Chapter 5: বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 50 MCQ | 30 SAQ | 10 Broad Questions
শ্রীরামপুর মিশন প্রেস বসু বিজ্ঞান মন্দির জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কারিগরি শিক্ষা শান্তিনিকেতন
ছাপাখানা ও বিজ্ঞান
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, IACS এবং কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের অবদান
বিকল্প শিক্ষা
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, কার্লাইল সার্কুলার এবং বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
50 টি1. বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ (Printed Book) কোনটি?
ক) বাইবেল
খ) হীরক সূত্র
গ) রামায়ণ
ঘ) কোরআন
ব্যাখ্যা: মুদ্রণ ব্যবস্থার ধাত্রীভূমি ছিল চিন। ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে চিনে ছাপা 'হীরক সূত্র' (Diamond Sutra) হল বিশ্বের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।
2. আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের (Printing Press) আবিষ্কারক কে?
ক) জোহানেস গুটেনবার্গ
খ) উইলিয়াম ক্যাক্সটন
গ) চার্লস উইলকিন্স
ঘ) পঞ্চানন কর্মকার
ব্যাখ্যা: ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ জার্মানির মেইনজ শহরে জোহানেস গুটেনবার্গ প্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন।
3. ভারতে প্রথম ছাপাখানা কোথায় স্থাপিত হয়?
ক) কলকাতা
খ) সুরাট
গ) গোয়া
ঘ) শ্রীরামপুর
ব্যাখ্যা: ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ মিশনারিরা ভারতের গোয়ায় (Goa) প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করেন।
4. বাংলায় প্রথম ছাপাখানা কোথায় স্থাপিত হয়?
ক) হুগলি
খ) কলকাতা
গ) শ্রীরামপুর
ঘ) চুঁচুড়া
ব্যাখ্যা: ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে জেমস অগাস্টাস হিকির উদ্যোগে হুগলিতে (এবং অ্যান্ড্রুজের উদ্যোগে) বাংলার প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হয়।
5. বাংলা মুদ্রণ শিল্পের জন্মদাতা বা 'বাংলার ক্যাক্সটন' কাকে বলা হয়?
ক) জেমস অগাস্টাস হিকি
খ) চার্লস উইলকিন্স
গ) পঞ্চানন কর্মকার
ঘ) মার্শম্যান
ব্যাখ্যা: গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের উৎসাহে চার্লস উইলকিন্স (Charles Wilkins) প্রথম বাংলা অক্ষরের নকশা বা টাইপ নির্মাণ করেন। তাই তাঁকে বাংলার ক্যাক্সটন বলা হয়।
6. চার্লস উইলকিন্সকে বাংলা অক্ষর নির্মাণে কে সাহায্য করেছিলেন?
ক) পঞ্চানন কর্মকার
খ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
গ) সুরেশচন্দ্র মজুমদার
ঘ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ব্যাখ্যা: ছাঁচে ঢালা ধাতু দিয়ে নিখুঁত বাংলা অক্ষর তৈরিতে উইলকিন্সকে সাহায্য করেছিলেন সুদক্ষ বাঙালি কারিগর পঞ্চানন কর্মকার।
7. বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ কোনটি?
ক) অন্নদামঙ্গল
খ) আ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ
গ) সমাচার দর্পণ
ঘ) মঙ্গল সমাচার
ব্যাখ্যা: ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত 'A Grammar of the Bengal Language' বইটি উইলকিন্সের তৈরি বাংলা হরফে হুগলি থেকে ছাপা হয়। এটিই বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই।
8. ভারতের প্রথম সংবাদপত্র (Newspaper) কোনটি?
ক) সমাচার দর্পণ
খ) সোমপ্রকাশ
গ) বেঙ্গল গেজেট
ঘ) দিকদর্শন
ব্যাখ্যা: ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে জেমস অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় প্রকাশিত 'বেঙ্গল গেজেট' (Hickey's Bengal Gazette) হল ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র (ইংরেজি ভাষায়)।
9. শ্রীরামপুর মিশন প্রেস (Serampore Mission Press) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৭৭৮ সালে
খ) ১৮০০ সালে
গ) ১৮১৮ সালে
ঘ) ১৮৩৫ সালে
ব্যাখ্যা: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড (যাঁদের একত্রে 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' বলা হয়) এর উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।
10. বাংলা ভাষার প্রথম মাসিক পত্রিকা কোনটি?
ক) সমাচার দর্পণ
খ) দিকদর্শন
গ) বেঙ্গল গেজেট
ঘ) সোমপ্রকাশ
ব্যাখ্যা: ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে শ্রীরামপুর মিশন থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'দিকদর্শন' নামক বাংলা ভাষার প্রথম মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
11. বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা কোনটি?
ক) সমাচার দর্পণ
খ) দিকদর্শন
গ) হিন্দু প্যাট্রিয়ট
ঘ) যুগান্তর
ব্যাখ্যা: ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে শ্রীরামপুর মিশন থেকে মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'সমাচার দর্পণ' নামক প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
12. বাঙালিদের মধ্যে প্রথম কে নিজস্ব ছাপাখানা ও বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন?
ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
ঘ) সুরেশচন্দ্র মজুমদার
ব্যাখ্যা: শ্রীরামপুর প্রেসের প্রাক্তন কর্মী গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কলকাতায় 'বেঙ্গল গেজেটি প্রেস' স্থাপন করে প্রথম বাঙালি হিসেবে ছাপাখানা ও বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন (১৮১৮ সালে)।
13. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়' কবে প্রকাশিত হয়?
ক) ১৮১৮ সালে
খ) ১৮৪৭ সালে
গ) ১৮৫৫ সালে
ঘ) ১৮৭২ সালে
ব্যাখ্যা: ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কালজয়ী শিশুশিক্ষার গ্রন্থ 'বর্ণপরিচয়' (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) প্রকাশিত হয়, যা বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব আনে।
14. 'ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি' কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) ডেভিড হেয়ার
গ) লর্ড মেকলে
ঘ) উইলিয়াম কেরি
ব্যাখ্যা: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ার সুলভে বা বিনামূল্যে ছাত্রদের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের জন্য 'কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করেন।
15. 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' (U. Ray and Sons) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) সুকুমার রায়
খ) সত্যজিৎ রায়
গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
ঘ) দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যাখ্যা: ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী উন্নত মানের ছবি ও বই ছাপানোর জন্য কলকাতায় 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' নামক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
16. হাফ-টোন ব্লক (Half-tone block) প্রিন্টিং ভারতে কে প্রচলন করেন?
ক) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
খ) চার্লস উইলকিন্স
গ) পঞ্চানন কর্মকার
ঘ) সুকুমার রায়
ব্যাখ্যা: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ইউরোপীয় পদ্ধতির অনুকরণে নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে ভারতে প্রথম হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং পদ্ধতির বিকাশ ঘটান, যা ছবি ছাপাকে নিখুঁত করেছিল।
17. 'সন্দেশ' (Sandesh) পত্রিকা কে প্রকাশ করেন?
ক) সত্যজিৎ রায়
খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
ঘ) প্রমদাচরণ সেন
ব্যাখ্যা: ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে শিশুদের জন্য বিখ্যাত সচিত্র মাসিক পত্রিকা 'সন্দেশ' উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সম্পাদনায় ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হয়।
18. 'ছেলেদের রামায়ণ' ও 'টুনটুনির বই' কার লেখা?
ক) সুকুমার রায়
খ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঘ) সত্যজিৎ রায়
ব্যাখ্যা: এই বিখ্যাত শিশুসাহিত্যগুলি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রচনা করেছিলেন এবং তাঁর নিজের ছাপাখানা থেকেই উন্নত হাফ-টোন ব্লক ব্যবহার করে ছেপেছিলেন।
19. ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে প্রথম প্রতিষ্ঠান কোনটি?
ক) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
খ) ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS)
গ) বসু বিজ্ঞান মন্দির
ঘ) কলকাতা সায়েন্স কলেজ
ব্যাখ্যা: ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত IACS বা ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা ছিল ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম ও প্রধান প্রতিষ্ঠান।
20. IACS বা ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) প্রফুল্লচন্দ্র রায়
খ) ড. মহেন্দ্রলাল সরকার
গ) জগদীশচন্দ্র বসু
ঘ) ফাদার ইউজিন লাঁফো
ব্যাখ্যা: কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ফাদার ইউজিন লাঁফোর সহায়তায় ১৮৭৬ সালে IACS প্রতিষ্ঠা করেন।
21. ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভার (IACS) প্রথম অধিকর্তা কে ছিলেন?
ক) ফাদার ইউজিন লাঁফো
খ) ড. মহেন্দ্রলাল সরকার
গ) প্যারিচাঁদ মিত্র
ঘ) ড. সি. ভি. রামন
ব্যাখ্যা: IACS এর প্রথম অধিকর্তা (Director) ছিলেন প্যারিচাঁদ মিত্র। ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ছিলেন এর সম্পাদক।
22. কোন্ ভারতীয় বিজ্ঞানী প্রথম নোবেল পুরস্কার পান এবং তিনি কোন্ প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন?
ক) মেঘনাদ সাহা, বসু বিজ্ঞান মন্দির
খ) সি. ভি. রামন, IACS
গ) জগদীশচন্দ্র বসু, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
ঘ) প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বেঙ্গল কেমিক্যাল
ব্যাখ্যা: স্যার সি. ভি. রামন IACS-এ গবেষণা করে 'রামন এফেক্ট' আবিষ্কার করেন এবং ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় এশিয়ার প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান।
23. কলকাতা সায়েন্স কলেজ (Calcutta Science College) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৭৬ সালে
খ) ১৯০৬ সালে
গ) ১৯১৪ সালে
ঘ) ১৯১৭ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মার্চ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে 'ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি' প্রতিষ্ঠিত হয়।
24. কলকাতা সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠায় কোন্ দুজন বাঙালি বিপুল অর্থ দান করেছিলেন?
ক) তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষ
খ) মহেন্দ্রলাল সরকার ও জগদীশচন্দ্র বসু
গ) উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমার রায়
ঘ) রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যাখ্যা: বিশিষ্ট আইনজীবী স্যার তারকনাথ পালিত এবং স্যার রাসবিহারী ঘোষ কলকাতা সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ও জমি দান করেছিলেন।
25. বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) সত্যেন্দ্রনাথ বসু
খ) প্রফুল্লচন্দ্র রায়
গ) আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু
ঘ) চন্দ্রমুখী বসু
ব্যাখ্যা: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় বিজ্ঞান গবেষণার জন্য 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' প্রতিষ্ঠা করেন।
26. বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রবেশদ্বারে কীসের প্রতীক রয়েছে?
ক) পদ্মফুল
খ) বজ্র (Vajra)
গ) অশোক চক্র
ঘ) চরকা
ব্যাখ্যা: বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতীক হিসেবে ঋষি দধীচির আত্মত্যাগের স্মারক 'বজ্র' (Vajra) কে গ্রহণ করা হয়েছিল।
27. উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে, তা প্রমাণ করার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু কোন্ যন্ত্র আবিষ্কার করেন?
ক) সিসমোগ্রাফ
খ) ক্রেস্কোগ্রাফ (Crescograph)
গ) ব্যারোমিটার
ঘ) মাইক্রোস্কোপ
ব্যাখ্যা: আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ক্রেস্কোগ্রাফ (Crescograph) যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ ও সংবেদনশীলতা আছে।
28. 'বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস' কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) প্রফুল্লচন্দ্র রায়
খ) জগদীশচন্দ্র বসু
গ) মেঘনাদ সাহা
ঘ) মহেন্দ্রলাল সরকার
ব্যাখ্যা: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (P. C. Ray) ১৮৯২ সালে নিজ উদ্যোগে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা করেন (যা ১৯০১ সালে লিমিটেড কোম্পানি হয়)। এটি ভারতের প্রথম রাসায়নিক ও ঔষধ প্রস্তুতকারী কারখানা।
29. জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education) কবে গঠিত হয়?
ক) ১৯০৫ সালে
খ) ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট
গ) ১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই
ঘ) ১৯১১ সালে
ব্যাখ্যা: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্পরূপে ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE) গঠিত হয়।
30. জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
ক) অরবিন্দ ঘোষ
খ) রাসবিহারী ঘোষ
গ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যাখ্যা: স্যার রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রথম সভাপতি।
31. জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে প্রতিষ্ঠিত 'বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ'-এর প্রথম অধ্যক্ষ (Principal) কে ছিলেন?
ক) রাসবিহারী ঘোষ
খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
গ) অরবিন্দ ঘোষ
ঘ) ব্রজেন্দ্রনাথ শীল
ব্যাখ্যা: ঋষি অরবিন্দ ঘোষ (Aurobindo Ghosh) ছিলেন বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ (Principal)।
32. 'ডন সোসাইটি' (Dawn Society) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) অরবিন্দ ঘোষ
খ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) মহেন্দ্রলাল সরকার
ব্যাখ্যা: ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষাবিদ সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশি চেতনা ও জাতীয় শিক্ষার প্রসারের জন্য 'ডন সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করেন।
33. 'কার্লাইল সার্কুলার' (Carlyle Circular) কবে জারি করা হয়?
ক) ১৯০৪ সালে
খ) ১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবর
গ) ১৯০৬ সালে
ঘ) ১৯১১ সালে
ব্যাখ্যা: বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য ১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার দমনমূলক 'কার্লাইল সার্কুলার' জারি করে। এর প্রতিবাদেই জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন জোরদার হয়।
34. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি (Anti-Circular Society) কে গঠন করেন?
ক) শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু
খ) অরবিন্দ ঘোষ
গ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিবাদে এবং বহিষ্কৃত ছাত্রদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ দিতে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ সালে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি গঠন করেন।
35. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯০৫ সালে
খ) ১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই
গ) ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট
ঘ) ১৯১৪ সালে
ব্যাখ্যা: ভারতে দেশীয় কারিগরি শিক্ষার প্রসারের জন্য তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) প্রতিষ্ঠিত হয়।
36. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের (BTI) প্রথম অধ্যক্ষ কে ছিলেন?
ক) অরবিন্দ ঘোষ
খ) প্রমথনাথ বসু
গ) রাসবিহারী ঘোষ
ঘ) তারকনাথ পালিত
ব্যাখ্যা: বিখ্যাত ভূতাত্ত্বিক প্রমথনাথ বসু (P. N. Bose) ছিলেন বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথম অধ্যক্ষ।
37. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) বর্তমানে কী নামে পরিচিত?
ক) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
খ) প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়
গ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
ঘ) খড়গপুর আইআইটি
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার পর ১৯৫৫ সালে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট 'যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়' (Jadavpur University) নামে উন্নীত হয়।
38. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ১৮৬৩ সালে
খ) ১৯০১ সালে
গ) ১৯২১ সালে
ঘ) ১৯০৫ সালে
ব্যাখ্যা: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
39. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে 'বিশ্বভারতী' (Visva-Bharati) বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ১৯০১ সালে
খ) ১৯১৩ সালে
গ) ১৯২১ সালে
ঘ) ১৯৫১ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব শিক্ষাদর্শনে 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
40. বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য (Vice-Chancellor) কে ছিলেন?
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) অমর্ত্য সেন
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য।
41. বিশ্বভারতী কবে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (Central University) মর্যাদা লাভ করে?
ক) ১৯২১ সালে
খ) ১৯৪৭ সালে
গ) ১৯৫১ সালে
ঘ) ১৯৫৫ সালে
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী ভারতীয় লোকসভার আইন দ্বারা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।
42. 'তোতাকাহিনি' (The Parrot's Training) গল্পটি কার লেখা?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) সত্যজিৎ রায়
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'তোতাকাহিনি' রূপক গল্পের মাধ্যমে ব্রিটিশদের যান্ত্রিক, আনন্দহীন ও মুখস্থবিদ্যা-নির্ভর ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
43. রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত?
ক) শুধু বই পড়া
খ) সরকারি চাকরি পাওয়া
গ) প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো
ঘ) ইউরোপীয়দের অনুকরণ করা
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে প্রকৃত শিক্ষা হবে প্রকৃতির কোলে, মুক্ত পরিবেশে। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন ঘটানোই শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
44. শ্রীনিকেতন (Sriniketan) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
গ) গান্ধীজি
ঘ) রামমোহন রায়
ব্যাখ্যা: ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিওনার্ড এলমহার্স্ট-এর সহায়তায় শান্তিনিকেতনের পাশে সুরুল গ্রামে গ্রামীণ পুনর্গঠন ও কৃষিশিক্ষার জন্য শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন।
45. ভারতে প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কোনটি?
ক) যাদবপুর
খ) রুরকি (Roorkee)
গ) শিবপুর
ঘ) মাদ্রাজ
ব্যাখ্যা: ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত রুরকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে IIT Roorkee) হল ভারতের প্রথম কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলায় প্রথম শিবপুর বি.ই. কলেজ (১৮৫৬)।
46. কলকাতায় 'বিজ্ঞান পরিষদ' বা Indian Science Congress কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৭৬ সালে
খ) ১৯১৪ সালে
গ) ১৯১৭ সালে
ঘ) ১৯২১ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং নীলরতন সরকারের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
47. বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) কোন ধরনের গবেষণার জন্য বিখ্যাত?
ক) মহাকাশ গবেষণা
খ) পদার্থবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার আন্তঃসম্পর্ক
গ) পারমাণবিক গবেষণা
ঘ) সমাজবিজ্ঞান
ব্যাখ্যা: আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও উদ্ভিদবিদ্যার মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন।
48. 'বেঙ্গল কেমিক্যালস' কোন স্বদেশি আন্দোলনের সময় জনপ্রিয়তা লাভ করে?
ক) নীল বিদ্রোহ
খ) বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন (১৯০৫)
গ) অসহযোগ আন্দোলন
ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলন
ব্যাখ্যা: ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলনের সময় বিদেশি ওষুধ বর্জন করে দেশীয় শিল্পের প্রসারে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের 'বেঙ্গল কেমিক্যালস' অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
49. বাংলার প্রথম আধুনিক ছাপাখানা কে স্থাপন করেন?
ক) জেমস অগাস্টাস হিকি
খ) চার্লস উইলকিন্স
গ) অ্যান্ড্রুজ
ঘ) পঞ্চানন কর্মকার
ব্যাখ্যা: ১৭৭৮ সালে হুগলিতে অ্যান্ড্রুজ (Andrews) সাহেব বাংলার প্রথম আধুনিক ছাপাখানা স্থাপন করেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
50. লাইনোটাইপ (Linotype) কে আবিষ্কার করেন?
ক) সুরেশচন্দ্র মজুমদার
খ) পঞ্চানন কর্মকার
গ) চার্লস উইলকিন্স
ঘ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
ব্যাখ্যা: পঞ্চানন কর্মকার কাঠের বা সিসার ব্লক তৈরি করতেন, কিন্তু সুরেশচন্দ্র মজুমদার বাংলা মুদ্রণশিল্পে লাইনোটাইপ বা আধুনিক টাইপরাইটার পদ্ধতির প্রচলন করে মুদ্রণকে আরও দ্রুত করেছিলেন।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
30 টি1. মুদ্রণ বিপ্লব কী?
১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করলে বই ছাপানো সহজ ও সস্তা হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত শিক্ষার প্রসার ঘটে, যা ইতিহাসে মুদ্রণ বিপ্লব নামে পরিচিত।
2. চার্লস উইলকিন্স কে ছিলেন?
চার্লস উইলকিন্স ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী। তিনি প্রথম ছাঁচে ঢালা চলনসই বাংলা অক্ষরের (টাইপ) নকশা তৈরি করেছিলেন বলে তাঁকে 'বাংলার ক্যাক্সটন' বলা হয়।
3. পঞ্চানন কর্মকার কেন বিখ্যাত?
পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন একজন সুদক্ষ বাঙালি কারিগর। তিনি চার্লস উইলকিন্সের নকশা অনুযায়ী সিসা ও লোহা গলিয়ে নিখুঁত বাংলা অক্ষরের টাইপ বা ব্লক তৈরি করে বাংলা মুদ্রণশিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
4. বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম বই কোনটি? এটি কবে প্রকাশিত হয়?
ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত 'A Grammar of the Bengal Language' (বাংলা ব্যাকরণ) হল বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই। এটি ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলি থেকে প্রকাশিত হয়।
5. শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড (শ্রীরামপুর ত্রয়ী)-এর যৌথ উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।
6. শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?
এই ছাপাখানা থেকে বাইবেলের বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ, সমাচার দর্পণ ও দিকদর্শনের মতো পত্রিকা, এবং রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি বই সুলভে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলি করা হত, যা বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিল।
7. গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কে ছিলেন?
গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি নিজস্ব উদ্যোগে 'বেঙ্গল গেজেটি প্রেস' স্থাপন করেন এবং প্রথম বাঙালি হিসেবে বই ছাপানো ও বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। তিনি 'বেঙ্গল গেজেটি' (১৮১৮) পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন।
8. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছাপাখানার নাম কী ছিল?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কার ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'সংস্কৃত প্রেস' (Sanskrit Press) নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখান থেকেই 'বর্ণপরিচয়' ছাপা হয়।
9. উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কেন 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী উন্নত মানের ছবি, শিশুদের বই এবং নিখুঁত হাফ-টোন ব্লক ব্যবহার করে মুদ্রণের জন্য ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
10. হাফ-টোন ব্লক (Half-tone block) কী?
এটি মুদ্রণশিল্পের একটি আধুনিক প্রযুক্তি। ছবি বা ফটোগ্রাফকে ছোটো ছোটো বিন্দুতে (Dots) ভেঙে মুদ্রণের জন্য যে ব্লক তৈরি করা হয়, তাকে হাফ-টোন ব্লক বলে। উপেন্দ্রকিশোর ভারতে এর সফল প্রয়োগ করেছিলেন।
11. বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় বিজ্ঞান গবেষণার জন্য 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' প্রতিষ্ঠা করেন।
12. বসু বিজ্ঞান মন্দিরের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, এবং উদ্ভিদবিদ্যার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা এবং বিশ্বকে প্রমাণ করা যে ভারতীয়রাও বিজ্ঞানে পিছিয়ে নেই।
13. ক্রেস্কোগ্রাফ (Crescograph) যন্ত্রের কাজ কী?
জগদীশচন্দ্র বসু ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এর সাহায্যে উদ্ভিদের অতি সূক্ষ্ম বৃদ্ধি মাপা যেত এবং প্রমাণ করা যেত যে উদ্ভিদেরও প্রাণ ও সংবেদনশীলতা (উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া) আছে।
14. ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা (IACS) কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ফাদার ইউজিন লাঁফোর সহায়তায় 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স' (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন।
15. IACS এর গুরুত্ব কী ছিল?
এটি ছিল ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই স্যার সি. ভি. রামন 'রামন এফেক্ট' আবিষ্কার করে ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। মেঘনাদ সাহা, কে. এস. কৃষ্ণানও এখানে গবেষণা করেছেন।
16. কলকাতা সায়েন্স কলেজ কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং স্যার তারকনাথ পালিত ও স্যার রাসবিহারী ঘোষের বিপুল অর্থদানে কলকাতা সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
17. কলকাতা সায়েন্স কলেজে যুক্ত দুজন বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম লেখো।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু (S. N. Bose), মেঘনাদ সাহা এবং সি. ভি. রামন কলকাতা সায়েন্স কলেজে অধ্যাপনা ও গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন।
18. বেঙ্গল কেমিক্যাল (Bengal Chemical) কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় দেশীয় পদ্ধতিতে রাসায়নিক দ্রব্য ও ওষুধ তৈরির জন্য ১৮৯২ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯০১ সালে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়।
19. কার্লাইল সার্কুলার (Carlyle Circular - 1905) কী?
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ রুখতে ব্রিটিশ সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল এক দমনমূলক নির্দেশিকা জারি করেন। এতে বলা হয়, আন্দোলনে যোগ দিলে ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং বৃত্তি বন্ধ করা হবে।
20. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি কেন গঠিত হয়?
কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিবাদে এবং যে সমস্ত ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ সালে 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' গঠন করেন।
21. জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education) কবে, কেন গঠিত হয়?
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা বর্জন (Boycott) করে সম্পূর্ণ দেশীয় আদর্শে ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণে বিকল্প শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' গঠিত হয়। রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন এর প্রথম সভাপতি।
22. জাতীয় শিক্ষা পরিষদের (NCE) উদ্দেশ্য কী ছিল?
এর উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া, ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ জাগানো, এবং সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো যাতে ছাত্ররা স্বনির্ভর হতে পারে।
23. বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (Bengal National College) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর প্রথম অধ্যক্ষ কে ছিলেন?
জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে ১৯০৬ সালের ১৪ আগস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম অধ্যক্ষ (Principal) ছিলেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ।
24. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে 'সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন' (SPTE) এর অধীনে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রমথনাথ বসু ছিলেন এর প্রথম অধ্যক্ষ।
25. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের বর্তমান নাম কী?
বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) পরবর্তীকালে কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (Jadavpur) নামে পরিচিত হয়, যা ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
26. শান্তিনিকেতন (Santiniketan) কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে বোলপুরে ধ্যানের জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেন শান্তিনিকেতন। পরবর্তীকালে ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' নামে একটি বিদ্যালয় চালু করেন।
27. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তার মূল ভিত্তি কী ছিল?
রবীন্দ্রনাথের মতে, চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি মুখস্থবিদ্যা প্রকৃত শিক্ষা নয়। প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে, গাছের তলায় গুরু-শিষ্যের নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন ঘটানোই হল শিক্ষার মূল ভিত্তি।
28. রবীন্দ্রনাথ কেন 'তোতাকাহিনি' রচনা করেছিলেন?
ব্রিটিশদের প্রবর্তিত যান্ত্রিক, আনন্দহীন, অমানবিক এবং কেবল মুখস্থবিদ্যা-নির্ভর ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে তীব্র ব্যঙ্গ ও সমালোচনা করার জন্যই রবীন্দ্রনাথ 'তোতাকাহিনি' রূপক গল্পটি রচনা করেছিলেন।
29. বিশ্বভারতী (Visva-Bharati) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর উদ্দেশ্য কী ছিল?
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মিলন ঘটানো এবং 'যেখানে বিশ্ব এক নীড়ে পরিণত হয়' (Yatra visvam bhavatyekanidam) সেই আদর্শ স্থাপন করা।
30. শ্রীনিকেতন (Sriniketan) কবে, কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিওনার্ড এলমহার্স্ট-এর সহায়তায় শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ পুনর্গঠন, কৃষিশিক্ষা, কুটিরশিল্পের প্রসার এবং গ্রামবাসীদের স্বনির্ভর করা।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
10 টি1. বাংলায় মুদ্রণযন্ত্রের বা ছাপাখানার বিকাশ (Development of Printing Press in Bengal) সম্পর্কে আলোচনা করো।
বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ:
আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলায় আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের প্রবেশ ঘটে, যা বাংলার শিক্ষা ও সমাজে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এর বিকাশের পর্যায়গুলি হল:
- সূচনা পর্ব (হুগলি): ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানায় (অনেকের মতে জেমস অগাস্টাস হিকির ছাপাখানায়) ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের 'A Grammar of the Bengal Language' বইটি প্রথম ছাপা হয়। এটিই বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই।
- চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের ভূমিকা: গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের উৎসাহে চার্লস উইলকিন্স প্রথম বাংলা অক্ষরের নকশা বা চলনসই টাইপ নির্মাণ করেন (তাঁকে 'বাংলার ক্যাক্সটন' বলা হয়)। হুগলির সুদক্ষ কারিগর পঞ্চানন কর্মকার লোহা ও সিসা গলিয়ে সেই নকশা অনুযায়ী নিখুঁত বাংলা ব্লক বা টাইপ তৈরি করে বাংলা মুদ্রণের কাজকে সহজ করেন।
- শ্রীরামপুর মিশন প্রেস (১৮০০): উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ডের উদ্যোগে ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপিত হয়। এখান থেকে বাংলা, সংস্কৃত, মারাঠি সহ নানা ভাষায় বাইবেল, পাঠ্যপুস্তক, এবং 'সমাচার দর্পণ' ও 'দিকদর্শন' পত্রিকা মুদ্রিত হয়ে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছায়। এটি ছিল মুদ্রণ শিল্পের এক বড়ো মাইলফলক।
- বাঙালিদের উদ্যোগ: শ্রীরামপুর প্রেসের পর গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রথম বাঙালি হিসেবে 'বেঙ্গল গেজেটি প্রেস' স্থাপন করেন। পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 'সংস্কৃত প্রেস' (১৮৪৭) স্থাপন করে 'বর্ণপরিচয়' মুদ্রণ করেন, যা বাংলার শিক্ষা বিস্তারে বিপ্লব আনে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' (১৮৯৫) হাফ-টোন ব্লক ব্যবহার করে সচিত্র মুদ্রণে আধুনিকতা নিয়ে আসে।
2. ছাপাখানার বিকাশের সাথে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক (Relationship between Printing Press and Spread of Education) বিশ্লেষণ করো।
ছাপাখানা ও শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক:
উনিশ শতকে বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ এবং শিক্ষা বিস্তার সমান্তরালভাবে চলেছিল। ছাপাখানা কীভাবে শিক্ষায় বিপ্লব এনেছিল তা নীচে আলোচনা করা হল:
- সুলভে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ: ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে বই হাতে লিখতে হত, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে শিক্ষা কেবল ধনী ও অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ছাপাখানা আসার পর খুব দ্রুত, সস্তায় এবং প্রচুর পরিমাণে পাঠ্যবই ছাপানো সম্ভব হয়, যা সাধারণ গরিব ছাত্রদের হাতেও পৌঁছে যায়।
- মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার: শ্রীরামপুর মিশন প্রেস, কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি (১৮১৭) এবং বিদ্যাসাগরের 'সংস্কৃত প্রেস' থেকে বাংলা ভাষায় গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান এবং ব্যাকরণ বই ছাপানো শুরু হয়। বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়' (১৮৫৫) ছাপা হওয়ার পর গ্রামে গ্রামে স্কুল গড়ে উঠতে থাকে।
- সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের ভূমিকা: ছাপাখানার ফলে 'সমাচার দর্পণ', 'বঙ্গদর্শন', 'সোমপ্রকাশ', 'তত্ত্ববোধিনী'র মতো অসংখ্য পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। এগুলি সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশ-বিদেশের খবর, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে বিরাট সাহায্য করেছিল।
- আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার: ইংরেজি বইয়ের বাংলা অনুবাদ এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের বই ছাপানোর ফলে বাংলার মানুষ খুব সহজেই আধুনিক চিন্তাধারা ও ফরাসি বিপ্লবের মতো স্বাধীন ভাবধারার সাথে পরিচিত হতে পেরেছিল।
- উপসংহার: সুতরাং, ছাপাখানা শুধু কালির অক্ষর ছাপেনি, এটি বাংলার সমাজের অন্ধকার দূর করে এক অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক নবজাগরণ ও গণশিক্ষার পথ প্রশস্ত করেছিল।
3. বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (Upendrakishore Ray Chowdhury) এবং 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' এর অবদান আলোচনা করো।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স-এর অবদান:
উনিশ শতকের শেষদিকে বাংলা মুদ্রণশিল্প ও প্রকাশনার জগতে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' (U. Ray and Sons) এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল:
- ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স প্রতিষ্ঠা: উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী এবং মুদ্রণ বিশারদ। উন্নত মানের বই এবং নিখুঁত ছবি ছাপানোর উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স' নামক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
- হাফ-টোন ব্লকের (Half-tone block) আবিষ্কার: আগে কাঠ খোদাই করে (Woodcut) ছবি ছাপানো হত, যা স্পষ্ট হত না। উপেন্দ্রকিশোর ইউরোপীয় পদ্ধতির অনুকরণে নিজস্ব গবেষণায় আলোকবিজ্ঞানের সূত্র কাজে লাগিয়ে ভারতে প্রথম 'হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং' পদ্ধতির সফল বিকাশ ঘটান। এর ফলে বইয়ে ফটোগ্রাফ বা ছবি ছাপানো অত্যন্ত নিখুঁত ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
- শিশুসাহিত্যের বিকাশ: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শিশুদের বই আকর্ষণীয় করতে হলে প্রচুর রঙিন ও সুন্দর ছবির প্রয়োজন। তিনি নিজের ছাপাখানা থেকে 'ছেলেদের রামায়ণ', 'ছেলেদের মহাভারত', 'টুনটুনির বই', 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' প্রভৃতি বই উন্নত প্রযুক্তিতে ছাপিয়ে বাংলার শিশুসাহিত্যে বিপ্লব আনেন।
- সন্দেশ পত্রিকা প্রকাশ: ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় 'সন্দেশ' নামক সচিত্র মাসিক শিশু পত্রিকা এই প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়, যা আজও বাংলার শিশুদের কাছে জনপ্রিয়।
- উপসংহার: তাঁর তৈরি ডায়াফ্রাম ও স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র বিদেশের মুদ্রণ জগতেও প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর পুত্র সুকুমার রায় এবং পৌত্র সত্যজিৎ রায় এই প্রকাশনার ঐতিহ্যকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
4. ভারতে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে 'ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা' বা IACS (Indian Association for the Cultivation of Science) এর অবদান মূল্যায়ন করো।
বিজ্ঞান শিক্ষায় IACS এর অবদান:
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে যখন পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো উন্নত পরিকাঠামো ছিল না, তখন দেশীয় উদ্যোগে বিজ্ঞান গবেষণার প্রসারের জন্য ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ফাদার ইউজিন লাঁফোর সহায়তায় 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স' (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন। এর অবদানগুলি হল:
- প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র: এটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়দের অর্থানুকূল্যে এবং ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত এশিয়ার প্রথম বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্যারিচাঁদ মিত্র ছিলেন এর প্রথম অধিকর্তা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যায় মৌলিক গবেষণা করা।
- বক্তৃতা ও শিক্ষাদান: এখানে শুধু গবেষণাই হত না, বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ ছাত্র ও মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতার আয়োজন করা হত। মহেন্দ্রলাল সরকার, ফাদার লাঁফো, জগদীশচন্দ্র বসু, নীলরতন সরকার প্রমুখ এখানে নিয়মিত বক্তৃতা দিতেন।
- প্রখ্যাত বিজ্ঞানীদের আত্মপ্রকাশ: IACS ছিল ভারতের দিকপাল বিজ্ঞানীদের আঁতুড়ঘর। স্যার সি. ভি. রামন (C.V. Raman) এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারেই আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করে 'রামন এফেক্ট' আবিষ্কার করেন এবং ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় এশিয়ার প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
- অন্যান্য বিজ্ঞানীদের অবদান: নোবেলজয়ী সি. ভি. রামন ছাড়াও মেঘনাদ সাহা, কে. এস. কৃষ্ণান, এস. ভগবত্তম এর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা এখানে গবেষণা করে ভারতীয় বিজ্ঞানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। 'ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্স' নামক গবেষণা পত্রিকা এখান থেকেই প্রকাশিত হয়।
5. বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে 'কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ' (Calcutta Science College) এর ভূমিকা আলোচনা করো।
কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের ভূমিকা:
বিশ শতকের শুরুতে ভারতে উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে 'ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি' বা কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ভূমিকা অসীম:
- দেশি মূলধনে প্রতিষ্ঠা: এটি ব্রিটিশ সরকারের কোনো অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ ভারতীয়দের দানে গড়ে উঠেছিল। প্রখ্যাত আইনজীবী স্যার তারকনাথ পালিত এবং স্যার রাসবিহারী ঘোষ তাঁদের সারাজীবনের সঞ্চিত বিপুল অর্থ (প্রায় ৩৭ লক্ষ টাকা) ও জমি বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেছিলেন।
- আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার সুযোগ: এখানে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা এবং ফলিত বিজ্ঞানের (Applied Science) ওপর গবেষণার বিশ্বমানের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়। এর ফলে ভারতীয় ছাত্রদের আর বিজ্ঞান পড়ার জন্য ইউরোপে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।
- দিকপাল অধ্যাপকদের সমাবেশ: স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সারা দেশ থেকে সেরা প্রতিভাদের এখানে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (রসায়ন), সি. ভি. রামন (পদার্থবিদ্যা), মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু (S. N. Bose), জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, শিশিরকুমার মিত্র প্রমুখ বিজ্ঞানীরা এখানে অধ্যাপনা ও মৌলিক গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
- ভারতীয় বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ: এস. এন. বোস-এর 'বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স', মেঘনাদ সাহার 'তাপীয় আয়নন তত্ত্ব' এবং প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের রাসায়নিক গবেষণার ফলে এই কলেজ ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এটি ভারতের কারিগরি ও শিল্পোন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল।
6. বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' (Bose Institute) এর অবদান আলোচনা করো।
জগদীশচন্দ্র বসুর অবদান:
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানের অন্যতম প্রাণপুরুষ। তিনি পদার্থবিদ্যা এবং উদ্ভিদবিদ্যার মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
- বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার: তিনি মার্কোনির আগেই অতি ক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ (Microwave) আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজকের ওয়াই-ফাই বা রেডিও যোগাযোগের মূল ভিত্তি।
- উদ্ভিদের প্রাণ প্রমাণ: তিনি 'ক্রেস্কোগ্রাফ' (Crescograph), রেজোন্যান্ট রেকর্ডার প্রভৃতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করে বিশ্বের সামনে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে এবং তারা আলো, তাপ বা বিষ প্রয়োগে প্রাণীদের মতোই সাড়া দেয় (সংবেদনশীলতা)।
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের (Bose Institute) অবদান:
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় বিজ্ঞান গবেষণার জন্য 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রবেশদ্বারে বজ্রের (Vajra) চিহ্ন রয়েছে, যা আত্মত্যাগের প্রতীক।
- আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা (Interdisciplinary Research): এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা ও মাইক্রোবায়োলজির মধ্যে দেওয়াল ভেঙে দিয়ে এক সমন্বিত বিজ্ঞান চর্চা করা।
- ভারতীয় দর্শনের সাথে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন: জগদীশচন্দ্র চেয়েছিলেন প্রাচীন ভারতীয় উপনিষদের দর্শনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে। তিনি দেশীয় কারিগরদের দিয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি তৈরি করে দেখিয়েছিলেন যে ভারতীয়রা বিজ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
- জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণা: ব্রিটিশদের অবজ্ঞা সহ্য করেও তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ভারতীয় মেধা বিশ্বমানের। তাঁর এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের স্বাধীনভাবে গবেষণা করার এক অসীম প্রেরণা জুগিয়েছিল।
7. স্বদেশি আন্দোলনে 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' (National Council of Education - NCE) গঠনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং ব্যর্থতার কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনের প্রেক্ষাপট:
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করলে সারা বাংলায় স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্ররা স্কুল-কলেজ ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিলে সরকার 'কার্লাইল সার্কুলার' (১৯০৫) জারি করে ছাত্রদের স্কুল থেকে বহিষ্কার ও শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর প্রতিবাদে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা বয়কট করে সম্পূর্ণ দেশীয় নিয়ন্ত্রণে বিকল্প জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' বা NCE গঠিত হয় (সভাপতি: রাসবিহারী ঘোষ)।
NCE এর উদ্দেশ্য:
- ব্রিটিশদের যান্ত্রিক ও কেরানি তৈরির শিক্ষার বদলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা।
- ছাত্রদের মধ্যে গভীর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ এবং নৈতিক চরিত্র গঠন করা।
- কলাবিভাগের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার (Technical education) প্রসার ঘটানো, যাতে ছাত্ররা স্বনির্ভর হতে পারে।
ব্যর্থতার কারণ:
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ সাময়িক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি, কারণ:
- সরকারি স্বীকৃতির অভাব: এই প্রতিষ্ঠানগুলির দেওয়া ডিগ্রির কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। ফলে এখান থেকে পাস করা ছাত্রদের সরকারি চাকরি পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
- আর্থিক সংকট: ব্রিটিশ সরকারের কোনো আর্থিক অনুদান না থাকায় কেবল কয়েকজন দেশপ্রেমিক জমিদারের দানে এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থা চালানো সম্ভব হয়নি। পরিকাঠামো ও ল্যাবরেটরির চরম অভাব দেখা দেয়।
- নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: পরিষদের নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তারকনাথ পালিত প্রমুখ কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে চেয়ে ১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই আলাদা করে 'সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন' (SPTE) গঠন করেন।
- আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়া: ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর স্বদেশি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায় এবং ছাত্ররা পুনরায় সরকারি স্কুল-কলেজে ফিরে যেতে শুরু করে।
8. কারিগরি শিক্ষার (Technical Education) বিকাশে 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' (BTI) এর ভূমিকা আলোচনা করো।
BTI এর ভূমিকা:
বিশ শতকের শুরুতে স্বদেশি আন্দোলনের সময় উপলব্ধি করা হয় যে শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা বা কলাবিভাগ দিয়ে দেশের আর্থিক মুক্তি সম্ভব নয়। যুবসমাজকে স্বনির্ভর করতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশের জন্য কারিগরি বা টেকনিক্যাল শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
- BTI এর প্রতিষ্ঠা: এই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী স্যার তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে 'সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন' (SPTE) গঠিত হয়। এর অধীনেই ১৯০৬ সালের ২৫ জুলাই কলকাতায় 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' (BTI) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ প্রমথনাথ বসু।
- শিক্ষাদান পদ্ধতি: BTI-তে মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সেরামিকস, সাবান ও দেশলাই তৈরির মতো বৃত্তিমূলক কোর্স শেখানো হত।
- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর: ১৯১০ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE) এবং SPTE একত্রিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯২৮ সালে BTI এর নতুন নামকরণ হয় 'কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি' এবং এটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়। ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৫৫ সালে এটিই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
- উপসংহার: ব্রিটিশদের কারিগরি শিক্ষার অভাব পূরণে এবং স্বাধীন ভারতের শিল্পোন্নয়নে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগর তৈরিতে BTI-এর ঐতিহাসিক অবদান অপরিসীম।
9. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) শিক্ষাচিন্তা এবং শান্তিনিকেতন (Santiniketan) ভাবনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা ও শান্তিনিকেতন ভাবনা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থাকে তীব্র অপছন্দ করতেন। তাঁর মতে, বিদ্যালয়গুলি ছিল 'শিক্ষার কারখানা', যা শুধু যন্ত্রের মতো কেরানি তৈরি করে। তাই তিনি 'তোতাকাহিনি' লিখে এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর নিজস্ব শিক্ষাদর্শনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
- প্রকৃতির কোলে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে চার দেওয়ালের বন্দি খাঁচায় প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ হল উন্মুক্ত প্রকৃতি। প্রকৃতির উদারতার মধ্যেই শিশুর মন ও বুদ্ধির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। তাই তিনি শহরের কোলাহল থেকে দূরে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে গাছের তলায় খোলা আকাশের নীচে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন (১৯০১ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা)।
- প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন: তাঁর মতে, প্রকৃতির সাথে মানুষের এক নিবিড় আধ্যাত্মিক ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির গাছপালা, ঋতু পরিবর্তন, আলো-বাতাসকে অনুভব করেই ছাত্ররা জীবনের প্রকৃত অর্থ শিখবে।
- মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা: তিনি মাতৃভাষাকে 'মায়ের দুধ'-এর সমতুল্য মনে করতেন। তাই তিনি ইংরেজি নয়, বরং মাতৃভাষার মাধ্যমেই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
- সৃজনশীলতা ও আনন্দের শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষায় কোনো শাস্তির ভয় বা মুখস্থবিদ্যার চাপ ছিল না। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি গান, নাচ, ছবি আঁকা, নাটক, হস্তশিল্প প্রভৃতি সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে আনন্দময় শিক্ষার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।
- পল্লি উন্নয়ন: শিক্ষা যেন শুধু পুঁথিতে আটকে না থাকে, তা যেন সমাজের কাজে লাগে। তাই তিনি শান্তিনিকেতনের পাশে শ্রীনিকেতন (১৯২২) প্রতিষ্ঠা করে কৃষিশিক্ষা, সমবায় ও পল্লি উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
10. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিশ্বভারতী' (Visva-Bharati) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও আদর্শ আলোচনা করো।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও আদর্শ:
শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সাফল্যের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিক্ষাদর্শনকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখেন। এই মহৎ উদ্দেশ্যেই তিনি ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন (যা ১৯৫১ সালে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়)। এর আদর্শগুলি হল:
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন: বিশ্বভারতীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক মহান মিলনক্ষেত্র তৈরি করা। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, পাশ্চাত্যের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিকতা, দর্শন ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে।
- বিশ্বমানবতাবাদ (Universal Humanism): বিশ্বভারতীর মূল মন্ত্র বা মোটো (Motto) হল 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্' (Yatra visvam bhavatyekanidam)—অর্থাৎ 'যেখানে সমগ্র বিশ্ব এক নীড়ে বা ঠিকানায় এসে মিলিত হয়'। এখানে দেশ, জাতি বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। সমগ্র বিশ্বের মানুষ এখানে জ্ঞানের অন্বেষণে এক পরিবারের মতো বাস করবে।
- আন্তর্জাতিকতা: ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বজনীন ভাতৃত্ববোধ জাগানোই ছিল রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য। সিলভ্যাঁ লেভি, উইন্টারনিৎজ, অ্যান্ড্রুজ-এর মতো দেশ-বিদেশের বহু পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা এখানে অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন।
- চারুকলা ও সংস্কৃতির বিকাশ: পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে এখানে কলাভবন, সংগীতভবন, বিদ্যাভবন তৈরি করে চারুকলা, নৃত্য, ভাস্কর্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন ভাষার (চিন, জাপান, তিব্বত) ওপর গবেষণার এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব নাগরিক গড়ার এক সফল পরীক্ষা।
মনে রেখো!
ছাপাখানা: ১৭৭৮ সালে প্রথম বাংলা হরফে বই ছাপা হয়। ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস। উপেন্দ্রকিশোর হাফ-টোন ব্লক আনেন।
বিজ্ঞান: ১৮৭৬ সালে IACS (মহেন্দ্রলাল সরকার), ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির (J.C. Bose)।
বিকল্প শিক্ষা: ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও BTI (যাদবপুর)।
রবীন্দ্রনাথ: ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে স্কুল এবং ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।