মরশুমের দিনে

সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত 'মরশুমের দিনে' গদ্যের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | ষষ্ঠ শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 20 November 2025 Last Update: 03 June 2026

🌦️ মরশুমের দিনে

সুভাষ মুখোপাধ্যায় গদ্য / প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • নবম পাঠ • গদ্য (নারদের ডায়েরি থেকে নেওয়া)

চাষবাস ও উৎসব প্রখর গ্রীষ্ম বৃষ্টির ব্রত গ্রামবাংলার জীবন

সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)

বাংলা কবিতায় এক উল্লেখযোগ্য নাম কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ "পদাতিক"। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে অগ্নিকোণ, চিরকুট, ফুল ফুটুক, যত দূরেই যাই, কাল মধুমাস, ছেলে গেছে বনে, জল সইতে প্রভৃতি। তিনি হাফিজ, নাজিম হিকমত ও পাবলো নেরুদার কবিতা অনুবাদ করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। পাঠ্য রচনাংশটি তাঁর "নারদের ডায়েরি" নামক বইয়ের অংশবিশেষ।

📖

গদ্য

মরশুমের দিনে

✍️

লেখক

সুভাষ মুখোপাধ্যায়

🔍

উৎস

নারদের ডায়েরি

📚

পাঠ

নবম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

গদ্যের সারাংশ ও মূলভাব

সারাংশ: "মরশুমের দিনে" গদ্যটিতে লেখক সুভাষ মুখোপাধ্যায় গ্রামবাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা লৌকিক ব্রত ও পার্বণের এক সুন্দর চিত্র এঁকেছেন। শহরের সঙ্গে গ্রামের মানুষের নাড়ির টান, বাসের ছাদে মালপত্র ওঠা থেকে শুরু করে গ্রীষ্মের খরতাপে মরীচিকার দৃশ্য—সবই অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। গ্রীষ্মের দারুণ খরায় বৃষ্টির জন্য গ্রামের মেয়েদের "বসুধারা ব্রত" ও "মেঘরানির কুলো" নামানোর প্রথা এবং বর্ষার শেষে আপনজনদের মঙ্গল কামনায় "ভাদুলি ব্রত" পালনের কথা লেখক এখানে তুলে ধরেছেন।

কেন্দ্রীয় চেতনা: এদেশের সমস্ত উৎসব, আনন্দ ও পালা-পার্বণের মূলে রয়েছে চাষবাস। প্রকৃতি, বৃষ্টি এবং ফসলের সঙ্গে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন যে কতটা গভীরভাবে যুক্ত, তা এই গদ্যের মূল উপজীব্য।

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও

২ টি
১.১ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থটির নাম কী?
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থটির নাম হলো 'পদাতিক' (১৯৪০ সালে প্রকাশিত)।
১.২ তাঁর লেখা একটি গদ্যের বইয়ের নাম লেখো।
তাঁর লেখা একটি উল্লেখযোগ্য গদ্যের বইয়ের নাম হলো 'কাঁচা-পাকা' (বা 'ঢোল গোবিন্দের আত্মদর্শন')।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও

৫ টি
২.১ ধান শব্দটি কোন শব্দ থেকে এসেছে?
ধান শব্দটি 'ধন' শব্দ থেকে এসেছে, কারণ গ্রামবাংলায় ধন বা সম্পদ বলতে ধানকেই বোঝানো হতো।
২.২ 'অগ্রহায়ণ' বলতে কী বোঝায়?
'হায়ন' মানে বছর, তাই 'অগ্রহায়ণ' বলতে বছরের গোড়া বা বছরের শুরুকে বোঝায়।
২.৩ এদেশের সমস্ত পালা-পার্বণ, আনন্দ-উৎসব- এসবের মূলে কী রয়েছে?
এদেশের সমস্ত পালা-পার্বণ, আনন্দ-উৎসব— এসবের মূলে রয়েছে চাষবাস বা কৃষিকাজ।
২.৪ বসুধারা ব্রত কোন ঋতুতে হয়?
গ্রীষ্ম ঋতুতে, যখন কালবৈশাখীর রোদে চারদিক পুড়ে যায় এবং জলের জন্য হাহাকার পড়ে, তখন গ্রীষ্মকালে বসুধারা ব্রত হয়।
২.৫ মেঘকে নামাবার জন্য মেয়েরা দল বেঁধে ছড়া করে তাকে কী কী নামে ডাকে?
মেঘকে নামাবার জন্য মেয়েরা মেঘকে কালো মেঘা, ধুলোট মেঘা, তুলোট মেঘা, আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘা এবং সিঁদুর মেঘা ইত্যাদি নামে ডাকে।

শব্দার্থ (Vocabulary)

মফস্সল শহর বা নগরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোটো জনপদ
সেরেস্তা কার্যালয়, দফতর বা অফিস
তদবির-তদারক দেকাশোনা করা, পরিচালনা করা
বিলক্ষণ নিশ্চিত, বিশেষভাবে
আদিগন্ত আকাশের সীমান্তরেখা (দিগন্ত) পর্যন্ত ব্যাপ্ত
মাথাল টোকা, ঘাসপাতা দিয়ে তৈরি ছাতাবিশেষ
ভাদুলি ব্রত বাংলার লৌকিক দেবী ভাদুর নামে ভাদ্র মাসে অনুষ্ঠিত ব্রত

ব্যাকরণ ও ভাষা অনুশীলন

৩. নীচের বিশেষ্য শব্দগুলিকে বিশেষণ এবং বিশেষণ শব্দগুলিকে বিশেষ্যে রূপান্তরিত করো:

প্রদত্ত শব্দ (শ্রেণি)রূপান্তরিত শব্দ (শ্রেণি)
মফস্বল (বিশেষ্য)মফস্বলি (বিশেষণ)
বৎসর (বিশেষ্য)বাৎসরিক (বিশেষণ)
খর (বিশেষণ)খরা বা খরতা (বিশেষ্য)
ব্রত (বিশেষ্য)ব্রতী (বিশেষণ)
বিস্তর (বিশেষণ)বিস্তার (বিশেষ্য)
পর্বত (বিশেষ্য)পার্বত্য (বিশেষণ)
ঝড় (বিশেষ্য)ঝোড়ো (বিশেষণ)

৪. নীচের বাক্যগুলি গঠনগতভাবে কোনটি কী ধরনের লেখো (সরল/যৌগিক/জটিল):

বাক্যবাক্যের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ
৪.১ গ্রামের যাত্রীরা নেমে নেমে যাবে মাঝরাস্তায়।সরল বাক্য
৪.২ যেখানে ঘাসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না, হঠাৎ চোখে পড়বে সেখানে যেন কে সবুজ জাজিম পেতে রেখেছে।জটিল বাক্য
৪.৩ আয় বৃষ্টি কেঁপে, ধান দেব মেপে।যৌগিক বাক্য (দুটি স্বাধীন খণ্ডবাক্য)
৪.৪ খড় কিংবা টিনের চাল।যৌগিক বাক্য ('কিংবা' দ্বারা যুক্ত)

৫. নীচের বাক্যগুলি থেকে শব্দবিভক্তি এবং অনুসর্গ খুঁজে নিয়ে লেখো:

বাক্যবিভক্তিঅনুসর্গ
৫.১ কেউ এসেছিল দোকানের জন্য মাল তুলতে।দোকান-এর (-এর বিভক্তি)জন্য
৫.২ বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে অন্য সমস্ত আওয়াজ ডুবে যায়।বৃষ্টি-র (-র বিভক্তি), শব্দ-এ (-এ বিভক্তি)(নেই)
৫.৩ সন্ধে নাগাদ উলু দিয়ে ব্রত শেষ হয়।(নেই)নাগাদ, দিয়ে
৫.৪ ছেলেরা হই হই করে ছোটে আমবাগানে।ছেলে-রা (-রা বিভক্তি), আমবাগান-এ (-এ বিভক্তি)করে

৬. পাঠ থেকে নিম্নলিখিত শব্দগুলির সমার্থক শব্দ খুঁজে লেখো:

প্রদত্ত শব্দপাঠ থেকে পাওয়া সমার্থক শব্দ
অম্বরআকাশ
ধরামাটি / পৃথিবী
মৃত্তিকামাটি / ধুলো
প্রান্তরমাঠ
তটিনীনদী

৭. নীচের সমোচ্চারিত/প্রায়-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দগুলির অর্থ লেখো:

শব্দঅর্থশব্দঅর্থ
ধোয়াধৌত করা / পরিষ্কার করাধোঁয়াধূম / গ্যাসীয় পদার্থ
জলেসলিলে / পানিতেজ্বলেদহন হয় / পুড়ে যায়
বাধাবিঘ্ন / আটকানোবাঁধাবন্ধন / দড়ি দিয়ে যুক্ত করা
গায়েশরীরে / অঙ্গেগাঁয়েগ্রামে / পল্লিতে
ঝরেখসে পড়ে / পতিত হয়ঝড়েপ্রবল হাওয়ায় / তুফানে

৮. শুদ্ধ বানানটিতে টিক (✔) চিহ্ন দাও:

৮.১ মুহূর্ত / মূহূর্ত / মূহুর্ত ➔ মুহূর্ত
৮.২ অঘ্রহায়ন / অগ্রহায়ন / অগ্রহায়ণ ➔ অগ্রহায়ণ
৮.৩ বিলক্ষণ / বিলক্ষন / বিলখ্যন ➔ বিলক্ষণ
৮.৪ মরিচিকা / মরীচিকা / মরীচীকা ➔ মরীচিকা

৯. বেলা, ডাল, সারা, চাল- এই শব্দগুলিকে দুটি পৃথক অর্থে ব্যবহার করে দুটি করে বাক্য লেখো:

শব্দঅর্থ ১ ও বাক্যঅর্থ ২ ও বাক্য
বেলাসময়: এখন অনেক বেলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।সমুদ্রতীর: দিঘার সমুদ্র বেলায় বসে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে।
ডালগাছের শাখা: ছোটো পাখিটি আম গাছের ডালে বসে ডাকছে।শস্য/খাদ্য: আজ দুপুরে গরম ভাতের সঙ্গে মুসুর ডাল খেয়েছি।
সারাশেষ/সমাপ্ত: আমার বাড়ির সব কাজ সারা হয়ে গেছে।সমগ্র/সমস্ত: সারা গ্রাম জুড়ে আজ আনন্দের উৎসব চলছে।
চালঘরের আচ্ছাদন: প্রবল বৃষ্টিতে আমাদের টিনের চালে ঝমঝম শব্দ হচ্ছে।খাদ্যশস্য: বাজার থেকে পাঁচ কেজি ভালো চাল নিয়ে এসো।

১০. টীকা লেখো (Short Notes)

মরীচিকা: গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদে পিচঢালা কালো রাস্তা বা মরুভূমিতে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন জল চিকচিক করছে এবং তাতে গাছের ছায়া পড়েছে। কিন্তু কাছে গেলে জলের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সূর্যের আলোর পূর্ণ প্রতিফলনের ফলে মানুষের চোখের এই বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিভ্রমকেই মরীচিকা বলা হয়।
বসুধারা ব্রত: কালবৈশাখীর প্রখর রোদে এবং গ্রীষ্মের দারুণ খরায় যখন খাল-বিল শুকিয়ে যায় ও জলের জন্য চারিদিকে হাহাকার পড়ে, তখন বৃষ্টির কামনায় গ্রামীণ মহিলারা যে ব্রত পালন করেন, তাকেই বসুধারা ব্রত বলে।
মেঘরানির কুলো: অনাবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং মেঘকে নামানোর উদ্দেশ্যে গ্রামের অল্পবয়সি মেয়েরা কুলো ও জলঘট নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে। তারা ছড়া কেটে নানা প্রলোভন দেখিয়ে মেঘরানিকে ডাকে। এই লৌকিক প্রথাই গ্রামবাংলায় "মেঘরানির কুলো" নামানো নামে পরিচিত।
ভাদুলি ব্রত: বর্ষাকালের শেষাশেষি ভাদ্র মাসে গ্রামের মেয়েরা এই ব্রত করে। আলপনা এঁকে এবং ছড়া কেটে তারা বাণিজ্যে বা কর্মসূত্রে দূরে যাওয়া বাবা, ভাই ও স্বামীর মঙ্গল কামনা করে, যাতে তারা ভরা নদী ও সমুদ্র পেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসে।

১১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো (রচনাধর্মী)

১১.১ বাস-ডিপোয় অপেক্ষমান যাত্রীদের ছবি কীভাবে পাঠ্যাংশে ধরা পড়েছে?
উত্তর: ছোটো মফস্সল শহরের বাস-ডিপোয় বিভিন্ন ধরনের মানুষের ব্যস্ততার ছবি ফুটে উঠেছে। বাসের ছাদে কনডাক্টর ও ক্লিনার ধরাধরি করে মাল তুলছে। যাত্রীদের কেউ গ্রামে নামবে, কেউবা গঞ্জে যাবে। এদের মধ্যে কেউ কোর্টে মামলা করতে, কেউ সরকারি অফিসে, কেউ বা হাসপাতালে রোগী দেখতে আবার কেউ দোকানের মাল তুলতে শহরে এসেছিল। বাস ছাড়ার আগে তারা নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে চায়ের দোকানের সামনে ভিড় করে এবং ড্রাইভারের দিকে নজর রেখে রোদ পোহায় বা হাওয়া খায়।
১১.২ 'গ্রামের সঙ্গে শহরের যে এখনও নাড়ির টান'- এই নাড়ির টানের প্রসঙ্গ রচনাংশে কীভাবে এসেছে?
উত্তর: গ্রামে যখন মাঠে ফসল ওঠে বা ধান কাটা হয়, তখন চাষির হাতে দুটো পয়সা আসে। এই সময় গ্রামের মানুষ বিভিন্ন কাজে শহরে ভিড় করে। তারা মেয়ে দেখতে, পুজো দিতে, জিনিসপত্র কিনতে, সিনেমা দেখতে এবং কোর্টে মামলার তদারকি করতে শহরে আসে। এর ফলে শহরের উকিল, মোক্তার, দরজি, দোকানি, বামুন-পুরুত সকলেরই ভালো উপার্জন হয়। এইভাবেই শহর এবং গ্রামের একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে তাদের গভীর 'নাড়ির টান'-এর প্রসঙ্গটি রচনাংশে উঠে এসেছে।
১১.৩ 'ধানের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু বৃষ্টি' বৃষ্টির সময়ে ধানক্ষেতের ছবিটি কেমন? অন্য যে যে সময়ে ধান চাষ হয়ে থাকে, তা লেখো।
উত্তর: বৃষ্টির সময়ের ছবি: বর্ষায় বৃষ্টি নামলে চারপাশের শুকনো রুক্ষ মাটি হঠাৎ সবুজে ভরে ওঠে। মাঠে যেখানে ঘাসের চিহ্ন ছিল না, সেখানে যেন কেউ সবুজ জাজিম পেতে রাখে। বৃষ্টির জল পেয়ে জমিতে ধানের চারা দ্রুত (ডিগডিগ করে) বেড়ে ওঠে এবং মাঠ সবুজে সবুজ হয়ে যায়।
অন্যান্য সময়ের ধান চাষ: প্রধানত বর্ষায় আমন ধান রোপণ করা হলেও, আমাদের দেশে আরও দুটি সময়ে ধান চাষ হয়। যথা— শীতের শেষে বা বসন্তকালে 'বোরো' ধান এবং প্রাক-বর্ষায় বা গ্রীষ্মকালে 'আউশ' ধানের চাষ হয়ে থাকে।
১১.৪ 'আগে বছর আরম্ভ হতো অগ্রহায়ণে'- এর সম্ভাব্য কারণ কী?
উত্তর: 'অগ্রহায়ণ' শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় 'অগ্র' (অর্থাৎ গোড়া বা শুরু) এবং 'হায়ন' (অর্থাৎ বছর বা ফসল)। প্রাচীনকালে আমাদের দেশ ছিল সম্পূর্ণ কৃষিপ্রধান এবং মানুষের জীবন ফসলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বছরের এই সময়েই (হেমন্তকালে) মাঠের প্রধান ফসল ধান পেকে ঘরে উঠত। নতুন ফসল ওঠার আনন্দ এবং সমৃদ্ধির উৎসব থেকেই সম্ভবত অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা শুরুর সময় হিসেবে গণ্য করা হতো।
১১.۵ 'এদেশের যত পালা-পার্বণ, উৎসব-আনন্দ, সব কিছুরই মূলে রয়েছে চাষবাস।'- বাংলার উৎসব-খাদ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে চাষবাস কতটা জড়িত বলে তুমি মনে করো?
উত্তর: আমি মনে করি বাংলার সমাজ, উৎসব ও সংস্কৃতির সঙ্গে চাষবাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের অধিকাংশ উৎসব কৃষিকেন্দ্রিক। যেমন— নতুন ধান ঘরে ওঠার পর অগ্রহায়ণ মাসে হয় 'নবান্ন' উৎসব। মকর সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণে নতুন চালের গুঁড়ো ও গুড় দিয়ে ঘরে ঘরে পিঠেপুলি তৈরি হয়। এছাড়া বৃষ্টির কামনায় বসুধারা ব্রত, কিংবা মেঘরানির কুলো নামানোর মতো লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানগুলি প্রমাণ করে যে কৃষিকাজ এবং ফসল ফলানোকে কেন্দ্র করেই বাংলার সমস্ত উৎসব ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়।
১১.৬ 'শহর ছাড়ালেই দু-পাশে দেখা যাবে'- শহরের চিত্রটি কেমন? তা ছাড়িয়ে গেলে কোন দৃশ্য দেখা যাবে?
উত্তর: শহরের চিত্র: মফস্সল শহরের চিত্রটি হলো ব্যস্ততাপূর্ণ। সেখানে বাস-ডিপো, চায়ের দোকান, হাসপাতাল, সরকারি সেরেস্তা, কোর্ট-কাছারি এবং উকিল-মোক্তার ও দোকানিদের কর্মব্যস্ততা দেখা যায়।
শহর ছাড়িয়ে গেলে: শহর ছাড়িয়ে গেলে দু-পাশে দেখা যায় মাথার ওপর দরাজ খোলা আকাশ। রাস্তার দু-ধারে বট, পাকুড়, শাল ও সেগুনের সারি। পিচঢালা কালো রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে এবং রাস্তার দু-ধারে মাঝে মাঝে মাটির বা ইটের বাড়ি যুক্ত লোকালয় ও তারপর আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ চোখে পড়ে।
১১.৭ 'এই রাস্তার ওপরই এক ভারি মজার দৃশ্য দেখা যায়' মজার দৃশ্যটি কেমন তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর: গরমকালে যখন চারপাশের হাওয়া আগুনের মতো তেতে থাকে, তখন পিচঢালা কালো রাস্তার ওপর এক ভারি মজার দৃশ্য বা মরীচিকা দেখা যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় রাস্তার ওপর যেন চিকচিক করে জল ভাসছে এবং সেই জলে রাস্তার ধারের গাছপালার উলটো ছায়া পড়েছে। কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় সেখানে জল বা ছায়া কিছুই নেই। মরুভূমির মরীচিকার মতোই এই দৃষ্টিবিভ্রমকেই লেখক মজার দৃশ্য বলেছেন।
১১.৮ 'ব্রতের ভিতর দিয়ে মনে পড়ে যায় সেই আপনজনদের কথা, যারা দূরে আছে'- শিক্ষক/শিক্ষিকার সাহায্য নিয়ে এমনই কিছু 'ব্রত'র ছড়া খাতায় সংগ্রহ করো।
উত্তর: (শিক্ষার্থীদের সংগ্রহের জন্য একটি নমুনা ব্রতের ছড়া নিচে দেওয়া হলো)
সেঁজুতি ব্রতের ছড়া:
"সেঁজুতি সেঁজুতি, সোনার বাতি,
আমি যেন হই রাজার নাতনি।
বাপের বাড়ি খাট-পালঙ্ক, শ্বশুর বাড়ি দোলা,
আমার যেন হয় একশো ছেলের মেলা।"
১১.১০ 'ধান কাটার পর একেবারে আলাদা দৃশ্য'- এই দৃশ্যে কোন ঋতুর ছবি ফুটে উঠেছে? সেই ঋতু সম্পর্কে কয়েকটি বাক্যে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করো।
উত্তর: এই দৃশ্যে প্রখর গ্রীষ্ম ঋতুর চরম রুক্ষতার ছবি ফুটে উঠেছে। (যদিও ধান কাটা হয় হেমন্তে, কিন্তু পাঠ্যাংশে ধান কাটার পর মাঠের যে কঙ্কালসার, ধুলোময় ও তেতে ওঠা আগুনের ছবি বর্ণনা করা হয়েছে, তা মূলত গ্রীষ্মকালেরই রূপ)।

গ্রীষ্মকাল (অনুচ্ছেদ): গ্রীষ্মকাল হলো বছরের সবচেয়ে উষ্ণ ঋতু। এই সময়ে সূর্যের প্রখর তাপে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং নদী-নালা শুকিয়ে যায়। আকাশ তামার হাঁড়ির মতো রূপ ধারণ করে এবং মাঝে মাঝে লু বা গরম হাওয়া বয়। মানুষ ও পশুপাখি একটু শীতল ছায়া ও পানীয় জলের জন্য হাহাকার করে। এই সময়েই কালবৈশাখীর ঝড় ওঠে। এত কষ্ট সত্ত্বেও গ্রীষ্মকাল ফলের ঋতু, এই সময়ে আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ প্রভৃতি সুস্বাদু ফল পাওয়া যায়।

গদ্যের শিক্ষা

"মরশুমের দিনে" গদ্যটি আমাদের শেখায় যে আধুনিক নাগরিক জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে গ্রামবাংলার কৃষিকাজই হলো আমাদের সমস্ত অর্থনীতির মূল ভিত্তি। প্রকৃতির রূপবদল, বৃষ্টি এবং কৃষকের ঘামের উপর নির্ভর করেই আমাদের বেঁচে থাকা ও আনন্দ উৎসব। তাই গ্রামের সাধারণ মানুষ, তাদের সংস্কৃতি এবং কৃষিকাজের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'মরশুমের দিনে' গদ্যটির লেখক হলেন প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও সাহিত্যিক সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এটি তাঁর 'নারদের ডায়েরি' গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

গ্রীষ্মকালে যখন প্রখর রোদে নদীনালা শুকিয়ে যায় এবং বৃষ্টির অভাবে ফসলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন গ্রামের মেয়েরা বৃষ্টির কামনায় এবং মেঘকে আহ্বান করার জন্য 'বসুধারা ব্রত' ও 'মেঘরানির কুলো' নামক লৌকিক প্রথা পালন করে।

'অগ্রহায়ণ' শব্দের অর্থ হলো বছরের গোড়া (অগ্র = গোড়া, হায়ন = বছর/ফসল)। প্রাচীনকালে কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় হেমন্তকালে মাঠের প্রধান ফসল ধান পেকে ঘরে উঠত। এই নতুন ফসল ওঠার সময়কালকেই বছরের শুরু হিসেবে ধরা হতো।

বর্ষার শেষে ভাদ্র মাসে গ্রামের মহিলারা যে ব্রত পালন করে তাকে ভাদুলি ব্রত বলে। এই ব্রতে আলপনা এঁকে নদী, সমুদ্র ও বাণিজ্যে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের (বাবা, ভাই, স্বামী) নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করা হয়।