Chapter 3: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ

উপজাতীয় বিদ্রোহ, কৃষক আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ এবং ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলন | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর (WBBSE 2027)

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 15 March 2026 Last Update: 30 May 2026
Chapter 3: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ | Madhyamik History

Chapter 3: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ

সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 50 MCQ | 45 SAQ | 10 Broad Questions

অরণ্য আইন সাঁওতাল হুল মুন্ডা উলগুলান নীল বিদ্রোহ ফরাজি আন্দোলন

উপজাতীয় বিদ্রোহ

অরণ্য আইন, কোল, সাঁওতাল (হুল) এবং মুন্ডা (উলগুলান) বিদ্রোহ

কৃষক আন্দোলন

ওয়াহাবি (বাঁশের কেল্লা), ফরাজি, নীল এবং পাবনা কৃষক বিদ্রোহ

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

50 টি
1. ভারতে প্রথম অরণ্য আইন (Forest Act) কবে পাস হয়?
ক) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে
2. দ্বিতীয় অরণ্য আইন কবে পাস হয়?
ক) ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে
3. চুয়াড় বিদ্রোহের প্রথম পর্বের নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন?
ক) জগন্নাথ সিং
খ) দুর্জন সিং
গ) গঙ্গা নারায়ণ
ঘ) রানি শিরোমণি
4. মেদিনীপুরে চুয়াড় বিদ্রোহের দ্বিতীয় পর্বের (১৭৯৮) প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) জগন্নাথ সিং
খ) দুর্জন সিং
গ) দিগম্বর বিশ্বাস
ঘ) বিরসা মুন্ডা
5. মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাই কাকে বলা হয়?
ক) রানি শিরোমণি
খ) মাতঙ্গিনী হাজরা
গ) রানি ভবানী
ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
6. 'জঙ্গলমহল' জেলা কোন্ বিদ্রোহের পর গঠন করা হয়?
ক) সাঁওতাল বিদ্রোহ
খ) কোল বিদ্রোহ
গ) চুয়াড় বিদ্রোহ
ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহ
7. কোল বিদ্রোহ (Kol Rebellion) কবে শুরু হয়?
ক) ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে
8. কোল বিদ্রোহের একজন প্রধান নেতার নাম কী?
ক) বুদ্ধু ভগত
খ) সিধু
গ) বিরসা মুন্ডা
ঘ) তিতুমির
9. কোল আদিবাসীরা বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীদের কী বলত?
ক) গোমস্তা
খ) খুতকাট্টি
গ) দিকু (Diku)
ঘ) উলগুলান
10. কোল বিদ্রোহের ফলে ব্রিটিশ সরকার কোন্ নতুন অঞ্চল গঠন করে?
ক) জঙ্গলমহল
খ) দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি
গ) সাঁওতাল পরগনা
ঘ) ছোটোনাগপুর ফ্রন্টিয়ার
11. সাঁওতাল বিদ্রোহ (Santhal Rebellion) কবে শুরু হয়?
ক) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
12. সাঁওতাল বিদ্রোহ কী নামে পরিচিত?
ক) উলগুলান
খ) হুল (Hul)
গ) দিকু
ঘ) দামিন-ই-কোহ
13. সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান দুজন নেতা কে ছিলেন?
ক) বুদ্ধু ভগত ও জোয়া ভগত
খ) সিধু ও কানহু
গ) বিরসা ও গয়া মুন্ডা
ঘ) দিগম্বর ও বিষ্ণুচরণ
14. রাজমহল পাহাড়ের প্রান্তদেশকে সাঁওতালরা কী বলত?
ক) জঙ্গলমহল
খ) দামিন-ই-কোহ
গ) দিকু
ঘ) খুতকাট্টি
15. সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?
ক) লর্ড বেন্টিঙ্ক
খ) লর্ড ডালহৌসি
গ) লর্ড ক্যানিং
ঘ) লর্ড ওয়েলেসলি
16. কোন্ বিদ্রোহের পর 'সাঁওতাল পরগনা' গঠন করা হয়?
ক) কোল বিদ্রোহ
খ) মুন্ডা বিদ্রোহ
গ) চুয়াড় বিদ্রোহ
ঘ) সাঁওতাল বিদ্রোহ
17. মুন্ডা বিদ্রোহ (Munda Rebellion) কবে সংঘটিত হয়?
ক) ১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে
18. মুন্ডা বিদ্রোহ কী নামে পরিচিত?
ক) হুল
খ) উলগুলান (Ulgulan)
গ) দিকু
ঘ) ফরাজি
19. মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) গয়া মুন্ডা
খ) বিরসা মুন্ডা
গ) সিধু
ঘ) বুদ্ধু ভগত
20. মুন্ডাদের জমির যৌথ মালিকানা প্রথাকে কী বলা হত?
ক) খুতকাট্টি (Khuntkatti)
খ) দিকু
গ) দামিন-ই-কোহ
ঘ) জুম চাষ
21. মুন্ডা বিদ্রোহের সেনাপতি কে ছিলেন?
ক) বিরসা মুন্ডা
খ) গয়া মুন্ডা
গ) সিধু মুন্ডা
ঘ) ডোঙ্কা মুন্ডা
22. কোন্ আইনের মাধ্যমে মুন্ডাদের 'খুতকাট্টি' প্রথাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়?
ক) ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন (১৯০৮)
খ) সাঁওতাল পরগনা আইন
গ) অরণ্য আইন
ঘ) ইলবার্ট বিল
23. ভীল বিদ্রোহ (Bhil Rebellion) কবে এবং কোথায় হয়েছিল?
ক) ১৮৫৫ সালে বিহারে
খ) ১৮১৯ সালে খান্দেশে
গ) ১৮৯৯ সালে রাঁচিতে
ঘ) ১৭৯৮ সালে মেদিনীপুরে
24. রংপুর বিদ্রোহ (Rangpur Rebellion) কবে সংঘটিত হয়?
ক) ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
25. রংপুর বিদ্রোহের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) দেবী সিং
খ) নুরুলউদ্দীন
গ) মজনু শাহ
ঘ) ভবানী পাঠক
26. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (Sannyasi-Fakir Rebellion) কবে শুরু হয়?
ক) ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
27. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের একজন ফকির নেতার নাম লেখো।
ক) ভবানী পাঠক
খ) মজনু শাহ
গ) চিরাগ আলি
ঘ) দেবী চৌধুরানি
28. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের একজন সন্ন্যাসী নেতার নাম কী?
ক) মজনু শাহ
খ) ভবানী পাঠক
গ) তিতুমির
ঘ) দুদু মিঞা
29. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কোন্ উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকা রয়েছে?
ক) আনন্দমঠ
খ) বিষবৃক্ষ
গ) কপালকুণ্ডলা
ঘ) গোরা
30. পাগলপন্থী বিদ্রোহের (Pagal Panthi) সূচনা কে করেন?
ক) করম শাহ
খ) টিপু শাহ
গ) মজনু শাহ
ঘ) তিতুমির
31. করম শাহের পর কে পাগলপন্থী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন?
ক) মজনু শাহ
খ) টিপু শাহ
গ) দুদু মিঞা
ঘ) শরিয়তুল্লাহ
32. ভারতে ওয়াহাবি (Wahabi) আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
ক) সৈয়দ আহমেদ
খ) তিতুমির
গ) আব্দুল ওয়াহাব
ঘ) হাজি শরিয়তুল্লাহ
33. ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত নাম কী?
ক) ফরাজি আন্দোলন
খ) তরিকা-ই-মুহম্মদিয়া
গ) পাগলপন্থী
ঘ) আলিগড় আন্দোলন
34. বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) সৈয়দ আহমেদ
খ) দুদু মিঞা
গ) তিতুমির (মীর নিসার আলি)
ঘ) নোয়া মিঞা
35. 'বাঁশের কেল্লা' (Bansher Kella) কে নির্মাণ করেছিলেন?
ক) দুদু মিঞা
খ) তিতুমির
গ) মজনু শাহ
ঘ) সিধু
36. তিতুমিরের প্রধান সেনাপতি কে ছিলেন?
ক) গোলাম মাসুম
খ) মিসকিন শাহ
গ) মজনু শাহ
ঘ) সৈয়দ আহমেদ
37. বারাসাত বিদ্রোহ (Barasat Rebellion) কবে সংঘটিত হয়?
ক) ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
38. ফরাজি (Faraizi) আন্দোলনের প্রবর্তক কে ছিলেন?
ক) দুদু মিঞা
খ) হাজি শরিয়তুল্লাহ
গ) তিতুমির
ঘ) সৈয়দ আহমেদ
39. 'ফরাজি' শব্দের অর্থ কী?
ক) ইসলাম ধর্মের পবিত্র পথ
খ) ঈশ্বর নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য
গ) নবজাগরণ
ঘ) বিদ্রোহ
40. হাজি শরিয়তুল্লাহের মৃত্যুর পর কে ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন?
ক) নোয়া মিঞা
খ) তিতুমির
গ) দুদু মিঞা (মহম্মদ মহসীন)
ঘ) গোলাম মাসুম
41. কে ঘোষণা করেছিলেন, "জমি আল্লাহর দান, জমিতে কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই"?
ক) তিতুমির
খ) দুদু মিঞা
গ) হাজি শরিয়তুল্লাহ
ঘ) সৈয়দ আহমেদ
42. নীল বিদ্রোহ (Indigo Rebellion) কবে শুরু হয়?
ক) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে
43. নীল বিদ্রোহের দুজন প্রধান নেতার নাম লেখো।
ক) সিধু ও কানহু
খ) দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস
গ) তিতুমির ও দুদু মিঞা
ঘ) মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক
44. 'নীলদর্পণ' নাটকটি কে রচনা করেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) দীনবন্ধু মিত্র
গ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ঘ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
45. নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কোন্ পত্রিকার সম্পাদক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন?
ক) হিন্দু প্যাট্রিয়ট (হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়)
খ) সোমপ্রকাশ (দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ)
গ) বঙ্গদর্শন (বঙ্কিমচন্দ্র)
ঘ) যুগান্তর
46. ব্রিটিশ সরকার নীল চাষিদের অভিযোগ তদন্তের জন্য কবে 'নীল কমিশন' (Indigo Commission) গঠন করে?
ক) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে
47. নীল কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী নীল চাষকে কী বলা হয়?
ক) লাভজনক
খ) বাধ্যতামূলক
গ) চাষিদের ইচ্ছাধীন
ঘ) বেআইনি
48. পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (Pabna Peasant Rebellion) কবে শুরু হয়?
ক) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে
49. পাবনা কৃষক বিদ্রোহের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) ঈশানচন্দ্র রায়
খ) দিগম্বর বিশ্বাস
গ) তিতুমির
ঘ) বিরসা মুন্ডা
50. পাবনা বিদ্রোহে কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে কী গঠন করেছিল?
ক) বাঁশের কেল্লা
খ) কৃষক সমিতি (Agrarian League)
গ) ধর্মীয় সংগঠন
ঘ) সশস্ত্র বাহিনী

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)

45 টি
1. বিদ্রোহ (Rebellion) বলতে কী বোঝো?
বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনসমষ্টির স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ বা সংগ্রামকে বিদ্রোহ বলে। (যেমন: সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ)।
2. অভ্যুত্থান (Uprising) কী?
প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বা জনসমষ্টির সশস্ত্র ও হিংসাত্মক প্রকাশকে অভ্যুত্থান বলে। এটি বিদ্রোহের একটি চরম পর্যায় (যেমন: সিপাহি অভ্যুত্থান)।
3. বিপ্লব (Revolution) কাকে বলে?
যখন কোনো বিদ্রোহ বা আন্দোলনের ফলে প্রচলিত রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি দ্রুত, আমূল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে, তখন তাকে বিপ্লব বলে। (যেমন: ফরাসি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব)।
4. প্রথম ভারতীয় অরণ্য আইন (Forest Act) কবে পাস হয়?
১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার প্রথম ভারতীয় অরণ্য আইন পাস করে। এর ফলে ভারতের বনজ সম্পদের ওপর ব্রিটিশদের একাধিপত্য কায়েম হয়।
5. অরণ্য আইনের ফলে আদিবাসীদের কী ক্ষতি হয়েছিল?
অরণ্য আইনের ফলে যুগ যুগ ধরে অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল আদিবাসীদের কাঠ কাটা, পশু শিকার এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহের চিরাচরিত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যা উপজাতীয় বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল।
6. চুয়াড় (Chuar) কাদের বলা হত?
মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসী, যারা মূলত কৃষিকাজ ও স্থানীয় জমিদারদের পাইক বা রক্ষী হিসেবে কাজ করত, ব্রিটিশরা তাদের ঘৃণার্থে 'চুয়াড়' বলত।
7. চুয়াড় বিদ্রোহের দুটি প্রধান কারণ লেখো।
১) ব্রিটিশ সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে স্থানীয় জমিদার ও চুয়াড়দের জমি কেড়ে নেয়। ২) পাইক বা রক্ষীর কাজ থেকে চুয়াড়দের বরখাস্ত করে তাদের নিষ্কর জমি (পাইকান জমি) বাজেয়াপ্ত করা হয়।
8. দুর্জন সিং কে ছিলেন?
দুর্জন সিং ছিলেন রাইপুরের জমিদার এবং ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুরে চুয়াড় বিদ্রোহের (দ্বিতীয় পর্বের) প্রধান নেতা।
9. জঙ্গলমহল (Jangal Mahal) কী?
চুয়াড় বিদ্রোহ দমন করার পর ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বাঁকুড়া, মেদিনীপুর ও বীরভূম জেলার জঙ্গলময় অঞ্চলকে নিয়ে একটি পৃথক প্রশাসনিক জেলা গঠন করে, যার নাম দেয় জঙ্গলমহল।
10. কোল বিদ্রোহ (Kol Rebellion) কবে ও কোথায় হয়েছিল?
১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুর, সিংভূম, মানভূম, রাঁচি ও পালামৌ অঞ্চলে কোল উপজাতিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
11. কোল বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম লেখো।
বুদ্ধু ভগত এবং জোয়া ভগত ছিলেন কোল বিদ্রোহের প্রধান দুজন নেতা।
12. দিকু (Diku) কাদের বলা হত?
ছোটোনাগপুর ও সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে ব্রিটিশদের মদতে বাইরে থেকে আসা অত্যাচারী মহাজন, ব্যবসায়ী ও জমিদারদের কোল এবং সাঁওতাল আদিবাসীরা 'দিকু' বলে ডাকত।
13. কোল বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার কী ব্যবস্থা নেয়?
কোল বিদ্রোহ দমনের পর ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কোলদের জন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল 'দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি' (South-West Frontier Agency) গঠন করে।
14. সাঁওতাল বিদ্রোহ (Santhal Rebellion) বা 'হুল' কবে শুরু হয়?
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন ভগনাডিহির মাঠে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল জমায়েত হয়ে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার শপথ নেয় এবং সাঁওতাল হুল বা বিদ্রোহ শুরু হয়।
15. দামিন-ই-কোহ (Damin-i-Koh) কী?
রাজমহল পাহাড়ের প্রান্তদেশ, যেখানে সাঁওতালরা জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি করে বসবাস শুরু করেছিল, তাকে ফারসি ভাষায় 'দামিন-ই-কোহ' (পাহাড়ের প্রান্তদেশ) বলা হত।
16. সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন প্রধান নেতার নাম লেখো।
চার ভাই সিধু, কানহু, চাঁদ ও ভৈরব সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে সিধু ও কানহু ছিলেন প্রধান।
17. মুন্ডা বিদ্রোহ (Munda Rebellion) বা উলগুলান কবে সংঘটিত হয়?
১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে রাঁচি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা উপজাতিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, যা উলগুলান নামে পরিচিত।
18. উলগুলান (Ulgulan) শব্দের অর্থ কী?
মুন্ডারি ভাষায় 'উলগুলান' শব্দের অর্থ হল ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা বা প্রবল বিক্ষোভ। মুন্ডা বিদ্রোহ এই নামেই পরিচিত।
19. খুতকাট্টি (Khuntkatti) প্রথা কী?
মুন্ডা সমাজে জমির ওপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না, পুরো জমির মালিকানা ছিল যৌথ বা গোষ্ঠীর। এই যৌথ মালিকানা প্রথাকেই 'খুতকাট্টি' বলা হত।
20. মুন্ডা বিদ্রোহের পর কোন্ আইন পাস হয়?
মুন্ডা বিদ্রোহের পর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে 'ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন' (Chotanagpur Tenancy Act) পাস করে খুতকাট্টি প্রথাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বেগার খাটানো নিষিদ্ধ করা হয়।
21. ভীল বিদ্রোহ (Bhil Rebellion) কবে, কার নেতৃত্বে হয়েছিল?
১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের খান্দেশ অঞ্চলে চিল নায়েকের নেতৃত্বে ভীল উপজাতিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
22. রংপুর বিদ্রোহ (Rangpur Rebellion) কবে, কার বিরুদ্ধে হয়েছিল?
১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে রংপুরে অত্যাচারী ইজারাদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে নুরুলউদ্দীনের নেতৃত্বে কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল।
23. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (Sannyasi-Fakir Rebellion) কবে শুরু হয়?
১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা, রাজশাহী, মালদহ অঞ্চলে ব্রিটিশদের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং তীর্থকরের প্রতিবাদে সন্ন্যাসী ও ফকিররা বিদ্রোহ শুরু করে।
24. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম লেখো।
ফকির বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মজনু শাহ ও চিরাগ আলি। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানি।
25. পাগলপন্থী (Pagal Panthi) কাদের বলা হত?
ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাউল, সুফি ও হিন্দু ধর্মের সমন্বয়ে করম শাহ এক নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। এঁদের অনুগামীদের পাগলপন্থী বলা হত।
26. পাগলপন্থী বিদ্রোহের নেতা কে ছিলেন?
করম শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু শাহ ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে পাগলপন্থী সম্প্রদায়ের কৃষকদের নিয়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
27. ওয়াহাবি (Wahabi) কথার অর্থ কী?
আরবি শব্দ 'ওয়াহাবি' কথার আক্ষরিক অর্থ হল নবজাগরণ। আরবে আব্দুল ওয়াহাব এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন।
28. ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত নাম কী ছিল?
ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত নাম ছিল 'তরিকা-ই-মুহম্মদিয়া', যার অর্থ হল হজরত মহম্মদের প্রদর্শিত পথ।
29. ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
রায়বেরিলির সৈয়দ আহমেদ (Syed Ahmed Barelvi) ছিলেন ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন।
30. দার-উল-হারব এবং দার-উল-ইসলাম কী?
দার-উল-হারব কথার অর্থ হল 'শত্রুর দেশ' (ব্রিটিশ শাসিত ভারত)। আর দার-উল-ইসলাম কথার অর্থ হল 'ইসলামের দেশ' (সৈয়দ আহমেদ ভারতকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করতে চেয়েছিলেন)।
31. তিতুমির (Titumir) কে ছিলেন?
তিতুমির (প্রকৃত নাম মীর নিসার আলি) ছিলেন বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৩১ সালে বারাসাত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
32. বাঁশের কেল্লা (Bansher Kella) কী?
তিতুমির ব্রিটিশ সেনা এবং দেশীয় জমিদারদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বাঁশ ও কাদা দিয়ে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, যা বাঁশের কেল্লা নামে পরিচিত।
33. ফরাজি (Faraizi) শব্দের অর্থ কী?
ইসলাম ধর্মে 'ফরাজি' শব্দের অর্থ হল ঈশ্বর নির্দেশিত বাধ্যতামূলক কর্তব্য। হাজি শরিয়তুল্লাহ এই আন্দোলনের সূচনা করেন।
34. ফরাজি আন্দোলনের দুজন নেতার নাম লেখো।
হাজি শরিয়তুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র মহম্মদ মহসীন, যিনি দুদু মিঞা নামে সমধিক পরিচিত, ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
35. "জমি আল্লাহর দান"—কথাটি কে বলেছিলেন?
ফরাজি নেতা দুদু মিঞা ঘোষণা করেছিলেন, "জমি আল্লাহর দান, জমিতে কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই"। এর মাধ্যমে তিনি কৃষকদের জমিদারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করেন।
36. নীল বিদ্রোহ (Indigo Rebellion) কবে ও কোথায় শুরু হয়?
১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে নদিয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে নীল বিদ্রোহ শুরু হয়।
37. নীল বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম লেখো।
দিগম্বর বিশ্বাস এবং বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ছিলেন নীল বিদ্রোহের প্রথম ও প্রধান নেতা। এঁদের 'বাংলার ওয়াট টাইলার' বলা হয়।
38. 'নীলদর্পণ' নাটক কার লেখা? এর বিষয়বস্তু কী ছিল?
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে দীনবন্ধু মিত্র 'নীলদর্পণ' নাটক রচনা করেন। এর বিষয়বস্তু ছিল বাংলার অসহায় নীলচাষিদের ওপর ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অমানবিক অত্যাচার ও শোষণের বাস্তব চিত্র।
39. নীল বিদ্রোহে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার ভূমিকা কী ছিল?
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নীলচাষিদের সপক্ষে শিক্ষিত সমাজের জনমত গড়ে তুলেছিল।
40. নীল কমিশন (Indigo Commission) কবে এবং কেন গঠিত হয়?
নীল বিদ্রোহের ভয়াবহতা দেখে ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলচাষিদের অভাব-অভিযোগ তদন্ত করার জন্য নীল কমিশন গঠন করে।
41. নীল কমিশনের রিপোর্টের ফল কী হয়েছিল?
১৮৬০ সালে নীল কমিশন রিপোর্ট দেয় যে নীল চাষ চাষিদের পক্ষে সম্পূর্ণ ক্ষতিকর এবং এটি চাষিদের ইচ্ছাধীন, জোর করে কাউকে নীল চাষ করানো যাবে না।
42. পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (Pabna Peasant Rebellion) কবে ও কোথায় হয়?
১৮৭০ থেকে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পূর্ববঙ্গের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমায় জমিদারদের বেআইনি কর আদায়ের বিরুদ্ধে কৃষকরা বিদ্রোহ করে।
43. পাবনা বিদ্রোহের প্রধান নেতা কারা ছিলেন?
ঈশানচন্দ্র রায় (যাঁকে কৃষকরা 'রাজা' বলত), শম্ভুনাথ পাল এবং খুদিমোল্লা পাবনা কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
44. কৃষক সমিতি (Agrarian League) কোথায় গঠিত হয়?
পাবনা বিদ্রোহের সময় জমিদারদের বিরুদ্ধে আইনি পথে লড়াই করার জন্য পাবনার কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে 'কৃষক সমিতি' বা Agrarian League গঠন করেছিল।
45. পাবনা বিদ্রোহের প্রকৃতি কেমন ছিল?
পাবনা বিদ্রোহ ছিল মূলত জমিদার বিরোধী একটি নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি আন্দোলন। এটি ব্রিটিশ বিরোধী বা সাম্প্রদায়িক ছিল না। কৃষকরা আইনের সাহায্যে জমিদারদের শোষণ বন্ধ করতে চেয়েছিল।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)

10 টি
1. সাঁওতাল বিদ্রোহের (Santhal Rebellion) প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ (১৮৫৫-৫৬):

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে রাজমহল পাহাড়ের প্রান্তদেশে (দামিন-ই-কোহ) সাঁওতালরা যে ভয়ংকর বিদ্রোহ (হুল) করেছিল, তার প্রধান কারণগুলি হল:

  1. জমিদারদের শোষণ: সাঁওতালরা অক্লান্ত পরিশ্রমে জঙ্গল পরিষ্কার করে যে জমি চাষযোগ্য করে তুলেছিল, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদাররা সেই জমির ওপর চড়া হারে রাজস্ব চাপিয়ে দেয় এবং খাজনা দিতে না পারলে জমি কেড়ে নেয়।
  2. মহাজনদের অত্যাচার: বাইরের মহাজনরা (দিকু) সাঁওতালদের চড়া সুদে (৫০% থেকে ৫০০%) ঋণ দিত। ঋণ শোধ করতে না পারলে তাদের জমি, গবাদি পশু কেড়ে নেওয়া হত এবং তাদের বংশানুক্রমে বেগার বা ক্রীতদাসে পরিণত করা হত।
  3. রেলপথ নির্মাণে বঞ্চনা: ওই সময়ে ভাগলপুর থেকে বর্ধমান পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজে সাঁওতালদের জোর করে নামমাত্র মজুরিতে বেগার খাটানো হত এবং তাদের ওপর শারীরিক অত্যাচার করা হত।
  4. ব্যবসায়ীদের প্রতারণা: বহিরাগত ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের কাছ থেকে কৃষিদ্রব্য কেনার সময় ওজনে বেশি (কেনারাম বাটখারা) নিত এবং তাদের জিনিস বিক্রি করার সময় ওজনে কম (বেচারাম বাটখারা) দিয়ে প্রতারণা করত।
  5. ব্রিটিশ পুলিশ ও আইনের বৈষম্য: সাঁওতালরা জমিদার বা মহাজনদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে বিচার চাইতে গেলে, পুলিশ উলটে সাঁওতালদেরই শাস্তি দিত। এই সব বঞ্চনা ও শোষণের ফলেই সাঁওতালরা একজোট হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
2. সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব (Significance of Santhal Rebellion) আলোচনা করো।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব:

সাঁওতাল বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে দমিত হলেও, ভারতের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  1. সাঁওতাল পরগনা গঠন: বিদ্রোহের ব্যাপকতা দেখে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে সাঁওতালদের ক্ষোভ প্রশমিত করা প্রয়োজন। তাই ১৮৫৫ সালের শেষে ভাগলপুর ও বীরভূমের একাংশ নিয়ে পৃথক 'সাঁওতাল পরগনা' গঠন করা হয়।
  2. উপজাতীয় আইন: সাঁওতাল পরগনায় ব্রিটিশ সাধারণ আইনের বদলে তাদের নিজস্ব উপজাতীয় আইনকানুন ও বিচারব্যবস্থা প্রয়োগের অধিকার দেওয়া হয়।
  3. দিকুদের প্রবেশ নিষেধ: সাঁওতাল পরগনায় বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ী (দিকু) দের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
  4. ভবিষ্যৎ বিদ্রোহের প্রেরণা: সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে যেভাবে আধুনিক ব্রিটিশ বাহিনীর মোকাবিলা করেছিল, তা পরবর্তীকালে সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) এবং অন্যান্য কৃষক আন্দোলনকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
3. মুন্ডা বিদ্রোহ বা উলগুলানের (Munda Ulgulan) কারণ ও প্রকৃতি আলোচনা করো।

মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ (১৮৯৯-১৯০০):

রাঁচি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা উপজাতিরা ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ (উলগুলান) করে, তার কারণগুলি হল:

  1. খুতকাট্টি প্রথা বাতিল: মুন্ডা সমাজে জমির যৌথ মালিকানা বা 'খুতকাট্টি' প্রথা প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশরা এই প্রথা বাতিল করে জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা চাপিয়ে দেয় এবং মুন্ডাদের নিজস্ব জমি থেকে উচ্ছেদ করে।
  2. জমিদার ও মহাজনদের শোষণ: বহিরাগত জমিদার (দিকু) এবং ঠিকাদাররা মুন্ডাদের ওপর চড়া হারে খাজনা চাপায় এবং তাদের জোর করে বেগার খাটতে বাধ্য করে (বেঠবেগারি প্রথা)।
  3. মিশনারিদের ভূমিকা: খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের ধর্মান্তরিত করার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের জমি ফেরত দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
  4. বিরসা মুন্ডার নেতৃত্ব: এই সময় বিরসা মুন্ডা নিজেকে 'ধরতি আবা' (ভগবান) ঘোষণা করেন এবং মুন্ডাদের সমস্ত দুঃখ দূর করে স্বাধীন মুন্ডা রাজ্য (মুন্ডারাজ) প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান, যা বিদ্রোহকে ত্বরান্বিত করে।

প্রকৃতি ও ফলাফল:

মুন্ডা বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর ফলে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৮ সালে 'ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন' পাস করে মুন্ডাদের 'খুতকাট্টি' প্রথাকে আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং বেগার খাটানো নিষিদ্ধ করে।

4. নীল বিদ্রোহের (Indigo Rebellion) প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।

নীল বিদ্রোহের কারণ (১৮৫৯-৬০):

১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে নদিয়ার দিগম্বর ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে বাংলার কৃষকরা ইংরেজ নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে যে গণবিদ্রোহ শুরু করে, তার কারণগুলি হল:

  1. জোরপূর্বক নীল চাষ: নীলকর সাহেবরা কৃষকদের তাদের সবচেয়ে উর্বর জমিতে ধানের বদলে জোর করে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। নীল চাষ করলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যেত।
  2. দাদন বা অগ্রিম প্রথা: নীলকররা চাষিদের নীল চাষের জন্য নামমাত্র মূল্যে 'দাদন' বা অগ্রিম টাকা দিত। একবার দাদন নিলে কোনো কৃষক তা শোধ করতে পারত না এবং বংশানুক্রমে নীলকরদের ক্রীতদাসে পরিণত হত।
  3. অলাভজনক চাষ: নীল চাষ করে কৃষকরা যে দাম পেত, তা তাদের উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম ছিল। ফলে নীল চাষ করে কৃষকদের চরম আর্থিক অনটনে পড়তে হত।
  4. নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচার: কোনো কৃষক নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালে নীলকর সাহেবদের লাঠিয়ালরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিত, গবাদি পশু কেড়ে নিত, মহিলাদের অসম্মান করত এবং চাষিদের নীলকুঠিতে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালাত।
  5. আইনের বৈষম্য: ব্রিটিশ সরকার 'পঞ্চম আইন' (১৮৩০) ও 'একাদশ আইন' (১৮৬০) পাস করে নীল চাষ না করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে পুলিশ ও প্রশাসন নীলকরদের পক্ষ নিয়ে চাষিদের ওপর অত্যাচার চালাত। এরই প্রতিবাদে নীল বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।
5. নীল বিদ্রোহে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির (Educated Middle Class) ভূমিকা আলোচনা করো।

নীল বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভূমিকা:

নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) ছিল বাংলার প্রথম বিদ্রোহ যেখানে কৃষক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল:

  1. পত্রপত্রিকার ভূমিকা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা নীলকরদের অকথ্য অত্যাচার এবং কৃষকদের অসহায় অবস্থার কথা দিনের পর দিন প্রকাশ করে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং শিক্ষিত সমাজে জনমত গড়ে তোলে। 'সোমপ্রকাশ' এবং 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকাও নীলচাষিদের সমর্থন করেছিল।
  2. 'নীলদর্পণ' নাটক: দীনবন্ধু মিত্র তাঁর 'নীলদর্পণ' (১৮৬০) নাটকের মাধ্যমে নীলকরদের শোষণের এক বাস্তব ও মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর ইংরেজি অনুবাদ করে তা ইউরোপে পৌঁছে দেন, ফলে নীলকরদের অত্যাচার আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দিত হয়।
  3. আইনি ও নৈতিক সাহায্য: শিশিরকুমার ঘোষ, মথুরানাথ মৈত্রেয়, মনমোহন ঘোষ প্রমুখ শিক্ষিত ব্যক্তিরা সরাসরি গ্রামে গ্রামে ঘুরে নীলচাষিদের সংগঠিত করেন এবং তাদের আইনি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।
  4. উপসংহার: শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এই জোরালো সমর্থনের ফলেই নীল বিদ্রোহ একটি ব্যাপক গণ-আন্দোলনের রূপ নেয় এবং ব্রিটিশ সরকার নীল কমিশন (১৮৬০) গঠন করে নীলচাষকে চাষিদের ইচ্ছাধীন বলে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
6. কোল বিদ্রোহের (Kol Rebellion) কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

কোল বিদ্রোহের কারণ (১৮৩১-৩২):

ছোটোনাগপুর ও মানভূম অঞ্চলের কোল উপজাতিদের ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহের কারণগুলি হল:

  1. জমির অধিকার হরণ: কোলরা যুগ যুগ ধরে স্বাধীনভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিকাজ করত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন বহিরাগত জমিদারদের তাদের জমির মালিকানা দিয়ে কোলদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে।
  2. দিকুদের শোষণ: ব্রিটিশদের মদতে হিন্দু, শিখ ও মুসলিম ব্যবসায়ী এবং মহাজনরা (যাদের কোলরা 'দিকু' বলত) ছোটোনাগপুরে প্রবেশ করে। এরা কোলদের চড়া সুদে ঋণ দিত এবং ঋণ শোধ না করতে পারলে তাদের জমি কেড়ে নিয়ে তাদের বেগার খাটাত।
  3. রাজস্ব বৃদ্ধি ও কর: ব্রিটিশ সরকার কোলদের উৎপাদিত চালের ওপর এবং তাদের দেশীয় পানীয় 'হাঁড়িয়া' প্রস্তুত করার ওপর নতুন করে কর (Tax) আরোপ করে।
  4. সম্মানহানি: দিকু এবং ব্রিটিশ পুলিশ কোলদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করত এবং তাদের নারীদের সম্মানহানি করত। এরই প্রতিবাদে বুদ্ধু ভগত ও জোয়া ভগতের নেতৃত্বে কোলরা বিদ্রোহে ফেটে পড়ে।
7. বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনে তিতুমিরের (Titumir) ভূমিকা বা বারাসাত বিদ্রোহ আলোচনা করো।

ওয়াহাবি আন্দোলনে তিতুমিরের ভূমিকা:

আরবের ওয়াহাবি বা 'তরিকা-ই-মুহম্মদিয়া' আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, বাংলায় মীর নিসার আলি বা তিতুমিরের নেতৃত্বে এটি একটি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন ও ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়।

  1. কৃষকদের সংগঠিত করা: মক্কা থেকে ফিরে তিতুমির বারাসাত, বসিরহাট, নদীয়া ও ফরিদপুর অঞ্চলের দরিদ্র মুসলিম এবং হিন্দু কৃষকদের ব্রিটিশ সরকার, নীলকর সাহেব ও স্থানীয় জমিদারদের (যেমন পুড়ুরার কৃষ্ণদেব রায়) শোষণের বিরুদ্ধে একজোট করেন।
  2. কর প্রদানে অস্বীকৃতি: জমিদারদের চাপানো বেআইনি কর (যেমন দাড়ি রাখার ওপর কর) দিতে তিনি কৃষকদের বারণ করেন এবং স্বাধীন সরকার গঠনের ডাক দেন।
  3. বাঁশের কেল্লা নির্মাণ: ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ পুলিশ ও জমিদারদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বাঁশ ও কাদা দিয়ে একটি মজবুত দুর্গ নির্মাণ করেন, যা 'বাঁশের কেল্লা' নামে পরিচিত। তিনি নিজেকে 'বাদশাহ' ঘোষণা করেন এবং তাঁর সেনাপতি ছিলেন গোলাম মাসুম।
  4. ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ: ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ সেনাপতি লর্ড বেন্টিঙ্কের নির্দেশে মেজর স্কট আধুনিক কামান ও বন্দুক নিয়ে বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন। বীরের মতো যুদ্ধ করে তিতুমির ও তাঁর অনুগামীরা শহিদ হন এবং বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয়। একেই বারাসাত বিদ্রোহ বলা হয়।
8. ফরাজি আন্দোলনের (Faraizi Movement) বৈশিষ্ট্য ও দুদু মিঞার ভূমিকা আলোচনা করো।

ফরাজি আন্দোলন ও দুদু মিঞার ভূমিকা:

১৮২০-এর দশকে পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলায় হাজি শরিয়তুল্লাহ ফরাজি আন্দোলনের সূচনা করেন। 'ফরাজি' শব্দের অর্থ ঈশ্বর নির্দেশিত বাধ্যতামূলক কর্তব্য।

  • ধর্মীয় সংস্কার থেকে কৃষক আন্দোলন: প্রথমে এটি মুসলিমদের ধর্মীয় শুদ্ধিকরণ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, শরিয়তুল্লাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহম্মদ মহসীন বা দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে একটি ভয়ংকর কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।
  • দুদু মিঞার ঘোষণা: দুদু মিঞা ঘোষণা করেন যে, "জমি আল্লাহর দান, জমিতে কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই"। তিনি জমিদারদের বেআইনি কর দিতে কৃষকদের নিষেধ করেন।
  • সমান্তরাল প্রশাসন: তিনি পূর্ববঙ্গে নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের সমান্তরাল একটি নিজস্ব বিচারব্যবস্থা ও গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর নির্দেশে ফরাজিরা নীলকুঠি ও জমিদারদের কাছারি আক্রমণ করে।
  • ফলাফল: দুদু মিঞাকে বারবার জেলে যেতে হয়। তাঁর মৃত্যুর পর নোয়া মিঞা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও তা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে এটি বাংলার কৃষকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল।
9. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের (Sannyasi-Fakir Rebellion) কারণগুলি কী কী?

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কারণ (১৭৬৩-১৮০০):

বাংলার ঢাকা, রাজশাহী ও মালদহ অঞ্চলে মজনু শাহ এবং ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সংঘটিত সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের কারণগুলি হল:

  1. তীর্থকরের বোঝা: সন্ন্যাসী ও ফকিররা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন তীর্থস্থানে যাতায়াত করত। ব্রিটিশ সরকার তাদের তীর্থযাত্রার ওপর তীর্থকর চাপিয়ে দিলে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়।
  2. জমি বাজেয়াপ্ত করা: আগে নবাব ও জমিদারদের দেওয়া নিষ্কর জমিতে সন্ন্যাসীরা বসবাস করত। ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখল করে তাদের নিষ্কর জমিগুলি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাদের ভবঘুরে বা দস্যু আখ্যা দেয়।
  3. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও রাজস্ব আদায়: ১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানি জোরপূর্বক কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে থাকে। ফলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয় এবং অনেকেই সন্ন্যাসী ও ফকিরদের দলে যোগ দেয়।
  4. বাণিজ্যে বাধা: সন্ন্যাসী ও ফকিররা রেশম ও সুতোর ছোটোখাটো ব্যবসা করত। কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের কারণে তাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা কোম্পানির কুঠি ও জমিদারদের ওপর আক্রমণ চালায়।
10. পাবনা কৃষক বিদ্রোহের (Pabna Peasant Rebellion) কারণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

পাবনা কৃষক বিদ্রোহের কারণ ও বৈশিষ্ট্য (১৮৭০-৭৫):

পূর্ববঙ্গের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমায় জমিদারদের বিরুদ্ধে ঈশানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে কৃষকরা যে বিদ্রোহ করেছিল, তার কারণ ও বৈশিষ্ট্যগুলি হল:

  • বেআইনি কর আদায় (কারণ): ১৮৫৯ সালের দশম আইনে কৃষকদের জমির অধিকার দেওয়া হলেও, জমিদাররা তা মানেনি। তারা কৃষকদের ওপর জোর করে বিভিন্ন বেআইনি কর (আবওয়াব), বিবাহ কর, এবং মিথ্যা মামলা চাপিয়ে শোষণ চালাত। এর প্রতিবাদেই কৃষকরা বিদ্রোহ করে।
  • কৃষক সমিতি গঠন (বৈশিষ্ট্য): অন্যান্য বিদ্রোহের মতো এটি সহিংস বা সশস্ত্র ছিল না। পাবনার কৃষকরা জোটবদ্ধ হয়ে 'কৃষক সমিতি' (Agrarian League) গঠন করে এবং আইনি পথে ও শান্তিপূর্ণভাবে জমিদারদের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ও মামলা লড়েছিল।
  • ব্রিটিশ বিরোধী নয় (বৈশিষ্ট্য): এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। কৃষকদের স্লোগান ছিল, তারা "রানি মহারানির (রানি ভিক্টোরিয়া) প্রজা হতে চায়", জমিদারদের নয়।
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি (বৈশিষ্ট্য): পাবনার অধিকাংশ কৃষক মুসলিম হলেও, তাদের অন্যতম নেতা ছিলেন ঈশানচন্দ্র রায়, শম্ভুনাথ পাল প্রমুখ হিন্দু নেতারা। এখানে কোনো হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ ছিল না। এর ফলেই সরকার ১৮৮৫ সালে 'বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন' পাস করে কৃষকদের অধিকার স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

মনে রেখো!

অরণ্য আইন: ১৮৬৫ সালে প্রথম এবং ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় অরণ্য আইন পাস হয়।
সাঁওতাল হুল: ১৮৫৫ সালে সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে (দামিন-ই-কোহ অঞ্চল)।
মুন্ডা উলগুলান: ১৮৯৯ সালে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে, খুতকাট্টি প্রথা বাতিল কেন্দ্র করে।
নীল বিদ্রোহ: ১৮৫৯ সালে দিগম্বর ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে। হিন্দু প্যাট্রিয়ট ও নীলদর্পণ এই বিদ্রোহকে সমর্থন করে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহ বা 'হুল' শুরু হয়। সিধু ও কানহু ছিলেন এই বিদ্রোহের প্রধান নেতা।

মুন্ডারি ভাষায় 'উলগুলান' শব্দের অর্থ ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা। ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডারা যে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ করেছিল, তা উলগুলান নামে পরিচিত।

সাঁওতাল ও কোল উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ব্রিটিশদের মদতে বাইরে থেকে আসা অত্যাচারী মহাজন, ব্যবসায়ী ও জমিদারদের আদিবাসীরা 'দিকু' বলে ডাকত।

বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা তিতুমির ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ পুলিশ ও জমিদারদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নারকেলবেড়িয়া গ্রামে 'বাঁশের কেল্লা' নির্মাণ করেছিলেন।

নীলকর সাহেবদের জোরপূর্বক নীল চাষ, দাদন প্রথা, এবং চাষিদের ওপর অবর্ণনীয় অমানবিক অত্যাচারই ছিল ১৮৫৯ সালের নীল বিদ্রোহের প্রধান কারণ।