Chapter 2: সংস্কার : বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়ন

উনিশ শতকের বাংলা, পত্রপত্রিকা, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার, ব্রাহ্ম আন্দোলন এবং রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শ | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর (WBBSE 2027)

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 15 March 2026 Last Update: 30 May 2026
Chapter 2: সংস্কার ও মূল্যায়ন | Madhyamik History

Chapter 2: সংস্কার : বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়ন

সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 50 MCQ | 45 SAQ | 10 Broad Questions

পত্রপত্রিকা শিক্ষা সংস্কার সতীদাহ রদ ব্রাহ্ম আন্দোলন নব্য হিন্দুধর্ম

শিক্ষা ও সাহিত্য

মেকলে মিনিট, উডের ডেসপ্যাচ, নীলদর্পণ এবং হুতোমপ্যাঁচার নকশা

সমাজ সংস্কার

সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ, ব্রাহ্ম আন্দোলন এবং নবজাগরণ

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

50 টি
1. 'বামাবোধিনী' পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?
ক) উমেশচন্দ্র দত্ত
খ) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ
গ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
2. 'বামাবোধিনী' সভা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে
3. 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
ক) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
খ) গিরিশচন্দ্র ঘোষ
গ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘ) শিশিরকুমার ঘোষ
4. নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোন্ পত্রিকা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিল?
ক) সোমপ্রকাশ
খ) হিন্দু প্যাট্রিয়ট
গ) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা
ঘ) বঙ্গদর্শন
5. 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' পত্রিকা কোথা থেকে প্রকাশিত হত?
ক) কলকাতা
খ) কুষ্টিয়ার কুমারখালি
গ) শ্রীরামপুর
ঘ) ঢাকা
6. 'কাঙাল হরিনাথ' নামে কে পরিচিত ছিলেন?
ক) হরিনাথ মজুমদার
খ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
গ) উমেশচন্দ্র দত্ত
ঘ) দীনবন্ধু মিত্র
7. 'হুতোমপ্যাঁচার নকশা' গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) কালীপ্রসন্ন সিংহ
গ) প্যারিচাঁদ মিত্র
ঘ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
8. 'নীলদর্পণ' নাটকটি কে রচনা করেন?
ক) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
খ) দীনবন্ধু মিত্র
গ) রেভারেন্ড জেমস লং
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
9. 'নীলদর্পণ' নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ কে করেছিলেন?
ক) রেভারেন্ড জেমস লং
খ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
গ) লর্ড ক্যানিং
ঘ) উইলিয়াম কেরি
10. এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
11. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (Fort William College) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
12. শ্রীরামপুর ত্রয়ী নামে কারা পরিচিত ছিলেন?
ক) কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ড
খ) হেয়ার, ডিরোজিও, ড্রিংকওয়াটার বেথুন
গ) রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র
ঘ) রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, নিবেদিতা
13. হিন্দু কলেজ (Hindu College) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে
14. হিন্দু কলেজের বর্তমান নাম কী?
ক) স্কটিশ চার্চ কলেজ
খ) প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়
গ) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
ঘ) বিদ্যাসাগর কলেজ
15. জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) আলেকজান্ডার ডাফ
খ) ডেভিড হেয়ার
গ) লর্ড মেকলে
ঘ) উইলিয়াম কেরি
16. 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute) কবে পেশ করা হয়?
ক) ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে
17. কলকাতা মেডিকেল কলেজ (Calcutta Medical College) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে
18. কলকাতা মেডিকেল কলেজে প্রথম শবব্যবচ্ছেদ কে করেন?
ক) মধুসূদন গুপ্ত
খ) রাজেন্দ্রলাল মিত্র
গ) কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়
ঘ) মহেন্দ্রলাল সরকার
19. ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কে ছিলেন?
ক) চন্দ্রমুখী বসু
খ) কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়
গ) আনন্দীবাই যোশী
ঘ) স্বর্ণকুমারী দেবী
20. ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা (Magna Carta) বা মহাসনদ কাকে বলা হয়?
ক) ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট
খ) মেকলে মিনিট
গ) উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch)
ঘ) হান্টার কমিশন
21. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (Calcutta University) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
22. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Vice-Chancellor) কে ছিলেন?
ক) জেমস উইলিয়াম কোলভিল
খ) লর্ড ক্যানিং
গ) গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
23. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য কে ছিলেন?
ক) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
খ) স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
24. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক (Graduate) কারা ছিলেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ বসু
খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু
গ) রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগর
ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দ ঘোষ
25. সতীদাহ প্রথা কবে রদ করা হয়?
ক) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
26. বিধবা বিবাহ আইন কবে পাস হয়?
ক) ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে
27. তত্ত্ববোধিনী সভা কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) কেশবচন্দ্র সেন
ঘ) শিবনাথ শাস্ত্রী
28. ব্রাহ্মসমাজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে
29. 'ব্রহ্মানন্দ' উপাধি কে লাভ করেছিলেন?
ক) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) কেশবচন্দ্র সেন
গ) রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব
ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
30. ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) কেশবচন্দ্র সেন
ঘ) শিবনাথ শাস্ত্রী
31. নববিধান ব্রাহ্মসমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) শিবনাথ শাস্ত্রী
খ) কেশবচন্দ্র সেন
গ) আনন্দমোহন বসু
ঘ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়
32. সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) কেশবচন্দ্র সেন
খ) শিবনাথ শাস্ত্রী ও আনন্দমোহন বসু
গ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) রামমোহন রায়
33. নব্যবঙ্গ (Young Bengal) দলের প্রবর্তক কে ছিলেন?
ক) ডেভিড হেয়ার
খ) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও
গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
34. অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন (Academic Association) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ডিরোজিও
খ) রামমোহন রায়
গ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
35. তিন আইন (Three Acts) কবে পাস হয়?
ক) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে
36. 'যত মত, তত পথ' এই আদর্শ কে প্রচার করেছিলেন?
ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব
গ) স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ) দয়ানন্দ সরস্বতী
37. রামকৃষ্ণ মিশন (Ramakrishna Mission) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে
38. শিকাগো ধর্মমহাসম্মেলন কবে অনুষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৮৫ সালে
খ) ১৮৯০ সালে
গ) ১৮৯৩ সালে
ঘ) ১৮৯৭ সালে
39. নববেদান্তবাদ (Neo-Vedanta) এর প্রবক্তা কে ছিলেন?
ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) শ্রীরামকৃষ্ণ
গ) স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ) শ্রীঅরবিন্দ
40. নব্য হিন্দুধর্ম (Neo-Hinduism) এর প্রবক্তা কে ছিলেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) স্বামী বিবেকানন্দ
গ) শ্রীরামকৃষ্ণ
ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
41. 'বর্তমান ভারত' গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) স্বামী বিবেকানন্দ
গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
42. কলকাতায় 'বেথুন স্কুল' (Bethune School) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮১৭ সালে
খ) ১৮৪৯ সালে
গ) ১৮৫৬ সালে
ঘ) ১৮৭৯ সালে
43. 'বিদ্যাদর্শন' পত্রিকা কে প্রকাশ করতেন?
ক) অক্ষয়কুমার দত্ত
খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
44. ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র কোনটি ছিল?
ক) সোমপ্রকাশ
খ) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা
গ) বামাবোধিনী
ঘ) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা
45. লালন ফকির কোন্ ধারার সাধক ছিলেন?
ক) বাউল
খ) বৈষ্ণব
গ) সুফি
ঘ) শাক্ত
46. উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণকে 'এলিটিস্ট' (Elitist) আন্দোলন বলে কে সমালোচনা করেছেন?
ক) যদুনাথ সরকার
খ) সুশোভন সরকার
গ) অনিল শীল
ঘ) রমেশচন্দ্র মজুমদার
47. প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বন্দ্বের অবসান কে ঘটান?
ক) লর্ড মেকলে
খ) লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
গ) লর্ড অকল্যান্ড
ঘ) স্যার চার্লস উড
48. বাংলার প্রথম আধুনিক মানুষ (First Modern Man of India) কাকে বলা হয়?
ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) রামমোহন রায়
গ) স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ) ডিরোজিও
49. কলকাতায় 'মাদ্রাজ-ই-আলিয়া' বা কলকাতা মাদ্রাসা কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ওয়ারেন হেস্টিংস
খ) লর্ড কর্নওয়ালিস
গ) লর্ড ওয়েলেসলি
ঘ) উইলিয়াম কেরি
50. বেনারসে 'সংস্কৃত কলেজ' কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) জোনাথান ডানকান
খ) ওয়ারেন হেস্টিংস
গ) উইলিয়াম জোন্স
ঘ) লর্ড মেকলে

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)

45 টি
1. উনিশ শতকের 'ভদ্রলোক' বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি কাদের বলা হত?
উনিশ শতকের বাংলায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, সচ্ছল, এবং সরকারি চাকরি বা স্বাধীন পেশায় নিযুক্ত (যথা উকিল, ডাক্তার, শিক্ষক) সম্প্রদায়কে 'ভদ্রলোক' বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলা হত।
2. 'বামাবোধিনী' পত্রিকা কবে, কার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়?
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে উমেশচন্দ্র দত্তের সম্পাদনায় 'বামাবোধিনী' নামক মাসিক পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। বামা অর্থাৎ নারীদের অধিকার ও শিক্ষার উন্নতির উদ্দেশ্যে এটি প্রকাশিত হত।
3. 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন? পরে কে এর দায়িত্ব নেন?
১৮৫৩ সালে গিরিশচন্দ্র ঘোষ 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা প্রথম সম্পাদনা শুরু করেন। পরে ১৮৫৫ সালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এর সম্পাদক হন এবং এটিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলেন।
4. 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রধান ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এই পত্রিকা নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার, সাঁওতাল বিদ্রোহের খবর এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারাকে অত্যন্ত নির্ভীকভাবে তুলে ধরেছিল।
5. 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' পত্রিকা কবে, কোথা থেকে প্রকাশিত হয়?
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার (বর্তমানে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া) কুমারখালি গ্রাম থেকে কাঙাল হরিনাথ বা হরিনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
6. 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' পত্রিকার বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
এটি ছিল মূলত গ্রামবাংলার মুখপত্র। তৎকালীন নীলকর সাহেব, জমিদার ও মহাজনদের শোষণ এবং গ্রামীণ মানুষের চরম দুর্দশার কথা এই পত্রিকায় সাহসিকতার সাথে তুলে ধরা হত।
7. 'হুতোমপ্যাঁচার নকশা' গ্রন্থটির রচয়িতা কে? এটি কবে প্রকাশিত হয়?
১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে কালীপ্রসন্ন সিংহ 'হুতোমপ্যাঁচা' ছদ্মনামে এই বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক ও নকশাধর্মী গ্রন্থটি রচনা করেন।
8. 'হুতোমপ্যাঁচার নকশা' গ্রন্থে কাদের সমালোচনা করা হয়েছে?
এই গ্রন্থে উনিশ শতকের কলকাতার নব্যধনী বাবু সমাজ, তাদের মাত্রাতিরিক্ত বিলাসব্যসন, মদ্যপান, চড়ক পূজা, এবং ভণ্ড ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করা হয়েছে।
9. 'নীলদর্পণ' নাটক কে রচনা করেন? এর বিষয়বস্তু কী ছিল?
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে দীনবন্ধু মিত্র 'নীলদর্পণ' নাটক রচনা করেন। এর বিষয়বস্তু ছিল বাংলার অসহায় নীলচাষিদের ওপর ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অমানবিক অত্যাচার ও শোষণের বাস্তব চিত্র।
10. 'নীলদর্পণ' নাটকের ইংরেজি অনুবাদের নাম কী এবং তা কে প্রকাশ করেন?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন, যার নাম ছিল 'Nil Darpan, or The Indigo Planting Mirror'। এটি রেভারেন্ড জেমস লং-এর নামে প্রকাশিত হওয়ায় তাঁর এক মাসের জেল ও হাজার টাকা জরিমানা হয়েছিল।
11. কলকাতা মাদ্রাসা এবং বেনারস সংস্কৃত কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা এবং ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে জোনাথান ডানকান বেনারস সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
12. এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) কবে, কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে স্যার উইলিয়াম জোন্স এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রাচ্যবিদ্যা, প্রাচীন সাহিত্য, ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের গবেষণা করা।
13. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮০০ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসলি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সিভিলিয়ান বা আধিকারিকদের ভারতীয় ভাষা, আইন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।
14. শ্রীরামপুর ত্রয়ী কাদের বলা হয়?
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের তিনজন বিখ্যাত খ্রিস্টান মিশনারি— উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড-কে একত্রে 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' বলা হয়।
15. হিন্দু কলেজ কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ার, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট, রাধাকান্ত দেব প্রমুখের উদ্যোগে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)।
16. কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ ঘড়ি-নির্মাতা ও শিক্ষানুরাগী ডেভিড হেয়ার স্থানীয় ছাত্রদের জন্য সুলভে বা বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের উদ্দেশ্যে 'কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করেন।
17. মেকলে মিনিট (Macaulay's Minute) কী?
১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন, যেখানে তিনি ভারতে সরকারিভাবে ইংরেজি বা পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের জোর দাবি জানান। এটিই মেকলে মিনিট নামে পরিচিত।
18. 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' বা 'ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি' কী?
মেকলে বিশ্বাস করতেন যে, সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করলে সেই শিক্ষা তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাজের নীচুতলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। একেই 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' (Downward Filtration Theory) বলে।
19. উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) কী?
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ও নির্দেশনামা পেশ করেন। একেই উডের ডেসপ্যাচ বা ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।
20. কলকাতা মেডিকেল কলেজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের নির্দেশে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
21. মধুসূদন গুপ্ত কেন বিখ্যাত?
পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র এবং পরবর্তীকালে শিক্ষক। তিনি ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম হিন্দু বা ভারতীয় হিসেবে মানুষের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ (Dissection) করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
22. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর প্রথম ভারতীয় উপাচার্য কে ছিলেন?
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম ভারতীয় উপাচার্য (Vice-Chancellor) ছিলেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯০)।
23. কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় কে ছিলেন?
কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (এবং আনন্দীবাই যোশী) ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক (১৮৮৩) এবং প্রথম মহিলা চিকিৎসক। তিনি নারীশিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
24. তত্ত্ববোধিনী সভা কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের প্রচার এবং হিন্দুধর্মের সংস্কারের উদ্দেশ্যে তত্ত্ববোধিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেন।
25. সতীদাহ প্রথা কবে, কার উদ্যোগে রদ হয়?
রাজা রামমোহন রায়ের নিরলস আন্দোলনের ফলে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৭ নং রেগুলেশন আইন পাস করে সতীদাহ প্রথাকে বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেন।
26. বিধবা বিবাহ আইন কবে, কার উদ্যোগে পাস হয়?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রবল প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই লর্ড ডালহৌসি হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন (Hindu Widows' Remarriage Act) পাস করেন।
27. নব্যবঙ্গ (Young Bengal) দল কাদের বলা হত?
উনিশ শতকে হিন্দু কলেজের তরুণ ও যুক্তিবাদী অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত একদল তরুণ ছাত্রকে নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল দল বলা হত (যেমন: প্যারিচাঁদ মিত্র, রামতনু লাহিড়ী)।
28. ডিরোজিওর অনুগামীরা কোন্ দুটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন?
নব্যবঙ্গ দলের সদস্যরা 'পার্থেনন' (Parthenon), 'ক্যালেইডোস্কোপ' (Kaleidoscope) এবং 'এনকোয়েরার' (Enquirer) নামক পত্রিকা প্রকাশ করে সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করতেন।
29. অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন কী?
১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ, কুসংস্কারের বিরোধিতা এবং দেশপ্রেম জাগানোর জন্য যে বিতর্ক সভা বা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন, তাকে অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন বলে।
30. ব্রাহ্মসমাজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট রাজা রামমোহন রায় 'ব্রাহ্মসভা' প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৮৩০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে 'ব্রাহ্মসমাজ' রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল একেশ্বরবাদ প্রচার করা।
31. 'ব্রহ্মানন্দ' উপাধি কে, কাকে দিয়েছিলেন?
১৮৬২ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান সংগঠক কেশবচন্দ্র সেনের অসাধারণ বাগ্মিতা ও কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে 'ব্রহ্মানন্দ' উপাধি দিয়েছিলেন।
32. ব্রাহ্মসমাজে প্রথম ভাঙন কবে ও কেন হয়?
১৮৬৬ সালে প্রবীণ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নবীন কেশবচন্দ্র সেনের মধ্যে আদর্শগত বিরোধের কারণে ব্রাহ্মসমাজে প্রথম ভাঙন ধরে। কেশবচন্দ্র 'ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ' এবং দেবেন্দ্রনাথ 'আদি ব্রাহ্মসমাজ' গঠন করেন।
33. সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ কবে, কারা প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র সেন তাঁর নাবালিকা কন্যা সুনীতির সাথে কোচবিহারের মহারাজার বিবাহ দিলে ব্রাহ্ম আদর্শ ক্ষুণ্ণ হয়। এর প্রতিবাদে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ' প্রতিষ্ঠা করেন।
34. তিন আইন (Three Acts) কী?
কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মদের নিরন্তর আন্দোলনের ফলে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার 'নেটিভ ম্যারেজ অ্যাক্ট' বা তিন আইন পাস করে। এর ফলে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং অসবর্ণ বিবাহ ও বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়।
35. 'নববিধান' ব্রাহ্মসমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৮০ সালে কেশবচন্দ্র সেন তাঁর অনুগামীদের নিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শে 'নববিধান' (New Dispensation) নামক নতুন ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
36. 'যত মত, তত পথ' কথাটির অর্থ কী?
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই বাণী প্রচার করেছিলেন। এর অর্থ হল—সব ধর্মই সত্য, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, এবং বিভিন্ন ধর্মের পথ আলাদা হলেও গন্তব্য বা ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্য একই। এটি সর্বধর্ম সমন্বয়ের মূল কথা।
37. রামকৃষ্ণ মিশন কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮۹৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শে মানবসেবার উদ্দেশ্যে হাওড়ার বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
38. নববেদান্তবাদ (Neo-Vedanta) কী?
স্বামী বিবেকানন্দ শঙ্করাচার্যের বেদান্ত দর্শনকে আধুনিক ও বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত করে যে নতুন ধর্মাদর্শ প্রচার করেন, তাকে নববেদান্তবাদ বলে। তাঁর মতে, মূর্তিপূজার চেয়ে জীবে প্রেম বা মানবসেবাই হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
39. নব্য হিন্দুধর্ম (Neo-Hinduism) বলতে কী বোঝো?
উনিশ শতকের শেষদিকে স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের অন্ধ কুসংস্কার, জাতপাত ও অস্পৃশ্যতা দূর করে, শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয় এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যে নতুন ও শক্তিশালী হিন্দুধর্মের রূপ দেন, তাকে নব্য হিন্দুধর্ম বলে।
40. 'বর্তমান ভারত' গ্রন্থটি কার লেখা? এর বিষয়বস্তু কী?
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'বর্তমান ভারত' (১৮৯৯) গ্রন্থে বৈদিক যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ভারতের যুবসমাজকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
41. কলকাতায় 'বেথুন স্কুল' কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
নারীশিক্ষার প্রসারে জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে 'হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত হয়।
42. প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বন্দ্ব কী?
১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে ভারতের শিক্ষার জন্য বাৎসরিক এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু এই টাকা সংস্কৃত-আরবি (প্রাচ্য) শিক্ষায় নাকি ইংরেজি-বিজ্ঞান (পাশ্চাত্য) শিক্ষায় ব্যয় হবে, তা নিয়ে জনশিক্ষা কমিটিতে যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তাকে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বন্দ্ব বা Orientalist-Anglicist controversy বলে।
43. মেকলে মিনিট কীভাবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের অবসান ঘটায়?
১৮৩৫ সালে মেকলে তাঁর মিনিটে স্পষ্টভাবে জানান যে ভারতীয় শিক্ষা অপেক্ষা পাশ্চাত্য শিক্ষা অনেক উন্নত। লর্ড বেন্টিঙ্ক এই মত মেনে সরকারিভাবে ইংরেজি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দিলে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।
44. বাংলার নবজাগরণকে 'এলিটিস্ট' (Elitist) বা উচ্চবর্গীয় আন্দোলন বলা হয় কেন?
কারণ উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রভাব কেবল শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের সাধারণ দরিদ্র কৃষক বা শ্রমিকদের এর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই একে মুষ্টিমেয় এলিটিস্টদের আন্দোলন বলা হয়।
45. বাংলার নবজাগরণকে ইতালির নবজাগরণের (Renaissance) সাথে তুলনা করা কতটা যুক্তিসংগত?
ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের নবজাগরণ সমগ্র সমাজ, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু বাংলার নবজাগরণ ছিল শহরকেন্দ্রিক, ব্রিটিশ-নির্ভর এবং সীমিত মানুষের মধ্যে আবদ্ধ। তাই একে সত্যিকারের রেনেসাঁস বলা পুরোপুরি যুক্তিসংগত নয়।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)

10 টি
1. উনিশ শতকের বাংলার সমাজচিত্র প্রতিফলনে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' (Hindoo Patriot) পত্রিকার ভূমিকা আলোচনা করো।

'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার ভূমিকা:

১৮৫৩ সালে গিরিশচন্দ্র ঘোষের সম্পাদনায় 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা প্রকাশিত হলেও, ১৮৫৫ সালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এর সম্পাদক হওয়ার পর এটি বাংলার জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী মুখপত্রে পরিণত হয়। এর অবদানগুলি হল:

  1. নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিবাদ: এই পত্রিকার সবচেয়ে বড়ো অবদান ছিল নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) সময় বাংলার নীলচাষিদের পাশে দাঁড়ানো। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নির্ভীকভাবে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার, লুণ্ঠন এবং কৃষকদের চরম দুর্দশার কথা দিনের পর দিন তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করে নীলচাষিদের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।
  2. সাঁওতাল বিদ্রোহের সমর্থন: ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহকে এই পত্রিকা ব্রিটিশ সরকারের চোখে শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে না দেখে, জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র আদিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেছিল।
  3. দেশীয় রাজাদের অধিকার রক্ষা: লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি'র তীব্র সমালোচনা করে এই পত্রিকা দেশীয় রাজাদের অধিকার রক্ষার পক্ষে সওয়াল করেছিল।
  4. শিক্ষিত সমাজের মুখপত্র: এটি ছিল ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকা। ফলে দেশীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মধ্যে ভারতের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে এই পত্রিকা সেতুবন্ধনের কাজ করেছিল।
2. উনিশ শতকের বাংলার সমাজ দর্পণে 'হুতোমপ্যাঁচার নকশা' (Hutom Pyanchar Naksha) গ্রন্থটির গুরুত্ব আলোচনা করো।

'হুতোমপ্যাঁচার নকশা' গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে কালীপ্রসন্ন সিংহ 'হুতোমপ্যাঁচা' ছদ্মনামে এই বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক ও নকশাধর্মী গ্রন্থটি রচনা করেন। উনিশ শতকের কলকাতার সমাজচিত্রের এক নিখুঁত দর্পণ হল এই গ্রন্থ:

  1. বাবু সংস্কৃতির সমালোচনা: ব্রিটিশদের সংস্পর্শে এসে হঠাৎ বড়োলোক হওয়া কলকাতার একশ্রেণির নব্যধনী 'বাবু'দের মাত্রাতিরিক্ত বিলাসব্যসন, মদ্যপান, বাইজি নাচানো এবং অপসংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা এই গ্রন্থে করা হয়েছে।
  2. ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন: সমাজের বিভিন্ন স্তরের ভণ্ড মানুষ, বিশেষ করে ধর্মীয় গুরু, নকল সাহেব সাজা বাঙালি যুবক এবং স্বার্থপর জমিদারদের প্রকৃত চরিত্র কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর তীব্র ব্যঙ্গাত্মক লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
  3. কলকাতার উৎসব ও জনজীবন: এই গ্রন্থে তৎকালীন কলকাতার চড়ক পূজা, রথযাত্রা, দুর্গাপূজা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অত্যন্ত জীবন্ত ও রসাত্মক বিবরণ পাওয়া যায়।
  4. কথ্য ভাষার ব্যবহার: এই গ্রন্থের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল এর ভাষা। প্রথাগত সংস্কৃতঘেঁষা সাধু ভাষার পরিবর্তে কলকাতার সাধারণ মানুষের মুখের কথ্য ভাষায় (চলিত ভাষা) এটি রচিত, যা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
3. নারী শিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (Ishwar Chandra Vidyasagar) অবদান আলোচনা করো।

নারী শিক্ষায় বিদ্যাসাগরের অবদান:

উনিশ শতকে বাংলার নারী শিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এক অগ্রগণ্য পথপ্রদর্শক। তাঁর অবদানগুলি হল:

  1. বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা: ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুনের সাথে যৌথ উদ্যোগে তিনি কলকাতায় 'হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়' (পরবর্তীকালে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এই বিদ্যালয়ের অবৈতনিক সম্পাদক। এই স্কুল নারীশিক্ষার প্রসারে এক মাইলফলক।
  2. বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন: সরকারি বিদ্যালয় পরিদর্শক (Inspector of Schools) থাকাকালীন বিদ্যাসাগর নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় সম্পূর্ণ নিজের খরচে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যেখানে প্রায় ১৩০০ ছাত্রী পড়াশোনা করত।
  3. সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম: সে যুগে মেয়েদের বাড়ির বাইরে গিয়ে লেখাপড়া করাকে পাপ মনে করা হত। বিদ্যাসাগর বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
  4. নারীশিক্ষার তহবিল গঠন: নারীশিক্ষার খরচের জন্য তিনি 'নারীশিক্ষা ভাণ্ডার' নামে একটি তহবিল গঠন করেন। তিনি চেয়েছিলেন নারীরা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াক এবং সমাজের কুসংস্কার থেকে মুক্ত হোক। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার জন্যই তাঁকে ভারতে নারীশিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়।
4. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের (Raja Rammohan Roy) ভূমিকা মূল্যায়ন করো।

পাশ্চাত্য শিক্ষায় রামমোহন রায়ের ভূমিকা:

রাজা রামমোহন রায় বিশ্বাস করতেন যে ভারতের পিছিয়ে পড়া সমাজকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করতে হলে পাশ্চাত্য শিক্ষা (ইংরেজি, বিজ্ঞান ও গণিত) একান্ত অপরিহার্য। তাঁর অবদানগুলি হল:

  1. অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় 'অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইংরেজি ভাষা এবং আধুনিক বিজ্ঞান পড়ানো হত। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
  2. লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি (১৮২৩): সরকার যখন ১৮২৩ সালে কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন রামমোহন রায় বড়োলাট লর্ড আমহার্স্টকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখে এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি দাবি করেন যে সরকারের উচিত সংস্কৃতের বদলে আধুনিক ইংরেজি এবং বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করা।
  3. ডেভিড হেয়ারকে সহযোগিতা: ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে হিন্দু কলেজ (প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠার সময় রামমোহন রায় তাঁকে সমস্ত রকম সাহায্য করেছিলেন। যদিও রক্ষণশীল হিন্দুদের বিরোধিতায় তিনি এর পরিচালনা কমিটিতে থাকেননি।
  4. বেদান্ত কলেজ স্থাপন: ১৮২৬ সালে তিনি বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান পড়ানো হত। রামমোহন ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারার এক অপূর্ব সমন্বয়।
5. ভারতে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিকাশে কলকাতা মেডিকেল কলেজের (Calcutta Medical College) ভূমিকা আলোচনা করো।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা:

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারে এটি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ:

  1. আধুনিক চিকিৎসার সূচনা: এর আগে ভারতে মূলত আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা প্রচলিত ছিল। কলকাতা মেডিকেল কলেজেই প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচে আধুনিক অ্যানাটমি (Anatomy), সার্জারি, এবং ঔষধবিদ্যা পড়ানো শুরু হয়।
  2. মধুসূদন গুপ্তের শবব্যবচ্ছেদ: সে যুগে হিন্দু ধর্মে মড়া ছোঁয়া মহাপাপ বলে গণ্য করা হত। এই কুসংস্কার ভেঙে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত প্রথম ভারতীয় হিসেবে মানুষের শবব্যবচ্ছেদ (Dissection) করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এটি ছিল বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মানসিকতার এক বিরাট জয়।
  3. হাসপাতাল স্থাপন: মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য ১৮৩৮ সালে এর সাথে একটি বিশাল হাসপাতাল (বর্তমান কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) যুক্ত করা হয়।
  4. নারী চিকিৎসকদের উদ্ভব: এই কলেজ থেকেই কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো নারীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রি লাভ করে ভারতের নারী প্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিলেন। এটি ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় নিয়ে আসে।
6. উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজের (Brahmo Samaj) অবদান আলোচনা করো।

সমাজ সংস্কারে ব্রাহ্মসমাজের অবদান:

১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজ উনিশ শতকের বাংলায় ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল:

  1. সতীদাহ প্রথা রদ: রামমোহন রায় এবং ব্রাহ্মসমাজের তীব্র আন্দোলনের ফলেই ১৮২৯ সালে অমানবিক সতীদাহ প্রথা আইন করে রদ করা সম্ভব হয়।
  2. বিধবা বিবাহ ও নারীমুক্তি: ব্রাহ্মসমাজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন করেছিল। এছাড়া স্ত্রী-শিক্ষা প্রসার, অবরোধ প্রথার বিলোপ এবং নারীদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কেশবচন্দ্র সেন এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ (যেমন 'বামাবোধিনী' পত্রিকা) নিরলস কাজ করেছিল।
  3. বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রদ (তিন আইন): কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মদের লাগাতার আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার ১৮৭২ সালে 'তিন আইন' (Native Marriage Act) পাস করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বেআইনি ঘোষিত হয় এবং অসবর্ণ ও বিধবা বিবাহ আইনি স্বীকৃতি পায়।
  4. জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা: ব্রাহ্মসমাজ জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দুধর্মের কঠোর জাতিভেদ প্রথা এবং অস্পৃশ্যতার তীব্র বিরোধিতা করে মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসুরা এই বিষয়ে অগ্রণী ছিলেন।
7. নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল (Young Bengal) আন্দোলনের কারণ ও এর সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো।

নব্যবঙ্গ আন্দোলন:

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর মুক্তচিন্তা ও ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত একদল তরুণ ছাত্র (যেমন রামতনু লাহিড়ী, প্যারিচাঁদ মিত্র, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়) হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যে চরম যুক্তিবাদী ও প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তাকে নব্যবঙ্গ আন্দোলন বলে।

সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতার কারণ:

এই আন্দোলন প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি, কারণ:

  1. নেতিবাচক ও চরমপন্থী মানসিকতা: ডিরোজিয়ানরা হিন্দু ধর্ম ও প্রথাকে এত তীব্রভাবে আক্রমণ ও উপহাস করেছিল (যেমন প্রকাশ্যে গোমাংস খাওয়া বা পৈতে ছেঁড়া) যে তা সাধারণ মানুষের মনে আঘাত দিয়েছিল। এদের কোনো গঠনমূলক সংস্কার কর্মসূচি ছিল না।
  2. জনসমর্থনের অভাব: এই আন্দোলন শুধুমাত্র কলকাতা শহরের মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত ও ইংরেজি শিক্ষিত যুবকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ বা গরিব কৃষক-শ্রমিকদের সাথে এদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
  3. উচিত নেতৃত্বের অভাব: ১৮৩১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে ডিরোজিওর আকস্মিক মৃত্যুতে এই আন্দোলন উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়ে।
  4. ব্রিটিশ নির্ভরশীলতা: ডিরোজিয়ানরা পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি এত বেশি অন্ধ অনুরাগী ছিল যে, তারা ব্রিটিশ শাসনের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখত। ফলে দেশবাসীর কাছে তারা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
8. শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয় (Harmony of Religions) আদর্শটি ব্যাখ্যা করো।

শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয় আদর্শ:

উনিশ শতকে যখন ভারতে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে ভেদাভেদ এবং ব্রাহ্ম ও হিন্দুধর্মের মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন দক্ষিণেশ্বরের সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর সহজ-সরল বাণীতে 'সর্বধর্ম সমন্বয়'-এর এক মহান আদর্শ প্রচার করেন। এর মূল কথাগুলি হল:

  1. 'যত মত, তত পথ': শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের সাধনা করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। বিভিন্ন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান বা মতবাদ আলাদা হলেও সবার গন্তব্য বা ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্য একই। তাই তিনি বলেছিলেন, 'যত মত, তত পথ'।
  2. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: তাঁর মতে, জলকে কেউ 'ওয়াটার', কেউ 'পানি' আবার কেউ 'জল' বললেও বস্তুটা যেমন একই থাকে, তেমনি ঈশ্বর, আল্লাহ বা গড নাম আলাদা হলেও তিনি একই পরম সত্তা। এই মতবাদ সমাজে তীব্র সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ দূর করে সম্প্রীতি স্থাপনে সাহায্য করেছিল।
  3. সহজ ভাষায় ধর্মপ্রচার: তিনি কোনো জটিল দার্শনিক তত্ত্ব বা পুঁথির ভাষা ব্যবহার করেননি। গ্রামের সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে তিনি এই উদার ও মানবিক ধর্মের কথা প্রচার করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর এই আদর্শকেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
9. স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) নববেদান্তবাদ (Neo-Vedanta) এবং সমাজ সংস্কারের আদর্শ আলোচনা করো।

স্বামী বিবেকানন্দের নববেদান্তবাদ ও সমাজ সংস্কার:

স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচীন শঙ্করাচার্যের বেদান্ত দর্শনকে কেবল সন্ন্যাসীদের ধ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে আধুনিক ও বাস্তব মানুষের সমাজজীবনে প্রয়োগ করেছিলেন। এটিই 'নববেদান্তবাদ' বা 'ব্যবহারিক বেদান্ত' (Practical Vedanta) নামে পরিচিত। এর মূল ভিত্তিগুলি হল:

  1. নরনারায়ণ সেবা: বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি মানুষের ভেতরেই ঈশ্বরের অবস্থান। তাই মন্দিরে মূর্তিপূজার চেয়ে গরিব, দুঃখী ও আর্ত মানুষের সেবাই হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তাঁর বিখ্যাত বাণী— 'জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর'।
  2. নব্য হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠা: তিনি হিন্দুধর্মের অস্পৃশ্যতা, জাতপাত এবং অন্ধ কুসংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি 'ছোঁয়াছুঁয়ি' ধর্মকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন হিন্দুধর্ম এখন 'ভাতের হাঁড়িতে' প্রবেশ করেছে। তিনি একটি আত্মবিশ্বাসী, শক্তিশালী ও কুসংস্কারমুক্ত নব্য হিন্দুধর্মের ডাক দিয়েছিলেন।
  3. রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা: তাঁর এই মানবসেবার আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য তিনি ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও বন্যা, খরা বা যেকোনো দুর্যোগে আর্তের সেবায় নিবেদিত প্রাণ।
  4. জাতীয়তাবাদের বিকাশ: তাঁর 'বর্তমান ভারত' গ্রন্থে তিনি যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী (গীতা পাঠের চেয়ে ফুটবল খেলা ভালো) হয়ে পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মোচনের জন্য ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর আদর্শ বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
10. উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের (Bengal Renaissance) প্রকৃতি বা চরিত্র মূল্যায়ন করো। একে কি প্রকৃত নবজাগরণ বলা যায়?

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি ও মূল্যায়ন:

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে এসে বাংলায় ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ও সাহিত্যে যে অভূতপূর্ব যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল পরিবর্তন আসে, তাকে ঐতিহাসিকরা 'বাংলার নবজাগরণ' বলেছেন। তবে এর প্রকৃতি নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়েছে:

১. ইতিবাচক দিক (নবজাগরণের সপক্ষে):

যদুনাথ সরকার, সুশোভন সরকার প্রমুখ মনে করেন এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর ফলেই সতীদাহ, বাল্যবিবাহের মতো অন্ধ কুসংস্কার দূর হয়, নারীশিক্ষার প্রসার ঘটে, আধুনিক সাহিত্যের জন্ম হয় এবং দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই নবজাগরণের ভোরের পাখি।

২. সীমাবদ্ধতা (নবজাগরণের বিপক্ষে):

ঐতিহাসিক অনিল শীল, সুমিত সরকার একে ইতালির রেনেসাঁসের সাথে তুলনা করতে নারাজ। কারণ:
- এলিটিস্ট চরিত্র: এই জাগরণ কেবল কলকাতা শহরকেন্দ্রিক মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের এবং ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির (Elitist) মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের বিশাল কৃষক, শ্রমিক বা মুসলিম সমাজের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।
- ব্রিটিশ নির্ভরতা: এই নবজাগরণের নেতারা অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং ব্রিটিশদের সাহায্য নিয়েই সমাজ সংস্কার করতে চেয়েছিলেন।
উপসংহার: যদিও এর পরিধি সীমিত ছিল, তবুও আধুনিক ভারত গঠনে উনিশ শতকের বাংলার এই বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের ঐতিহাসিক অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

মনে রেখো!

শিক্ষা বিস্তারে সাল: এশিয়াটিক সোসাইটি (১৭৮৪), ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০), হিন্দু কলেজ (১৮১৭), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭)।
সমাজ সংস্কার: সতীদাহ রদ (১৮২৯) লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে, বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬) লর্ড ডালহৌসির আমলে।
পত্রিকা: হিন্দু প্যাট্রিয়ট (নীল বিদ্রোহের সমর্থন), গ্রামবার্তা প্রকাশিকা (কাঙাল হরিনাথ)।
ব্রাহ্মসমাজ: ১৮২৮ সালে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তিন আইন (১৮৭২) পাস হয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার বিখ্যাত সম্পাদক। এই পত্রিকা নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং নীল বিদ্রোহের সমর্থনে জনমত গড়ে তুলেছিল।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্যার চার্লস উড ভারতে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনামা পেশ করেন। একে ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।

রাজা রামমোহন রায়ের নিরলস আন্দোলনের ফলে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৭ নং রেগুলেশন আইন পাস করে সতীদাহ প্রথাকে রদ করেন।

উনিশ শতকে হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত একদল তরুণ ছাত্রকে নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল দল বলা হত, যারা সমাজের কুসংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্ত দর্শনকে আধুনিক ও বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত করে যে নতুন ধর্মাদর্শ প্রচার করেন, তাকে নববেদান্তবাদ বলে। তাঁর মতে, মূর্তিপূজার চেয়ে জীবে প্রেম বা মানবসেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম।