আঁকা, লেখা

মৃদুল দাশগুপ্ত রচিত 'আঁকা, লেখা' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

আঁকা, লেখা

মৃদুল দাশগুপ্ত কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ

ছবি আঁকা কবিতা লেখা পাখি প্রকৃতি

মৃদুল দাশগুপ্ত (জন্ম ১৯৫৫)

হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে জন্ম। লেখাপড়া করেছেন উত্তরপাড়া কলেজে। বিষয় ছিল জীববিজ্ঞান। প্রথম কাব্যগ্রন্থ—'জলপাই কাঠের এসরাজ'। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ—'এভাবে কাঁদে না', 'গোপনে হিসার কথা বলি', 'সূর্যাস্তে নির্মিত গৃহ' ইত্যাদি। ছোটদের জন্য ছড়ার বই—'বিকিমিকি বিরিবিরি', 'ছড়া ৫০', 'আমপাতা জামপাতা'। বর্তমানে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত।

📝

কবিতা

আঁকা, লেখা

👤

কবি

মৃদুল দাশগুপ্ত

📚

পাঠ

তৃতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

প্রকৃতি ও সৃজনশীলতা

সম্পূর্ণ কবিতা

আঁকা, লেখা

✍️ আঁকা, লেখা

রং ছড়িয়ে খুশ-খেয়ালে আমি যখন ছবি আঁকি তিনটি শালিক বগড়া থামায়, অবাক তাকায় চড়ুই পাখি মৎস্য ভুলে মাছরাঙা তার নীল রংটি ধার দিতে চায় প্রজাপতির ঝাঁক চাইছে তাদের রেখে যেতে আমার আঁকায় গর্ত থেকে ইঁদুর, সেটাও পিটপিটে চোখ দেখছে চেয়ে রং-তুলিরা বেজায় খুশি আজ দুপুরে আমায় পেয়ে। ওই যে মাঠে চাঁদের দুধের সর জমে যায় যখন পুব বাতাস ঈষৎ কাঁপন দিতেই আমার ছড়া লেখার শুরু এবার যেন তারার মালা খুব গোপনে নামছে কাছে 'অ' লিখেছে 'আ' লিখেছে দশ জোনাকি বকুল গাছে এই ছড়াতেই আজ আমাকে তোমার কাছে আনলো হাওয়া সেই তো আমার পরম পুলক, সেই তো আমার পদক পাওয়া!

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

মূলভাব: "আঁকা, লেখা" কবিতায় মৃদুল দাশগুপ্ত কবির আঁকা আর লেখার জগৎটিকে প্রকৃতি ও চারপাশের প্রাণীদের সঙ্গে মিলিয়ে এক অপূর্ব কাব্যচিত্র এঁকেছেন। কবি যখন রং ছড়িয়ে ছবি আঁকেন, তখন শালিকেরা ঝগড়া থামায়, চড়ুই পাখি অবাক হয়ে তাকায়, মাছরাঙা মাছ ভুলে নীল রং ধার দিতে চায়। আবার যখন কবি ছড়া লেখেন, তখন চাঁদের দুধের সর জমে, বাতাস কাঁপন দেয়, জোনাকিরা বকুল গাছে 'অ-আ' লিখে দেয়।

কবির কাছে এই প্রকৃতির সঙ্গে সৃজনের যে মিলন, সেইটাই তাঁর পরম পুলক—সেটাই তাঁর 'পদক পাওয়া' বা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। প্রকৃতি, পাখি, কীটপতঙ্গ আর কবির আঁকা-লেখা—সব যেন এক সুতোয় গাঁথা।

১. 'পিটপিটে চোখ'-এর মতো আরও পাঁচটি শব্দ তৈরি করো

প্রদত্ত উদাহরণ: কুড়মুড় চানাচুর

  • মিটমিটে আলো — হালকাভাবে জ্বলা আলো
  • খটখটে রাস্তা — এবড়োখেবড়ো, কঠিন রাস্তা
  • চকচকে মেঝে — পরিষ্কার, উজ্জ্বল মেঝে
  • টসটসে তরমুজ — টাটকা, রসালো তরমুজ
  • লকলকে শরীর — সরু ও লম্বাটে শরীর
  • ঝরঝরে বাতাস — একটানা বইতে থাকা বাতাস

২. সঠিক বানানটি বেছে নাও

প্রশ্নসঠিক বানান
২.১মৎস্য (মৎস্য / মৎস্ / মত্স্য)
২.২দুধের সর (দুধের স্বর / দুধের সর / দুধের শর)
২.৩কাঁপন (কাপন / কাঁপন / কাঁপণ)
২.৪ঈষৎ (ঈশৎ / ইষৎ / ঈষৎ)

৩. সমার্থক শব্দ কবিতা থেকে খুঁজে লেখো

প্রদত্ত শব্দসমার্থক শব্দ (কবিতা থেকে)
সামান্যঈষৎ — সামান্য পরিমাণ, অল্প
আনন্দপুলক — রোমাঞ্চ, আনন্দের অনুভূতি
মীনমৎস্য — মাছ
নক্ষত্রতারা — আকাশের তারা
মুষিকইঁদুর — ইঁদুর, গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা প্রাণী

৪. 'কম্পন' → 'কাঁপন' — একই নিয়মে ছক সম্পূর্ণ করো

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপনিয়ম
কম্পনকাঁপনম্প → ঁপ (ম + প → ঁ + প)
শম্পাশাঁপাম্প → ঁপ
সাম্প্রতসাঁপ্রতম্প্র → ঁপ্র
সম্পূর্ণসঁপূর্ণম্পু → ঁপু
সম্পত্তিসঁপত্তিম্প → ঁপ
সংকল্পসংকল্প (অপরিবর্তিত — সংস্কৃত তৎসম শব্দ)—

৫. সমষ্টিবাচক শব্দ দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো

প্রশ্নউত্তর
৫.১ ভেড়ার _____ভেড়ার পাল
৫.২ কইমাছের _____কইমাছের ঝাঁক
৫.৩ হাতির _____হাতির দল
৫.৪ নৌকার _____নৌকার বহর
৫.৫ সুপুরি গাছের _____সুপুরি গাছের সারি
৫.৬ ছাত্রদের _____ছাত্রদের দল

অতিরিক্ত: প্রজাপতির ঝাঁক, পাখির ঝাঁক বা দল, মাছের ঝাঁক, গরুর পাল, সৈন্যের দল বা বাহিনী

৬. বিশেষ্যের বিশেষণ রূপ লেখো

বিশেষ্যবিশেষণ
রংরঙিন
ছবিছবিতুল্য / চিত্রিত
মাঠমেঠো / মাঠের
লেখালিখিত
পুলকপুলকিত

৭. বিশেষণের সঙ্গে উপযুক্ত বিশেষ্য বসিয়ে বাক্য রচনা

  • ঈষৎ (হাসি): তাঁর মুখে ঈষৎ হাসি ফুটে উঠল।
  • বেজায় (রাগ): বাবার বেজায় রাগ দেখে সবাই চুপ হয়ে গেল।
  • পিটপিটে (চোখ): পিটপিটে চোখে ইঁদুরটা গর্ত থেকে উঁকি মারছিল।
  • পরম (আনন্দ): মায়ের মুখে হাসি দেখে আমার পরম আনন্দ হলো।
  • নীল (আকাশ): শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভাসছে।
  • গোপনে (বিয়ে): তারা দুজনে গোপনে বিয়ে করে ফেলল।

৮. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো

শব্দবিপরীতার্থক শব্দ
গোপনেপ্রকাশ্যে
ঈষৎপ্রচুর / অত্যন্ত
খুশিদুঃখী / বিষণ্ণ
পুবপশ্চিম
বড়ছোট

৯. নিম্নরেখ অংশগুলির কারক-বিভক্তি নির্ণয় করো

বাক্যাংশপদকারকবিভক্তি
তিনটি শালিক বগড়া থামায়।তিনটি শালিককর্তৃকারকশূন্য
গর্ত থেকে ইঁদুর, সেটাও পিটপিটে চোখ দেখছে চেয়ে।গর্ত থেকেঅপাদান কারকথেকে
প্রজাপতির ঝাঁক চাইছে তাদের রাখতে আমার আঁকায়।প্রজাপতির ঝাঁককর্তৃকারকশূন্য
এবার যেন তারার মালা খুব গোপনে নামছে কাছে।কাছেঅধিকরণ কারকএ (সপ্তমী)
সেই তো আমার পদক পাওয়া।আমারসম্বন্ধ পদর (ষষ্ঠী)

১০. বাক্য বাড়াও

১০.১ আমি যখন আঁকি। (কী? কীভাবে?)

সম্প্রসারিত: আমি যখন রং ছড়িয়ে খুশ-খেয়ালে মনের সুখে নানা রঙের ছবি আঁকি।

১০.২ চাঁদের দুধের সর জমে যায়। (কোথায়? কেমন?)

সম্প্রসারিত: ওই যে মাঠের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে, সন্ধ্যা নামার মুখে চাঁদের দুধের সর খুব নরম ও ঘন হয়ে জমে যায় যখন পুব আকাশে।

১০.৩ পিটপিটে চোখ দেখছে চেয়ে। (কে? কোথা থেকে?)

সম্প্রসারিত: গর্তের ভেতর থেকে ইঁদুরটা উঁকি মেরে তার পিটপিটে চোখে কৌতূহল নিয়ে দেখছে চেয়ে।

১০.৪ ছড়া লেখার শুরু। (কার? কখন?)

সম্প্রসারিত: যখন সন্ধ্যাবেলা বাতাস ঈষৎ কাঁপন দেয়, তখনই আমার নতুন ছড়া লেখার শুরু হয়।

১০.৫ 'অ' লিখেছে 'আ' লিখেছে। (কারা? কোথায়?)

সম্প্রসারিত: দশটি জোনাকি পোকা বকুল গাছের ডালে বসে অন্ধকারে আলো জ্বেলে 'অ' লিখেছে আর 'আ' লিখেছে।

১১. একটি বাক্যে উত্তর দাও

10 টি
১১.১ কবি কখন ছবি আঁকেন?
কবি যখন রং ছড়িয়ে খুশ-খেয়ালে মনের আনন্দে ভেসে বেড়ান, তখনই তিনি ছবি আঁকেন।
১১.২ কখন তাঁর ছড়া লেখার শুরু?
পুব আকাশে চাঁদের দুধের সর জমে গেলে এবং বাতাস ঈষৎ কাঁপন দিলে—ঠিক তখনই কবির ছড়া লেখার শুরু হয়।
১১.৩ তিনটি শালিক কী করে?
তিনটি শালিক তাদের নিজেদের মধ্যে বগড়া বা ঝগড়া থামিয়ে দেয়—কারণ কবির ছবি আঁকা দেখে তারা বিস্ময়ে থমকে যায়।
১১.৪ কে অবাক তাকায়?
চড়ুই পাখি অবাক হয়ে তাকায়। কবির তূলির রঙের ছটা দেখে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়।
১১.৫ মাছরাঙা কী চায়?
মাছরাঙা মাছ ধরার কথা ভুলে গিয়ে তার নীল রংটি কবিকে ধার দিতে চায়—যেন কবির ছবিতে সেই নীল রং ব্যবহার করা হয়।
১১.৬ প্রজাপতিদের ইচ্ছা কী?
প্রজাপতির ঝাঁক চায় যে তাদের বাঁকা রেখাগুলি যেন কবির আঁকা ছবিতে স্থান পায়—তারা যেন কবির ছবিরই অংশ হয়ে যায়।
১১.৭ গর্ত থেকে কে থাকে?
গর্ত থেকে একটি ইঁদুর থাকে—সে তার পিটপিটে চোখে কৌতূহল নিয়ে কবির আঁকা দেখছে চেয়ে।
১১.৮ চাঁদের পুরু দুধের সর কোথায় জমে?
চাঁদের পুরু দুধের সর ওই মাঠে জমে যায়—যখন পুব আকাশে চাঁদ ওঠে এবং তার আলো মাঠের উপর ছড়িয়ে পড়ে।
১১.৯ কারা, কোথায় অ-আ লিখেছে?
দশটি জোনাকি পোকা বকুল গাছের ডালে বসে একসঙ্গে মিলে 'অ' লিখেছে আর 'আ' লিখেছে—অন্ধকারে তাদের আলোই যেন অক্ষর হয়ে ফুটেছে।
১১.১০ কবি কোন বিষয়কে 'পদক পাওয়া' মনে করেছেন?
প্রকৃতির মাঝে বসে ছড়া লেখার সময় যে অপার আনন্দ ও পুলক অনুভব করেন—সেই পুলককেই কবি তাঁর জীবনের 'পদক পাওয়া' বা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে মনে করেছেন।

১২. দুই-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও

6 টি
১২.১ কবি যখন ছড়া লিখতে শুরু করেন তখন চারপাশের প্রকৃতিতে কী কী পরিবর্তন ঘটে?
কবি যখন ছড়া লিখতে শুরু করেন, তখন প্রকৃতি এক জাদুকরী রূপ নেয়। পুব আকাশে চাঁদের আলো মাঠের উপর দুধের সরের মতো জমে যায়। বাতাস ঈষৎ কেঁপে ওঠে—যেন সেই কাঁপনই কবির কলমে দোলা দেয়। তারার মালা খুব গোপনে নেমে আসে কবির কাছে। দশটি জোনাকি বকুল গাছে বসে 'অ' আর 'আ' লিখে দেয়—অন্ধকারে তাদের আলো যেন অক্ষরের আকার নেয়।
১২.২ কবি যখন ছবি আঁকেন তখন কী কী ঘটনা ঘটে?
কবি যখন রং ছড়িয়ে খুশ-খেয়ালে ছবি আঁকেন, তখন চারপাশের সব প্রাণী যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। তিনটি শালিক নিজেদের মধ্যে ঝগড়া (বগড়া) থামিয়ে দেয়। চড়ুই পাখি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে। মাছরাঙা পাখি মাছ ধরার কথা ভুলে গিয়ে কবিকে তার দেহের নীল রং ধার দিতে চায়। প্রজাপতির ঝাঁক তাদের বাঁকা রেখা কবির আঁকায় রেখে যেতে চায়। গর্ত থেকে ইঁদুর পিটপিটে চোখে কৌতূহল নিয়ে দেখে। রং-তুলিরাও বেজায় খুশি হয় কবিকে পেয়ে।
১২.৩ "তিনটি শালিক ঝগড়া থামায়"—কোন কবির কোন কবিতায় এমন তিন শালিকের প্রসঙ্গ অন্যভাবে আছে?
তিনটি শালিকের প্রসঙ্গ বিখ্যাত বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের \'সহজপাঠ\' বা শিশুতোষ কবিতার মতো রচনায় পাওয়া যায়। তবে বিশেষভাবে \'তিনটি শালিকের ছানা\' নামে একটি সুপরিচিত ছড়া আছে। এছাড়াও সুকুমার রায়ের ছড়ায় পাখিদের নানা রকম মজার প্রসঙ্গ আছে। তবে মৃদুল দাশগুপ্তের এই \'আঁকা, লেখা\' কবিতায় শালিকেরা কবির ছবি আঁকায় মগ্ধ হয়ে নিজেদের ঝগড়া ভুলে যায়—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অভিনব উপস্থাপনা।
১২.৪ মাছরাঙা পাখি কেমন দেখতে? সে মৎস্য ভুলে যায় কেন?
মাছরাঙা পাখি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর—তার দেহে উজ্জ্বল নীল, সবুজ ও কমলা রঙের মিশ্রণ থাকে। তার লম্বা চঞ্চু (ঠোঁট) দিয়ে সে জলের মাছ শিকার করে। কিন্তু কবি যখন ছবি আঁকেন, তখন মাছরাঙা মাছ ধরার কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়—কারণ কবির আঁকা রঙের সমারোহ তাকে এতটাই মুগ্ধ করে যে সে নিজের গায়ের নীল রংটিই ধার দিতে চায় কবির ছবির জন্য।
১২.৫ "রং-তুলিরা বেজায় খুশি আজ দুপুরে আমায় পেয়ে।" — কবির এমন বলার কারণ কী?
কবি এমন বলেছেন কারণ দুপুরে যখন তিনি রং আর তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসেন, তখন রং-তুলিরা (যেন সজীব হয়ে) বেজায় খুশি হয়। এর কারণ:
• কবি যখন আনন্দের সঙ্গে সৃষ্টি করেন, রং ও তুলি যেন প্রাণ পায়।
• দুপুরে সাধারণত সবাই বিশ্রাম নেয়, কিন্তু কবি তখন সৃজনশীল—তাই রং-তুলিরা যেন আদৃত বোধ করে।
• চারপাশের পাখি, প্রজাপতি, ইঁদুর—সবার কৌতূহলী উপস্থিতি আরও আনন্দ বাড়িয়ে দেয়।
১২.৬ "অ' লিখেছে 'আ' লিখেছে" —কারা কীভাবে এমন লিখেছে? তাদের দেখে কী মনে হয়েছে?
দশটি জোনাকি পোকা বকুল গাছে বসে তাদের আলো দিয়ে 'অ' আর 'আ' লিখেছে। জোনাকির দেহ থেকে নির্গত জ্যোতিঃ অন্ধকারে যখন জ্বলে-নেভে, তখন সেই আলোর রেখাগুলো যেন বাংলা বর্ণমালার 'অ' এবং 'আ'-র আকার তৈরি করে।

তাদের এই আলো-লেখা দেখে মনে হয়েছে—যেন তারার মালা খুব গোপনে কবির কাছে নেমে এসেছে। প্রকৃতি যে নিজেই এক বর্ণমালা, এক ভাষা সৃষ্টি করতে পারে—এ যেন তারই প্রমাণ। কবির কাছে এই দৃশ্যই পরম পুলকের, এটাই কবির জীবনের সেরা 'পদক পাওয়া'।

১৩. অনধিক দশটি বাক্যে উত্তর দাও

4 টি
১৩.১ "এই ছড়াতেই আজ আমাকে তোমার কাছে আনলো হাওয়া" —কাকে উদ্দেশ্য করে কবি একথা বলেছেন? কবির আঁকা এবং লেখার সঙ্গে এই মানুষটির উপস্থিতির সম্পর্ক ও গুরুত্ব বিচার করো।
কবি এখানে সম্ভবত তাঁর প্রিয়জন বা প্রেমিকাকে (বা সাধারণভাবে পাঠককেও) উদ্দেশ্য করে বলেছেন। কিন্তু গভীরতর অর্থে, \'তোমার\' বলতে কবি প্রকৃতিপ্রেমী যে কোনো মানুষকে বোঝাতে পারেন, অথবা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকেও।

সম্পর্ক ও গুরুত্ব:
কবির কাছে আঁকা আর লেখা নিছক একাকী সৃজন নয়—এগুলোর মধ্যে দিয়ে তিনি পৌঁছাতে চান তাঁর প্রিয়জনের কাছে। হাওয়া (বাতাস) যেন দূতের কাজ করে—কবির ছড়াকে বয়ে নিয়ে যায় \'তোমার\' কাছে। এই \'তুমি\'ই হলেন কবির সৃষ্টির মূল প্রেরণা ও প্রাপক।

বিচার করলে দেখা যায়: (১) কবির আঁকা যখন পাখি-প্রজাপতি-ইঁদুরকে মুগ্ধ করে, তখন সেই আনন্দের পূর্ণতা পেতে চায় প্রিয়জনের উপস্থিতি। (২) কবির লেখা যখন জোনাকির আলোয় অক্ষর হয়ে ফোটে, তখন সেই সৃষ্টিও একান্তভাবেই \'তোমার\' জন্য। অর্থাৎ, সমস্ত সৃজনশীলতার চূড়ান্ত গন্তব্যই হলো এই \'তুমি\' বা ভালোবাসার মানুষটি। তাঁকে ছাড়া আঁকা-লেখার পুলক অসম্পূর্ণ।
১৩.২ এই কবিতায় যে যে উপমা ও তুলনা ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলি ব্যবহারের সার্থকতা বুঝিয়ে দাও।
মৃদুল দাশগুপ্তের \'আঁকা, লেখা\' কবিতায় যে উপমা ও তুলনা ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলি অত্যন্ত সার্থক:

১) চাঁদের দুধের সর: পুব আকাশে চাঁদের যে আলো মাঠে পড়ে, তাকে \'দুধের সর\'-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সর যেমন ঘন, সাদা ও কোমল—চাঁদের আলোটাও তেমনই নরম ও স্নিগ্ধ। প্রকৃতির এই উপমা ছাড়া মাঠের চাঁদ-ধোয়া রূপ বোঝানো যেত না।

২) তারার মালা: জোনাকিদের সমবেত আলোকে তারার মালার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রাতের তারারা যেমন আকাশে গয়নার মতো ঝুলে থাকে, জোনাকিরাও তেমনই বকুল গাছে আলোর হার পরিয়ে দিয়েছে।

৩) জোনাকির \'অ-আ\' লেখা: এটি উপমা নয়—মানবীয়করণ (Personification)। জোনাকিরা যেন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন—তাদের আলোর রেখা যেন বর্ণমালা হয়ে ধরা দিয়েছে।

৪) পদক পাওয়া: কবি ছড়া লেখার পুলককে \'পদক পাওয়া\'-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসল পুরস্কার কোনো ধাতব পদক নয়—সৃজনের আনন্দই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

এই উপমাগুলি ছাড়া কবির সৃজনলোকের জাদুকরী আবহ বোঝানো সম্ভব হতো না।
১৩.৩ ছবি আঁকা, ছড়া/কবিতা লেখার মধ্যে তুমি নিজে কোনটা, কেন বেশি পছন্দ করো তা লেখো।
ছবি আঁকা আর কবিতা লেখা—দুটোই সৃজনশীলতার প্রকাশ। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কবিতা বা ছড়া লেখা বেশি পছন্দ করি।

এর কারণ:
১) ভাষার মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করা আমার কাছে সহজ। রং আর তুলির চেয়ে শব্দ দিয়ে মনের ভাব আঁকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
২) কবিতা লেখার সময় কোনো বাঁধাধরা নিয়মের প্রয়োজন পড়ে না—ছন্দ-মিল থাকতেই হবে এমনও নয়। নিজের মনের কথা সোজাসুজি বলা যায়।
৩) কবিতা বা ছড়া লেখার পর সেটা জোরে পড়ে শোনাতে ভালো লাগে। আঁকা ছবি দেখানো যায়, কিন্তু \'শোনানো\' যায় না।
৪) তাছাড়া, কবিতা লেখার জন্য শুধু কলম-কাগজ বা মোবাইলই যথেষ্ট। ছবি আঁকতে গেলে রং-তুলি-কাগজ—অনেক সরঞ্জাম চাই।

তবে ছবি আঁকাটাও যে ভালো লাগে না তা নয়—বিশেষ করে প্রকৃতির ছবি আঁকতে আমার দারুণ লাগে। কিন্তু দুটোর মধ্যে বেছে নিতে হলে আমি নিঃসন্দেহে কবিতা লেখাকেই বেছে নেবো।
১৩.৪ তোমার নিজের লেখা ছড়া/কবিতা, নিজের আঁকা ছবিতে ভরিয়ে চার পাতার একটি হাতে লেখা পত্রিকা তৈরি করো। পত্রিকার একটি নাম দাও। তারপর শিক্ষক/শিক্ষিকাকে দেখিয়ে তাঁর মতামত জেনে নাও।
পত্রিকার নাম: \'জোনাকির আলো\'

এটি একটি হাতে লেখা পত্রিকা তৈরি করার জন্য নির্দেশনা ও নমুনা:

প্রথম পাতা (প্রচ্ছদ):
• ওপরে বড় অক্ষরে নাম: \'জোনাকির আলো\'
• নীচে একটি জোনাকি পোকার ছবি আঁকো (কালো কাগজে সাদা-হলুদে)
• সম্পাদকের নাম ও শ্রেণি লেখো

দ্বিতীয় পাতা:
• তোমার নিজের লেখা একটি ছড়া—যেমন বৃষ্টি, ফুল, পাখি বা স্কুল নিয়ে
• পাশে বৃষ্টির ফোঁটা বা ফুলের ছোট্ট ছবি আঁকো

তৃতীয় পাতা:
• একটি ছোট্ট গল্প বা কবিতা—যেমন \'আমার প্রিয় বন্ধু\' বা \'একটি ভোরে দেখা\'
• পাশে সূর্যোদয় বা বন্ধুর ছবি আঁকো

চতুর্থ পাতা (শেষ পাতা):
• \'আমার পত্রিকা সম্বন্ধে শিক্ষকের মতামত\'
• নীচে শিক্ষকের স্বাক্ষরের জন্য জায়গা

গুরুত্বপূর্ণ: পত্রিকাটি সম্পূর্ণ হাতে লিখবে (পেনসিল বা পেনে), রং পেনসিল বা জলরং দিয়ে ছবি আঁকবে। মার্জিন টেনে সুন্দর করে সাজাবে। শিক্ষককে দেখানোর পর তাঁর মতামত নীচে লিখে নেবে।

কবিতার শিক্ষা

মনে রেখো: মৃদুল দাশগুপ্তের \'আঁকা, লেখা\' কবিতা শুধু ছবি আর কবিতার কথা নয়—এটা প্রকৃতি, সৃজনশীলতা আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কবির আঁকা যখন পাখি-প্রজাপতি-ইঁদুরকে মুগ্ধ করে, আর লেখা যখন জোনাকির আলোয় অক্ষর হয়ে ফোটে—তখন বোঝা যায়, সৃষ্টি কখনো একা হয় না। প্রকৃতি আর মানুষ—দুজনেই এর সহশিল্পী।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'আঁকা, লেখা\' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি মৃদুল দাশগুপ্ত (জন্ম ১৯৫৫) রচিত। তিনি হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ \'জলপাই কাঠের এসরাজ\'। ছোটদের জন্য \'বিকিমিকি বিরিবিরি\', \'ছড়া ৫০\', \'আমপাতা জামপাতা\'-র মতো জনপ্রিয় ছড়ার বই লিখেছেন। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের তৃতীয় পাঠ।

কবিতাটিতে কবির আঁকা আর লেখা—এই দুই সৃজনশীল কাজের সঙ্গে প্রকৃতি ও চারপাশের প্রাণীদের এক অপূর্ব সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। কবি যখন রং ছড়িয়ে ছবি আঁকেন, শালিকেরা ঝগড়া থামায়, চড়ুই অবাক তাকায়, মাছরাঙা নীল রং ধার দিতে চায়, প্রজাপতিরা তাঁদের বাঁকা রেখা এঁকে দিতে চায়। আবার যখন কবি ছড়া লেখেন, চাঁদের আলো দুধের সরের মতো জমে, বাতাস কাঁপন দেয়, জোনাকিরা বকুল গাছে \'অ-আ\' লিখে দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে এই সৃজনের মিলনই কবির পরম পুলক।

কবিতার শেষে কবি বলেছেন, প্রকৃতির মাঝে বসে ছড়া লেখার সময় যে অপার পুলক ও আনন্দ অনুভব করেন, সেটাই তাঁর কাছে \'পদক পাওয়া\'র সমান। প্রকৃত পদের বা পুরস্কার কোনো ধাতব বা বস্তুগত জিনিস নয়—বরং সৃজনের আনন্দ, ভালোবাসার মানুষের কাছে পৌঁছতে পারার তৃপ্তিই জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ প্রসঙ্গে কবি আগেই বলেছেন: \'এই ছড়াতেই আজ আমাকে তোমার কাছে আনলো হাওয়া\'—এই পৌঁছে যাওয়াটাই আসল পুরস্কার।