Chapter 6: কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 55 MCQ | 40 SAQ | 10 Broad Questions
একা আন্দোলন বারদৌলি সত্যাগ্রহ এআইটিইউসি (AITUC) মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা ফরোয়ার্ড ব্লক
কৃষক আন্দোলন
অসহযোগ থেকে ভারত ছাড়ো: একা, বারদৌলি, তেভাগা ও তেলেঙ্গানা
শ্রমিক ও বামপন্থী
AITUC প্রতিষ্ঠা, কমিউনিস্ট পার্টির বিকাশ এবং সুভাষচন্দ্রের ফরোয়ার্ড ব্লক
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
55 টি1. বঙ্গভঙ্গ কবে কার্যকর হয়?
ক) ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর
খ) ১৯০৫ সালের ১৬ আগস্ট
গ) ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট
ঘ) ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর
ব্যাখ্যা: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের নির্দেশে সরকারিভাবে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় এবং ওই দিন সারা বাংলায় অরন্ধন পালিত হয়।
2. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের অংশগ্রহণের মাত্রা কেমন ছিল?
ক) স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক
খ) শুধুমাত্র ধনী কৃষকরা যোগ দিয়েছিল
গ) কৃষকদের বিশেষ অংশগ্রহণ ছিল না
ঘ) সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল
ব্যাখ্যা: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বা স্বদেশি আন্দোলন মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ কৃষকদের এতে বিশেষ অংশগ্রহণ ছিল না।
3. অসহযোগ আন্দোলন কবে শুরু হয়?
ক) ১৯০৫ সালে
খ) ১৯২০ সালে
গ) ১৯৩০ সালে
ঘ) ১৯৪২ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, যা ১৯২২ সালে চৌরিচৌরা ঘটনার পর প্রত্যাহার করা হয়।
4. বাবা রামচন্দ্র (Baba Ramchandra) কোন্ আন্দোলনের নেতা ছিলেন?
ক) একা আন্দোলন
খ) যুক্তপ্রদেশের কৃষক আন্দোলন
গ) বারদৌলি সত্যাগ্রহ
ঘ) তেভাগা আন্দোলন
ব্যাখ্যা: অসহযোগ আন্দোলনের সময় যুক্তপ্রদেশে (উত্তরপ্রদেশ) বাবা রামচন্দ্র কৃষকদের সংগঠিত করে এক শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
5. একা (Eka) বা একতা আন্দোলন কবে ঘটেছিল?
ক) ১৯২১-২২ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯৩৬ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: অসহযোগ আন্দোলনের শেষ পর্বে ১৯২১-২২ সালে যুক্তপ্রদেশের হরদোই, সীতাপুর প্রভৃতি জেলায় একা আন্দোলন সংঘটিত হয়।
6. একা আন্দোলনের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) বাবা রামচন্দ্র
খ) মাদারী পাশি
গ) স্বামী সহজানন্দ
ঘ) বল্লভভাই প্যাটেল
ব্যাখ্যা: মাদারী পাশি (Madari Pasi) নামক এক নিম্নবর্গীয় নেতার নেতৃত্বে একা আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করেছিল।
7. মোপলা বিদ্রোহ (Moplah Rebellion) কোথায় হয়েছিল?
ক) যুক্তপ্রদেশে
খ) কেরালার মালাবার উপকূলে
গ) গুজরাটে
ঘ) বাংলায়
ব্যাখ্যা: ১৯২১ সালে কেরালার মালাবার উপকূলে মুসলিম কৃষকরা (যাদের মোপলা বলা হত) হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
8. আইন অমান্য আন্দোলন কবে শুরু হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯৩০ সালে
গ) ১৯৪২ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৩০ সালে গান্ধীজির ডান্ডি অভিযানের (লবণ আইন ভঙ্গ) মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়।
9. বারদৌলি সত্যাগ্রহ (Bardoli Satyagraha) কবে হয়?
ক) ১৯২১ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯৩০ সালে
ঘ) ১৯৪২ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই সফল কৃষক সত্যাগ্রহ হয়েছিল।
10. বারদৌলি সত্যাগ্রহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) জওহরলাল নেহরু
গ) বল্লভভাই প্যাটেল
ঘ) সুভাষচন্দ্র বসু
ব্যাখ্যা: বল্লভভাই প্যাটেল বারদৌলি সত্যাগ্রহের সফল নেতৃত্ব দেন এবং এই আন্দোলনের সাফল্যের জন্যই তাঁকে 'সর্দার' উপাধি দেওয়া হয়।
11. সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে 'সর্দার' উপাধি কারা দিয়েছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) বারদৌলির মহিলারা
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) ব্রিটিশ সরকার
ব্যাখ্যা: বারদৌলি সত্যাগ্রহের সফল নেতৃত্বের জন্য বারদৌলির কৃষক রমণীরা তাঁকে 'সর্দার' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
12. নিখিল ভারত কিষাণ সভা (All India Kisan Sabha) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯৩৬ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে লখনউতে সারা ভারতের কৃষকদের অধিকার আদায়ের জন্য নিখিল ভারত কিষাণ সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।
13. নিখিল ভারত কিষাণ সভার প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
ক) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
খ) এন. জি. রঙ্গ
গ) বাবা রামচন্দ্র
ঘ) বল্লভভাই প্যাটেল
ব্যাখ্যা: স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী ছিলেন নিখিল ভারত কিষাণ সভার প্রথম সভাপতি। এন. জি. রঙ্গ ছিলেন প্রথম সম্পাদক।
14. নিখিল ভারত কিষাণ সভার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
ক) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
খ) এন. জি. রঙ্গ
গ) মুজফফর আহমেদ
ঘ) পি. সি. যোশী
ব্যাখ্যা: অধ্যাপক এন. জি. রঙ্গ (N. G. Ranga) নিখিল ভারত কিষাণ সভার প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
15. ভারত ছাড়ো আন্দোলন বা আগস্ট আন্দোলন কবে শুরু হয়?
ক) ১৯৩০ সালে
খ) ১৯৩৯ সালে
গ) ১৯৪২ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোম্বাই অধিবেশনে ভারত ছাড়ো প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ৯ আগস্ট থেকে আন্দোলন শুরু হয়।
16. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মেদিনীপুরের তমলুকে কোন্ জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছিল?
ক) তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার
খ) সমান্তরাল সরকার
গ) স্বাধীন বাংলা সরকার
ঘ) আজাদ হিন্দ সরকার
ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে তমলুকে 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' গঠিত হয়, যা প্রায় দু-বছর স্বাধীনভাবে শাসন চালিয়েছিল।
17. তমলুকে 'বিদ্যুৎ বাহিনী' কে গঠন করেন?
ক) মাতঙ্গিনী হাজরা
খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত
গ) সুশীল কুমার ধাড়া
ঘ) সুভাষচন্দ্র বসু
ব্যাখ্যা: তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী ছিল 'বিদ্যুৎ বাহিনী', যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুশীল কুমার ধাড়া।
18. তেভাগা আন্দোলন (Tebhaga Movement) কবে সংঘটিত হয়?
ক) ১৯৩৬-৩৭ সালে
খ) ১৯৪২-৪৩ সালে
গ) ১৯৪৬-৪৭ সালে
ঘ) ১৯৫০-৫১ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলায় (বিশেষত উত্তরবঙ্গে) ভাগচাষিরা ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ (তেভাগা) দাবিতে এই আন্দোলন করে।
19. তেভাগা আন্দোলনের প্রধান দাবি কী ছিল?
ক) জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ
খ) উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) ভাগচাষিদের দেওয়া
গ) বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া
ঘ) রাজস্ব মকুব করা
ব্যাখ্যা: ভাগচাষিরা (বর্গাদার) দাবি করে যে উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দু-ভাগ তারা পাবে এবং একভাগ জমির মালিক (জোতদার) পাবে।
20. তেভাগা আন্দোলনের একজন প্রধান নেত্রীর নাম কী?
ক) ইলা মিত্র
খ) কল্পনা দত্ত
গ) মাতঙ্গিনী হাজরা
ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
ব্যাখ্যা: কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্র, কংসারি হালদার, চারু মজুমদার প্রমুখ তেভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
21. তেলেঙ্গানা আন্দোলন (Telangana Movement) কোথায় হয়েছিল?
ক) বাংলায়
খ) হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যে
গ) মহীশূরে
ঘ) কাশ্মীরে
ব্যাখ্যা: ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যে নিজাম ও দেশমুখদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকরা এক ভয়ংকর সশস্ত্র আন্দোলন করেছিল।
22. তেলেঙ্গানা আন্দোলনের কৃষকরা হায়দরাবাদের স্থানীয় জমিদারদের কী বলত?
ক) দেশমুখ
খ) দিকু
গ) গোমস্তা
ঘ) খুতকাট্টি
ব্যাখ্যা: হায়দরাবাদের অত্যাচারী বড়ো জমিদারদের 'দেশমুখ' বলা হত। এদের শোষণেই কৃষকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
23. ভারতে প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট কোথায় হয়েছিল?
ক) বোম্বাইয়ে
খ) নাগপুরে (এমপ্রেস মিল)
গ) হাওড়ায়
ঘ) কানপুরে
ব্যাখ্যা: ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে নাগপুরের এমপ্রেস মিল-এ (Empress Mill) মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ভারতের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়।
24. ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন কোনটি?
ক) বোম্বাই মিলহ্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন
খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
গ) এআইটিইউসি
ঘ) গিরনি কামগার ইউনিয়ন
ব্যাখ্যা: ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে নারায়ণ মেঘাজি লোখান্ডের উদ্যোগে বোম্বাইয়ে 'Bombay Mill Hands Association' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন।
25. বোম্বাই মিলহ্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) বালগঙ্গাধর তিলক
খ) এন. এম. যোশী
গ) নারায়ণ মেঘাজি লোখান্ডে
ঘ) বি. পি. ওয়াদিয়া
ব্যাখ্যা: নারায়ণ মেঘাজি লোখান্ডে (N. M. Lokhande) ছিলেন ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।
26. মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন (Madras Labour Union) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৯০ সালে
খ) ১৯০৮ সালে
গ) ১৯১৮ সালে
ঘ) ১৯২০ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে বি. পি. ওয়াদিয়ার (B. P. Wadia) নেতৃত্বে মাদ্রাজে ভারতের প্রথম আধুনিক ও সুসংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন 'মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন' প্রতিষ্ঠিত হয়।
27. এআইটিইউসি (AITUC - All India Trade Union Congress) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯১৮ সালে
খ) ১৯২০ সালে
গ) ১৯২৫ সালে
ঘ) ১৯২৮ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর বোম্বাইয়ে সারা ভারতের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য AITUC প্রতিষ্ঠিত হয়।
28. এআইটিইউসি (AITUC) এর প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) লালা লাজপত রায়
গ) সি. আর. দাস
ঘ) মুজফফর আহমেদ
ব্যাখ্যা: লালা লাজপত রায় ছিলেন AITUC এর প্রথম সভাপতি। চমনলাল ছিলেন এর সাধারণ সম্পাদক।
29. ভারতে কবে প্রথম 'মে দিবস' (May Day) পালিত হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৩ সালের ১ মে
গ) ১৯২৫ সালে
ঘ) ১৯২৮ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৩ সালের ১ মে মাদ্রাজে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের উদ্যোগে ভারতে প্রথম মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়।
30. বোম্বাই গিরনি কামগার ইউনিয়ন (Bombay Girni Kamgar Union) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৫ সালে
গ) ১৯২৭ সালে
ঘ) ১৯২৯ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৭ সালে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বোম্বাইয়ের সুতাকল শ্রমিকদের নিয়ে 'গিরনি কামগার ইউনিয়ন' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯২৮ সালে বিশাল ধর্মঘট করেছিল।
31. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (Meerut Conspiracy Case) কবে দায়ের করা হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৪ সালে
গ) ১৯২৯ সালে
ঘ) ১৯৩৩ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার ভারতের ক্রমবর্ধমান শ্রমিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলন দমন করার জন্য ৩৩ জন বামপন্থী নেতার বিরুদ্ধে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।
32. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কতজন ব্রিটিশ বা ইংরেজ কমিউনিস্ট নেতার বিচার হয়েছিল?
ক) ১ জন
খ) ২ জন
গ) ৩ জন
ঘ) ৪ জন
ব্যাখ্যা: ৩ জন ইংরেজ কমিউনিস্ট নেতা—ফিলিপ স্প্র্যাট (Philip Spratt), বেঞ্জামিন ব্র্যাডলি এবং লেস্টার হাচিনসন-কে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
33. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কোন্ বিখ্যাত বাঙালি কমিউনিস্ট নেতা অভিযুক্ত হয়েছিলেন?
ক) এম. এন. রায়
খ) মুজফফর আহমেদ
গ) পিসি যোশী
ঘ) সুভাষচন্দ্র বসু
ব্যাখ্যা: মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, পিসি যোশী প্রমুখ প্রথম সারির কমিউনিস্ট নেতারা এই মামলায় জেলে যান।
34. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) বিদেশে প্রথম কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) লন্ডনে
খ) মস্কোতে
গ) তাসখন্দে
ঘ) বার্লিনে
ব্যাখ্যা: ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর রাশিয়ার তাসখন্দে (বর্তমান উজবেকিস্তানে) এম. এন. রায়, অবনী মুখার্জি প্রমুখের উদ্যোগে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম গঠিত হয়।
35. মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (M. N. Roy) প্রকৃত নাম কী ছিল?
ক) নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
খ) অবনী মুখার্জি
গ) বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়
ঘ) রাসবিহারী বসু
ব্যাখ্যা: ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্থপতি এম. এন. রায়ের প্রকৃত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
36. ভারতের মাটিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) কবে এবং কোথায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯২০ সালে বোম্বাইয়ে
খ) ১৯২৫ সালে কানপুরে
গ) ১৯২৮ সালে কলকাতায়
ঘ) ১৯৩৪ সালে মাদ্রাজে
ব্যাখ্যা: ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে সত্যভক্তের সভাপতিত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলন হয় এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
37. কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (Kanpur Conspiracy Case) কবে হয়েছিল?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৪ সালে
গ) ১৯২৯ সালে
ঘ) ১৯৩৪ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকার মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, নলিনীগুপ্ত ও শওকত উসমানিকে গ্রেফতার করে কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।
38. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (WPP) বা শ্রমিক-কৃষক দল কবে গঠিত হয়?
ক) ১৯২৫ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯৩০ সালে
ঘ) ১৯৩৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৮ সালে কমিউনিস্টদের উদ্যোগে বাংলার 'শ্রমিক কৃষক দল' সর্বভারতীয় রূপ নিয়ে 'Workers and Peasants Party' (WPP) গঠিত হয়।
39. 'লাঙল' পত্রিকা কোন্ দলের মুখপত্র ছিল?
ক) জাতীয় কংগ্রেস
খ) ফরোয়ার্ড ব্লক
গ) ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি
ঘ) মুসলিম লিগ
ব্যাখ্যা: কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'লাঙল' এবং মুজফফর আহমেদের 'গণবাণী' ছিল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির মুখপত্র।
40. ১৯২৮ সালের বারদৌলি সত্যাগ্রহে কৃষকরা কীসের প্রতিবাদ করেছিল?
ক) নীল চাষের বিরুদ্ধে
খ) ৩০% (পরে ২২%) রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে
গ) বন আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে
ঘ) লবণ আইনের বিরুদ্ধে
ব্যাখ্যা: ব্রিটিশ সরকার বারদৌলিতে ২২% (প্রথমে ৩০%) রাজস্ব বৃদ্ধি করলে কৃষকরা বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
41. বারদৌলি সত্যাগ্রহের পর সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির হার কমিয়ে কত করেছিল?
ক) ৫.০৩%
খ) ৬.০৩%
গ) ১০%
ঘ) ১৫%
ব্যাখ্যা: ব্রুমফিল্ড ও ম্যাক্সওয়েল কমিশন তদন্ত করে রাজস্ব বৃদ্ধির হার ২২% থেকে কমিয়ে অন্যায্য বলে ৬.০৩% নির্ধারণ করে। এটি ছিল কৃষকদের বিরাট জয়।
42. কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল (Congress Socialist Party - CSP) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯৩৪ সালে
খ) ১৯৩৬ সালে
গ) ১৯৩৯ সালে
ঘ) ১৯৪২ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৩৪ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ধ্যানধারণার প্রসারের জন্য জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব, রামমনোহর লোহিয়া প্রমুখ 'কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল' গঠন করেন।
43. ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) এম. এন. রায়
খ) সুভাষচন্দ্র বসু
গ) জয়প্রকাশ নারায়ণ
ঘ) মুজফফর আহমেদ
ব্যাখ্যা: ১৯৩৯ সালের ৩ মে সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই তাঁর নিজস্ব বামপন্থী দল 'ফরোয়ার্ড ব্লক' গঠন করেন।
44. সুভাষচন্দ্র বসু কেন ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন?
ক) ব্রিটিশদের খুশি করতে
খ) কংগ্রেসের ডানপন্থী বা গান্ধীজি-পন্থীদের সাথে মতবিরোধের কারণে
গ) কমিউনিস্টদের সাথে হাত মেলাতে
ঘ) মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে লড়তে
ব্যাখ্যা: ত্রিপুরী কংগ্রেসে (১৯৩৯) গান্ধীজির প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে সুভাষচন্দ্র সভাপতি হলেও, কার্যনির্বাহী সমিতি গঠনে গান্ধীজির সাথে মতবিরোধে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।
45. র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (Radical Democratic Party) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) সুভাষচন্দ্র বসু
খ) এম. এন. রায়
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) এস. এ. ডাঙ্গে
ব্যাখ্যা: ১৯৪০ সালে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর মানবেন্দ্রনাথ রায় (M. N. Roy) 'র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' গঠন করেন।
46. ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট (Trade Union Act) কবে পাস হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৬ সালে
গ) ১৯২৯ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট পাস করে শ্রমিকদের বৈধভাবে ইউনিয়ন করার অধিকার এবং ধর্মঘটের আংশিক অধিকার দেয়।
47. রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান (অলিন্দ যুদ্ধ) কবে হয়েছিল?
ক) ১৯২৮ সালে
খ) ১৯৩০ সালে
গ) ১৯৪২ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: যদিও এটি সশস্ত্র বিপ্লব, তবে আইন অমান্য আন্দোলনের সমকালে ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিনয়-বাদল-দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান করেন।
48. তেভাগা আন্দোলনের স্লোগান কী ছিল?
ক) ডু অর ডাই
খ) নিজ খামারে ধান তোলো
গ) লাঙল যার জমি তার
ঘ) ইনকিলাব জিন্দাবাদ
ব্যাখ্যা: তেভাগা আন্দোলনে কৃষকদের প্রধান স্লোগান ছিল 'নিজ খামারে ধান তোলো' এবং 'তেভাগা চাই'।
49. ফ্লাউড কমিশন (Floud Commission) কোন্ আন্দোলনের সাথে যুক্ত?
ক) তেভাগা আন্দোলন
খ) তেলেঙ্গানা আন্দোলন
গ) নীল বিদ্রোহ
ঘ) চম্পারণ সত্যাগ্রহ
ব্যাখ্যা: ১৯৪০ সালে গঠিত ফ্লাউড কমিশন বা Land Revenue Commission ভাগচাষিদের ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, যা তেভাগা আন্দোলনের ভিত্তি ছিল।
50. 'হিন্দি মজদুর কিষাণ পার্টি' কবে গঠিত হয়?
ক) ১৯২০ সালে
খ) ১৯২৮ সালে
গ) ১৯৩৮ সালে
ঘ) ১৯৪৬ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯২৮ সালে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির শাখা হিসেবে বিভিন্ন প্রদেশে এমন সংগঠন গড়ে ওঠে।
51. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে কবে ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে?
ক) ১৯২৪ সালে
খ) ১৯২৯ সালে
গ) ১৯৩৪ সালে
ঘ) ১৯৪২ সালে
ব্যাখ্যা: কমিউনিস্টদের প্রভাব বাড়তে থাকায় ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (যা ১৯৪২ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল)।
52. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদে আইনজ্ঞদের একটি দল গঠন করা হয়েছিল, তাতে কোন্ বিখ্যাত নেতা ছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) জওহরলাল নেহরু
গ) সুভাষচন্দ্র বসু
ঘ) বল্লভভাই প্যাটেল
ব্যাখ্যা: মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষে মামলা লড়ার জন্য জওহরলাল নেহরু, এম. এ. আনসারি, কৈলাশনাথ কাটজু প্রমুখ আইনজ্ঞদের একটি ডিফেন্স কমিটি গঠিত হয়েছিল।
53. কোন্ আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের বিরোধিতা করেছিল?
ক) স্বদেশি আন্দোলন
খ) অসহযোগ আন্দোলন
গ) আইন অমান্য আন্দোলন
ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলন
ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় রাশিয়া মিত্রপক্ষে যোগ দেওয়ায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশদের সমর্থন করে এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে।
54. তেলেঙ্গানা আন্দোলনে কোন্ সংগঠন নেতৃত্ব দিয়েছিল?
ক) জাতীয় কংগ্রেস
খ) অন্ধ্র মহাসভা ও কমিউনিস্ট পার্টি
গ) কিষাণ সভা
ঘ) ফরোয়ার্ড ব্লক
ব্যাখ্যা: অন্ধ্র মহাসভা এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তেলেঙ্গানার কৃষকরা দেশমুখদের বিরুদ্ধে এবং নিজাম প্রশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
55. ভারতে প্রথম মে দিবস (May Day) কে পালন করেন?
ক) মুজফফর আহমেদ
খ) সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার
গ) এস. এ. ডাঙ্গে
ঘ) এম. এন. রায়
ব্যাখ্যা: ১৯২৩ সালের ১ মে মাদ্রাজে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার 'লেবার কিষাণ পার্টি অফ হিন্দুস্তান' এর পতাকাতলে প্রথম মে দিবস পালন করেন।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
40 টি1. বিশ শতকে ভারতের কৃষক আন্দোলনের দুটি মূল বৈশিষ্ট্য লেখো।
১) বিশ শতকে কৃষক আন্দোলনগুলি বিচ্ছিন্ন না থেকে সর্বভারতীয় রূপ লাভ করে এবং জাতীয় আন্দোলনের (যেমন অসহযোগ, আইন অমান্য) মূল স্রোতের সাথে যুক্ত হয়। ২) কিষাণ সভা এবং কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে কৃষকদের নিজস্ব অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার (যেমন খাজনা হ্রাস, জমিদারি উচ্ছেদ) সংগ্রাম সংগঠিত হয়।
2. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বা স্বদেশি আন্দোলনে (১৯০৫) কৃষকদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল?
স্বদেশি আন্দোলন মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত জমিদার শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা কৃষকদের নিজস্ব অর্থনৈতিক দাবিগুলিকে এই আন্দোলনে যুক্ত না করায়, সাধারণ কৃষকরা এই আন্দোলনে বিশেষ অংশগ্রহণ করেনি।
3. অসহযোগ আন্দোলনের সময় (১৯২০-২২) যুক্তপ্রদেশে কৃষক বিদ্রোহের নেতা কে ছিলেন?
যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) প্রতাপগড়, রায়বেরিলি প্রভৃতি জেলায় বাবা রামচন্দ্র (Baba Ramchandra) কৃষকদের সংগঠিত করে তালুকদার ও জমিদারদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
4. একা (Eka) বা একতা আন্দোলন কী?
অসহযোগ আন্দোলনের শেষ পর্বে ১৯২১-২২ সালে যুক্তপ্রদেশের হরদোই, সীতাপুর, বারাবাঁকি প্রভৃতি জেলায় অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় এবং জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাদারী পাশি-র নেতৃত্বে কৃষকরা একজোট হয়ে যে আন্দোলন করেছিল, তা একা বা একতা আন্দোলন নামে পরিচিত।
5. একা আন্দোলনের কৃষকরা কী কী শপথ নিয়েছিল?
তারা শপথ নিয়েছিল যে— ১) নির্দিষ্ট খাজনার চেয়ে এক পয়সাও বেশি দেবে না, ২) সময়মতো খাজনা দেবে, ৩) জমি থেকে উচ্ছেদ করলেও জমি ছাড়বে না, এবং ৪) বেগার খাটবে না।
6. মোপলা বিদ্রোহ (Moplah Rebellion) কী?
১৯২১ সালে কেরালার মালাবার উপকূলে মুসলিম কৃষকরা (মোপলা) হিন্দু জমিদার (জেনমি) এবং ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর বিদ্রোহ করেছিল। প্রথমে এটি কৃষক আন্দোলন হলেও পরে তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়।
7. বারদৌলি সত্যাগ্রহ (Bardoli Satyagraha) কবে ও কেন হয়েছিল?
১৯২৮ সালে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে ব্রিটিশ সরকার হঠাৎ করে কৃষকদের রাজস্ব ২২% (প্রথমে ৩০%) বাড়িয়ে দেয়। এর প্রতিবাদে বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষকরা খাজনা বন্ধের যে অহিংস ও সফল আন্দোলন করে, তা বারদৌলি সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।
8. বল্লভভাই প্যাটেলকে 'সর্দার' উপাধি কে দিয়েছিলেন?
বারদৌলি সত্যাগ্রহে তাঁর অনবদ্য নেতৃত্ব এবং আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য বারদৌলির কৃষক রমণীরা বল্লভভাই প্যাটেলকে সম্মান জানিয়ে 'সর্দার' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
9. নিখিল ভারত কিষাণ সভা (All India Kisan Sabha) কবে ও কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল লখনউতে সারা ভারতের কৃষকদের দাবিদাওয়া আদায় এবং তাদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে 'নিখিল ভারত কিষাণ সভা' প্রতিষ্ঠিত হয়।
10. নিখিল ভারত কিষাণ সভার প্রথম সভাপতি ও সম্পাদক কে ছিলেন?
এর প্রথম সভাপতি ছিলেন স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক এন. জি. রঙ্গ (N. G. Ranga)।
11. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) কৃষকদের ভূমিকা কেমন ছিল?
এই আন্দোলনে কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছিল। মেদিনীপুরের তমলুকে, উত্তরপ্রদেশের বালিয়ায় এবং বিহারে কৃষকরা থানা আক্রমণ করে, রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং 'জাতীয় সরকার' গঠন করে ব্রিটিশ শাসনকে অচল করে দিয়েছিল।
12. তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার (Tamluk National Government) কে গঠন করেন?
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশচন্দ্র সামন্ত, সুশীল কুমার ধাড়া এবং অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করে 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' গঠিত হয়েছিল।
13. তেভাগা আন্দোলন (Tebhaga Movement) কী?
১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার (জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, মেদিনীপুর) ভাগচাষিরা ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দু-ভাগ (তেভাগা) নিজেদের জন্য এবং একভাগ জমিদারের জন্য দাবি করে যে বিশাল আন্দোলন গড়ে তোলে, তাকে তেভাগা আন্দোলন বলে।
14. তেভাগা আন্দোলনের দুটি স্লোগান লেখো।
তেভাগা আন্দোলনের প্রধান স্লোগানগুলি ছিল— "নিজ খামারে ধান তোলো", "তেভাগা চাই", এবং "লাঙল যার জমি তার"।
15. তেলেঙ্গানা আন্দোলন (Telangana Movement) কোথায় ও কেন হয়েছিল?
১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যের তেলেঙ্গানা অঞ্চলে স্থানীয় অত্যাচারী জমিদার (দেশমুখ) ও নিজাম প্রশাসনের বিরুদ্ধে কৃষকরা কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে এক সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল।
16. ভারতে প্রথম কবে ও কোথায় শ্রমিক ধর্মঘট (Labour Strike) হয়?
১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির নাগপুরে 'এমপ্রেস মিল' (Empress Mill)-এর শ্রমিকরা ধর্মঘট করে, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত শ্রমিক ধর্মঘট।
17. বোম্বাই মিলহ্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (Bombay Mill Hands Association) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে সমাজসংস্কারক নারায়ণ মেঘাজি লোখান্ডে বোম্বাইয়ের সুতাকল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন।
18. স্বদেশি আন্দোলনের সময় (১৯০৫) শ্রমিকদের ভূমিকা কেমন ছিল?
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫-০৬ সালে রেলওয়ে, চটকল এবং সুতাকলের শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালন করেছিল। বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ নেতারা শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন। 'প্রিন্টার্স ইউনিয়ন' এই সময় গঠিত হয়।
19. এআইটিইউসি (AITUC - All India Trade Union Congress) কবে ও কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর বোম্বাইয়ে ভারতের বিক্ষিপ্ত শ্রমিক আন্দোলনগুলিকে একটি সর্বভারতীয় মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সাথে যোগাযোগ রাখার উদ্দেশ্যে AITUC প্রতিষ্ঠিত হয়।
20. AITUC-এর প্রথম সভাপতি ও সম্পাদক কে ছিলেন?
AITUC-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায় এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দেওয়ান চমনলাল।
21. ভারতে প্রথম 'মে দিবস' (May Day) বা শ্রমিক দিবস কবে পালিত হয়?
১৯২৩ সালের ১ মে মাদ্রাজে (চেন্নাই) সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের উদ্যোগে 'লেবার কিষাণ পার্টি অফ হিন্দুস্তান' এর পতাকাতলে ভারতে প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়।
22. কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (Kanpur Conspiracy Case - 1924) কী?
ভারতে কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখে ভীত হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৪ সালে মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, নলিনীগুপ্ত ও শওকত উসমানিকে গ্রেফতার করে এবং বলশেভিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।
23. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) কবে ও কোথায় প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর রাশিয়ার তাসখন্দে এম. এন. রায় (মানবেন্দ্রনাথ রায়), অবনী মুখার্জি, এম. পি. বি. আচার্য প্রমুখের উদ্যোগে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়।
24. ভারতের মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে সত্যভক্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম কমিউনিস্ট সম্মেলনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
25. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (Meerut Conspiracy Case - 1929) কী?
১৯২৮-২৯ সালে বোম্বাই ও বাংলায় ব্যাপক শ্রমিক ধর্মঘটের জেরে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে ৩৩ জন শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে গ্রেফতার করে যে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করে, তাকে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা বলে।
26. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কোন্ তিন ইংরেজ নেতা অভিযুক্ত হয়েছিলেন?
ফিলিপ স্প্র্যাট, বেঞ্জামিন ব্র্যাডলি এবং লেস্টার হাচিনসন—এই তিন ইংরেজ কমিউনিস্ট নেতা ভারতের শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হন।
27. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (Workers and Peasants Party - WPP) কবে গঠিত হয়?
১৯২৫ সালে বাংলায় মুজফফর আহমেদ ও কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে 'লেবার স্বরাজ পার্টি' গঠিত হয়। ১৯২৮ সালে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের কৃষক-শ্রমিক দলগুলি একজোট হয়ে সর্বভারতীয় 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি' (WPP) গঠন করে।
28. WPP-এর মুখপত্রগুলির নাম কী ছিল?
কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত 'লাঙল' এবং মুজফফর আহমেদ সম্পাদিত 'গণবাণী' পত্রিকা ছিল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির প্রধান মুখপত্র।
29. মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (M. N. Roy) প্রকৃত নাম কী ছিল?
ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান স্থপতি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের প্রকৃত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তিনি 'র্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' (১৯৪০) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
30. কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল (Congress Socialist Party - CSP) কবে, কারা প্রতিষ্ঠা করেন?
১৯৩৪ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রসারের জন্য জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব, রামমনোহর লোহিয়া এবং অচ্যুত পট্টবর্ধন 'কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল' প্রতিষ্ঠা করেন।
31. ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৯৩৯ সালের ৩ মে সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই তাঁর নিজস্ব বামপন্থী ও প্রগতিশীল মতাদর্শের দল 'ফরোয়ার্ড ব্লক' প্রতিষ্ঠা করেন।
32. সুভাষচন্দ্র বসু কেন ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন?
১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধীজির প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে সুভাষচন্দ্র সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতি (Working Committee) গঠন নিয়ে গান্ধীজি ও ডানপন্থীদের সাথে প্রবল মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি পদত্যাগ করেন এবং বামপন্থীদের নিয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।
33. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা কী ছিল?
১৯৪১ সালে রাশিয়া মিত্রপক্ষে যোগ দিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে, ভারতের কমিউনিস্টরা এই যুদ্ধকে 'জনযুদ্ধ' (People's War) আখ্যা দেয় এবং ব্রিটিশদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তারা তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
34. গিরনি কামগার ইউনিয়ন (Girni Kamgar Union) কবে গঠিত হয়?
১৯২৭ সালে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বোম্বাইয়ের সুতাকল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য গিরনি কামগার ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৯২৮ সালে এই ইউনিয়ন ছয় মাসব্যাপী এক বিশাল ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
35. ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট (Trade Union Act) কবে পাস হয় এবং এর গুরুত্ব কী?
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট পাস হয়। এর ফলে শ্রমিকদের বৈধভাবে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার অধিকার এবং ধর্মঘট করার আংশিক আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
36. বামপন্থী (Leftist) রাজনীতি বলতে কী বোঝায়?
যে রাজনৈতিক মতাদর্শ সমাজের প্রচলিত শোষক কাঠামো ভেঙে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের সমান বণ্টনের কথা বলে (মূলত মার্কসবাদী চিন্তাধারা), তাকে বামপন্থী রাজনীতি বলে।
37. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের একটি বড়ো অবদান লেখো।
বামপন্থীদের সবচেয়ে বড়ো অবদান হল তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করেছিল (যেমন তেভাগা, তেলেঙ্গানা)।
38. ফ্লাউড কমিশন (Floud Commission) কী?
বাংলার কৃষকদের দুরবস্থা তদন্তের জন্য ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউডের নেতৃত্বে 'Land Revenue Commission' গঠন করে। এই কমিশন ভাগচাষিদের ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, যা তেভাগা আন্দোলনের জন্ম দেয়।
39. মাদারি পাশি (Madari Pasi) কে ছিলেন?
মাদারি পাশি ছিলেন একজন নিম্নবর্গীয় সাধারণ মানুষ, যিনি ১৯২১-২২ সালে যুক্তপ্রদেশের (উত্তরপ্রদেশ) একা (Eka) বা একতা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
40. বি. পি. ওয়াদিয়া (B. P. Wadia) কেন বিখ্যাত?
১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে বি. পি. ওয়াদিয়া মাদ্রাজে (চেন্নাই) ভারতের প্রথম আধুনিক ও সুসংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন 'মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
10 টি1. অসহযোগ আন্দোলনের (Non-Cooperation Movement) পর্বে ভারতের কৃষক আন্দোলনের পরিচয় দাও।
অসহযোগ আন্দোলনের পর্বে কৃষক আন্দোলন (১৯২০-২২):
১৯২০ সালে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ডাক কৃষকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এই পর্বে কৃষক আন্দোলনগুলি জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে যুক্ত হয়:
- যুক্তপ্রদেশের কৃষক আন্দোলন: বাবা রামচন্দ্রের (Baba Ramchandra) নেতৃত্বে যুক্তপ্রদেশের (উত্তরপ্রদেশ) প্রতাপগড়, রায়বেরিলি প্রভৃতি জেলায় কৃষকরা তালুকদারদের বেআইনি কর ও বেদখলের বিরুদ্ধে কিষাণ সভা গঠন করে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। জওহরলাল নেহরু এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
- একা বা একতা আন্দোলন (Eka Movement): ১৯২১-২২ সালে যুক্তপ্রদেশের হরদোই, সীতাপুর জেলায় মাদারী পাশি-র নেতৃত্বে কৃষকরা 'একা আন্দোলন' গড়ে তোলে। তারা শপথ নেয় যে অতিরিক্ত খাজনা দেবে না এবং বেগার খাটবে না। এটি একটি নিচুতলার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল।
- মোপলা বিদ্রোহ (Moplah Rebellion): ১৯২১ সালে কেরালার মালাবার উপকূলে মুসলিম কৃষকরা (মোপলা) হিন্দু জমিদার (জেনমি) ও ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনের নেতারা একে সমর্থন করলেও, পরে এটি চরম সাম্প্রদায়িক রূপ নিলে জাতীয় কংগ্রেস এর থেকে সরে আসে।
- বাংলায় আন্দোলন: মেদিনীপুরে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের নেতৃত্বে ইউনিয়ন বোর্ড ট্যাক্স বয়কট আন্দোলন ব্যাপক সাফল্য লাভ করে।
মূল্যায়ন: এই আন্দোলনগুলি কৃষকদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনা জাগালেও, কংগ্রেস নেতারা জমিদারদের চটাতে চাননি বলে কৃষকদের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংগ্রামকে তারা পূর্ণ সমর্থন দেননি।
2. আইন অমান্য আন্দোলনের (Civil Disobedience Movement) পর্বে ভারতের কৃষক আন্দোলনের পরিচয় দাও।
আইন অমান্য আন্দোলনের পর্বে কৃষক আন্দোলন (১৯৩০-৩৪):
১৯৩০ সালে ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হলে সারা ভারতের কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশগ্রহণ করে:
- গুজরাট: এই পর্বে সবচেয়ে সফল কৃষক আন্দোলন ছিল গুজরাটের বারদৌলি সত্যাগ্রহ (যদিও এটি ১৯২৮ সালে শুরু হয়)। এছাড়া সুরাট, খেদা, এবং ব্রোচ জেলায় পাতিদার কৃষকরা খাজনা বন্ধ (No-tax campaign) করে এক তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে।
- যুক্তপ্রদেশ ও বিহার: ১৯৩০-এর মহামন্দার (Great Depression) ফলে কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়। যুক্তপ্রদেশ ও বিহারে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতীর নেতৃত্বে কৃষকরা খাজনা ও চৌকিদারি ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এখানেই ১৯৩৬ সালে 'নিখিল ভারত কিষাণ সভা' প্রতিষ্ঠিত হয়।
- বাংলা: মেদিনীপুরের কাঁথি ও তমলুকে লবণের ওপর কর এবং চৌকিদারি করের বিরুদ্ধে কৃষকরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশি অত্যাচার সত্ত্বেও তারা কর দেওয়া বন্ধ রাখে।
- দক্ষিণ ভারত: অন্ধ্রপ্রদেশে এন. জি. রঙ্গের নেতৃত্বে এবং কেরালায় কৃষকরা বন আইন অমান্য করে এবং অরণ্য সত্যাগ্রহ (Forest Satyagraha) করে।
মূল্যায়ন: এই পর্বে কৃষক আন্দোলন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ছিল এবং কিষাণ সভার মাধ্যমে কৃষকদের নিজস্ব অর্থনৈতিক দাবিগুলি (খাজনা মকুব, ঋণ মুকুব) জাতীয় আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল।
3. বারদৌলি সত্যাগ্রহের (Bardoli Satyagraha) পটভূমি, বিবরণ এবং গুরুত্ব আলোচনা করো।
বারদৌলি সত্যাগ্রহ (১৯২৮):
পটভূমি: ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে ব্রিটিশ সরকার তুলার দাম কমে যাওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে কৃষকদের রাজস্ব ২২% (প্রথমে ৩০%) বাড়িয়ে দেয়। বারবার আবেদন করেও কোনো ফল না হওয়ায় কৃষকরা গান্ধীবাদী নেতা বল্লভভাই প্যাটেলকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
- বিবরণ: বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষকরা সম্পূর্ণ অহিংস পথে বর্ধিত খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তিনি সমগ্র বারদৌলিকে ১৩টি শিবিরে ভাগ করে সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ে তোলেন। মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনের এক বিশেষ দিক। সরকার কৃষকদের জমি, গবাদি পশু বাজেয়াপ্ত করলেও কৃষকরা ভয় পায়নি।
- সাফল্য: এই আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং জাতীয় নেতাদের (গান্ধীজি, নেহরু) চাপে ব্রিটিশ সরকার ব্রুমফিল্ড ও ম্যাক্সওয়েল কমিশন গঠন করে। কমিশনের রিপোর্টে রাজস্ব বৃদ্ধির হার ২২% থেকে কমিয়ে মাত্র ৬.০৩% করা হয়। এটি ছিল কৃষকদের এক বিশাল জয়।
- গুরুত্ব: ১) এই আন্দোলনের সফল নেতৃত্বের জন্যই বারদৌলির মহিলারা বল্লভভাই প্যাটেলকে 'সর্দার' উপাধিতে ভূষিত করেন। ২) এটি প্রমাণ করে যে অহিংস সত্যাগ্রহ এবং সুসংগঠিত কৃষক আন্দোলন ব্রিটিশদের মাথা নত করতে বাধ্য করতে পারে। ৩) এটি ভারতের অন্যান্য প্রান্তের কৃষকদেরও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
4. তেভাগা আন্দোলনের (Tebhaga Movement) কারণ, বিস্তার ও ফলাফল আলোচনা করো।
তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-৪৭):
কারণ: অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজে জমির মালিক ছিল 'জোতদার'রা এবং তাদের জমিতে চাষ করত 'বর্গাদার' বা ভাগচাষিরা। প্রথা অনুযায়ী ভাগচাষিরা ফসলের অর্ধেক (অর্ধেক ভাগ) পেত। কিন্তু চাষের সমস্ত খরচ চাষিদেরই বহন করতে হত বলে তাদের অবস্থা শোচনীয় ছিল। ১৯৪০ সালের 'ফ্লাউড কমিশন' সুপারিশ করে যে ভাগচাষিদের ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩ বা তেভাগা) দেওয়া উচিত। জোতদাররা এই নিয়ম না মানায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন 'বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভা'র ডাকে ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়।
- বিস্তার ও স্লোগান: এই আন্দোলন মূলত উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, রংপুর এবং দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর ও চব্বিশ পরগনায় ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের স্লোগান ছিল— "নিজ খামারে ধান তোলো", "তেভাগা চাই", এবং "লাঙল যার জমি তার"। ইলা মিত্র, কংসারি হালদার, চারু মজুমদার প্রমুখ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
- ফলাফল: জোতদার ও ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম অত্যাচারে ৭৩ জন কৃষক শহিদ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার 'বর্গাদার বিল' এনে তেভাগার দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আন্দোলন স্তিমিত হয়। যদিও তখন এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদে এবং ভূমি সংস্কারে এটি বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
5. বিশ শতকে ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের পর্যায়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো (বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন পর্বে)।
ভারতে শ্রমিক আন্দোলন:
বিশ শতকে ভারতের শ্রমিক আন্দোলন ধাপে ধাপে জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়:
- স্বদেশি ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী পর্ব (১৯০৫-০৮): এই পর্বে ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের পাশাপাশি দেশীয় শ্রমিকরা নিজেদের মজুরি বৃদ্ধি ও কাজের সময় কমানোর দাবিতে ধর্মঘট শুরু করে। রেলওয়ে, হাওড়ার চটকল এবং বোম্বাইয়ের সুতাকলে ব্যাপক ধর্মঘট হয়। ১৯০৮ সালে বালগঙ্গাধর তিলকের কারাদণ্ডের প্রতিবাদে বোম্বাইয়ের শ্রমিকরা ছয় দিনের বিশাল রাজনৈতিক ধর্মঘট পালন করেছিল।
- অসহযোগ আন্দোলনের পর্ব (১৯২০-২২): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের দুর্দশা চরমে ওঠে। এই সময় ১৯২০ সালে AITUC (All India Trade Union Congress) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শ্রমিকদের সর্বভারতীয় স্তরে ঐক্যবদ্ধ করে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে, স্টিমার ঘাট এবং চা বাগানের শ্রমিকরা অসহযোগ আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ব্যাপক ধর্মঘট করে।
- আইন অমান্য আন্দোলনের পর্ব (১৯৩০-৩৪): এই পর্বে কমিউনিস্টদের প্রভাবে শ্রমিক আন্দোলন চরম জঙ্গিরূপ ধারণ করে। ১৯২৮-২৯ সালে বোম্বাইয়ের 'গিরনি কামগার ইউনিয়ন'-এর নেতৃত্বে সুতাকল শ্রমিকরা ছয় মাসের বিশাল ধর্মঘট করে। ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়ে ১৯২৯ সালে 'মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করে শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করে। তবুও শোলাপুর ও বোম্বাইয়ে আইন অমান্য আন্দোলনে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
6. এআইটিইউসি (AITUC - All India Trade Union Congress) প্রতিষ্ঠার পটভূমি এবং গুরুত্ব আলোচনা করো।
AITUC প্রতিষ্ঠার পটভূমি (১৯২০):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে গেলেও শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি, বরং ছাঁটাই শুরু হয়। এর ফলে সারা দেশে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয় এবং ১৯১৯ সালে প্রচুর ধর্মঘট হয়। এই বিক্ষিপ্ত আন্দোলনগুলিকে একটি সর্বভারতীয় মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। এছাড়া ১৯১৯ সালে 'আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা' (ILO) প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ভারতের শ্রমিকদের প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য একটি জাতীয় স্তরের সংগঠনের দরকার হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর বোম্বাইয়ে All India Trade Union Congress (AITUC) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায় এবং সম্পাদক ছিলেন দেওয়ান চমনলাল।
গুরুত্ব:
- সর্বভারতীয় ঐক্য: AITUC প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতের শ্রমিক আন্দোলন তার স্থানীয় ও বিক্ষিপ্ত চরিত্র হারিয়ে একটি সর্বভারতীয় ও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।
- জাতীয় কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক: প্রথমদিকে জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা (যেমন সি. আর. দাস, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু) AITUC-র সভাপতিত্ব করেন, যার ফলে শ্রমিক আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
- অধিকার আদায়: AITUC-র চাপের ফলেই ব্রিটিশ সরকার ১৯২৬ সালে 'ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট' পাস করে শ্রমিকদের সংগঠন করার এবং ধর্মঘট করার আইনি অধিকার দিতে বাধ্য হয়েছিল।
7. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (Meerut Conspiracy Case - 1929) কী? এর কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।
মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯):
কারণ: ১৯২০-এর দশকের শেষে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এবং ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (WPP) এর প্রভাবে শ্রমিক আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ১৯২৮ সালে বোম্বাইয়ে 'গিরনি কামগার ইউনিয়ন' এর নেতৃত্বে সুতাকল শ্রমিকরা এবং বাংলায় চটকল ও রেল শ্রমিকরা ব্যাপক ধর্মঘট করে। কমিউনিস্টদের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের ভয় থেকে ব্রিটিশ সরকার শ্রমিক আন্দোলনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়।
- বিবরণ: ১৯২৯ সালের ২০ মার্চ ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩৩ জন শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং ৩ জন ইংরেজ কমিউনিস্টকে (ফিলিপ স্প্র্যাট, বেঞ্জামিন ব্র্যাডলি, লেস্টার হাচিনসন) গ্রেফতার করে। মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, পি. সি. যোশী প্রমুখ এই মামলায় অভিযুক্ত হন। তাদের বিরুদ্ধে মিরাট শহরে 'ব্রিটিশ রাজ উৎখাতের ষড়যন্ত্র' এর অভিযোগে যে দীর্ঘ মামলা চলে, তা মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত।
- ফলাফল ও গুরুত্ব: এই মামলা প্রায় চার বছর ধরে চলে (১৯৩৩ পর্যন্ত)। মুজফফর আহমেদ সহ ২৭ জনকে দীর্ঘ কারাদণ্ড বা দ্বীপান্তর দেওয়া হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে ভারতের শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন আসামিদের বক্তব্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কমিউনিস্টদের মতাদর্শ এবং জনপ্রিয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
8. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (Communist Party of India) প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করো।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ:
১৯১৭ সালের রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতে কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী চিন্তাধারার প্রসার শুরু হয়।
- তাসখন্দে প্রতিষ্ঠা (১৯২০): ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর রাশিয়ার তাসখন্দে (বর্তমান উজবেকিস্তানে) মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (M. N. Roy) উদ্যোগে এবং অবনী মুখার্জি, এম. পি. বি. আচার্যের সহায়তায় 'ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি' (CPI) প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ভারতে প্রসার ও দমননীতি: ভারতে মুজফফর আহমেদ (বাংলা), এস. এ. ডাঙ্গে (বোম্বাই), সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার (মাদ্রাজ) প্রমুখ কমিউনিস্ট আদর্শ প্রচার শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়ে ১৯২৪ সালে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে এঁদের জেলে পাঠায়।
- কানপুরে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা (১৯২৫): জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে সত্যভক্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম কমিউনিস্ট সম্মেলনে ভারতের মাটিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- শ্রমিক-কৃষক পার্টি (WPP): সরাসরি কমিউনিস্ট নামে কাজ করা কঠিন হওয়ায় ১৯২৮ সালে তারা 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি' (WPP) গঠন করে এবং শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বোম্বাই ও বাংলায় বড়ো ধর্মঘট হয়।
- মিরাট ষড়যন্ত্র ও নিষিদ্ধকরণ: ১৯২৯ সালে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে ব্রিটিশরা কমিউনিস্টদের দমন করার চেষ্টা করে এবং ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করে। তবুও কমিউনিস্টরা গোপনে এবং কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের ভেতরে থেকে কাজ চালিয়ে যায় এবং তেভাগা, তেলেঙ্গানার মতো বিশাল কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
9. জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার বিকাশ এবং ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) প্রতিষ্ঠার কারণ আলোচনা করো।
কংগ্রেসে বামপন্থী ভাবধারার বিকাশ:
১৯২০-এর দশক থেকে জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ নেতাদের হাত ধরে জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে সমাজতান্ত্রিক বা বামপন্থী ভাবধারার বিকাশ ঘটতে থাকে। তাঁরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, ভারতের কৃষক ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মুক্তির কথাও বলতে শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব প্রমুখ কংগ্রেসের ভেতরেই 'কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল' (CSP) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বামপন্থী মতাদর্শকে আরও শক্তিশালী করে।
ফরোয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠার কারণ (১৯৩৯):
সুভাষচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একটি আপসহীন ও চরমপন্থী রূপ দিতে।
- ত্রিপুরী কংগ্রেসের সংকট: ১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। এতে গান্ধীজি ও ডানপন্থী নেতারা অসন্তুষ্ট হন।
- ডানপন্থীদের অসহযোগিতা: গান্ধীজির আপসহীন মনোভাবের কারণে কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতি (Working Committee) গঠনে সুভাষচন্দ্র বসু কোনো সহযোগিতা পাননি। গোবিন্দবল্লভ পন্থের একটি প্রস্তাব পাস করে তাঁকে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়।
- পদত্যাগ ও নতুন দল গঠন: কংগ্রেসে কাজের কোনো পরিবেশ না থাকায় সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে একজোট করে আপসহীন ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম চালানোর উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৩৯ সালের ৩ মে কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই 'ফরোয়ার্ড ব্লক' নামক নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন।
10. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের (Leftists) ভূমিকা এবং সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা:
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলি (CSP, WPP) স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অনন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল:
- শ্রমিক ও কৃষক সমাজের জাগরণ: কংগ্রেস যেখানে মূলত মধ্যবিত্ত ও পুঁজিপতিদের দল ছিল, বামপন্থীরা সেখানে সমাজের একেবারে নীচুতলার অবহেলিত কৃষক ও শ্রমিকদের রাজনৈতিক সচেতন করে তোলে। তাদের নেতৃত্বে এআইটিইউসি (AITUC) এবং সারা ভারত কিষাণ সভা গঠিত হয়।
- অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবি: বামপন্থীরাই প্রথম বোঝায় যে শুধু ব্রিটিশদের তাড়ালেই হবে না, জমিদার ও পুঁজিপতিদের শোষণের হাত থেকেও গরিব মানুষকে মুক্ত করতে হবে (পূর্ণ স্বরাজের সাথে সমাজতন্ত্রের দাবি)।
- উগ্র ও আপসহীন সংগ্রাম: আইন অমান্য আন্দোলনের সময় বোম্বাই, সোলাপুর বা বাংলায় বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক ধর্মঘটগুলি ব্রিটিশদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এছাড়া তেভাগা ও তেলেঙ্গানার মতো সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ ছিল বামপন্থীদের এক অসামান্য অবদান।
সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি:
- আন্তর্জাতিক নির্দেশ নির্ভরতা: ভারতের কমিউনিস্টরা অনেক সময় দেশের পরিস্থিতির চেয়ে রাশিয়ার (Comintern) নির্দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল।
- ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা: ১৯৪২ সালে রাশিয়া মিত্রপক্ষে যোগ দেওয়ায় কমিউনিস্টরা ব্রিটিশদের সমর্থন করে এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে, যা সাধারণ মানুষের চোখে তাদের 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে প্রতিপন্ন করেছিল।
- মুসলিম লিগকে সমর্থন: ১৯৪০-এর দশকে কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবির তত্ত্বকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছিল, যা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল।
মনে রেখো!
কৃষক নেতা: একা আন্দোলনের নেতা মাদারী পাশি, বারদৌলিতে সর্দার প্যাটেল এবং কিষাণ সভার প্রথম সভাপতি স্বামী সহজানন্দ।
শ্রমিক সংগঠন: ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত AITUC এর প্রথম সভাপতি লালা লাজপত রায়।
বামপন্থী: ১৯২৫ সালে কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা ১৯২৯ সালে।
ফরোয়ার্ড ব্লক: কংগ্রেস সভাপতির পদ ছেড়ে ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।