Chapter 1: ইতিহাসের ধারণা (Ideas of History)
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 50 MCQ | 40 SAQ | 14 Broad Questions
নতুন সামাজিক ইতিহাস ফটোগ্রাফি আত্মজীবনী সোমপ্রকাশ খেলাধুলার ইতিহাস
ইতিহাসের বৈচিত্র্য
নিম্নবর্গের ইতিহাস, পোশাক, খাদ্য, এবং খেলাধুলার ইতিহাস
আধুনিক উপাদান
সরকারি নথিপত্র, আত্মজীবনী, চিঠিপত্র এবং সাময়িকপত্রের গুরুত্ব
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
50 টি1. নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চা কবে শুরু হয়?
ক) ১৯৪০-এর দশকে
খ) ১৯৫০-এর দশকে
গ) ১৯৬০-এর দশকে
ঘ) ১৯৭০-এর দশকে
ব্যাখ্যা: ১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেন, জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিবাদী আবহাওয়ায় নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে।
2. 'ইতিহাসবিদ্যাকে অন্যান্য বিদ্যাচর্চার জননী' বলে কে অভিহিত করেছেন?
ক) জি এম ট্রেভেলিয়ান
খ) লিওপোল্ড ভন র্যাঙ্কে
গ) ই এইচ কার
ঘ) মার্ক ব্লক
ব্যাখ্যা: প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জি এম ট্রেভেলিয়ান ইতিহাসবিদ্যাকে অন্যান্য বিদ্যাচর্চার জননী বলে অভিহিত করেছেন।
3. নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার (Subaltern Studies) প্রধান প্রবক্তা কে?
ক) সুমিত সরকার
খ) রণজিৎ গুহ
গ) রোমিলা থাপার
ঘ) রামচন্দ্র গুহ
ব্যাখ্যা: ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে ড. রণজিৎ গুহ-র সম্পাদনায় 'Subaltern Studies' বা নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা শুরু হয়।
4. নতুন সামাজিক ইতিহাসে কাদের কথা বলা হয়েছে?
ক) রাজা-মহারাজাদের
খ) অভিজাতদের
গ) সাধারণ মানুষের বা আমজনতার
ঘ) কেবলমাত্র ব্রিটিশদের
ব্যাখ্যা: নতুন সামাজিক ইতিহাসে সমাজের উপেক্ষিত, ব্রাত্য, সাধারণ আমজনতার (Bottom of History) জীবনচর্চা ও সমাজকাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
5. 'ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব' কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব' স্থাপিত হয়, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ক্রিকেট ক্লাব।
6. মোহনবাগান ক্লাব আই.এফ.এ. (IFA) শিল্ড জয় করেছিল কবে?
ক) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান ক্লাব ব্রিটিশদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে আই.এফ.এ. শিল্ড জয় করে।
7. ভারতে আলুর ব্যবহার কারা প্রথম প্রচলন করেন?
ক) ব্রিটিশরা
খ) ফরাসিরা
গ) পর্তুগিজরা
ঘ) ওলন্দাজরা
ব্যাখ্যা: পর্তুগিজরা ভারতে প্রথম আলু, টমেটো, লঙ্কা, তামাক ইত্যাদির ব্যবহার শুরু করে।
8. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীর নাম কী?
ক) সত্তর বৎসর
খ) জীবনস্মৃতি
গ) জীবনের ঝরাপাতা
ঘ) আমার কথা
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীর নাম 'জীবনস্মৃতি', যা ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
9. বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনীর নাম কী?
ক) জীবনস্মৃতি
খ) জীবনের ঝরাপাতা
গ) সত্তর বৎসর
ঘ) আত্মচরিত
ব্যাখ্যা: বিপিনচন্দ্র পালের লেখা আত্মজীবনীর নাম 'সত্তর বৎসর'। এটি প্রথমে 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
10. সরলাদেবী চৌধুরানির আত্মজীবনীর নাম কী?
ক) জীবনের ঝরাপাতা
খ) সত্তর বৎসর
গ) জীবনস্মৃতি
ঘ) আমার জীবন
ব্যাখ্যা: সরলাদেবী চৌধুরানির আত্মজীবনীর নাম 'জীবনের ঝরাপাতা', যা ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
11. ভারতের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র কোনটি?
ক) আলম আরা
খ) রাজা হরিশচন্দ্র
গ) দেনা পাওনা
ঘ) জামাই ষষ্ঠী
ব্যাখ্যা: দাদাসাহেব ফালকে পরিচালিত ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত 'রাজা হরিশচন্দ্র' হল ভারতের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র।
12. ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র কোনটি?
ক) রাজা হরিশচন্দ্র
খ) আলম আরা
গ) চণ্ডীদাস
ঘ) জামাই ষষ্ঠী
ব্যাখ্যা: ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে আরদেশির ইরানির পরিচালনায় ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র 'আলম আরা' মুক্তি পায়।
13. বাংলার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র কোনটি?
ক) দেনা পাওনা
খ) জামাই ষষ্ঠী
গ) বিল্বমঙ্গল
ঘ) রাজা হরিশচন্দ্র
ব্যাখ্যা: মদন থিয়েটার্স লিমিটেডের প্রযোজনায় ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'জামাই ষষ্ঠী' হল বাংলার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র।
14. ফটোগ্রাফির সূচনা কবে হয়?
ক) ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফটোগ্রাফির সূচনা হয় এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতে এর ব্যবহার শুরু হয়।
15. ভারতে প্রথম রেলপথ কবে স্থাপিত হয়?
ক) ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসির আমলে বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে থানে পর্যন্ত ভারতের প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়।
16. বাংলায় প্রথম রেলপথ কোথায় স্থাপিত হয়?
ক) হাওড়া থেকে বালি
খ) হাওড়া থেকে বর্ধমান
গ) হাওড়া থেকে হুগলি
ঘ) শিয়ালদহ থেকে নৈহাটি
ব্যাখ্যা: ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত বাংলায় প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
17. 'ইকোলজিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজম' (Ecological Imperialism) গ্রন্থের রচয়িতা কে?
ক) রামচন্দ্র গুহ
খ) অ্যালফ্রেড ক্রসবি
গ) রিচার্ড গ্রোভ
ঘ) ইরফান হাবিব
ব্যাখ্যা: অ্যালফ্রেড ক্রসবি 'ইকোলজিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজম' গ্রন্থটি রচনা করেন, যা পরিবেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।
18. পরিবেশের ইতিহাসের ওপর লেখা রামচন্দ্র গুহর বিখ্যাত বইটির নাম কী?
ক) Green Imperialism
খ) The Fissured Land
গ) Silent Spring
ঘ) Ecological Imperialism
ব্যাখ্যা: ভারতের পরিবেশের ইতিহাস চর্চায় রামচন্দ্র গুহ এবং মাধব গ্যাডগিলের লেখা 'The Fissured Land: An Ecological History of India' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
19. সরকারি নথিপত্র কোথায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়?
ক) জাদুঘরে
খ) মহাফেজখানায় (Archives)
গ) গ্রন্থাগারে
ঘ) চিত্রশালায়
ব্যাখ্যা: সরকারি নির্দেশিকা, পুলিশ বা গোয়েন্দাদের রিপোর্ট, চিঠিপত্র ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র মহাফেজখানা বা আর্কাইভে (Archives) সংরক্ষিত থাকে। ভারতের জাতীয় মহাফেজখানা নয়াদিল্লিতে অবস্থিত।
20. ভারতের জাতীয় মহাফেজখানা কোথায় অবস্থিত?
ক) কলকাতা
খ) মুম্বাই
গ) নয়াদিল্লি
ঘ) চেন্নাই
ব্যাখ্যা: National Archives of India বা ভারতের জাতীয় মহাফেজখানা নয়াদিল্লিতে অবস্থিত।
21. 'লেটারস ফ্রম আ ফাদার টু হিজ ডটার' (Letters from a Father to his Daughter) চিঠিগুলি কে কাকে লিখেছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী ইন্দিরা গান্ধীকে
খ) জওহরলাল নেহরু ইন্দিরা গান্ধীকে
গ) মতিলাল নেহরু জওহরলাল নেহরুকে
ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৈত্রেয়ী দেবীকে
ব্যাখ্যা: ১৯২৮ সালের গ্রীষ্মকালে জওহরলাল নেহরু তাঁর দশ বছরের কন্যা ইন্দিরাকে পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে ৩০টি চিঠি লিখেছিলেন।
22. নেহরুর লেখা চিঠিগুলিকে হিন্দিতে কে অনুবাদ করেন?
ক) মুন্সি প্রেমচাঁদ
খ) মহাত্মা গান্ধী
গ) মুন্সি প্রেমচাঁদ (হিন্দি নাম 'পিতা কে পত্র পুত্রী কে নাম')
ঘ) ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র
ব্যাখ্যা: প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদ এই চিঠিগুলিকে হিন্দিতে অনুবাদ করেন, যার নাম দেওয়া হয় 'পিতা কে পত্র পুত্রী কে নাম'।
23. 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ
গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।
24. 'সোমপ্রকাশ' কী ধরনের পত্রিকা ছিল?
ক) দৈনিক
খ) সাপ্তাহিক
গ) পাক্ষিক
ঘ) মাসিক
ব্যাখ্যা: 'সোমপ্রকাশ' ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা প্রতি সোমবার প্রকাশিত হত।
25. কোন্ পত্রিকা লর্ড লিটনের 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' (Vernacular Press Act) এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল?
ক) বঙ্গদর্শন
খ) সোমপ্রকাশ
গ) অমৃতবাজার পত্রিকা
ঘ) হিন্দু প্যাট্রিয়ট
ব্যাখ্যা: ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড লিটন 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' পাস করলে 'সোমপ্রকাশ' তার তীব্র সমালোচনা করে এবং এর জেরে এক বছরের জন্য পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ থাকে।
26. 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার প্রথম প্রকাশ কবে হয়?
ক) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।
27. 'বঙ্গদর্শন' কী ধরনের পত্রিকা ছিল?
ক) সাপ্তাহিক
খ) দৈনিক
গ) মাসিক
ঘ) পাক্ষিক
ব্যাখ্যা: 'বঙ্গদর্শন' ছিল একটি মাসিক পত্রিকা। চার বছর বঙ্কিমচন্দ্র এটি সম্পাদনা করেন।
28. 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি প্রথম কোন্ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
ক) সোমপ্রকাশ
খ) বঙ্গদর্শন
গ) সঞ্জীবনী
ঘ) যুগান্তর
ব্যাখ্যা: বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
29. 'দি সেকেন্ড সেক্স' (The Second Sex) গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) সিমোন দ্য বোভেয়ার
খ) ভার্জিনিয়া উলফ
গ) মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট
ঘ) জেরল্ডিন ফোর্বস
ব্যাখ্যা: ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমোন দ্য বোভেয়ার নারী ইতিহাসের ওপর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দি সেকেন্ড সেক্স' রচনা করেন।
30. আধুনিককালের ইতিহাস চর্চায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় কোনটিকে?
ক) রাজাদের জীবনী
খ) যুদ্ধবিগ্রহ
গ) নিম্নবর্গের ইতিহাস বা আর্থ-সামাজিক ইতিহাস
ঘ) ধর্মীয় ইতিহাস
ব্যাখ্যা: আধুনিক যুগে ইতিহাস আর শুধু রাজাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন সমাজের সাধারণ মানুষ, তাদের সংস্কৃতি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে (Subaltern studies) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
31. প্রথম বাংলা রাজনৈতিক সংবাদপত্র কোনটি ছিল?
ক) সমাচার দর্পণ
খ) সোমপ্রকাশ
গ) সংবাদ প্রভাকর
ঘ) যুগান্তর
ব্যাখ্যা: 'সোমপ্রকাশ' কেই প্রথম বাংলা রাজনৈতিক সংবাদপত্র বলে মনে করা হয়, কারণ এটি নির্ভীকভাবে সরকারের সমালোচনা করত।
32. ভারতে ফুটবল খেলার প্রবর্তন কারা করেন?
ক) ইংরেজরা
খ) পর্তুগিজরা
গ) ওলন্দাজরা
ঘ) ফরাসিরা
ব্যাখ্যা: ভারতে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি প্রভৃতি খেলার প্রবর্তন করেছিল ইংরেজ বা ব্রিটিশরা।
33. কোন্ বিদ্রোহের কথা 'জীবনের ঝরাপাতা' গ্রন্থ থেকে জানা যায়?
ক) সাঁওতাল বিদ্রোহ
খ) নীল বিদ্রোহ
গ) বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন
ঘ) সিপাহি বিদ্রোহ
ব্যাখ্যা: সরলাদেবী চৌধুরানির 'জীবনের ঝরাপাতা' গ্রন্থ থেকে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন এবং মহারাষ্ট্রের শিবাজি উৎসবের অনুকরণে বাংলায় প্রতাপাদিত্য ও বীরাষ্টমী ব্রত পালনের কথা জানা যায়।
34. 'প্রতাপাদিত্য উৎসব' ও 'বীরাষ্টমী ব্রত' কে চালু করেন?
ক) সরলাদেবী চৌধুরানি
খ) ভগিনী নিবেদিতা
গ) বাসন্তী দেবী
ঘ) অ্যানি বেসান্ত
ব্যাখ্যা: বাংলার যুবসমাজের মধ্যে সাহস ও দেশপ্রেম জাগানোর জন্য সরলাদেবী চৌধুরানি প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসব এবং বীরাষ্টমী ব্রত চালু করেন।
35. 'সত্তর বৎসর' গ্রন্থটি প্রথম কোন্ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
ক) প্রবাসী
খ) দেশ
গ) বঙ্গদর্শন
ঘ) ভারতী
ব্যাখ্যা: বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী 'সত্তর বৎসর' প্রথমে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
36. 'জীবনস্মৃতি' থেকে আমরা কোন্ বিখ্যাত পরিবারের কথা জানতে পারি?
ক) জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার
খ) শোভাবাজার রাজপরিবার
গ) সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার
ঘ) লাহা পরিবার
ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, স্বদেশি যুগের উন্মাদনা এবং 'স্বদেশী সমাজ' গঠনের ইতিহাস জানা যায়।
37. নবান্ন নাটকটি কে রচনা করেন?
ক) বিজন ভট্টাচার্য
খ) দীনবন্ধু মিত্র
গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) গিরিশচন্দ্র ঘোষ
ব্যাখ্যা: ১৯৪৪ সালে অবিভক্ত বাংলার ভয়াবহ মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে বিজন ভট্টাচার্য 'নবান্ন' নাটকটি রচনা করেন। এটি শিল্প ও সংস্কৃতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
38. 'অ্যানালস্' (Annales) পত্রিকা কোথায় প্রকাশিত হয়?
ক) ব্রিটেনে
খ) জার্মানিতে
গ) ফ্রান্সে
ঘ) ইতালিতে
ব্যাখ্যা: ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে মার্ক ব্লক এবং লুসিয়েন ফেভার-এর উদ্যোগে 'অ্যানালস্' পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চায় বিপ্লব আনে।
39. ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থ কোনটি?
ক) রাজতরঙ্গিনী
খ) হর্ষচরিত
গ) রামায়ণ
ঘ) ইন্ডিকা
ব্যাখ্যা: কলহন রচিত 'রাজতরঙ্গিনী' কে ভারতের প্রথম প্রামাণ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ ধরা হয়। এতে কাশ্মীরের ইতিহাস বর্ণিত আছে।
40. রসগোল্লা আবিষ্কার কে করেন?
ক) নবীনচন্দ্র দাস
খ) কে. সি. দাস
গ) ভীম নাগ
ঘ) বলরাম মল্লিক
ব্যাখ্যা: খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসে জানা যায়, ১৮৬৮ সালে কলকাতার বাগবাজারের ময়রা নবীনচন্দ্র দাস প্রথম রসগোল্লা আবিষ্কার করেন।
41. 'শ্রীরামপুর মিশন প্রেস' কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৭৮০ সালে
খ) ১৮০০ সালে
গ) ১৮১৭ সালে
ঘ) ১৮৩৫ সালে
ব্যাখ্যা: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ডের উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।
42. নীলদর্পণ নাটকটি কবে প্রকাশিত হয়?
ক) ১৮৫৭ সালে
খ) ১৮৬০ সালে
গ) ১৮৭২ সালে
ঘ) ১৮৭৮ সালে
ব্যাখ্যা: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে দীনবন্ধু মিত্র রচিত 'নীলদর্পণ' নাটকটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এটি নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের প্রামাণ্য দলিল।
43. ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন কোনটি?
ক) ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি (জমিদার সভা)
খ) ভারত সভা
গ) জাতীয় কংগ্রেস
ঘ) বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি
ব্যাখ্যা: ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জমিদার সভা বা ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি হল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন।
44. হিন্দি সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক গায়ক কে ছিলেন?
ক) কুন্দন লাল সায়গল (K.L. Saigal)
খ) কিশোর কুমার
গ) মুকেশ
ঘ) মহম্মদ রফি
ব্যাখ্যা: চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কে. এল. সায়গল একজন কিংবদন্তি এবং তিনি প্রথম দিকের বিখ্যাত প্লেব্যাক গায়ক ছিলেন।
45. ভারতে প্রথম ডাকটিকিট কবে চালু হয়?
ক) ১৮৫২ সালে
খ) ১৮৫৪ সালে
গ) ১৮৫৬ সালে
ঘ) ১৮৬০ সালে
ব্যাখ্যা: যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে দেখা যায়, লর্ড ডালহৌসির আমলে ১৮৫৪ সালে ভারতে প্রথম ডাকটিকিট (Postage Stamp) চালু হয়।
46. মেয়েরা প্রথম কবে মোহনবাগান ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করে?
ক) ১৯১১ সালে
খ) ১৯৭০ সালে
গ) ১৯৭৫ সালে
ঘ) ১৯৭৭ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৭৭ সালে মেয়েরা প্রথম মোহনবাগান ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করে।
47. ইতিহাস চর্চায় 'বটতলা সাহিত্য' বলতে কী বোঝায়?
ক) উচ্চমার্গের সাহিত্য
খ) বটগাছের নীচে লেখা সাহিত্য
গ) সস্তায় ছাপা সাধারণ মানুষের পাঠ্য সাহিত্য
ঘ) ধর্মীয় সাহিত্য
ব্যাখ্যা: উনিশ শতকে কলকাতার বটতলা ও চিৎপুর অঞ্চলে সস্তা কাগজে সাধারণ মানুষের জন্য মুদ্রিত সাহিত্যকে 'বটতলা সাহিত্য' বলা হত, যা সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
48. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সরকারি নথিপত্র' এর একটি সীমাবদ্ধতা কী?
ক) এগুলি সহজে পাওয়া যায় না
খ) এগুলিতে কেবল সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়, সাধারণ মানুষের কথা থাকে না
গ) এগুলি সম্পূর্ণ মিথ্যা
ঘ) এগুলির ভাষা বোঝা যায় না
ব্যাখ্যা: সরকারি নথিপত্রগুলি পুলিশ বা সরকারি আধিকারিকরা তৈরি করতেন, তাই এতে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষপাতিত্ব থাকে। সাধারণ মানুষের আসল অবস্থা বা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এতে প্রতিফলিত হয় না।
49. কলকাতায় কবে প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়?
ক) ১৮৫৩ সালে
খ) ১৮৭৩ সালে
গ) ১৮৮০ সালে
ঘ) ১৯০২ সালে
ব্যাখ্যা: পরিবহণের ইতিহাসে ১৮৭৩ সালে কলকাতায় শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়।
50. কলকাতায় কবে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চালু হয়?
ক) ১৮৭৩ সালে
খ) ১৮৯৯ সালে
গ) ১৯০২ সালে
ঘ) ১৯১১ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯০২ সালে কলকাতায় এশিয়ার মধ্যে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা চালু হয়।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
40 টি1. নতুন সামাজিক ইতিহাস (New Social History) কী?
১৯৬০-এর দশক থেকে রাজা-মহারাজা বা অভিজাতদের পরিবর্তে সমাজের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক শ্রেণিকে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে, তাকে নতুন সামাজিক ইতিহাস বলে।
2. নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা (Subaltern Studies) বলতে কী বোঝো?
সমাজের একেবারে নীচুতলার মানুষ অর্থাৎ কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী ও দলিতদের অবদানকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালে রণজিৎ গুহর নেতৃত্বে যে ইতিহাস চর্চার সূত্রপাত হয়, তাকে নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা বা Subaltern Studies বলে।
3. অ্যানালস্ (Annales) গোষ্ঠী কোথায় এবং কেন গড়ে উঠেছিল?
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে মার্ক ব্লক এবং লুসিয়েন ফেভার-এর উদ্যোগে অ্যানালস্ গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রথাগত রাজনৈতিক ইতিহাসের বদলে সাধারণ মানুষ ও সমাজকে নিয়ে নতুন ধরনের ইতিহাস চর্চা করা।
4. খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস চর্চা গুরুত্বপূর্ণ কেন?
খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস থেকে কোনো দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ভোজ্য উপাদানের বিবর্তন, এবং ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব (যেমন পর্তুগিজদের আলু বা তামাক প্রচলন) সম্পর্কে জানা যায়।
5. ভারতে কারা আলুর প্রচলন করেছিল?
ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা ভারতে প্রথম আলু, টমেটো, লঙ্কা, তামাক, কাজুবাদাম ইত্যাদির প্রচলন করেছিল।
6. পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস চর্চা কেন প্রয়োজনীয়?
পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে কোনো নির্দিষ্ট যুগের মানুষের রুচি, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জলবায়ু সম্পর্কে ঐতিহাসিক ধারণা পাওয়া যায়।
7. খেলাধুলার ইতিহাস চর্চার দুটি গুরুত্ব লেখো।
১) খেলাধুলা মানুষের বিনোদন ও শারীরিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয়। ২) এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে (যেমন ১৯১১ সালে মোহনবাগানের শিল্ড জয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ ছিল)।
8. কলকাতায় 'ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব' কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব' (Calcutta Cricket Club) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এশিয়ার প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব।
9. মোহনবাগান ক্লাব কবে, কাকে হারিয়ে আই.এফ.এ. শিল্ড জয় করে?
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান ক্লাব ব্রিটিশদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আই.এফ.এ. (IFA) শিল্ড জয় করে।
10. চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব কী?
এই ইতিহাস থেকে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন মহামারির (ম্যালেরিয়া, প্লেগ) প্রাদুর্ভাব, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, এবং সমাজে তার প্রভাব সম্পর্কে জানা যায়।
11. ফটোগ্রাফির ইতিহাস চর্চা গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্র ইতিহাসের এক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য দৃশ্যমান দলিল। এটি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার হুবহু ও অপরিবর্তিত রূপ তুলে ধরে, যা লিখিত উপাদানের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণ্য।
12. ভারতে কবে ফটোগ্রাফির সূচনা হয়?
১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বে ফটোগ্রাফির সূচনা হয় এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারতে ফটোগ্রাফির ব্যবহার শুরু হয়।
13. পরিবেশের ইতিহাস (Environmental History) বলতে কী বোঝো?
মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক, অরণ্য ধ্বংসের প্রভাব, এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন (যেমন চিপকো বা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন) নিয়ে যে ইতিহাস চর্চা করা হয়, তাকে পরিবেশের ইতিহাস বলে।
14. পরিবেশের ইতিহাস চর্চার ওপর লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম লেখো।
১) অ্যালফ্রেড ক্রসবির লেখা 'Ecological Imperialism'। ২) রামচন্দ্র গুহ ও মাধব গ্যাডগিলের লেখা 'The Fissured Land'।
15. নারী ইতিহাস (Women's History) চর্চা কী?
সমাজে নারীদের অবস্থান, তাদের ওপর বঞ্চনা, এবং অধিকার আদায়ের জন্য নারীদের দীর্ঘ লড়াই ও আন্দোলন নিয়ে যে ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে (বিশেষত ১৯৭০-এর দশক থেকে), তাকে নারী ইতিহাস বলে।
16. নারী ইতিহাস চর্চার ওপর লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের নাম লেখো।
সিমোন দ্য বোভেয়ার রচিত 'দি সেকেন্ড সেক্স' (The Second Sex - ১৯৪৯) নারী ইতিহাস চর্চার একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ।
17. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'আত্মজীবনী' ও 'স্মৃতিকথা'র গুরুত্ব কী?
আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথায় লেখকের নিজের জীবনের পাশাপাশি সমসাময়িক যুগের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবস্থার এক জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ বিবরণ পাওয়া যায়, যা ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।
18. 'জীবনস্মৃতি' কার লেখা? এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আত্মজীবনী হল 'জীবনস্মৃতি'। এখান থেকে উনিশ শতকের জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের পরিবেশ, হিন্দু মেলার আয়োজন এবং স্বদেশি আন্দোলনের নানা তথ্য জানা যায়।
19. 'জীবনের ঝরাপাতা' কার লেখা? এটি কোথায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
সরলাদেবী চৌধুরানির লেখা আত্মজীবনী হল 'জীবনের ঝরাপাতা'। এটি ১৯৪৪ সালে 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
20. 'জীবনের ঝরাপাতা' থেকে আমরা কী ঐতিহাসিক তথ্য পাই?
এই গ্রন্থ থেকে বাংলার যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সরলাদেবী কর্তৃক 'বীরাষ্টমী ব্রত' ও 'প্রতাপাদিত্য উৎসব' চালুর কথা এবং ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহলের অনেক অজানা তথ্য জানা যায়।
21. 'সত্তর বৎসর' কার আত্মজীবনী? এটি কোথায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী হল 'সত্তর বৎসর'। এটি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
22. 'সত্তর বৎসর' গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
বিপিনচন্দ্র পালের এই আত্মজীবনী থেকে উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজ, কলকাতার ব্রাহ্মসমাজের কার্যকলাপ, এবং সর্বোপরি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের এক নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়।
23. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'চিঠিপত্র' (Letters) এর গুরুত্ব কী?
বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা চিঠিপত্র থেকে অনেক গোপন ও ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের এমন অনেক অজানা কথা জানা যায়, যা সরকারি নথিতে থাকে না।
24. নেহরু তাঁর কন্যা ইন্দিরাকে যে চিঠিগুলি লিখেছিলেন, তার মূল বিষয়বস্তু কী ছিল?
১৯২৮ সালে জওহরলাল নেহরু তাঁর দশ বছরের কন্যা ইন্দিরাকে ৩০টি চিঠি লেখেন। এতে পৃথিবীর সৃষ্টি, মানবসভ্যতার বিবর্তন, সমাজ গঠন এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছিল।
25. নেহরুর চিঠিগুলি কে হিন্দিতে অনুবাদ করেন এবং কী নামে প্রকাশ করেন?
বিখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদ নেহরুর চিঠিগুলিকে হিন্দিতে অনুবাদ করেন এবং 'পিতা কে পত্র পুত্রী কে নাম' শিরোনামে প্রকাশ করেন।
26. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সরকারি নথিপত্র' (Official Records) বলতে কী বোঝো?
ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন আদেশনামা, চিঠিপত্র, গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট, পুলিশের ডায়েরি, এবং সেনসাস রিপোর্টকে সরকারি নথিপত্র বলে। এগুলি ন্যাশনাল আর্কাইভে সংরক্ষিত থাকে।
27. সরকারি নথিপত্রের একটি বড়ো সীমাবদ্ধতা কী?
সরকারি নথিপত্রগুলি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা হত। তাই এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা বা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রকৃত সত্য প্রায়ই গোপন করা হত বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হত।
28. সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের মধ্যে পার্থক্য কী?
সংবাদপত্র সাধারণত প্রতিদিন (Daily) বা সপ্তাহে প্রকাশিত হয় এবং এতে দৈনন্দিন খবর বেশি থাকে। কিন্তু সাময়িকপত্র একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর (মাসিক বা পাক্ষিক) প্রকাশিত হয় এবং এতে খবরের বদলে প্রবন্ধ ও সাহিত্য বেশি থাকে।
29. 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা কবে, কার সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি প্রতি সোমবার প্রকাশিত হত।
30. 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
এটি ছিল প্রথম বাংলা রাজনৈতিক সংবাদপত্র। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, জমিদারদের শোষণ এবং ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির তীব্র সমালোচনা করে এই পত্রিকা জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।
31. লর্ড লিটনের 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' (১৮৭৮) এর প্রধান লক্ষ্য কোন্ পত্রিকা ছিল?
লর্ড লিটনের 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' (Vernacular Press Act)-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার কণ্ঠস্বর রোধ করা, কারণ এই পত্রিকা নির্ভীকভাবে সরকারের সমালোচনা করত।
32. 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা কবে, কার সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি ছিল একটি মাসিক সাময়িকপত্র।
33. 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
উনিশ শতকে বাঙালির জাতীয়তাবাদ উন্মেষে 'বঙ্গদর্শন' এর ভূমিকা অসীম। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস 'আনন্দমঠ' এবং 'বন্দে মাতরম্' সংগীত এই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়ে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
34. ভারতের প্রথম নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্র দুটির নাম লেখো।
ভারতের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র হল দাদাসাহেব ফালকে পরিচালিত 'রাজা হরিশচন্দ্র' (১৯১৩)। এবং প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হল আরদেশির ইরানির 'আলম আরা' (১৯৩১)।
35. স্থানীয় ইতিহাস (Local History) চর্চা কী?
জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইতিহাসের বদলে কোনো নির্দিষ্ট ছোটো এলাকার (গ্রাম, শহর বা জেলা) উৎপত্তি, লোকসংস্কৃতি, স্থাপত্য ও জনজীবন নিয়ে যে ইতিহাস চর্চা করা হয়, তাকে স্থানীয় ইতিহাস বলে।
36. স্থানীয় ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব কী?
জাতীয় ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় স্তরের ছোটো কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলি বাদ পড়ে যায়। স্থানীয় ইতিহাস সেই ফাঁক পূরণ করে এবং জাতীয় ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে।
37. শহরের ইতিহাস চর্চা কেন প্রয়োজনীয়?
শহরের ইতিহাস থেকে প্রাচীন নগরায়ণের বিবর্তন, শহরের আর্থ-সামাজিক কাঠামো, স্থাপত্যশৈলী এবং আধুনিক নাগরিক সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
38. স্থাপত্যের ইতিহাস চর্চার একটি গুরুত্ব লেখো।
স্থাপত্য (মঠ, মন্দির, অট্টালিকা) থেকে কোনো নির্দিষ্ট যুগের কারিগরি দক্ষতা, শিল্পরীতি, রাজাদের আর্থিক অবস্থা এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
39. শিল্পচর্চার ইতিহাস (History of Art) বলতে কী বোঝো?
শিল্পকলা অর্থাৎ সংগীত, নৃত্য, নাটক এবং চিত্রকলা কীভাবে যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে এবং তা কীভাবে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে, তার ইতিহাস চর্চাকে শিল্পচর্চার ইতিহাস বলে।
40. আধুনিক ইতিহাস চর্চার প্রধান উপাদানগুলি কী কী?
আধুনিক ইতিহাস চর্চার প্রধান উপাদানগুলি হল— সরকারি নথিপত্র, আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা, চিঠিপত্র, সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র, এবং ফটোগ্রাফ ও চলচ্চিত্র।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
14 টি1. আধুনিক ইতিহাস চর্চায় 'নতুন সামাজিক ইতিহাস' (New Social History) এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব:
১৯৬০-এর দশকে প্রথাগত রাজনৈতিক ইতিহাসের বৃত্ত ভেঙে যে নতুন ধরনের ইতিহাস চর্চার সূত্রপাত হয়, তাকে নতুন সামাজিক ইতিহাস বলে। এর গুরুত্বগুলি হল:
- আমজনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ: আগে ইতিহাস মানেই ছিল রাজা-মহারাজা, যুদ্ধবিগ্রহ বা অভিজাত শ্রেণির কাহিনি। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাসে সমাজের সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী এবং প্রান্তিক শ্রেণিকে ইতিহাসের মূল কারিগর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
- বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি: এই ইতিহাসে কেবল রাজনীতি নয়, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং পরিবেশকেও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
- নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা (Subaltern Studies): নতুন সামাজিক ইতিহাসের হাত ধরেই রণজিৎ গুহ, সুমিত সরকার প্রমুখের উদ্যোগে নীচুতলার মানুষদের নিয়ে 'নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা' শুরু হয়, যা ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছে।
- ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ: সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কথা যুক্ত হওয়ায় ইতিহাস আর একপেশে নেই, বরং তা সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তব দর্পণে পরিণত হয়েছে।
2. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'আত্মজীবনী' (Autobiography) ও 'স্মৃতিকথা' (Memoirs) এর গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা লেখো।
আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব:
কোনো ব্যক্তি যখন তাঁর নিজের জীবনের নানা ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন তখন তাকে আত্মজীবনী বলে। আর যখন পুরোনো দিনের স্মৃতি থেকে কোনো বিশেষ ঘটনার কথা লেখেন, তখন তাকে স্মৃতিকথা বলে। এর গুরুত্বগুলি হল:
- প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা: লেখক নিজে সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় তাঁর লেখা বিবরণ থেকে সমসাময়িক যুগের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক জীবন্ত ছবি পাওয়া যায়।
- অজানা তথ্যের উদ্ঘাটন: সরকারি নথিতে অনেক সময় আসল সত্য গোপন করা হয়। কিন্তু আত্মজীবনীতে লেখক নির্ভীকভাবে এমন অনেক গোপন তথ্য তুলে ধরেন যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
- উদাহরণ: বিপিনচন্দ্র পালের 'সত্তর বৎসর' থেকে স্বদেশি আন্দোলনের রূপরেখা এবং সরলাদেবী চৌধুরানির 'জীবনের ঝরাপাতা' থেকে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল ও বীরাষ্টমী ব্রতের কথা জানা যায়।
সীমাবদ্ধতা:
- ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও পক্ষপাতিত্ব: আত্মজীবনীতে অনেক সময় লেখকের নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত আবেগ প্রতিফলিত হয়, ফলে তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নাও হতে পারে।
- স্মৃতির অস্পষ্টতা: স্মৃতিকথা অনেক বছর পর লেখা হয় বলে লেখকের স্মৃতিভ্রম ঘটতে পারে বা অনেক তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। তাই অন্যান্য উপাদানের সাথে মিলিয়ে এর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
3. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরলাদেবী চৌধুরানির 'জীবনের ঝরাপাতা' গ্রন্থটির গুরুত্ব আলোচনা করো।
'জীবনের ঝরাপাতা' গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
সরলাদেবী চৌধুরানি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নি এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম নেত্রী। ১৯৪৪ সালে 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী 'জীবনের ঝরাপাতা' আধুনিক ভারতের ইতিহাসের এক অসামান্য দলিল। এর গুরুত্বগুলি হল:
- ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহলের চিত্র: এই গ্রন্থ থেকে উনিশ শতকের শেষদিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, মেয়েদের শিক্ষা, অবরোধ প্রথা এবং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের এক নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়।
- স্বদেশি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার যুবসমাজ কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার প্রত্যক্ষ বিবরণ এখানে রয়েছে।
- যুবসমাজকে সংগঠিত করা: সরলাদেবী বাংলার যুবকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাতে মহারাষ্ট্রের শিবাজি উৎসবের অনুকরণে বাংলায় 'প্রতাপাদিত্য উৎসব', 'উদয়াদিত্য উৎসব' এবং 'বীরাষ্টমী ব্রত' চালু করেছিলেন। এই গ্রন্থে তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
- বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি: সমকালীন যুগের বিভিন্ন বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি (যেমন সুহৃদ সমিতি) এবং বিপ্লবীদের কার্যকলাপের অনেক অজানা তথ্য 'জীবনের ঝরাপাতা' থেকে পাওয়া যায়। তাই নারী ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে এই গ্রন্থটি অমূল্য।
4. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বিপিনচন্দ্র পালের 'সত্তর বৎসর' গ্রন্থের গুরুত্ব লেখো।
'সত্তর বৎসর' গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান নেতা (লাল-বাল-পাল এর 'পাল') বিপিনচন্দ্র পালের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হল 'সত্তর বৎসর'। এটি 'প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এর গুরুত্বগুলি নিম্নরূপ:
- উনিশ শতকের বাংলার সমাজচিত্র: এই গ্রন্থ থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীহট্ট (সিলেট) জেলার গ্রামীণ সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, এবং হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে গভীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায়।
- ব্রাহ্মসমাজের সংস্কার আন্দোলন: লেখক নিজে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাই তৎকালীন কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন এবং সমাজপতিদের সাথে তাঁদের সংঘাতের কথা এই বইতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
- স্বদেশি যুগের উন্মাদনা: বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেতা। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কীভাবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ এবং তিনি নিজে সারা বাংলায় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তার জীবন্ত ইতিহাস 'সত্তর বৎসর' এ পাওয়া যায়।
- জাতীয়তাবাদের বিকাশ: কীভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল এবং নরমপন্থী রাজনীতি থেকে কীভাবে চরমপন্থী রাজনীতির উদ্ভব ঘটল, তা বোঝার জন্য এই আত্মজীবনী একটি অত্যন্ত প্রামাণ্য উপাদান।
5. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
'জীবনস্মৃতি' গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী 'জীবনস্মৃতি' শুধুমাত্র একটি সাহিত্যিক দলিল নয়, এটি আধুনিক বাংলার ইতিহাস রচনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান:
- ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ ও শিক্ষা: এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছোটোবেলার কথা, ঠাকুরবাড়ির কড়া শাসন, সেকালের গৃহশিক্ষকদের পড়ানোর পদ্ধতি এবং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের চিত্র চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
- জাতীয়তাবোধের উন্মেষ: কীভাবে তাঁদের পরিবারে ধীরে ধীরে দেশপ্রেমের বীজ রোপিত হচ্ছিল, তা এই বই থেকে জানা যায়। নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে আয়োজিত 'হিন্দু মেলা' বা চৈত্র মেলায় কিশোর রবীন্দ্রনাথের যোগদান এবং স্বরচিত কবিতা পাঠের বিবরণ এতে রয়েছে।
- স্বদেশী উদ্যোগ: বিদেশি জিনিসের পরিবর্তে দেশি জিনিস ব্যবহারের তাগিদে ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগে 'স্বদেশী ভাণ্ডার' স্থাপন এবং 'সঞ্জীবনী সভা' নামক গুপ্ত সমিতি গঠনের অনেক অজানা তথ্য এখান থেকে পাওয়া যায়।
- তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পরিচয়: 'জীবনস্মৃতি' পড়লে উনিশ শতকের বাংলার অনেক দিকপাল ব্যক্তি যেমন— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখের চরিত্র ও কার্যকলাপ সম্পর্কে ঐতিহাসিক ধারণা পাওয়া যায়।
6. ইতিহাস চর্চায় জওহরলাল নেহরুর লেখা 'চিঠিপত্র' (Letters from a Father to his Daughter) এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
নেহরুর চিঠিপত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১৯২৮ সালের গ্রীষ্মকালে জওহরলাল নেহরু এলাহাবাদ থেকে তাঁর দশ বছরের কন্যা ইন্দিরাকে (যিনি তখন মুসৌরিতে ছিলেন) পৃথিবীর ইতিহাস ও সভ্যতার বিবর্তন নিয়ে পরপর ৩০টি চিঠি লেখেন। এর গুরুত্বগুলি হল:
- সভ্যতার বিবর্তনের সরল পাঠ: নেহরু অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় এই চিঠিগুলিতে বুঝিয়েছিলেন কীভাবে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে মানুষ পশুপালন ও কৃষিকাজ শিখল এবং কীভাবে ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটল। এটি সামাজিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
- আর্যদের আগমন ও প্রাচীন ভারত: ভারতে আর্যদের আগমন, তাদের ভাষা, রামায়ণ-মহাভারতের যুগের সমাজ ব্যবস্থা এবং প্রাচীন ভারতের বর্ণাশ্রম প্রথার এক সুন্দর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এই চিঠিগুলিতে পাওয়া যায়।
- পিতৃসুলভ দায়িত্ব ও দেশপ্রেম: এই চিঠিগুলির মাধ্যমে নেহরু তাঁর কন্যা ইন্দিরার মনে শুধু জ্ঞানই নয়, এক গভীর দেশপ্রেম এবং বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি (Internationalism) তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
- হিন্দি অনুবাদ: এই চিঠিগুলির ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য অনুধাবন করে প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদ একে 'পিতা কে পত্র পুত্রী কে নাম' শিরোনামে হিন্দিতে অনুবাদ করেন, যা আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
7. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সরকারি নথিপত্র' (Official Records) এর গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা লেখো।
সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব:
ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন সরকারি আদেশনামা, চিঠিপত্র, গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট, পুলিশের ডায়েরি এবং সেনসাস রিপোর্টকে সরকারি নথিপত্র বলে। এগুলি ন্যাশনাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। এর গুরুত্ব হল:
- প্রশাসনিক তথ্য: ব্রিটিশ সরকার কীভাবে ভারত শাসন করত, তাদের ভূমিরাজস্ব নীতি, দমনমূলক আইন এবং শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর নিখুঁত বিবরণ এই নথিপত্র থেকে পাওয়া যায়।
- বিদ্রোহের বিবরণ: নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীরা কীভাবে সংঘবদ্ধ হচ্ছিল এবং ব্রিটিশ সরকার কীভাবে তা দমন করেছিল, তার দিনলিপি পুলিশের রিপোর্ট থেকে জানা যায়।
- বিপ্লবীদের কার্যকলাপ: ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের (IB) গোপন রিপোর্ট থেকে সমকালীন ভারতের বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি এবং বিপ্লবীদের কার্যকলাপের অনেক অজানা তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।
সীমাবদ্ধতা:
- ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গি ও পক্ষপাতিত্ব: সরকারি নথিপত্রগুলি ব্রিটিশ আমলারা তৈরি করতেন। তাই এতে সবসময় সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া হত এবং ভারতীয়দের আন্দোলনকে ছোটো বা বিকৃত করে দেখানো হত।
- সাধারণ মানুষের কথার অভাব: এই নথিতে সমাজের নীচুতলার সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা, তাদের যন্ত্রণা বা দৃষ্টিভঙ্গির কোনো প্রতিফলন থাকে না। তাই সরকারি নথিপত্রকে সম্পূর্ণ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না।
8. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার গুরুত্ব আলোচনা করো।
'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় মাসিক সাময়িকপত্র 'বঙ্গদর্শন' প্রথম প্রকাশিত হয়। উনিশ শতকে বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও মনন গঠনে এর ভূমিকা অপরিসীম:
- জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা ছিল পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী মুখপত্র। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত প্রবন্ধগুলি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে শিক্ষিত বাঙালির মনে গভীর দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধ জাগিয়ে তুলেছিল।
- 'বন্দে মাতরম্' ও আনন্দমঠ: ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের প্রধান মন্ত্র 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় লেখা বিখ্যাত উপন্যাস 'আনন্দমঠ' প্রথম এই পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
- কৃষক দরদী দৃষ্টিভঙ্গি: এই পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রবন্ধে বাংলার জমিদারদের শোষণ ও কৃষকদের চরম দুর্দশার কথা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছিলেন, যা আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল।
- বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি: ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব—সব ধরনের গুরুগম্ভীর বিষয়কে মাতৃভাষা বাংলায় প্রকাশ করে 'বঙ্গদর্শন' বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, 'বঙ্গদর্শন' যেন আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টির মতো বাঙালির মনে প্রাণসঞ্চার করেছিল।
9. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার গুরুত্ব আলোচনা করো।
'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় ও দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সোমপ্রকাশ' প্রকাশিত হয়। এটি ছিল বাংলার প্রথম রাজনৈতিক পত্রিকা। এর গুরুত্বগুলি হল:
- নীলচাষিদের পক্ষে সওয়াল: সোমপ্রকাশ পত্রিকা অত্যন্ত নির্ভীকভাবে ব্রিটিশ নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার এবং শোষণের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরেছিল। নীল বিদ্রোহকে সমর্থন করে এই পত্রিকা নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখত।
- জমিদার ও মহাজনদের সমালোচনা: শুধু ইংরেজরাই নয়, দেশীয় জমিদার ও মহাজনরা কীভাবে সাধারণ গরিব কৃষকদের শোষণ করত, তার বিরুদ্ধেও সোমপ্রকাশ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
- সামাজিক সংস্কার: বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনকে সমর্থন করা এবং বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও কৌলীন্য প্রথার মতো সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই পত্রিকা জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।
- লর্ড লিটনের রোষানল: সোমপ্রকাশের তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী সমালোচনার কারণে লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' (Vernacular Press Act) পাস করে এই পত্রিকার কণ্ঠস্বর রোধ করার চেষ্টা করেন। এর ফলে এক বছর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ ছিল। এই ঘটনা পত্রিকাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রমাণ করে।
10. আধুনিক ইতিহাস চর্চায় 'ফটোগ্রাফি' (Photography) বা আলোকচিত্রের গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা লেখো।
ফটোগ্রাফির ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফটোগ্রাফির আবিষ্কার ইতিহাস চর্চার জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে:
- নির্ভুল ও প্রামাণ্য দলিল: মানুষের লেখা বিবরণ বা আঁকা ছবিতে পক্ষপাতিত্ব বা অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু ক্যামেরার লেন্স কোনো ঘটনার হুবহু ও অপরিবর্তিত দৃশ্য ধরে রাখে। তাই ফটোগ্রাফ ইতিহাসের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য দৃশ্যমান দলিল।
- ঐতিহাসিক ঘটনার বাস্তব চিত্র: সিপাহি বিদ্রোহের ভয়াবহতা, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাযজ্ঞ, বা দেশভাগের সময়ের মর্মান্তিক শরণার্থীদের ছবি দেখলে সেই সময়কার ঘটনার বাস্তব ভয়াবহতা ও সত্যতা সরাসরি উপলব্ধি করা যায়।
- সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র: পুরোনো ফটোগ্রাফ থেকে তৎকালীন মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, স্থাপত্য, যানবহন এবং জীবনযাত্রার অনেক ছোটোখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
সীমাবদ্ধতা:
- অসম্পূর্ণ তথ্য: একটি ছবি কেবল একটি মুহূর্তের দৃশ্য তুলে ধরে। ঘটনার পেছনের কারণ বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ছবি থেকে জানা সম্ভব নয়।
- বিকৃতির সম্ভাবনা: আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে (Photoshop) ছবিকে এডিট করে বা বিকৃত করে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করার সম্ভাবনা থাকে, যা ইতিহাসের সত্যতাকে বিপন্ন করতে পারে। তাই ছবির সত্যতা যাচাই করা অপরিহার্য।
11. পরিবেশের ইতিহাস চর্চা (Environmental History) বলতে কী বোঝো? এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
পরিবেশের ইতিহাস চর্চা:
১৯৭০-এর দশক থেকে মানবসমাজের সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্ক, পরিবেশের অবক্ষয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য মানুষের আন্দোলন নিয়ে যে নতুন ধরনের ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে, তাকে পরিবেশের ইতিহাস বলে।
পরিবেশ ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব:
- প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক: যুগে যুগে মানুষ কীভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সভ্যতা গড়ে তুলেছে এবং আধুনিক যুগে শিল্পায়নের ফলে কীভাবে সেই প্রকৃতির চরম বিনাশ ঘটাচ্ছে, তা এই ইতিহাস থেকে জানা যায়।
- ঔপনিবেশিক অরণ্য নীতি: ব্রিটিশরা ভারতে এসে কীভাবে রেলপথ তৈরি ও জাহাজের শিল্পের জন্য ভারতের বিস্তীর্ণ বনভূমি ধ্বংস করেছিল এবং আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তার প্রামাণ্য ইতিহাস এখান থেকে পাওয়া যায়।
- পরিবেশ আন্দোলন: পরিবেশ রক্ষার তাগিদে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যেমন— চিপকো আন্দোলন (হিমালয় অঞ্চল), আপ্পিকো আন্দোলন (দক্ষিণ ভারত), এবং নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস এর অন্তর্ভুক্ত।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: বর্তমান বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সমাজকে সতর্ক করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে পরিবেশের ইতিহাস চর্চা অত্যন্ত জরুরি। (অ্যালফ্রেড ক্রসবির 'Ecological Imperialism' একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ)।
12. ইতিহাস চর্চায় 'নারী ইতিহাস' (Women's History) এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
নারী ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব:
ঐতিহ্যগত ইতিহাসে নারীদের অবদানকে চিরকালই উপেক্ষা করা হয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে সমাজে নারীদের অবস্থান ও অবদানকে কেন্দ্র করে যে 'নারী ইতিহাস' চর্চা শুরু হয়েছে, তার গুরুত্ব অপরিসীম:
- অবদানের স্বীকৃতি: প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সমাজ সংস্কার এবং শিল্প-সাহিত্যে নারীদের অসামান্য অবদানকে (যা আগে আড়ালে ছিল) এই ইতিহাস চর্চা জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।
- বঞ্চনার ইতিহাস উদ্ঘাটন: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা যুগ যুগ ধরে কীভাবে অবহেলিত ও শোষিত হয়েছে, বাল্যবিবাহ, সতীদাহ বা অবরোধ প্রথার মতো অমানবিক প্রথার শিকার হয়েছে, তার বাস্তব চিত্র নারী ইতিহাসে ফুটে উঠেছে।
- অধিকার আদায়ের লড়াই: শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার এবং ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য নারীরা কীভাবে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে এবং নারীবাদী আন্দোলনগুলি কীভাবে গড়ে উঠেছে, তা নারী ইতিহাসের একটি মূল আলোচ্য বিষয়।
- ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ: সমাজের অর্ধেক অংশ নারী। তাই নারীদের বাদ দিয়ে কোনো দেশের ইতিহাস সম্পূর্ণ হতে পারে না। নারী ইতিহাস চর্চার ফলে ইতিহাস আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক রূপ লাভ করেছে। (সিমোন দ্য বোভেয়ারের 'The Second Sex' একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ)।
13. খেলাধুলার ইতিহাস (History of Sports) চর্চার প্রয়োজনীয়তাগুলি আলোচনা করো।
খেলাধুলার ইতিহাস চর্চার প্রয়োজনীয়তা:
খেলাধুলা মানুষের বিনোদনের একটি মাধ্যম হলেও আধুনিক ইতিহাস চর্চায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এর প্রয়োজনীয়তাগুলি হল:
- জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের বিকাশ: পরাধীন ভারতে খেলাধুলা কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার। ১৯১১ সালে খালি পায়ে খেলে মোহনবাগান যখন বুট-পরা ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে আই.এফ.এ. শিল্ড জয় করে, তখন তা সারা দেশে অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিল।
- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: কোনো দেশের প্রচলিত খেলাধুলা থেকে সেই দেশের মানুষের শারীরিক গঠন, মানসিকতা, আবহাওয়া এবং সামাজিক বিনোদনের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন— ভারতের কুস্তি বা কাবাডি।
- সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব: ক্রিকেট, ফুটবল, হকি প্রভৃতি খেলার উৎপত্তি ইউরোপে হলেও ব্রিটিশরা কীভাবে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে এই খেলাগুলিকে ভারতে ছড়িয়ে দিয়েছিল (Cultural Imperialism), তা খেলাধুলার ইতিহাস থেকে জানা যায়।
- বর্ণবৈষম্য ও লিঙ্গবৈষম্য: খেলাধুলার মাঠে কালো ও সাদা চামড়ার ভেদাভেদ (যেমন দক্ষিণ আফ্রিকায়) এবং নারীদের অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের ইতিহাস খেলাধুলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
14. স্থানীয় ইতিহাস (Local History) এবং শহরের ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব লেখো।
স্থানীয় ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব:
জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইতিহাসের বদলে কোনো নির্দিষ্ট ছোটো এলাকার (গ্রাম বা জেলা) উৎপত্তি ও জনজীবন নিয়ে ইতিহাস চর্চাকে স্থানীয় ইতিহাস বলে। এর গুরুত্ব হল:
- ফাঁক পূরণ: বৃহৎ জাতীয় ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় স্তরের ছোটো কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বা বীরদের কথা বাদ পড়ে যায়। স্থানীয় ইতিহাস সেই ফাঁক পূরণ করে।
- লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ: কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা, পোশাক, উৎসব, লোকগীতি এবং স্থাপত্যের নিখুঁত বিবরণ স্থানীয় ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকে, যা জাতীয় ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। (যেমন কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী' কাশ্মীরের স্থানীয় ইতিহাস)।
শহরের ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব:
শহরের ইতিহাস থেকে প্রাচীন নগরায়ণের বিবর্তন ও আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায়:
- নগরায়ণের বিবর্তন: একটি ছোটো গ্রাম কীভাবে বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর ভর করে ধীরে ধীরে একটি মেগাসিটিতে (যেমন কলকাতা বা মুম্বাই) রূপান্তরিত হয়, তার ধারাবাহিক ইতিহাস জানা যায়।
- ঔপনিবেশিক শহরের বিকাশ: ব্রিটিশরা তাদের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার্থে কীভাবে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজের মতো শহরগুলি গড়ে তুলেছিল, তা শহরের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়।
মনে রেখো!
আত্মজীবনী: রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি, বিপিনচন্দ্র পালের সত্তর বৎসর, সরলাদেবীর জীবনের ঝরাপাতা।
পত্রিকা: ১৮৫৮ সালে সোমপ্রকাশ (প্রথম রাজনৈতিক) এবং ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হয়।
নিম্নবর্গের ইতিহাস: সাধারণ মানুষকে নিয়ে ইতিহাস চর্চা, প্রধান প্রবক্তা রণজিৎ গুহ।
প্রথম চলচ্চিত্র: রাজা হরিশচন্দ্র (নির্বাক) এবং আলম আরা (সবাক)।