অধ্যায় ৪: কার্বন ও কার্বনঘটিত যৌগ (Carbon & its Compounds)

Sk Rejoyanul Kerim
Sk Rejoyanul Kerim

অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে আমরা কার্বন, তার বিভিন্ন রূপভেদ (বহুরূপতা), কার্বনঘটিত যৌগ যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইড, বিভিন্ন পলিমার এবং জ্বালানি সম্পর্কে জানব। এছাড়াও পরিবেশের উপর কার্বন যৌগগুলির প্রভাব, যেমন গ্রিনহাউস এফেক্ট ও বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

  • কার্বনের বহুরূপতা: কার্বন প্রকৃতিতে বিভিন্ন রূপে পাওয়া যায়, যেমন নিয়তাকার (হিরে, গ্রাফাইট, ফুলারিন) এবং অনিয়তাকার (কয়লা, কোক, ভুসোকালি)। এদের ভৌত ধর্ম ভিন্ন হলেও রাসায়নিক ধর্ম একই।
  • হিরে ও গ্রাফাইট: হিরে অত্যন্ত কঠিন এবং তড়িতের কুপরিবাহী, যেখানে গ্রাফাইট নরম, পিচ্ছিল এবং তড়িতের সুপরিবাহী। এই ধর্মের পার্থক্যের কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ পরমাণুর সজ্জার পার্থক্য।
  • জ্বালানি: কাঠ, কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি। এদের দহনে শক্তি উৎপন্ন হয়। কোনো জ্বালানির একক ভরের সম্পূর্ণ দহনে যে তাপশক্তি উৎপন্ন হয় তাকে তার তাপন মূল্য বলে।
  • কার্বন ডাইঅক্সাইড \(CO_2\): এটি একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন, বাতাসের চেয়ে ভারী গ্যাস। এটি আগুন নেভাতে, ইউরিয়া সার ও সোডা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গ্রিনহাউস গ্যাস।
  • গ্রিনহাউস এফেক্ট: বায়ুমণ্ডলের \(CO_2\), মিথেন \(CH_4\) ইত্যাদি গ্যাস পৃথিবীর বিকিরিত তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে উষ্ণ রাখে, যা গ্রিনহাউস এফেক্ট নামে পরিচিত। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
  • পলিমার: অসংখ্য ছোট ছোট অণু (মনোমার) যুক্ত হয়ে যে বৃহৎ অণু গঠন করে তাকে পলিমার বলে। পলিথিন, PVC, নাইলন, টেফলন হল কৃত্রিম পলিমার। সেলুলোজ, প্রোটিন প্রাকৃতিক পলিমার।
  • পরিবেশ সংকট: পলিথিনের মতো নন-বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার পরিবেশে দীর্ঘকাল অপরিবর্তিত থেকে দূষণ ঘটায়।

গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)

  1. কার্বনের কোন রূপভেদটি তড়িতের সুপরিবাহী?

    • (ক) হিরে
    • (খ) গ্রাফাইট
    • (গ) ফুলারিন
    • (ঘ) কাঠকয়লা

    উত্তর: (খ) গ্রাফাইট

  2. প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সবচেয়ে কঠিন পদার্থ কোনটি?

    • (ক) লোহা
    • (খ) গ্রাফাইট
    • (গ) প্ল্যাটিনাম
    • (ঘ) হিরে

    উত্তর: (ঘ) হিরে

  3. কোনটি গ্রিনহাউস গ্যাস নয়?

    • (ক) কার্বন ডাইঅক্সাইড
    • (খ) মিথেন
    • (গ) অক্সিজেন
    • (ঘ) জলীয় বাষ্প

    উত্তর: (গ) অক্সিজেন

  4. শুষ্ক বরফ (Dry Ice) আসলে কী?

    • (ক) কঠিন নাইট্রোজেন
    • (খ) কঠিন অক্সিজেন
    • (গ) কঠিন কার্বন ডাইঅক্সাইড
    • (ঘ) বরফ ও লবণের মিশ্রণ

    উত্তর: (গ) কঠিন কার্বন ডাইঅক্সাইড

  5. বায়োগ্যাসের প্রধান উপাদান কী?

    • (ক) ইথেন
    • (খ) মিথেন
    • (গ) প্রোপেন
    • (ঘ) বিউটেন

    উত্তর: (খ) মিথেন

  6. কোন পলিমারটি নন-স্টিক বাসনপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়?

    • (ক) পলিথিন
    • (খ) PVC
    • (গ) নাইলন
    • (ঘ) টেফলন

    উত্তর: (ঘ) টেফলন

  7. কোনটি বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার?

    • (ক) পলিথিন
    • (খ) সেলুলোজ
    • (গ) PVC
    • (ঘ) টেফলন

    উত্তর: (খ) সেলুলোজ

  8. পরীক্ষাগারে কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রস্তুতিতে মার্বেল পাথরের \(CaCO_3\) সঙ্গে কোন অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়?

    • (ক) লঘু \(H_2SO_4\)
    • (খ) গাঢ় \(H_2SO_4\)
    • (গ) লঘু \(HCl\)
    • (ঘ) গাঢ় \(HCl\)

    উত্তর: (গ) লঘু \(HCl\)

  9. কোন জ্বালানির তাপন মূল্য সবচেয়ে বেশি?

    • (ক) কাঠ
    • (খ) কয়লা
    • (গ) LPG
    • (ঘ) হাইড্রোজেন

    উত্তর: (ঘ) হাইড্রোজেন

  10. অ্যাসিড বৃষ্টির জন্য দায়ী গ্যাস কোনটি?

    • (ক) \(CO_2\)
    • (খ) \(SO_2\)
    • (গ) \(CH_4\)
    • (ঘ) \(O_2\)

    উত্তর: (খ) \(SO_2\) (এবং নাইট্রোজেনের অক্সাইড)

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

  1. কার্বনের বহুরূপতা কাকে বলে? দুটি নিয়তাকার রূপভেদের নাম লেখো।

    উত্তর: যখন কোনো মৌল প্রকৃতিতে একাধিক ভৌত রূপে অবস্থান করে, যাদের ভৌত ধর্ম আলাদা কিন্তু রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই, তখন মৌলটির এই ধর্মকে বহুরূপতা বলে। কার্বনের দুটি নিয়তাকার রূপভেদ হলো হিরে ও গ্রাফাইট।

  2. হিরে ও গ্রাফাইটের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।

    উত্তর: (i) হিরে অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু গ্রাফাইট নরম ও পিচ্ছিল। (ii) হিরে তড়িতের কুপরিবাহী, কিন্তু গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী।

  3. গ্রিনহাউস এফেক্ট কী?

    উত্তর: বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, জলীয় বাষ্প প্রভৃতি গ্যাস পৃথিবীর বিকিরিত তাপশক্তিকে শোষণ করে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এই ঘটনাকে গ্রিনহাউস এফেক্ট বলে।

  4. বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং কী?

    উত্তর: মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির (যেমন \(CO_2\), \(CH_4\)) পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঘটনাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।

  5. * পলিমার ও মনোমার কাকে বলে?

    উত্তর: যে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও সরল অণু রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরস্পর যুক্ত হয়ে একটি বৃহৎ শৃঙ্খল-আকৃতির অণু গঠন করে, তাদের মনোমার বলে। আর মনোমার থেকে উৎপন্ন ঐ বৃহৎ অণুটিকে পলিমar বলে।

  6. Biodegradable এবং Non-biodegradable পলিমার কী? একটি করে উদাহরণ দাও।

    উত্তর: যেসব পলিমারকে জীবাণু বা প্রাকৃতিক উপায়ে ভেঙে ফেলা বা বিয়োজিত করা যায়, তাদের বায়োডিগ্রেডেবল পলিমar বলে (উদাহরণ- সেলুলোজ)। যেসব পলিমারকে জীবাণু দ্বারা বিয়োজিত করা যায় না, তাদের নন-বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার বলে (উদাহরণ- পলিথিন)।

  7. তাপন মূল্য কাকে বলে?

    উত্তর: এক কিলোগ্রাম ভরের কোনো জ্বালানির সম্পূর্ণ দহনের ফলে যে পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়, তাকে ওই জ্বালানির তাপন মূল্য বা ক্যালোরি মূল্য বলে। এর একক কিলোক্যালোরি/কেজি (kcal/kg)।

  8. PVC-এর পুরো নাম কী? এর একটি ব্যবহার লেখো।

    উত্তর: PVC-এর পুরো নাম পলিভিনাইল ক্লোরাইড। এটি জলের পাইপ, ইলেকট্রিক তারের আবরণ, বর্ষাতি ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

  9. পরীক্ষাগারে \(CO_2\) প্রস্তুতিতে লঘু \(H_2SO_4\) ব্যবহার করা হয় না কেন?

    উত্তর: কারণ মার্বেল পাথরের \(CaCO_3\) সঙ্গে লঘু \(H_2SO_4\)-এর বিক্রিয়ায় অদ্রাব্য ক্যালসিয়াম সালফেটের \(CaSO_4\) একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা মার্বেল পাথরের সঙ্গে অ্যাসিডের সংস্পর্শ বন্ধ করে দেয়। ফলে বিক্রিয়া কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যায়।

  10. দুটি বিকল্প শক্তির উৎসের নাম লেখো।

    উত্তর: দুটি বিকল্প শক্তির উৎস হলো সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি।

রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)

  1. * হিরে ও গ্রাফাইটের গঠন ও ধর্মের মধ্যে তুলনা করো। তাদের গঠনের ভিন্নতা কীভাবে তাদের ধর্মের পার্থক্যের কারণ হয়?

    উত্তর:

    বিষয়হিরেগ্রাফাইট
    গঠনপ্রতিটি কার্বন পরমাণু অন্য চারটি কার্বন পরমাণুর সঙ্গে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে একটি সুদৃঢ় ত্রিমাত্রিক জালক গঠন করে।কার্বন পরমাণুগুলি ষড়ভুজাকারে সজ্জিত হয়ে সমান্তরাল স্তর গঠন করে। স্তরগুলির মধ্যে দূরত্ব বেশি ও আকর্ষণ বল দুর্বল।
    কঠিনতাঅত্যন্ত কঠিন, কারণ পরমাণুগুলি দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে।নরম ও পিচ্ছিল, কারণ একটি স্তর অন্যটির ওপর দিয়ে সহজেই পিছলে যেতে পারে।
    তড়িৎ পরিবাহিতাতড়িতের কুপরিবাহী, কারণ কোনো মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না।তড়িতের সুপরিবাহী, কারণ স্তরগুলির মধ্যে মুক্ত ইলেকট্রন চলাচল করতে পারে।
    ঘনত্বঘনত্ব খুব বেশি (প্রায় 3.5 g/cm³)।ঘনত্ব হিরের চেয়ে কম (প্রায় 2.25 g/cm³)।

    ব্যাখ্যা: হিরের সুদৃঢ় ত্রিমাত্রিক গঠনের জন্যই এটি অত্যন্ত কঠিন এবং এর মধ্যে কোনো মুক্ত ইলেকট্রন না থাকায় এটি তড়িতের কুপরিবাহী। অন্যদিকে, গ্রাফাইটের স্তরীয় গঠনের জন্য এটি নরম এবং স্তরগুলির মধ্যে থাকা মুক্ত ইলেকট্রনের জন্য এটি তড়িতের সুপরিবাহী।

  2. পরীক্ষাগারে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস প্রস্তুতির পদ্ধতিটি প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য, বিক্রিয়ার সমীকরণ ও শনাক্তকরণ সহ বর্ণনা করো।

    উত্তর:
    প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য: মার্বেল পাথরের টুকরো (ক্যালসিয়াম কার্বনেট, \(CaCO_3\)) এবং লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (\(HCl\))।

    পদ্ধতি: একটি উলফ বোতলে কয়েকটি মার্বেল পাথরের টুকরো নেওয়া হয়। বোতলের এক মুখে একটি দীর্ঘনল ফানেল এবং অন্য মুখে নির্গমনল যুক্ত করা হয়। দীর্ঘনল ফানেলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে লঘু \(HCl\) যোগ করলে \(CO_2\) গ্যাস উৎপন্ন হয়। \(CO_2\) গ্যাস বাতাসের চেয়ে প্রায় 1.5 গুণ ভারী হওয়ায় এটিকে বায়ুর ঊর্ধ্ব অপসারণ দ্বারা গ্যাসজারে সংগ্রহ করা হয়।
    বিক্রিয়ার সমীকরণ: \( CaCO_3 + 2HCl \rightarrow CaCl_2 + H_2O + CO_2 \)
    শনাক্তকরণ:
    (i) একটি জ্বলন্ত পাটকাঠি গ্যাসজারের মুখে ধরলে সেটি নিভে যায়।
    (ii) উৎপন্ন গ্যাসকে স্বচ্ছ চুনজলের \(Ca(OH)_2\) মধ্যে দিয়ে চালনা করলে চুনজল ঘোলা হয়ে যায়।

  3. * গ্রিনহাউস এফেক্ট এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন বলতে কী বোঝো? বিশ্ব উষ্ণায়নের দুটি সম্ভাব্য ক্ষতিকারক প্রভাব লেখো।

    উত্তর:
    গ্রিনহাউস এফেক্ট: বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কার্বন ডাইঅক্সাইড \(CO_2\), মিথেন \(CH_4\), জলীয় বাষ্প, নাইট্রাস অক্সাইড \(N_2O\) প্রভৃতি গ্যাস পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত অবলোহিত রশ্মি (তাপ) শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে এমন একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখে যা জীবজগতের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কাচের ঘরের মতো এই প্রক্রিয়াকে গ্রিনহাউস এফেক্ট এবং গ্যাসগুলিকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়।

    বিশ্ব উষ্ণায়ন: জীবাশ্ম জ্বালানির দহন, অরণ্যছেদন ইত্যাদি কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। এই ঘটনাকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলা হয়।

    ক্ষতিকারক প্রভাব:
    (i) মেরু অঞ্চলের বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাবে, ফলে উপকূলবর্তী নিচু এলাকাগুলি প্লাবিত হবে।
    (ii) জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটবে, যার ফলে খরা, বন্যা, ঝড় ইত্যাদির প্রকোপ বাড়বে এবং কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।