Chapter 8: উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত (১৯৪৭-৬৪)
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 60 MCQ | 40 SAQ | 10 Broad Questions
দেশীয় রাজ্য সংযুক্তি কাশ্মীর ও হায়দরাবাদ উদ্বাস্তু সমস্যা ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন সংবিধান
দেশীয় রাজ্য ও উদ্বাস্তু
সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা, কাশ্মীর, জুনাগড়, হায়দরাবাদ এবং দিল্লি চুক্তি
রাজ্য পুনর্গঠন
অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন, রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (SRC) এবং সরকারি ভাষা বিতর্ক
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
60 টি1. ভারত কবে স্বাধীনতা লাভ করে?
ক) ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট
খ) ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট
গ) ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি
ঘ) ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট
ব্যাখ্যা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
2. স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?
ক) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
খ) চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
ব্যাখ্যা: স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন।
3. স্বাধীন ভারতের প্রথম ও শেষ ভারতীয় গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?
ক) ড. বি. আর. আম্বেদকর
খ) চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
ব্যাখ্যা: চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী (C. Rajagopalachari) ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম এবং শেষ ভারতীয় গভর্নর জেনারেল।
4. স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?
ক) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
খ) মহাত্মা গান্ধী
গ) পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু
ঘ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
ব্যাখ্যা: পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
5. ভারতের সংবিধান কবে গণপরিষদ দ্বারা গৃহীত বা অনুমোদিত হয়?
ক) ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট
খ) ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর
গ) ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি
ঘ) ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি
ব্যাখ্যা: ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর ভারতের সংবিধান গণপরিষদ (Constituent Assembly) দ্বারা গৃহীত বা অনুমোদিত হয়।
6. ভারতের সংবিধান কবে কার্যকর (বলবৎ) হয়?
ক) ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর
খ) ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি
গ) ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট
ঘ) ১৯৫১ সালের ১৫ আগস্ট
ব্যাখ্যা: ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় প্রজাতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নতুন সংবিধান কার্যকর হয়।
7. ভারতীয় সংবিধানের খসড়া কমিটির (Drafting Committee) চেয়ারম্যান কে ছিলেন?
ক) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
খ) ড. বি. আর. আম্বেদকর
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) বি. এন. রাও
ব্যাখ্যা: ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ছিলেন সংবিধানের খসড়া রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির চেয়ারম্যান এবং ভারতীয় সংবিধানের রূপকার।
8. স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি (President) কে ছিলেন?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী
গ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
ঘ) ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ
ব্যাখ্যা: ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
9. স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতে প্রায় কতগুলি দেশীয় রাজ্য (Princely States) ছিল?
ক) ৩০০ টির বেশি
খ) ৪০০ টির বেশি
গ) ৫৬৫ টি
ঘ) ৭০০ টি
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাইরে প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য ছিল, যেগুলি ব্রিটিশদের পরোক্ষ অধীনে রাজা বা নবাবদের দ্বারা শাসিত হত।
10. দেশীয় রাজ্য দপ্তরের (States Department) প্রথম প্রধান বা মন্ত্রী কে ছিলেন?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
গ) ভি. পি. মেনন
ঘ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
ব্যাখ্যা: ১৯৪৭ সালের ৫ জুলাই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে 'দেশীয় রাজ্য দপ্তর' গঠিত হয় দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।
11. দেশীয় রাজ্য দপ্তরের সচিব (Secretary) কে ছিলেন?
ক) ভি. পি. মেনন
খ) সর্দার প্যাটেল
গ) মাউন্টব্যাটেন
ঘ) বি. এন. রাও
ব্যাখ্যা: ভি. পি. মেনন (V. P. Menon) ছিলেন দেশীয় রাজ্য দপ্তরের সচিব। তিনি প্যাটেলের ডানহাত হিসেবে কাজ করেছিলেন।
12. কাকে ভারতের 'লৌহমানব' (Iron Man of India) বলা হয়?
ক) জওহরলাল নেহরু
খ) সুভাষচন্দ্র বসু
গ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
ঘ) ভগৎ সিং
ব্যাখ্যা: কঠোর হাতে ও কূটনীতির মাধ্যমে ভারতের ৫ শতাধিক দেশীয় রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ভারতের লৌহমানব বলা হয়।
13. কাকে ভারতের 'বিসমার্ক' (Bismarck of India) বলা হয়?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
গ) ভি. পি. মেনন
ঘ) রাজা হরি সিং
ব্যাখ্যা: জার্মানির একত্রীকরণে বিসমার্ক যেমন ভূমিকা নিয়েছিলেন, স্বাধীন ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্যাটেল একইরকম ভূমিকা নেওয়ায় তাঁকে ভারতের বিসমার্ক বলা হয়।
14. দেশীয় রাজারা ভারতভুক্তির জন্য যে দলিলে স্বাক্ষর করতেন, তার নাম কী ছিল?
ক) Treaty of Peace
খ) Instrument of Accession
গ) Standstill Agreement
ঘ) Delhi Pact
ব্যাখ্যা: ভারতভুক্তির জন্য দেশীয় রাজ্যগুলিকে একটি আইনি দলিলে স্বাক্ষর করতে হত, যার নাম ছিল 'Instrument of Accession' (ভারতভুক্তির দলিল)।
15. কোন তিনটি দেশীয় রাজ্য প্রথমে ভারতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিল?
ক) কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, মহীশূর
খ) জুনাগড়, কাশ্মীর, হায়দরাবাদ
গ) ত্রিবাঙ্কুর, ভোপাল, জোধপুর
ঘ) গোয়ালিয়র, বরোদা, কাশ্মীর
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার পর জুনাগড়, কাশ্মীর এবং হায়দরাবাদ—এই তিনটি রাজ্য ভারতে যোগ দিতে তীব্র আপত্তি জানায় এবং স্বাধীন থাকার বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করে।
16. কাশ্মীরের মহারাজা কে ছিলেন?
ক) হরি সিং
খ) উসমান আলি খান
গ) মহব্বত খান
ঘ) শেখ আবদুল্লা
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার সময় জম্মু ও কাশ্মীরের হিন্দু রাজা ছিলেন মহারাজা হরি সিং।
17. কাশ্মীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল কনফারেন্স' এর নেতা কে ছিলেন?
ক) মহারাজা হরি সিং
খ) মেহেরচাঁদ মহাজন
গ) শেখ আবদুল্লা
ঘ) লিয়াকত আলি খান
ব্যাখ্যা: কাশ্মীরের জনপ্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ নেতা ছিলেন শেখ আবদুল্লা (যাঁকে 'শের-ই-কাশ্মীর' বলা হত)। তিনি ন্যাশনাল কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন।
18. পাকিস্তান আশ্রিত সশস্ত্র পাঠান উপজাতিরা (হানাদার বাহিনী) কবে কাশ্মীর আক্রমণ করে?
ক) ২২ অক্টোবর ১৯৪৭
খ) ১৫ আগস্ট ১৯৪৭
গ) ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০
ঘ) ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮
ব্যাখ্যা: ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সশস্ত্র উপজাতীয় হানাদাররা কাশ্মীরে ঢুকে ব্যাপক লুটপাট ও হত্যা শুরু করে।
19. মহারাজা হরি সিং কবে 'ভারতভুক্তির দলিলে' (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন?
ক) ২২ অক্টোবর ১৯৪৭
খ) ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭
গ) ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৭
ঘ) ১ জানুয়ারি ১৯৪৮
ব্যাখ্যা: হানাদারদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মহারাজা হরি সিং ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়।
20. ভারত সরকার কবে কাশ্মীর সমস্যা রাষ্ট্রসংঘের (UNO) নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করে?
ক) ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭
খ) ১ জানুয়ারি ১৯৪৮
গ) ১৫ আগস্ট ১৯৪৮
ঘ) ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০
ব্যাখ্যা: পাকিস্তানের আগ্রাসন বন্ধ করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রসংঘের দ্বারস্থ হন।
21. জুনাগড় (Junagadh) রাজ্যটি ভারতের কোথায় অবস্থিত ছিল?
ক) রাজস্থানে
খ) হায়দরাবাদে
গ) গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে
ঘ) বাংলায়
ব্যাখ্যা: গুজরাটের কাথিয়াবাড় বা সৌরাষ্ট্র উপদ্বীপে জুনাগড় অবস্থিত ছিল। এখানকার অধিকাংশ প্রজা ছিল হিন্দু, কিন্তু নবাব ছিলেন মুসলিম।
22. জুনাগড়ের নবাবের নাম কী ছিল?
ক) উসমান আলি খান
খ) তৃতীয় মহব্বত খান
গ) শাহ নওয়াজ ভুট্টো
ঘ) কাশিম রিজভি
ব্যাখ্যা: জুনাগড়ের নবাব ছিলেন তৃতীয় মহব্বত খান। তিনি তাঁর দেওয়ান শাহ নওয়াজ ভুট্টোর প্ররোচনায় পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করেন।
23. জুনাগড় রাজ্যটি কবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
ক) ১৯৪৭ সালে
খ) ১৯৪৮ সালে
গ) ১৯৪৯ সালে
ঘ) ১৯৫০ সালে
ব্যাখ্যা: জুনাগড়ে গণভোটের (Plebiscite) মাধ্যমে ৯৯% এর বেশি মানুষ ভারতে যোগদানের পক্ষে মত দিলে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জুনাগড় ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
24. ভারতের বৃহত্তম দেশীয় রাজ্য কোনটি ছিল?
ক) কাশ্মীর
খ) জুনাগড়
গ) মহীশূর
ঘ) হায়দরাবাদ
ব্যাখ্যা: আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে হায়দরাবাদ (Hyderabad) ছিল ভারতের বৃহত্তম দেশীয় রাজ্য।
25. হায়দরাবাদের শাসককে কী বলা হত?
ক) নবাব
খ) মহারাজা
গ) নিজাম
ঘ) পেশোয়া
ব্যাখ্যা: হায়দরাবাদের শাসককে নিজাম (Nizam) বলা হত। স্বাধীনতার সময় নিজাম ছিলেন উসমান আলি খান।
26. নিজামের তৈরি উগ্র ও ধর্মান্ধ সশস্ত্র মুসলিম বাহিনীর নাম কী ছিল?
ক) রাজাকার (Razakars)
খ) খাকসার
গ) আলবদর
ঘ) মুজাহিদিন
ব্যাখ্যা: কাশিম রিজভির নেতৃত্বে 'রাজাকার' (Razakars) নামক এক উগ্র সশস্ত্র বাহিনী হায়দরাবাদের হিন্দু প্রজাদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার শুরু করে।
27. রাজাকার বাহিনীর প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) উসমান আলি খান
খ) কাশিম রিজভি
গ) লিয়াকত আলি
ঘ) শাহ নওয়াজ ভুট্টো
ব্যাখ্যা: কাশিম রিজভি ছিলেন ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমিন দলের নেতা এবং রাজাকার বাহিনীর প্রধান।
28. হায়দরাবাদ রাজ্যটি দখল করার জন্য ভারত সরকার যে সামরিক অভিযান চালায় তার সাংকেতিক নাম কী ছিল?
ক) অপারেশন ব্লু স্টার
খ) অপারেশন পোলো (Operation Polo)
গ) অপারেশন বিজয়
ঘ) অপারেশন মেঘদূত
ব্যাখ্যা: হায়দরাবাদের নিজাম ও রাজাকারদের দমন করতে সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনা যে অভিযান চালায়, তার নাম ছিল 'অপারেশন পোলো' (পুলিশ অ্যাকশন)।
29. হায়দরাবাদ কবে সরকারিভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
ক) ১৯৪৭ সালে
খ) ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর
গ) ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর
ঘ) ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি
ব্যাখ্যা: অপারেশন পোলোর পর ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিজাম বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করেন এবং হায়দরাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় (১৯৫০ সালে সরকারি সিলমোহর পড়ে)।
30. পন্ডিচেরি (Pondicherry), কারিকল, মাহে এবং চন্দননগর কাদের উপনিবেশ ছিল?
ক) পর্তুগিজদের
খ) ফরাসিদের (French)
গ) ডাচদের
ঘ) ব্রিটিশদের
ব্যাখ্যা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরও এই অঞ্চলগুলি ফ্রান্সের বা ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল।
31. ফরাসি উপনিবেশগুলি কবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
ক) ১৯৪৮ সালে
খ) ১৯৫০ সালে
গ) ১৯৫৪ সালে
ঘ) ১৯৬১ সালে
ব্যাখ্যা: গণভোট এবং চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি উপনিবেশগুলি (পন্ডিচেরি, চন্দননগর ইত্যাদি) ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
32. গোয়া (Goa), দমন ও দিউ কাদের উপনিবেশ ছিল?
ক) ফরাসিদের
খ) ওলন্দাজদের
গ) ব্রিটিশদের
ঘ) পর্তুগিজদের (Portuguese)
ব্যাখ্যা: গোয়া, দমন ও দিউ ছিল পর্তুগিজদের উপনিবেশ। তারা ভারত ছাড়ার পরও এই অঞ্চলগুলি ছাড়তে চায়নি।
33. গোয়া কবে পর্তুগিজ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
ক) ১৯৫৪ সালে
খ) ১৯৫৬ সালে
গ) ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর
ঘ) ১৯৬৪ সালে
ব্যাখ্যা: ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী 'অপারেশন বিজয়'-এর মাধ্যমে গোয়া, দমন ও দিউ-কে পর্তুগিজদের হাত থেকে মুক্ত করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে।
34. দেশভাগের ফলে উদ্ভূত একটি প্রধান আর্থ-সামাজিক সমস্যা কী ছিল?
ক) শিল্পায়ন
খ) উদ্বাস্তু বা বাস্তুহারা সমস্যা
গ) জমিদারদের সমস্যা
ঘ) শিক্ষা সমস্যা
ব্যাখ্যা: ভারত ভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে আসে। এটিই উদ্বাস্তু সমস্যা (Refugee problem)।
35. উদ্বাস্তু (Refugee) বলতে কাদের বোঝায়?
ক) যারা কাজের খোঁজে শহরে আসে
খ) যারা দেশভাগের কারণে প্রাণভয়ে নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়
গ) যারা বিদেশে পড়তে যায়
ঘ) জমিদারদের
ব্যাখ্যা: দেশভাগের ফলে দাঙ্গা ও প্রাণভয়ে যারা নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের উদ্বাস্তু বা বাস্তুহারা বলা হয়।
36. দিল্লি চুক্তি বা নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (Nehru-Liaquat Pact) কবে স্বাক্ষরিত হয়?
ক) ১৯৪৭ সালে
খ) ১৯৪৮ সালে
গ) ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল
ঘ) ১৯৫৬ সালে
ব্যাখ্যা: উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মধ্যে ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
37. নেহরু-লিয়াকত চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
ক) কাশ্মীর সমস্যার সমাধান
খ) দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুনিশ্চিত করা
গ) যুদ্ধবিরতি
ঘ) বাণিজ্যের প্রসার
ব্যাখ্যা: এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দাঙ্গা বন্ধ করা এবং দুই দেশের সরকার তাদের দেশের সংখ্যালঘুদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার দেবে, যাতে দেশত্যাগ বন্ধ হয়।
38. নেহরু-লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে কোন্ দুজন বাঙালি মন্ত্রী নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন?
ক) বিধানচন্দ্র রায় ও প্রফুল্লচন্দ্র সেন
খ) শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও কে. সি. নিয়োগী
গ) ফজলুল হক ও সুহরাবর্দি
ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও চিত্তরঞ্জন দাশ
ব্যাখ্যা: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কে. সি. নিয়োগী মনে করেছিলেন এই চুক্তি একপেশে এবং পাকিস্তান এটি মানবে না। তাই প্রতিবাদে তাঁরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন।
39. ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবিতে প্রথম কোন্ কমিশন গঠিত হয়?
ক) জে.ভি.পি. কমিটি
খ) ধার কমিশন (Dhar Commission)
গ) ফজল আলি কমিশন
ঘ) সাইমন কমিশন
ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি উঠলে ১৯৪৮ সালের জুনে সংবিধান সভার সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এস. কে. ধারের নেতৃত্বে 'ধার কমিশন' গঠন করেন।
40. ধার কমিশন (Dhar Commission) তাদের রিপোর্টে কী সুপারিশ করেছিল?
ক) ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন করা উচিত
খ) ভাষার ভিত্তিতে নয়, প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সুবিধার্থে রাজ্য গঠন করা উচিত
গ) রাজ্যগুলিকে ভেঙে দেওয়া উচিত
ঘ) সব রাজ্যকে এক করে দেওয়া উচিত
ব্যাখ্যা: ধার কমিশন ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে এবং প্রশাসনিক সুবিধার ওপর জোর দেয়।
41. জে. ভি. পি. কমিটি (JVP Committee) কবে গঠিত হয়?
ক) ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে
খ) ১৯৫০ সালে
গ) ১৯৫৩ সালে
ঘ) ১৯৫৬ সালে
ব্যাখ্যা: ধার কমিশনের রিপোর্টের পর তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হলে কংগ্রেস ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে জে. ভি. পি. কমিটি গঠন করে।
42. জে. ভি. পি. (JVP) কমিটিতে কোন্ তিনজন সদস্য ছিলেন?
ক) জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, পট্টভি সীতারামাইয়া
খ) জিন্না, বল্লভভাই, প্যাটেল
গ) জওহরলাল, ভি. পি. মেনন, পট্টভি
ঘ) জওহরলাল, বিদ্যাসাগর, প্রফুল্লচন্দ্র
ব্যাখ্যা: JVP অর্থাৎ J-জওহরলাল নেহরু, V-বল্লভভাই প্যাটেল, এবং P-পট্টভি সীতারামাইয়া। এই কমিটিও ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করেছিল।
43. পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে কে ৫৮ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন?
ক) চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী
খ) পোট্টি শ্রীরামুলু (Potti Sriramulu)
গ) টি. প্রকাশম
ঘ) রামস্বামী নাইকার
ব্যাখ্যা: মাদ্রাজ প্রদেশ ভেঙে তেলেগু ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক অন্ধ্র রাজ্যের দাবিতে গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামুলু ৫৮ দিন অনশন করে ১৯৫২ সালের ১৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
44. ভাষাভিত্তিক প্রথম রাজ্য কোনটি গঠিত হয়?
ক) মহারাষ্ট্র
খ) গুজরাট
গ) অন্ধ্রপ্রদেশ
ঘ) কেরালা
ব্যাখ্যা: পোট্টি শ্রীরামুলুর মৃত্যুর পর প্রবল দাঙ্গা শুরু হলে ভারত সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৫৩ সালের ১ অক্টোবর তেলেগু ভাষার ভিত্তিতে ভারতের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য 'অন্ধ্র রাজ্য' (পরে অন্ধ্রপ্রদেশ) গঠন করে।
45. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (State Reorganisation Commission - SRC) কবে গঠিত হয়?
ক) ১৯৪৮ সালে
খ) ১৯৫৩ সালে
গ) ১৯৫৬ সালে
ঘ) ১৯৬০ সালে
ব্যাখ্যা: অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের পর অন্যান্য ভাষার মানুষও পৃথক রাজ্যের দাবি তুললে, ভারত সরকার ১৯৫৩ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (SRC) গঠন করে।
46. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের (১৯৫৩) সভাপতি কে ছিলেন?
ক) কে. এম. পানিক্কর
খ) এইচ. এন. কুঞ্জরু
গ) ফজল আলি (Fazl Ali)
ঘ) জওহরলাল নেহরু
ব্যাখ্যা: প্রাক্তন বিচারপতি সৈয়দ ফজল আলি ছিলেন এই কমিশনের সভাপতি। তাই একে ফজল আলি কমিশনও বলা হয়।
47. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের অন্য দুজন সদস্য কারা ছিলেন?
ক) কে. এম. পানিক্কর এবং এইচ. এন. কুঞ্জরু
খ) নেহরু এবং প্যাটেল
গ) পোট্টি শ্রীরামুলু এবং প্রকাশম
ঘ) জওহরলাল এবং মেনন
ব্যাখ্যা: ফজল আলি ছাড়া এই কমিশনের বাকি দুজন সদস্য ছিলেন পণ্ডিত হৃদয়নাথ কুঞ্জরু এবং কে. এম. পানিক্কর।
48. রাজ্য পুনর্গঠন আইন (State Reorganisation Act) কবে পাস হয়?
ক) ১৯৫৩ সালে
খ) ১৯৫৫ সালে
গ) ১৯৫৬ সালে
ঘ) ১৯৬০ সালে
ব্যাখ্যা: রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সংসদে রাজ্য পুনর্গঠন আইন পাস হয়।
49. ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন অনুযায়ী ভারতে কয়টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়েছিল?
ক) ১৪টি রাজ্য ও ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
খ) ১৬টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
গ) ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
ঘ) ১৪টি রাজ্য ও ৪টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
ব্যাখ্যা: ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর ভাষার ভিত্তিতে ভারতের রাজ্যগুলিকে পুনর্গঠন করে ১৪টি রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (UT) গঠন করা হয়।
50. বোম্বাই রাজ্য ভেঙে কবে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্যের সৃষ্টি হয়?
ক) ১৯৫৬ সালে
খ) ১৯৬০ সালে
গ) ১৯৬৬ সালে
ঘ) ২০০০ সালে
ব্যাখ্যা: মারাঠি ও গুজরাটি ভাষাভাষীদের মধ্যে প্রবল সংঘাতের জেরে ১৯৬০ সালের ১ মে বোম্বাই রাজ্যকে ভেঙে দুটি পৃথক রাজ্য—মহারাষ্ট্র ও গুজরাট গঠন করা হয়।
51. পাঞ্জাব ভেঙে কবে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্য গঠিত হয়?
ক) ১৯৫৬ সালে
খ) ১৯৬০ সালে
গ) ১৯৬৬ সালে
ঘ) ১৯৭১ সালে
ব্যাখ্যা: পাঞ্জাবি ও হিন্দি ভাষীদের মধ্যে বিরোধের ফলে ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাব রাজ্যকে ভেঙে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা গঠন করা হয়। চণ্ডীগড় উভয় রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হয়।
52. ভারতের সরকারি ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা (Official Language) সম্পর্কে সংবিধানের কোন্ ধারায় বলা আছে?
ক) ৩৪৩ নং ধারায়
খ) ৩৪৪(১) ও ৩৫১ নং ধারায়
গ) ১৫ নং ধারায়
ঘ) ৩৭০ নং ধারায়
ব্যাখ্যা: সংবিধানের অষ্টম তফশিলের ৩৪৪(১) ও ৩৫১ ধারায় ভারতের সরকারি ভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে এবং হিন্দি ও ইংরেজিকে সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
53. ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের সংবিধানে কয়টি স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা ছিল?
ক) ১২টি
খ) ১৪টি
গ) ১৮টি
ঘ) ২২টি
ব্যাখ্যা: ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সংবিধানে ১৪টি ভাষাকে (অসমিয়া, বাংলা, ওড়িয়া, গুজরাটি, মারাঠি, কাশ্মীরি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কানাড়ি, হিন্দি, উর্দু ও সংস্কৃত) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। (বর্তমানে ২২টি)।
54. ভারতের সরকারি ভাষা হিসেবে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কোন্ রাজ্যে তীব্র ভাষা-আন্দোলন (অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি) সৃষ্টি হয়েছিল?
ক) তামিলনাড়ু (মাদ্রাজ)
খ) গুজরাট
গ) পশ্চিমবঙ্গ
ঘ) উত্তরপ্রদেশ
ব্যাখ্যা: ১৯৬০-এর দশকে অহিন্দি ভাষাভাষী দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে, বিশেষত তামিলনাড়ুতে, জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে তীব্র ভাষা-আন্দোলন ও দাঙ্গা দেখা দেয়।
55. স্বাধীনতার পর কবে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন (General Election) অনুষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯৪৭-৪৮ সালে
খ) ১৯৫০ সালে
গ) ১৯৫১-৫২ সালে
ঘ) ১৯৫৬ সালে
ব্যাখ্যা: সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৫১-৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
56. উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে লেখা 'ছেড়ে আসা গ্রাম' গ্রন্থটির রচয়িতা কে?
ক) হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
খ) দক্ষিণারঞ্জন বসু
গ) প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী
ঘ) জওহরলাল নেহরু
ব্যাখ্যা: দেশভাগের যন্ত্রণায় বাস্তুহারা হয়ে আসা মানুষের স্মৃতি নিয়ে দক্ষিণারঞ্জন বসু 'ছেড়ে আসা গ্রাম' গ্রন্থটি সংকলন করেন।
57. 'উদ্বাস্তু' (Udbastu) নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) দক্ষিণারঞ্জন বসু
খ) হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
গ) প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী
ঘ) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের আধিকারিক হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে 'উদ্বাস্তু' গ্রন্থটি রচনা করেন।
58. 'ট্রেন টু পাকিস্তান' (Train to Pakistan) গ্রন্থটির রচয়িতা কে?
ক) খুশবন্ত সিং
খ) সাদাত হাসান মান্টো
গ) ভীষ্ম সাহনি
ঘ) সলমন রুশদি
ব্যাখ্যা: দেশভাগের মর্মান্তিক দাঙ্গা ও মানবিক বিপর্যয়ের পটভূমিতে প্রখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং 'ট্রেন টু পাকিস্তান' উপন্যাসটি রচনা করেন।
59. 'তমস' (Tamas) উপন্যাসের রচয়িতা কে?
ক) খুশবন্ত সিং
খ) ভীষ্ম সাহনি
গ) মুন্সি প্রেমচাঁদ
ঘ) অমৃতা প্রীতম
ব্যাখ্যা: দেশভাগের সময়ের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে হিন্দি লেখক ভীষ্ম সাহনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'তমস' রচনা করেন।
60. প্রান্তিক মানব (The Marginal Men) গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী
খ) দক্ষিণারঞ্জন বসু
গ) হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘ) জয়া চ্যাটার্জি
ব্যাখ্যা: দেশভাগ এবং বাংলার উদ্বাস্তুদের সীমাহীন দুর্দশার প্রামাণ্য ইতিহাস নিয়ে প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী 'প্রান্তিক মানব' বা 'The Marginal Men' গ্রন্থটি রচনা করেন।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
40 টি1. উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত (Post-Colonial India) বলতে কী বোঝায়?
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ বা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকে স্বাধীন ভারতের যে সময়কাল বা যুগ শুরু হয়, তাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত বলে। দশম শ্রেণির সিলেবাসে মূলত ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ (নেহরুর মৃত্যু পর্যন্ত) সময়কালকে ধরা হয়েছে।
2. স্বাধীন ভারতের সংবিধান কবে প্রণীত ও কবে কার্যকর হয়?
ভারতের নতুন সংবিধান ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদ দ্বারা গৃহীত ও প্রণীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে সারা দেশে কার্যকর বা বলবৎ হয়।
3. সংবিধানের খসড়া কমিটির (Drafting Committee) চেয়ারম্যান কে ছিলেন?
ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর (Dr. B.R. Ambedkar) ছিলেন সংবিধানের খসড়া রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির চেয়ারম্যান এবং ভারতীয় সংবিধানের রূপকার।
4. স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?
স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (২৬ জানুয়ারি ১৯৫০) এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু (১৫ আগস্ট ১৯৪৭)।
5. দেশীয় রাজ্য (Princely States) কাকে বলে?
ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে যে সমস্ত রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত হত না, বরং ব্রিটিশদের বশ্যতা স্বীকার করে স্থানীয় হিন্দু রাজা বা মুসলিম নবাবদের দ্বারা শাসিত হত, তাদের দেশীয় রাজ্য বলে (যেমন: কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, মহীশূর)।
6. স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতে কতগুলি দেশীয় রাজ্য ছিল? এর মধ্যে বৃহত্তম কোনটি?
স্বাধীনতার সময় ভারতে প্রায় ৫৬৫টি ছোটো-বড়ো দেশীয় রাজ্য ছিল। এর মধ্যে আয়তন ও জনসংখ্যায় বৃহত্তম ছিল হায়দরাবাদ (Hyderabad)।
7. দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির দায়িত্ব কার ওপর ছিল?
ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের (Sardar Vallabhbhai Patel) ওপর দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব ছিল। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেন সচিব ভি. পি. মেনন।
8. সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ভারতের 'লৌহমানব' বা 'বিসমার্ক' বলা হয় কেন?
স্বাধীনতার পর ভারত ৫৬৫টি খণ্ডে ভেঙে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল। সর্দার প্যাটেল তাঁর কঠোর মানসিকতা, লৌহকঠিন দৃঢ়তা এবং অসাধারণ কূটনীতির মাধ্যমে এই রাজ্যগুলিকে রক্তপাতহীনভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাই তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
9. ভারতভুক্তির দলিল (Instrument of Accession) কী?
দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ভারত সরকার একটি আইনি চুক্তিপত্র বা দলিল তৈরি করেছিল, যাতে স্বাক্ষর করলে সেই রাজ্যটি প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকার ভারত সরকারকে ছেড়ে দিয়ে ভারতের অংশ হত। একেই 'ভারতভুক্তির দলিল' বলে।
10. কাশ্মীরের রাজা কে ছিলেন এবং সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা কোন ধর্মের ছিল?
কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হিন্দু ডোগরা বংশীয় মহারাজা হরি সিং। কিন্তু সেখানকার প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের।
11. কাশ্মীর কবে, কেন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান মদতপুষ্ট সশস্ত্র হানাদার বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে ব্যাপক হত্যা ও লুটপাট চালায়। নিরুপায় হয়ে মহারাজা হরি সিং প্রাণ বাঁচাতে ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর 'ভারতভুক্তির দলিলে' স্বাক্ষর করে কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।
12. শেখ আবদুল্লা (Sheikh Abdullah) কে ছিলেন?
শেখ আবদুল্লা ছিলেন কাশ্মীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং 'ন্যাশনাল কনফারেন্স' দলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে 'শের-ই-কাশ্মীর' (কাশ্মীরের বাঘ) বলা হত। তিনি কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে সমর্থন করেছিলেন।
13. জুনাগড় (Junagadh) রাজ্যটি ভারতের কোথায় অবস্থিত ছিল?
জুনাগড় রাজ্যটি ভারতের পশ্চিম উপকূলে গুজরাটের কাথিয়াবাড় বা সৌরাষ্ট্র উপদ্বীপে অবস্থিত ছিল। এখানকার ৮০% প্রজা ছিল হিন্দু, কিন্তু নবাব ছিলেন মুসলিম (মহব্বত খান)।
14. জুনাগড় কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করলে প্রজারা বিদ্রোহ করে। নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এরপর ভারত সরকার ১৯৪৮ সালে সেখানে একটি গণভোট (Plebiscite) করে, যেখানে ৯৯% প্রজা ভারতে যোগদানের পক্ষে মত দেয় এবং জুনাগড় ভারতের অংশ হয়।
15. হায়দরাবাদের (Hyderabad) শাসকের উপাধি কী ছিল? স্বাধীনতার সময় শাসক কে ছিলেন?
হায়দরাবাদের শাসকের উপাধি ছিল 'নিজাম' (Nizam)। স্বাধীনতার সময় হায়দরাবাদের নিজাম ছিলেন মির উসমান আলি খান।
16. রাজাকার (Razakars) কাদের বলা হত?
হায়দরাবাদকে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য মজলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমিন দলের নেতা কাশিম রিজভির নেতৃত্বে যে উগ্র ও ধর্মান্ধ সশস্ত্র মুসলিম মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাদের রাজাকার বলা হত। এরা হিন্দু প্রজাদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাত।
17. অপারেশন পোলো (Operation Polo) কী?
হায়দরাবাদের নিজামের ভারত-বিরোধী ষড়যন্ত্র এবং রাজাকার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার দমন করার জন্য ভারত সরকার ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযান (Police Action) চালায়, তার সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন পোলো।
18. ফরাসি উপনিবেশগুলি কবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
পন্ডিচেরি (পুদুচেরি), কারিকল, মাহে, ইয়ানাম এবং চন্দননগরে ফরাসিদের (French) উপনিবেশ ছিল। চুক্তি এবং গণভোটের মাধ্যমে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে এগুলি শান্তিপূর্ণভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
19. পর্তুগিজ উপনিবেশগুলি কবে, কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
গোয়া, দমন ও দিউ-তে পর্তুগিজদের উপনিবেশ ছিল। তারা ভারত ছাড়তে অস্বীকার করলে ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী 'অপারেশন বিজয়' (Operation Vijay) এর মাধ্যমে পর্তুগিজদের হঠিয়ে এই অঞ্চলগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে।
20. উদ্বাস্তু বা বাস্তুহারা (Refugee) কাদের বলা হয়?
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের ফলে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, প্রাণভয় এবং ভিটেমাটি হারানোর কারণে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের উদ্বাস্তু বা বাস্তুহারা বলা হয়।
21. দিল্লি চুক্তি বা নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (Delhi Pact) কবে, কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?
পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে উদ্বাস্তু স্রোত আছড়ে পড়লে, দাঙ্গা রোধ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মধ্যে দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
22. দিল্লি চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের সংখ্যালঘুদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা, সমান অধিকার এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা দেওয়া, যাতে দেশত্যাগ বা উদ্বাস্তু হওয়া বন্ধ হয় এবং হারানো সম্পত্তি ফিরে পাওয়া যায়।
23. নেহরু-লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে কোন্ দুজন বাঙালি মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন?
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কে. সি. নিয়োগী মনে করেছিলেন যে পাকিস্তান কখনোই এই চুক্তি মেনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবে না, এটি ভারতের সাথে একটি প্রতারণা। তাই এর প্রতিবাদে তাঁরা নেহরুর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
24. ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি কেন উঠেছিল?
ব্রিটিশ আমলে রাজ্যগুলি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য যথেচ্ছভাবে তৈরি হয়েছিল, সেখানে ভাষা বা সংস্কৃতির কোনো মিল ছিল না (যেমন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে তামিল, তেলেগু, কানাড়া সব ছিল)। স্বাধীনতার পর প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার ভিত্তিতে আলাদা রাজ্যের দাবি তোলে, যাতে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
25. ধার কমিশন (Dhar Commission) কবে, কেন গঠিত হয়?
স্বাধীনতার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের প্রবল দাবির যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার জন্য ১৯৪৮ সালের জুন মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এস. কে. ধারের নেতৃত্বে 'লিঙ্গুইস্টিক প্রভিন্সেস কমিশন' বা ধার কমিশন গঠিত হয়।
26. ধার কমিশন এবং জে.ভি.পি. (JVP) কমিটির মত কী ছিল?
উভয় কমিটিই ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। তারা জানিয়েছিল যে ভাষা নয়, বরং প্রশাসনিক সুবিধা, ভৌগোলিক সীমানা এবং দেশের ঐক্যের কথা মাথায় রেখে রাজ্য পুনর্গঠন হওয়া উচিত।
27. পোট্টি শ্রীরামুলু (Potti Sriramulu) কে ছিলেন? তিনি কেন বিখ্যাত?
পোট্টি শ্রীরামুলু ছিলেন একজন গান্ধীবাদী নেতা। মাদ্রাজ প্রদেশকে ভেঙে তেলেগু ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক 'অন্ধ্র রাজ্য' গঠনের দাবিতে তিনি অনশন শুরু করেন এবং ১৯৫২ সালের ১৫ ডিসেম্বর ৫৮ দিন অনশনের পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর আত্মত্যাগেই প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠিত হয়।
28. ভারতের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য কোনটি এবং কবে গঠিত হয়?
শ্রীরামুলুর মৃত্যুর পর প্রবল দাঙ্গা শুরু হলে ভারত সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৫৩ সালের ১ অক্টোবর তেলেগু ভাষার ভিত্তিতে ভারতের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য 'অন্ধ্র রাজ্য' (বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশ) গঠন করে।
29. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (State Reorganisation Commission - SRC) কবে, কেন গঠিত হয়?
অন্ধ্র রাজ্য গঠনের পর সারা দেশের অন্যান্য ভাষার মানুষেরাও (মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়) পৃথক রাজ্যের দাবিতে প্রবল আন্দোলন শুরু করে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভারত সরকার ১৯৫৩ সালের শেষে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করে।
30. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন বা ফজল আলি কমিশনের তিনজন সদস্য কারা ছিলেন?
এই কমিশনের সভাপতি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সৈয়দ ফজল আলি। বাকি দুজন সদস্য ছিলেন পণ্ডিত হৃদয়নাথ কুঞ্জরু (H.N. Kunzru) এবং কে. এম. পানিক্কর (K.M. Panikkar)।
31. রাজ্য পুনর্গঠন আইন (State Reorganisation Act) কবে পাস হয় এবং এর ফল কী হয়?
ফজল আলি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে 'রাজ্য পুনর্গঠন আইন' পাস হয়। এর ফলে ভাষার ভিত্তিতে ভারতের সীমানা পুনর্বিন্যাস করে ১৪টি নতুন রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (Union Territories) গঠন করা হয়।
32. বোম্বাই (Bombay) রাজ্য ভেঙে কোন্ কোন্ রাজ্য তৈরি হয় এবং কবে?
মারাঠি ও গুজরাটি ভাষাভাষীদের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্বের কারণে ১৯৬০ সালের ১ মে বোম্বাই রাজ্যকে ভেঙে মারাঠিদের জন্য 'মহারাষ্ট্র' এবং গুজরাটিদের জন্য 'গুজরাট' নামক দুটি পৃথক রাজ্য গঠন করা হয়।
33. পাঞ্জাব ভেঙে কবে, কোন্ কোন্ রাজ্য তৈরি হয়?
পাঞ্জাবি ও হিন্দি ভাষীদের মধ্যে বিরোধের জেরে ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাব রাজ্যকে ভেঙে পাঞ্জাবিদের জন্য 'পাঞ্জাব' এবং হিন্দিভাষীদের জন্য 'হরিয়ানা' রাজ্য গঠন করা হয়। চণ্ডীগড় উভয় রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হয়।
34. ভারতের সংবিধানে সরকারি ভাষা (Official Language) সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
সংবিধানের ৩৪৩ নং ধারা অনুযায়ী দেবনাগরী হরফে লেখা 'হিন্দি' ভাষাকে ভারতের সরকারি ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে অবাঙ্গালি ও অহিন্দিদের সুবিধার্থে ১৫ বছরের জন্য (১৯৬৫ পর্যন্ত) ইংরেজিকেও সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
35. ১৯৬০-এর দশকে ভারতে ভাষা-আন্দোলন (অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি) কেন শুরু হয়েছিল?
সংবিধান অনুযায়ী ১৯৬৫ সালে ইংরেজি ভাষার সরকারি মান্যতা শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা ছিল। এর প্রতিবাদে অ-হিন্দি রাজ্যগুলি, বিশেষত দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র ও সহিংস ভাষা-আন্দোলন শুরু হয়।
36. হিন্দি ভাষা আন্দোলন কীভাবে প্রশমিত হয়?
তীব্র আন্দোলনের জেরে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পরে লালবাহাদুর শাস্ত্রী আশ্বাস দেন যে, যতক্ষণ না অ-হিন্দি রাজ্যগুলি চাইছে, ততক্ষণ হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও ভারতের সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে চালু থাকবে। এরপর আন্দোলন প্রশমিত হয়।
37. বর্তমানে ভারতীয় সংবিধানে কয়টি ভাষাকে স্বীকৃতি (Recognized Languages) দেওয়া হয়েছে?
১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ভারতের সংবিধানে ১৪টি আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সংবিধানের অষ্টম তফশিলে মোট ২২টি ভাষাকে ভারতের স্বীকৃত বা জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
38. 'ছেড়ে আসা গ্রাম' গ্রন্থটি কার সংকলন এবং এর বিষয়বস্তু কী?
দক্ষিণারঞ্জন বসু 'ছেড়ে আসা গ্রাম' গ্রন্থটি সংকলন করেন। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) থেকে সর্বস্বান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে আসা ছিন্নমূল মানুষের ফেলে আসা ভিটেমাটির স্মৃতি এবং যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতাই এই বইয়ের মূল বিষয়।
39. 'উদ্বাস্তু' (Udbastu) গ্রন্থটি কে লিখেছেন? এর গুরুত্ব কী?
উদ্বাস্তু ত্রাণ দপ্তরের আধিকারিক হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে 'উদ্বাস্তু' গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে দেশভাগের পর শিয়ালদহ স্টেশনে শরণার্থীদের মানবেতর জীবন এবং তাদের পুনর্বাসনের সমস্যাগুলি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
40. 'ট্রেন টু পাকিস্তান' (Train to Pakistan) কার লেখা? এর বিষয়বস্তু কী?
প্রখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং 'ট্রেন টু পাকিস্তান' উপন্যাসটি রচনা করেন। ১৯৪৭ সালে পাঞ্জাব সীমান্তে দেশভাগের মর্মান্তিক দাঙ্গা, হত্যাযজ্ঞ এবং একটি শিখ-মুসলিম গ্রামের মানবিক বিপর্যয়ের কাহিনি এতে বর্ণিত হয়েছে।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
10 টি1. স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশীয় রাজ্যগুলির (Princely States) ভারতভুক্তির পটভূমি এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের (Sardar Patel) ভূমিকা আলোচনা করো।
দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তি এবং সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা:
পটভূমি: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন ভারত ছাড়ে, তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশগুলি ছাড়াও প্রায় ৫৬৫টি ছোটো-বড়ো 'দেশীয় রাজ্য' ছিল (যেমন কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, মহীশূর)। ১৯৪৭ সালের 'ভারত স্বাধীনতা আইন' অনুযায়ী এই রাজ্যগুলিকে অধিকার দেওয়া হয় যে তারা স্বাধীন ভারতের সাথে যুক্ত হতে পারে, পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে পারে, অথবা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে পারে। এর ফলে ভারত খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার এক ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে।
সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা:
স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই খণ্ডবিখণ্ড ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করার এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
- দেশীয় রাজ্য দপ্তর গঠন: ১৯৪৭ সালের ৫ জুলাই তিনি 'দেশীয় রাজ্য দপ্তর' (States Department) গঠন করেন এবং তাঁর সুযোগ্য সচিব ভি. পি. মেননের সহায়তায় দেশীয় রাজাদের সাথে আলোচনা শুরু করেন।
- দেশপ্রেমের আবেদন ও কূটনীতি: প্যাটেল রাজাদের বুঝিয়েছিলেন যে স্বাধীন থাকা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং এতে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তিনি রাজাদের দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
- ভারতভুক্তির দলিল (Instrument of Accession): তিনি একটি সহজ শর্তের আইনি দলিল তৈরি করেন। এতে বলা হয়, রাজারা শুধু প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকার কেন্দ্রের হাতে তুলে দেবে, বাকি অভ্যন্তরীণ শাসনভার তাদের হাতেই থাকবে। রাজাদের জন্য ভাতা বা পেন্সনের (Privy Purse) ব্যবস্থাও করা হয়।
- কঠোর পদক্ষেপ: যে রাজারা এই প্রস্তাবে রাজি হননি (যেমন জুনাগড়, হায়দরাবাদ), প্যাটেল সেখানে কঠোর সামরিক ও পুলিশি পদক্ষেপ নিতে পিছপা হননি।
উপসংহার: ১৫ আগস্টের আগেই প্যাটেলের দূরদর্শিতা, লৌহকঠিন দৃঢ়তা এবং সফল কূটনীতির ফলে ৩টি রাজ্য ছাড়া বাকি সব রাজ্য শান্তিপূর্ণভাবে ভারতে যোগ দেয়। এই অসামান্য অবদানের জন্যই তাঁকে ভারতের 'লৌহমানব' (Iron Man) এবং 'ভারতের বিসমার্ক' বলা হয়।
2. স্বাধীনতার পর কাশ্মীর সমস্যা (Kashmir Problem) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এবং কাশ্মীর কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় তা আলোচনা করো।
কাশ্মীর সমস্যা ও ভারতভুক্তি:
স্বাধীনতার সময় জম্মু ও কাশ্মীর ছিল ভারতের উত্তরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় রাজ্য। এখানকার রাজা ছিলেন হিন্দু ডোগরা বংশীয় মহারাজা হরি সিং, কিন্তু মোট প্রজার প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল মুসলিম।
- স্বাধীন থাকার চেষ্টা: ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় মহারাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই যোগ না দিয়ে কাশ্মীরকে 'স্বাধীন' রাষ্ট্র হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উভয় দেশের সাথে 'স্ট্যান্ডস্টিল এগ্রিমেন্ট' করার প্রস্তাব দেন।
- পাকিস্তানের আগ্রাসন: পাকিস্তান চেয়েছিল মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর তাদের দখলে আসুক। তাই ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান তাদের সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র পাঠান উপজাতীয় হানাদারদের (আফ্রিদি, ওয়াজিরি) পাঠিয়ে কাশ্মীর আক্রমণ করে। হানাদাররা মুজফফরাবাদ, বারামুলা দখল করে শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে এবং ব্যাপক হত্যা, লুটপাট ও নারীধর্ষণ চালায়।
- মহারাজার ভারতের কাছে সাহায্য প্রার্থনা: রাজধানী শ্রীনগর পতনের উপক্রম হলে উপায়হীন মহারাজা হরি সিং প্রাণ বাঁচাতে এবং কাশ্মীরকে রক্ষা করতে ২৪ অক্টোবর ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন।
- ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর: ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল জানান যে কাশ্মীর আইনিভাবে ভারতের অংশ না হলে ভারত সেখানে সেনা পাঠাতে পারবে না। তখন মহারাজা হরি সিং ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর 'ভারতভুক্তির দলিলে' (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন। ফলে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
- ভারতীয় সেনার অভিযান: ২৬ অক্টোবর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ২৭ অক্টোবর সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী বিমানে করে শ্রীনগরে পৌঁছায় এবং বীরত্বের সাথে লড়াই করে হানাদারদের শ্রীনগর থেকে বিতাড়িত করে।
- রাষ্ট্রসংঘে নেহরু: পাকিস্তানের সরাসরি মদত প্রমাণ হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্বশান্তি রক্ষার্থে সমস্যাটি রাষ্ট্রসংঘের (UNO) নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যান, যার ফলে যুদ্ধবিরতি হয় এবং কাশ্মীর সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয় (আজও পাক-অধিকৃত কাশ্মীর বা POK পাকিস্তানের দখলে রয়ে গেছে)।
3. হায়দরাবাদ (Hyderabad) দেশীয় রাজ্যটি কীভাবে স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল তা আলোচনা করো।
হায়দরাবাদের ভারতভুক্তি:
হায়দরাবাদ ছিল ভারতের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম দেশীয় রাজ্য। এখানকার শাসক ছিলেন মুসলিম (যাঁকে 'নিজাম' বলা হত), কিন্তু প্রায় ৮৫% প্রজা ছিল হিন্দু।
- স্বাধীনতার দাবি: স্বাধীনতার সময় হায়দরাবাদের নিজাম উসমান আলি খান ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকার কথা ঘোষণা করেন। ভারত সরকার হায়দরাবাদের মতো বিশাল রাজ্যকে ভারতের পেটের ভেতর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিল না।
- রাজাকারদের অত্যাচার: হায়দরাবাদকে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য কাশিম রিজভির নেতৃত্বে 'রাজাকার' (Razakars) নামক এক ধর্মান্ধ, উগ্র ও সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে ওঠে। এরা ভারতভুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত হিন্দু প্রজাদের ওপর অবর্ণনীয় হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট শুরু করে।
- পাকিস্তানের সাথে গোপন আঁতাত: নিজাম ভারত সরকারের সাথে স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তিতে সই করলেও গোপনে পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে থাকেন এবং রাষ্ট্রসংঘে যাওয়ার হুমকি দেন। হায়দরাবাদের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
- অপারেশন পোলো (Operation Polo): সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বুঝতে পারেন যে কূটনৈতিক আলোচনায় কাজ হবে না। তাই তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর নির্দেশে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল জে. এন. চৌধুরীর নেতৃত্বে হায়দরাবাদে প্রবেশ করে। এই সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল 'অপারেশন পোলো' (বা পুলিশ অ্যাকশন)।
- নিজামের আত্মসমর্পণ: মাত্র পাঁচ দিনের যুদ্ধে রাজাকার বাহিনী ও নিজামের সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনার কাছে পর্যুদস্ত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিজাম বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করেন। এর ফলে হায়দরাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৫০ সালে সরকারিভাবে এটি ভারতের একটি রাজ্যে পরিণত হয়।
4. জুনাগড় (Junagadh) দেশীয় রাজ্যটি কীভাবে স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল তা আলোচনা করো।
জুনাগড়ের ভারতভুক্তি:
গুজরাটের কাথিয়াবাড় বা সৌরাষ্ট্র উপদ্বীপে অবস্থিত একটি ছোটো দেশীয় রাজ্য ছিল জুনাগড়। এখানকার ৮০ শতাংশের বেশি প্রজা ছিল হিন্দু, কিন্তু শাসক বা নবাব ছিলেন মুসলিম (তৃতীয় মহব্বত খান)।
- নবাবের পাকিস্তানে যোগদানের ঘোষণা: ভারতের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এবং পাকিস্তানের সাথে কোনো সরাসরি স্থল সীমানা না থাকা সত্ত্বেও, জুনাগড়ের নবাব তাঁর দেওয়ান শাহ নওয়াজ ভুট্টোর প্ররোচনায় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। পাকিস্তান সরকার দ্রুত সেই প্রস্তাব গ্রহণও করে।
- প্রজাদের বিদ্রোহ: নবাবের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে জুনাগড়ের হিন্দু প্রজারা। তারা 'আরজি হুকুমত' (Provisional Government) নামে একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করে এবং নবাবের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।
- নবাবের পলায়ন: পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে এবং প্রজাদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে নবাব মহব্বত খান প্রাণভয়ে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে একটি বিমানে করে সপরিবারে করাচিতে (পাকিস্তান) পালিয়ে যান।
- ভারতীয় সেনার প্রবেশ: নবাব পালিয়ে গেলে জুনাগড়ের দেওয়ান শাহ নওয়াজ ভুট্টো প্রশাসন চালাতে না পেরে ভারত সরকারের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ৯ নভেম্বর জুনাগড়ে প্রবেশ করে এবং শান্তি স্থাপন করে।
- গণভোট ও ভারতভুক্তি: জওহরলাল নেহরু গণতান্ত্রিক পথে এর সমাধান চেয়েছিলেন। তাই ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জুনাগড়ে একটি গণভোট (Plebiscite) নেওয়া হয়। এই গণভোটে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ (১,৯০,৮৭০ টি ভোটের মধ্যে মাত্র ৯১ জন বাদে) ভারতে যোগদানের পক্ষে রায় দেয়। প্রজাদের এই রায়ের ভিত্তিতে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জুনাগড় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
5. স্বাধীনতার পর ভারতে 'উদ্বাস্তু সমস্যা' (Refugee Problem) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর প্রভাব কী ছিল?
উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি:
১৯৪৭ সালে মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ অনুযায়ী ভারত ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই দেশভাগের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ফল ছিল 'উদ্বাস্তু সমস্যা' বা বাস্তুহারা সমস্যা।
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: ভারতভাগের সাথে সাথে পাঞ্জাব, বাংলা এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। সংখ্যালঘু হিন্দু ও শিখদের ওপর পাকিস্তানে অবর্ণনীয় অত্যাচার, ধর্ষণ ও লুটপাট চালানো হয়।
- দেশত্যাগ: প্রাণভয়ে, মহিলাদের সম্মান বাঁচাতে এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ নিজেদের মাতৃভূমি, সহায়-সম্বল ও ভিটেমাটি চিরতরে ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এদেরকেই উদ্বাস্তু (Refugees) বলা হয়। একইভাবে ভারত থেকেও লক্ষ লক্ষ মুসলিম পাকিস্তানে পাড়ি দেয়। মানব ইতিহাসের এটিই ছিল সর্ববৃহৎ দেশত্যাগ (Migration)।
উদ্বাস্তু সমস্যার প্রভাব:
- আর্থ-সামাজিক সংকট: লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষ ভারতে এসে শিয়ালদহ স্টেশন, ফুটপাত বা খোলা মাঠে আশ্রয় নেয়। তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে ভারতের সদ্যোজাত ও ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এক প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়।
- অমানবিক জীবন: সরকারি সাহায্য অপর্যাপ্ত হওয়ায় উদ্বাস্তুরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। অনাহার ও কলেরার মতো মহামারিতে হাজার হাজার শিশু ও বৃদ্ধ প্রাণ হারায়। (যার নিখুঁত বর্ণনা হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উদ্বাস্তু' গ্রন্থে রয়েছে)।
- জবরদখল ও কলোনি গঠন: নিরুপায় হয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুরা কলকাতার আশেপাশে (যাদবপুর, টালিগঞ্জ, সোদপুর) পরিত্যক্ত বা অন্যের জমি জবরদখল করে রাতারাতি অসংখ্য রিফিউজি কলোনি বা বস্তি গড়ে তোলে।
6. উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে ভারত সরকারের উদ্যোগ এবং 'দিল্লি চুক্তি' (নেহরু-লিয়াকত চুক্তি - ১৯৫০) আলোচনা করো।
উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ:
স্বাধীনতার পর লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের সামলানো ভারত সরকারের কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার এই সমস্যা সমাধানে দুটি পদক্ষেপ নেয়—ত্রাণ ও পুনর্বাসন।
- ত্রাণ ও পুনর্বাসন: সরকার 'উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর' খুলে দেশজুড়ে অসংখ্য ট্রানজিট ক্যাম্প বা ত্রাণ শিবির গড়ে তোলে। পাঞ্জাব থেকে আগত উদ্বাস্তুদের দিল্লি, হরিয়ানা অঞ্চলে এবং পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরার বিভিন্ন ক্যাম্পে রাখা হয়। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, সামান্য সরকারি অনুদান এবং কর্মসংস্থানের জন্য লোন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
- দণ্ডকারণ্য প্রকল্প: পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের ভিড় সামলাতে না পেরে সরকার তাদের মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও ছত্তিশগড়ের গভীর জঙ্গল ঘেরা ও শুষ্ক দণ্ডকারণ্য (Dandakaranya) এবং আন্দামানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। যদিও এই প্রতিকূল পরিবেশে বাঙালি উদ্বাস্তুদের জীবন চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
দিল্লি চুক্তি বা নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (১৯৫০):
১৯৫০ সালের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) হিন্দুদের ওপর পুনরায় ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হলে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার হিন্দু ভারতে পালিয়ে আসতে থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মধ্যে নয়াদিল্লিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দিল্লি চুক্তি নামে পরিচিত।
শর্তাবলি:
১) উভয় দেশ তাদের নিজ নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের (হিন্দু ও মুসলিম) সম্পূর্ণ নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা দেবে।
২) দাঙ্গা বন্ধ করতে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ বেআইনি ঘোষিত হবে।
৩) যেসব উদ্বাস্তু ফিরে যেতে চায়, তাদের হারানো সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
প্রতিক্রিয়া: ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কে. সি. নিয়োগী মনে করেন যে পাকিস্তান এই চুক্তি মানবে না, তাই তাঁরা প্রতিবাদে নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বাস্তবেও পাকিস্তান এই চুক্তি রক্ষা করেনি এবং পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু বিতাড়ন অব্যাহত ছিল।
7. স্বাধীনতার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের (Linguistic Reorganisation of States) পটভূমি ও বিতর্ক আলোচনা করো।
ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের পটভূমি ও বিতর্ক:
ব্রিটিশ আমলে ভারতের রাজ্য বা প্রদেশগুলি (যেমন বেঙ্গল, মাদ্রাজ, বোম্বাই প্রেসিডেন্সি) প্রশাসনিক ও সামরিক সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছিল। এই সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের ভাষা বা সংস্কৃতির কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে একই রাজ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষার মানুষ বাস করত।
- জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি: ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, দেশ স্বাধীন হলে ভারতীয়দের মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা পুনর্গঠন করা হবে, যাতে প্রতিটি ভাষার মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
- স্বাধীনতার পর বিতর্ক: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দক্ষিণ ভারত ও মহারাষ্ট্রে ভাষাভিত্তিক রাজ্যের প্রবল দাবি ওঠে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল এবং ড. আম্বেদকর এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা মনে করেন যে, সদ্য দেশভাগের কারণে ভারত এমনিতেই রক্তাক্ত ও দুর্বল। এই মুহূর্তে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য ভাগ করলে উগ্র আঞ্চলিকতার সৃষ্টি হবে এবং দেশের ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হয়ে ভারত খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে।
- ধার কমিশন ও জে.ভি.পি. কমিটি (১৯৪৮): এই দাবির যৌক্তিকতা বিচারে ১৯৪৮ সালের জুনে এস. কে. ধারের নেতৃত্বে 'ধার কমিশন' এবং ডিসেম্বরে নেহরু, প্যাটেল ও পট্টভিকে নিয়ে 'JVP কমিটি' গঠিত হয়। উভয় কমিটিই ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয় এবং প্রশাসনিক সুবিধা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেয়। এর ফলে সারা দেশে, বিশেষত দক্ষিণ ভারতে, চরম ক্ষোভ ও আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে।
8. প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য হিসেবে 'অন্ধ্রপ্রদেশ' (Andhra Pradesh) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা আলোচনা করো।
অন্ধ্রপ্রদেশ সৃষ্টি (১৯৫৩):
স্বাধীনতার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের প্রবল দাবি উঠলেও ভারত সরকার (ধার কমিশন ও জেভিপি কমিটি) তা সরাসরি খারিজ করে দেয়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয় দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ প্রদেশে।
- অন্ধ্র রাজ্যের দাবি: ব্রিটিশ আমলে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মধ্যে তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ও কানাড়া—এই চার ভাষার মানুষ একসাথে বাস করত। জেভিপি কমিটির রিপোর্টের পর তেলেগু ভাষাভাষী মানুষ মাদ্রাজ ভেঙে তাদের জন্য পৃথক 'অন্ধ্র রাজ্য' গঠনের দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু করে।
- পোট্টি শ্রীরামুলুর অনশন ও মৃত্যু: সরকার এই দাবি মেনে না নেওয়ায় বিশিষ্ট গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামুলু (Potti Sriramulu) ১৯৫২ সালের ১৯ অক্টোবর পৃথক অন্ধ্র রাজ্যের দাবিতে আমৃত্যু অনশন শুরু করেন। টানা ৫৮ দিন অনশনের পর ১৯৫২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
- দাঙ্গা ও আন্দোলন: শ্রীরামুলুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সমগ্র তেলেগু অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রবল দাঙ্গা, ভাঙচুর ও বিক্ষোভ শুরু হয়। জনজীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হতে থাকে।
- অন্ধ্র রাজ্য গঠন: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বাধ্য হয়ে তেলেগু ভাষীদের দাবি মেনে নেন। ১৯৫৩ সালের ১ অক্টোবর মাদ্রাজ রাজ্যকে ভেঙে তেলেগু ভাষার ভিত্তিতে 'অন্ধ্র রাজ্য' (যা ১৯৫৬ সালে হায়দরাবাদের তেলেগু অঞ্চল নিয়ে 'অন্ধ্রপ্রদেশ' হয়) গঠন করা হয়। এটিই ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য।
9. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (State Reorganisation Commission - 1953) এবং ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইনের গুরুত্ব আলোচনা করো।
রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩):
১৯৫৩ সালে ভাষার ভিত্তিতে পৃথক 'অন্ধ্র রাজ্য' গঠিত হওয়ার পর ভারতের অন্যান্য প্রান্তেও (যেমন মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়, পাঞ্জাবি ভাষীদের মধ্যে) মাতৃভাষার ভিত্তিতে আলাদা রাজ্যের দাবি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্রমবর্ধমান দাবি ও আন্দোলনকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সমাধান করার জন্য ভারত সরকার ১৯৫৩ সালের শেষে 'রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন' (SRC) গঠন করে।
সদস্য: এই কমিশনের সভাপতি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সৈয়দ ফজল আলি। বাকি দুজন সদস্য ছিলেন পণ্ডিত হৃদয়নাথ কুঞ্জরু এবং কে. এম. পানিক্কর।
সুপারিশ ও রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬):
কমিশন প্রায় দু-বছর ধরে সারা ভারতের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ১৯৫৫ সালে তাদের রিপোর্ট পেশ করে। তারা স্বীকার করে নেয় যে, রাজ্যের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা উচিত, তবে তা যেন দেশের ঐক্য ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত না করে।
এই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতীয় সংসদে ১৯৫৬ সালে 'রাজ্য পুনর্গঠন আইন' (State Reorganisation Act) পাস হয়। এর গুরুত্বগুলি হল:
- ব্রিটিশ আমলের অবৈজ্ঞানিক A, B, C, D ক্যাটাগরির রাজ্য বিভাজন বাতিল করে দেওয়া হয়।
- ভাষার ভিত্তিতে ভারতের সীমানা পুনর্বিন্যাস করে সমগ্র ভারতকে ১৪টি রাজ্য (States) এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (Union Territories) বিভক্ত করা হয় (যেমন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, বম্বে, মাদ্রাজ)।
- এই আইন ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রকে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে স্বীকৃতি দিয়ে আঞ্চলিক ক্ষোভ প্রশমিত করেছিল।
10. ভারতের সরকারি ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা (Official Language) নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক বা সমস্যা (হিন্দি বনাম ইংরেজি) সৃষ্টি হয়েছিল তা আলোচনা করো।
সরকারি ভাষা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক:
ভারত বহু ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। তাই স্বাধীনতার পর কোন্ ভাষাটি স্বাধীন ভারতের সরকারি ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা হবে, তা নিয়ে গণপরিষদে এক দীর্ঘ ও তিক্ত বিতর্ক দেখা দেয়।
- সংবিধানের স্বীকৃতি: দীর্ঘ বিতর্কের পর সংবিধানের ৩৪৩ নং ধারায় স্থির হয় যে, দেবনাগরী হরফে লেখা 'হিন্দি' (Hindi) ভাষাই হবে ভারতের সরকারি কাজের প্রধান ভাষা। তবে অ-হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্যগুলির (বিশেষত দক্ষিণ ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারত) তীব্র বিরোধিতার কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, সংবিধান চালুর দিন থেকে আগামী ১৫ বছর পর্যন্ত (অর্থাৎ ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত) সরকারি কাজেকর্মে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি (English) ভাষাও সমমর্যাদায় ব্যবহার করা যাবে।
- ১৯৬০-এর দশকের ভাষা আন্দোলন: ১৯৬৫ সাল এগিয়ে এলে অ-হিন্দি রাজ্যগুলিতে ভয় দেখা দেয় যে এরপর থেকে তাদের ওপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং সরকারি চাকরিতে হিন্দিভাষীরা সুবিধা পাবে। এর ফলে তামিলনাড়ু (মাদ্রাজ), পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যে 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ'-এর বিরুদ্ধে তীব্র ও সহিংস ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। তামিলনাড়ুর পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে এবং দাঙ্গায় বহু মানুষ মারা যায়।
- সমস্যার সমাধান (ভাষা আইন ১৯৬৩ ও ১৯৬৭): দেশের ঐক্য রক্ষার্থে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু 'অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট' (১৯৬৩) পাস করে আশ্বাস দেন যে ১৯৬৫ সালের পরও ইংরেজি ভাষার ব্যবহার চলবে। পরে লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলে এই আইন সংশোধন করে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে, যতদিন অ-হিন্দি রাজ্যগুলি চাইবে, ততদিন পর্যন্ত হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজিও ভারতের সরকারি বা সহযোগী ভাষা হিসেবে চালু থাকবে। এর ফলে ভাষা বিতর্কের অবসান ঘটে।
মনে রেখো!
সংযুক্তি: সর্দার প্যাটেল (লৌহমানব) ৫৬৫টি রাজ্যকে ভারতে যুক্ত করেন। কাশ্মীর (হরি সিং), হায়দরাবাদ (অপারেশন পোলো)।
উদ্বাস্তু সমস্যা: দেশভাগের ফলে সৃষ্ট সমস্যা, ১৯৫০ সালে দিল্লি চুক্তি (নেহরু-লিয়াকত প্যাক্ট) স্বাক্ষরিত হয়।
রাজ্য পুনর্গঠন: পোট্টি শ্রীরামুলুর মৃত্যুতে ১৯৫৩ সালে প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ গঠিত হয়।
সংবিধান: ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের নতুন সংবিধান কার্যকর হয়।