Chapter 4: সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 50 MCQ | 40 SAQ | 10 Broad Questions
মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭ মহারানির ঘোষণাপত্র ভারত সভা আনন্দমঠ ভারতমাতা
মহাবিদ্রোহ ও সভা-সমিতি
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রকৃতি, ইলবার্ট বিল এবং ভারত সভার আন্দোলন
সাহিত্য ও শিল্পকলা
আনন্দমঠ, বর্তমান ভারত, গোরা উপন্যাস এবং ভারতমাতা চিত্র
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
50 টি1. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে 'ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' (First War of Independence) কে বলেছেন?
ক) রমেশচন্দ্র মজুমদার
খ) সুরেন্দ্রনাথ সেন
গ) বিনায়ক দামোদর সাভারকর
ঘ) তারাচাঁদ
ব্যাখ্যা: বি. ডি. সাভারকর বা বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর 'The Indian War of Independence' গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন।
2. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রথম শহিদ কে ছিলেন?
ক) তাঁতিয়া তোপি
খ) মঙ্গল পাণ্ডে
গ) বখত্ খান
ঘ) রানি লক্ষ্মীবাই
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরের ৩৪ নং নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম বিদ্রোহ শুরু করেন এবং তাঁর ফাঁসি হয়।
3. মহাবিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?
ক) লর্ড ডালহৌসি
খ) লর্ড ক্যানিং
গ) লর্ড লিটন
ঘ) লর্ড রিপন
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং। তিনি পরে ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন।
4. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে সিপাহিরা কাকে 'ভারতের সম্রাট' (বাদশাহ-ই-হিন্দুস্তান) বলে ঘোষণা করেন?
ক) দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ
খ) নানা সাহেব
গ) কুনওয়ার সিং
ঘ) তাঁতিয়া তোপি
ব্যাখ্যা: বিদ্রোহী সিপাহিরা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর-কে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করেছিলেন।
5. কানপুরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন?
ক) রানি লক্ষ্মীবাই
খ) কুনওয়ার সিং
গ) নানা সাহেব
ঘ) বেগম হজরত মহল
ব্যাখ্যা: কানপুরে সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানা সাহেব এবং তাঁর সেনাপতি তাঁতিয়া তোপি।
6. নানা সাহেবের প্রকৃত নাম কী ছিল?
ক) ধোন্দুপন্থ
খ) রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপি
গ) মণি কণিকর্ণিকা
ঘ) গোবিন্দ ধোন্দু
ব্যাখ্যা: নানা সাহেবের আসল নাম ছিল ধোন্দুপন্থ (Dhondopant)।
7. তাঁতিয়া তোপির (Tatya Tope) প্রকৃত নাম কী ছিল?
ক) ধোন্দুপন্থ
খ) রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপি
গ) গোবিন্দ রাও
ঘ) দ্বিতীয় বাজিরাও
ব্যাখ্যা: তাঁতিয়া তোপির প্রকৃত নাম ছিল রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপি। তিনি কানপুরে নানা সাহেবের সেনাপতি ছিলেন।
8. ঝাঁসিতে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন?
ক) বেগম হজরত মহল
খ) রানি লক্ষ্মীবাই
গ) মাতঙ্গিনী হাজরা
ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
ব্যাখ্যা: ঝাঁসিতে সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রানি লক্ষ্মীবাই। ব্রিটিশ সেনাপতি হিউরোজের সাথে যুদ্ধ করে তিনি শহিদ হন।
9. রানি লক্ষ্মীবাইয়ের প্রকৃত নাম কী ছিল?
ক) মণিকর্ণিকা
খ) লক্ষ্মীবাঈ
গ) দুর্গাবতী
ঘ) অহল্যাবাঈ
ব্যাখ্যা: রানি লক্ষ্মীবাইয়ের ছেলেবেলার নাম বা প্রকৃত নাম ছিল মণিকর্ণিকা (Monikarnika) বা মনু।
10. অযোধ্যায় (লখনউ) মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন?
ক) কুনওয়ার সিং
খ) বখত্ খান
গ) বেগম হজরত মহল
ঘ) নানা সাহেব
ব্যাখ্যা: অযোধ্যা বা লখনউতে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের স্ত্রী বেগম হজরত মহল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
11. বিহারে (জগদীশপুর) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) কুনওয়ার সিং
খ) তাঁতিয়া তোপি
গ) নানা সাহেব
ঘ) দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ
ব্যাখ্যা: বিহারের জগদীশপুরের বৃদ্ধ রাজপুত জমিদার কুনওয়ার সিং (Kunwar Singh) ছিলেন বিহারে বিদ্রোহের প্রধান নেতা।
12. মহারানির ঘোষণাপত্র (Queen's Proclamation) কবে জারি করা হয়?
ক) ১ নভেম্বর ১৮৫৮
খ) ১ নভেম্বর ১৮৫৭
গ) ১৫ আগস্ট ১৮৫৮
ঘ) ২ আগস্ট ১৮৫৮
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর এলাহাবাদের দরবারে লর্ড ক্যানিং মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
13. মহারানির ঘোষণাপত্রের ফলে ভারতে কোন্ শাসনের অবসান ঘটে?
ক) মুঘল শাসন
খ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন
গ) মারাঠা শাসন
ঘ) ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শাসন
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন এবং মহারানির ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তি (মুকুট) নিজের হাতে তুলে নেয়।
14. ভারতের প্রথম ভাইসরয় (Viceroy) কে ছিলেন?
ক) লর্ড ক্যানিং
খ) লর্ড মাউন্টব্যাটেন
গ) লর্ড কার্জন
ঘ) ওয়ারেন হেস্টিংস
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ সালে গভর্নর জেনারেল পদটির নাম পরিবর্তন করে 'ভাইসরয়' (রাজপ্রতিনিধি) রাখা হয়। লর্ড ক্যানিং হন ভারতের প্রথম ভাইসরয়।
15. বাংলার প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন (Political Association) কোনটি?
ক) জমিদার সভা
খ) ভারত সভা
গ) বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা
ঘ) ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন
ব্যাখ্যা: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে গৌরীশংকর তর্কাগীশের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা' হল বাংলার তথা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন।
16. জমিদার সভা (Landholders' Society) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে জমিদারদের স্বার্থরক্ষার জন্য 'জমিদার সভা' প্রতিষ্ঠিত হয়।
17. বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি (Bengal British India Society) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৩৮ সালে
খ) ১৮৪৩ সালে
গ) ১৮৫১ সালে
ঘ) ১৮৭৬ সালে
ব্যাখ্যা: জর্জ থমসনের উদ্যোগে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
18. ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (British Indian Association) কবে গঠিত হয়?
ক) ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: জমিদার সভা এবং বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি মিলে গিয়ে ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' গঠিত হয়। রাধাকান্ত দেব ছিলেন এর প্রথম সভাপতি।
19. হিন্দুমেলা (Hindu Mela) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে 'চৈত্র মেলা' বা 'হিন্দুমেলা' প্রতিষ্ঠিত হয়।
20. হিন্দুমেলার প্রধান সংগঠক কে ছিলেন যাঁকে 'ন্যাশনাল মিত্র' বলা হত?
ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
খ) রাজনারায়ণ বসু
গ) নবগোপাল মিত্র
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: নবগোপাল মিত্র ছিলেন হিন্দুমেলার প্রধান সংগঠক। তিনি 'ন্যাশনাল পেপার' সম্পাদনা করতেন বলে তাঁকে 'ন্যাশনাল মিত্র' বলা হত।
21. হিন্দুমেলার প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
ক) ব্রিটিশদের সমর্থন করা
খ) স্বদেশি ভাবধারা ও দেশজ শিল্পের প্রসার
গ) ধর্মীয় সংস্কার
ঘ) পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার
ব্যাখ্যা: হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীর মধ্যে স্বজাত্যবোধ, দেশপ্রেম জাগানো এবং দেশীয় শিল্প, ব্যায়াম ও দেশি ভাষা চর্চার প্রসার।
22. ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (Indian Association) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
23. ভারত সভার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু
গ) নবগোপাল মিত্র
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্যোগে ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।
24. ভারত সভার প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
খ) কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
গ) রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘ) আনন্দমোহন বসু
ব্যাখ্যা: রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (Rev. Krishna Mohan Banerjee) ভারত সভার প্রথম সভাপতি ছিলেন। আনন্দমোহন বসু ছিলেন প্রথম সম্পাদক।
25. কোন্ রাজনৈতিক সংগঠন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স কমানোর প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিল?
ক) জমিদার সভা
খ) ভারত সভা (Indian Association)
গ) হিন্দুমেলা
ঘ) কংগ্রেস
ব্যাখ্যা: লর্ড লিটন আই.সি.এস. (ICS) পরীক্ষার বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করলে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে 'ভারত সভা' তীব্র সর্বভারতীয় আন্দোলন (Civil Service Agitation) গড়ে তোলে।
26. ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট বা দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন (১৮৭৮) কে পাস করেন?
ক) লর্ড রিপন
খ) লর্ড ক্যানিং
গ) লর্ড লিটন
ঘ) লর্ড ডালহৌসি
ব্যাখ্যা: ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড লিটন (Lord Lytton) দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধ করার জন্য 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' পাস করেন।
27. ইলবার্ট বিল (Ilbert Bill) কবে উত্থাপিত হয়?
ক) ১৮৭৮ সালে
খ) ১৮৮৩ সালে
গ) ১৮৮৫ সালে
ঘ) ১৯০৫ সালে
ব্যাখ্যা: লর্ড রিপনের শাসনকালে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আইনসচিব সি. পি. ইলবার্ট এই বিল উত্থাপন করেন।
28. ইলবার্ট বিলের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
ক) কর কমানো
খ) দেশীয় সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করা
গ) ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দেওয়া
ঘ) শিক্ষা বিস্তার
ব্যাখ্যা: ইলবার্ট বিলে বলা হয় যে ভারতীয় বিচারকরাও ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করতে পারবেন। শ্বেতাঙ্গরা এর তীব্র বিরোধিতা করে (শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ)। ভারত সভা ইলবার্ট বিলের পক্ষে আন্দোলন করেছিল।
29. জাতীয় কংগ্রেস (Indian National Congress) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের উদ্যোগে বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
30. 'আনন্দমঠ' (Anandamath) উপন্যাসটি কে রচনা করেন?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
ব্যাখ্যা: ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান উৎস।
31. 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের পটভূমিকা কী ছিল?
ক) সিপাহি বিদ্রোহ
খ) নীল বিদ্রোহ
গ) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ
ঘ) ওয়াহাবি আন্দোলন
ব্যাখ্যা: ১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের পটভূমিকায় বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' রচনা করেন।
32. 'বন্দে মাতরম্' (Vande Mataram) সংগীতটি কোন্ উপন্যাসের অন্তর্গত?
ক) দুর্গেশনন্দিনী
খ) বর্তমান ভারত
গ) গোরা
ঘ) আনন্দমঠ
ব্যাখ্যা: 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি ১৮৭৫ সালে রচিত হলেও, এটি ১৮৮২ সালে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি স্বদেশি আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল।
33. 'বর্তমান ভারত' (Bartaman Bharat) গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
ক) শ্রীঅরবিন্দ
খ) স্বামী বিবেকানন্দ
গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যাখ্যা: স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'বর্তমান ভারত' (১৮৯৯) গ্রন্থটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অসামান্য দলিল। এটি 'উদ্বোধন' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।
34. 'বর্তমান ভারত' গ্রন্থে কোন্ যুগের কথা বলা হয়েছে?
ক) বৈদিক যুগ থেকে ব্রিটিশ যুগ পর্যন্ত
খ) শুধু ব্রিটিশ যুগ
গ) মুঘল যুগ
ঘ) প্রাচীন প্রস্তর যুগ
ব্যাখ্যা: স্বামী বিবেকানন্দ এই গ্রন্থে বৈদিক যুগের ব্রাহ্মণ শাসন থেকে শুরু করে বর্তমান শূদ্র বা সাধারণ মানুষের জাগরণ পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস ও সমাজের বিশ্লেষণ করেছেন।
35. 'গোরা' (Gora) উপন্যাসটি কার লেখা?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
ব্যাখ্যা: ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামাজিক উপন্যাস হল 'গোরা'।
36. 'গোরা' উপন্যাসের মূল সুর কী ছিল?
ক) উগ্র জাতীয়তাবাদের সমর্থন
খ) সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা ও বিশ্বমানবতাবাদ
গ) ব্রিটিশ শক্তির প্রশস্তি
ঘ) সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কথা
ব্যাখ্যা: 'গোরা' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা করে বিশ্বমানবতাবাদ ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ তুলে ধরেছিলেন।
37. 'ভারতমাতা' (Bharat Mata) চিত্রটি কে অঙ্কন করেন?
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) নন্দলাল বসু
ব্যাখ্যা: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতমাতা' ছবিটি অঙ্কন করেন (প্রাথমিক নাম ছিল 'বঙ্গমাতা')।
38. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' চিত্রে ভারতমাতার কয়টি হাত দেখানো হয়েছে?
ক) দুটি
খ) চারটি
গ) ছয়টি
ঘ) আটটি
ব্যাখ্যা: ভারতমাতার চার হাতে রয়েছে—অন্ন (ধানের শিষ), বস্ত্র (সাদা কাপড়), দীক্ষা (বই) এবং শান্তি (জপের মালা)। এটি সম্পূর্ণ অহিংস জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
39. ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন (Cartoons) অঙ্কনে কে বিখ্যাত ছিলেন?
ক) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) নন্দলাল বসু
ব্যাখ্যা: উনিশ শতকের বাবু সমাজ, ব্রিটিশদের প্রতি অন্ধ অনুকরণ এবং ঔপনিবেশিক শাসনকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করে কার্টুন আঁকার জন্য গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিখ্যাত ছিলেন।
40. 'অদ্ভুত লোক', 'বিরূপ বজ্র' এবং 'নয়া হুল্লোড়' কার আঁকা ব্যঙ্গচিত্রের সংকলন?
ক) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ) সত্যজিৎ রায়
ঘ) যামিনী রায়
ব্যাখ্যা: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রের বইগুলি হল 'অদ্ভুত লোক' (১৯১৫), 'বিরূপ বজ্র' (১৯১৭) এবং 'নয়া হুল্লোড়' (১৯২১)।
41. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে কে 'শহিদ' হয়েছিলেন?
ক) মঙ্গল পাণ্ডে
খ) বঙ্কিমচন্দ্র
গ) ডালহৌসি
ঘ) সুরেন্দ্রনাথ
ব্যাখ্যা: মঙ্গল পাণ্ডে ছিলেন ১৮৫৭ সালের প্রথম শহিদ।
42. মহাবিদ্রোহের সময় বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনোভাব কেমন ছিল?
ক) পূর্ণ সমর্থন করেছিল
খ) সশস্ত্র লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল
গ) নীরব দর্শক ছিল বা বিরোধিতা করেছিল
ঘ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল
ব্যাখ্যা: উনিশ শতকের বাংলার ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি মহাবিদ্রোহকে সমর্থন করেনি, কারণ তারা ব্রিটিশ শাসনের সুফল সম্পর্কে আশাবাদী ছিল এবং বিদ্রোহকে বিশৃঙ্খলা বলে মনে করেছিল।
43. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কে 'সামন্তশ্রেণির বিদ্রোহ' বলেছেন?
ক) কার্ল মার্কস
খ) ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার
গ) জওহরলাল নেহরু
ঘ) রজনীপাম দত্ত
ব্যাখ্যা: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা একে জাতীয় সংগ্রাম না বলে সামন্তশ্রেণির বা সিপাহিদের বিদ্রোহ বলেছেন।
44. মহারানির ঘোষণাপত্রে কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল?
ক) ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা
খ) দেশীয় রাজ্যগুলি গ্রাস না করা (স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল)
গ) যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের সরকারি চাকরি দেওয়া
ঘ) ওপরের সবকটি
ব্যাখ্যা: মহারানির ঘোষণাপত্রে ভারতীয়দের শান্ত করার জন্য স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল, ধর্মে হস্তক্ষেপ না করা এবং সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল (যদিও তা পালিত হয়নি)।
45. জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে 'হিন্দুমেলা' কত বছর স্থায়ী হয়েছিল?
ক) ৫ বছর
খ) ১০ বছর
গ) ১৪ বছর
ঘ) ২০ বছর
ব্যাখ্যা: ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুমেলা ১৪ বছর ধরে (১৮৮০ পর্যন্ত) বার্ষিক মেলার আয়োজন করেছিল। ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হলে এর গুরুত্ব কমে যায়।
46. ইলবার্ট বিল বিতর্কের সময় ভারতের ভাইসরয় কে ছিলেন?
ক) লর্ড লিটন
খ) লর্ড রিপন
গ) লর্ড কার্জন
ঘ) লর্ড ডাফরিন
ব্যাখ্যা: উদারপন্থী ভাইসরয় লর্ড রিপন (Lord Ripon) ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দেওয়ার জন্য ১৮৮৩ সালে ইলবার্ট বিল আনেন।
47. 'ভারত সভা' (Indian Association) এর প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
খ) আনন্দমোহন বসু
গ) শিবনাথ শাস্ত্রী
ঘ) রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারত সভার প্রথম সভাপতি এবং আনন্দমোহন বসু ছিলেন প্রথম সম্পাদক (Secretary)। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এর মূল প্রাণপুরুষ।
48. কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কী আখ্যা দিয়েছিলেন?
ক) সিপাহি বিদ্রোহ
খ) সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ
গ) জাতীয় বিদ্রোহ (National Revolt)
ঘ) কৃষক বিদ্রোহ
ব্যাখ্যা: কার্ল মার্কস এবং অনেক ব্রিটিশ বিরোধী ঐতিহাসিক ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে নিছক সিপাহি বিদ্রোহ না বলে 'জাতীয় বিদ্রোহ' বা 'National Revolt' আখ্যা দিয়েছিলেন।
49. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে কোন রাজ্যের সেনা ইংরেজদের সাহায্য করেছিল?
ক) শিখ ও গুর্খা সেনা
খ) মারাঠা সেনা
গ) বাংলা সেনা
ঘ) আওধ (অযোধ্যা) সেনা
ব্যাখ্যা: পাঞ্জাবের শিখ সেনা, নেপালের গুর্খা এবং হায়দ্রাবাদের নিজাম ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।
50. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাস কোন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
ক) বঙ্গদর্শন
খ) সোমপ্রকাশ
গ) হিন্দু প্যাট্রিয়ট
ঘ) যুগান্তর
ব্যাখ্যা: ১৮৮১ সাল থেকে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
40 টি1. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে কে, কেন 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' বলেছেন?
বিনায়ক দামোদর সাভারকর (V.D. Savarkar) তাঁর 'The Indian War of Independence' গ্রন্থে মহাবিদ্রোহকে ভারতের 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' বলেছেন। কারণ, এই প্রথম ভারতের বিশাল অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, সৈনিক ও রাজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছিল।
2. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ কী ছিল?
মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল 'এনফিল্ড রাইফেল'-এর টোটার ব্যবহার। এই টোটার খোলস দাঁতে কেটে বন্দুকে ভরতে হত এবং সিপাহিদের মধ্যে গুজব ছড়ায় যে এতে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে, যা হিন্দু ও মুসলিম উভয়েরই ধর্মনাশের কারণ।
3. মঙ্গল পাণ্ডে কে ছিলেন?
মঙ্গল পাণ্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনানিবাসের ৩৪ নং নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সিপাহি। তিনি ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ প্রথম এনফিল্ড রাইফেলে টোটা ভরতে অস্বীকার করেন এবং এক ইংরেজ অফিসারকে গুলি করে মহাবিদ্রোহের সূচনা করেন।
4. নানা সাহেব ও তাঁতিয়া তোপি কে ছিলেন?
নানা সাহেব (ধোন্দুপন্থ) ছিলেন শেষ পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র, যিনি কানপুরে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তাঁতিয়া তোপি (রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ) ছিলেন নানা সাহেবের সুযোগ্য সেনাপতি, যিনি কানপুর ও গোয়ালিয়রে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন।
5. রানি লক্ষ্মীবাই কেন মহাবিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন?
লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি' (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করে ব্রিটিশরা ঝাঁসি রাজ্যটি দখল করে নেয় এবং রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। এর প্রতিবাদেই রানি বিদ্রোহে যোগ দেন এবং শহিদ হন।
6. দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ কে ছিলেন? মহাবিদ্রোহে তাঁর পরিণতি কী হয়?
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। বিদ্রোহী সিপাহিরা তাঁকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করেছিল। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশরা তাঁকে বন্দি করে রেঙ্গুনে (মায়ানমার) নির্বাসনে পাঠায়, সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
7. শিক্ষিত বাঙালি সমাজ কেন মহাবিদ্রোহকে সমর্থন করেনি?
উনিশ শতকের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশ শাসনের সুফল (যেমন পাশ্চাত্য শিক্ষা, রেল, আধুনিকীকরণ) সম্পর্কে গভীরভাবে আশাবাদী ছিল। তারা মহাবিদ্রোহকে বিশৃঙ্খলা এবং মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক প্রথায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা মনে করে একে সমর্থন করেনি।
8. মহারানির ঘোষণাপত্র (Queen's Proclamation) কী?
মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদের দরবারে ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং মহারানি ভিক্টোরিয়ার একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ রাজতন্ত্র সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে।
9. মহারানির ঘোষণাপত্রের দুটি প্রতিশ্রুতি লেখো।
১) ব্রিটিশ সরকার ভারতে আর কোনো রাজ্য বিস্তার করবে না এবং 'স্বত্ববিলোপ নীতি' বাতিল করা হবে (দত্তক পুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়)। ২) সরকার ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
10. ভারত শাসন আইন (১৮৫৮) এর গুরুত্ব কী?
১৮৫৮ সালের 'Government of India Act' বা উন্নততর ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার রানির হাতে যায় এবং 'গভর্নর জেনারেল' পদের নাম পরিবর্তন করে 'ভাইসরয়' (Viceroy) রাখা হয়।
11. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কবে, কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে গৌরীশংকর তর্কাগীশ ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের উদ্যোগে 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই বাংলার প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। এর উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম বাদ দিয়ে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা।
12. জমিদার সভা (Landholders' Society) কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে জমিদার সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভারতের প্রথম সার্থক রাজনৈতিক সংগঠন।
13. জমিদার সভার উদ্দেশ্য কী ছিল?
জমিদার সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলার জমিদারদের স্বার্থরক্ষা করা, ব্রিটিশ সরকারের নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করার নীতির প্রতিবাদ করা এবং নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পথে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায় করা।
14. বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে জর্জ থমসন এবং প্যারিচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ নব্যবঙ্গ (Young Bengal) দলের সদস্যদের উদ্যোগে বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
15. ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন কবে, কীভাবে গঠিত হয়?
১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে জমিদার সভা এবং বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি—এই দুটি সংগঠন একত্রিত হয়ে 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' (British Indian Association) গঠন করে। রাধাকান্ত দেব ছিলেন এর প্রথম সভাপতি।
16. হিন্দুমেলা (Hindu Mela) কবে, কারা প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে চৈত্র সংক্রান্তির দিন 'চৈত্র মেলা' বা 'হিন্দুমেলা' প্রতিষ্ঠিত হয়।
17. নবগোপাল মিত্রকে 'ন্যাশনাল মিত্র' বলা হত কেন?
নবগোপাল মিত্র হিন্দুমেলার প্রধান সংগঠক ছিলেন। তিনি 'ন্যাশনাল পেপার' (National Paper) পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এবং 'ন্যাশনাল জিমন্যাশিয়াম', 'ন্যাশনাল স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে তাঁকে 'ন্যাশনাল মিত্র' বলা হত।
18. হিন্দুমেলার দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
১) শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে হিন্দু ধর্মের অতীত গৌরব তুলে ধরে স্বজাত্যবোধ ও জাতীয়তাবাদ জাগানো। ২) দেশীয় শিল্প, হস্তশিল্প, দেশি ভাষা এবং শরীরচর্চা (ব্যায়াম, লাঠিখেলা) ও দেশপ্রেমমূলক সংগীতের প্রসার ঘটানো।
19. ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (Indian Association) কবে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু ও শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্যোগে ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।
20. ভারত সভার প্রথম সভাপতি ও সম্পাদক কে ছিলেন?
ভারত সভার প্রথম সভাপতি ছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রথম সম্পাদক ছিলেন আনন্দমোহন বসু।
21. ভারত সভার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য লেখো।
১) সমগ্র ভারতের মানুষকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করা এবং জনমত গঠন করা। ২) হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করা।
22. সিভিল সার্ভিস আন্দোলন (Civil Service Agitation) কী?
১৮৭৬ সালে লর্ড লিটন আই.সি.এস. (ICS) পরীক্ষায় বসার বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করে ভারতীয়দের পরীক্ষায় বসা প্রায় অসম্ভব করে দেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভারত সভা এর বিরুদ্ধে যে তীব্র সর্বভারতীয় আন্দোলন গড়ে তোলে, তাকে সিভিল সার্ভিস আন্দোলন বলে।
23. দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন বা ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (১৮৭৮) কী?
লর্ড লিটন দেশীয় ভাষায় (বিশেষত বাংলায়) প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির (যেমন সোমপ্রকাশ, অমৃতবাজার) সরকার বিরোধী সমালোচনা বন্ধ করার জন্য ১৮৭৮ সালে যে দমনমূলক আইন পাস করেন, তাকে দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন বলে।
24. অস্ত্র আইন (Arms Act - ১৮৭৮) কী?
লর্ড লিটনের এই আইন অনুযায়ী, ভারতীয়দের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়, কিন্তু ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গদের জন্য এই নিয়ম ছিল না। ভারত সভা এই বর্ণবৈষম্যমূলক আইনের তীব্র প্রতিবাদ করেছিল।
25. ইলবার্ট বিল (Ilbert Bill) কী?
লর্ড রিপনের আইনসচিব সি. পি. ইলবার্ট ১৮৮৩ সালে একটি বিল এনে প্রস্তাব করেন যে, ভারতীয় বিচারকরাও ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করতে পারবেন (যা আগে ছিল না)। এটিই ইলবার্ট বিল।
26. শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ (White Mutiny) বলতে কী বোঝো?
ইলবার্ট বিলের মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকদের হাতে ইউরোপীয়দের বিচারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ভারতের ব্রিটিশ বা শ্বেতাঙ্গরা এর বিরুদ্ধে যে তীব্র ও সংগঠিত বর্ণবিদ্বেষী আন্দোলন করেছিল, তাকে শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ বলে।
27. জাতীয় কংগ্রেস (Indian National Congress) কবে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আধিকারিক অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের (A.O. Hume) উদ্যোগে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এর প্রথম সভাপতি।
28. 'আনন্দমঠ' (Anandamath) উপন্যাস কে রচনা করেন? এর পটভূমিকা কী?
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'আনন্দমঠ' রচনা করেন। ১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের পটভূমিকায় এটি রচিত।
29. 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি (যা আনন্দমঠ উপন্যাসের অংশ) দেশমাতৃকাকে ঈশ্বরীরূপে কল্পনা করে ভারতীয়দের মধ্যে চরম দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রেরণা জুগিয়েছিল। এটি ছিল ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র বা স্লোগান।
30. 'বর্তমান ভারত' (Bartaman Bharat) কার লেখা? এটি প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়?
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'বর্তমান ভারত' (১৮৯৯) গ্রন্থটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অসামান্য দলিল। এটি রামকৃষ্ণ মিশনের মুখপত্র 'উদ্বোধন' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রথম প্রকাশিত হয়।
31. 'বর্তমান ভারত' গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের সমাজকে কীভাবে ভাগ করেছেন?
তিনি ভারতের ইতিহাসকে চারটি যুগে ভাগ করেছেন— ব্রাহ্মণ যুগ (প্রাচীনকাল), ক্ষত্রিয় যুগ (রাজপুত ও মুঘল), বৈশ্য যুগ (ব্রিটিশ শাসন) এবং ভবিষ্যৎ শূদ্র যুগ (অর্থাৎ সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জাগরণ)।
32. 'গোরা' (Gora) উপন্যাস কার লেখা? এটি কবে প্রকাশিত হয়?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামাজিক উপন্যাস হল 'গোরা'। এটি ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯১০ সালে গ্রন্থাকারে বের হয়।
33. 'গোরা' উপন্যাসের মূল সুর কী ছিল?
'গোরা' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সংকীর্ণ ও ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদের তীব্র সমালোচনা করে বিশ্বমানবতাবাদ, সর্বধর্ম সমন্বয় এবং উদার দেশপ্রেমের আদর্শ তুলে ধরেছিলেন।
34. 'ভারতমাতা' (Bharat Mata) চিত্রটি কে আঁকেন? এর প্রেক্ষাপট কী ছিল?
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে এবং স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতমাতা' ছবিটি অঙ্কন করেন (প্রাথমিক নাম ছিল 'বঙ্গমাতা')।
35. 'ভারতমাতা' চিত্রে ভারতমাতাকে কীভাবে তুলে ধরা হয়েছে?
চিত্রে ভারতমাতাকে চার হাতযুক্ত এক দেবী বা সন্ন্যাসিনীর রূপে দেখানো হয়েছে। তাঁর চার হাতে রয়েছে—অন্ন (ধানের শিষ), বস্ত্র (সাদা কাপড়), দীক্ষা (বই) এবং শান্তি (জপের মালা)। এটি সম্পূর্ণ অহিংস জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
36. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (Gaganendranath Tagore) কীসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন?
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন (Cartoons) অঙ্কনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি তাঁর কার্টুনের মাধ্যমে উনিশ শতকের বাবু সমাজ এবং ঔপনিবেশিক শাসনকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করেছিলেন।
37. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি বিখ্যাত কার্টুন সংকলনের নাম লেখো।
তাঁর বিখ্যাত কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রের বইগুলি হল 'অদ্ভুত লোক' (Realm of the Absurd - ১৯১৫) এবং 'বিরূপ বজ্র' (Play of Opposites - ১৯১৭)।
38. গগনেন্দ্রনাথ তাঁর ব্যঙ্গচিত্রে (Cartoons) কাদের সমালোচনা করেছিলেন?
তিনি মূলত নব্যধনী 'বাবু' সমাজের অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণ, ভণ্ডামি, ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় গোঁড়ামি, এবং ব্রিটিশ পুলিশের নিষ্ঠুরতা ও বর্ণবৈষম্যকে তাঁর কার্টুনের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
39. উনিশ শতককে 'সভাসমিতির যুগ' (Age of Associations) কে বলেছেন এবং কেন?
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনিশ শতককে (বিশেষত ১৮৫৭-৮৫ সময়কালকে) 'সভাসমিতির যুগ' বলেছেন। কারণ এই সময়েই ভারতে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির ফলে আঞ্চলিক ও সর্বভারতীয় স্তরে অসংখ্য সভা-সমিতি (যেমন ভারত সভা, জমিদার সভা) গড়ে উঠেছিল।
40. জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা কী?
উনিশ শতকের শেষার্ধে সাহিত্য (যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, বিবেকানন্দের বর্তমান ভারত, রবীন্দ্রনাথের গোরা) ভারতীয়দের মনে পরাধীনতার গ্লানি, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের প্রেরণা জাগিয়ে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
10 টি1. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের (Revolt of 1857) প্রকৃতি বা চরিত্র (Nature and Character) বিশ্লেষণ করো।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি:
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তবে এর প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে গভীর বিতর্ক রয়েছে। প্রধান মতবাদগুলি হল:
- সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny): ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ সেন, এবং ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল নিছক সিপাহিদের একটি শৃঙ্খলাভঙ্গ বা বিদ্রোহ। কারণ সিপাহিরাই প্রথমে টোটা বিতর্কে খেপে গিয়ে অস্ত্র ধরেছিল এবং ভারতের বৃহত্তর জনসমাজ এর বাইরে ছিল।
- সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, যে সমস্ত দেশীয় রাজা, তালুকদার ও জমিদাররা লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি'র ফলে রাজ্য বা জমিদারি হারিয়েছিলেন (যেমন রানি লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব), তাঁরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য এই বিদ্রোহে যোগ দেন। তাই এটি পুরনো সামন্তশ্রেণির বিদ্রোহ।
- প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (First War of Independence): বিনায়ক দামোদর সাভারকর (V.D. Savarkar) এবং অনেক জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক একে 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' বলেছেন। কারণ, এই প্রথম সিপাহিদের সাথে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল।
- জাতীয় বিদ্রোহ (National Revolt): কার্ল মার্কস, বেঞ্জামিন ডিজরেলি প্রমুখ একে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন, কারণ এর ব্যাপকতা এবং ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বজনীন।
উপসংহার: এটি নিছক সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না। এর মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থ থাকলেও, সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং ব্রিটিশ বিরোধী তীব্রতা এটিকে ভারতের প্রথম ব্যাপক স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দিয়েছে।
2. মহাবিদ্রোহের প্রতি বাংলার শিক্ষিত সমাজের (Educated Bengali Middle Class) মনোভাব কেমন ছিল তা আলোচনা করো।
শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব:
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ যখন উত্তর ও মধ্য ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন বাংলার ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ (যেমন জমিদার, বুদ্ধিজীবী) এই বিদ্রোহ থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে এর বিরোধিতাই করেছিল। এর কারণগুলি হল:
- ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মোহ: শিক্ষিত বাঙালিরা বিশ্বাস করত যে ব্রিটিশ শাসন ভারতের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ব্রিটিশরা আধুনিক শিক্ষা, রেলওয়ে, ডাক ব্যবস্থা এবং সমাজ সংস্কারের (সতীদাহ রদ, বিধবা বিবাহ) মাধ্যমে ভারতকে আধুনিক ও সভ্য করে তুলছে। তাই তারা ব্রিটিশদের পতন চায়নি।
- বিশৃঙ্খলা ও সামন্ততন্ত্রের ভয়: তারা মনে করত, সিপাহিরা এবং দেশীয় রাজারা জয়ী হলে ভারতে আবার পুরনো, রক্ষণশীল ও অত্যাচারী সামন্ততান্ত্রিক শাসন (মুঘল বা মারাঠা রাজ) ফিরে আসবে, যা দেশের প্রগতিকে স্তব্ধ করে দেবে।
- শ্রেণিস্বার্থ: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট জমিদার ও নব্যধনীরা তাদের নিজেদের সম্পত্তি ও স্বার্থরক্ষার জন্য ব্রিটিশদের অনুগত থাকাই শ্রেয় মনে করেছিল।
- নেতৃত্বের অভাব: বিদ্রোহীদের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল না, যা শিক্ষিত সমাজকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাই হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' বা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো ব্যক্তিরা বিদ্রোহের বদলে ব্রিটিশদেরই সমর্থন করেছিলেন।
3. মহারানির ঘোষণাপত্রের (Queen's Proclamation - 1858) ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনা করো।
মহারানির ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য:
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ভয়াবহতা দেখে ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে শুধু কোম্পানির ওপর ভারতের শাসনভার ছেড়ে রাখা নিরাপদ নয়। তাই ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদের দরবারে লর্ড ক্যানিং মহারানি ভিক্টোরিয়ার এক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এর তাৎপর্যগুলি হল:
- কোম্পানির শাসনের অবসান: এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১০০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তি বা রানির হাতে চলে যায়।
- স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল: ভারতীয় রাজাদের আশ্বস্ত করতে লর্ড ডালহৌসির কুখ্যাত 'স্বত্ববিলোপ নীতি' (Doctrine of Lapse) বাতিল করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক পুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে আর কোনো নতুন রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা হবে না।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা: ঘোষণা করা হয় যে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতিনীতি এবং সামাজিক প্রথায় আর কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
- সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতা অনুযায়ী ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
- মূল্যায়ন: মহারানির ঘোষণাপত্র ছিল মূলত ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করার একটি রাজনৈতিক চাল। বাস্তবে ধর্মীয় স্বাধীনতা বা সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি ব্রিটিশরা কখনোই পালন করেনি, বরং তারা 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতি চরমভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে।
4. উনিশ শতকে ভারতে 'সভাসমিতির যুগ' (Age of Associations) বলতে কী বোঝো? এই যুগে ভারত সভার (Indian Association) ভূমিকা আলোচনা করো।
সভাসমিতির যুগ:
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনিশ শতককে (বিশেষত ১৮৫৭-১৮৮৫ সময়কালকে) 'সভাসমিতির যুগ' বলে অভিহিত করেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার এবং জাতীয়তাবাদের উন্মেষের ফলে ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে নিজেদের দাবি আদায় করতে হলে সংগঠিত হতে হবে। এর ফলেই বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা, হিন্দুমেলা এবং ভারত সভার মতো অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে।
ভারত সভার ভূমিকা (১৮৭৬):
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু ও শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্যোগে ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত 'ভারত সভা' বা Indian Association ছিল প্রাক-কঙ্গ্রেস যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন। এর ভূমিকাগুলি হল:
- সিভিল সার্ভিস আন্দোলন: লর্ড লিটন আই.সি.এস. পরীক্ষায় বসার বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করলে, ভারত সভা তীব্র সর্বভারতীয় আন্দোলন গড়ে তোলে এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সারা ভারত ঘুরে জনমত গঠন করেন।
- অস্ত্র আইন ও মুদ্রাযন্ত্র আইনের বিরোধিতা: লর্ড লিটনের বর্ণবৈষম্যমূলক অস্ত্র আইন (Arms Act) এবং সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (১৮৭৮) এর বিরুদ্ধে ভারত সভা প্রবল গণ-আন্দোলন শুরু করে।
- ইলবার্ট বিল আন্দোলন: ভারতীয় বিচারকদের অধিকার রক্ষার জন্য ইলবার্ট বিলের (১৮৮৩) সমর্থনে ভারত সভা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেছিল।
- কৃষকদের অধিকার রক্ষা: কেবল শিক্ষিত শ্রেণি নয়, ভারত সভা বাংলার রায়ত বা কৃষকদের অধিকার রক্ষার জন্যও সোচ্চার হয়েছিল (যেমন রেন্ট বিলের সমর্থন)। এইভাবে এটি জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল।
5. ইলবার্ট বিল বিতর্ক (Ilbert Bill Controversy) কী? এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা করো।
ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৮৩):
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় বিচারকদের কোনো ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীর বিচার করার অধিকার ছিল না। উদারপন্থী ভাইসরয় লর্ড রিপন এই বর্ণবৈষম্য দূর করার জন্য তাঁর আইনসচিব সি. পি. ইলবার্টকে দিয়ে ১৮৮৩ সালে একটি বিল বা আইনের খসড়া তৈরি করান। এতে বলা হয় যে যোগ্য ভারতীয় বিচারকরাও ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারবেন। এটিই ইলবার্ট বিল।
শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ ও বিতর্ক:
এই বিল পাস হলে ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের সম্মানহানি ও নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা 'ইউরোপীয় ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' তৈরি করে এর বিরুদ্ধে তীব্র বর্ণবিদ্বেষী আন্দোলন (শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ) শুরু করে। শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপন মাথা নত করে বিলে সংশোধন আনতে বাধ্য হন (বলা হয়, জুরির অর্ধেক ইউরোপীয় হতে হবে)।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
- ভারতীয়দের চক্ষু উন্মোচন: এই ঘটনা ভারতীয়দের বুঝিয়ে দেয় যে ব্রিটিশদের কাছে ন্যায়বিচার বা সমানাধিকার আশা করা বৃথা এবং তারা কতটা বর্ণবিদ্বেষী।
- জাতীয় ঐক্য ও সংগঠন: শ্বেতাঙ্গদের এই তীব্র আন্দোলন দেখে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভারত সভার নেতারা উপলব্ধি করেন যে, নিজেদের দাবি আদায় করতে হলে ভারতীয়দেরও একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হতে হবে। এই বিল বিতর্কই পরোক্ষভাবে ১৮৮৫ সালে 'জাতীয় কংগ্রেস' (Indian National Congress) প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
6. জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' (Anandamath) উপন্যাসের ভূমিকা আলোচনা করো।
'আনন্দমঠ' ও জাতীয়তাবাদ:
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের 'গীতা' বা বাইবেল হিসেবে পরিচিত। পরাধীন ভারতে স্বদেশপ্রেম জাগাতে এর ভূমিকা অসীম:
- দেশমাতৃকার বন্দনা: এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে কোনো ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং এক দেবীমূর্তি বা 'মাতা' (Motherland) রূপে কল্পনা করেছেন। 'মা যা ছিলে, মা যা হইয়াছ, মা যা হইবে'—এই রূপকের মাধ্যমে তিনি ভারতমাতার অতীত গৌরব, বর্তমান পরাধীনতা ও ভবিষ্যৎ মুক্তির স্বপ্ন তুলে ধরেছেন।
- 'বন্দে মাতরম্' মন্ত্র: এই উপন্যাসের অন্তর্গত 'বন্দে মাতরম্' সংগীতটি ছিল পরাধীন ভারতের মুক্তি সংগ্রামীদের সঞ্জীবন মন্ত্র। ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ফাঁসির মঞ্চ—সর্বত্র এই একটি মন্ত্রই ভারতীয়দের মৃত্যুর ভয় জয় করতে শিখিয়েছিল।
- সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আদর্শ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় রচিত এই উপন্যাসের চরিত্রগুলি (যেমন সত্যানন্দ, ভবানন্দ) দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে 'সন্তান দল' গঠন করেছিল। এটি যুবসমাজকে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রেরণা জুগিয়েছিল।
- স্বদেশি ও বয়কট: উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে স্বদেশি জিনিস ব্যবহার এবং ব্রিটিশদের বিদেশি শক্তি হিসেবে বয়কট করার প্রচ্ছন্ন বার্তা ছিল, যা পরবর্তীকালের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা তৈরি করেছিল।
7. জাতীয়তাবাদের বিকাশে স্বামী বিবেকানন্দের 'বর্তমান ভারত' (Bartaman Bharat) গ্রন্থের ভূমিকা আলোচনা করো।
'বর্তমান ভারত' ও জাতীয়তাবাদ:
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'বর্তমান ভারত' (১৮৯৯) গ্রন্থটি কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ নয়, এটি পরাধীন ভারতীয়দের মনে প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেম জাগানোর এক অসামান্য দলিল:
- ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও শ্রেণি সংগ্রাম: এই গ্রন্থে স্বামীজি ভারতের ইতিহাসকে চারটি যুগে ভাগ করেছেন— ব্রাহ্মণ (পুরোহিত), ক্ষত্রিয় (রাজা), বৈশ্য (ইংরেজ বণিক) এবং ভবিষ্যৎ শূদ্র (শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ) যুগ। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে ভবিষ্যতে শূদ্র বা সাধারণ মানুষের জাগরণ অনিবার্য।
- জাতীয়তাবোধের উন্মেষ: তিনি ভারতীয়দের মনে অতীত গৌরব জাগিয়ে তুলে বলেন, 'হে ভারত ভুলিও না, নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।' এই বাণী সমাজের উঁচু-নিচু ভেদ ভুলে সকল ভারতীয়কে একজোট হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
- মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি: স্বামীজি দেশমাতৃকাকে আরাধ্য দেবী রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি যুবসমাজকে ডাক দিয়ে বলেন, 'তুমি জন্মাবধি মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।' মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের এই আহ্বান অরবিন্দ ঘোষ, সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের (যেমন অনুশীলন সমিতি) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
- স্বদেশি ভাবনা: তিনি পাশ্চাত্য অনুকরণ ছেড়ে স্বদেশি পোশাক ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার কথা বলেছেন, যা স্বদেশি আন্দোলনের আধ্যাত্মিক ও মানসিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
8. জাতীয়তাবাদের বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা' (Gora) উপন্যাসের ভূমিকা আলোচনা করো।
'গোরা' উপন্যাস ও জাতীয়তাবাদ:
১৯০৭-১৯০৯ সালে 'প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা' উপন্যাসটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অনন্য ও গভীর দার্শনিক দলিল। এর ভূমিকাগুলি হল:
- উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সংকীর্ণতার সমালোচনা: উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গোরা (গৌরমোহন) প্রথম দিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী ছিল। সে মনে করত হিন্দুধর্মের আচার-বিচার মেনেই ভারতের কল্যাণ সম্ভব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গোরার চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে এবং তা ভারতের প্রকৃত মুক্তির পথ হতে পারে না।
- বিশ্বমানবতাবাদ ও সর্বধর্ম সমন্বয়: উপন্যাসের শেষে যখন গোরা জানতে পারে যে সে জন্মসূত্রে আইরিশ (খ্রিস্টান) এবং তার পালক পিতা-মাতা হিন্দু, তখন তার সমস্ত জাতপাতের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। সে উপলব্ধি করে যে, 'আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান কোনো বিরোধ নেই।' এটিই রবীন্দ্রনাথের সর্বধর্ম সমন্বয় ও বিশ্বমানবতাবাদের আদর্শ।
- প্রকৃত দেশপ্রেম: রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেন যে, ভারতকে ভালোবাসতে হলে আগে গ্রামের সাধারণ, দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু শহরের ড্রয়িংরুমে বসে বক্তৃতা দেওয়াই দেশপ্রেম নয়।
- উপসংহার: 'গোরা' উপন্যাসটি ভারতীয়দের শিখিয়েছিল যে, ধর্ম বা জাতের ভিত্তিতে নয়, বরং সমস্ত মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসার মাধ্যমেই প্রকৃত জাতীয়তা ও স্বাধীন ভারত গড়ে উঠতে পারে।
9. চিত্রকলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের বিকাশে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' (Bharat Mata) চিত্রের ভূমিকা আলোচনা করো।
'ভারতমাতা' চিত্র ও জাতীয়তাবাদ:
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে এবং উত্তাল স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতমাতা' (প্রাথমিক নাম 'বঙ্গমাতা') নামক বিখ্যাত জলরঙের ছবিটি অঙ্কন করেন। চিত্রকলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ বিকাশে এর ভূমিকা অপরিসীম:
- দেশমাতৃকার মূর্ত রূপ: আগে ভারতবাসীরা 'দেশ' বলতে কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বুঝত। অবনীন্দ্রনাথ প্রথম দেশমাতৃকাকে একটি স্নিগ্ধ, শান্ত ও পবিত্র দেবীমূর্তির (সন্ন্যাসিনীর বেশে) রূপ দেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ দেশের প্রতি এক গভীর মানসিক ও ধর্মীয় টান অনুভব করতে শুরু করে।
- অহিংস জাতীয়তাবাদের প্রতীক: ভারতমাতার চার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তাঁর চার হাতে রয়েছে ধানের শিষ (অন্ন বা খাদ্য), সাদা কাপড় (বস্ত্র বা স্বদেশি শিল্প), বই (দীক্ষা বা শিক্ষা) এবং জপের মালা (শান্তি ও আধ্যাত্মিকতা)। এটি ছিল ব্রিটিশদের হিংস্রতার বিপরীতে ভারতীয়দের অহিংস ও গঠনমূলক জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
- স্বদেশি চেতনার প্রসার: ছবিতে ভারতমাতার হাতে দেশীয় জিনিসপত্র তুলে দিয়ে অবনীন্দ্রনাথ দেশবাসীকে বিদেশি জিনিস বর্জন (Boycott) এবং স্বদেশি জিনিস ব্যবহারের বার্তা দিয়েছিলেন। ভগিনী নিবেদিতা এই ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করে একে জাতীয়তাবাদের প্রথম শ্রেষ্ঠ চিত্র বলে আখ্যা দেন। স্বদেশি আন্দোলনের মিছিলে এই ছবি প্ল্যাকার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হত।
10. ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনায় গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুনের (Cartoons) ভূমিকা আলোচনা করো।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের ভূমিকা:
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আধুনিক ভারতীয় ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর আঁকা 'অদ্ভুত লোক' (১৯১৫), 'বিরূপ বজ্র' (১৯১৭) এবং 'নয়া হুল্লোড়' (১৯২১) প্রভৃতি কার্টুন সংকলনগুলি ঔপনিবেশিক সমাজকে তীব্র কটাক্ষ করেছিল:
- বাবু সংস্কৃতির সমালোচনা: ব্রিটিশদের অন্ধ অনুকরণকারী নব্যধনী 'বাবু' সমাজকে তিনি তাঁর কার্টুনে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। বাইরে সাহেবি পোশাক এবং ভেতরে দেশীয় কুসংস্কার—এই ভণ্ডামিকে তিনি তাঁর তুলির খোঁচায় মানুষের সামনে হাস্যাস্পদ করে তুলেছিলেন (যেমন 'সংকর' চিত্রটি)।
- ধর্মীয় ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন: সেকালের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং ধর্মীয় নেতাদের কপটতা, ছুঁৎমার্গ এবং ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে শোষণ করার ছবি তিনি তাঁর 'ব্রাহ্মণ' বা 'অদ্ভুত লোক' কার্টুনগুলিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছিলেন।
- ঔপনিবেশিক শাসনের ব্যঙ্গ: ব্রিটিশ পুলিশ ও প্রশাসনের দুর্নীতি, বর্ণবৈষম্য এবং ভারতীয়দের ওপর তাদের অমানবিক অত্যাচারকেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক কার্টুনের বিষয়বস্তু করেছিলেন।
- উপসংহার: গগনেন্দ্রনাথের কার্টুনগুলি শুধু হাস্যরস সৃষ্টি করেনি, বরং সমাজকে আয়নার মতো তাদের নিজেদের ত্রুটিগুলি দেখিয়ে আত্মসংশোধন করতে এবং ব্রিটিশদের ভণ্ডামি বুঝতে সাহায্য করেছিল। এটি ছিল শিল্পকলার মাধ্যমে এক নীরব কিন্তু তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ।
মনে রেখো!
মহাবিদ্রোহ (১৮৫৭): মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম শহিদ। মহারানির ঘোষণাপত্র (১৮৫৮) দ্বারা কোম্পানির অবসান।
সভা-সমিতি: জমিদার সভা (১৮৩৮), হিন্দুমেলা (১৮৬৭), ভারত সভা (১৮৭৬)।
উপন্যাস: বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, বিবেকানন্দের বর্তমান ভারত, রবীন্দ্রনাথের গোরা।
চিত্রকলা: অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা এবং গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্র (কার্টুন)।