আদ্যপ্রাণী।
* অ্যান্টিবায়োটিক কী? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: যে জৈব রাসায়নিক পদার্থ কোনো অণুজীব (যেমন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া) থেকে নিঃসৃত হয়ে অন্য ক্ষতিকারক অণুজীবের (বিশেষত ব্যাকটেরিয়া) বৃদ্ধি ব্যাহত করে বা তাকে ধ্বংস করে, তাকে অ্যান্টিবায়োটিক বলে। উদাহরণ: পেনিসিলিন।
ভ্যাকসিন বা টিকা কাকে বলে?
উত্তর: কোনো রোগের মৃত, নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল জীবাণু বা জীবাণুর অংশবিশেষ যা জীবদেহে প্রবেশ করিয়ে ওই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা গড়ে তোলা হয়, তাকে ভ্যাকসিন বা টিকা বলে।
মিথোজীবিতা (Symbiosis) কাকে বলে?
উত্তর: যখন দুটি ভিন্ন প্রজাতির জীব একে অপরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে এবং পরস্পরের দ্বারা উপকৃত হয়, তখন তাদের এই সহাবস্থানকে মিথোজীবিতা বলে। যেমন- শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার বসবাস।
নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ কী?
উত্তর: যে পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেন, নাইট্রোজেনঘটিত যৌগে (যেমন- অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট) রূপান্তরিত হয়ে মাটিতে আবদ্ধ হয়, তাকে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বা Nitrogen Fixation বলে।
খাদ্য সংরক্ষণের দুটি পদ্ধতির নাম লেখো।
উত্তর: খাদ্য সংরক্ষণের দুটি পদ্ধতি হলো রেফ্রিজারেশন (কম তাপমাত্রায় রাখা) এবং পাস্তুরাইজেশন (নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গরম করে জীবাণুমুক্ত করা)।
একটি উপকারী ও একটি অপকারী ব্যাকটেরিয়ার নাম লেখো।
উত্তর: একটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া হলো ল্যাকটোব্যাসিলাস (দই তৈরিতে সাহায্য করে) এবং একটি অপকারী ব্যাকটেরিয়া হলো ভিব্রিও কলেরি (কলেরা রোগ সৃষ্টি করে)।
পেনিসিলিন কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন।
লাইকেন কী?
উত্তর: শৈবাল ও ছত্রাকের মিথোজীবী সহাবস্থানের ফলে যে নতুন ধরনের জীবদেহ গঠিত হয়, তাকে লাইকেন বলে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
* ভাইরাসকে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয় কেন?
উত্তর:
ভাইরাসকে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলার কারণ এর দ্বৈত সত্তা।
জড় বৈশিষ্ট্য:
১. এদের কোনো নির্দিষ্ট কোশীয় গঠন নেই (অকোশীয়)।
২. পোষক কোশের বাইরে এরা রাসায়নিক কণার মতো আচরণ করে, কোনো জীবনের লক্ষণ দেখায় না।
৩. এদের কেলাসিত করা যায়।
জীব বৈশিষ্ট্য:
১. জীবন্ত পোষক কোশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এরা সংখ্যাবৃদ্ধি (প্রজনন) করতে পারে।
২. এদের দেহে নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA বা RNA) এবং প্রোটিন থাকে, যা জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৩. এদের মধ্যে পরিব্যক্তি (mutation) ঘটে।
এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকায় ভাইরাসকে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয়।মানব জীবনে অণুজীবের তিনটি উপকারী ও তিনটি অপকারী ভূমিকা লেখো।
উত্তর:
উপকারী ভূমিকা:
১. ওষুধ শিল্পে: পেনিসিলিয়াম নামক ছত্রাক থেকে পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়, যা বহু ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।
২. খাদ্য শিল্পে: ল্যাকটোব্যাসিলাস নামক ব্যাকটেরিয়া দুধ থেকে দই তৈরি করে এবং ইস্ট নামক ছত্রাক পাউরুটি, কেক ইত্যাদি তৈরিতে সাহায্য করে।
৩. কৃষিক্ষেত্রে: রাইজোবিয়াম, অ্যাজোটোব্যাকটরের মতো ব্যাকটেরিয়া বায়ুর নাইট্রোজেনকে মাটিতে আবদ্ধ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
অপকারী ভূমিকা:
১. রোগ সৃষ্টি: ভিব্রিও কলেরি (কলেরা), মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (যক্ষ্মা), প্লাজমোডিয়াম (ম্যালেরিয়া), HIV (AIDS) ইত্যাদি অণুজীব মানুষে বিভিন্ন মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে।
২. খাদ্য বিষাক্তকরণ: বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক খাবারকে পচিয়ে দেয় এবং বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করে, যা খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে।
৩. উদ্ভিদের রোগ সৃষ্টি: অণুজীবরা উদ্ভিদের মধ্যেও বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে, যেমন - আলুর ধসা রোগ, ধানের টুংরো রোগ ইত্যাদি।টিকা বা ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে? এর গুরুত্ব কী?
উত্তর:
কার্যপদ্ধতি: টিকা বা ভ্যাকসিন হলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের মৃত, দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় জীবাণু যা ইনজেকশন বা ড্রপের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করানো হয়। এই দুর্বল জীবাণুগুলি দেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, কিন্তু দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (Immune System) উদ্দীপিত করে। এর ফলে দেহে ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং মেমোরি কোশ (Memory Cell) গঠিত হয়।
গুরুত্ব:
ভবিষ্যতে যখন ওই রোগের প্রকৃত শক্তিশালী জীবাণু দেহে প্রবেশ করে, তখন আগে থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি এবং মেমোরি কোশগুলি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে রোগটি আর হতে পারে না। পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস-এর মতো অনেক মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে টিকার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি অত্যন্ত কার্যকরী উপায়।