ভরদুপুরে

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত 'ভরদুপুরে' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | ষষ্ঠ শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 20 November 2025 Last Update: 03 June 2026

🌾 ভরদুপুরে

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • প্রথম পাঠ • কবিতা

গ্রামবাংলা অলস দুপুর প্রকৃতি ছন্দের জাদু নদী

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (জন্ম: ১২২৪ বঙ্গাব্দ)

বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। জন্মস্থান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলা। কর্মজীবন শুরু সত্যযুগ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে, পরে আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি দীর্ঘদিন আনন্দমেলা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: 'নীল নির্জন', 'অশ্বকার ব্যাধ', 'কলকাতার যীশু' প্রভৃতি। 'উলঙ্গ রাজা' কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।

📖

কবিতা

ভরদুপুরে

✍️

কবি

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

🎨

ধরন

প্রকৃতি ও জীবনভাবনা

📚

পাঠ

প্রথম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারাংশ: "ভরদুপুরে" কবিতায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী গ্রামবাংলার এক অলস দুপুরের ছবি এঁকেছেন। তিনি দেখেছেন অশথ গাছটি পথিকের ছাতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার তলায় ঘাসের গালিচা পাতা রয়েছে। দূরে গোরু-বাছুর চরে বেড়াচ্ছে, গাছের তলায় শুয়ে রাখাল মেঘেদের আকাশ ছোঁয়া দেখছে। নদীর ধারে খড় বোঝাই নৌকো বাঁধা, বাতাস মিহি সাদা ধুলো ওড়াচ্ছে। এই ভরদুপুরে সবাই যার যার ঘরে ঘুমোচ্ছে। কবির মনে হয়েছে, শুধু মানুষই নয়, আঁচল পেতে বিশ্বভুবনও যেন এখানে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় চেতনা: প্রকৃতির কোলে গ্রামজীবনের সরল, শান্ত ও নিসর্গ সৌন্দর্যের এক মনোরম চিত্র এই কবিতায় ফুটে উঠেছে। কবি দেখিয়েছেন, দুপুরের আলস্যে প্রকৃতি ও মানুষ একাকার হয়ে যায়।

১. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও

৩ টি
১.১ \'অশথ গাছ\'-কে পথিকজনের ছাতা বলা হয়েছে কেন?
বিশাল অশথ গাছটি তার ছড়ানো ডালপালা দিয়ে পথ চলতি ক্লান্ত মানুষকে রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে ছায়া দান করে বলেই তাকে \'পথিকজনের ছাতা\' বলা হয়েছে।
১.২ রাখালরা গাছের তলায় শুয়ে কী দেখেছে?
রাখালরা গাছের তলায় শুয়ে আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘগুলিকে দেখেছে, যা যেন আকাশটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
১.৩ নদীর ধারের কোন দৃশ্য কবিতায় ফুটে উঠেছে?
নদীর ধারে বাঁধা একটি বড়ো নৌকা, যা শুকনো খড়ের আঁটি বোঝাই করা, এবং বাতাসে উড়ে যাওয়া মিহি সাদা ধুলোর দৃশ্য কবিতায় ফুটে উঠেছে।

২. শব্দার্থ ও সমার্থক শব্দ

কবিতার শব্দভাণ্ডার
শব্দঅর্থ
গালিচাকার্পেট, ঘাসের চমৎকার পাতার বিছানা
খড়াঁপা আবরণ (যেমন নৌকোর খোল)
মিহিনসূক্ষ্ম, অতি ক্ষুদ্র

৩. একই অর্থযুক্ত শব্দ কবিতা থেকে খুঁজে নিয়ে লেখো

প্রদত্ত শব্দকবিতায় ব্যবহৃত সমার্থক শব্দ
তৃণঘাস
তটিনীনদী
গোরক্ষকরাখাল
পৃথিবীবিশ্বভুবন
জলধরমেঘ

ব্যাকরণ অনুশীলন

৪. বিশেষ্য শব্দগুলিকে বিশেষণে এবং বিশেষণ শব্দগুলিকে বিশেষ্যে পরিবর্তিত করো

শব্দরূপান্তর
খাস (বিণ.)খাসা (বিণ.) বা খাসি (বিশেষ্য)
রাখাল (বি.)রাখালিয়া (বিণ.)
আকাশ (বি.)আকাশি (বিণ.)
মাঠ (বি.)মেঠো (বিণ.)
আদর (বিণ.)আদুরে / আদরণীয় (বিণ.)
গাছ (বি.)গেছো (বিণ.)
লোক (বি.)লৌকিক (বিণ.)

৫. পাশে দেওয়া শব্দগুলির সঙ্গে উপসর্গ যোগ করে নতুন শব্দ তৈরি করো

শব্দউপসর্গ + শব্দ = নতুন শব্দ
নদীউপ + নদী = উপনদী
আদরসম + আদর = সমাদর
বাতাসঅনু + বাতাস = অনুবাতাস (অনুবাত)

৬. নীচের বাক্য বা বাক্যংশের উদ্দেশ্য ও বিধেয় নির্ণয় করো

বাক্যউদ্দেশ্যবিধেয়
ওই যে অশথ গাছটি, ও তো পথিকজনের ছাতা।ওই যে অশথ গাছটিপথিকজনের ছাতা।
কেউ কোথা নেই, বাতাস ওড়ায় মিহিন সাদা ধুলো।বাতাসওড়ায় মিহিন সাদা ধুলো।
আঁচল পেতে বিশ্বভুবন ঘুমচ্ছে এইখানে।বিশ্বভুবনআঁচল পেতে এইখানে ঘুমচ্ছে।

৭. একই অর্থবিশিষ্ট শব্দদ্বয়ের একত্র ব্যবহার

‘বিশ্বভুবন’ শব্দটি ‘বিশ্ব’ আর ‘ভুবন’—এই একই অর্থবিশিষ্ট শব্দদ্বয়ের একত্র উপস্থিতি। এমন আরও পাঁচটি নতুন শব্দ তৈরি করো:

ঘর-বাড়ি
দয়া-মায়া
টাকা-পয়সা
খোঁজ-খবর
আদর-যত্ন

৮. ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো (কোনটি চলতি/ কোনটি শেষ)

বাক্যক্রিয়ার কাল
চরেছে দূরে গোরু-বাছুর।ঘটমান অতীত
দেখেছে রাখাল মেঘগুলো যায় আকাশটাকে ছুঁয়ে।ঘটমান অতীত (চলতি অর্থে)
নদীর ধারে বাঁধা কাদের ওই বড়ো নৌকাটি।সাধিত অতীত (অসমাপিকা)
বাতাস ওড়ায় মিহিন সাদা ধুলো।সাধারণ বর্তমান
আঁচল পেতে বিশ্বভুবন ঘুমচ্ছে এইখানে।ঘটমান বর্তমান

৯. নীচের বাক্যগুলির গঠনগত শ্রেণিবিভাগ করো

বাক্যশ্রেণি
তলায় ঘাসের গালিচাখানি আদর করে পাতা।সরল বাক্য
ওই যে অশথ গাছটি, ও তো পথিকজনের ছাতা।যৌগিক বাক্য
ভরদুপুরে যে যার ঘরে ঘুমোচ্ছে লোকগুলো।জটিল বাক্য
যে জানে, সেই জানে।জটিল বাক্য

ভাষা পর্যবেক্ষণ

১০ দূরত্ববাচক নির্দেশক সর্বনাম
‘ওই যে অশথ গাছটি...’ — এখানে ‘ওই’ একটি দূরত্ববাচক নির্দেশক সর্বনাম।
আরও উদাহরণ: ও, উহা, উনি, ওঁরা, ঐ।
১১ সম্বন্ধপদ
‘পথিকজনের ছাতা’ — সম্বন্ধপদ।
কবিতায় আরও আছে: ঘাসের গালিচা, নদীর ধার।
নতুন উদাহরণ: গোরুর রাখাল, দুপুরের ঘুম, আকাশের মেঘ।
১২ একবচনের নির্দেশক
‘ওই বড়ো নৌকাটি’ — এখানে ‘টি’ নির্দেশক পসিয়ো একবচন বোঝানো হয়েছে।
আরও নির্দেশক: টা, খানা, খানি, গাছ, টুকু।
যেমন: বইটা, দোকানখানা, চিঠিখানি, ফুলগাছ, একটুকু।
১৩ বহুবচনের প্রয়োগ
কবিতায় বহুবচনের ব্যবহার: মেঘগুলো, লোকগুলো।
অন্যান্য বহুবচন নির্দেশক: রা, এরা, গুলা, সব, গণ, বৃন্দ।
যেমন: ছেলেরা খেলছে, পাখিগুলা উড়ছে, ফুলসব ফুটেছে।

বড়ো প্রশ্নোত্তর

১৪.১ \'আঁচল পেতে বিশ্বভুবন ঘুমচ্ছে এইখানে\'— কবির এমন ভাবনার কারণ কী?
উত্তর: ভরদুপুরে চারপাশে এক গভীর স্তব্ধতা নেমে আসে। মানুষ, পশু, নদী, বাতাস—সব যেন থমকে যায়। গাছের ছায়ায় রাখাল ঘুমিয়ে পড়ে, নদীর ধারে নৌকো বাঁধা থাকে, ধুলোও বাতাসে ধীরে উড়ে যায়। এই পরম শান্তির দৃশ্য দেখে কবির মনে হয়, শুধু মানুষ নয়—গোটা বিশ্বভুবনই যেন আঁচল বিছিয়ে এক মহা-ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। এটি কবির কল্পনায় প্রকৃতি ও মানুষের অপূর্ব মিলনের প্রকাশ।
১৪.২ \'ভরদুপুরে\' কবিতায় গ্রামবাংলার এক অলস দুপুরের ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। কবিতায় ফুটে ওঠা সেই ছবিটি কেমন?
উত্তর: কবিতাটি গ্রামীণ জীবনের একটি নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে। এতে দেখা যায়—বিশাল অশথ গাছ ছাতার মতো ছায়া দিচ্ছে, তার নীচে ঘাসের সবুজ গালিচা পাতা। দূরে মাঠে গোরু-বাছুর চরে বেড়াচ্ছে। এক রাখাল গাছের নীচে শুয়ে আকাশে মেঘদের ভেসে যাওয়া দেখছে। নদীর ধারে খড়-বোঝাই নৌকো বাঁধা, বাতাস ধীরে ধূলো উড়িয়ে চলেছে। গোটা গ্রাম যেন দুপুরের ঘুমে ঢুলছে—এটি একটি অপূর্ব নিসর্গ চিত্র।
১৪.৩ কোনো এক ছুটির দিনের দুপুরবেলায় তোমার বাড়ির চারপাশ জুড়ে কেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা জানিয়ে বন্ধুকে একটি চিঠি লেখো।
প্রিয় বন্ধু সুমিত,

আজ ছুটির দিন। বাড়ির চারপাশ কেমন যেন চুপচাপ। বাইরে রোদ ঝলমল করছে, অশথ গাছটার নীচে চড়ুই পাখিগুলো উড়ছে আর কিচিরমিচির করছে। মাঠে রাখাল গোরু নিয়ে বসে আছে, গানের সুর ভেসে আসছে। আমাদের পুকুরের জল একদম স্থির, মাঝে মাঝে মাছ লাফাচ্ছে। বাড়ির উঠোনে মা পিঠে করছেন, আর দিদা কাঁথা সেলাই করছেন। সত্যি বলতে কি, এই দুপুরের শান্তিটা আমার খুব প্রিয়। তোর ওখানে কেমন লাগে ছুটির দিনে? আমাকে জানাস।

ইতি,
তোর প্রিয় বন্ধু
(নাম)
১৪.৪ তোমার দেখা একটি অলস দুপুরের ছবি আঁকো।
উত্তরের নির্দেশনা: এই প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজের কল্পনা থেকে একটি আলাদা ছবি আঁকবে। ছবিতে ফুটে উঠতে পারে—গাছের তলায় একজন রাখাল, দূরে নদী, আকাশে মেঘ, আর ঘুমন্ত পরিবেশের রেখাচিত্র। শিক্ষকরা চিত্রটির মৌলিকতা ও কবিতার ভাব কতটা ফুটে উঠেছে তা দেখে মূল্যায়ন করবেন।

কবিতার শিক্ষা

"ভরদুপুরে" কবিতাটি শুধু গ্রামীণ দৃশ্যের বর্ণনা নয়, এটি আমাদের শেখায় কীভাবে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়। আধুনিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে এই অলস দুপুরের নিঝুম শান্তি আমাদের মনে এনে দিতে পারে গভীর প্রশান্তি। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, প্রকৃতি আর মানুষ আসলে এক ও অভিন্ন। সৌন্দর্য উপলব্ধি করাই প্রকৃত জীবন।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'ভরদুপুরে' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (জন্ম ১২২৪ বঙ্গাব্দ) রচিত। এটি WBBSE ষষ্ঠ শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের প্রথম পাঠে অন্তর্ভুক্ত একটি প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা।

কবিতাটির মূলভাব হলো গ্রামবাংলার এক অলস দুপুরের নিসর্গচিত্র। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতির কোলে সবকিছু থমকে যায়—পথিকের ছাতা হয়ে দাঁড়ানো অশথ গাছ, নদীর ধারে বাঁধা নৌকো, ঘুমন্ত রাখাল ও মিহি ধুলো ওড়া বাতাস এক পরম শান্তির আবহ তৈরি করে। কবি অনুভব করেছেন, শুধু মানুষ নয়, আঁচল পেতে বিশ্বভুবনও এইখানে ঘুমিয়ে পড়েছে।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি। তিনি সত্যযুগ ও আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো 'নীল নির্জন', 'অশ্বকার ব্যাধ', 'কলকাতার যীশু'। 'উলঙ্গ রাজা' কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
[file content end]