ভানুসিংহের পত্রাবলী
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • সপ্তম পাঠ
উৎস: 'ভানুসিংহের পত্রাবলি' পত্রসংকলন
রচনা
ভানুসিংহের পত্রাবলী
লেখক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাঠ
সপ্তম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ধরন
পত্রসাহিত্য (চিঠি)
পত্রের সারসংক্ষেপ
এই পত্রদুটির প্রথমটি লেখা হয়েছে ২৯ আষাঢ়, ১৩২৯ (বাংলা সন) কলকাতা থেকে।
প্রথম পত্র: কলকাতা শহরকে ইট-কাঠের প্রকাণ্ড জন্তু বলে মনে হয় কবির—যেন তা তাঁকে গিলে ফেলেছে। অন্যদিকে শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি নামলে চারপাশের প্রকৃতি এক করুণ সৌন্দর্যে ভরে ওঠে, গান জেগে ওঠে মনের মধ্যে। কিন্তু কলকাতার নববর্ষের বাড়ির ছাদ থেকে সেই সৌন্দর্য খাঁড়া হয়ে পড়ে। বর্ষামঙ্গলের গান শান্তিনিকেতনের মাঠে তৈরি হয়—কলকাতার হাটে তা জমবে কিনা সন্দেহ। দিনুবাবুও (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর) কলকাতা ছেড়ে পালাতে চান।
দ্বিতীয় পত্র: লেখা ২ শ্রাবণ, ১৩২৯। কবি আত্মাই নদীতে বোটে করে ভেসে চলেছেন। বর্ষার মেঘে আকাশ ঢাকা, হালকা বাতাস বইছে, পাল তুলে দেওয়া হয়েছে। নদী কূলে কূলে পরিপূর্ণ, দলে দলে শেওলা ভেসে আসছে। দুই তটে সবুজের ঘনিমা—ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, আম-কাঁঠাল-তেঁতুল-শিমুল গাছ। এরই মধ্যে বৃষ্টি নামল। এই জলমগ্ন আকাশের ছায়াবৃত নিভৃত শ্যামলতায় একটি গান তৈরি করতে ইচ্ছে করছে কবির। দীর্ঘদিন বোলপুরের শুকনো ডাঙায় কাটিয়ে এখন নদীর উপর আসতে পেরে কবির মনে হচ্ছে পৃথিবীর মনের কথাটি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু রাতের গাড়িতেই কলকাতা যেতে হবে—এটা ভালো লাগছে না।
১. সঠিক উত্তরটি বেছে লেখো
৫ টিবর্ষামঙ্গল শ্রাবণ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। পত্রে উল্লেখ আছে 'এবার শ্রাবণ মাসে আর বারের মতো কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে'।
শান্তিনিকেতন বীরভূম জেলায় অবস্থিত। এটি বোলপুরের কাছে রবীন্দ্রনাথের স্থাপিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত।
কবি আত্মাই নদীর ওপর বোট করে ভেসে চলেছেন। এটি পদ্মা নদীর কাছাকাছি অঞ্চলের একটি নদী।
পৃথিবীর মনের কথাটি কবি শুনতে পান নদীর ওপর এসে। তিনি বলেছেন: 'এই নদীর উপর এসে মনে হয়—পৃথিবীর যেন মনের কথাটি শুনতে পাওয়া যায়।'
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত প্রমাণসাহিত্যের উদাহরণ: ছিন্নপত্র। এটি তিনি নদীতে বোটে ভ্রমণকালে লেখা চিঠির এক বিখ্যাত সংকলন। (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ, শেষের কবিতা উপন্যাস—এগুলো প্রমাণসাহিত্য নয়।)
২. সংক্ষেপে উত্তর দাও
8 টিসম্পর্ক: শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির মাঝে থাকলে কবির মনের মধ্যে যে ভাব ও সুর জাগত, তাতে আরও নতুন গান তৈরি হতে পারত। কিন্তু কলকাতার নববর্ষের বাড়ির ইট-পাথরের পরিবেশে সেই সৃষ্টির আবহ তৈরি হয় না। কাজেই, কলকাতায় আসার কারণেই নতুন গান জমে ওঠেনি।
৩. দুই-চার কথা পরিচয় দাও
শান্তিনিকেতন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের কাছে অবস্থিত। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যা পরে 'বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ রূপান্তরিত হয়। প্রকৃতির মাঝে খোলা আকাশের নীচে শিক্ষাদান ছিল এর মূল আদর্শ। শান্তিনিকেতনের মাঠ, বৃষ্টি আর প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের বহু সৃষ্টির প্রেরণা।
দিনু অর্থাৎ দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২-১৯৩৫) ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি (জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পুত্র)। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রধান স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'সগল্পনী' নাটক দিনেন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং তাঁকে 'আমার সকল গানের ভাণ্ডারী' নামে অভিহিত করেছিলেন। কবির গানের সুর সংগ্রহের কাজে তাঁর অবদান অপরিসীম।
বর্ষামঙ্গল হলো বর্ষা ঋতুকে স্বাগত জানানোর একটি উৎসব। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বর্ষাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত 'বর্ষামঙ্গল' অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেন। এতে বর্ষার গান-কবিতা পাঠ হতো। পরে কলকাতাতেও এর প্রচলন হয়। এই পত্রে বর্ণিত হয়েছে শ্রাবণ মাসের সেই বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানের কথাই।
আত্মাই নদী অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে প্রবাহিত একটি নদী যা পদ্মার উপনদী। এই নদীতে বোটে করে ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত 'ছিন্নপত্র'-সহ বহু রচনার উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। পত্রে বর্ণিত বর্ষামুখর আত্মাই নদী ও তার দুই তীরের দৃশ্য কবির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
৪. একটি বর্ষামুখর দিনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে একটি ছোট অনুচ্ছেদ রচনা করো
একটি বর্ষামুখর দিন
সেদিন ছিল আষাঢ়ের এক ভরা বর্ষার দিন। সকাল থেকেই আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমি আর আমার দিদা বসেছিলাম দাওয়ায়। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো, বিদ্যুৎ চমকালো, তারপর শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। ছাদের টিনের ওপর বৃষ্টির শব্দ—টাপটাপ করে যেন কে ড্রাম বাজাচ্ছে। দিদা বললেন, 'বর্ষা এলো রে!'
আমি ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম—বাড়ির সামনের আমগাছটা ভিজে গাঢ় সবুজ হয়ে গেছে, পাতায় পাতায় জলের ফোঁটা ঝিকমিক করছে। রাস্তার ধারের কেয়াগাছটার গোড়ায় পানি জমে ছোট্ট একটা ডোবা হয়ে গেছে। একটা টিয়াপাখি ভিজে এসে বসেছে বারান্দার রেলিঙে, মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটাচ্ছে।
বৃষ্টির শব্দে আর ব্যাঙের ডাকে চারপাশ মুখরিত। দিদা পাশে বসে বললেন, 'এখনই বর্ষামঙ্গলের সময়।' কোনো গান শোনেননি তবু তাঁর চোখেমুখে সেই পুরোনো দিনের বর্ষামঙ্গলের সুর ভেসে উঠল। বৃষ্টি বুঝি কেবল জল নয়—এটা স্মৃতি, গান আর জীবনেরই আরেক নাম।
৫-৮. ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডার অনুশীলনী
- পুলক: রোমাঞ্চ, হর্ষোৎকর্ষ, আনন্দে গায়ের লোম খাড়া হওয়া
- উত্তরীয়: চাদর, গায়ে জড়ানোর বস্ত্র
- এসরাজ: এক ধরনের তারযন্ত্র, বেহালা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র
- আড়িনা: নদীতীরের পাড় বা উঁচু কিনারা
- সায়াহ্ন: সন্ধ্যাকাল, দিনাবসানের সময়
- প্রয়াস: চেষ্টা, যত্ন, উদ্যম
- নিভৃত: নির্জন, একান্ত, গোপন
| বাক্য | পদ | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|---|
| কলকাতা শহরটা আমি মোটেই পছন্দ করিনে। | আমি | কর্তৃকারক | শূন্য |
| তার উপরে আবার আকাশ মেঘে কল্প। | তার উপরে | অধিকরণ কারক | এ (সপ্তমী) |
| আমার মনের মধ্যে গান জেগে ওঠে। | মনের মধ্যে | অধিকরণ কারক | এ (সপ্তমী) |
| কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। | কলকাতায় | অধিকরণ কারক | য় (সপ্তমী) |
| সে গান কি কলকাতা শহরের হাটে জমবে। | হাটে | অধিকরণ কারক | এ (সপ্তমী) |
- শান্তিনিকেতন: শান্তিনিকেতনে গেলে মন শান্তিতে ভরে যায়।
- হাট: গ্রামের হাটে বসে পসরা সাজিয়েছেন কুমোর, কামার আর কৃষকেরা।
- বাদল: বাদল দিনে গরম ভাত আর আলু ভাজা খেতে দারুণ লাগে।
- বৃষ্টিধারা: ঝমঝমিয়ে বৃষ্টিধারা পড়ছে, চারদিক জলে থৈ থৈ করছে।
| শব্দজোড় | অর্থ ১ | অর্থ ২ |
|---|---|---|
| সূর — শূর | সূর: সুর, ধ্বনি, গানের টোন | শূর: বীর, সাহসী যোদ্ধা |
| আষাঢ় — আসার | আষাঢ়: বর্ষাকালের মাস | আসার: আগমনের, আসার (ক্রিয়া) |
| নৃত্য — নিত্য | নৃত্য: নাচ | নিত্য: প্রতিদিনের, সর্বদা |
| কুল — কূল | কুল: বংশ, গোত্র | কূল: নদীর তীর, পাড় |
| বর্ষ — বর্য | বর্ষ: বছর, বারো মাস | বর্য: বরণ করার যোগ্য, শ্রেষ্ঠ |
| সাড়া — সারা | সাড়া: প্রতিক্রিয়া, জবাব | সারা: সমাপ্ত করা, সারাদিন |
৯-১৭. সাহিত্য বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর
9 টি১) কলকাতা ইট-কাঠের প্রকাণ্ড জন্তুর মতো—গিলে খায় মানুষের মনুষ্যত্ব।
২) এ শহরে বর্ষার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে না—শান্তিনিকেতনের মতো গাছে গাছে, ঘাসে ঘাসে পুলক লাগে না।
৩) বর্ষার মেঘলা আকাশ আর ইট-পাথরের শহরের মিলন কবির কাছে কৃত্রিম মনে হয়।
৪) \'নববর্ষের বাড়ির ছাদ মঠাকর খেতে খেতে খাঁড়া হয়ে পড়ে\'—অর্থাৎ শহুরে বর্ষায় সেই আবেগ, সৌন্দর্য, নৃত্য-গান কিছুই নেই।
কবিতা: (১) \'বর্ষামঙ্গল\' (২) \'আষাঢ়\' (\'আজি ঝরঝর মুখর বাদরদিনে\')
হাট হলো অস্থায়ী বাজার বা মেলা—যেখানে মানুষ কেনাবেচা করে, কোলাহল হয়, ভিড় জমে, কিন্তু গভীর কোনো প্রাণ থাকে না। ব্যস্ততা আছে কিন্তু আন্তরিকতা নেই।
ঠিক তেমনই, কবির চোখে কলকাতা শহরটাও এক প্রকাণ্ড হাট—লোকজনের ভিড়, কোলাহল, যান্ত্রিক ব্যস্ততা আছে কিন্তু প্রকৃতির স্পর্শ বা আত্মার গভীরতা নেই। শান্তিনিকেতনের গান সেখানে তাই জমবে না—কারণ হাটে শিল্প জমে না, জিনিসপত্র কেনাবেচা হয়।
পত্রটি: পত্রটি সম্ভবত \'ছিন্নপত্র\' সংকলনের অন্তর্গত। \'ভানুসিংহের পত্রাবলি\'-তে অন্তর্ভুক্ত হলেও, এই ধাচের পত্রগুলি মূলত \'ছিন্নপত্র\'-এরই অংশ। কবি যখন পদ্মা ও তার শাখানদীতে বোটে ভ্রমণ করছিলেন, তখনই এইসব অবিস্মরণীয় পত্র লিখেছিলেন।
• ঘন বাঁশের ঝাড়ে গ্রামগুলো আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
• আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, শিমুল গাছ নিবিড় হয়ে উঠে গ্রামকে বেষ্টন করে রেখেছে।
• নদীর তীর ধরে কাঁচা ধানক্ষেত—পানিতে ডোবা, ধানের মাথা জলের উপর জেগে আছে।
• দুই তীরে জায়গায় জায়গায় সবুজের ঘনিমা ফুলে ফুলে উঠেছে।
এই পুরো দৃশ্যটি এত নির্জন, এত ছায়াবৃত যে মনে হয়—\'\'পৃথিবীর মনের কথাটি শোনা যাচ্ছে।\'\'
১) দর্শন-প্রীতি: চোখ দিয়ে দেখা—\'\'আমার দুই চোখ এখন বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে চায়।\'\'
২) শ্রবণ-প্রীতি: বৃষ্টির ঝমঝম ধ্বনি, বাতাসের সাড়া, নদীর কল্লোল—সব শুনে কবির মন গান রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়।
৩) ভাব-প্রীতি: প্রকৃতি দেখে মনের মধ্যে গান জাগে, \'\'মনে হতে চায়—পৃথিবীর যেন মনের কথাটি শোনা যায়।\'\'
৪) তুলনামূলক প্রীতি: কলকাতা বনাম শান্তিনিকেতনের বর্ষা—এই তুলনাই প্রমাণ করে তাঁর প্রকৃতি-প্রীতি।
৫) সৃজন-প্রীতি: প্রকৃতির রূপ দেখে কবির মনে নতুন গান সৃষ্টির ইচ্ছা জাগে—এটাই সর্বোচ্চ প্রীতি।
১৮. ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো
| বাক্য | ক্রিয়া | কাল |
|---|---|---|
| কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। | হবে | ভবিষ্যৎ কাল (সাধারণ) |
| অনুরোধে পড়ে কথনা কথনা আমার নতুন বর্ষার গান গাইতে হয়েছে। | গাইতে হয়েছে | বর্তমান কাল (পুরাঘটিত) |
| আজ সকালেই সে পালাবে শিকার করেছে। | করেছে | বর্তমান কাল (পুরাঘটিত) |
| আত্মাই নামক একটি নদীর উপর বোট করে ভেসে চলেছেন। | ভেসে চলেছেন | বর্তমান কাল (ঘটমান) |
| অনেকদিন বোলপুরের শুকনো ডাঙায় কাটিয়ে এসেছেন। | কাটিয়ে এসেছেন | বর্তমান কাল (পুরাঘটিত) |
১৯. বাক্যগুলিকে দুটি বাক্যে আলাদা করে লেখো
(ক) কথা হচ্ছে এবার শ্রাবণ মাসে বর্ষামঙ্গল গান হবে।
(খ) আর বারের মতো কলকাতায় (এই অনুষ্ঠান) হবে।
(ক) শান্তিনিকেতনের মাঠে বৃষ্টি নামে।
(খ) তখন তার ছায়ায় আকাশের আলো করুণ হয়ে আসে।
এটি সরল বাক্য—আলাদা করা যায় না। একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া 'নেই'।
(ক) আমার দুই চোখ এখন বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে চায়।
(খ) খাতার দিকে চোখ রাখবার এখন সময় নয়।
(ক) আজ রাতের গাড়িতেই কলকাতায় যাব।
(খ) (সে) মনে করে ভালো লাগছে না।